৩. কিশোরের পাশে দাঁড়াল রবিন আর মুসা

0 Comments

স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কিশোর। চোখ ক্যাকটাসের দিকে।

হাঁচড়ে-পাচড়ে তার পাশে এসে দাঁড়াল রবিন আর মুসা।

কি হয়েছে? মুসা জিজ্ঞেস করল।

বুঝতে পারছি না। কিছু দেখে ভয় পেয়েছে শারি।

পা বাড়াতে গেল রবিন। ধরে ফেলল তাকে মুসা। বারোর ঘাড়ের রোম যে দাঁড়িয়ে গেছে সেটা সে-ও লক্ষ্য করেছে। দেখি, কি করে ও।

কিছুই করল না শারি। তাকিয়েই রয়েছে ক্যাকটাসের দিকে। পেছনে হাঁপাতে হাঁপাতে উঠে এল ডজের ঘোড়া। কি হয়েছে?

শব্দটা কানে এল এই সময়। মৃদু একটা খড়খড়। ওদের কানে শব্দ পৌঁছার আগেই জেনে ফেলেছে বারোটা, সামনে মারাত্মক বিপদ।

শব্দটা আসছে ক্যাকটাসের পেছনের একটা পাথরের ওপাশ থেকে। কিসে করছে? আবার হলো শব্দ, আরও জোরাল। এবার আর খড়খড় নয়, অনেকটা মৌমাছির গুঞ্জনের মত।

ঘোড়াটার পাশে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছেন ডজ। জোরে শ্বাস টানলেন একবার। হাত বাড়ালেন রাইফেলের দিকে। র্যাটল স্নেক! ক্যাকটাসের পেছনেই! ভয় দেখিয়ে খোলা জায়গায় বের করে আনতে হবে, যাতে গুলি করতে পারি।

পাথর কুড়িয়ে নিল তিন গোয়েন্দা। ছোঁড়ার জন্যে তৈরি হলো। ক্যাকটাসের দিকে রাইফেল তুলে ধরলেন ডজ।

মার! বলে উঠল মুসা। একই সঙ্গে পাথর ছুঁড়ল তিনজনে। থেমে গেল গুঞ্জন। তবে নীরব হলো না।

জোরাল খটাখট আওয়াজ করে ক্যাকটাসের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল সাপটা। চার ফুট লম্বা। চ্যাপ্টা মাথাটা ওপরে তোলা। সাংঘাতিক দ্রুত গতি। শরীর মোচড়াতে মোচড়াতে পলক ফেলতে না ফেলতে ছুটে আসছে।

লাফিয়ে পেছনে সরে এল তিন গোয়েন্দা।

গুলি করলেন ডজ।

মনে হলো, লাগেনি। লাফিয়ে একপাশে সরে গিয়ে আবার আসতে লাগল।

তাকিয়ে রয়েছে যেন রবিন। সোজা তারই দিকে আসছে সাপটা। গোল গোল চোখ, লম্বা জিভটা দ্রুত বেরোচ্ছে আর ঢুকছে, লেজটা তুলে ধরা। লেজের ডগায় অনেকগুলো হাড় বোতামের মত একটার ওপর আরেকটা আলগা ভাবে বসানো, বাড়ি লেগে লেগে ওই অদ্ভুত শব্দ হচ্ছে। সরে যেতে চাইছে, কিন্তু পা উঠছে না। সম্মােহিত করে ফেলেছে যেন তাকে সাপটা।

রাইফেলের বোন্ট টানার শব্দ হলো। রাইফেল তুললেন ডজ।

কিন্তু ট্রিগার টেপার সুযোগ পেলেন না। নলের সামনে রয়েছে শারি, ওটার গায়ে গুলি লাগতে পারে।

চ্যাপ্টা হয়ে একেবারে ঘাড়ের সঙ্গে মিশে গেছে যেন বারোর কান। ঘুরছে। সাপটা যতই এগিয়ে আসছে, চঞ্চল হয়ে উঠছে ওটা। কিন্তু রবিনের মতই যেন সম্মােহিত হয়ে গেছে।

ফনা আরও উঁচু হল সাপটার। ছোবল মারার জন্যে প্রস্তুত।

চরকির মত পাক খেয়ে ঘুরে গেল হঠাৎ শারি। পেছনের দুই পা তুলে লাথি চালাল।

সাপের শরীরের মাঝামাঝি জায়গায় আঘাত হানল এক পায়ের লাথি। উড়ে গিয়ে বিশ ফুট নিচে পাথরের ওপর পড়ল ওটা। একটা সেকেন্ড নিথর হয়ে পড়ে বইল, যেন মরে গেছে। রবিনও তাই ভেবেছিল। কিন্তু ওদেরকে অবাক করে দিয়ে নড়ে উঠল ওটা। পিছলে গিয়ে ঢুকে পড়ল পাথরের ফাঁকে।

স্যাডল হোলস্টারে রাইফেলটা ঢুকিয়ে রাখলেন ডজ।

কেউ কথা বলল না। সবাই চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে, ভারি নিঃশ্বাস পড়ছে। তারপর, নীরবে আবার পা বাড়াল।

সামনের দিকে এগোল না আর শারি। উপরেও উঠল না। সমতল জায়গাটাকে ঘুরে এগোল। আবার জঙ্গল চোখে পড়ল কিশোরের। তাড়াহুড়ো করে সেদিকে এগিয়ে চলল বারো-টা। মূল পথ থেকে সরে যাচ্ছে, কিন্তু থামানোর চেষ্টা করল না কিশোর। যেদিকে খুশি যাক। ডজ বলেছেন ওটাকে ওটার ইচ্ছের ওপরই ছেড়ে দিতে।

বনে ঢুকে কিছুদূর এগিয়ে থেমে গেল শারি। ওটার গলা চুলকে দিল কিশোর।

আর কিছু বলব না তোকে, বলল সে। তোর ইচ্ছে মত চলবি। বুঝে গেছি, এখানে আমার চেয়ে তোর বুদ্ধি অনেক বেশি।

মুসা আর রবিন এল। ওদের পেছনে এলেন ডজ। চারপাশে তাকিয়ে স্বীকার করতে বাধ্য হলেন, রাতে ক্যাম্প ফেলার জন্যে চমৎকার জায়গা বেছেছে বারো। প্রচুর লাকড়ি আছে, সবুজ ঘাস আছে। কাছেই একটা সুন্দর ঝর্না, কিশোরকে পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল সেখানে।

সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে তাপমাত্রা কমে গেল। শার্টের ওপরে সোয়েটার পরে নিল তিন গোয়েন্দা। লাকড়ি জোগাড় করে চমৎকার একটা আগুনের কুন্ড বানিয়ে ফেলল মুসা। তারপর ঘোড়া থেকে মালপত্র নামাতে সাহায্য করল ডজকে।

শারির পিঠ থেকেও বোঝা নামিয়ে ফেলল কিশোর। জিন খুলে নিল। ঘাসপাতা খাওয়াল, ঝর্নার ধারে নিয়ে গেল পানি খাওয়াতে। তারপর সে আর রবিন মিলে রান্না করতে বসল। বড় একটা পাত্রে চাল আর বীন নিয়ে সিদ্ধ করে নিল।

এই জিনিস খাওয়া যায়! বিরস দৃষ্টিতে তাকাল ওগুলোর দিকে কিশোর। কিন্তু কি আর করা। বেঁচে থাকতে হলে খেতেই হবে। এই খাবারে দুজন লোক কিছুই মনে করল না। একজন ডজ, তার অভ্যাস আছে, আরেকজন মুসা, যার কোন খাবারেই অরুচি নেই।

খেতে খেতে ভাবছে কিশোর—আর কোন সন্দেহ নেই, সাংঘাতিক রহস্যময় একটা কেস পেয়ে গেছে তিন গোয়েন্দা। সমাধান করতে ভালই লাগবে। রহস্যটার কথা ভাবতে ভাবতে কোন দিক দিয়ে যে চাল আর বীন সেদ্ধ গিলে শেষ করে ফেলল সে, খেয়ালই রইল না।

খাওয়া শেষ করে জুতো খুলে ফেলল রবিন। পায়ের পাতায় হাত বোলাতে লাগল। ঢাল বেয়ে উঠতে গিয়ে ব্যথা হয়ে গেছে। ফোসকাও পড়েছে।

আর কতদূর যেতে হবে? ডজকে জিজ্ঞেস করল সে।

তীক্ষ্ণ হলো ডজের দৃষ্টি। কেন, তোমার ভাল্লাগছে না?

রবিনের দৃষ্টি আরও বেশি তীক্ষ্ণ হলো। এভাবে এগোনোর কথা কিন্তু ছিল না। ছিল, শারির খুরের ব্যবস্থা করার কথা। ওকে পাহাড়ে ছেড়ে দিয়ে যাওয়ার কথা। এমন কোথাও যেখানে ওর খুর ঠিক থাকবে। এখানে প্রচুর, পাথর আর পাহাড় আছে। জায়গাটা ভালও লাগছে মনে হয় ওর। তাহলে আর দেরি কেন?

রূঢ় কণ্ঠে কথাগুলো বলল সে। ডজের মিথ্যে বলা শুনতে শুনতে বিরক্ত হয়ে গেছে। লোকটাকে বুঝিয়ে দিতে চায় ওরা কচি থােকা নয় যে এভাবে মাথায় হাত বুলিয়ে আর অনর্গল মিথ্যে বলে বলে ধোকা দেবেন। বোঝাতে চায়, শারির খুর নিয়ে যে বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই ডজের, এটা বুঝে গেছে ওরা।

হ্যাঁ, রবিনের কথার প্রতিধ্বনি করল যেন মুসা, এটা শারির জন্যে চমৎকার জায়গা। পাহাড়ের ঢালে কিছু কিছু জায়গা তো দেখলাম লোহা ঘষার উখার চেয়েও ধার। এখানেই ছেড়ে দিচ্ছেন না কেন?

সাথে সাথে জবাব দিলেন না ডজ। কয়েকটা ডাল ছুঁড়ে দিলেন আগুনে। বারোটা নিজেই বুঝিয়ে দেবে কোথায় ওকে ছাড়তে হবে। যেখান থেকে এসেছে সেখানেই চলেছে। সেখানে পৌঁছলেই থামবে।

হোম, সুইট হোম, আনমনে বিড়বিড় করল কিশোর। বাড়ির জন্যে অস্থির হয়ে উঠেছে ও, একথা কেন মনে হচ্ছে আপনার?

বলা কঠিন, অধৈর্য কণ্ঠে জবাব দিলেন ডজ। কখনও কখনও বুনো বারোরা বাড়ির কাছাকাছিই থাকতে চায় সব সময়। কেন, কে জানে!

এখনও যে মিথ্যে বলছেন ডজ, বুঝতে পারছে কিশোর। রবিন আর মুসাও পারছে।

তাহলে বাড়ি থেকে অতদূরে র‍্যাঞ্চে গিয়ে উঠল কেন? ফস করে জিজ্ঞেস করে বসল মুসা।

বুনো বারোরা অনেক সময়ই দলছুট হয়ে দূরে চলে যায়। তারপর আবার একই কথা বললেন ডজ, কেন, কে জানে!

এটাও মিথ্যে কথা, ভাবছে কিশোর। দলছুট হয়ে নিছক খেয়ালের বশে র‍্যাঞ্চে গিয়ে হাজির হয়েছে বারো, কিছুতেই বিশ্বাস করে না সে। কেউ ওকে নিয়ে গিয়েছিল ওখানে। এমন কেউ, যাকে বিশ্বাস করে, পছন্দ করে শারি। সেই লোকের সঙ্গে সঙ্গেই চলে গিয়েছিল। হয়তো ওর প্রাণ বাঁচিয়েছিল ওই লোক এবং যার কণ্ঠ কিশোরের মত।

ঘাস খেতে খেতে আগুনের কাছ থেকে সরে যাচ্ছে বারো-টা। ওটার দিকে তাকিয়ে অস্বস্তি বাড়ছে ডজের। শেষে আর থাকতে না পেরে কিশোরকে বললেন, অনেক খেয়েছে। এবার বেঁধে ফেল। রাতে যেন ছুটতে না পারে। জোর করে হাসি ফোটালেন চেহারায়। নইলে আবার কি খেয়াল হয় কে জানে! র‍্যাঞ্চে ফিরে চলে যেতে পারে। বারোর কথা কিছুই বলা যায় না।

উঠে দাঁড়াল কিশোর। শারির পিঠে চড়ার সময় বুঝতে পারেনি, কতটা ধকল গেছে, এখন পারছে। এত শক্ত হয়ে গেছে পায়ের পেশী, ঠিকমত দাঁড়াতেই পারছে না। পায়ের পাতায় যেন কাঁটা বিঁধেছে, এরকম ভঙ্গিতে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে জানোয়ারটার কাছে গিয়ে দাঁড়াল সে। আদর করে চাপড় দিল পিঠে। বলল, দূরে যাসনে। আমার কাছাকাছি থাকবি।

ওসব বলে লাভ হবে না, ডজ সন্তুষ্ট হতে পারছেন না। গাধা গাধাই। ওটাকে বেঁধে ফেল, গাছের সঙ্গে।

ঘুরে দাঁড়াল কিশোর। ডজের মুখোমুখি। মাথা নাড়ল। না। রাতে পিপাসা লাগতে পারে ওর। পানি খেতে যেতে পারবে না বেঁধে রাখলে।

পানি আর কত খাবে? যা খাওয়ার খেয়েছে।

রাখঢাকের সময় শেষ হয়ে এসেছে। কাজেই নমনীয় হলো না কিশোর। বেঁধে রাখতে চাইলে আপনি যান। দেখুন ছুঁতে দেয় কিনা।

দীর্ঘ একটা মুহূর্ত চোখে চোখে তাকিয়ে রইল দুজনে। চলার সময় বস হয়ে যায় বারোটা, কিন্তু এখন বস্ হলো কিশোর। সেটাই বুঝিয়ে দিতে চাইল। সে যা বলবে তাই হবে।

বেশ, অবশেষে নরম হলেন ডজ। হামাগুড়ি দিয়ে গিয়ে ঢুকলেন স্লীপিং ব্যাগের ভেতরে। আমার বিশ্বাস, যতক্ষণ তুমি আছ, কাছাকাছিই থাকবে বারোটা।

কেন? কর্কশ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল কিশোর, আপনার এ বিশ্বাস হলো কেন? আমার প্রতি কেন এত আকর্ষণ গাধাটার?

কুইয়েন সাবে! মেকসিকানদের ভাষায়ই বললাম। কাত হয়ে শুলেন ডজ। চোখ মুদল। মানে করে দিল কথাটার, কে জানে!

অগ্নিকুন্ডের কাছে ফিরে চলল কিশোর। যাওয়ার সময় তার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপল রবিন।

স্লীপিং ব্যাগে ঢুকল কিশোর। ঘুমিয়ে পড়ল চারজনে।

অন্ধকার থাকতেই ঘুম ভেঙে গেল কিশোরের। আগুন নিভে গেছে। চোখে ঘুম। প্রথমে বুঝতে পারল না কি কারণে ঘুমটা ভাঙল। তারপর শুনতে পেল শব্দ।

গাধার ডাক। শারি!

একভাবে পড়ে থেকে শক্ত হয়ে গেছে শরীর। কোনমতে বেরিয়ে এল স্লীপিং ব্যাগের ভেতর থেকে। গাছপালার ভেতর দিয়ে ছুটল ঝর্নার দিকে।

বনের ভেতর থেকে বেরিয়েই চোখে পড়ল টর্চের আলো। ওপরে, নিচে, চক্রাকারে নড়ছে আলোক রশ্মি। সেই আলোয় প্রথমে দেখল শুধু বারো-টাকে। পেছনের পায়ে ভর দিয়ে লাফিয়ে উঠছে বার বার, সামনের পা দিয়ে লাথি মারার চেষ্টা করছে। প্রচন্ড খেপে গেছে।

ক্ষণিকের জন্যে স্থির হল আলো, চোখে পড়ল মহিলাকে। একহাতে টর্চ, আরেক হাতে বারোর দড়ি, টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। দড়িটা ফাসের মত করে পরিয়ে দিয়েছে শারির গলায়। কিশোরের ভয় হলো, দম না আটকে যায় টানাটানিতে।

আবার চিৎকার করে উঠল শারি। গলায় দড়ি আটকানো থাকায় শব্দটা কেমন ভোঁতা হয়ে গেল। আবার লাফিয়ে উঠল ওটা। সামনের পা দিয়ে লাথি মারার চেষ্টা করল অচেনা আগন্তুককে। একই সঙ্গে টেনে ছোটানোর চেষ্টা করছে গলায় লাগানো দড়ি।

সাপটার কি গতি করেছে, দেখেছে কিশোর। আশঙ্কা হলো মহিলার জন্যে। ওই লাথি যদি মাথায় লাগে, খুলি ভেঙে ঘিলু বেরিয়ে যাবে।

ছেড়ে দিন! চিৎকার করে বলল সে।

ছুটতে শুরু করল কিশোর। চেঁচিয়ে বলতে লাগল, শারি, চুপ কর, শারি! শান্ত হ!

দড়ি ছেড়ে দিয়েছে মহিলা।

টান বন্ধ হয়ে যেতেই আবার চারপায়ের ওপর স্থির হলো শারি। ফিরে তাকাল কিশোরের দিকে। ওটার নাকে হাত বুলিয়ে দিল সে। গলার দড়িটা দেখল। আঙুল ঢুকিয়ে দিয়ে হ্যাচকা টানে ঢিল করে দিল ফাঁসের বন্ধনী। আবার স্বাভাবিক ভাবে দম নিতে পারল শারি। মহিলার দিকে তাকাল কিশোর।

নিভে গেছে টর্চ।

অন্ধকার হয়ে গেছে আবার। ছুটন্ত পায়ের শব্দ কানে এল কিশোরের। পালিয়ে যাচ্ছে মহিলা। ঠিক এই সময় কিশোরের পাশে এসে দাঁড়াল মুসা আর রবিন।

কি হয়েছে? জানতে চাইল রবিন। শারি অমন চেঁচামেচি করল কেন?

ওকে চুরি করতে চেয়েছিল, জানাল কিশোর। এক মহিলা…

খাইছে! মুসা বলে উঠল। আবার সেই সোনালি চুল! তোমাকে যে খুন করতে চেয়েছিল! সে এসেছে বারো চুরি করতে?

না। মাথা নাড়ল কিশোর। টর্চের আলোয় আবছাভাবে দেখেছি তাকে। মুহূর্তের জন্যে। তবে চিনতে অসুবিধে হয়নি। সেই মেকসিকান মহিলা, বাসে যাকে দেখেছি। লাল শাল। কালো বেণি।

পরের দুটো দিন প্রথম দিনের মতই একটানা পথ চল ওরা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা, মাইলের পর মাইল, চলে চলে সিয়েরা মাদ্রের আরও গভীরে ঢুকে যেতে লাগল। এই পর্বতমালার যেন আর শেষ নেই, চলেছে তো চলেছেই। অনেক কষ্টে ঢাল বেয়ে যখন ওঠে, ভাবে ওপারে আর কিছু নেই। কিন্তু চূড়ায় উঠে দেখে ঠিকই মাথা তুলে রেখেছে আরেকটা পাহাড়।

মাঝে উপত্যকা। কোনটা সরু, কোনটা চওড়া। এখানে কয়েক মাইল ধরে চলল পাইনের বন। তারপর, সেই বন পেরিয়ে, আরেকটা ঢাল বেয়ে উঠে গাছপালার মাথা ছাড়িয়ে এল একসময়, ওপরে রুক্ষ পাথুরে ঢাল প্রায় খাড়া হয়ে উঠে গেছে।

ভাগ্যিস এখন গরমকাল, মুসা বলল। পাথর মাড়িয়ে ওঠার সময় সামনের দিকে ঝুঁকে থাকতে হচ্ছে অনেকখানি, পর্বতের খাড়াইয়ের জন্যে। শীতকাল হলে তুষারেই ডুবে যেতাম।

তাতে মন্দ হত না, রবিন বলল। দরদর করে ঘামছে পরিশ্রমে। কপাল থেকে একফোঁটা গড়িয়ে নামল চোখের পাতায়। এই গরম তো আর লাগত না।

ওদের দিন শুরু হয় এখানে সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে। সকালে নাস্তা সারে বীন আর চাল সেদ্ধ দিয়ে, দুপুরে লাঞ্চে ঠান্ডা বীন আর চাল সেদ্ধ-সকালে খাওয়ার পর যা বেঁচে যায়, রাতে আবার একই খাবার, গরম গরম, নতুন রান্না করে। মহা বিরক্তিকর। ঘেন্না ধরে গেছে কিশোরের। রবিনের তো এখন দেখলেই বমি আসে। মুসারও আর ভাল লাগছে না।

ফিরে যাওয়ার কথা বলল রবিন আর মুসা। কিন্তু গোঁ ধরে আছে কিশোর। এই রহস্যের শেষ না দেখে সে ছাড়বে না। দেখাই যাক না, কোথায় ওদেরকে নিয়ে যায় শারি। তবে, আর দুচারদিন ওই ভয়াবহ খাবার খেতে হলে তারও মনোবল ভেঙে যাবে।

দিনে তিন-চার বার করে খাওয়ার জন্যে থামে শারি। অন্যদেরকেও থামতে হয় বাধ্য হয়ে। এই থামাটাকে স্বাগতই জানায় তিন গোয়েন্দা। বিশ্রামের সুযোগ পাওয়া যায়। ডজ তো এক মুহূর্তের জন্যেও থামতে নারাজ। তবে একটা সুবিধে হয় তাঁর এতে। ঘোড়াটাকে নিয়ে অনেক পেছনে পড়ে যান তো, এগিয়ে আসতে পারেন। প্রচুর জই খাওয়ানো হয় ঘোড়াটাকে, তার পরেও প্রতিদিনই একটু একটু করে দুর্বল হয়ে পড়ছে ওটা। মাঝে মাঝে মাইল খানেক পেছনে পড়ে যায়। রবিন আর মুসার মত পা টেনে টেনে চলে তখন।

এ রকমই একটা বিশ্রামের সময় হাত-পা ছড়িয়ে চিত হয়ে আছে তিন গোয়েন্দা, ঘাস চিবুচ্ছে শারি। রবিন বলল, ওই মহিলাগুলো কেন এর মধ্যে ঢুকেছে, বুঝতে পারছি না। প্রথমে কিশোরকে ডুবিয়ে মারার চেষ্টা চালাল সোনালি চুলওয়ালা এক মহিলা, তারপর কালো বেনি এসে চুরি করার চেষ্টা করল বারোটাকে।

হয়তো মেকসিকান মহিলার বারোর পা ভেঙে গেছে, আন্দাজ করল মুসা। কাজেই বোঝা টানার জন্যে আরেকটা দরকার হতেই পারে।

রবিন এই যুক্তি মানতে পারল না। বারোর চরিত্র ভাল করেই জানা আছে মেকসিকানদের। জোর করে যে পিঠে সওয়ার হওয়া যায় না, জানে।

ভাবছি, কিশোর বলল। বারো-টাকে নিজের জন্যেই চেয়েছে কিনা মহিলা। কিংবা অন্য কোন কারণে ওটাকে সরিয়ে ফেলতে চেয়েছে।

তাই? মুসা আর কোন যুক্তি দেখাতে না পেরে চুপ হয়ে গেল।

কিশোরেরও আর কিছু বলার নেই।

আবার শুরু হলো পথচলা।

প্রতি সন্ধ্যায়ই একটা করে জায়গা খুঁজে বের করে শারি, যেখানে আগুন জ্বালানোর জন্যে প্রচুর লাকড়ি আছে, আর খাওয়ার পানির ব্যবস্থা আছে। ওখানেই রাতের জন্যে ক্যাম্প ফেলে ওরা। এর মাঝে ওই মহিলাকে ছাড়া আর কোন মানুষ চোখে পড়েনি ওদের। মাঝে সাঝে একআধটা কুঁড়ে চোখে পড়ে, মাটির দেয়াল আর পাতার ছাউনি, অ্যাডাব বলে ওগুলোকে। সবই দূরে দূরে। ওগুলোতে কেউ থেকে থাকলেও গোয়েন্দাদের চোখে পড়ল না।

দ্বিতীয় দিনে কিশোরের পায়ের পেশী শক্ত হয়ে থাকা সেরে গেছে। আড়ষ্টতা দূর হয়ে একেবারে ঝরঝরে হয়ে গেছে। হাঁটতে এখন অনেক সহজ লাগে। কোমরের বেল্ট ঢিলে হয়ে গেছে, রওনা দেয়ার সময় যে ছিদ্রটায় ঢুকত বাকলেসের কাটা, এখন তার আগের ছিদ্রটায় ঢোকে।

বাপরে বাপ! বন্ধুদেরকে বলল সে, বারোর পিঠে চাপা-ও কম পরিশ্রম নয়!

সেদিন, একটা শৈলশিরার কাছ দিয়ে চলার সময় সামনে সাদা ধোঁয়া দেখতে পেল ওরা। থেমে গেল। তাকিয়ে রইল সেদিকে।

বিড়বিড় করল রবিন, দাবানল না তো!

হলেও অনেক দূরে, মুসা বলল। আমাদের কাছে আসতে পারবে না।

যদি বাতাস এদিকে না বয়।

এ ব্যাপারে কিশোর কোন মন্তব্য করল না। চিন্তিত ভঙ্গিতে তাকিয়ে রয়েছে ধোঁয়ার দিকে।

সেদিন এত বেশি পেছনে পড়ে গেল ডজের ঘোড়া, সন্ধ্যায় তিন গোয়েন্দার এক ঘণ্টা পরে পৌঁছল ক্যাম্পে। খুবই উদ্বিগ্ন ডজ। রাতের খাওয়ার সময় বললেন, একটা দিন বিশ্রাম দিতে হবে ঘোড়াটাকে। নইলে চলতে পারবে না। খোঁড়াও হয়ে যেতে পারে।

খাওয়া শেষ হলে বললেন, তোমরা আমাকে রেখেই এগিয়ে যাও। যত তাড়াতাড়ি পারি তোমাদের কাছে পৌঁছব।

আমাদের খুঁজে পাবেন তো? মুসার গলায় সন্দেহ।

তা পাব। এসব অঞ্চলে চিহ্ন অনুসরণ করে চলা খুব সহজ। দুজন মানুষের জুতো আর একটা বারোর খুরের ছাপ জ্বলজ্বল করবে মাটিতে।

পরদিন সকালে খাবার ভাগ করে দিলেন ডজ। রওনা হয়ে গেল তিন গোয়েন্দা। স্লীপিং ব্যাগের ওপরে আরও কিছু বোঝা, এই যেমন খাবার আর রান্নার সরঞ্জাম, বহন করতে আপত্তি করল না শারি। এবার আর ওটার পিঠে চাপল না কিশোর। হেঁটে চলল। রবিন আর মুসাও রইল সঙ্গে।

সেরাতে ক্যাম্প ফেলার পর প্রচুর কথা বলল ওরা, হাসি-মশকরা করল। ডজ কানের কাছে না থাকায় কথা বলতে পারছে সহজ ভাবে।

রাতে কি খাওয়া যায়, বলো তো? কিশোরকে রান্নার জোগাড় করতে দেখে ঠাট্টা করে বলল রবিন। রাইস আর বীন?

নাহ! জবাব দিল মুসা, বীন আর রাইস।

আসলে, হেসে বলল কিশোর। তোমরা দুজনেই ভুল করলে। রান্না করব বীনস আ লা রাইস। দয়া করে বাসন নিয়ে তৈরি হয়ে যাও।

ডিনারের পর আগুনের কুন্ড ঘিরে বসল তিনজনে। হঠাৎ উত্তেজিত ডাক ছাড়ল শারি। লাফিয়ে উঠল তিনজনে। কান খাড়া।

মুহূর্ত পরেই আগুনের আলোয় একটা বড় বারোকে বেরিয়ে আসতে দেখা গেল গাছের আড়াল থেকে। এল এদিকেই। শারির চেয়ে বয়েস অনেক বেশি। পিঠে জিন নেই। তবে দড়ি দিয়ে বাঁধা রয়েছে কয়েকটা পোঁটলা।

ওটার পেছন পেছন এল কালো বেণি করা সেই মহিলা।

ডাকাডাকি থামিয়ে দিল শারি। স্বজাতীয়কে দেখে খুশি হয়েছে। দুলকি চালে এগিয়ে গেল। নাক ঘষাঘষি করে স্বাগত জানাল পরস্পরকে।

কাছে এল মেকসিকান মহিলা।

ঘাবড়িও না, হাত নেড়ে স্প্যানিশ ভাষায় বলল সে। এবার বারো চুরি করতে আসিনি। তোমাদের সঙ্গে কথা বলতে চাই। আমার নাম ইসাবেল। তোমরা কে, জানি। তবে, কথা বলার আগে, আমাকে কিছু খেতে দাও। খুব খিদে পেয়েছে।

এক প্লেট রাইস আর বীন দিল ওকে কিশোর। আগুনের ধারে বসল ইসাবেল। ভাল খিদেই পেয়েছে ওর। সমস্ত খাবার শেষ করার আগে মুখই তুলল না।

বাসে বেশ কিছুটা দূর থেকে ওকে দেখেছে কিশোর। এই প্রথম কাছে থেকে ভালমত দেখার সুযোগ পেল। মহিলা খাচ্ছে, আর সে তাকিয়ে রইল তার মুখের দিকে।

বয়েস চল্লিশ মত হবে। মোটামুটি সুন্দরীই বলা চলে। চেহারাই বলে দিচ্ছে আত্মবিশ্বাসে ভরপুর। পকেট ওয়ালা ঢিলাঢালা একটা উলের স্কার্ট পরেছে। পায়ে মেকসিকান বুট। গায়ে খাটো হাতাওয়ালা একটা ব্লাউজ। চামড়ার রঙ গাঢ় বাদামী, চোখ পিরেটোর মতই কালো। সব মিলিয়ে, কিশোরের মনে হলো, ওই মহিলা ভালর ভাল, মন্দের যম।

খালি বাসনটা সরিয়ে হাতঘড়ির দিকে তাকাল ইসাবেল। পুরুষের ঘড়ি পরেছে। বেল্টটা ঢিলে। হাত খাড়া করতেই নিচের দিকে নেমে গেল ওটা। তাড়াতাড়ি আবার ওপরের দিকে কব্জির কাছাকাছি তুলে দিল সে।

সময় বেশি নেই, ইসাবেল বলল। লেকের কাছে ফিরে যেতে হবে আমাকে। যতটা তাড়াতাড়ি পারি সংক্ষেপে সব বলে যাচ্ছি তোমাদেরকে। কিশোরের দিকে তাকাল সে। আমি ইংরেজি বলতে পারি না। তবে তোমরা স্প্যানিশ জানো, জানি আমি।

পুরানো চামড়ার জ্যাকেট পরা লোকটার কথা মনে পড়ল কিশোরের। যে ওদেরকে বাসে উঠতে বাধা দিচ্ছিল। লোকটার সঙ্গে তর্ক করার সময় নিশ্চয় মহিলা শুনেছে। বুঝতে পেরেছে ওরা স্প্যানিশ জানে।

মাথা ঝাঁকাল কিশোর। বলতে ততটা পারি না। তবে বুঝতে পারি। আস্তে আস্তে বলুন, বুঝব।

গুড। হাঁটু ভাঁজ করে আরাম করে বসল ইসাবেল। টেনে দিল স্কার্ট। পরের পনেরো মিনিট নিচু স্বরে প্রায় একটানা কথা বলে গেল। মাঝে সাঝে একআধটা প্রশ্ন করল কিশোর। ইতিমধ্যে একবার উঠে চলে গিয়েছিল রবিন। কয়েক মিনিট পর ফিরে এসেছে।

তারপর উঠে দাঁড়াল ইসাবেল। তিন গোয়েন্দাও উঠল।

এক এক করে ওদের সঙ্গে হাত মেলাল ইসাবেল। তারপর, যেমন হঠাৎ করে উদয় হয়েছিল, রহস্যময় ভাবে, তেমনি করেই আবার বারো-টাকে টেনে নিয়ে অশ্য হয়ে গেল রাতের অন্ধকারে।

আগুনে কাঠ ফেলল মুসা। কি বুঝলে?

একটা সাংঘাতিক গল্প বলে গেল! মাটিতে পা ছড়িয়ে বসে বলল কিশোর। রবিন, পঞ্চো ভিলার ব্যাপারে যা যা জানো বলো তো?

আমাকে কি মেকসিকান পাবলিক লাইব্রেরি বলে মনে হচ্ছে?

বাজে কথা রাখ। রকি বীচ থেকেই মেকসিকোর ইতিহাস পড়া শুরু করেছ তুমি। শেষ করোনি এখনও?

করেছি, হাসল রবিন। যেদিন তুমি লেকের পানিতে ডুবে আরেকটা ইতিহাস সৃষ্টি করতে যাচ্ছিলে, সেদিনই।

আমিও জানি, শেষ করে ফেলেছ। হাসিটা ফিরিয়ে দিল কিশোর। উনিশ শো ষোলো সালের ব্যাপারে আমার আগ্রহ। পঞ্চো ভিলার কথা কি জানো?

ওই বছর একটা বিরাট বিদ্রোহ হয়ে গিয়েছিল মেকসিকোতে। সেই বিদ্রোহেরই এক বড় নায়ক ছিল পঞ্চো ভিলা। অনেকের ধারণা, আউট-ল ছিল সে, জেসি-জেমসের মত। ব্যক্তিগত একটা সেনাবাহিনী গড়ে তুলেছিল। অনেকগুলো লড়াই জিতেছে।

এখানে, সিয়েরা মাদ্রেতেও এসেছিল নাকি?

এসেছিল। তার একটা ঘাঁটি তৈরি করেছিল এখানেই। মরুভূমিতে নেমে গিয়ে ট্রেনের ওপর আক্রমণ চালাত। লুটপাট করে ফিরে এসে আবার লুকিয়ে পড়ত এখানে।

চিন্তিত ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকাল কিশোর। এই কথাটা তাহলে সত্যিই বলেছে ইসাবেল।

তারমানে, তুমি বলতে চাইছ ওর ব্যাপারেই যত আগ্রহ মহিলার? মৃত একজন মানুষের ব্যাপারে?

না, তার ব্যাপারে নয়, কিশোর জবাব দিল। মনে হচ্ছে সিয়েরা মাদ্রের গুপ্তধনের পেছনেই ছুটেছি আমরা, না জেনে, যেটার কথা বহুবার বলেছ তুমি। পঞ্চো ভিলার লুটের মাল। শুনলে না, ইসাবেল বলে গেল, একদিন একটা ট্রেন লুট করে হাজার হাজার ডলার দামের সিলভার পেসো নিয়ে এসেছিল পঞ্চো। এখানে উঠে এসে কোন একটা গুহাটুহায় লুকিয়ে রেখে গিয়েছিল সে সব পেসো। ইসাবেলের বলে যাওয়া গল্প আবার বলতে লাগল কিশোর। নিজেকেই যেন শোনাচ্ছে। খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে কি রহস্য লুকিয়ে রয়েছে এর ভেতরে। একটা ভুল করেছিল পঞ্চো, কিংবা তার দুর্ভাগ্যই বলা যায়, পেসোর সঙ্গে একই গুহায় বারুদ রেখেছিল সে। অসাবধানে দেশলাইয়ের কাঠি ফেলেছিল তার এক সহচর, বিস্ফোরণ ঘটল বারুদে। পর্বতের একটা অংশ ধসে গেল। টন টন পাথরের নিচে চাপা পড়ল পঞ্চোর লুটের মাল, সেই সঙ্গে তার সেনাবাহিনীর একটা বড় অংশ। পাথর পরিষ্কার করতে শুরু করল পঞ্চো। কিন্তু এই সময় তার শত্রুরা এসে আক্রমণ চালিয়ে বসল পর্বতের অন্য পাশ থেকে পালাতে বাধ্য হলো সে।

এক মুহূর্ত চুপ করে রইল কিশোর।

তারপর, গল্পটা শেষ করল সে। ইসাবেল বলে গেল, শুনলেই তো, মুদ্রাগুলো এখনও সেখানে আছে।

নীরবে কিশোরের কথা শুনছিল মুসা আর রবিন।

ইসাবেল জানল কি করে এসব? রবিনের প্রশ্ন। উঠে চলে যাওয়ায় অনেক কিছুই শোনেনি সে।

ও বলল, তার দাদা নাকি তার সৈন্য দলে ছিল। ও-ই গল্পটা শুনিয়ে গেছে। ওদের পরিবারকে, জবাবটা দিল মুসা।

ডজের কথা কি বলল? জানতে চাইল রবিন। ওর নাম বলতে শুনলাম। বারোটার কথাও কি যেন বলল?

কিশোর বলল, মাস তিনেক আগে নাকি ইসাবেলের এক বন্ধু, টনি নামের এক আমেরিকান তরুণ, এখানে এসেছে। সে আর তার বাবা সোনা খুঁজে বেড়িয়েছে এখানকার পর্বতে। আসলে ওরা খুঁজতে এসেছিল পঞ্চো ভিলার গুহা। ওদের ধারণা, গুহাঁটা খুঁজেও পেয়েছিল ওরা। ইসাবেলকে টনি সে কথাই বলেছে।

চুপ করল কিশোর।

বলো, তাগাদা দিল রবিন। কথার মাঝখানে থামলে কেন? ডজ আর শারি এর মধ্যে এল কিভাবে শুনতে চাই।

টনি যখন লেকে গেল, বলল কিশোর। তার সঙ্গে ছিল একটা ছোট সাদা বারো। গুহার কাছে পেয়েছিল ওটাকে। বাচ্চাটার সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতিয়ে ফেলল। যাওয়ার সময় নিয়ে গিয়েছিল ডজের র‍্যাঞ্চে। তারপর আবার ফিরে গিয়েছিল পর্বতে।

কেন? সাথে করে যখন আনতেই পারল, নিতে পারল না কেন? কেন ফেলে গেল র‍্যাঞ্চে?

কারণ টনির ভয়, শারি আবার পর্বতে গেলে মরে যাবে। বারোটার চিকিৎসার দরকার ছিল, আর এখানে সব চেয়ে কাছের পশুচিকিৎসক থাকেন লারেটোতে। পিরেটো গিয়ে নিয়ে এসেছিল তাঁকে। বারোটাকে চিকিৎসা করে সারিয়ে তোলা হলো।

কি হয়েছিল ওর? এটাই যদি অসুস্থ হবে, ডজের র‍্যাঞ্চ পর্যন্ত গেল কি করে?

চোখে একটা বাজে ধরনের ইনফেকশন হয়েছিল। তাতে প্রায় অন্ধই হয়ে গিয়েছিল বারোটা। ইসাবেলের গল্পের এই জায়গাটায় বিশেষ আগ্রহ কিশোরের। গলা শুনেই যে তাকে চিনেছে বারোটা, তার সঙ্গে ওই চোখের অসুখের কি কোন যোগাযোগ আছে? কেন শারি বুঝতে পারল না, সে টনি নয়, যে তাকে অন্ধত্ব থেকে মুক্তি দিয়ে বাঁচিয়েছে? অন্ধ হয়ে পর্বতে কোনদিন টিকে থাকতে পারে না কোন বারো। পিরেটোর কথা মনে পড়ল কিশোরের শারি ভাবে, তুমি ওর প্রাণ বাঁচিয়েছ।

মোলায়েম শিস দিল মুসা। হুঁ, মিলতে আরম্ভ করেছে। ডজ জেনে গেছে টনি আর তার বাবা পঞ্চো ভিলার গুপ্তধন খুঁজে পেয়েছে…

তখন, মুসার মুখের কথা টেনে নিয়ে কিশোর বলল, ডজ টনিকে গুহাঁটা চিনিয়ে দেয়ার জন্যে চাপাচাপি করেছে। কিন্তু টনি খুব চালাক। পালাল। চলার পথে নিজের চিহ্ন সব মুছে দিয়ে গেল, যাতে ডজ পিছু নিতে না পারে। ডজের কাছে রয়ে গেল শারি। পথ চেনে যে। পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে পারে গুহার কাছে। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও শারিকে বাগ মানাতে পারল না সে, কিছুতেই তাকে নিয়ে গেল না বারোটা। ডজ বুঝতে পারল, যাকে পছন্দ করবে একমাত্র তার কথা ছাড়া আর কারও আদেশ মানবে না শারি। এমন কেউ, যাকে কণ্ঠস্বর শুনেই বন্ধু হিসেবে চিনে নেবে।

তখন ওরকম কাউকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করল ডজ, মুসা বলল, যার কণ্ঠস্বরের সঙ্গে টনির স্বরের মিল আছে। এ জন্যেই রহস্যময় ওই ধাঁধা প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিল সে।

এবং কিশোরকে খুঁজে বের করল, যোগ করল রবিন। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না, ইসাবেল কেন এসব কথা ওকে বলে গেল?

ঠিক, মুসা বলল। আমাদেরকে র‍্যাঞ্চেই যেতে দিতে চায়নি যে, সে কেন এখন যেচে পড়ে সব কথা শুনিয়ে যায়?

কথাটা কিশোরের মনেও খচখচ করছে।

আমাকে কোন প্রশ্ন করতে দেয়নি ইসাবেল, কিশোর বলল। কেবল তার কথা যখন বুঝিনি, জিজ্ঞেস করেছি, বুঝিয়ে দিয়েছে। ব্যস, ওই পর্যন্তই। যা বলার সে নিজেই বলেছে, আমাকে কেবল শুনতে হয়েছে। ডজকে একবিন্দু বিশ্বাস করে না। ওর ঘোড়া খোঁড়া হয়ে যাবে, চলতে পারবে না, এটা বিশ্বাস করেনি। ইসাবেলের ধারণা, ঘোড়ার পা ঠিকই ছিল, ইচ্ছে করেই আমাদের পেছনে পড়েছে ডজ। কোন উদ্দেশ্য আছে। মহিলার ভয়, টনি আর তার বাবাকে দেখলেই গুলি করে মারবে ডজ। ইসাবেলকে দেখলে তাকেও মারবে। কাজেই লেকে ফিরে যাচ্ছে সে। আমাদেরকে অনুরোধ করেছে গুহায় গিয়ে টনি আর তার বাবাকে যেন সাবধান করে দিই ডজের ব্যাপারে।

আগুনের দিকে তাকিয়ে বসে রইল তিন গোয়েন্দা। দীর্ঘক্ষণ কারও মুখে কথা নেই।

অবশেষে মুখ খুলল মুসা, কিশোর, ইসাবেলকে বিশ্বাস করো তুমি?

বুঝতে পারছি না করব কিনা। তাকে সন্দেহ এবং অবিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ আছে। টনি আর তার বাবাকে খুঁজে বের করার ব্যাপারে এত আগ্রহ কেন? এমনও তো হতে পারে, সে চাইছে আমরা গিয়ে পেসোগুলো খুঁজে বের করি।

হ্যাঁ, হতেই পারে, রবিন বলল। আমাদের পেছন পেছন যাবে সে। তারপর যেই আমরা ওগুলো বের করব, কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করবে।

পরদিন সূর্য ওঠার আগেই ঘুম থেকে উঠে পড়ল তিন গোয়েন্দা। নাস্তা সারতে সারতে আরও আলোচনা করল ইসাবেলের ব্যাপারে।

আমাকে বোকা বানাতে চেয়েছে সে, কিশোর বলল।

কিভাবে? মূসার প্রশ্ন।

লেকে ফিরে যাচ্ছে বলে! বেশ তাড়াহুড়া, এমন একটা ভাব, যেন তক্ষুণি রওনা হয়ে যাবে লেকের উদ্দেশে।

মাথা দোলাল রবিন। রাতের বেলা এসব পাহাড়ে পথ চলাই মুশকিল। যাওয়ার ইচ্ছে থাকলে সকালেও তো রওনা হতে পারত। পুরো ব্যাপারটাই আসলে ভাঁওতাবাজি।

আর ওই ঘড়িটা, কিশোর বলল, বার বার কজি থেকে নেমে যাচ্ছিল, ঠেলে ঠেলে তুলতে হচ্ছিল ওপরে। মনে হলো… শ্রাগ করল সে, …জানি, না, আলোর কারসাজি হতে পারে। ভুলও দেখে থাকতে পারি।

কি? জিজ্ঞেস করল মুসা।

ওর কব্জিতে একটা দাগ দেখেছি। শিওর না।

মুসা দেখেনি, জানাল সে কথা।

রবিন বলল, মহিলা ভীষণ চালাক। ওর অনেক কিছুই খটকা লাগার মত। আমার অবাক লেগেছে, যখন জানলাম, কন্টাক্ট লেন্স পরে। সাধারণত যা পরে না। মানুষ…

কন্টাক্ট লেন্স? বাধা দিল মুসা।

হ্যাঁ। বাসে মুছতে দেখেছি। মাথা নিচু করে রেখেছিল, প্রথমে বুঝতে পারিনি কি করছে। পরে ভালমত দেখে বুঝলাম। আরেকটা ব্যাপার আরও বেশি অবাক করেছে। চুপ হয়ে গেল রবিন।

সেটা কি? জানতে চাইল কিশোর। বলতে এত দেরি করছে রবিন, এটা সহ্য হচ্ছে না ওর।

আরেকটা ব্যাপার হলো… কিশোরের অবস্থা বুঝে হাসল রবিন। ইচ্ছে করেই দেরি করছে বলতে। তথ্য গোপন করে কিশোরও অনেক সময় ওদেরকে এরকম অস্থিরতার মাঝে রাখে। সুযোগ পেয়ে শোধ তুলছে সে।

কী! বলো না! খেপে গেল কিশোর। ওয়াকি-টকি দিয়ে এই পর্বতের ভেতর কি করে সে? প্লেটের বীন সেদ্ধ শেষ করে কয়েকটা পাইনের পাতা কুড়িয়ে নিয়ে সেগুলো দিয়ে মুছে পরিষ্কার করতে লাগল প্লেটটা রবিন। আবার চুপ।

অস্থির হয়ে উঠেছে কিশোর। এক থেকে দশ পর্যন্ত গুনল। তারপর যখন খেঁকিয়ে উঠতে যাবে তখন রবিন বলল, বারোর পিঠের একটা পোটলা থেকে ওয়াকি-টকির অ্যান্টেনা বেরিয়ে আছে দেখলাম মনে হলো। পঞ্চো ভিলার ব্যাপারে যখন তোমাকে জ্ঞান দিচ্ছে, তখন উঠে গেলাম ভাল করে দেখার জন্যে। ওয়াকিটকি একটা আছে ওর কাছে।

ওয়াকি-টকি দিয়ে এই পর্বতের ভেতর কার সঙ্গে কথা বলে সে? অবাক হলো মুসা। ডজ হতে পারে না। কারণ ওকে দেখতে পারে না মহিলা। তাছাড়া ডজের সমস্ত পোটলা-পাটলি ভাল মত দেখেছি আমি। ওয়াকি-টকি নেই।

পিরেটোর আছে, কিশোর বলল। নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। আমি মেরামত করে দিয়েছি। কিন্তু র‍্যাঞ্চ এখান থেকে অনেক দূর। ওয়াকি-টকিতে যোগাযোগ অসম্ভব।

উঠল ওরা। সাবধানে আগুন নেভাল, যাতে ছড়িয়ে গিয়ে দাবানল সৃষ্টি করতে পারে। শারির কাঁধে মালপত্র বাঁধল কিশোর।

লেকে যদি, বারোর পিঠে আলতো চাপড় দিয়ে চিন্তিত ভঙ্গিতে যেন নিজেকেই প্রশ্ন করল কিশোর। সত্যিই না গিয়ে থাকে ইসাবেল, তাহলে কি করবে? হতে পারে, এই মুহূর্তে পাথরের আড়ালে লুকিয়ে আমাদের ওপর নজর রাখুছে সে। আলো বেড়েছে। বাড়ছে ক্রমেই। চারপাশে তাকাল সে। আমরা এগোলেই আমাদের পিছু নেবে, চিহ্ন ধরে ধরে। আমাদেরকে জানতে দিতে চায় না। হয়তো, সে-ও যে ওই পেসোর পেছনে লেগেছে।

হাত ওন্টাল মুসা। যদি সেটা করতেই চায়, করবে, আমাদের কিছু করার নেই। চিহ্ন তো আর লুকাতে পারব না।

তা পারব না। শারিকে চলার নির্দেশ দিল কিশোর। তবে একটা সুবিধা আমাদের আছে।

কি?

কাল রাতে ইসাবেলের বারোর সঙ্গে বন্ধুত্ব করে ফেলেছে শারি। আর মিস্টার সাইমন জানিয়েছেন, বারোরা চেনা বারোকে অনেক দূর থেকেও গন্ধ শুকে চিনতে পারে। একজন আরেকজনকে ডাকাডাকি করে জানান দেয়। তাই, ইসাবেলের বারোটা যদি খুব কাছাকাছি চলে আসে, ডাক দেবেই। শারিও জবাব দেবে। মাইল দুয়েকের মধ্যে থাকলেও জেনে যেতে পারব আমরা।

সেদিনকার পথচলা অন্যদিনের চেয়ে কঠিন হল। সব চেয়ে খাড়া আর উঁচু চূড়ায় উঠতে থাকল শারি। ঢালের গভীর সব খাঁজ আর শৈলশিরার ভেতর দিয়ে একেবেঁকে উঠে চলল অনেক উঁচু চূড়াটার দিকে।

একটি বারের জন্যেও থামল না কিংবা ডাকল না ওটা। বার বার পেছনে ফিরে তাকাল তিন গোয়েন্দা, কিন্তু ইসাবেল বা তার বারোর ছায়াও চোখে পড়ল।

আরেকবার ধোঁয়া দেখতে পেল ওরা। এক জায়গা থেকে লম্বা হয়ে উড়ছে ঘন সাদা ধোঁয়া। মনে হলো, যে চূড়াটায় উঠছে ওরা, তার ওপাশ থেকে উঠছে ওই ধোঁয়া।

অদ্ভুত তো? মুসা বলল। বনই নেই, আগুন লাগল কিসে? ক্যাকটাস ছাড়া আর কিছুই দেখি না।

হুঁ, মাথা দোলাল কিশোর। পাহাড়ের অন্যপাশে আছে হয়তো।

তিক্ত কণ্ঠে রবিন বলল, এখানে যেন সবাই মিথ্যুক। ডজ মিছে কথা বলে, ইসাবেল মিথ্যে বলে, এখন পাহাড়ও দাবানল লেগেছে বলে ফাঁকি দিয়ে চলেছে আমাদের।

আকাশের দিকে তাকিয়ে রয়েছে মুসা। ধোঁয়ার রঙও কেমন আজব! সাধারণ ধোঁয়ার মত নয়।

অনেক ওপরে উড়ছে শিকারি পাখিরাঃ শকুন, ঈগল, চিল। সেদিকে তাকিয়ে রবিন বলল, দাবানল পাখিদের কিছু করতে পারে না। বনের সবাই মরলেও ওরা পালায়। আগুন ছুতেও পারে না ওদের। এদিক থেকে ওরা ভাগ্যবান।

এগিয়ে চলেছে ওরা। রহস্য সমাধানের প্রচন্ড নেশাই রুক্ষ দুর্গম পথে শারির পিছু পিছু টেনে নিয়ে চলেছে কিশোরকে। বিকেলের শুরুতে মুসা আর রবিনকে অনেক পেছনে ফেলে এল ওরা।

এই থাম! আচমকা চিৎকার শোনা গেল। এক পা এগোবে না আর!

থেমে গেল রবিন আর মুসা। মুখ তুলে দেখল ওদের অনেক ওপরে হাত তুলছে কিশোর।

এইবার আস্তে আস্তে এগোও, বলল সে। বারোটাকে অনুসরণ করো।

অবাক হয়ে পরস্পরের মুখের দিকে তাকাল দুই সহকারী গোয়েন্দা। তাই তো করছে ওরা। তাহলে কি বলতে চাইছে কিশোর?
ধীরে ধীরে যেন প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে উঠতে আরম্ভ করল আবার রবিন আর মুসা। শারির একেবারে পেছনেই রয়েছে কিশোর। কোন রহস্যময় কারণে হাত তুলেই রেখেছে সে। বুঝতে পারছে না ওরা।

তারপর থেমে গেল গোয়েন্দাপ্রধান।

আর কাছে এসো না, পাহাড়ে পাহাড়ে প্রতিধ্বনি তুলে আবার ভেসে এল কিশোর পাশার কণ্ঠ। কে তোমরা? এখানে কি চাই?

আবার একে অন্যের দিকে তাকাল মুসা আর রবিন। পুরো ব্যাপারটাই কেমন ভূতুড়ে লাগছে এখন ওদের কাছে। হচ্ছেটা কি? পাগল হয়ে যাচ্ছে নাকি ওরা? ওদের মাথায় যেন গোলমাল করে দেয়ার জন্যেই আবার শোনা গেল আমি কিশোর পাশা। তোমার জন্যে খবর নিয়ে এসেছি।

ওর কথা যে কি প্রতিক্রিয়া করছে ওর বন্ধুদের ওপর ভাবল না কিশোর, ভাবার অবকাশও নেই। ওর কাছেও পরিস্থিতিটা বিপজ্জনক। পথের একটা মোড় ঘুরতেই চোখ পড়েছে একটা রাইফেলের নলের ওপর। পাথরের আড়াল থেকে উঁকি দিয়ে আছে ওটা।

থাম! আবার আদেশ দিল আগের কণ্ঠটা। এগোবে না আর!

ওই কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করে দিয়েছে শারিকেও। খাড়া হয়ে গেছে কান। মোলায়েম ডাক ছাড়ল একবার।

আবার ধীরে এগোনোর আদেশ হলো। শারিকে নিয়ে এগিয়ে চলল কিশোর। নলের গজখানেক সামনে এসে দাঁড়িয়ে গেল। এখনও রাইফেলের নল স্থির হয়ে আছে কিশোরের বুকের দিকে।
পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল কিশোরেরই বয়েসী একটা ছেলে। তবে ওর চেয়ে লম্বা। এলোমেলো সোনালি চুল, রোদে পোড়া তামাটে মুখ। পরনে জিনস, পায়ে মেকসিকান বুট, গায়ে ডেনিম জ্যাকেট। রাইফেল নামাল না। নজর শারির দিকে।

শারি, বলল সে। তুই এখানে এলি কি করে?

কেঁপে উঠল বারোর কান। মুখ ঘুরিয়ে তাকাল ছেলেটার দিকে। তারপর কিশোরের দিকে, তারপর আবার ছেলেটার দিকে। দ্বিধায় পড়ে গেছে।

আদর করে ওর গলা চাপড়ে দিল কিশোর।

আমি নিয়ে এসেছি, শারির হয়ে জবাব দিল সে। কিংবা বলা যায়, আমাকে এনেছে ও। তুমি কি টনি?

জবাব দিল না ছেলেটা। কিশোরের দিকে একই ভাবে রাইফেল তাক করে রেখে সরে এল কিনারে, নিচে তাকাল। তিরিশ গজ নিচে ধীরে ধীরে উঠে আসছে রবিন আর মুসা।

ওরা কারা? ছেলেটার কণ্ঠে সন্দেহ।

অল্প কথায় জানাল কিশোর, ওরা তার বন্ধু, ক্যালিফোর্নিয়া থেকে এসেছে।

তোমাকে সাহায্য করতে এসেছি আমরা। আবার নাম জিজ্ঞেস করল কিশোর, তোমার নাম টনি, তাই না?

হ্যাঁ। রাইফেল নামাল না টনি। কি সাহায্য করতে এসেছ?

তোমাকে সাবধান করে দিতে যে, ডজ মরিস…

ও কোথায়? সহসা শঙ্কা ফুটল টনির চোখে। তোমার বন্ধুদের সঙ্গে আছে?

না। আমাদেরকে নিয়ে একসাথেই বেরিয়েছিল। তারপর তার ঘোড়ার পায়ে অসুখ দেখা দিল। ও তাই বলেছে। কয়েক মাইল পেছনে ফেলে এসেছি ওকে আমরা। কাল নাগাদ হাজির হয়ে যেতে পারে।
থ্যাংকস। আমাকে জানানোর জন্যে অসংখ্য ধন্যবাদ তোমাকে। সেফটি ক্যাচ অন করে রাইফেলটা কাঁধে ঝোলাল টনি। তোমরা এলে কি করে এখানে?

বললাম না শারি নিয়ে এসেছে। যেখান থেকে গিয়েছিল ও সেখানেই ফিরে এসেছে।

এত তাড়াতাড়ি ওকে পোষ মানাল কি করে ডজ?
ও পারেনি। এখনও বুনোই রয়ে গেছে বারোটা। কেবল আমাকেই কাছে ঘেঁষতে দেয়। ওর হয়তো ধারণা, আমিই ওর প্রাণ বাঁচিয়েছি। আমাকে তুমি ভেবেছে।

আমি? কেন?

কারণ, আমাদের দুজনের কণ্ঠস্বরই এক রকম মনে হচ্ছে তুমি এটা খেয়াল করনি। শারির কাছে তাই আমরা দুজনেই এক। আমার গলা প্রথমে শুনে ভেবেছে আমিই তুমি। ওর কাছে এটা সেই কণ্ঠ, যে তাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে গেছে লেকের কাছে, যখন সে অন্ধ ছিল। ওকে ভাল করার জন্যে কৃতজ্ঞতা বোধ থেকেই আমাকে পছন্দ করেছে সে। আমার কথা শোনে। তোমার কথা শুনে অবাক হয়েছে। কারণ, একই রকম কণ্ঠস্বর।

বারোটার দিকে তাকিয়ে হাসল টনি। আয়, শারি। লক্ষ্মী শারি।

এখনও কাঁপছে বারোর কান। ঘোরের মধ্যে যেন কথা শুনল টনির, এগিয়ে গেল। তারপর যখন ওকে আদর করল টনি, আস্তে আস্তে ঘোর ভাঙল যেন। টনির বুকে নাক ঘষল।

রবিন আর মুসা উঠে এল সেখানে।

পরিচয় করিয়ে দিল কিশোর, আমার বন্ধু মুসা আমান। আর ও রবিন মিলফোর্ড।…রবিন, ও টনি… পুরো নাম শোনার জন্যে তাকাল ওর মুখের দিকে।

টনি ইয়ালার। হাত বাড়াল সে, হাই, তোমাদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে খুশি হলাম।

রবিন আর মুসা হাসল। এখন বুঝতে পারছে, কিশোরের উল্টো পাল্টা কথার মানে। আসলে কিশোর বলেনি ওসব কথা, বলেছে টনি। তার কণ্ঠকেই কিশোরের কণ্ঠ বলে ভুল করেছে ওরা।

মনে হয় পিপাসা পেয়েছে তোমাদের, টনি বলল। যে রকম পথে হেঁটে এসেছ, পাওয়ারই কথা। এসো। দিচ্ছি। আমার ঘরটাও দেখবে।

শারির দড়ি ধরে নিয়ে চলল টনি। একটা শৈলশিরার পাশের ঘোরানো পথ ধরে ওপরে উঠে পর্বতের গায়ে দেখতে পেল প্রায় লুকানো একটা ফোকর। সুড়ঙ্গ মুখ।

মাথা নুইয়ে রাখ, সরু, নিচু সুড়ঙ্গে ঢোকার আগে সাবধান করে দিল টনি। কিছুদূর এগোনোর পর বলল, ঠিক আছে, এবার সোজা হও।
ভেতরে আবছা আলো। সেই আলোয় তিন গোয়েন্দা দেখল, বিশাল এক গুহায় এসে দাঁড়িয়েছে ওরা। ছাত অনেক উঁচুতে।

দেশলাই দিয়ে মোম ধরল টনি। কিশোর আন্দাজ করল, বেশ কিছুদিন ধরে এখানে বাস করছে সে। মেঝেতে গোটানো রয়েছে একটা স্লীপিং ব্যাগ। বাসন, হাঁড়ি-পাতিল, একটা কেরোসিনের চুলা, আধবোঝাই কয়েকটা বস্তা, গাঁইতি, শাবল রাখা হয়েছে দেয়াল ঘেঁষে। ছাত দেখেই অনুমান করা যায় এখানে কখনও বারুদ বিস্ফোরিত হয়নি। পঞ্চো ভিলার গুহা নয় এটা।

একটা বস্তা তুলে নিয়ে মেঝেতে জই ঢালল টনি। আব্বা এনেছিল, ঘোড়ার জন্যে। ভালই হয়েছে, কিছুটা রয়ে গেছে। এখানে ঘাসপাতার যা আকাল। এই জই না থাকলে না খেয়ে থাকতে হত শারিকে।
একমাত্র স্লীপিং ব্যাগটার দিকে তাকিয়ে রয়েছে রবিন। তোমার আব্বা কোথায়?

কেন? তার কি দরকার? আবার সন্দেহ জাগল টনির চোখে।

কারণ তাকেও ডজের ব্যাপারে সাবধান করে দিতে চাই।
মাটির জগ তুলে নিয়ে একটা মাটির ছোট গামলায় শারির জন্যে পানি ঢালল টনি।

আব্বা নেই। ঘোড়া নিয়ে গেছে, খাবারদাবার আনার জন্যে। জগটা বাড়িয়ে দিল তিন গোয়েন্দার দিকে। নাও, পানি।
কোনদিকে গেছেন তিনি? জানতে চাইল কিশোর। লেকের দিকে? তাহলে ডজের সামনে পড়ে যেতে পারেন।

না, ওদিকে যায়নি। পর্বতের অন্যপাশে একটা গ্রাম আছে। গোটা দুই দোকান আছে ওখানে। সব জিনিস পাওয়া যায় না। তবে বাস থামে। আর বাস দিয়ে…

থেমে গেল টনি। সন্দেহ যাচ্ছে না। দ্বিধা করছে। মনস্থির করার চেষ্টা করছে, ওদেরকে বিশ্বাস করবে কিনা।

এখানে কেন এসেছ, বলো তো? জিজ্ঞেস করল সে।

ডজের ধারণা…

বলতে গিয়ে চুপ হয়ে গেল কিশোরও। সব কথা টনিকে বলার সময় এসেছে। জোরে একবার দম নিল সে। তারপর শুরু করল। ক্রসওয়ার্ড পাজল প্রতিযোগিতা থেকে। একে একে বলল, কি করে ওরা জানতে পেরেছে পঞ্চো ভিলার পেসোর কথা।

নীরবে শুনছে টনি। মেঝেতে তিন গোয়েন্দার পাশাপাশি বসেছে। পেসোর কথা শুনে হঠাৎ উঠে দাঁড়াল সে। ওগুলোর কথা জজ বলেছে? আর কি বলেছে? পেলে লুটের মাল ভাগাভাগি করে নেবে?

না, মুসা সন্দেহমুক্ত করার চেষ্টা করল তাকে। ভুলেও একবার পেসোর কথা উচ্চারণ করেনি ডজ। ও আমাদেরকে বলেছে, পর্বতে যেতে হবে বারোটাকে ছেড়ে দিয়ে আসার জন্যে। ওটার জন্মভূমিতে। শারির খুর নাকি বড় হয়ে যাচ্ছে, পর্বতের পাথুরে অঞ্চলে ঘষা না খেলে সমান হবে না।

কী!

মুসা আরও বলল, ইসাবেল আমাদেরকে বলেছে রূপার পেসোর কথা।

ইসাবেল? চিনতে না পেরে ভ্রূকুটি করল টনি। এই ইসাবেলটা আবার কে?

চেহারার বর্ণনা দিল রবিন। কালো বেনির কথা বলল। কালো চোখ আর লাল শলের কথা বলল।

মেকসিকান? এখনও ভুরু কুঁচকেই রেখেছে টনি।

মনে তো হলো, জবাব দিল কিশোর। স্প্যানিশ ছাড়া আর কোন ভাষা বোঝে না। ওর চামড়ার রঙও মেকসিকানদের মত বাদামী। নিজেও অবাক হয়ে ভাবতে আরম্ভ করেছে এখন, আসলেই মহিলা মেকসিকান কিনা! ডজের ব্যাপারে তোমাকে সাবধান করে দিতে বলেছে আমাদেরকে। তোমার নাকি বন্ধু। তুমি তাকে চেন?

মাথা নাড়ল টনি। নামই শুনিনি কখনও। আর চেহারার যা বর্ণনা শুনলাম, তাতে বুঝতে পারছি, ওর সঙ্গে জীবনে কখনও দেখা হয়নি আমার।

এই পর্বতে গুহার অভাব নেই, টনি বলল। পঞ্চো ভিলা আর তার সাগরেদরা নিশ্চয় একেক সময় একেক গুহায় ঢুকত, লুকিয়ে থাকার জন্যে। তবে আব্বার ধারণা, সে যেটাতে পেসো লুকিয়েছিল সেটা পেয়ে গেছি আমরা।

সন্ধ্যায় যার যার স্লীপিং ব্যাগ বের করে তার ওপর আরাম করে বসেছে তিন গোয়েন্দা। কেরোসিনের চুলায় এক হাঁড়ি খাবার রান্না করেছে টনি, একঘেয়ে সেই বীন আর চাল সেদ্ধ। তিনটে মোম জ্বলছে এখন। সুড়ঙ্গমুখে একটা কম্বল ঝুলিয়ে দিয়ে এসেছে সে, যাতে বাইরে আলো বেরোতে না পারে। এককোণে জই চিবাচ্ছে শারি।

যার যার প্লেটে খাবার দেয়া হলো।

কি করে জানলে তোমরা, আসল গুহাঁটাই খুঁজে পেয়েছ? মুসা জিজ্ঞেস করল। এত গুহার মধ্যে, আলাদা করে চিনলে কি করে?

কিছু কিছু চিহ্ন দেখে। পাথর পড়ে বন্ধ হয়ে ছিল গুহামুখ। ওগুলো কিছু কিছু সরিয়ে যখন ঢুকলাম, পেয়ে গেলাম ইগনাসিওকে।

ইগনাসিও?

ভিলার এক সিপাহী। উনিশশো ষোলো সাল থেকে গুহায় থেকে থেকে তার চেহারা অবশ্যই আর চেনার জো ছিল না। আসলে, চেহারাই আর অবশিষ্ট নেই। শুধুই কঙ্কাল। ইউনিফর্মের কয়েকটা টুকরো তখনও লেগে ছিল। আর তার খুলিটা…

দয়া করে এখন একটু চুপ করবে, বাধা দিয়ে বলল মুসা। আমি এখন এই রাজকীয় খানা গেলার চেষ্টা করছি।

হাসল রবিন। মরা মানুষের কথা শুনলে ভয় পায় আমাদের মুসা। বিশেষ করে অপঘাতে মৃত্যুর কথা শুনলে। মুসার দিকে তাকিয়ে ভুরু নাচিয়ে হাসল, খাওয়ার রুচিও মষ্ট হয়ে যায়, তাই না? আবার টনির দিকে তাকাল সে। ভূতের বড় ভয়।

ও, টনিও হাসল। ভাবনা নেই, ভূত হতে পারবে না। খ্রিস্টানদের মত করেই কবর দিয়েছি তাকে। আব্বা তার কবরের ওপর একটা ক্রুশ লাগিয়ে দিয়েছে। লিখে দিয়েছে মেসিকোর মহান মিলিটারি হিরো ইগনাসিওর স্মৃতির উদ্দেশ্যে। ইগনাসিও অ্যালেন্ড ছিল অনেকটা আমেরিকানদের জর্জ ওয়াশিংটনের মত, আর…

গুহার মধ্যে তুমি ঢুকেছিলে? প্রসঙ্গটা ভাল লাগছে না মুসার, অন্য বিষয়ে চলে যাওয়ার জন্যে বলল।

মাথা নাড়ল টনি। গাঁইতি আর শাবল দিয়ে কিছু পাথর সরিয়েছি। ওই পর্যন্তই। এর বেশি আর কিছু করতে পারিনি। পেসোগুলো দেখিনি। সে জন্যেই বিস্ফোরক কিনতে গেছে আব্বা।

কখন ফিরবেন? জিজ্ঞেস করল কিশোর।

তিন-চার দিনের আগে না। গাঁয়ে যেতে বেশিক্ষণ লাগে না, মাত্র কয়েক ঘণ্টা। ওখানে ঘোড়া রেখে যাবে আব্বা। দুটো ঘোড়া নিয়ে গেছে। দরকার আছে। আসার সময় ভারি বোঝা বয়ে আনতে হবে। যাই হোক, আব্বা চলে যাবে চিহয়া হুয়ায়। ওটাই সব চেয়ে কাছের শহর, যেখানে ডিনামাইট আর দরকারী অন্যান্য জিনিস কিনতে পাওয়া যায়।

তার মানে, রবিন বলল। ডজকে আমাদেরই সামলাতে হবে। হয়তো ইসাবেলাকেও। তবে, আমরা চারজন। দুজন মানুষকে কাবু না করতে পারার কিছু নেই।

নতুন বন্ধুদের দিকে তাকাল টনি। ভাল লাগছে আমার। একা আর সামলাতে হবে না ওদেরকে। আরও তিনজনের সাহায্য পাব। ডজের ব্যাপারে যে আমাকে সাবধান করে দিলে তার জন্যে আরেকবার ধন্যবাদ দিচ্ছি তোমাদেরকে। তোমরা আমাকে চিনতেও না।

ইয়ে… কিশোরের মনে পড়ল, ওদের পরিচয়ই এখনও দেয়া হয়নি টনির কাছে। শুধু নাম বলেছে। বলল, তোমার জন্যেই যে কেবল একাজ করছি, তা নয়। আমাদেরও আগ্রহ আছে। এটা আমাদের জন্যে আরেকটা কেস।
মানে? টনি বুঝতে পারছে না। ডিটেকটিভের মত কথা বলছ তুমি।

ডিটেকটিভই আমরা। শখের গোয়েন্দা। পকেট থেকে একটা কার্ড বের করে দিল কিশোর।

অনেকক্ষণ কার্ডটার দিকে তাকিয়ে রইল টনি। ভুরু কোঁচকাল। তারপর বিড়বিড় করল, এটা কি ভাষা?

দেখি? আরে, বাংলাটা দিয়ে ফেলেছি। এটা আমার মাতৃভাষা।

তার মানে তুমি আমেরিকান নও? অবাক হলো টনি।

বাংলাদেশী। তবে আমেরিকার নাগরিকত্বও আছে আমার। ইংরেজিতে লেখা আরেকটা কার্ড বের করে দিল কিশোর।

সেটাও ঠিক মত পড়তে পারল না টনি। ইনভেসটিগেটরের উচ্চারণ করল নিভেসটিগেটর। শেষে কিশোরের হাতে দিতে দিতে বলল, তুমিই পড়ে শোনাও।

কার্ডের দিকে তাকানোর প্রয়োজন বোধ করল না কিশোর। জোরে জোরে বলল, কি লেখা আছে।
ও, আরেক দিকে চোখ ফিরিয়ে নিল টনি। বলল, আমি পড়তে পারি না, তা নয়। আসলে, ডিজলেকজিয়া আছে আমার। ওটা কি জাননা?
জানি, ঘাড় কাত করল রবিন। টনির জন্যে কষ্ট হল তার। এর মানে হল, অক্ষর উল্টোপাল্টা দেখ তুমি। ইটালিতে এই রোগ নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। রঙিন লেন্স দিয়ে এখনও চেষ্টা চলছে, সারানোর উপায় খুঁজছেন বিজ্ঞানীরা।

হ্যাঁ। বাড়ি ফিরলে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে বলেছে আম্মা। সেটা তো বাড়ি যাবার পর। এখানে তো আমি এখন পড়তে পারি না। খুবই কষ্ট হয়। চিঠিও পড়তে পারি না। তাই যোগাযোগ রাখার জন্যে অন্য ব্যবস্থা করেছি। টেপে কথা রেকর্ড করে আদান-প্রদান করি। আম্মা আমাকে টেপ পাঠায়, আমিও আম্মাকে টেপ পাঠাই।

কিছু বলল না কিশোর। মাথার ভেতরের মগজ নামের কম্পিউটারটা তার চালু হয়ে গেছে বেদম গতিতে।

আরেকটা ধাঁধার সমাধান হলো, বসে গেল খাপে খাপে। ইয়ার্ডের ডাকবাক্সে পাওয়া টেপটায় রেকর্ড করা ছিলঃ মেকসিকোতে এসো না, প্লীজ! মারাত্মক বিপদে পড়বে…

নিশ্চয় ওটা টনিরই কণ্ঠ ছিল। ওর মা কে কোন কারণে সতর্ক করে দিয়ে পাঠানো একটা দীর্ঘ চিঠিরই কিছু অংশ আবার রেকর্ড করা হয়েছিল। কিংবা বিশেষ বিশেষ জায়গাগুলো রেখে বাকি সব মুছে ফেলা হয়েছিল। তারপর রেখে আসা হয়েছিল ইয়ার্ডের ডাকবাক্সে। কিশোরকে ভয় দেখানোর জন্যে, হুমকি দেয়ার জন্যে এবং এটা করতে গিয়ে একটা চমৎকার সূত্র রেখে এসেছিল।

টনির দিকে তাকিয়ে হেসে জিজ্ঞেস করল কিশোর, তোমার আম্মা কি এখন লস অ্যাঞ্জেলেসে থাকেন?

হ্যাঁ। মনে হয়। আসলে, কখন যে কোথায়… চুপ হয়ে গেল টনি। আবার অন্য দিকে তাকাল। বলতে চায় না।

চাপাচাপি করল না কিশোর। তবে আরেকটা কথা জানা দরকার। তুমি কি তোমার আম্মার মত দেখতে? তোমার মতই সোনালি চুল?

হ্যাঁ। আমার মত চোখও নীল। কেন?

না, ভাবছি। হাই তুলল কিশোর। শুয়ে পড়ল লম্বা হয়ে। ঘুমালে কেমন হয়?

সবাই রাজি। কয়েক মিনিট পর ফুঁ দিয়ে মোমবাতি নিভিয়ে দিল ওরা। সুড়ঙ্গ মুখের কাছে ঝোলানো কম্বলটা গিয়ে খুলে নিয়ে এল টনি। স্লীপিং ব্যাগে ঢুকল চারজনেই। তারপর ঘুম।

পরদিন খুব সকালে ঘুম ভাঙল কিশোরের। দেখল, বাইরে থেকে সুড়ঙ্গমুখ দিয়ে যেন চুইয়ে চুঁইয়ে ঢুকছে আবছা আলো। প্রথমেই তাকাল, শারি কি করছে দেখার জন্যে। আরে! নেই তো!

তাড়াহুড়ো করে ব্যাগ থেকে বেরিয়ে এল সে। শারিকে খুঁজতে লাগল। গুহায় ঢোকার পথের ওপরই দেখতে পেল ওটাকে, বিশ গজ দূরে। তাকিয়ে রয়েছে কিশোর। মাথা তুলে মোলায়েম ডাক ডাকল বারোটা। হুঁশিয়ারি নয়, বন্ধুত্বপূর্ণ। মুহূর্ত পরেই আরেকটা বারোর ডাক কানে এল, শারির ডাকের সাড়া দিল ওটা বাইরে থেকে। সুড়ঙ্গমুখের নিচে কোনখানে রয়েছে।

ইসাবেলের বারো, ভাবল কিশোর। দ্রুত সরে এল পেছনে। লুকিয়ে পড়ল পাথরের আড়ালে। মুহূর্ত পরেই তার পাশে চলে এল টনি, মুসা আর রবিন। ওরাও ডাক শুনেছে।

মোলায়েম ডাক বিনিময় চলতেই থাকল শারি আর অন্য বারোটার মধ্যে। তারপর একসময় দেখা গেল দ্বিতীয় বারোটাকে। পর্বতের ঢালের একটা নালা ধরে উঠে আসছে।

দুলকি চালে এগিয়ে গেল শারি। অন্য বারোটা কাছাকাছি এলে ওটার গায়ে গা ঘষতে শুরু করল।

ইসাবেলের ব্যরোর লাগাম এখনও পরানো রয়েছে, কিন্তু পিঠের বোঝাগুলো নেই। সূর্য উঠেছে। রোদ বাড়ছে, বাড়ছে আলো। আশপাশটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে এখন। উঁকি দিয়ে দেখতে লাগল চারজনে।

ইসাবেলকে দেখা গেল না।

চলো, দুটোকেই গুহায় নিয়ে যাই, প্রস্তাব দিল মুসা। শারিকে দেখলেই বুঝে ফেলবে ইসাবেল, আমরা এখানে আছি।

কিশোর আর টনি মিলে দুটো বারোকে বলে বলে নিয়ে গেল গুহার ভেতরে। ওদের অনুসরণ করল অন্য দুজন।

ইসাবেলকে তোমরা পছন্দ করো না, তাই না? টনির প্রশ্ন।

ওই মহিলা আরেকটা ধাঁধা, কিশোর বলল। সে আমাদেরকে বলেছে ডজের ব্যাপারে তোমাদেরকে সাবধান করে দিতে। বলেছে, সে তোমাদের পরিচিত। বন্ধু। অথচ তুমি বলছ, কখনও দেখইনি। এর মানেটা কি? মনে হচ্ছে রবিনের কথাই ঠিক। ধাপ্পাবাজ মহিলা।

দুটো বারোই ক্ষুধার্ত। গুহার ভেতরে নিরাপদ জায়গায় এনেই ওগুলোকে খাবার দিল টনি, পানি ঢেলে দিল গামলায়। মুসা বসল রান্না করতে। তাদের সেই একই খাবার, বীন আর চাল সেদ্ধ।

একসাথে খেতে বসল না ওরা। বাসন নিয়ে সুড়ঙ্গমুখের কাছে চলে গেল কিশোর, পাহারা দেয়ার জন্যে। উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল সে, যাতে নিচ থেকে তাকে চোখে না পড়ে। আত্মগোপন করে রইল পাথরের আড়ালে। উঁকি দিয়ে মুখ বাড়িয়ে তাকিয়ে দেখল নিচের অঞ্চল। আঁতিপাতি করে খুঁজেও ইসাবেলকে চোখে পড়ল না।

কম্পনটা প্রথমে টের পেল বুকের কাছে। হৃৎপিন্ডের ঝাঁকি নয়, বাইরে থেকে আসছে। যেন পাহাড়ের অনেক গভীর থেকে আসছে। এতটাই জোরাল হলো, হাত থেকে চামচ পড়ে গেল। ভূমিকম্প নয়। লস অ্যাঞ্জেলেসে আজীবন বাস করে আসছে, ভূমিকম্প হলে কি হয় ভাল করেই জানে। এখনকারটা হঠাৎ কোন ঝাঁকুনি নয়। বরং মহাসড়কের ধারে দাঁড়ালে আর পাশ দিয়ে ভারি কোন লরি চলে গেলে যেমন কাঁপতে থাকে মাটি অনেকটা তেমন।

ঘণ্টাখানেক পরে তার জায়গায় পাহারা দিতে এল রবিন। সেই রকম কথা হয়েছে। এক এক করে সবাই দেবে, এক ঘণ্টা পর পর।

কাঁপুনি টের পেয়েছে কিনা জিজ্ঞেস করল কিশোর।

পেয়েছি, রবিন জানাল। ভূমিকম্পের মত কিন্তু মনে হলো না। অন্য রকম। এই পর্বতমালাকে বিশ্বাস নেই, বইয়ে পড়েছি। এখন তার প্রমাণ পাচ্ছি। কখন যে কি ঘটে যাবে বলা মুশকিল। আচ্ছা, কাল যে বনে আগুন লাগতে দেখলাম… না, আগুন তো না, ধোঁয়া, এর কি ব্যাখ্যা, বলো তো?

ফিরে তাকাল সে। পেছনে কিছুই দেখতে পেল না। দেয়ালের মত দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়ের উঁচু চূড়া। গুহামুখের ওপর থেকে উঠে গেছে অনেকখানি।

কুইন সাবে? রবিনের প্রশ্নের জবাব দিল কিশোর। অর্থাৎ, জানে না।

পাহারায় বসল রবিন। নিচের দিকে তাকিয়ে ইসাবেলকে খুঁজতে লাগল তার চোখ।

কিশোর যখন এসেছিল, তার দুই ঘণ্টা পরে এসে রবিনকে মুক্তি দিল মুসা। নিচে তাকিয়ে মনে হলো তার, একটা নড়াচড়া দেখতে পেয়েছে। স্পষ্ট বুঝতে পারল না। পাখির ডাক ডেকে গুহার ভেতরে বন্ধুদেরকে জানিয়ে দিল তার সন্দেহের কথা।

কোথায়? সুড়ঙ্গমুখের কাছে আবার উপুড় হয়ে শুয়ে জিজ্ঞেস করল কিশোর।

এই যে, ওখানটায়। বাঁয়ে হাত তুলে দেখাল মুসা।

চারজনেই দেখতে পেল, অনেক নিচে মূর্তিটাকে।

একজন লোক। মাথায় স্টেটসন হ্যাট। হাতে রাইফেল নিয়ে ধীরে ধীরে উঠে আসছে এদিকেই।

ডজ মরিস।

Categories: