১৭. ঝটকা দিয়ে খুলে গেল গোল্ড রুমের দরজা

0 Comments

ঝটকা দিয়ে খুলে গেল গোল্ড রুমের দরজা। নাছোড়বান্দা কিছু কমিকের ভক্তের ওপর ছড়িয়ে পড়ল আলো। টেরই পেল না ওরা। গভীর ঘুমে অচেতন। যারা জেগে রয়েছে তারা তাকিয়ে রয়েছে পর্দার দিকে। আলো পড়তেই চিৎকার করে উঠল দুচারজন, এই, বন্ধ করো! দরজা বন্ধ কর!

পর্দায় তখন মাকম্যানের রাজা গুঙের সঙ্গে মরিয়া হয়ে লড়ছে এক অ্যাসটারয়েড।

দর্শকদের আপত্তির পরোয়াই করল না দরজায় দাঁড়ানো লম্বা মানুষটা। সোজা এগোল প্রোজেকটরের দিকে। যাওয়ার সময় ঘষা লাগল পিটারের গায়ে। টেবিলে রাখা ক্যানভাসের ব্যাগটা ধরে টান দিল নিজের দিকে। একপাশে সরে গেল প্রোজেকটর, আলো অর্ধেক পড়ছে এখন পর্দায়, বাকি অর্ধেক বাইরে।

দর্শকরা দেখতে পাচ্ছে রে গান বের করছে রক, কিন্তু যার উদ্দেশে বের করেছে, সেই শত্রুই গায়েব। আলো অর্ধেক সরে যাওয়ায় বাইরে পড়ে গেছে গুঙ।

অ্যাই, কি হলো? ছবির কি হলো? চিৎকার করে উঠল কয়েকজন দর্শক। এমনকি যারা ঘুমিয়ে ছিল তারাও জেগে উঠে চেঁচামেচি শুরু করল। লোকটা যখন টান দিয়ে প্রোজেকটরের নিচ থেকে ব্যাগটা বের করল, তখন চিৎকার চরমে উঠেছে। কারণ প্রোজেকটরের আলো তখন পর্দা থেকে এতটাই নিচে নেমে গেছে, রক আর গুঙের কেবল মাথাটা দেখা যাচ্ছে। রকের হেলমেট আর গুঙের মাথার অ্যান্টেনা এপাশ ওপাশ করছে প্রোজেকটরের আলো নড়ার সাথে সাথে।

চেঁচামেচিতে ছবির শব্দই শোনা যায় না। কয়েকজন ভক্ত চেঁচিয়ে উঠল যারা চিৎকার করছে তাদেরকে চুপ করানোর জন্যে। তাতে চিৎকার বাড়লই শুধু, কমল না।

সব চিৎকারকে ছাপিয়ে শোনা গেল আরেকটা তীক্ষ্ণ কর্কশ চিৎকার, অ্যাই, তোমরা চুপ করবে! কিছু তো শুনতে পাচ্ছি না!

নিঃশব্দে এগিয়ে এল ওরা সাতজন, ঘিরে ফেলল টেবিলের কাছে দাঁড়ানো মানুষটাকে। এই সাতজন হলো তিন গোয়েন্দা, ম্যাড ডিকসন, আইজাক হুফার, এডগার ডুফার আর মিরিনা জরডান। আবছা আলোতেও স্পষ্ট চেনা গেল লুই মরগানকে।

ব্যাগটা হাতে আঁকড়ে ধরে একটা মুহূর্ত চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন মরগান। তারপর শ্রাগ করে ব্যাগ থেকে বের করলেন ছোট একটা বল।

থামুন! চিৎকার করে উঠল কিশোর। কিন্তু ততক্ষণে বলটা মেঝেতে পড়ে গেছে।

ঘন ধোঁয়া উঠতে শুরু করল। চিৎকার করে বললেন মরগান, আগুন! আগুন!

আসল ভক্তরা কথাটা কানেই তুলল না। ছবি ঠিক করতে বলছে পিটারকে। ধোঁয়া বাড়ছে, তাতে ঠিক করা ক্রমেই মুশকিল হয়ে উঠছে। যারা একটু কম ভক্ত, তারা গোয়েন্দাদের দলকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দৌড় দিল দরজার দিকে। এই সুযোগটা কাজে লাগালেন মরগান। আক্রমণ করে বসলেন মিরিনাকে। ব্যাগ ঘুরিয়ে বাড়ি মারতে গেলেন।

বাড়ি লাগল না, ধাক্কায়ই টলে উঠে পিছিয়ে গেল মিরিনা। তার পাশ কাটিয়ে খোলা দরজার দিকে দৌড় দিলেন মরগান।

পড়ে যাচ্ছিল মিরিনা, কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে আটকাল কিশোর। চিৎকার করে বলল অন্যদেরকে, আসুন! জলদি!

দরজা দিয়ে দৌড়ে বেরোল ওরাও। হলের অর্ধেক পেরিয়ে গেছেন ততক্ষণে মরগান। সামনে কেউ পড়লে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিচ্ছেন। পিছু নিল তিন গোয়েন্দা। সামনে একটা ছেলেকে দেখে সোজা ঘুসি মেরে বসলেন মরগান, সরানর জন্যে। চরকির মত পাক খেয়ে দেয়ালের দিকে চলে গেল ছেলেটা।

লবিতে বেরোলেন মরগান। কোনদিকে না তাকিয়ে সোজা ছুটলেন, লোকজনকে ধাক্কা দিয়ে, কনুইয়ের গুঁতো মেরে সরিয়ে। সাধারণত যেদিক দিয়ে বেরোনর কথা-সামনের দরজা কিংবা এলিভেটরের দিকে না গিয়ে যাচ্ছেন অন্য দিকে।

বুঝে ফেলল কিশোর। সিড়ি! লোহার সিড়ির দিকে যাচ্ছেন তিনি!

আগে চলে গেল মুসা। দ্রুত কমে আসছে তার আর মরগানের মাঝের দূরত্ব। অবাক হয়ে হাঁ করে তাকিয়ে রয়েছে লোকে।

মোড়ের কাছে গিয়ে যেন ব্রেক কষলেন মরগান। পরক্ষণেই ঘুরে গেলেন সিড়ির দিকে। একটু পরেই দড়াম করে সিঁড়ির দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ শোনা গেল।

হ্যাঁঁচকা টানে দরজাটা খুলে ফেলল মুসা। ঢুকে পড়ল ভেতরে। পেছনে বিন্দুমাত্র গতি না কমিয়ে এসে ঢুকল কিশোর আর রবিন। সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করল।

মুসা, চেঁচিয়ে বলল কিশোর। সোজা তোমার গাড়িতে গিয়ে উঠবে। মরগানকে ধরার চেষ্টা কোরো না! আগের বার কিভাবে ওদের দৌড়ে পরাজিত করে দিয়েছিলেন কনভেনশন চীফ, মনে আছে তার।

পার্কিং গ্যারেজে নেমে এল ওরা। ওরাও নামল, মরগানও উঠে পড়লেন লাল একটা করভেট গাড়িতে।

ইমপালার দিকে দৌড় দিল তিন গোয়েন্দা। মুসা ইঞ্জিন স্টার্ট দিতে দিতে চলতে শুরু করল করভেট, ঘুরে রওনা হয়ে গেল একজিট র্যাম্পের দিকে। এক্সিলারেটরে পায়ের চাপ বাড়িয়ে গাড়িটার পিছু নিল মুসা।

খোলা রাস্তায় যদি চলে যায়, বলল সে। তাহলে আর ধরতে পারব না। ওর গাড়ির ধুলো খাওয়া ছাড়া তখন আর কিছুই করার থাকবে না আমাদের।

কিন্তু থামাবেই বা কি করে লোকটাকে? র্যাম্পে যেতে কোন বাধা নেই।

তারপর, হঠাৎ করেই কর্কশ আর্তনাদ করে উঠল টায়ার। দেখা গেল, একটা থামের আড়াল থেকে বেরোচ্ছে ম্যাড ডিকসনের সবুজ ভ্যান। মরগানের গাড়ির পথরোধ করতে ছুটল একচোখা সাইক্লপস।

গতি বাড়াল করভেট। শাঁই করে একপাশে কেটে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল সাইক্লপসকে। পুরোপুরি পারল না। ধ্রাম করে এসে ওটার পেছনের ডান ফেন্ডারে গুতো মারল সবুজ ভ্যান।

থামলেন না মরগান। গতিও কমালেন না। ভাঙা ফেন্ডার বিচিত্র শব্দ তুলছে।

কয়েক জায়গায় রঙ চটে গেল সাইক্লপসের। কেয়ারই করল না। তীক্ষ্ণ মোড় নিতে গিয়ে কাত হয়েই আবার সোজা হলো। দুলে উঠল একবার। থামল না। করভেটের লেজে লেগে রইল। কাছাকাছি চলে এল ইমপালা।

সেঞ্চরি বুলভারে বেরিয়েই গতি বাড়াল করভেট। যানবাহনের ভেতর দিয়ে পথ করে ছুটতে গিয়ে যেন মাতালের মত দুলছে। খানিক পর পরই কিইচ কিইচ করে প্রতিবাদ জানাচ্ছে টায়ার। রাস্তায় ঘষা লেগে জ্বলে যাচ্ছে। ডানের ফেন্ডারটা চেপে লেগে রয়েছে চাকার সঙ্গে, ক্ষতি করে চলেছে টায়ারের।

মুসার ভবিষ্যতবাণী ঠিক হয়নি। গতি বাড়িয়ে ওদেরকে ধুলো খাইয়ে সরে পড়তে পারেননি মরগান। গতি বাড়ালেই মাতাল হয়ে যায় গাড়ি, নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয় আছে এভাবে চললে। গতি কমাতে বাধ্য হচ্ছেন তিনি। আশা হলো তিন গোয়েন্দার। ধরার সুযোগ আছে।

করভেটের পেছনে লেগেই রয়েছেন ডিকসন। গালাগাল করছে অন্যান্য ড্রাইভাররা, সরতে বলছে, কানেই তুলছেন না তিনি। থ্রী লেনের দিকে ঘুরে গেল মুসা। সামনে দিয়ে গিয়ে করভেটকে আটকানোর চেষ্টা করল।

আরেকবার গতি বাড়ানোর চেষ্টা করলেন মরগান। আবার বাধা দিল আহত ফেন্ডার। পেছনের বাম্পারে গুতো মারল কয়েকবার সাইক্লপস।

সব রকমে চেষ্টা চালিয়েও করভেটকে থামাতে কিংবা রাস্তা থেকে সরাতে পারল না সাইক্লপস আর ইমপালা। কিছুতেই পাশ কাটিয়ে পেরোতে দিলেন না ওদেরকে মরগান। একবার বাঁ পাশে এগিয়ে প্রায় সমান সমান হয়ে গেল সাইক্লপস। ধা করে এসে ওটাকে বাড়ি মারল করভেট, কয়েক জায়গার রঙ তুলে দিল। তুবড়ে গেল বডির ওসব জায়গা। রাস্তায় এই কাণ্ড চলতে দেখে হতবাক হয়ে গেছে অনেক ড্রাইভার। জোরে জোরে হর্ন বাজাতে শুরু করেছে।

রবিন বলল, করভেট বেচারার স্যালভিজ ইয়ার্ডে যেতে আর দেরি নেই।

ভুল বলেনি সে। চমৎকার গাড়িটার করুণ চেহারা হয়েছে। দুই পাশে রঙ চটে গেছে অনেক জায়গায়, তুবড়ে গেছে শরীর। বাম্পারের একটা পাশ খুলে ঝুলছে, রাস্তায় ঘষা লেগে আগুনের ফুলকি ছিটাচ্ছে। বসে যাওয়া ফেন্ডারের চাপে একনাগাড়ে আর্তনাদ করে চলেছে চাকাটা।

ঘষা লেগে রাবার ক্ষয়ে গিয়ে পাতলা হয়ে এল টায়ার, আর সইতে পারল না। বিকট শব্দ করে ফাটল। পাগল হয়ে গেল যেন করভেট। হুঁশজ্ঞান সবকিছু হারিয়ে রাস্তার গাড়িগুলোকে গুঁতো মারার জন্যে ছুটে যেতে লাগল এদিক ওদিক। সবাই সরে যেতে চাইছে পাগলা গাড়ির নাকের সামনে থেকে। ব্রেক কষার ফলে একাধিক টায়ারের কর্কশ শব্দ হলো। হর্ন বাজল। রাগত চিৎকার শোনা গেল ড্রাইভারদের। অবশেষে গাড়িটাকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এলেন মরগান।

ডান পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল সাইক্লপস। বাঁ পাশে চেপে আসছে ইমপালা। কোণঠাসা করে ফেলল করভেটকে।

এখন আর কিছুই হারানোর নেই মরগানের। দুটো গাড়ির মাঝখান দিয়ে ভয়ানক ভাবে কাঁপতে কাঁপতে চলেছে তাঁর গাড়ি। থামলেন না এত কিছুর পরেও। দুই সারি গাড়িকে মাঝখান দিয়ে কেটে বেরিয়ে চলে যেতে চাইছেন ডানের রাস্তায়। কিন্তু যেতে দিলেন না ডিকসন।

করভেটের গায়ে প্রায় ঘষা লেগে বেরিয়ে গেল সাইক্লপস। সামনে গিয়ে পথ রোধ করে দাঁড়াল লাল গাড়িটার। থামতে বাধ্য হলেন মরগান। তবে সেটা মুহূর্তের জন্যে। পরক্ষণেই শাঁই শাঁই স্টিয়ারিং কেটে নাক ঘোরাতে শুরু করলেন গাড়ির।

ভ্যান থামতে না থামতেই ঝটকা দিয়ে খুলে গেল এক পাশের দরজা। লাফিয়ে রাস্তায় নামল মিরিনা। ভয় পাচ্ছে বোঝা যায়, তবে ছাড়তেও রাজি নয়। টান দিয়ে গা থেকে খুলে ফেলল আলখেল্লা বুলফাইটারদের লাল কাপড়ের মত করে ধরল। তাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল করভেট। সোজা ওটার ডান উইন্ডশীন্ডে আলখেল্লা ছুঁড়ে মারল সে।

সামনের কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না মরগান। মোড় নিতে ব্যর্থ হলেন তিনি। অন্ধের মত রাস্তা হাতড়ে বেড়াতে গিয়ে দড়াম করে লাইটপোস্টে গুতো লাগিয়ে বসল করভেট।

পুলিশ যখন হাজির হলো, দেখল, মরগানকে ঘিরে রেখেছে সাতজন লোক। বিধ্বস্ত চেহারা হয়েছে কনভেনশন চীফের, তবে জখম হয়নি কোথাও। হাতে ধরা রয়েছে তখনও ব্যাগটা, যেটাতে রয়েছে ডাকাতির মাল।

Categories: