১৪. মিরিনার হাত ধরে টানতে টানতে

0 Comments

মিরিনার হাত ধরে টানতে টানতে দরজার দিকে ছুটল কিশোর। রবিন আর মুসাকে একথা জানানো দরকার।

আহ, ছাড় না! হ্যাঁচকা টান দিয়ে হাতটা ছাড়িয়ে নিল মিরিনা। এই পোশাকে কনভেনশন ফ্লোরে যেতে পারব না আমি। কেউ আমাকে চিনে ফেলতে পারে। আর তাহলে আম্মা আমার…

ছাল ছাড়াবে, কথাটা শেষ করে দিল কিশোর। হাতে সিল না থাকাটা এমন কি জরুরি?

অনেক জরুরি। এতে প্রমাণ হয়, কাজটা করেছে ভেতরের কোন লোক। তুমি, আমি, দোকানদার, যে-ই ঢুকি না কেন, প্রবেশ মূল্য দিতে হয়, হাতে সিল মেরে নিতে হয়। নইলে দরজায় আটকে দেয় দারোয়ান। কিন্তু যে লোকটা বোমা ফেলল তার হাতে সিল না থাকলেও ঢুকতে পারল। কি করে? কেন তাকে আটকাল না দারোয়ান? একটাই কারণ, ও এখানকার লোক।

হুঁ, বুঝলাম, দ্বিধা করছে মিরিনা। লবিতে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রয়েছে এলিভেটর ব্যাংকের দিকে। দেখ, এই কেসে তোমাদের আমি সাহায্য করতে চাই, যদি সম্ভব হয়। এখন ত আর আমাকে এড়াতে পারবে না, জড়িত হয়ে গেছি। ওপরে গিয়ে পোশাক বদলে আসি। ম্যাড় ডিকসনের দােকানের সামনে থেক, দেখা হবে।

তোমার সাথে আসব?

হাসল মিরিনা। দরকার নেই। এখন আর এলিভেটরে কিছু হবে বলে মনে হয় না। একাই যেতে পারব।

মেইন কনফারেন্স রুমের দিকে রওনা হলো কিশোর। কয়েকবার দেখা হয়েছে, ইতিমধ্যে তাকে চিনে ফেলেছে দারোয়ান, তার পরেও হাতের সিল না দেখে ছাড়ল না। ভিড়ের ভেতর দিয়ে সোজা ডিকসনের স্টলের দিকে এগোল সে। ওটার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে রবিন আর মুসা।

ওকে দেখেই বলে উঠল মুসা, কয়েক যুগ তো লাগল আসতে। লোরা স্টারগার্ল তোমাকে আরেক গ্যালাক্সিতে নিয়ে গিয়েছিল নাকি?

রবিন রসিকতা করল না। কিশোরের চেহারা দেখেই অনুমান করে ফেলেছে কিছু হয়েছে। কি ব্যাপার? ভুরু কোঁচকাল সে। ওখানেও রহস্য পেলে?

একটা সূত্র পেলাম, কিশোর বলল। শুনলে তোমাদেরও চোখ কপালে উঠবে। আইজাক হুফারের দেখা পেলে?

আমাকে কি দরকার? পেছন থেকে বলে উঠল হুফার। সময় মত এসে গেছি, তাই না? হাসল সে। এইমাত্র এলাম। একটা উৎসবের আয়োজন করব ভাবছি। জ্যাকেটের পকেটে চাপড় দিয়ে বলল, একটা কন্ট্রাক্ট আছে এখানে। নতুন একটা কমিকের জন্যে চুক্তি করে এলাম।

কে ছাপছে? সব কথাই কানে গেছে ডিকসনের।

হ্যাঁরিস ডিমলার। এ শহরেই আছেন। কনভেনশনে যোগ দিতে এসেছেন। দেখা হয়ে গেল। আমাকে নিয়ে গেলেন ঘরে। আলাপ-আলোচনা করে পছন্দ হলো, কাজ করতে রাজি হয়ে গেলাম। মীটিং থেকে চলে গিয়েছিলাম সে জন্যেই।

কাল ডাকাতির সময় কি সেখানেই ছিলেন? জিজ্ঞেস করল কিশোর।

মাথা ঝাকাল হুফার। হ্যাঁ। ওখান থেকে এসে কনভেনশন ফ্লোরে ঢুকে দেখি ধোঁয়া।

আপনার নতুন চুক্তির কথা কেউ জানে?

কেউ না। বকবক করে সবাইকে জানিয়ে দিয়ে মেজর মেহ্যামের বারোটা বাজাতে চাই না এখনই।

মেজর মেহ্যাম? ডিকসনের গোফ কাঁপছে। কি ধরনের হিরো হবে? মুষ্টিযোদ্ধা? ইনটেলিজেন্ট এজেন্ট? মারসেনারি? নাকি স্পেসম্যান?

তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল হুফার। একটা কপি কিনে নিজেই পড়ে দেখবেন। আগে থেকেই বলতে যাব কেন? কিশোরের দিকে তাকাল সে। চুক্তির কথা কেউ জানে কি-না, এ প্রশ্ন করলে কেন?

কণ্ঠস্বর খাদে নামিয়ে কিশোর বলল, আপনার কি ক্ষতি করেছে, জানি আমি। সে কথাই ভাবছি- হবিগুলো নষ্ট করল, হামলা চালাল… যে করেছে, সে জানেই না, যে এখানে থাকার একটা জোরাল কারণ আছে আপনার।

সামনে ঝুকল রবিন। কিশোর, কেবল জটিল করে তুলছ সব কিছু। দয়া করে একটু সহজ করো। এমন ভাবে বলছ, যেন কেউ হুফারকে তাড়াতে চাই এখান থেকে।

ঠিক, তা-ই বলছি। হুফারের দিকে তাকাল কিশোর। এই চুক্তি না হলে কি এখনও এখানে থাকতেন আপনি?

না। এমনকি সেদিন বক্তৃতাও দিতাম না। আমি বুঝতে পেরেছি, ঘটনা কোনভাবে আঁচ করে ফেলেছে বোরাম, তাই তাকে আরেকটু খুঁচিয়ে  দিতে চেয়েছি। কিন্তু তুমি বললে…

কেউ জানে না আপনার চুক্তির কথা, কিশোর বলল। তাহলে মিস্টার ডিমলারের ওপরও হামলা চলত। বিরক্ত করা হত তাঁকেও। আঘাতটা শুধু আপনার ওপরই হয়েছে, হুফার। আমার বিশ্বাস এর সঙ্গে ফ্যান ফান চুরির ব্যাপারটার কোন সম্পর্ক আছে। থাকতেই হবে!

ভিকসনের দিকে তাকাল কিশোর। অটোগ্রাফের কথা জিজ্ঞেস করছেন না কেন?

অটোগ্রাফ? সতর্ক হয়ে উঠলেন হুফার। কোন কিছুতে সই করতে বলবেন তো…

সই করে দিয়েছেন, এমন কিছুর কথাই বলব, ডিকসন বললেন।

যদি হুফার করে থাকেন আরকি, মাঝখান থেকে বলল কিশোর।

মানে? হুফারের চোখে সংশয়।

আমি দেখেছি, আপনি ক্রিমসন ফ্যান্টমে সই করেননি। পুড়িয়ে ফেলতেও দেখেছি। আপনার হিরোয়িক কমিক আমলের কোন কিছুতেই সই আপনি আর করতে চান না।

ও, সবই দেখেছ তাহলে। কোন কিছুই চোখ এড়ায় না। খেপামি ভাবতেই পার। তবে কেন এই খেপামি করি কারণটা জানলে আর ওরকম ভাববে না। হিরোয়িক কমিক, বিশেষ করে নীল বোরাম আমার সর্বনাশ করে দিয়েছে।

জানি আমরা, কিশোর বলল। এডগার ডুফার সবই বলেছে আমাদের।

পকেটে দুই হাত ঢুকিয়ে দিল আটিস্ট। তার মানে কোন কথাই আর গোপন থাকে না। যা-ই হোক, বুঝতেই পারছ কেন আর আমি ওদের প্রকাশিত কোন কিছুতে সই করি না। আমি সই দিয়ে ওদের ব্যবসা কেন বাড়াব?

সব সময় তো ওদের ওপর খাপ্পা ছিলেন না, ডিকসন বললেন। সে সময় নিশ্চয় সই করতেন।

হেসে উঠল হুফার। সে সময় এত কাজ আমাকে দিত হিরোয়িক কমিক, করতে করতেই জানা বেরোত, সম্মেলনে যোগ দেয়ার আর সময় পেতাম না। সই করব কি?

তার আগে? ফ্যান ফানের আমলে?

গ্রে ফ্যান্টমের কথা বলছেন? মাথা নাড়ল হুফার, না, তখনও দিইনি। এতটা বিখ্যাত হইনি তখনও যে লোকে আমার অটোগ্রাফ চাইতে আসবে।

যা-ই হোক, আপনি নিশ্চয় কথাটা ভুলে গেছেন। একআধটা সই করেই থাকতে পারেন। কাউকে উপহার দেয়া কোন কপিতেঃ মাকে দিতে পারেন, বোনকে দিতে পারেন, বন্ধুকে…কিংবা যেখানে কাজ করতেন সেখানকার কাউকে…

মনে করতে পারছি না। ভুরু কোঁচকাল হুফার। কেন? এটা নিয়ে এত প্রশ্ন কেন?

আপনার সই দেয়া ফ্যান ফানের একটা কপি ছিল আমার কাছে, জোর দিয়ে বললেন ডিকসন।

থাকতেই পারে না, ঠিক একই রকম জোর দিয়ে বলল হুফার। আমি ফ্যান ফানের কোন কপিতে সই করিনি।

দেখুন, আপনার নামটাই ছিল। স্পষ্ট পড়া যায়। যে পৃষ্ঠা থেকে গল্প শুরু হয়েছে…

চোখের পাতা সরু হয়ে এল হুফারের। দেখলে বুঝতে পারতাম।

তা আর পারবেন না। কপিটা চুরি হয়ে গেছে। ডিকসনের দিকে তাকাল হুফার। সইটা দেখতে কেমন, বলতে পারবেন? এখন আমার সই অনেক বদলে গেছে, তখনকার সঙ্গে মিলবে না। ইদানীংকার কোন সই থেকে জাল করতে গেলে ধরা পড়ে যাবে, অন্তত আমি দেখলে বুঝে ফেলব। আমি সই করিনি ওরকম কোন কপিতে, এটা বলতে পারি। মনে থাকতই…

হয়তো মনে করতে চান না এটার কথা। আমি শিওর হচ্ছি, তার কারণ, যে লোকটা ওই কপি আমার কাছে বিক্রি করেছে, সে আপনার সই ভালমতই চেনে।

কে লোকটা? জানতে চাইল মুসা।

নীল বোরাম।

চোখে অবিশ্বাস নিয়ে ডিকসনের দিকে তাকাল তিন গোয়েন্দা।

ওই শয়তানটা! ফেটে পড়ল হুফার। তার কপিতে দেব আমি সই!

দিতেই পারেন। একটা সময় তো বন্ধুত্ব ছিল আপনাদের। যখন একসঙ্গে কাজ করতেন, ডিকসন বললেন।

কোন কালেই ওর সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব ছিল না, তিক্ত কণ্ঠে বলল হুফার। ওটা একটা ধাড়ি শয়তান, আর আমি ছিলাম অল্পবয়েসী, তার তুলনায় কচি খোকা, যাকে ঠকানোর সুযোগ পেয়েছিল সে। আমাকেই বরং একটা অটোগ্রাফ দিয়েছিল একবার। হিরোয়িক কমিক ছাড়ার পর সেটা পুড়িয়ে ফেলেছি।

তাহলে বইটা পেলেন কোথায় বোরাম? রবিনের প্রশ্ন।

নীল-সোনালি রঙের ঝিলিক তুলে এই সময় সেখানে এসে হাজির হলো মিরিনা।

কিছু মিস করলাম না তো?

না, কিশোর বলল, সময়মতই এসেছ। আলাপটা সবে গরম হলো। নীল বোরামের কথা বলছি আমরা।

ওই হারামজাদার মুখে একটা ঘুসি মারতে পারলে এখন খুশি হতাম আমি! মুঠো তুলে ঝাঁকাল হুফার।

পারলে মারুনগে, আমি আপনাকে আটকাব না, ডিকসন বললেন। লোকটা আপনাকে যদি ঠকিয়েই থাকে, রাগ হবেই। হাজার হোক, আপনারটা ভাঙিয়ে তো আর কম খাচ্ছে না। একটা খবর নিশ্চয় জানেন, পুরানো জনপ্রিয় কমিকগুলো আবার ক্ল্যাসিক হিসেবে ছাপছে হিরোয়িক কমিক।

তার মানে, মুসা বলল। আমরা যেগুলো পড়তাম, সেগুলোই রিপ্রিন্ট করছে?

হ্যাঁ। ক্রিমসন ফ্যান্টম ক্ল্যাসিক খুব চড়া দামে বিক্রি হবে। ব্যাপারটা ডিকসনেরও পছন্দ নয়। এতে আসল বইগুলোর দাম অনেক কমে যাবে। যেগুলো আগে প্রকাশিত হয়েছিল। আমার কাছে অনেক আছে, যেখানে যা পেয়েছি কিনে ফেলেছি। লস দিতে হবে আমাকে।

বোরামের কাছে ফ্যান ফান বিক্রি করেননি কি এই রাগেই? জিজ্ঞেস করল কিশোর।

হ্যাঁ, তিক্ত হাসি ফুটল ডিকসনের ঠোঁটে। অনেক দিন ধরেই কেনার জন্যে আমার পেছনে লেগে ছিল সে। দিইনি।

নীল বোরামের সঙ্গে কথা বলা দরকার, বলল কিশোর। দেখি, তাঁর কি বলার আছে?

হিরোয়িক কমিকের এলাকায় পৌঁছল ওরা। আরেকটা প্রেস কনফারেন্স দিতে তৈরি হচ্ছে কোম্পানি। মিরিনার দিকে তাকিয়ে হাসলেন বোরাম। পেছনে কারা আসছে, দেখেই হাসিটা মুছে গেল মুখ থেকে।

হুফার! জোর করে পাতলা একটা হাসি দিলেন বোরাম। অভিযোগ করতে এসেছ তো আমার নামে? গালাগাল করবে?

না, জবাবটা দিল কিশোর। কয়েকটা কথা জিজ্ঞেস করতে এসেছি। আপনি যে বইটা কিনতে চেয়েছিলেন ডিকসনের দোকান থেকে, সেটার ব্যাপারে। মনে আছে নিশ্চয়? ফ্যান ফানের কপি। সংগ্রাহকের জিনিস।

কি বলছ বুঝতে পারছি না! টাকের চামড়া লাল হয়ে যাচ্ছে সম্পাদকের। চোখে অস্বস্তি। বার বার তাকাচ্ছেন ডিকসনের দিকে।

ফ্যান ফান নাম্বার ওয়ানের কপিটা, যেটা সেদিন কিনতে চেয়েছিলেন, মনে করিয়ে দেয়ার ভঙ্গিতে বলল কিশোর। মিস্টার ডিকসন বললেন, আপনিই নাকি তাঁর কাছে ওটা বিক্রি করেছিলেন।

তাতে কি? সম্পাদকের গালে দুটো লাল রক্তবিন্দু জমল। এটা কোন অভিযোগ নয়। কমিক আমি বিক্রি করেই থাকতে পারি। ওটাই আমার ব্যবসা। কিশোরের দিকে সরাসরি তাকালেন তিনি। নাকি চোর ভাবছ আমাকেই?

আরে না না, কি যে বলেন, তাড়াতাড়ি বলল কিশোর। বোমা যখন ফাটল, তখন আপনি ছিলেন ডুফারের সঙ্গে, গোন্ড রুমের বাইরে। আমরা কেবল জানতে এলাম, কপিটার জন্যে এত আগ্রহ কেন আপনার?

শুনতে চাও? আরও বেশি দামের অফার পেয়েছিলাম আমি কপিটার জন্যে। লাভের এই সুযোগ ছাড়ব কেন? তাই কিনতে গিয়েছিলাম। অন্যায় হয়েছে?

তা হয়নি। মিস্টার ডিকসন যা চাইলেন, তা দিয়েই আনলেন না কেন তাহলে? লাভ তো হতই।

না, হত না। দাম বাড়াতে বাড়াতে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল, বেচে লাভ হত না। তাই আর কিনিনি।

কে কিনতে চেয়েছিল? জিজ্ঞেস করল মুসা।

ঠোঁটে জিভ বুলিয়ে ভিজিয়ে নিলেন বোরাম।

চাইলেও এখন আর লোকটার কাছে কপিটা বিক্রি করতে পারছেন না, মিস্টার বোরাম, রবিন বলল।

সে পাট ঘুচে গেছে। কাজেই এখন বলতে আর অসুবিধে কি?

সুমাতো কমিক, ফাঁদে আটকা পড়েছেন যেন বোরাম, ভাবভঙ্গিতে সে রকমই লাগছে।

বইটা পেলেন কোথায়? হুফার জানতে চাইল। আমি তো দিইনি।

হাল ছেড়ে দিলেন বোরাম। বুঝলেন, মিথ্যে বলে সুবিধে হবে না আর। বললেন, সুমাতোর কাছ থেকেই নিয়েছিলাম।

কিশোর বলল, মিটার বোরামকে আর বিরক্ত করার দরকার নেই। চলো।

সারি বেঁধে স্টলটার কাছ থেকে সরে এল ওরা সবাই।

ভেরি, ভেরি ইনটারেসটিং, কিশোর বলল, ঘরের ইঁদুরেই বেড়া কেটেছে। একটা কোম্পানি, যে কমিকটা বিক্রি করেছে, হঠাৎ করে তারাই আবার ফেরত চাইছে ওটা। অবশেষে জোড়া লাগতে আরম্ভ করেছে এক এক করে। আর মাত্র কয়েকটা প্রশ্নের জবাব, তাহলেই আমাদের চোরটাকে ধরে ফেলতে পারব। রহস্যময় কণ্ঠে বলল সে। আমি এখন জানি, কোথায় খুঁজতে হবে তাকে।

Categories: