১৭. সেরাতে দুঃস্বপ্ন দেখল মুসা

0 Comments

সেরাতে দুঃস্বপ্ন দেখল মুসা। ঘুমের মধ্যেই চেঁচাতে শুরু করল, ওরে বাবারে! কানা হয়ে গেলামরে! সাগর-শসার বিষ লেগেছে!

ঠেলা দিয়ে তাকে জাগাল কিশোর। এই মুসা, চেঁচানি থামাও। দুঃস্বপ্ন দেখছ।

আর ঘুম এল না মুসার। হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে এল ছাউনি থেকে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। দেখতে পাচ্ছে সবাই, তারমানে অন্ধ হয়নি। আসলেই দুঃস্বপ্ন ছিল ওটা।

কালো কালো মূর্তির মত তার চারপাশে দাঁড়িয়ে আছে নারকেলের কাণ্ডগুলো।

তারার ঘড়ি দেখে অনুমান করল, ভোর তিনটে বাজে। ল্যাগুনের শান্ত পানিতে সাদার্ন ক্রসের উজ্জ্বল প্রতিবিধ ঝিলমিল করছে।

ল্যাগুনের ধারে পায়চারি শুরু করল সে, উত্তেজনা কমানোর উদ্দেশ্যে। তারপর সরে এল সাগরের ধারে। সাগরও নীরব। ঢেউ নেই। জোয়ার নামছে।

অলস ভঙ্গিতে হেঁটে এগোল সে ফাঁদে কি পড়েছে দেখার জন্যে। কিনারে। এসে ভেতরে তাকাল। ভীষণ চমকে উঠল সে। জীবনে এরকম দৃশ্য দেখেনি। বিশাল দুটো চোখ তাকিয়ে রয়েছে তার দিকে।

বাসনের সমান বড় একেকটা। তার মনে হল, কোন জীবন্ত প্রাণী নয়, প্রাণীর ওরকম চোখ থাকতে পারে না। সত্যি সত্যি দেখছে, না সে এখনও ঘুমিয়েই রয়েছে? আরেকটা দুঃস্বপ্ন দেখছে।

কেমন যেন ভূতুড়ে সবুজ রঙ চোখগুলোর, জ্বলছে। মনে হয় কাচের ওপাশে বৈদ্যুতিক বাতি বসানো। ট্রাফিকের সিগন্যাল বাতি যেন বলছে যাও। যাওয়ার ইহেও হল মুসার। কিন্তু পা কথা শুনতে চাইছে না।

হঠাৎ প্রচণ্ড আলোড়ন উঠল পানিতে, বিরাট কিছু একটা রয়েছে। দুটো সবুজ গোলক ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে লাগল মুসার দিকে।

চিৎকার করে উঠল সে। তবু দৌড় দিতে পারল না। চোখ দুটো যেন সম্মােহিত করে ফেলেছে তাকে, মাটির সঙ্গে আঠা দিয়ে জুড়ে দিয়েছে পা। স্বপ্নে যেরকম হয়, ইচ্ছে থাকলেও দৌড় দিতে পারে না মানুষ। সে-কারণেই তার মনে হচ্ছে, আবারও দুঃস্বপ্ন দেখছে।

পায়ের শব্দ শোনা গেল। পাশে এসে দাঁড়াল কিশোর। জিজ্ঞেস করল, কি হয়েছে? চিৎকার করছ

কেন?

তারপর সে-ও দেখল ওগুলো। মুসার মতই বিশ্বাস করতে পারছে না।

চোখের মতই তো লাগছে, রবিন বলল।

কিন্তু এত বড়? বলল মুসা। নাকি প্ল্যাঙ্কটন জমে আছে কে জানে!

পাগল নাকি? কিশোর বলল। প্ল্যাঙ্কটন কখনও ওভাবে গোল হয়ে জমে সাঁতরাতে পারে না। ওগুলো চোখই। আরিব্বাপরে, কত বড় একেকটা!

যেন ম্যানহোলের ঢাকনা! ভূত না তো! বলতে বলতে পিছিয়ে গেল মুসা। ফাদের ভেতর পড়ে যাবার ভয়েই বুঝি। হুঁশিয়ার! ব্যাটা আসছে!

ঝটকা দিয়ে সামনে এগোল ওটা।

চমকে পিছিয়ে গেল তিন গোয়েন্দা।

ওটার নড়াচড়ায় কয়েক টন পানি বেরিয়ে গেল ফাদের ভেতর থেকে। কালো কালো বিশাল কয়েকটি সাপ কিলবিক করে শূন্যে উঠল, আবার ঝপাত করে পড়ল পানিতে।

জায়ান্ট স্কুইড! আচমকা চেঁচিয়ে উঠল রবিন। ভাল করে দেখার জন্যে আগে বাড়ল। একটা সাপ তার দিকে এগোতেই তাড়াতাড়ি পিছিয়ে এল আবার।

ফোয়ারার মত ছিটকে এল তরল পদার্থ। ভিজে গেল তিন গোয়েন্দা।

পানি ছিটিয়ে ভেজাচ্ছে, মুসা বলল। ব্যাটা খেলছে আমাদের সঙ্গে।

পানি না, কালি,রবিন বলল। সাবধান, চোখে যেন না লাগে।

আরও দূরে সরে এল ওরা।

এ-জন্যেই ওদেরকে বলে কালি-কলম মাছ, বিড়বিড় করল কিশোর।

হ্যাঁ, বিদ্যে ঝাড়ার সুযোগ পেয়ে গেছে রবিন। খুব ঘন কালি, লেখা যায়। একজন অভিযাত্রী একবার ওই কালি দিয়ে লগবুক লিখেছিল।

দাপাদাপি তো করছে খুব, মুসা বলল। ঘাড়ের ওপর এসে না পড়ে।

মনে হয় না। ডাঙায় উঠতে পারে না ওরা।

সাগরে তো নামতে পারে?

কিভাবে নামতে হবে জানলে তো সহজেই পারত। কিন্তু যেমন বড় তেমনি বোকা। এরকম ফাঁদে নিশ্চয় আর কখনও পড়েনি। বেরোতে পারবে না।

ধরে নিয়ে যেতে পারলে হত, চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল কিশোর। এরকম একটা স্কুইডই চেয়েছেন মিস্টার লিসটার।

কিন্তু এই জীবটা তিনি পাচ্ছেন না, বলল রবিন। আশা করা যায়, স্কুনার নিয়ে ফেরার পথে ধরতে পারব একটা। হামবোল্ড কারেন্টে অনেক পাওয়া যায় এগুলো?

দক্ষিণ আমেরিকার উপকূল ঘেঁষে যে স্রোতটা এসেছে, তার কথা বলছ?

হ্যাঁ। মনে আছে তোমার ওই বইটার কথা, ছয়জন তরুণ বিজ্ঞানী বালসা গাছের ভেলায় চড়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন সাগরে? পেরু থেকে রওনা হয়েছিলেন তারা, ওই স্রোতে ভেলা ভাসিয়ে দক্ষিণসাগরের দ্বীপে এসেছিলেন। অসংখ্য স্কুইড দেখেছিলেন তাঁরা। রাতের বেলা ভেসে উঠত ওগুলো, দিনে তলিয়ে যেত গভীর পানিতে।

সবুজ আলো দুটোর উজ্জ্বলতা এখন কমছে বাড়ছে, যেন ভেতরের বিদ্যুৎ উৎপাদক যন্ত্র ভোল্টেজ একবার বাড়াচ্ছে একবার কমাচ্ছে।

গায়ে কাঁটা দিল মুসার। খাইছে! ব্যাটা চোখের পাতা ফেলে না কেন একবারও? গুহার ভেতরে অষ্টাপদী জীবটার সঙ্গে লড়াইয়ের কথা মনে পড়ল তার। ওটার চোখেও এরকম শয়তানী ছিল, তবে আরও ছোট চোখ, আর দেখতে মানুষের চোখের মত। এটার মত উজ্জ্বলতাও ছিল না ওগুলোয় মাথা দোলাল সে, হুঁ, অক্টোপাস আর স্কুইডের মাঝে ফারাকটা এখন বুঝতে পারছি। মাঝে মাঝেই ভাবতাম তফাৎটা কোথায়?

অনেক তফাৎ, রবিন বলল। এটার চোখ বাসনের মত, অক্টোপাসের চোখ থিমবলের মত। অক্টোপাসের শরীর একটা আস্ত ফোলা ব্যাগ, আর এটার হল টরপেডোর মত। চলেও ওরকম ভাবেই। শুঁড় দশটা। দুটো শুঁড় আরগুলোর চেয়ে অনেক বেশি লম্বা। ওঁড়ে কাপের মত বসানো রয়েছে, তবে অক্টোপাসের মত সাকশন কাপ নয়, এগুলোতে রয়েছে ধারাল দাঁত। মারাত্মক। ইস্পাতের তার কেটে ফেলতে পারে।

যাহ্, বাড়িয়ে বলছ।

এক বর্ণও না। আমেরিকান মিউজিয়ম অভ নেচারাল হিস্টরির কয়েকজন বিজ্ঞানী একবার এক অভিযানে বেরিয়েছিলেন। বড় মাছ ধরার জন্যে তাঁরা ব্যবহার করছিলেন ইস্পাতের তার। সেই তার কেটে দিয়েছে স্কুইডের সাত। কাজেই সাবধান। অবশ্য যদি নিজেকে ইস্পাতের চেয়ে শক্ত মনে কর, তাহলে আলাদা কথা।

ভোর এল। অন্ধকার তাড়ানর জন্যে উঠেপড়ে লাগল ধূসর আলো। দানবটাকে স্পষ্ট দেখা গেল এখন। পুরো ফাঁদটা জুড়ে রয়েছে। শরীরের জন্য, শুড়ের জায়গা হচ্ছে না ভেতরে। পাথরের ওপর দিয়ে এসে শুকনোয় বিছিয়ে আছে ওগুলো।

ক্ষণে ক্ষণে রঙ বদলাচ্ছে টর্পেডোর মত শরীরটা। কালো থেকে বাদামী, বাদামী থেকে তামাটে, তামাটে থেকে ফ্যাকাসে সাদা।

গোল চোখের ব্যাস একফুট। রাতের চেয়ে এখন আরও ভয়ঙ্কর লাগছে। ফসফরাসের সবুজ আলো মিলিয়ে গেছে এখন, চোখ দুটোকে লাগছে এখন কালো, দুটো গর্তের মত, যেন যে কোন মুহূর্তে ভেতর থেকে বেরিয়ে আসবে আতঙ্ককর কিছু। তীব্র ঘৃণা নিয়ে তাকিয়ে আছে ছেলেদের দিকে। স্থির ওই চোখের দিকে

তাকিয়ে নিজেদেরকে বড় ক্ষুদ্র আর অসহায় মনে হল তিন গোয়েন্দার।

প্রশান্ত মহাসাগরের দুঃস্বপ্ন! বিড়বিড় করল কিশোর। একেবারে মানানসই।

জোয়ার এখনও পুরোপুরি নামেনি। ফাঁদের মধ্যে পানি রয়েছে। আবার জোয়ার এলে সহজেই বেরিয়ে যেতে পারবে স্কুইডটা। ততক্ষণ টিকতে পারলে হয়। আটকা পড়েছে পাথরের ফাদে। একেবারে নেমে যাবে পানি। রোদ উঠবে।

তখন কি করবে? ভাবসাবে মনে হচ্ছে বিপদ এখনও বুঝতে পারেনি ওটা।

ফাঁদের ভেতরে পানি কুচকুচে কালো, স্কুইডের কালি মেশানো। শরীরের ভেতরের থলে বোঝাই করে পানি টানছে, তীব্র গতিতে ছুঁড়ে মারছে আবার, উল্টোদিকে ছুটে যেতে চাইছে রকেটের মত, পারছে না পাথরের দেয়ালের জন্যে। ঠেকে রয়েছে।

আরিব্বাবারে, কত্তো বড়! গাল ফুলিয়ে বলল মুসা। শরীরটাই বিশ ফুট হবে।ড় আরও বিশ ফুট।

তু এটাকে ছোটই বলা চলে, রবিন বলল। বেয়াল্লিশ ফুট লম্বা উড়ওয়ালা স্কুইডও ধরা পড়েছে। শার্ম তিমির সঙ্গে অনেক সময় লড়াই বাধে স্কুইডের। একবার ওরকম এক লড়াই দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল একদল বৈজ্ঞানিক অভিযাত্রীর। লড়াইয়ে তিমিটা হেরে গিয়েছিল।

কিশোর ঠিকই বলেছে, মুসা বলল। এটাকে ধরে নিয়ে যেতে পারলে ভাল পয়সা মিলত। কিন্তু পারব না। হাতে পেয়েও ছেড়ে দিতে হচ্ছে।

জীবটার দিকে তাকিয়ে চুপচাপ ভাবছিল আর নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটছিল কিশোর। বলল, এটাকে কাজে লাগাতে পারি আমরা। দড়ি বানাতে পারি।

দড়ি? হাহ, পাগল হয়ে গেছ তুমি। এটা দিয়ে দড়ি বানাবে কি করে?

ড়গুলো দিয়ে। ফালি করে কেটে নিলে খুব শক্ত দড়ি হবে, চামড়ার ফালির মত।

ঘোঁৎ করে উঠল মুসা, বিশ্বাস করতে পারছে না।

কেন পারব না? কিশোরের কণ্ঠে দৃঢ় আত্মবিশ্বাস। বোয়াকনসট্রিকটর আর অ্যানাকোন্ডার চামড়া দিয়ে যদি দড়ি হয় স্কুইডের বঁড় দিয়ে কেন হবে না? মালয়েশিয়ায় অজগর দিয়েও দড়ি বানায় লোকে। ওগুলো এত টেকসই, আসবাবপত্র মোড়ানর কাজে ব্যবহার করে, লস অ্যাঞ্জেলেসের বড় বড় অনেক দোকানে দেখতে পাবে। আমার তো বিশ্বাস, এই ঔড় দিয়ে সাপের দড়ির চেয়ে শক্ত দড়ি হবে।

…বেশ, তা নাহয় হল, কিন্তু কাটতে যাচ্ছে কে? বললেই তো খসিয়ে দিয়ে দেবে না স্কুইড। আমি ওই শুড়ের ধারেকাছে যেতে চাই না। রেগে আগুন হয়ে শেষে আমাকে দিয়েই নাস্তাটা সেরে ফেলবেন মহামান্য কালির মহাজন।

সূর্য উঠল। রোদ চড়তে লাগল। গরম সইতে না পেরে অস্থির হয়ে উঠল দানবটা, রাগ বাড়ছে। মেরু অঞ্চলের ঠাণ্ডা পানি ওদের পছন্দ, হামরোল্ড স্রোতের কনকনে ঠাণ্ডা পানিতে ভেসে চলে আসে বলে নিরক্ষীয় অঞ্চলের গরম টের পায় না। দিনের বেলা ওই স্রোতের মধ্যেই থাকে। রাতে আবহাওয়া খুব ঠাণ্ডা হলে স্রোত ছেড়ে উঠে আসে ওপরে, আলো ফোঁটার আগেই ডুবে যায় আবার। রোদ ভীষণ অপছন্দ।

কড়া রোদে অস্থির হয়ে অল্প পানিতে সাংঘাতিক দাপাদাপি শুরু করল ওটা। শুঁড় দিয়ে চাবুকের মত বাড়ি মারতে লাগল দেয়ালের বাইরে মাটিতে, ধারাল দাঁতের আঁচড়ে গভীর ক্ষত হয়ে গেল শক্ত প্রবাল পাথরে।

হঠাৎ এক লাফ দিয়ে উঠে গেল ছয় ফুট। চাবুকের মতই শাঁই শাঁই শুঁড় চালাল বাতাসে। লাফিয়ে সরে এল রবিন আর মুসা। কিশোর সরে সারতে পারল না। পাথরে হোঁচট খেয়ে গেল পড়ে।

শাঁ করে এসে তার কোমর জড়িয়ে ধরল একটা ভয়াবহ ভঁড়। নারকেল কাপড়ের পোশাক কেটে চামড়ায় বসে যেতে লাগল তীক্ষ্ণধার দাঁত।

বড় একটা পাথর দিয়ে উঁড়টায় পাগলের মত বাড়ি মারতে শুরু করল মুসা। কুমালো! কুমালো! বলে গলা ফাটিয়ে চেঁচাতে লাগল রবিন।

ধীরে ধীরে কিশোরকে মুখের কাছে টেনে নিচ্ছে প্রকাণ্ড শুঁড়টা। ঈগল-চঞ্চর, মত ঠোঁটটা ফাঁক হয়ে বেরিয়ে পড়ল একসারি করাতে-দাঁত। দুই হাতে একটা পাথর আঁকড়ে ধরে রাখার চেষ্টা করছে কিশোর। পারছে না। টানের চোটে হাত ছুটে গেল পাথর থেকে। ধরল আরেকটা পাথর। হ্যাঁচকা টানে ওটা থেকেও তার হাত ছুটিয়ে নিল স্কুইডের গুঁড়।

তিন-হাতে পায়ে ভর দিয়ে আহত পা-টা টানতে টানতে তাঁবু থেকে বেরোল কুমালো।

কুমালে, জলদি! চেঁচিয়ে বলল রবিন। তার ধারণা, স্কুইডকে ঠেকার নিশ্চয় কোন উপায় জানে পলিনেশিয়ানরা।

পাথর দিয়ে বাড়ির পর বাড়ি মারছে মুসা। যেন রবারে লাগছে পাথর, কিছুই হচ্ছে না গুঁড়টার। শেষে পাথরটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে কিশোরের দুহাত চেপে ধরল। শুরু হল যেন স্কুইডে আর মানুষের দড়ি টানাটানি।

দুজনে মিলেও থামাতে পারল না খুঁড়টাকে। হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে চলেছে স্কুইড। আর মাত্র কয়েক ফুট তফাতে রয়েছে অপেক্ষমাণ ঠোঁট।

মুসা, খবরদার! সাবধান করল রবিন। আরেকটা ঔড় এগিয়ে আসছে মুসাকে ধরার জন্যে, সে দেখতে পায়নি। রবিনের চিৎকার শুনে লাফ দিয়ে সরে গেল একপাশে।

অবশেষে পৌঁছে গেল কুমালো। বড় একটা পাথর তুলে নিয়ে ভাল পা-টায় ভর দিয়ে দাঁড়াল। গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে ছুঁড়ে মারল পাথরটা। পাথর আর বর্শা ছুঁড়ে মাছ মারায় ওস্তাদ পলিনেশিয়ানরা। হাতের নিশানা খুব ভাল। আহত, অসুস্থ অবস্থায়ও কুমালোর লক্ষ্য ফসকাল না। দুর্বল অবশ্যই, কিন্তু এই জরুরি মুহূর্তে কোথা থেকে যেন অসুরের বল এসে গেছে তার গায়ে।

উড়ে এসে পাথরটা ঢুকল দানবের ঠোঁটে, চোয়ালে এমন শক্ত হয়ে আটকে গেল, কিছুতেই খুলতে পারল না স্কুইড।

একমুখ পাথর নিয়ে মানুষ খাওয়ার আশা ছাড়তে বাধ্য হল কালির মহাজন। কিন্তু ওঁড়ের বাঁধন আলগা করল না। যেন প্রতিজ্ঞা করেছে, আচ্ছামত শান্তি দিয়ে ছাড়বে ব্যাটাদের।

জলদি কর, রবিন, ওই লাকড়িটা দাও আমার হাতে! চিৎকার করে বলল কুমালো।

ছুটে গিয়ে নারকেল কাণ্ডের একটা ফাড়া লাকড়ি এনে কুমালোর হাতে দিল রবিন।

ধর আমাকে নিয়ে যাও ওটার কাছে!

কুমালোকে স্কুইডটার কাছে আসতে সাহায্য করল রবিন। পায়ের ব্যথার পরোয়াই করল না পলিনেশিয়ান। ধা করে বাড়ি মারল স্কুইডের মাথায়, মগজ ভর্তা করে দেয়ার জন্যে।

যন্ত্রণায় ভীষণ ভাবে কেঁপে উঠল স্কুইডের শরীর। লাফ দিয়ে উড়টা উঠে গেল ওপরে, ঢিল হয়ে গেল বাঁধন। ধপ করে মাটিতে খসে পড়ল কিশোর। ঝাড়া লেগে চিত হয়ে পড়েছে মুসা, আগেই।

মাটিতে আছড়াতে শুরু করল গুঁড়গুলো, মুমূর্ষ সাপের মত মোচড় খাচ্ছে। ধীরে ধীরে কমে এল নড়াচড়া, নিথর হয়ে গেল।

কিশোরকে তুলে বসাল রবিন আর মুসা। তার জখম পরীক্ষা করল। রক্তাক্ত শরীর। অনেক জায়গায় কেটেছে, রক্ত ঝরছে ওগুলো থেকে।

ঠিকই, আছি আমি, বলল কিশোর। হাত-পা ভাঙেনি। কাটাও তেমন বেশি নয়, শুধু আঁচড় লেগেছে। কুমালোকে তোল। ওর অবস্থা কাহিল।

কুমালোর দুই বগলের তলায় ক্রাচ হয়ে তাকে ধরে ধরে তাঁবুতে নিয়ে এল মুসা আর রবিন। একেবারে নেতিয়ে পড়ল বেচারা। সারাদিন পায়ের অসহ্য যন্ত্রণায় কষ্ট পেল।

কুমালোকে ঘরে রেখে মরা দানবটার কাছে ফিরে এল তিন গোয়েন্দা। পাথরটা আটকে রয়েছে স্কুইডের ঠোঁটে। যে ঔড়টা তাকে ধরেছিল সেটার দিকে চেয়ে শিউরে উঠল কিশোর। আতঙ্ক উত্তেজনায় দুর্বল হয়ে পড়েছে শরীর, মাথা ঘুরছে, ঘোলা দেখছে চোখে।

এরকম একটা প্রাণীকে মেরে ফেললাম, আফসোস করে বলল কিশোর। জ্যান্ত নিতে পারলে কাজ হত।

না মারলে তুমি বাঁচতে না এতক্ষণ, মুসা বলল। তাছাড়া ভেলা বানাতে দড়ি দরকার। ভেলা না হলে বেঁচে ফিরতে পারব না আমরা এখান থেকে।

তা ঠিক। বসে থাকলে চলবে না। জোয়ার আসার আগে কাজ শেষ করে ফেলতে হবে। নইলে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে এটাকে।

চামড়া খুবই শক্ত। কয়েক ঘন্টা কঠোর পরিশ্রম করে বঁড়গুলো আলাদা করল ওরা। টেনে নিয়ে গিয়ে পাথরের ওপর বিছিয়ে দিল রোদে শুকানর জন্যে।

কাল কাটব, কিশোর বলল। জোয়ার এসেছে। ভেসে ওঠা লাশটাকে টানতে শুরু করেছে পানি।

নিয়ে যাক, নাকি? জিজ্ঞেস করল মুসা। না স্কুইডের মাংসও খাওয়া যায়? কেটে রাখব খানিকটা?

আমার মনে হয় না সুবিধে হবে, রবিন বলল। পুবদেশীর অবশ্য বাচ্চা স্কুইডের মাংস খুবই পছন্দ করে। তবে এই বুড়ো দাদাকে ওরাও গিলতে পারবে কিনা সন্দেহ। চিবানই যাবে না রবারের মত মাংস।

ভেসে যাওয়ার আগে আরেকটা জিনিস রাখতে হবে আমাদের, বলল কিশোর। কাজে লাগবে।

একটা পাথর তুলে নিয়ে গিয়ে স্কুইডের ঠোঁটে বাড়ি মারতে শুরু করল সে। পিটিয়ে ভেঙে ফেলল একটা অংশ। শক্ত এই জিনিসটা দেখতে অনেকটা কুড়ালের মত, কুড়ালের ফলার মতই ধার। নারকেল কাণ্ডের একটা খাটো লাকড়ি নিয়ে হাতল বানাল কিশোর। শুঁড় থেকে সরু চামড়ার একটা ফালি কেটে হাতলের সঙ্গে বাঁধল ভাঙা ঠোঁটটা।

দেখতে হয়ত তেমন সুন্দর না, হাত ঘুরিয়ে বাতাসে কোপ মারল সে। তবে চমৎকার একটা কুড়াল পেয়ে গেলাম। ভেলা বানাতে খুব কাজ দেবে।

Categories: