ক্ষুধা তীক্ষ্ণ করে দিয়েছে ওদের চোখ। মিহি দাঁতের চিরুনি দিয়ে উকুন বাছার মত করে দ্বীপটায় খুঁজতে লাগল খাবার। অতি ছোট বস্তুও এখন চোখ এড়াবে না।
ওল্টানো যায় এরকম আলগা পাথর যে কটা পেল, সব উল্টে উল্টে দেখল তলায় কি আছে। প্রায় চষে ফেলল বালির সৈকত।
কিন্তু নিরাশ হতে হল।
তিন ঘন্টা খোঁজার পর ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ল মুসা। শেষে একটা নারকেলের, কাণ্ডে মাথা রেখে একেবারে শুয়েই পড়ল। একটা আঙুল নাড়তে ইচ্ছে করছে না আর।
খুব মৃদু একটা শব্দ কানে এল, নড়াচড়ার। মনে হল কাটার ভেতরে। কিশোর আর রবিনকে ডাকল সে। কাছে এলে কিশোরকে বলল, কান রেখে দেখ।…কিছু শুনছ?।
কান ঠেকিয়ে রেখেই বলল কিশোর, ভেতরে জ্যান্ত কিছু আছে। ছুরি দিয়ে কেটে বের করা যাবে।
কাটা কাটতে শুরু করল ওরা। পচে নরম হয়ে গেছে। ভেতরের জিনিস দেখে মুখ বিকৃত করে ফেলল রবিন। মোটা মোটা শুয়ালোকার মত কতগুলো জীব।
পোকা! কিশোর বলল। সাদা গোবরেপোকার শুককীট। মুসা, ভর পকেটে। আর আছে কিনা দেখি।
খাবে ওগুলো! রবিনের প্রশ্ন।
প্রাণ তো বাঁচাতে হবে, জবাব দিল কিশোর। নাক টিপে ধরে তেতো ওষুধ খায় না রোগী?
মোট চোদ্দটা পোকা পেল ওরা। সেগুলো দেখাতে নিয়ে গেল কমালোকে।
বিষাক্ত? সন্দেহের চোখে পোকাগুলোর দিকে তাকাচ্ছে রবিন।
মোটেই না, মাথা নাড়ল কুমালো। ভিটামিনে ভরা।
রাঁধা যায় না?
যায়। আগুন তো নেই, রোদে ঝলসেই কাজটা সেরে নিতে হবে। অন্ধকারে থাকে এগুলো, শরীর খুব নরম। গরম পাথরে রেখে রোদে দাও, সেদ্ধ হয়ে যাবে।
ঘিনঘিনে লাগলেও ঝলসানো পুঁয়াপোকার স্বাদ খুব একটা খারাপ লাগল না ছেলেদের কাছে। দুই দিনের খিদে পেটে, যা খাবে এখন তাই ভাল লাগার কথা!
এগুলো যেখানে পেয়েছ, কুমালো বলল। সেখানে উইপোকাও থাকতে পারে। পচা কাঠে বাসা বানায় ওরা।
কুমানোর অনুমান সত্যি। ওই কাণ্ডটারই আরেক প্রান্তে একটা উইয়ের বাসা খুঁজে পেল ছেলেরা। এই পোকার আরেক নাম সাদা পিপড়ে। বেশ মোটা, নরম। রোদ সইতে পারে না। তাড়াহুড়ো করে গাছের ভেতরের সুড়ঙ্গে ঢুকে বাঁচতে চাইল। কিন্তু যেতে দেয়া হল না। রবিনও হাত লাগাল এখন। পোকাগুলোকে বের করে করে রাখল গরম পাথরে। চোখের পলকে কুঁকড়ে, মরে গেল ওগুলো। ধীরে ধীরে সেদ্ধ হল।
আবার কিছু খাওয়া জুটল অভিযাত্রীদের।
হেসে বলল মুসা, বাড়ি গিয়ে মাকে যদি বলি শুঁয়াপোকা আর উই বেঁধে দাও, কি করবে আল্লাই জানে।
আবার খুঁজল ওরা। আর কিছু বেরোল না।
সূর্য ডোবার আগে ডুব দিয়ে গিয়ে পানি তুলে আনল মুসা। মনে হল, আগের মত জোর আর নেই স্রোতের। কিশোরকে জানাল সেকথা।
নিশ্চয় বৃষ্টি, আন্দাজ করল গোয়েন্দাপ্রধান। কয়েক দিন আগে ঝড়ের সময় যে বৃষ্টি পড়েছিল, সেটাই মাটির তলায় জমা হয়েছিল, ফাঁক দিয়ে বেরোতে শুরু করেছে। পানি কমে আসছে, তাই স্রোতের জোরও কমছে। আবার বৃষ্টি না হলে শেষ হয়ে যাবে একসময়। মনে মনে উদ্বিগ্ন হলেও আশঙ্কার কথা কাউকে জানাল, না সে।
পানিতে মাছ নিশ্চয় আছে, কিশোর বলল। ধরি কিভাবে?
জোর আলোচনা চলল। মাছ ধরা যায় কি উপায়ে? সুতো নেই, বড়শি নেই, ছিপ নেই, টোপ নেই, জাল নেই, বর্শা নেই। কি দিয়ে ধরবে?
কুমালো সুস্থ স্বাভাবিক থাকলে একটা জবাব বের করা যেত। কিন্তু রোগে ভুগে ভীষণ ক্লান্ত সে, ঘুমোচ্ছে। সমস্যাটা নিয়ে প্রায় ধস্তাধস্তি শুরু করে দিল তিন গোয়েন্দা। হাই তুলল মুসা। ঘুম পেয়েছে।
একটা ফাদ বানানো যায়, কিশোর প্রস্তাব দিল। অবশ্য যদি একটা বাক্স বা ঝুড়িটুড়ি পাওয়া যায়। কিন্তু নেই, আবার হাই তুলল মুসা, হাত চাপা দিল মুখে। কাজেই ফাঁদ তৈরি হচ্ছে না। আর কোন উপায়ও নেই…
নিশ্চয় আছে! চেঁচিয়ে বলে, একলাফে উঠে কুঁড়ে থেকে বেরিয়ে গেল কিশোর। রবিনও বেরোল। ঘুমজড়িত চোখে তাদের পিছু নিল মুসা, কি করে কিশোর দেখার জন্যে কৌতূহল হচ্ছে।
সূর্য ডুবে গেছে। যাই যাই করে এখনও রয়ে গেছে গোধূলির কিছু আলো। সাগরের পারে এসে পাথর জড়ো করতে শুরু করল কিশোর।
দয়া করে বলবে, কি করছ? আর থাকতে না পেরে জিজ্ঞেস করল মুসা।
ফাঁদ তৈরি করছি, পাথরের ফাঁদ। এটাই উপযুক্ত সময়, জোয়ার এখন সবে আসতে শুরু করেছে। পাথর গায়ে গায়ে লাগিয়ে একটা গোল দেয়াল তৈরি করব। জোয়ারে ডুবে যাবে ওটা। যখন পানি নেমে যাবে, হয়ত একআধটা মাছ আটকে থাকতেও পারে ওর ভেতর।
খাইছে। ঠিকই তো বলেছ! তুড়ি বাজাল মুসা। ঘুম দূর হয়ে গেছে। কিশোর আর রবিনের সঙ্গে সে-ও দেয়াল তৈরিতে হাত লাগাল। দেয়ালটা ছড়িয়ে নিয়ে গেল পানি পর্যন্ত, যাতে জোয়ার চলে যাওয়ার পরেও তাতে চিকচিকে পানি থাকে।
শেষ হল দেয়াল। তিন ফুট উঁচু, বিশ ফুট চওড়া।
হিসেব করে বের করল কিশোর, মাঝরাতের দিকে ডুবে যাবে দেয়াল, ভোরে সূর্য ওঠার আগে আবার বেরিয়ে আসবে। ভেতরে পানি থাকবে তখনও।
পরদিন সকালে রোদের বর্শাগুলো যখন সবে ছড়াতে শুরু করেছে সূর্য, দুএকটা ঢুকে পড়েছে মাছের চামড়ার তাঁবুতে, ঘুম ভাঙল মুসার। শুয়াপোকা আর উই হজম করে ফেলেছে পেট, নতুন খাবার চাইছে। কিশোর আর রবিনকে ডাকল, এই ওঠ ওঠ! আলসে হয়ে গেছে সব। চল, গিয়ে দেখি কি মাছ পড়ল।
ফাঁদের তলায় নেমে গেছে পানি। অল্প পানিতে ছোটাছুটি করছে কয়েকটা বিচিত্র ছোট জীব, বেরোনর পথ খুঁজছে। খুব সুন্দর একটা মাছ দেখা গেল, গায়ের রঙ সবুজে সোনালিতে মেশানো, তার ওপর লাল আর নীলের হালকা ভোরা। তিনজনেই চিনতে পারল ওটাকে, অ্যাঞ্জেল ফিশ। আরও দুটো মাছ আছে, অ্যাঞ্জেলের মত এত সুন্দর নয়, তবে খেতে চমৎকার। একটা বাচ্চা ব্যারাকুড়া, আরেকটা মুলেট। বিষাক্ত একটা স্করপিয়ন ফিশও আছে। ওটার কাছেও গেল না তিন গোয়েন্দা। পানিতেই রইল ওটা। পরের বার জোয়ার এলে বেরিয়ে যেতে পারবে, যদি ততোক্ষণ বেঁচে থাকে।
মোচার মত দেখতে একটা তারা মাছ দেখে ধরতে গেল মুসা, থামাল রবিন। খবরদার! মারাত্মক বিষ ওগুলোর কাঁটায়। হাতে ফুটলে প্রথমে হাত ফুলে যাবে। তারপর ফুলবে শরীর। শেষে হৃৎপিণ্ড থেমে গিয়ে মারা যাবে।
সরে এল মুসা। তারা মাছের ধারেকাছে গেল না আর।
খাবার উপযোগী মাছগুলো ধরে নিয়ে মহানন্দে ঘরে ফিরল তিন গোয়েন্দা। ওগুলো দেখে কুমালোও খুশি হল।
কাঁচাই খেতে হবে, সে বলল। খারাপ লাগবে না। তবে বেঁধে নিতে পারলে ভাল হত। কিন্তু কি করব? গায়ে তো জোর নেই, মলে আগুন জ্বালাতে পারতাম।
দেখি, আমি চেষ্টা করে, বলল কিশোর। তবে বিশেষ ভরসা পেল না। আমাজনের জঙ্গলে ভাসমান দ্বীপে আগুন জ্বালাতে গিয়ে বুঝেছে কাজটা কত কঠিন।
প্রথমেই দরকার শুকনো খড়কুটো। সেটা জোগাড় করা যাবে, নারকেলের কাণ্ড থেকে। ভেতরের কিছু ছোবড়া কেটে নিলেই হবে। তারপর লাগবে কাঠের গুঁড়ো। আর শক্ত শক্ত কয়েকটা কাঠি।
ছোবড়া জোগাড় হল। গুড়োও পাওয়া গেল বাকল চেঁছে। বাকি রইল কাঠি।
কাঠি লাগবে, কিশোর বলল। শক্ত এবং হালকা।
আগের দিন সৈকতে একটা গাছের ডাল পড়ে থাকতে দেখেছিল রবিন। ঢেউয়ে ভেসে এসে আটকা পড়েছে। ছুটে গিয়ে কাঠি কেটে নিয়ে এল সে।
বেশ হালকা কাঠি। খটখটে শুকনো। কিভাবে কি করবে? মুসা জানতে চাইল।
সোজা একটা কাঠিকে সুন্দর করে কেটে ঘোট করল কিশোর। এক মাথা, চোখা করল। বাকলের একটা টুকরো কেটে মাঝখানে ছোট একটা গোল খাঁজ করল। তারমধ্যে রাখল বাকলের গুড়ো। চারপাশে ছড়িয়ে দিল ছোবড়া। তারপর ছোট কাঠির চোখা মাথাটা খাঁজে রেখে দুহাতের তালুতে চেপে ধরে ডলতে শুরু করল, ডাল ঘুটনি দিয়ে ডাল ঘোটা হয় যেভাবে।
দ্রুত থেকে দ্রুততর হল হাত। হাতের জোর ঠিক রাখতে হবে, বাড়াতে হবে গতি, তাহলেই কেবল আসবে সাফল্য। টপ টপ করে ঘাম ঝরতে লাগল তার কপাল থেকে। বাকলের খাঁজটাকে গভীর করে বসে যাচ্ছে কাঠির চোখা মাথা। চারপাশে ছিটকে পড়ছে বাকলের গুড়ো।
আরও জোরে ডলতে লাগল কিশোর। ধোঁয়া বেরোতে শুরু করল ছোবড়া থেকে। তারপর দপ করে জ্বলে উঠল আগুনের একটা শিখা।
পেটের ওপর ভর দিয়ে শুয়ে পড়েছে মুসা। মুখ নামিয়ে আস্তে আস্তে ফু দিল। আগুনে। তার ওপর আরও কিছু ছোড়া আর শুকনোবার্কলের কুটো রাখল মুসা। উজ্জ্বল হয়ে জ্বলতে লাগল আগুন।
কাঠিটা সরিয়ে এনেছে কিশোর। হউফ! করে জোরে নিঃশ্বাস ফেলে হাতের। উল্টো পিঠ দিয়ে ঘাম মুছল কপালের। বলল, ইস, এভাবে কষ্ট করে আগুন ধরানো..ম্যাচ থাকলে কত সহজ হত।
দ্রুত মাছগুলোর চামড়া পরিষ্কার করে টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলল ওরা। লম্বা লম্বা কাঠিতে গেঁথে ধরল আগুনের ওপর।
মাছের কাবাব দিয়ে চমৎকার নাস্তা হল সেদিন। কিছুই অবশিষ্ট রাখল না। কাঁটায় লেগে থাকা, মাংসগুলো পর্যন্ত চেটেপুটে সাফ করে ফেলল। সেই সঙ্গে রয়েছে ডুবো ঝর্নার মিষ্টি পানি। আয়েশ করে ঢেকুর তুলল সবাই। ভুলে গেল। প্রথম তিন দিনের আতঙ্ককর পরিস্থিতির কথা। মৃত্যুদ্বীপকে জয় করেছে ওরা।
আশা করা যাচ্ছে, রবিন বলল। ডেংগু আসাতক বেঁচে থাকতে পারব আমরা। একটা কাঠিতে ছুরি দিয়ে গোল গোল খাজ কাটছে সে, তিনটা কেটে ফেলেছে, আরেকটা কাটছে।
কি করছ? মুসা জিজ্ঞেস করল।
দিনের হিসেব রাখছি। কাঠিটা যেরকম লম্বা, তাতে চোদ্দটা খাজ কাটা যাবে। আমার বিশ্বাস, ততদিনে মোটর বোটটাকে দেখতে পাব। ইস, কি যে আনন্দের দিন হবে সেদিনটা!
রবিন, কিশোর বলল। কয়েকটা কথা বলার সময় এসেছে। তোমাদের জানিয়ে রাখা উচিত মনে করছি। একদিন খুব ঝামেলা গেছে, দুশ্চিন্তায় ছিলাম, আরও বেশি চিন্তায় পড়ে যাবে বলে বলিনি। ডেংগুর আশা ছাড়তে হবে আমাদের। দ্বীপ থেকে বেরোতে হলে ভেলা তৈরি করতে হবে।
রবিন, মুসা, কুমালো, তিনজনেই অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে কিশোরের দিকে।
ভেলা? মুসা বলল। ভেলা কি দরকার? বোটই যখন পাব?
না, বোট আসছে না, ভুল রীডিং লিখে ডেংগুকে কিভাবে ফাঁকি দিয়েছে, খুলে বলল কিশোর। কাজেই বুঝতেই পারছ, নিজের পায়ে কিভাবে কুড়োল মেরেছি।
তা মেরেছ, মাথা দোলাল মুসা।
না, ঠিকই করেছ তুমি, কুমালো বলল। এছাড়া আর কি করতে পারতে? তুমি তো আর জানতে না এখানে এনে আমাদেরকে আটকাৰে ডেংগু। তুমি করেছ, যাতে মুক্তা চুরি করতে না পারে সে। প্রফেসরের সম্পদ রক্ষা করেছ। এটা তোমার দায়িত্ব ছিল। আর এত ভাবনার কিছু নেই। খাবার আর পানি যখন পাওয়া গেছে, বেরিয়েও যেতে পারব আমরা। ভেলা বানাতে পারবে। নারকেলের অনেক কাণ্ড আছে।
কিন্তু শুধু কাণ্ড দিয়েই হবে না, রবিন বল। বাধব কি দিয়ে ওগুলোকে? পেরেক নেই, স্কু, বন্টু, দড়ি কিচ্ছু নেই। কুমালোর জবাবের জন্যে অপেক্ষা করল
সে। তাছাড়া আসল কাজই এখনও বাকি রয়ে গেছে, যে জন্যে আমরা এলাম এখানে, আটকা পড়লাম। মুক্তো ভোলা। কিছু নমুনা নিয়ে গিয়ে তাঁকে দেখাতে হবে। মুক্তো তোলার জন্যে এত নিচে ডুব দেবে কে? তুমি তো অসুস্থ।
কাজটা আমাদেরকেই করতে হবে আরকি, কিশোর বলল।
হাঁ হয়ে গেল রবিন। ষাট ফুট! তিরিশের বেশি আমি পারব না। পঁয়তাল্লিশের বেশি মুসাও পারবে কিনা সন্দেহ।
হাসল মুসা। ওর এই হাসির অর্থ বুঝল কিশোর। ব্যাপারটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে ফেলেছে গোয়েন্দা সহকারী। আর একবার যখন নিয়েছে, সহজে ক্ষান্ত হবে না।
খানিক পরেই তাঁবু থেকে বেরিয়ে গেল মুসা। পিছে পিছে রওনা হল কিশোর আর রবিন।
ল্যাগুনের পাড়ে এসে কাপড় খুলে পানিতে নামল মুসা। ডাইভিং প্র্যাকটিস শুরু করল।
ডুব দিয়ে নেমে গেল অনেক নিচে। কিছুক্ষণ পর ভেসে উঠে ফোঁস্স্ করে বাতাস ছাড়ল মুখ দিয়ে।
দম নেয়ার পর বলল, তিরিশ ফুটের বেশি নেমেছি। পানি খালি ঠেলে রাখে। পায়ে দুটো লোহার জুতো পরতে পারলে কাজ হত। টেনে নামাত।
বিকেলে দোকান থেকে এনে দেবখন, হেসে বলল রবিন। আপাতত একটা পাথর দিয়ে কাজ চালাও।
হ্যাঁ, তাই করতে হবে।
একটা পাথর বেছে নিল মুসা, তার মাথার দ্বিগুণ। ওটা দুহাতে ধরে মাথা নিচু করে ডুব দিল। ভারের কারণে প্রথমে বেশ দ্রুত নেমে চলল, আস্তে আস্তে কমে এল গতি। কিন্তু তলায় নামতে পারল। এক হাতে পাথরটাকে বুকের সঙ্গে আঁকড়ে ধরে আরেক হাতে একটা ঝিনুক তুলে নিল। তারপর ছেড়ে দিল পাথরটা। সঙ্গে সঙ্গে তীরবেগে তাকে ঠেলে তুলতে লাগল পানি।
বিশাল বাদামী ঝিনুকটা তীরে ছুঁড়ে মারল সে।
পানির তলায় বেশিক্ষণ থাকেনি, বিশ সেকেণ্ড। ফলে পানির চাপ তেমন প্রতিক্রিয়া করল না শরীরে।
বাপরে বাপ, পিষে মেরে ফেলতে চায়! শ্বাস নিতে নিতে বলল সে। এভাবে একটা একটা করে ঝিনুক তুলতে হলে এক মুক্তা পেতেই এক বচ্ছর লাগবে।
একটা ঝুড়ি হলে…। কিশোরের কথায় বাধা দিল মুসা, কোথায় পাবে?
জানি না। চল, কুমালোকে জিজ্ঞেস করি।
কুমালোকে সমস্যাটার কথা বলতে পড়ে থাকা নারকেল কাণ্ডের মাথার দিকে তাকাল সে। বলল, নারকেল গাছের মাথায় শক্ত আঁশে তৈরি এক ধরনের জাল থাকে। চেষ্টা করলে ওগুলো দিয়ে একটা থলে বানানো যায়।
দূর! বলে মাথা নাড়ল মুসা।
তবে নারকেলের জাল বা কাপড় পাওয়া গেল। গাছের মাথার কাছে ডালের গোড়ায় জড়িয়ে থাকে এই জাল। বেশ শক্ত। ডালের গোড়ার ফুটখানেক ওপর থেকে ডালপাতা সব মুড়িয়ে নিয়ে গেছে ঝড়। তবে গোড়া যেটুকু আছে, তাতে পাওয়া গেল ওই জাল। ছুরি দিয়ে কয়েক টুকরো কেটে নিয়ে ওই জালের সুতো দিয়েই সেলাই করে থলে তৈরি হয়ে গেল।
আচ্ছা, এই জিনিস দিয়ে কাপড় হয় না? রবিন বলল।
হয়ত হয়, আনমনে বলল কিশোর চামড়ায় ঘষা লাগবে। আরাম পাব না। তবে দিনের বেলা গায়ে দিয়ে রাখলে রোদ বাঁচবে কিছুটা।
কড়া রোদ সাদা প্রবালে প্রতিফলিত হয়ে এসে গায়ে লেগে চামড়ায় যেন ছ্যাকা দেয়। ফোঁসকা পড়ে যাওয়ার অবস্থা।
নারকেলের কাপড় দিয়ে শার্ট, কিংবা বলা ভাল গায়ের কিশোর। গায়ে দিয়ে দেখল, ভালই, রোদ অনেকখানি ঠেকায়।
সানগ্লাস দরকার আমার, মুসা বলল। চোখের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে রোদ। এভাবে রোদের দিকে সারাক্ষণ চেয়ে থাকতে হলে অন্ধ হয়ে যাব।
ঠিকই বলেছে ও। এসব ছায়াশূন্য দ্বীপে আটকা পড়া অনেক নাবিকই অন্ধ হয়ে গেছে রোদের কারণে।
জালের বুনন কোথাও মোটা, কোথাও মিহি। ওরকম মিহি কাপড়ের ফালি কেটে চোখে বেঁধে নিল সে। খুদে ফাঁক দিয়ে তাকাল। আরে! কাজ হচ্ছে। রোদ আর ততটা লাগে না চোখে। যদিও দেখা যায় কম। তাতে কি? কাজ চললেই হল।
যাক, আরামই লাগছে, কিশোর বলল।
তা তো লাগছে, বলল মুসা। কিন্তু আমাকেও কি তোমার মতই কিত লাগছে?
হ্যাঁ, লাগছে, হেসে বলল রবিন। একেবারে নারকেল গাছের ভূত। হাসতে শুরু করল তিনজনেই।
চল, কুমালোকে দেখাই, প্রস্তাব দিল মুসা।
পা টিপে টিপে ঘরে ঢুকল ওরা। তবু সামান্য শব্দ হয়ে গেল। তন্দ্রায় দুলছিল কুমালো, হঠাৎ জেগে তিনটে কিম্ভুত মুখোশ পরা মূর্তিকে দেখে চমকে চিৎকার করে উঠল। তারপর চিনতে পারল ওদেরকে। কাপড়, চশমা, আর থলের প্রশংসা করল।
কি জানি, মাথা চুলকাল সে। সন্দেহ হচ্ছে, তোমাদের গায়েও পলিনেশিয়ান রক্ত বইছে কিনা। নইলে এভাবে নকল কর কিভাবে? যা-ই পাচ্ছ, ঠিক কাজে লাগিয়ে ফেলছ।
খুশি হয়ে আবার উপসাগরের ধারে ফিরে এল ওরা। কুমালোর প্রশংসা অনেক উৎসাহ জোগাল ওদের।
এখন, পলিনেশিয়ানদের মত ডুব দিতে পারলেই হয়, বলল কিশোর। তাহলে কিছু মুক্তো তুলতে পারব।
কিন্তু কাজটা মোটেই সহজ নয়। পাথর নিয়ে কয়েকবার চেষ্টা করে দেখল কিশোর, তলায় পৌঁছতে পারল না। তবে প্রতিবারেই আগের চেয়ে বেশি নিচে নামতে পারছে। বুঝল, আস্তে আস্তে অভ্যাস হয়ে যাবে। পুরো ব্যাপারটাই অভ্যাসের।
ব্যাগ কোমরে বেঁধে নিচে নেমে গেল মুসা। ঝিনুক কুড়িয়ে থলেতে ভরে উঠে আসার সময় খেয়াল করল, ভারি হয়ে গেছে। টেনে রাখছে নিচের দিকে। বেশি, জোরাজুরি করলে থলে ফেটে সব পড়ে যাওয়ারও ভয় রয়েছে। শেষে মাত্র তিনটে ঝিনুক নিয়ে উঠে আসতে হল তাকে।
আসলে একটা দাড়ি দরকার আমাদের, মুসা বলল। ব্যাগ বেঁধে দেব। টেনে তোলা যাবে।
ঠিকই বলেছ, একমত হল কিশোর। ভেলা তৈরির জন্যেও দড়ি দরকার। কিন্তু এই পাথরের রাজ্যে পাই কোথায়?
দড়ি খুঁজে অনেকটা সময় কাটাল ওরা। কুমালোর কাছে জেনেছে, ছোবড়া দিয়ে দড়ি তৈরি করে পলিনেশিয়ানরা। কিন্তু পেয়েছে মাত্র একটা নারকেল, ওটা দিয়ে আর কত লম্বা দড়ি হবে।
লিয়ান লতা দিয়ে দড়ির কাজ চালানো যায়। কিন্তু এই দ্বীপে তেমন কোন লতাই নেই।
আমাজানের জঙ্গলে ওরা দেখেছে, বোয়া সাপের চামড়া দিয়ে দড়ি বানায় ওখানকার জংলীরা। অ্যানকোণ্ডা সাপের চামড়া দিয়েও হয়। কিন্তু প্রবাল অ্যাটলে সাপ থাকে না, না ছোট, না বড়। সাগরের সাপ অবশ্য আছে, তবে এই ল্যাগুনে একটাও দেখতে পেল না ওরা।
দড়ি না পেলেও খাবার পেল। একটা শসা নিয়ে ঘরে ফিরল বিকেলে।
কুমালো চমকে যাবে, হাসতে হাসতে বলল মুসা। কে ভাবতে পেরেছিল প্রবালের বাগানে শসা পেয়ে যাব?
এই বিশেষ শসাটা কোন সজি নয়, কোন বাগানেও জননি। এটা একটা জলজ প্রাণী, নাম সী কিউকামবার বা সাগরের শসা। চীনাদের খুব প্রিয় খাবার।
ল্যাগুনের প্রবালের একটা তাকে ওটাকে পড়ে থাকতে দেখেছে ছেলেরা। বিশাল এক শসার মতই দেখতে, গায়ে শসার মতই শুয়া রয়েছে, চামড়ায় চাকা চাকা দাগ। বেশ মোটা, আর ফুটখানেক লম্বা। তবে পানির ওপরে তোলার পর চুপসে অর্ধেক হয়ে গেল।
এই জীবটাও বিষ ছড়াতে পারে, সেই বিষ চোখে লাগলে অন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। কাজেই ছুরি দিয়ে গেঁথে সাবধানে তুলেছে ওটাকে মুসা। রেখে দিয়েছে গরম পাথরের ওপর। মরে যাওয়ার পর ক্যাম্পে এনেছে।
কুমালোর নির্দেশ মত লম্বালম্বি চিরে পাঁচটা ফালি করল ওটাকে কিশোর। ঝলসে নিল আগুনে। চেহারাটা কুৎসিত, কিন্তু খেতে চমৎকার লাগল সাগর-শসার মাংস।