১৫. কাক-ভোরের ফ্যাকাসে আলোয়

0 Comments

কাক-ভোরের ফ্যাকাসে আলোয় ঘুম ভাঙল তার। পিঠে আর শরীরের এখানে ওখানে ব্যথা। চোখা প্রবালের খোঁচা যেখানে যেখানে লেগেছে সবখানে। বাতাস খুব ঠাণ্ডা, পরিস্কার। ঘুমানর আগে যতটা ক্ষুধা আর তৃষ্ণা ছিল, ততটা নেই। খারাপ লক্ষণ। তারমানে দেহের যন্ত্রপাতিগুলো অবশ হয়ে আসছে।

তবে তাজা বাতাস নতুন উদ্দীপনা সঞ্চার করল তার মধ্যে। যেভাবেই হোক, যে-কোন উপায়েই হোক, এই মৃত্যুদ্বীপকে পরাজিত করবে ওরা, সেই সাথে পরাজিত করবে ডেংগু পারভিকে। মনে পড়ল একটা কবিতার দুটো চরণঃ

দি মরনিংস ডিউ পার্লড,
অলস রাইট উইথ দ্য ওয়ার্ল্ড।

খুশি মনে উঠে সৈকতে চলল সে। দেখার জন্যে, তার শিশির-ধরা-ফাঁদে কতখানি শিশির আটকা পড়েছে।

পানি জমেছে মালার অর্ধেকের কম। আরও বেশি পড়বে আশা করেছিল সে। শিশির বোধহয় হালকা ছিল। যাকগে, যা পড়েছে তাই লাভ। অতি মূল্যবান তরলটুকু নিয়ে ক্যাম্পে ফিরল সে।

কুমালো নড়াচড়া করছে। চোখ মেলে তাকাচ্ছে ও, তবে কেমন যেন হতবুদ্ধি একটা ভাব। তার মাথাটা তুলে ধরে অর্ধেকটা পানি গলায় ঢেলে দিল কিশোর। বাকি অর্ধেক মুসার হাতে দিয়ে বলল, তোমরা দুজনে ভাগাভাগি করে খেয়ে ফেল।

হাই তুলতে তুলতে উঠে বসেছে রবিন।

মালাটা মুসার হাতে ধরিয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়াল কিশোর। চলে এল মরা হাঙরটার কাছে। চামড়া ছিলতে শুরু করল। আর খামিক পরেই উঠবে মারাত্মক রোদ, তার আগেই যদি একটা ছাউনির ব্যবস্থা করা যায়, বেঁচে যাবে।

মালার তলায় জমা পানিটুকুর দিকে তাকিয়ে আছে মুসা। মুখ বাড়িয়ে রবিনও দেখল। চোখে চোখে কথা হয়ে গেল দুজনের। ওই দুই চুমুক পানিই এখন ওদের কাছে লক্ষ টাকার চেয়ে দামি। মুসা ভাবছে কুমালোর কথা, রবিনও।

গোঙাচ্ছে কুমালো। বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে কপালে। রোদ ওঠার আগেই যদি এই অবস্থা হয়, উঠলে পরে কি হবে? পানি খেল না মুসা। রবিনের দিকে বাড়িয়ে ধরল। মাথা নাড়ল রবিন। হাসল দুজনেই। কুমালোর মাথাটা উঁচু করে বাকি পানিটুকু তার মুখে ঢেলে দিল মুসা।

কিশোরকে সাহায্য করতে চলল দুই সহকারী গোয়েন্দা।

চামড়া পুরোপুরি ছাড়ার আগেই উঠল লাল সূর্য, দিগন্তে উঁকি দিয়েই যেন আগুন ছড়াতে শুরু করল।

চামড়া ছাড়ানো শেষ হল অবশেষে। বিশ ফুট লম্বা আট ফুট চওড়া বেশ চমৎকার একটা টুকরো। ভেতরের দিকে লেগে থাকা মাংসের টুকরোগুলো সযতে, সাফ করে ফেলল ওরা। চামড়াটা টান টান করে মাটিতে বিছিয়ে দেখল কাজ কেমন হয়েছে।

ভাল বুদ্ধি বের করেছিলে, রবিন, কিশোর বলল।

ঘর তো বানায় বললে মাছের চামড়া দিয়ে, মুসা বলল রবিনকে। কি করে বানায়? সাইবেরিয়ায় বললে, না?

হ্যাঁ। মাছ-তাতার বলে ওদেরকে। মাছ খায়, মাছের চামড়া দিয়ে জুতা আর পোশাক বানায়, ঘর বানায়। মাটিতে খুঁটি গেড়ে তার ওপর চামড়া ছড়িয়ে দেয়। যদি দেখতে যাও, বহুদূর থেকেই ওদের গ্রামের গন্ধ নাকে আসবে তোমার।

জানি, কি বলতে চাইছ, নাক কুঁচকাল মুসা।

হাঙরের চামড়ার অবশ্য এতটা গন্ধ বেরোবে না, কিশোর বলল। রোদে শুকিয়ে যাবার পর। তবে মাছটার গন্ধ আর সইতে পারছি না। এটাকে গড়িয়ে নামিয়ে দিতে পারলে হয়। জোয়ারে ভেসে চলে যাবে।

প্রচণ্ড পরিশ্রমের পর ভারি লাশটাকে পানির কিনারে নিয়ে যেতে পারল ওরা।

মাংসের পাহাড়, পচা দেহটার দিকে তাকিয়ে বলল মুসা।

অথচ এমনি কপাল আমাদের, একটা টুকরো মুখে দিতে পারব না।

বেশি পচে গেছে, কিশোর বলল। খেলে পেটে অসুখ করে মরবে।

সুতরাং, সাগরের নাস্তার আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করে বিষাক্ত খাবারের দিকে পিঠ ফেরাল ওরা। হাঙরের চামড়াটা টানতে টানতে নিয়ে ফিরে এল ক্যাম্পে।

ঘর বানানয় মনোযোগ দিল ওরা। কি করে বানানো যায়? পেরেক নেই, বল্ট নেই, স্কু নেই, নেই কড়িকাঠ, তক্তা, খুঁটি। ঘর বানাতে যা যা জিনিস প্রয়োজন, তার কোনটাই নেই।

শুধু আছে একটা চামড়া, মুসা বলল। চালা বানানো যাবে। দেয়াল হবে কি দিয়ে? পাথর জড়ো করব?

প্রথমে দরকার লগি, বলল কিশোর। আর গোটা দুই খুঁটি। ওই নারকেলের কাণ্ডটা দিয়ে লগির কাজ চলবে।

আরেকটা কাণ্ড কেটেই তো দুটো খুঁটি বানানো যাবে, রবিন বলল। কিংবা আরও এক কাজ করা যায়। নারকেলের অনেক কাণ্ড দাঁড়িয়ে আছে। পাশাপাশি দুটোকে পালা হিসেবে ব্যবহার করতে পারি।

নারকেল কাণ্ডের অভাব নেই। আট ফুট উঁচু দুটো কাণ্ড বেছে নিল ওরা, একটা থেকে আরেকটার দূরত্ব বারো ফুট। ছুরি দিয়ে ওগুলোর মাথায় গভীর খাঁজ কাটল। তার পর ফেঁড়ে যাওয়া আরেকটা কাণ্ডকে কেটে এনে তুলে দিল ওই দুটোর ওপর, কড়িকাঠ হয়ে গেল।

বাবা, দারুণ চালা, মুসা বলল। তাবু হয়ে গেল একেবারে।

হ্যাঁ, মাথা ঝাঁকাল রবিন। অনেক পলিনেশিয়ানই এরকম কুঁড়েতে থাকে। দ্বীপে থাকার সময় জাপানীরাও হরদম বানাত।

কড়িকাঠের ওপর চামড়াটা ঝুলিয়ে দিল ওরা, দড়িতে চাদর ঝোলানর মত করে। দশ ফুট করে হল একেকদিকে। এরপর দেয়াল তৈরির পালা। প্রবালের চ্যাপ্টা টুকরো এনে একটার ওপর আরেকটা রেখে দুই পাশে চার ফুট উঁচু দুটো দেয়াল তুলল। চামড়ার দুই প্রান্ত বিছিয়ে দিল ওগুলোর ওপর। তার ওপর আরও পাথর রেখে আটকে দিল, যাতে ছুটতে না পারে। ব্যস, হয়ে গেল ঢালু ছাউনি। রোদ তো আটকাবেই, বৃষ্টি হলেও গড়িয়ে পড়ে যাবে ঢাল বেয়ে।

পাথর দিয়ে অন্য দুপাশের দেয়ালও তুলে দিল ওরা। চারটে বড় বড় ফোকর রাখল, ওগুলো দরজা।

শেষ হল ঘর তৈরি। এমন কুঁড়ে আর কেউ কখনও দেখেছে কিনা সন্দেহ। মুসার দৃঢ় বিশ্বাস, মাছ-তাতারেরাও দেখেনি এই জিনিস।

কুমালোকে ঘরের ভেতর নিয়ে আসা হল। শোয়ানো হল প্রবালের মেঝেতে সব চেয়ে কম খসখসে জায়গায়। নিঃশ্বাস ফেলা দেখেই বোঝা গেল অন্ধকার। ঠাণ্ডায় এসে আরাম লাগছে তার। তিন ফুট চওড়া প্রবালের দেয়াল পুরোপুরি ঠেকিয়ে দিয়েছে রোদ। চালাটাও চমৎকার, অন্তত নারকেল পাতার ছাউনি আর ক্যানভাসের চেয়ে ভাল। কুঁড়ে কিছুটা নিচু হয়ে গেল, তবে একদিক দিয়ে সেটা বরং ভালই, ঝড়ের সময় বাতাসে উড়িয়ে নেয়ার সম্ভাবনা কম।

লম্বা হয়েছে যথেষ্ট। চারজনের জন্যে বেশ বড়। গা ঘেঁষাঘেঁষি করে থাকতে হবে না।

বৃষ্টির দিনে রান্নাও করতে পারব এর ভেতর, কিশোর বলল।

যদি বৃষ্টি হয়, বলল মুসা। রান্না করার মত কিছু পাওয়া যায়। আর যদি আগুন জ্বালাতে পারি।

ঠোঁটে চিমটি কাটল একবার কিশোর। এইসব যদির সমাধান করতে হবে আমাদের। বৃষ্টি ঝরাতে পারব না, কাজেই পানি জোগাড়ের অন্য ব্যবস্থা করতে হবে। হয়ে যাবে। ভাবতে হবে আর কি। গুইজি লতা থেকে পানি পাওয়া যায়, কিন্তু এই দ্বীপে ওই গাছ নেই। ব্যারেল ক্যাকটাসে পানি পাওয়া যায়, এখানে তাও নেই।প্যানডানাসের খোঁজ করলে কেমন হয়? এখানকার মত খারাপ জায়গায়ও জন্মায় ওগুলো। পানি থাকে ওতে। চল, খুঁজে দেখি।

খুব উৎসাহের সঙ্গে রওনা হল ওরা, যদিও জানে, প্যানভানাস পাওয়ার আশা তেমন নেই।

একটা পাথর তুলে মুসার হাতে দিতে দিতে কিশোর বলল, এটা চোষ। লালা গড়াতে থাকবে। মনে হবে পানি খাচ্ছ।

বাকি দিনটা খুঁজে বেড়াল ওরা। প্যানডানাসও পেল না, পানি আছে ওরকম কিছুই না। চাঁদের পিঠের মতই মরা যেন এই দ্বীপ।

সেরাতে আবার শিশির ধরা ফাঁদ পাতল কিশোর। কিন্তু পাতার খানিক পরেই এল জোরাল বাতাস, বাষ্প জমতেই পারল না। সকালে শূন্য পাওয়া গেল মালাটা। এমনকি রোগীর জন্যেও এক ফোঁটা পানি মিলল না।

কুমালোর বিহ্বল ভাব কেটে গেছে। ফলে পায়ের অসহ্য ব্যথা টের পাচ্ছে। প্রচণ্ড পিপাসা। তবে জ্বর চলে গেছে। গাল আর কপালে হাত দিলে এখন আগের মত গরম লাগে না। তার সঙ্গে পানির সমস্যা নিয়ে আলোচনা করল কিশোর। পানির জন্যে কি কি করেছে, সব জানাল। তারপর বলল, তুমি নিশ্চয় কোন উপায় বাতলাতে পারবে?

না, কুমালো বলল। এর বেশি আমিও কিছু করতে পারতাম না। ওই পিগউইড খুঁজে বের করা, তারপর মালা পেতে শিশির ধরা…।

জীবনে এতটা বোকা মনে হয়নি নিজেকে, বিড়বিড় করল কিশোর। অসহায়…

কিশোরের বিধ্বস্ত চেহারার দিকে তাকাল কুমালো। দুশ্চিন্তা কাবু করে ফেলেছে তোমাকে। একটা কথা বললে শুনবে?

কী?

সাঁতার কাটতে চলে যাও তোমরা। আমার দেশের লোকের বিশ্বাস, কোন ব্যাপার যখন খুব জটিল হয়ে যায়, কিছুতেই কিনারা না হয়, ওটার দিক থেকে তখন মুখ ফিরিয়ে নেয়া উচিত। গিয়ে খেলাধুলা করা উচিত কিছুক্ষণ। এতে শরীরের অস্থিরতা কমে, চিন্তার ক্ষমতা বাড়ে।

বেশ, ডাক্তার কুমালো, তুমি যখন বলছ, যাচ্ছি, শুকনো হাসল কিশোর।

তবে আমার মনে হয় সময়ই নষ্ট হবে অযথা।

আমার কাছে পরামর্শটা ভালই লাগছে, মুসা বলল। বাতাস আছে। পানিও বেশ ঠাণ্ডা। আরামই লাগবে।

রবিন কিছু বলল না। তবে কিশোর আর মুসা উঠতেই সে-ও পিছে পিছে চলল।

সাগরের কিনারে চলে এল ওরা। ল্যাগুনের চেয়ে এদিকটায় ঠাণ্ডা বেশি। ঝাঁপিয়ে পড়ল ঢেউয়ের ওপর। ধীরে ধীরে ঢালু হয়ে যায়নি দেয়ালটা, সৈকত নেই, একবারেই ঝপ করে নেমে গেছে গভীর পানিতে। তিনটে সীল মাছের মত খেলতে শুরু করল ওরা। ডুব দিচ্ছে, সাঁতার কাটছে, দাপাদাপি করছে। কচুপাতার পানির মত পিছলৈ ধুয়ে চলে গেল যেন তাদের সমস্ত উদ্বেগ।

ধরতে পারবে না আমাকে, মুসাকে চ্যালেঞ্জ করল কিশোর।

পারলে কি দেবে?

এই দ্বীপটা।

এই মরা দ্বীপ কে নেয়? তবু আমি ধরছি তোমাকে। কয়েক গজও যেতে পারল না কিশোর, তার আগেই তাকে ধরে ফেলল মুসা। ভেসে উঠে হাসতে হাসতে বলল, কি, রবিন মিয়া, তুমি চ্যালেঞ্জ করবে নাকি?

মাথা নাড়ল রবিন, না বাবা, পারব না, খামোকা মুখ খরচ করে লাভ নেই।

ডুব দাও,মুসাকে বলল কিশোর। আমি ধরব।

পারবে না জানে, তবু মুসার দ্রুত নেমে যাওয়া ছায়াটাকে লক্ষ্য করে ডুবে চলল কিশোর।

বিশ ফুট মত নেমে থামল মুসা। দেয়ালের ধার ধরে ডুব-সাঁতার দিয়ে চল। তার পিছে তেড়ে এল কিশোর।

দেয়ালের বোতলের মুখের মত জায়গাটায় এসে, যেখানে চওড়া হতে আরম্ভ করেছে দেয়াল, হঠাৎ মুখে ঠাণ্ডা পানি লাগল মুসার। বেশি ঠাণ্ডা।

মনে হল, ঠাণ্ডা পানির একটা ডুবো-প্রবাহ দেয়ালের গা থেকে বেরিয়ে এসে সাগরে পড়ছে। সামনে এগোতেই আবার গরম পানিতে পড়ল সে।

ঠাণ্ডা পানি কিশোরের শরীরেও লাগল। সঙ্গে সঙ্গে ভেসে উঠতে শুরু করল সে। দম প্রায় ফুরিয়ে এসেছে মুসার, সে-ও উঠতে লাগল।

রবিন দেখল, ভুস জুস করে ভেসে উঠল দুটো মাথা। সাঁতরে কাছে আসতে লাগল সে।

ঝাড়া দিয়ে চুল আর মুখ থেকে পানি ফেলে কিশোর বলল, মুসা, কিছু টের পেয়েছি। ঠাণ্ডা পানি। মনে হল দ্বীপের ভেতর থেকেই আসছে।

এর মানে বুঝতে পারছ?

না তো!

এর মানে পরিষ্কার পানি! বাজি ধরে বলতে পারি আমি।

ধরলে হারবে, আরকি।

কাছে চলে এল রবিন। জিজ্ঞেস করল, কি হয়েছে। তাকে বলল কিশোর। শুনে তার সঙ্গে একমত হল রবিন। নিশ্চয় মিষ্টি পানি! ইস, একটা বোতল পেলে হত! চল, ডুব দিয়ে হাঁ করে মুখে নিই।

ডুব দিল কিশোর। ঠাণ্ডা পানিতে মাথা ঢুকতেই স্রোতের দিকে ফিরে মুখ হাঁ করল। সঙ্গে সঙ্গে মুখে ঢুকল পানি। পরিষ্কার, মিষ্টি! গিলে নিয়ে আবার হাঁ করল। আবার গিলে আবার হাঁ। পানি মুখে নিয়ে ভেসে উঠল ওপরে। তার পাশে ভাসল মুসা।

রবিইন, চেঁচিয়ে উঠল গোয়েন্দা সহকারী। সত্যি মিষ্টি!

খুশিতে দাঁত বেরিয়ে পড়ল কিশোরের। বলল, যাক, অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে। রবিন, মুসার সঙ্গে গিয়ে তুমিও খেয়ে এস।

ওরা দুজনে আবার ভাসলে বলল কিশোর, তোমরা এখানে থাক। নিশানা রাখ। আমি গিয়ে মালাটা নিয়ে আসি।

দশ মিনিটের মধ্যেই নারকেলের মালা নিয়ে ফিরে এল সে।  কিন্তু মুখ তো নেই, মুসা বলল। ডোবালেই নোনা পানিতে ভরে যাবে। মিষ্টি পানি ভরবে কিভাবে?

পরা যাবে, বলল রবিন। কায়দা আছে।

হ্যাঁ, বলে ডুব দিল কিশোর। নোনা পানিতে ভরে গল মালা। ঠাণ্ডা পানিতে পৌঁছে মালাটা উপুড় করল সে। ভেতরে হাত ঢুকিয়ে পাম্প করার মত কয়েকবার ওপরে নিচে করল আঙুলগুলো। চাপ লেগে বেরিয়ে গেল নোনাপানি, আর ঢুকতে পারল না, কারণ মিষ্টি পানির চেয়ে ভারি। সেই জায়গা দখল করল মিষ্টি পানি। মালাটাকে কয়েকবার ওপরে-নিচে করে, পানি ঢুকিয়ে, বের করে নিশ্চিত হয়ে নিল। সে, যে আর এক ফোঁটা নোনা পানিও নেই। তারপর মালা ভর্তি মিষ্টি পানি নিয়ে, মালার মুখ হাত দিয়ে চেপে ধরে ভেসে উঠতে শুরু করল ওপরে।

দেয়ালের ওপরে উঠে পা দোলাচ্ছে রবিন। পাশে বসে আছে মুসা। হাত বাড়িয়ে মালাটা নিল কিশোরের হাত থেকে। ঠোঁটে লাগাতে গেল। বাধা দিল কিশোর, না না, আর খেয়ো না। দুতিন দিনের শুকনো পেট, বেশি সইতে পারবে না। যা খেয়েছ খেয়েছ। আবার পরে। এটা কুমালোর জন্যে নিয়ে যাই।

পানির নিচের ঝর্না থেকে কুমালোর জন্যে পানি নিয়ে এল ছেলেরা। দেখে, পানি এসে গেল আহত রোগীর চোখে। দুহাতে মালাটা ধরে একচুমুক খেয়ে নামিয়ে রাখল পাশে, ধরে রাখল যাতে গড়িয়ে না পড়ে যায়। বলল, জীবনে আর কোন জিনিস এত মজা লাগেনি।

যাক, দুটো দরকারি জিনিস পাওয়া গেল, বলল কিশোর। ঘর এবং পানি। কিন্তু পেট বলছে খাবার ছাড়া আর বেশিক্ষণ থাকতে পারবে না।

গুঙিয়ে উঠল মুসা, ঠিক বলেছ! আহারে, দুদিন ধরে যে কি কষ্টে রয়েছে বেচারা, পেটে হাত বোলাল সে।

হেসে উঠল সবাই।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে কুমালো বলল, এসব কাজ আমারই করার কথা। অথচ আমি একটা মরা কাঠ হয়ে পড়ে আছি এখানে, তোমরা কষ্ট করে মরছ।

হাত নাড়ল কিশোর। বাদ দাও এসব কথা।

হ্যাঁ, তোমারও এখন খাবার দরকার, মুসা বলল। আমাদের চেয়ে বেশি দরকার তোমার। কিশোর, দেরি করে লাভ কি? চল, যাই।

পানি খেয়ে শরীর কিছুটা ঠাণ্ডা হয়েছে। ছাউনির ছায়া ছেড়ে রোদে বেরোতে ইচ্ছে হচ্ছে না কিশোরের। কিন্তু বসে থাকলে চলবে না।

রবিন বলল, খোঁজাখুঁজি তো দুদিন ধরেই করলাম। কিছু থাকলে চোখে পড়ত না? কি পাওয়া যাবে এই হতচ্ছাড়া দ্বীপে?

একটা ব্যাপার চোখ এড়িয়ে গেছে তোমাদের, কুমালো বলল। একটা ভাল লক্ষণ। ওই পাখিটা, গাংচিল। রয়ে গেছে দ্বীপে। খাবার না থাকলে কিছুতেই থাকত না।

প্রথমে আমিও তাই ভেবেছি, কুমালো, কিশোর বলল। শুনে নিরাশ হবে হয়ত। চলে গেছে ওটা। কাল রাতে।

দীর্ঘ একটা নীরব মুহূর্ত, কেউ কথা বলল না। প্রচণ্ড হতাশা যেন চেপে ধরেছে সবাইকে। পানি শক্তি জুগিয়েছে বটে, অন্য দিকে পেটকেও চাঙা করেছে। খাবার চাইছে এখন ওটা।

হঠাৎ লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল কিলোর। বলল, এভাবে বসে থাকলে কিছুই হত না। পানি আর ঘর তো পেয়েছি। খাবারও পাব। ওঠ, এস তোমরা। প্রমাণ করে দেব, পাখি ব্যাটা ভুল করেছে।

Categories: