নড়েচড়ে গুঙিয়ে উঠল কুমালো। যন্ত্রণার ছাপ চেহারায়, ভাঁজ পড়ল কপালে। চোখ মেলল সে। একে একে দেখল কিশোর, রবিন আর মুসার মুখ। কি ঘটেছিল, মনে পড়ল সব।
সরি, বেহুশ হয়ে গিয়েছিলাম, উঠে বসার চেষ্টা করল কুমালো। পারল না। চিত হয়ে শুয়ে পড়ল আবার। বিকৃত করে ফেলেছে চেহারা।
চুপচাপ শুয়ে থাক, কিশোর বলল।
জোর করে মুখে হাসি ফোঁটাল কুমালো। কি কি ঘটেছে আমি ঘুমানোর সময়? দারুণ কিছু মিস করেছি?
না, তেমন কিছু না। শুধু ডেংগুকে বিদায় জানাতে বাধ্য হয়েছি আমরা। বিদায়? চলে গেছে, বোট নিয়ে। পোনাপে থেকে জাহাজ আর ডুবুরি নিয়ে আসবে।
বড় বড় হয়ে গেল কুমালের চোখ। বিশ্বাস করেছ ওর কথা? ফাঁকি দিয়েছে সে, ধাপ্পা দিয়েছে। ভয় দেখিয়ে তোমাদেরকে দিয়ে কাজ আদায় করতে চেয়েছে। দেখ, রাতের আগেই ফিরে আসবে আবার। আমাদেরকে এই অবস্থায় এখানে ফেলে যেতে পারে না সে।
আল্লাহ করুক, তাই যেন হয়, আশা করল মুসা।
কিন্তু যদি সত্যিই চলে গিয়ে থাকে, তাহলে পোনাপেতে পৌঁছতে অন্তত তিন দিন লেগে যাবে তার। জাহাজ আর ডুবুরি জোগাড় করতে কম করে হলেও এক হপ্তা। ভাল ডুবুরি মেলানো খুব কঠিন। দুই তিন হপ্তাও লাগতে পারে। তারপর আরও তিন-চার দিন লাগবে এখানে আসতে। তিন হপ্তায় এখানে আমাদের কি হবে বুঝতে পারছে না সে?
না পারার কোন কারণ নেই, কিশোর বলল। তবে ও-ব্যাপারে মাথাব্যথা নেই তার।
এক হপ্তাও যদি লাগে আসতে, নিঃসঙ্গ পাথরগুলোর দিকে তাকাল কুমালো, কড়া রোদে যেন ঝলসাচ্ছে ওগুলো। গেছি আমরা। জানো কেন মানুষ নেই এটাতে?
না। কেন?
কারণ এখানে মানুষ বাস কতে পারবে না। কেউ কখনও চেষ্টা করেছে বলেও মনে হয় না। জীবন ধারণের জন্যে প্রয়োজনীয় জিনিস এখানে নেই। যা-ও বা কিছু ছিল, সব ধ্বংস হয়ে গেছে হারিক্যানে। এমনকি এখন পাখি পর্যন্ত থাকতে পারবে না এখানে। ল্যানে মাছ দেখিনি। মুসা যে নাম রেখেছে, মরা দ্বীপ, ঠিকই রেখেছে। এখানে থাকলে ক্ষুধায় ধুকে ধুকে মরতে হবে।
চোখ বুজে চুপচাপ যন্ত্রণা সহ্য করল কিছুক্ষণ কুমালো। তারপর আবার চেয়ে, হাসল। ওভাবে বলা উচিত হয়নি আমার। আসলে দুর্বল হয়ে পড়েছি তো, আবোলতাবোল…ভেব না, উপায় বের করেই ফেলব আমরা। বেঁচে যাব। কষ্ট করতে হবে আরকি, অনেক খাটতে হবে। এভাবে এখন শুয়ে থাকলে চলবে না আমার, জোর করে উঠে বসল কুমালো।
শুয়ে থাক! তীক্ষ্ণ হল কিশোরের কণ্ঠ। এই দেখ, কি কাণ্ড করেছ! আবার রক্ত বেরোতে শুরু করেছে। কোন ওষুধ নেই আমাদের কাছে।
কে বলল নেই? দুর্বল কণ্ঠে বলল কুমালো। ওষুধের বাক্সের ওপরই তো শুয়ে আছি। একটা নারকেলের কাণ্ডে মাথা রেখেছে সে।
এটা দিয়ে কি হবে?
দুরি দিয়ে বাকলটা চাছো। পাউডারের মত বেরোবে। ওগুলো জখমে লাগিয়ে। দাও। অ্যাসট্রিনজেন্ট, রক্ত পড়া বন্ধ করবে।
পচন ধরাবে না তো আবার?
আরে না না, যে কড়া রোদ। টেরিলাইজ করে দিয়েছে। একেবারে জীবাণুমুক্ত।
পলিনেশিয়ানদের ভেষজ জ্ঞানের কথা শুনেছে কিশোর। লতাপাতা, ঘাস, শেকড়, আর গাছপালা থেকে ওষুধ তৈরি করতে নাকি ওরা ওস্তাদ। অনেক জটিল রোগের সার্থক চিকিৎসা করে ফেলে। কিন্তু শুকনো নারকেলের কাণ্ডও যে ওষুধ হিসেবে ব্যবহার হয়, ভাবতে পারেনি।
তর্ক করল না সে। ছুরি দিয়ে চাছতে আরম্ভ করল। পাউডার জমল। ওগুলো নিয়ে জখমে রেখে শার্ট ছিঁড়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিল।
কুমালোর কপালে হাত দিয়ে দেখল রবিন। গরম। জ্বর উঠছে। অল্পক্ষণেই অস্থির হয়ে গেল কুমালো।
ছায়া দরকার, মুসাকে বলল কিশোর। ছায়ায় নিয়ে রাখতে হবে এখন ওকে।
যতদূর চোখ যায়, পুরো চীফটায় চোখ বোলাল ওরা। ছায়া নেই কোথাও। ওদের দিকে তাকিয়ে ব্যঙ্গ করছে যেন শুধু রুক্ষ পাথর।
এক জায়গায় কাছাকাছি হয়ে জন্মেছিল কিছু নারকেল গাছ, কাণ্ডগুলো দাঁড়িয়ে রয়েছে এখন। সামান্য ছায়া আছে ওখানে। সেখানেই কুমালোকে শুইয়ে দিল। ওরা। এমন কিছু ছায়া নয়, রোদের আঁচ ঠেকাতে পারছে না, তবু নেই মামার চেয়ে কানা মামা ভাল। সূর্য সরার সাথে সাথে ছায়া সরছে, কুমালোকেও সরাতে হচ্ছে।
এভাবে হবে না, কিশোর বলল। ছাউনি-টাউনি একটা কিছু তৈরি করতেই হবে।
তিক্ত হাসল মুসা। কোন ভরসা নেই।
কিন্তু নেই বলে বসে থাকল না। পুরো দ্বীপটায় খুঁজে দেখতে চলল ছাউনি বানান মত কিছু পাওয়া যায় কিনা।
বিড়বিড় করে কথা বলতে লাগল কুমালো। শোনার জন্যে প্রায় তার মুখের কাছে কান নিয়ে যেতে হল কিশোর আর রবিনকে।
কুমালো বলছে, কিশোর, আমার কথায় দুশ্চিন্তা কোরো না। বাড়িয়েই বলেছি। কোন না কোনভাবে টিকে যাবই আমরা। বেশিদিন তো নয়। এক কি দুহপ্তা, বড়জোর তিন। ডেংগু আসবে। আসতেই হবে তাকে। মুক্তার লোতে। সে
এলে অবশ্য আশা নেই আমাদের, কোন জাহাজ আসে না এদিকে। অসুবিধে নেই। ডেংগুই আসবে। আর আসতে কষ্ট হবে না তার, দ্বীপটার অবস্থান তো জানাই আছে।
া, কুমালো, কিশোর বলল। এখন ঘুমানর চেষ্টা কর তো একটু।
ওদেরকে ভয় পাওয়াতে চাইল না কিশোর। সে কেবল একলা জানে, ডেংগু কখনও ফিরে আসবে না। আসতে পারবে না।
বোটে লগবুক আছে। সেটার রীডিং অনুসরণ করবে ডেংগু। তাকে ফকি দিতে চেয়েছিল কিশোর। কিন্তু নিজের পাতা ফাঁদে নিজেই পড়েছে এখন। শুধু সে
একা নয়, আরও তিনজনকে নিয়ে পড়েছে।
লগবুকের রীডিং অনুসরণ করে একশো মাইল দূরে চলে যাবে ডেংগু। কিছুতেই বুঝতে পারবে না পার্ল ল্যাগুন কোথায় আছে। হয়ত খুঁজবে। যথাসাধ্য চেষ্টা করবে দ্বীপটা খুঁজে বের করার। পাওয়ার সম্ভাবনা হাজারে এক, হয়ত বা লাখে। মাসের পর মাস, সারা বছর ধরে খুঁজলেও হয়ত বের করতে পারবে না। কয়েক মাইলের মধ্যে চলে এলেও চোখে পড়বে না, কারণ দ্বীপটা সমুদ্র সমতল থেকে মাত্র দশ ফুট উঁচু, তা-ও যেখানটায় সবচেয়ে বেশি। গাছপালা নেই। পানি থেকে আলাদা করে দ্বীপটাকে চেনা খুব কঠিন। সঠিক রীডিং জানা থাকলেই শুধু খুঁজে বের করা সম্ভব।
আর যদিও বা অলৌকিক ভাবে বছরখানেক পরে ডেংগু খুঁজে পায় দ্বীপটা, ওদের লাভ কি তাতে? সে এসে দেখবে, চারটে ঝকঝকে কঙ্কাল পড়ে রয়েছে প্রবাল পাথরের মাঝে, অবশ্যই যদি ঝড়ের সময় পানিতে ভাসিয়ে না নিয়ে যায় লাশগুলো।
ডেংগু হয়ত ওদেরকে মরার জন্যে রেখে যায়নি। খানিকটা শাস্তি দিতে চেয়েছে। এটা ভেবেই ফেলে গেছে, আবার তে; আসছেই, ততদিন মরবে না ওরা। কিন্তু কিশোর যা করে রেখেছে, সময় মত কিছুতেই আসতে পারবে না ডেংগু।
রবিন আর মুসা জানলে কি বলবে? কুমালোও কি তাকেই দোষারোপ করবে তাদের মৃত্যুর জন্যে? মুখে হয়ত কেউই কিছু বলবে না, কিশোরের মানসি যন্ত্রণা বাড়াতে চাইবে না, কিন্তু মনে মনে? না খেয়ে মরার জন্যে কি দোষ দেবে না তাকে? আচ্ছা, না খেয়ে, পিপাসায় ধুকে ধুকে মরতে কতটা কষ্ট হবে? খুব বেশি?
আপাতত কাউকে কিছু না বলার সিদ্ধান্ত নিল কিশোর ! শুনলে মনমরা হয়ে পড়বে মুসা আর রবিন, একেবারে নিরাশ হয়ে যাবে। কুমালোর সেবাযতের দিকে আর মন দেয়ার প্রয়োজন বোধ করবে না।
ভয়ঙ্কর ভাবনাগুলো জোর করে মন থেকে বিদেয় করল কিশোর কুমালোর সেবায় মন দিল। রক্তপাত বন্ধ হয়েছে। কাজ করেছে টোটকা ওষুধ। সাবধানে টর্নিকেটটা খুলতে লাগল কিশোর। বেশিক্ষণ বেঁধে রাখা ঠিক না, গ্যাংগ্রিন হয়ে যেতে পারে। টনিকেটটা খোলার পরেও রক্ত বেরোল না। নারকেল-বাকলের পাউডারের ওপর শ্রদ্ধা জন্মাল কিশোরের। এত ভাল অ্যাসট্রিনজেন্ট এই জিনিস, কনাই করতে পারবে না অনেকে।
হেঁড়া শার্টটা নিয়ে গিয়ে পানিতে ভেজাল কিশোর। চিপে বাতাসে ছড়িয়ে নাড়ল, যাতে ঠাণ্ডা হয়। তারপর এনে রাখল কুমালোর কপালে। ভীষণ জ্বর। কি হচ্ছে না হচ্ছে জানতেই পারল না বেচারা।
রবিন সাহায্য করছে কিশোরকে।
মুসা বিশেষ সুবিধে করতে পারছে না। এসব দ্বীপে ছাউনির চালা বলতে একমাত্র নারকেল পাতা। একসময় অনেকই ছিল, এখন একটাও নেই। ঝড়ে ছিঁড়ে যেগুলো পড়েছিল, সেগুলোকেও ভাসিয়ে নিয়ে গেছে ঢেউ।
পাথরের খাঁজে খুঁজে আটকে রয়েছে কিছু ভাঙা কাণ্ড। কয়েকটা মাথা আছে। তাতে ডালও রয়েছে, তবে একটাও পাতা মেই। যেন ছুরি দিয়ে চেঁছে নিয়ে গেছে। বাতাস। হারিকানের এই প্রচণ্ড ক্ষমতা না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।
নারকেল পাতা পাওয়া যাবে না, নিশ্চিত হয়ে গেল সে। তাহলে আর কি আছে? কি দিয়ে ছাউনি হবে? চোখ বন্ধ করে ভাবতে লাগল। ভাবনার একাগ্রতার জন্যে চোখের পাতা বোজেনি, বুজেছে রোদের মধ্যে চোখ মেলে রাখতে কষ্ট হচ্ছে বলে। প্যানডানাস পাতা দিয়ে ছাউনি বানায় দ্বীপবাসীরা, ট্যারো পাতা দিয়েও হয়। কলাপাতা পেলেও সাময়িক কাজ চালানো যায়। জাহাজডুবি হয়ে নির্জন দ্বীপে উঠে খুব আরামে থাকে নাবিকেরা, এরকম অনেক গল্প পড়েছে সে। তবে ওদের কেউই কোন মরা দ্বীপে ওঠে না। নানারকম রসাল ফলের গাছ থাকে, সুন্দর পাখি থাকে, হরিণ থাকে, মিষ্টি পানির ঝর্না থাকে ওসব দ্বীপে। বাঁচতে অসুবিধে হয় না মানুষের।
ওরকম একটা দ্বীপে আটকে গেলে কিছুই মনে করত না মুসা। হাত বাড়ালেই পেয়ে যেত পাকা কলা, ছিঁড়ে নিতে পারত রুটিফল, বুনো কমলা, আম, পেঁপে, পেয়ারা, আঙর। ল্যাগুন থাকত মাছে বোঝাই। সৈকত থাকত সাদা বালির, জোয়ারের পানি তাতে এনে ফেলত মোটা মোটা চিংড়ি। আর এত বেশি পাখি থাকত, খালি হাতেই ধরে ফেলা যেত ওগুলো, কারণ মানুষকে ভয় পায় না ওরা, আগে মানুষ দেখেনি তো কখনও। দ্বীপের কিনারে পাহাড়ে থাকত অগণিত পাখির বাসা, তাতে ডিম। পাহাড়ি ঝর্নায় আশ মিটিয়ে গোসল করত, নারকেলের মিষ্টি পানি খেত, থাকত বাঁশের তৈরি সুন্দর কুঁড়েতে। রাতে ফুটফুটে জ্যোৎস্নায় মাথা দোলাত নারকেল গাছ, রহস্যময় সরসর শব্দ তুলত বাঁশের কঞ্চি, সবুজ বন থেকে ভেসে আসত নিশাচর পাখির ঘুমপাড়ানি ডাক…
চোখ মেলতে বাধ্য, হল মুসা। ঘাড়ের চামড়া যেন পুড়ে যাচ্ছে রোদে। সাদা পাথরে রোদ প্রতিফলিত হয়ে চোখে এসে লাগতে গুঙিয়ে উঠল সে। তাকানই যায় না।
পাথরের দিক থেকে চোখ সরাতেই চোখে পড়ল ওটা। মস্ত দুটো পাথরের খাঁজে কি যেন একটা পড়ে আছে, পানির, কিনারে। ধড়াস করে উঠল তার বুক। নৌকা না তো! দেখে তো মনে হয় নৌকাই উল্টে পড়ে আছে। হয়ত ঝড়ে ভেসে এসে ঠেকেছে ওখানে!
উত্তেজনায় বুকের খাঁচায় দাপাদাপি শুরু করে দিল হৃৎপিণ্ডটা। আশার আলো জ্বলল মনে। নৌকা হলে এই মৃত্যুদ্বীপ থেকে বেরোতে পারবে। প্রবালের চোখা, ধারাল বাধা অমান্য করে দৌড় দিল সে।
নাহ্, নৌকা নয়! বিশাল এক মাছ। পেট আকাশের দিকে, মরে ঠাণ্ডা হয়ে আছে। পুরো তিরিশ ফুট লম্বা।
চামড়ার রঙ বাদামী, তাতে সাদা ফুটকি। কুৎসিত মুখ, ব্যাঙের মুখের মত অনেকটা। মুখের তুলনায় ছোট দুটো চোখ।
তিরিশ ফুট শরীরের তুলনায়ও মুখের হাঁ বিশাল। চার ফুট চওড়া। দুই কশ বেয়ে লালা গড়িয়ে পড়ছে এখনও, যেন শ্যাওলা লেগে আছে।
এত বড় আর কুৎসিত মাছ দেখলে প্রথমেই মনে হবে ওটা মানুষখেকো ভয়ঙ্কর হিংস্রজীব। কিন্তু মুসা জানে, এই মাছ একেবারেই নিরীহ, যদিও হিংস্রতম প্রজাতিরই বংশধর এটা। মাছের মধ্যে সব চেয়ে বড় মাছ, নাম হোয়েল শার্ক বা তিমি-হাঙর। এখানে যেটা পড়ে আছে সেটা ছোট, এর দ্বিগুণ বড়ও হয় এ মাছ। হাঙর গোষ্ঠির প্রাণী, অথচ ছোট জাতভাইদের মত রক্তলোলুপ নয়। খুব ছোট ছোট জলজ জীব খেয়ে বেঁচে থাকে। ওসব জীবের কোন কোনটা এত ছোট, খালি চোখে দেখা যায় না, অণুবীক্ষণ যন্ত্র লাগে।
নিরাশ হয়ে ফিরে এল মুসা। বন্ধুদের জানাল, ঘর বানানর মত কিছুই পাওয়া যায়নি। মাছটার কথাও বলল।
দাঁড়াও দাঁড়াও, হাত তুলল রবিন। বইয়ে পড়েছি, সাইবেরিয়ার আমুর নদীর ধারেও মানুষ বাস করে। এমন কোন গাছপালা নেই ওখানে, যা দিয়ে ঘর বানানো যায়। তাই মাছের চামড়া দিয়ে ঘর বানায় লোকে।
হেসে উঠল মুসা। ওসব সীল-টীলের চামড়া দিয়ে বানায় আরকি। হাঙরের চামড়া দিয়ে কে বানাতে যাবে?
দোষ কি? বলল কিশোর। চল তো দেখি। আমার মনে হয় ব্যবস্থা একটা হয়ে গেল।
দানব মাছটাকে দেখতে এল ওরা।
আহা, কি সুন্দর মুখ, মুখ বাঁকিয়ে কিশোর বলল। সারা প্রশান্ত মহাসাগরে এত সরল মুখ আর নেই। মাছটার চামড়ায় হাত বোলাল সে। সিরিসের মত খসখসে। কাটা সহজ হবে না। তবে ছুরিটুরি ভালই আছে আমাদের। পেটের চামড়াটা তুলে নেব আমরা। মুসা, তুমি গলার কাছ থেকে শুরু কর। রবিন, তুমি লেজের কাছে, পাখনার ওপর থেকে। আমি পেটের দুই পাশ থেকে চিরছি।
ভীষণ শক্ত চামড়া। এমন সব জায়গা আছে, ছুরিই বসতে চায় না। সেসব জায়গায় প্রবাল পাথর দিয়ে ছুরির বাটে বাড়ি মেরে ফলা ঢোকাতে হচ্ছে।
দরদর করে ঘামছে কিশোর। হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বলল, কেটে ছাড়াতে পারলে ভালই হবে। যা শক্ত, নারকেল পাতার চেয়ে অনেক বেশি টেকসই হবে, একেবারে ক্যানভাস। অ্যাসবেসটসের চেয়েও বেশি টেকসই হবে।
অত টেকার দরকার নেই আমাদের, রবিন বলল। আরও অনেক কম টিকলেও চলবে। দুতিন হপ্তার বেশি তো থাকছি না আমরা এই দ্বীপে।
খচ করে কাটা বিঁধল যেন কিশোরের মনে। ওরা এখনও জানে না, কোনদিনই আর ফিরবে না ডেংগু। বলে দেবে? জানাতেই যখন হবে, দেরি করে লাভ কি? শুনে আগে থেকেই মনকে শক্ত করুক।
নিশ্চয়! হালকা গলায় বলল কিশোর। কিন্তু ধর, আর ফিরল না। তাহলে?
থেমে গেল মুসার ছুরি। আমাদের তাহলে কি হবে ভেবেছ?
কি আর হবে, বলল রবিন। মরব।
না, এত সহজে মরছি না, কিশোর বলল। বেঁচে যাবই। কোন না কোন উপায় নিশ্চয় হয়ে যাবে। চুপ করে না থেকে এখন যা করছি করি। এই, মুসা, ওই কোনাটা ভালমত ছাড়াও। বাপরে বাপ, কি মোটা চামড়া!
হাসল মুসা। গণ্ডারেরও এত মোটা কিনা সন্দেহ।
দুই ঘন্টা কঠোর পরিশ্রমের পর দম নেয়ার জন্যে থামল ওরা। চামড়া অর্ধেক ছাড়িয়েছে। এমনিতেই সাংঘাতিক দুর্গন্ধ ছিল, চামড়া ছাড়ার পর অসহ্য হয়ে উঠেছে। মাথায় যেন গরম হাতুড়ি পিটছে সূর্য। রোদের তেজ এড়ানর জন্যে চোখের পাতা প্রায় বুজে রেখেছে ওরা। শার্টের হাতা দিয়ে মুখ মুছল মুসা। টর্নিকেট, ব্যাণ্ডেজ, আর কপালে পট্টি দিতেই শেষ হয়েছে কিশোরের শার্ট। মুসারটার না দিয়েই মুখ মুছল।
এক গ্লাস পানি যদি পেতাম, মুসা বলল।
তাই তো! চমকে উঠল কিশোর। একবারও মনে হয়নি ও-কথা! ছাউনির চেয়েও বেশি দরকার পানি, খাবারের চেয়েও। থাক, কাজকর্ম এখন বাদ। বাকিটা কালও সারতে পারব। এখন চল, কুমালো কেমন আছে, দেখে, পানির খোঁজ করি।
ঘুমিয়ে আছে কুমালো। গায়ের ওপর থেকে সরে গেছে গাছের ছায়া। ধরাধরি করে তাকে সরাল কিশোর আর মুসা। পট্টি শুকিয়ে গেছে, ভিজিয়ে এনে আবার ওটা কপালে রাখল রবিন।
তারপর শুরু হল পানির খোঁজ। পানি পাওয়া যাবেই, জোর গলায় একথা একে অন্যকে শুনিয়ে রওনা হল ওরা। কিন্তু মনে মনে প্রত্যেকেই জানে, পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। রুক্ষ এই রোদেপোড়া প্রবালদ্বীপে কোথায় থাকবে মিষ্টি পানি?
হারিক্যানের সময় প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে, কিশোর বলল। পাথরের মাঝে বড় গর্তটৰ্ত থাকলে আটকে থাকার কথা। রোদে নিশ্চয় সব শুকিয়ে যায়নি এখনও।
তীরের কাছে পাওয়া গেল একটা গর্ত, বেশ বড় গামলার মত। তাতে কিছু পানি আটকে রয়েছে। তাড়াতাড়ি ছুটে গিয়ে আঁজলা ভরে তুলে মুখে দিল মুসা। থু থু করে ফেলে দিল পরক্ষণেই।
দূর! লবণ!
বৃষ্টির পানি নয়, ঝড়ের সময় সাগরের পানিই উঠেছিল এখানে। আরও কিছু গর্ত পাওয়া গেল, তাতে পানির দাগ আছে, পানি নেই। শুকিয়ে গেছে অনেক আগেই।
নারকেল গাছের গোড়াগুলোয় খুঁজে দেখল কিশোর।
নিশ্চয় ফল ছিল গাছে, রবিন বলল।
এক আধটা নারকেল পেলেও আপাতত চলত, বলল মুসা।
হ্যাঁ, কিশোর বলল। পানি তো হতই। খাবারও।
নারকেলের মিষ্টি পানি আর শাঁসের কথা ভেবে জিভে জল এল তিনজনেরই।
অনেক খুঁজল ওরা। কিন্তু একটা নারকেলও মিলল না।
মুশকিল হয়েছে কি, কিশোর বলল। নারকেল পানিতে ভাসে। ঝড়ের সময় যা পড়েছিল সব ভাসিয়ে নিয়ে গেছে ঢেউ।
তাহলে? ভুরু নাচাল মুসা। এবার কি করব?
খুঁড়ব, বলে সৈকতের দিকে রওনা হল কিশোর। ভাটার সময় ল্যাগুনের পানি নেমে গেলে নাকি অনেক সময় কিনারে মাটির তলায় মিষ্টি পানি পাওয়া যায়। আচ্ছা, এই জায়গাটা কেমন মনে হয় তোমাদের? পা দিয়ে দেখাল সে, ঠিক এই পর্যন্ত ওঠে পানি। পা আরেকটু নিচের দিকে সরাল, এখানটায়?
আমার কাছে পাগলামি মনে হচ্ছে, বলল মুসা। নোনা পানির নিচে আবার মিষ্টি পানি থাকে কি করে?
কি করে থাকে, জানি না, রবিন বলল। তবে আমিও পড়েছি। আমার মনে হয় বিচিত্র কোন প্রাকৃতিক কারণে বৃষ্টির পানি জমেটমে থাকে আরকি।
বেশ, খুঁড়ি তাহলে, বলে চ্যাপ্টা একটা পাথর তুলে নিয়ে ওটাকে বেলচা বানিয়ে বালি খুঁড়তে শুরু করল মুসা।
তিন ফুট খোঁড়ার পর কিশোর বলল, এবার থাম। দেখা যাক কি ঘটে?
চুইয়ে পানি উঠতে শুরু করল গর্তে। দেখতে দেখতে ভরে গেল তিন চার ইঞ্চি।
মিষ্টি পানি? মুসার জিজ্ঞাসা।
কি জানি, বলল কিশোর। আশা করছি। অনেক অ্যাটলেই ঘটে এটা। জাহাজডুবি হয়ে নাবিকেরা দ্বীপে ওঠার পর এমনি করে পানি বের করেই খেয়ে বেঁচেছে, শুনেছি।
দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হলেও?
তা বলতে পারব না।
আমি পড়েছি, রবিন বলল। বষ্টি না হলেও পাওয়া যায়। সাগরের পানিই বালির স্তর ভেদ করে ওঠার সময় ফিলটার হয়ে যায়। লবণ অনেকখানি নষ্ট হয়ে যায় তাতে। আর বৃষ্টি হলে তো কথাই নেই। পাথর আর বালির ফাঁকফোকর দিয়ে চলে যায় তলায়, জমা হয়ে থাকে।…হ্যাঁ, যথেষ্ট উঠেছে। এবার খেয়ে দেখ। সাবধান, বেশি নেড় না। নোনা পানির চেয়ে মিষ্টি পানি হালকা, থাকলে ওপরেই থাকবে।
খানিকটা পানি তুলে মুখে দিল মুসা। তারপর আরও দুই আঁজলা তুলে গিলে ফেলল। মাথা দুলিয়ে বলল, লবণ আছে, তবে ততটা নয়। সাগরের পানির চেয়ে কম।
খানিকটা তুলে কিশোরও মুখে দিল। হতাশ মনে হল তাকে। মুখ থেকে ফেলে দিয়ে বলল, খেয়ো না আর, ভাল না। পেটে সহ্য হবে না।
কিশোরের না বললেও চলত। কপাল টিপে ধরল মুসা। ওয়াক ওয়াক শুরু করল। মোচড় দিচ্ছে পেট। হড়হড় করে বমি করে ফেলল। সকালে নাস্তা যা খেয়েছিল বেরিয়ে গেল সব।
রাগ করে কিশোর আর রবিনের দিকে তাকাল। ধেত্তের তোমাদের মিষ্টি পানি! বইয়ে কি সত্যি কথা লেখে নাকি? ব্যাটারা জানে না শোনে না…মরা দ্বীপে কখনও আটকা পড়েছিল ওরা যে জানবে?
তা হয়ত পড়েনি, স্বীকার করল কিশোর। কিন্তু ইউ এস নেভির সারভাইভাল বুক-এও একথাই লিখেছে, আমরা যা করলাম ওরকম করেই পানি বের করতে বলেছে।
তাহলে বেরোল না কেন?
হয়ত এখানকার বালি মোটা বেশি, লবণ ঠিকমত ফিল্টার করতে পারে না। কিংবা হয়ত খুব বেশি বৃষ্টি হয়নি এখানে। আর হলেও হয়ত ফাঁকফোকর দিয়ে অনেক নিচে নেমে গেছে।
অত সব হয়ত হয়ত শুনে তো লাভ নেই। সত্যি সত্যি হয় ওরকম কিছু কর।
মুসা, শান্তকণ্ঠে বলল কিশোর। তোমার মনের অবস্থা বুঝতে পারছি। কিন্তু ভুলে যাচ্ছ, এই দ্বীপে তুমি শুধু একাই তৃষ্ণার্ত নও।
চুপ হয়ে গেল মুসা।
থেমে থাকল না ওরা। চলল পানির ক্লান্তিকর খোঁজে। হাঁটতে হাঁটতে চলে এল প্রাচীরের সব চেয়ে সরু জায়গাটায়, এক দ্বীপ থেকে আরেক দ্বীপে যাবার সেতু তৈরি করেছে যেটা। দেয়ালের একপাশে সারাক্ষণ আছড়ে পড়ে সাদা ফেনা সৃষ্টি করছে সাগরের ঢেউ, আরেক পাশে নীল ল্যাগুনের সাদা সৈকত ঢালু হয়ে নেমে গেছে পানিতে। কাঁচের মত মসৃণ ল্যাগুনের পানি। এখানটায় গভীরতা বারো ফুটের বেশি নয়। নিচে যেন গজিয়ে উঠেছে এক পরীর, শহর, তাতে গাঢ় লাল প্রাসাদ, স্তম্ভ, প্যাগোডা, মিনার, সবই রয়েছে, তৈরি করেছে খুদে প্রবাল-কীট।
অতি চমৎকার দৃশ্য, মন ভরে যেত যদি গরম, ক্লান্তি, চোখ জ্বলা, এবং খাবার আর পানির ভাবনা ভুলে থাকা যেত। কিন্তু তা থাকা সম্ভব নয়।
সেতুর ওপাশেই আবার চওড়া হতে শুরু করেছে দেয়াল। ঘন্টাখানেক ধরে অন্য দ্বীপটায় খোঁজাখুঁজি করল ওরা। পানি পাওয়া গেল না। পাথরের খাঁজে, গর্তে পানি জমে রয়েছে, সবই নোনা। নারকেলের গোড়া আছে, কাণ্ড আছে, কোনটারই মাথা নেই, ফলে পাতা বা ফলও নেই। কোন কোন গুঁড়ির মাঝে গর্ত হয়ে আছে, ওগুলোতেও জমে-থাকা পানির খোঁজ করল ওরা। পেল না। শুকিয়ে গেছে।
অবশেষে পাওয়া গেল একটা নারকেল! আটকে রয়েছে পাথরের খাঁজে। ঢেউও ভাসিয়ে নিতে ব্যর্থ হয়েছে।
উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে ছোবড়া ছাড়াল ওরা। মাথার ওপরের দিকে ফাটা। ফাঁকের ভেতরে ছুরি ঢুকিয়ে চাড় দিয়ে ওপরের অংশটা তুলে ফেলল কিশোর। ভেতরের জিনিস দেখে গুঙিয়ে উঠল তিনজনেই।
খাইছে! বিলাপ শুরু করবে যেন মুসা। এক্কেবারে পচা!
ফাটা দিয়ে মালার ভেতরে নোনা পানি ঢুকে নারকেলের পানি আর শাঁসের সর্বনাশ করে দিয়েছে।
ছুরি দিয়ে খুঁচিয়ে শাস ফেলে মালা পরিষ্কার করতে করতে কিশোর বলল, যাক, একটা কাপ পাওয়া গেল।
লাভ কি? বলল রবিন, কি রাখব এটাতে?
দেখা যাক। কিছু না কিছু পাওয়া যাবেই।
খোঁজ চালিয়েই গেল ওরা। পশ্চিম দিগন্তে হেলে পড়েছে সূর্য। খাবার লাগবে, জানান দিল ওদের পেট, পানির তাগাদা দিতে শুরু করল।
এই যে পানি! হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল কিশোর।
কি পেয়েছে দেখার জন্যে তাড়াতাড়ি কুঁকে এল রবিন আর মুসা। পাথরের ফাঁকে মাটিতে শেকড় গেড়ে আছে চ্যাপ্টা এক ধরনের উদ্ভিদ।
হুঁহ, পানি! হতাশ হল মুসা।
মুসার কথায় কান দিল না কিশোর। নরম একটা পাতা ছিঁড়ে নিয়ে মুখে পুরে চিবাতে শুরু করল। ঠাণ্ডা রসে ভরা পাতাটা। শুকনো মুখ আর খসখসে জিভে ভিজে পরশ বোলাল। হাসি ফুটল তার মুখে।
একটা পাতা ছিঁড়ে মুসাও মুখে পুরল। বলল, হুঁ, ভালই। কিন্তু আর হেঁড়ার জন্যে হাত বাড়াল না।
রবিনও ছিঁড়ল একটা। বেশি না। তিনজনের মনেই এক ভাবনা। গাছটা তুলে নিয়ে যেতে হবে তাদের দ্বীপে। ওদেরই যখন এত পিপাসা, আহত কুমালোর নিশ্চয় আরও অনেক বেশি।
ভীষণ অস্থির হয়ে পড়েছে কুমালো। চোখ মেলল। জ্বরে লাল টকটকে।
সামান্য পানি নিয়ে এসেছি, কুমালো, কিশোর বলল। তবে এই পানি গিলতে পারবে না, চিবাতে হবে। তোমরা একে কি বল, জানি না, বইয়ে এর নাম পড়েছি পিগউইড।
পার্সলেইনও বলে অনেকে, রবিন বলল।
নাম যা-ই হোক খুব আগ্রহের সঙ্গে গাছটা নিল কুমালো। পাতাগুলো চিবিয়ে শেষ করল। তারপর একে একে শেষ করল কাণ্ড আর শেকড়ের রস।
দারুণ, বলল সে। নিশ্চয় আরও অনেক আছে। খেয়েছ তো?
মাথা কাত করল মুসা।
সরি, কিশোর বলল। আর কোন খাবার-টাবার দিতে পারব না তোমাকে।
কুমালো হাসল। পানিই দরকার ছিল আমার। পেয়েছি। এখন ঘুমাতে পারব, বলেই চোখ মুদল সে।
আরও পিগউইডের সন্ধান করল কিশোর। পেল না। পাতার দুএক ফোঁটা রস পিপাসা না কমিয়ে বরং বাড়িয়েই দিয়েছে। খুনী সূর্যটাকে দিগন্তের ওপাশে হারিয়ে যেতে দেখে আন্তরিক খুশি হল সে। স্বাগত জানাল রাতকে। ভেবে শঙ্কিত হল, ভয়ঙ্কর দিন আসবে কয়েক ঘন্টা পরেই, আরেকটা, তারপর আরেকটা…আসতেই থাকবে একের পর এক, যতক্ষণ না ক্ষুধায় পিপাসায় মারা যাচ্ছে ওরা…
এভাবে মরতে চায় না কিশোর। কিন্তু বাঁচতে হলে পানি চাই। এক নম্বর সমস্যা এখন পানি। কোথায় পাওয়া যাবে? ভাবতে বসল সে। নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটছে ঘন ঘন। হঠাৎ পাথরে হাত পড়তে চমকে উঠল। ভেজা ভেজা!
শিশির! শিশির পড়ছে। সন্ধ্যার ছায়া নামতেই হালকা বাষ্প জমেছে ল্যাগুনের ওপরে। যদি কোনভাবে ধরা যেত ওই শিশির…
শুনেছে, পলিনেশিয়ানরা শিশির ধরার কায়দা জানে। মনে করতে পারছে না কিভাবে। কুমালো হয়ত জানে, কিন্তু ও ঘুমাচ্ছে, এখন জাগানো উচিত হবে না।
ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছে রবিন আর মুসা। কিন্তু কিশোরের চোখে ঘুম এল। শুয়ে গড়াগড়ি করল কিছুক্ষণ। তারপর উঠে পড়ল। একটা ব্যবস্থা করতেই হবে।
ল্যাগুনের সৈকতে চলে এল সে। বালিতে একটা ছোেট গর্ত করল। তলায় রাখল নারকেলের মালাটা। গর্তের মুখ ঢেকে দিল কাপড় দিয়ে, শার্ট ঘেঁড়া কাপড়, যেটা দিয়ে কুমালোর মাথায় পট্টি দিয়েছিল। ঠাণ্ডা এখন বাতাস, পট্টির আর দরকার নেই। নারকেলের মালার মুখে কাপড়টার যে গোল অংশটুকু পড়েছে, তার ঠিক মাঝখানে একটা ফুটো করল। তারপর গর্তটা ঢেকে দিতে লাগল পাথর দিয়ে। ছোট ছোট পাথরের তিন ফুট উঁচু একটা পিরামিড তৈরি করে ফেলল গর্তের ওপরে।
উদ্দেশ্যঃ পাথরে ধরা পড়বে শিশির। ভিজবে। তারপর আরও শিশির পড়ে পাথরের ফাঁক দিয়ে চুঁইয়ে চুঁইয়ে নামবে নিচে, শার্টের কাপড়ে জমা হবে, সেখান থেকে ফোঁটা ফোঁটা পড়বে মালায়। সকাল নাগাদ একমালা পরিষ্কার পানি পাওয়ার সম্ভাবনা আছে।
ফিরে এসে দেখল সে, রবিন আর মুসা কুমালোর পাশে মড়ার মত ঘুমোচ্ছে। কিশোরও শুয়ে পড়ল আবার, মাথার নিচে দিল প্রবালের বালিশ।
কিন্তু ঘুমাতে পারল না। জীবন বাঁচানোর জন্যে অতি প্রয়োজনীয় তিনটে শব্দ শুধু ঘুরছে মাথায়—পানি, খাবার, ছাউনি।
বাড়িতে নিঝঝাট জীবন জাপনের কথা ভাবল সে। নরম বিছানা, মাথার ওপরে ছাত। পানির ভাবনা নেই। বিছানা থেকে নেমে কয়েক পা গিয়ে ট্যাপের মুখ ঘোরালেই হল। খিদে পেলে শুধু ফ্রিজের ডালা খোলা, ব্যস…।
বাড়িতে জীবন এত সহজ, যারা থাকে ধরে নেয় এত সহজেই কাটে জীবন, সব জায়গায়। কষ্ট যে করতে হয় অনেক জায়গায়, বোঝেই না যেন। তাই অচেনা সঙ্কটময় কোন জায়গায় গিয়ে পড়লে ভাবে, এই বুঝি মরলাম! ওখানেও যে বাঁচা সম্ভব, বিশ্বাসই করতে চায় না।
ওর গলা শুকিয়ে খসখসে সিরিশ কাগজ হয়ে গেছে। পেট যেন শূন্য একটা ড্রাম। তন্দ্রা নামল চোখে। স্বপ্নে দেখল বৃষ্টি। চমকে জেগে গেল সে। তাকাল আকাশের দিকে।
মেঘশূন্য আকাশ। বড়বড় একেকটা উজ্জ্বল তারা যেন খুদে খুদে সূর্য, কিশোরের মনে হল ওগুলোর তাপ এসে লাগছে তার গায়ে। ছায়াপথটাকে দেখে মনে হচ্ছে লম্বা পথের ওপর ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে কাচের গুঁড়ো।
এরকম রাত বিকিনিতেও কাটিয়েছে। রাতের বেলা ছোট জীবের হুটোপুটি শুনেছে ঝোপের ভেতরে। এখানে এই মৃত্যুদ্বীপে ওরকম কিছু নেই, একেবারে নীরব, শুধু দেয়ালে আছড়ে পড়া ঢেউয়ের বিচিত্র গুমরানি ছাড়া। বাতাসে ভেসে আসছে মৃত্যুর গন্ধ, দ্বীপের ওপাশ থেকে, পচা হাঙরের।
আবার অস্থির ঘুম নামল কিশোরের চোখে।