পুরো ফিচারটা আরেকবার খুঁটিয়ে পড়ল কিশোর। এতই মগ্ন রইল পড়ায়, সময় কোনদিক দিয়ে বেরিয়ে গেল টেরই পেল না।
দুপুরের খাবার দেবে কিনা জিজ্ঞেস করতে এল মিসেস ওয়েলটন। মুসা আর রবিনকে না দেখে ওরা কোথায় গেছে জানতে চাইল।
চোখ মিটমিট করে তাকাল কিশোর। তাই তো! লাঞ্চের সময় তো ওদের ফিরে আসার কথা! মোহরের খোঁজ করতে করতে খিদেই ভুলে গেল!
বাইরে গেছে, মিসেস ওয়েলটনকে বলল কিশোর। এসে যাবে। যে-কোন মুহূর্তে। আমার খাবার দিন। ডাক্তারের কাছে যাবার সময় হয়ে গেছে।
নাক দিয়ে অনবরত পানি গড়াচ্ছে। রুচি নেই। এক গ্লাস দুধ দিয়ে কোনমতে একটা স্যান্ডউইচ গিলে নিলো কিশোর। তারপর বেরিয়ে পড়ল।
বোর্ডিং হাইসের কয়েকটা বাড়ি পরেই ডাক্তার রজারের চেম্বার, মিসেস ওয়েলটনকে জিজ্ঞেস করে জেনে নিয়েছে কিশোর।
রাস্তায় লোকজন কম। কলোনি টাইপের কয়েকটা বাড়ি পেরিয়ে এলো কিশোর। রঙ চটে গেছে, প্লাস্টার উঠে গেছে জায়গায় জায়গায়। কয়েকটা খালি দোকান পেরোল। দরজায় ঝুলছে ভাড়া দেওয়া হইবে নোটিশ। পরিষ্কার বোঝা যায়, ফিশিংপোর্টের সময় খুব খারাপ যাচ্ছে।
আশেপাশের বাড়িগুলোর তুলনায় ডাক্তার রোজারের বাড়িটা নতুন। লাল ইটের তৈরি, ছোটখাট, ছিমছাম। ওয়েটিং রুমে ঢুকল কিশোর। দুটো বাচ্চা নিয়ে বসে আছে এক মহিলা। খানিক দূরে বসেছে দুজন বৃদ্ধ, শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সামনের দেয়ালের দিকে।
কিশোরের দিকে তাকাল ডেস্কের ওপারে বসা নার্স। ডাক্তারের চেম্বারের দরজা দেখিয়ে দিল। সোজা ঢুকে যেতে বলল।
মাঝারি আকারের একটা কামরা। এক পাশে একটা ছোট ডেস্ক। কাছেই একটা বিছানা, ওতে শুইয়ে পরীক্ষা করা হয় রোগীকে। দুপাশের দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটা আলমারি। সাদা রঙ করা। ওষুধের শিশি বোতলে ঠাসা।
ডেস্কের ওপাশে বসে আছেন ডাক্তার রোজার। ধূসর হয়ে এসেছে চুল। একটা স্যান্ডউইচ খাচ্ছেন।
অপেক্ষা করছি। এসো, বসে।
স্যান্ডউইচটা খেয়ে নিলেন ডাক্তার। এক ঢোক কফি খেয়ে উঠে দাঁড়ালেন। বিছানায় গিয়ে শুতে ইঙ্গিত করলেন কিশোরকে।
দ্রুত অভ্যস্ত হাতে কিশোরের নাক গলা কান পরীক্ষা করলেন ডাক্তার। গলায় স্টেথো লাগিয়ে হাটবিট শুনলেন। টোকা দিয়ে পরীক্ষা করলেন বুক। তারপর ব্লাডপ্ৰেশার দেখলেন।
হুমম, মাথা ঝোঁকালেন ডাক্তার। ঠাণ্ডা লাগিয়েছ ভাল মতই। এখানকার আবহাওয়া সহ্য হয়নি…
আলমারি খুলে একটা শিশি বের করলেন ডাক্তার। একটা ছোট খামে কয়েকটা বড়ি ঢেলে নিলেন। খামটা কিশোরের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ভাবনা নেই। চার ঘণ্টা পর পর দুটো করে বড়ি খেয়ো। দুদিনেই সেরে যাবে। তবে হ্যাঁ, নড়াচড়া বেশি করে না, বিশ্রাম নেবে। সাগরের ধারে কাছে যাবে না।
ঠিক আছে, বলল কিশোর। এক মুহূর্ত দ্বিধা করল। আচ্ছা, স্যার, আমাকে কয়েক মিনিট সময় দিতে পারবেন? কিছু কথা…
লাঞ্চ টাইম, কিশোরের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন ডাক্তার। খেতে খেতে কথা বলতে পারব। ওইটুকু সময় পাবে। ঘুরে ডেস্কের ওপাশে চেয়ারে বসে পড়লেন আবার তিনি। হ্যাঁ, শুরু কর। কি জানতে চাও?
আমি মানে…কিছু তথ্য দরকার, বলল কিশোর। শুনলাম আপনি স্কেলিটন আইল্যান্ডের মালিক…
স্কেলিটন আইল্যান্ড! হাত তুললেন ডাক্তার। ওই হতচ্ছাড়া দ্বীপের কথা রাখা শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা হয়ে গেছে। মরার আর জায়গা পেল না হতভাগিটা! মরে নাকি ভূত হয়েছে।
তাহলে ভূত মানেন না আপনি? জেলেদের কথা বিশ্বাস করেন না? জিজ্ঞেস করল কিশোর।
আরে দূত্তোর! ভূত আছে নাকি! সব ব্যাটা জেলেদের কুসংস্কার। স্যালি মারা যাবার পর কোন পাঁজি লোক ভূত সেজে গিয়ে নাগরদোলায় চড়েছিল হয়ত। মেয়েটার একটা রুমাল জোগাড় করে নিয়ে ফেলে। এসেছিল পার্কে। সব সাজানো ব্যাপার। জানি কার কাজ। কিন্তু প্ৰমাণ করতে পারব না। দ্বীপে যাতে লোকজন না যায়, সেজন্যেই এই শয়তানী।
মাথা ঝোঁকাল কিশোর। ডাক্তারের কথায় যুক্তি আছে।
দুর্ঘটনায় মারা গেল একটা মেয়ে, আবার বললেন ডাক্তার। কয়েক রাত পরে দেখা গেল তার ভূত। ব্যস, আর কি যেতে চায় কেউ ওখানে। ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল প্লেজার পার্ক। জাঁকিয়ে উঠল মেলভিলের আরেকটা পার্ক। প্লেজার পার্কের সব কাস্টেীমার চলে গেল ওখানে। ব্যাটারা মনে করেছে, আমি কিছু বুঝি না।
কাপে কফি ঢাললেন ডাক্তার। আরেকটা স্যান্ডউইচ তুলে নিলেন। সামনের প্লেট থেকে। নাও, তুমি খাও।
মাথা নাড়ল কিশোর। না, আপনি খান। আমি খেয়ে এসেছি।
পার্কটা চালাত আমার বাবা, স্যান্ডউইচ চিবাতে চিবাতে বলল ডাক্তার। আমি তখন ছাত্র। বাবার মৃত্যুর পর দ্বীপের মালিক হলাম আমি। কিন্তু ওই পর্যন্তই। একটা কানাকড়িও এল না। ওখান থেকে। …অনেক বছর পর সিনেমা কোম্পানি এসে ভাড়া নিল দ্বীপটা। কিছু পয়সা পাব। এবার। হঠাৎ সামনে বুকে এলেন তিনি। আচ্ছা, সত্যি শুটিঙের জন্যেই এসেছে তো দলটা? গুজব শুনছি, ওয়ান-ইয়ারের ম্যাপ নিয়ে নাকি…
ভুল শুনেছেন, বাধা দিয়ে বলল কিশোর। ছবির শুটিং করতেই এসেছে দলটা।
হুমম! সত্যি হলেই ভাল। দ্বীপটা আমার। ওতে গুপ্তধন থাকলে ওগুলো আমারই হওয়া উচিত, তাই জিজ্ঞেস করলাম।
আমার মনে হয়, নেই। কোন জায়গা তো আর খোঁজা বাদ রাখেনি। লোকে। থাকলে, পেয়ে যেতই।
তা-ও ঠিক, আবার স্যান্ডউইচে কামড় দিলেন ডাক্তার।
আচ্ছা, ডক্টর, বলল কিশোর, সিনেমা কোম্পানির জিনিসপত্র চুরি যাচ্ছে, নিশ্চয় শুনেছেন। কারা, কেন চুরি করছে, কিছু অনুমান করতে পারেন?
অবশিষ্ট স্যান্ডউইচটুকু মুখে পুরলেন ডাক্তার। চিবিয়ে গিলে ফেললেন। কফির কাপ টেনে নিতে নিতে বললেন, অনুমান তো কত কিছুই করা যায়। এই যেমন, কেউ একজন চায় না, দ্বীপে শুটিং করুক। সিনেমা কোম্পানি। মেলভিলের সেই পার্কের মালিকও হতে পারে। দ্বীপটািতে লোক যাতায়াত শুরু করলে হয়ত আবার চালু হতে পারে। প্লেজার পার্ক। সেজন্যেই তাড়াতে চাইছে সিনেমা কোম্পানিকে। অন্য কারণেও হতে পারে চুরি। এখানকার লোক বড় গরীব। ঝিনুকে রোগ দেখা দেবার পর থেকে অনেকেরই রুটি জোটে না। ওদের কেউ পেটের দায়ে চুরি করছে হয়ত জিনিসপত্র।
কিন্তু ঠিক যেন মিলছে না চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল কিশোর।
রহস্যের সমাধান করতে চাইছ না? হাসলেন ডাক্তার। গোয়েন্দাগিরি?
পকেট থেকে একটা কার্ড বের করল কিশোর। ডাক্তারের দিকে বাড়িয়ে ধরল।
কার্ডটা নিয়ে পড়লেন ডাক্তার। হাসলেন আবার। ফিরিয়ে দিতে দিতে বললেন, তাহলে সত্যিই তোমরা গোয়েন্দা? বেশ বেশ। আত্মবিশ্বাস থাকা ভাল। তোমাদেরকেই তাহলে দ্য হ্যান্ডে ফেলে রেখে এসেছিল হান্ট গিল্ডার। কেন, বল তো?
হয়ত ভয় দেখাতে, বলর কিশোর। কেউ একজন হয়ত চায়, আমরা আবার হলিউডে ফিরে যাই। এখানে থাকলে, খোঁজখবর করলে, তার অসুবিধে হবে।
হুমম ভুরু কুঁচকে কিশোরের দিকে চেয়ে আছেন ডাক্তার। তোমার কথায় যুক্তি আছে। ফেলে দেয়া যায় না।
আচ্ছা, স্যার, আরেকটা কথা, ডাক্তারের দিকে তাকাল কিশোর। ঠিক কবে থেকে আবার দেখা দিতে শুরু করেছে নাগরদোলার ভূত? বলতে পারবেন?
কবে থেকে? নিজের চিবুকে আলতো টোকা দিলেন ডাক্তার। দুই. হ্যাঁ, দুবছরই হবে। হঠাৎ দেখা দিতে শুরু করল ভূতটা। বেশ ঘন ঘন। কেন, একথা জানতে চাইছ কেন?
শিওর না হয়ে বলা উচিত না, স্যার। আচ্ছা, উঠি। আপনার অনেক সময় নষ্ট করে দিলাম।
না না, ও কিছু না, উঠে দাঁড়ালেন ডাক্তার। ভূত রহস্যের সমাধান করতে পারলে জানিও আমাকে। আর হ্যাঁ, আবার মনে করিয়ে দিচ্ছি, দ্বীপে গুপ্তধন থাকলে, তার মালিক কিন্তু আমি।
ডাক্তারকে ধন্যবাদ জানিয়ে বেরিয়ে এল কিশোর। চিন্তিত। বেশ কয়েকটা রহস্য একসঙ্গে এসে জড় হয়েছে। কিছুতেই জট ছাড়ানো যাচ্ছে না। এ-নিয়ে আরও অনেক বেশি ভাবতে হবে।
পথে এসে নামল কিশোর। পাশ কাটিয়ে চলে গেল একটা গাড়ি। ঘ্যাঁচ করে ব্ৰেক কষার আওয়াজ হল। পিছিয়ে এলো গাড়িটা। কিশোরের পাশে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল।
এই যে, খোকা, জানোলা দিয়ে মুখ বের করে ডাকলেন পুলিশ চীফ হোভারসন, কোথায় গিয়েছিলে?
ডাক্তারের কাছে, বলল কিশোর।
কেন?
সর্দি।
ও। হ্যাঁ, শুনেছি, হান্টকে ধরতে পারিনি। ব্যাটা পালিয়েছে।
পালিয়েছে? একটা মালবাহী জাহাজে কাজ নিয়েছে। আজ সকালে ছেড়ে গেছে জাহাজটা। কয়েক মাসের মধ্যে ফিরবে না। ওর এক বন্ধুকে ধরেছিলাম। ওই ব্যাটা বলল, গোয়েন্দা জেনে তোমাদেরকে নিয়ে একটু মজা করছে হান্ট। আমার কিন্তু বিশ্বাস হচ্ছে না।
আমারও না, বলল কিশোর।
কিন্তু কি আর করা? ব্যাটাকে তো ধরতে পারলাম না, বললেন হোভারসন। ঠিক আছে, চলি। তোমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখব। নতুন কিছু জানতে পারলে জনাব।
গাড়ি চালিয়ে চলে গেলেন হোভারসন। আবার বোডিং হাউসের দিকে হাঁটতে লাগল কিশোর। চিমটি কাটছে নিচের ঠোঁটে।
লোকটার ওপর প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়ল কিশোর। পাশের এক গলি থেকে আচমকা বেরিয়ে এসে পথ রোধ করেছে তার। হালকা-পাতলা। কুৎসিত হাসিতে বিকৃত হয়ে আছে মুখ।
এই ছেলে, দাঁড়াও, আঙুল তুলল লোকটা। তোমাকে কিছু উপদেশ দেব।
নিশ্চয়, নিশ্চয়, বলুন কি বলবেন? চেহারা বোকা বোকা করে রেখেছে কিশোর। ইচ্ছে করলেই চেহারাটাকে এমন হাবাগোবা করে তুলতে পারে সে। এতে কাজ দেয় অনেক সময়, দেখেছে।
আমার উপদেশ, হাড়গোড় আস্ত রাখতে চাইলে হলিউডে ফিরে যাও। সঙ্গে নিয়ে যাও সিনেমা কোম্পানিকে। ফিশিংপোটে তোমাদেরকে কেউ চায় না।
দুদিকের কান পর্যন্ত বিস্তৃত হল লোকটার কুৎসিত হাসি। তার হাতের দিকে চোখ পড়ল। কিশোরের। বাঁ হাতের উল্টো পিঠে উল্কিতে আঁকা ছবি। স্পষ্ট নয়। তবে বুঝতে অসুবিধে হয় না, ছবিটা জলকুমারীর। ভয়ের ঠাণ্ডা একটা শিহরণ উঠে গেল কিশোরের মেরুদন্ড বেয়ে।
ঠিক আছে, স্যার, ভোঁতা গলায় বলল কিশোর। বলব ওদেরকে। কিন্তু কে যেতে বলছে, কার নাম বলব?
বেশি চালাকির চেষ্টা কোরো না, ছেলে’ কর্কশ গলায় বলল লোকটা। ভাল চাইলে আজই ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে যাও।
হঠাৎ ঘুরে দাঁড়াল লোকটা। গট গট করে হেঁটে আবার ঢুকে পড়ল গলিতে।
লোকটা চলে যাবার পরও কয়েক মুহূর্ত তার গমন পথের দিকে চেয়ে রইল কিশোর। চেপে রাখা শ্বাসটা ফেলল শব্দ করে। তারপর আবার হাটতে শুরু করল বোডিং হাউসের দিকে।
একটা ব্যাপারে এখন নিশ্চিত কিশোর। দ্বীপে সিনেমা কোম্পানির থাকাটা বরদাস্ত করতে পারছে না কেউ একজন।
আমার নৌকা, বিড়বিড় করে বলল পাপালো। জোর করে ঠেকিয়ে রেখেছে চোখের পানি। নৌকা নেই। গুপ্তধন খোঁজার আশা শেষ।
তই তো! পাপালোর কত বড় ক্ষতি হয়ে গেছে, এতক্ষণে বুঝতে পারল যেন রবিন। কিন্তু একাজ করল কেন লোকটা? দুর্ঘটনা, নাকি ইচ্ছে করেই?
ইচ্ছে করে! রাগ প্ৰকাশ পেল পাপালোর গলায়। নইলে থামত ও। এসে জিজ্ঞেস করত, বোটটা কার। দুঃখ প্রকাশ করত।
ঠিকই বলেছ বলল রবিন। কিন্তু কেন? তোমার নৌকা ভেঙে দিল কেন? কার কি লাভ?
আমি মোহর খুঁজে বেড়াই, এটা লোকের পছন্দ না, কাঁদো কাঁদো গলায় বলল পাপালো। জেলেরা দেখতে পারে না। আমাকে। এই উপসাগর ওদের। এতে বাইরের কারও ভাগ বসানো সইতে পারে না। দীর্ঘ এক মুহূর্ত নীরবতা। যতদূর চোখ যায়, কোন নৌকা বা জাহাজের চিহ্নও নেই। আর কতক্ষণ থাকতে হবে এ-দ্বীপে?
তোমার নৌকা গেল, অবশেষে বলল রবিন। দামি অনেক জিনিসপত্র গেল আমাদেরও।
হ্যাঁ, গম্ভীর হয়ে আছে মুসা। অনেক দামি। একে অন্যের দিকে চেয়ে আছে দুই গোয়েন্দা। দুজনের মনে একই ভাবনা। এক সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল দুজনে, ওগুলো তো তুলে আনতে পারি। আমরা!
বিষণ্ণতা ঝেড়ে ফেলল পাপালো। হাসল। নিশ্চয় পারি। চল। আমি সাহায্য করব তোমাদেরকে।
মুসা। পানিতে নামল। হেঁটে চলল। ডুব দিল গভীর পানিতে এসে।
পানির ওপরে রোদ। ছোট ছোট ঢেউ। তলার বালিতে শুয়ে থাকা নৌকার গায়ে বিচিত্র ভঙ্গিতে নাচছে সূর্যের আলো। ফ্লিপার নাচিয়ে দ্রুত নেমে চলেছে। রবিন আর মুসা। পাপালোর ওসব দরকার নেই। ভারি একটা পাথর ধরে রেখেছে দুহাতে। দুই সঙ্গীর চেয়ে অনেক দ্রুত নামছে
পাথরের ভারে।
নৌকার কাছে পৌঁছে গেল পাপালো। অর্ধেক পথও নামতে পারেনি এখনও অন্য দুজন। এক পাশে কাত হয়ে আছে নৌকাটা। জিনিসপত্র ভেতরে কিছু কিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আশপাশে। দুহাতে যা পারল, নিয়ে রওনা হয়ে গেল। আবার ওপরে।
পাশ দিয়ে নামার সময় পাপালোকে হাসতে দেখল দুই গোয়েন্দা। সাগরের শান্ত তলদেশে এসে কেমন এক ধরনের অনুভূতি জাগল। বিপদে পড়েছে, ভুলেই গেল। পাশাপাশি নেমে এল নৌকাটার ধারে। সাপের মত নাচছে পালের দড়ি। দড়ির কাছ থেকে দূরে থাকল রবিন। কি জানি, আবার যদি পায়ে পেচিয়ে যায়! নিজের একটা প্যান্ট পড়ে থাকতে দেখে তুলে নিল। পাপালোর জুতো জোড়া তুলে নিল মুসা। আরও জিনিসের জন্যে চাইল এদিক ওদিক।
খুব ধীরে ধীরে এপােশ ওপােশ দোল খাচ্ছে নৌকাটা, ছেড়া পালটাও দুলছে তালে তালে। বেশ জোরালো স্রোত বইছে পানির তলায়।
মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই যা তোলার, তুলে ফেলল ওরা। অগভীর পানিতে এসে দাঁড়াল। তিনজনেরই দুহাত বোঝাই জিনিসপত্রে।
মনে হয়। আর কিছু নেই, হেসে বলল পাপালো। সবই তুলে এনেছি।
তই তো মনে হচ্ছে, বলল মুসা। ছপাৎ ছপাৎ আওয়াজ তুলে হেঁটে চলল। ওরা তীরের দিকে। তীরে পৌঁছে ভেজা জিনিসপত্র নামিয়ে রাখল। বসে পড়ল। ওগুলোর পাশে।
হঠাৎ কি মনে পড়তেই কাপড়ের স্তুপে খুঁজতে শুরু করল পাপালো। পেল না। আরে! আমার কম্পাস কই! তোমরা তোলনি?
এদিক ওদিক মাথা নাড়ল দুই গোয়েন্দা।
তোমরা বস। আমি নিয়ে আসছি। আবার পানিতে নামল গিয়ে পাপালো।
কাপড়গুলো চিপে ছড়িয়ে দেয়া দরকার। শুকাক। বলল মুসা।
মাথা বুকিয়ে সায় দিল রবিন।
কাপড় শুকাতে দিয়ে এসে আবার আগের জায়গায় বসল ওরা।
খবর পাঠানোর কোন উপায় নেই সাগরের দিকে চেয়ে বলল রবিন। রাফাত চাচা গাধা ভাববেন আমাদেরকে। বোকার মত আবার আটকা পড়েছি এসে এই দ্বীপে।
এটা আমাদের দোষ নয়, পাপালোরও না, ভারি একটা টর্চের পানি ঝাড়তে ঝাড়তে বলল মুসা। এখন না পারলেও অন্ধকার হলে পারব। টর্চের সাহায্যে।
কিন্তু অন্ধকার হতে এখনও অনেক দেরি, আকাশের দিকে তাকাল একবার রবিন। খিদেয় পেট জ্বলছে। এতক্ষণ সইব কি করো
কাপড়গুলো শুকাক আগে। খিদের ব্যাপারটা নিয়ে পরে ভাবা যাবে, পাপালো আসুক।
এই সময় মনে হল ওদের, পাপালো গেছে অনেকক্ষণ। এতক্ষণ ফিরে আসার কথা তার। ফিরে তো এলই না, একবার ভাসেওনি এপর্যন্ত। সঙ্গে গ্যাস ট্যাংক নেই। একটানা পনেরো মিনিট দিম আটকে রাখতে পারে না কোন মানুষ সতর্ক হয়ে উঠল ওরা। বিপদের গন্ধ পেল। নিশ্চয়, বিড়বিড় করে বলল রবিন। নিশ্চয় কোন বিপদে পড়েছে!
কোন কিছুতে আটকে যায়নি তো! ফ্যাকাসে হয়ে গেছে মুসার মুখ। জলদি চল, দেখি কি ঘটেছে।
দ্রুত আবার ডুবুরির সরঞ্জাম পরে নিল দুজনে। পানিতে এসে নামল। হেঁটে চলে এল গভীর পানির ধারে। সবুজ পানিতে উজ্জ্বল রোদ নিচের দিকে তাকাল ওরা একবার। পেছন ফিরে চিত হয়ে পড়ল পানিতে। ডুব দিল।
আগের মতই পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে তলার বাকি। কিন্তু পাপালো কোথায়? নৌকাটাও নেই। দ্রুত নেমে চলল দুজনে। ধড়াস ধড়াস করছে বুকের ভেতর।
ওপরের দিকে কয়েক ফুট ঢালু হয়ে নেমেছে পাথরের দেয়াল, তারপর একেবারে খাড়া। ছোটবড় অনেক গর্ত দেয়ালে। ওগুলোর পাপালোকে টেনে নিয়েছে, ভাবল রবিন।
না, নৌকাটা আছে। আগের জায়গায় নয়। ওখান থেকে বিশ ফুট দূরে। দেয়ালের গা ঘেঁষে পড়ে আছে। দুলছে ধীরে ধীরে। বাড়ি খাচ্ছে পাথুরে দেয়ালে।
তাড়াতাড়ি নৌকার দিকে সাঁতরে চলল দুই গোয়েন্দা। কাছে চলে এল। কিন্তু কোথায় পাপালো? নৌকার তলায় মরে পড়ে নেই তো?
বালিতে এসে ঠেকল রবিন। ভয়ে ভয়ে উঁকি দিল নৌকার তলায়। না, নেই। ওখানে পাপালো। গেল কোথায়! এখানকার পানিতে হাঙর নেই, জানা আছে। রবিনের। অক্টোপাস বা ওই ধরনের কোন ভয়াবহ সামুদ্রিক জীবও নেই। তাহলে?
বাহুতে ছোঁয়া লাগতেই প্ৰায় চমকে উঠল রবিন। ফিরে চাইল মুসা। দুটো আঙুল জড়ো করে দেখাল গোয়েন্দা সহকারী। ইঙ্গিতটা বুঝল রবিন। পাশাপাশি থাকতে বলছে। আঙুল তুলে একটা গর্ত দেখােল মুসা। তারপর সাঁতরাতে শুরু করল ওদিকে।
পাশাপাশি কয়েকটা গর্ত। উঁকি দিয়ে দেখল দুজনে। ভেতরটা অন্ধকার। টর্চ আনা উচিত ছিল। গর্তের মুখে পানিতে হাত দিয়ে নাড়া দিয়ে দেখল। কোন জবাব এল না। বেরিয়ে এল শুধু ছোট মাছের দল।
বড় বড় কিছু গর্তের মুখে ঘন হয়ে জন্মেছে শেওলা। ওপরের দিকে মাথা তুলে দুলছে তালে তালে। দুহাতে ওগুলো সরিয়ে উঁকি দিতে হচ্ছে ওসব গর্তের ভেতরে। কিন্তু অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ছে না।
পাঁচ মিনিট পেরিয়ে গেল। দেয়ালের ধার ধরে ধরে প্রায় শখানেক ফুট চলে এসেছে ওরা নৌকার কাছ থেকে। কিন্তু পাপালোর কোন চিহ্নই নেই।
থেমে গেল ওরা। মুখ কাছাকাছি নিয়ে এল। মাস্কের ভেতরে দুজনের চোখ দেখতে পাচ্ছে দুজনে। মুসার চোখ বড় বড় হয়ে গেল, দেখল রবিন। উদ্বেগ প্রকাশ পাচ্ছে। বুড়ো আঙুল তুলে উল্টো দিক দেখাল সে। মাথা ঝোঁকাল মুসা। দুজনে আবার এগিয়ে চলল নৌকাটার দিকে।
নৌকার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে ওরা। এই সময় দেখতে পেল ওকে। দ্রুত উঠে যাচ্ছে ওপরে পাপালো। আশ্চর্য বিশ মিনিট পানির তলায় দম আটকে রাখতে পারলা অবাক হল দুই গোয়েন্দা। ওরাও উঠতে শুরু করল ওপরের দিকে।
ভুসস করে মাথা তুলল দুই গোয়েন্দা। কোমর পানিতে দাঁড়িয়ে আছে পাপালো। হাঁ করে শ্বাস নিচ্ছে জোরে জোরে। অক্ষতই মনে হচ্ছে। ওদেরকে দেখে হাসল।
পাপালোর পাশে চলে এল দুই গোয়েন্দা। ঠেলে মুখের একপাশে সরিয়ে দিল মাস্ক।
পাপু হাঁপাতে হাঁপাতে বলল মুসা। ভয় পাইয়ে দিয়েছিলে আমাদেরকে।
কোথায় ছিলে তুমি? বন্ধুকে সুস্থ দেখে হাসি ফুটেছে। রবিনের মুখে। কি হয়েছিল?
হাসল আবার পাপালো। একটা জিনিস পেয়েছি। বলত কি?
তোমার কম্পাস?
এদিক ওদিক মাথা নাড়ল গ্ৰীক কিশোর। জ্বলজ্বল করছে কালো চোখের তারা। হয়নি। আবার বল।
বুঝেছি! মোহর চেঁচিয়ে উঠল মুসা।
হাসছে পাপালো। ডান হাত বাড়াল। মুঠো খুলল। এক টুকরো সোনা। মুদ্রা ছিল এককালে। বেঁকেচুরে গেছে ধারগুলো।
মোহরের সিন্দুকটা পেয়েছ নাকি? জানতে চাইল রবিন।
না। দেয়ালের একটা গর্ত দিয়ে মাছ ঢুকতে বেরোতে দেখলাম। ভাবলাম, মাছেরা যদি পারে, পাপুও পারবে। ঢুকে পড়লাম ভেতরে। চুপ করল পাপালো। নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল, দ্বীপের তলায় এক গুহা আবিষ্কার করেছি। ওখানেই পেয়েছি। এই সোনার টুকরো। বাজি ধরে বলতে পারি, আরও অনেক মোহর আছে ওখানে।