১৮. জায়ান্ট স্কুইডের শুঁড়

0 Comments

পরদিন জায়ান্ট স্কুইডের শুঁড় কেটে লম্বা লম্বা ফালি করল ওরা। চেঁছে ফেলে দিল চামড়ার ভেতরের মাংস। কড়া রোদে খুব তাড়াতাড়ি শুকিয়ে গেল চামড়া।

ট্যান করার দরকার আছে? মুসা জিজ্ঞেস করল।

কয়েক বছর যদি রাখতে চাইতাম, তাহলে করতাম, জবাব দিল কিশার। আমাদের এত বেশি দিন রাখার দরকার নেই। কয়েক হপ্তায় নষ্ট না হলেই হল।

অদ্ভুত, না? সুইডের চামড়া দিয়ে দড়ি…হাহ, হাই।

অদ্ভুত হবে কেন? ভুরু নাচাল রবিন। অন্য জীবের মত এটাও তো জীব। কিসের চামড়া ব্যবহার করে না লোকে? ক্যাঙারু, ওয়ালাবি, মোষ, উটপাখি, হরিণ, গুইসাপ, অ্যালিগেটর, হাঙর, সীল, ওয়ালরাস, কোনটা বাদ দেয়? বিশ্বাস করবে, জংলী নরখাদকরা আজও মানুষের চামড়া দিয়ে তাদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বানায়?.

বিশ ফুট লম্বা চারটে ফালি জোড়া দিয়ে বড় একটা দড়ি হল, উপসাগরের তলায় পৌঁছেও আরও থাকে। দড়ির এক মাথায় নারকেল কাপড়ের থলে বেঁধে ডুব দেয়ার জন্যে প্রস্তুত হল ওরা।

আমিই আগে যাই, মুসা বলল।

একহাতে পাথর আঁকড়ে আরেক হাতে ব্যাগ নিয়ে পানিতে নামল সে। ওপর থেকে কিশোর আর রবিন দেখল কঁপা কাঁপা একটা ছায়া নেমে যাচ্ছে, নামার সময় পানিতে ঢেউ উঠেছে, সে জন্যেই ওরকম দেখা যাচ্ছে মুসাকে।

পা নিচের দিকে রাখতে কষ্ট হচ্ছে মুসার। ঠেলে উল্টে ফেলতে চাইছে পানি। শেষে দুপা দিয়ে পাথরটা চেপে ধরল। এবার আর মাথা ওপরের দিকে রাখতে অসুবিধে হল না।

ভয়ঙ্কর চাপ পড়ছে দেহের ওপর। জড়িয়ে ধরে চেপে চ্যাপ্টা করে দিতে চাইছে যেন বিশাল কোন দৈত্য। এই চাপের মধ্যে ফুসফুসের বাতাস আটকে রাখতেই হিমশিম খাচ্ছে।

নিচে নেমে খামচি দিয়ে দিয়ে ঝিনুক তুলে ব্যাগে ভরতে লাগল। ঝিনুকের খোলা খসখসে, কাঁটা কাঁটাও রয়েছে কোন কোনটাতে। কুমালোর দস্তানা দুটো পরে আসা উচিত ছিল, ভাবল সে। খোঁচা লেগে রক্তাক্ত হয়ে যাচ্ছে আঙুল। যদি কাছাকাছি হাঙর থাকে, তাহলে বিপদ হবে। তবে ল্যানের ভেতর এ-পর্যন্ত কোন হাঙর দেখেনি। কিন্তু বাইরে থেকে আসতে কতক্ষণ?

থলেতে অন্তত পনেরোটা ঝিনুক জায়গা হবে। একের পর এক তুলে ভরতে লাগল সে। গোনার অবকাশ নেই। প্রচণ্ড এই চাপের মধ্যে কতক্ষণ থাকতে পারবে? এখনই মনে হচ্ছে, আধ ঘন্টা পেরিয়ে গেছে।

থলেটা ভরে ফেলে রেখে ওপরে উঠতে শুরু করল সে।

ওপরে ভাসলে হাত বাড়িয়ে তাকে টেনে তুলল কিশোর আর রবিন। জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলছে মুসা, শিস দেয়ার মত শব্দ বেরোচ্ছে নাকের ফুটো থেকে। শরীর মোচড়াচ্ছে যন্ত্রণায়। খি ধরেছে মাংসপেশিতে। ফুলে উঠেছে গলা আর হাতের রগ। থরথর করে কাঁপছে ম্যালেরিয়া রোগীর মত। এই কড়া রোদের মাঝেও শীত করছে।

উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ল রবিন আর কিশোর।

অনেক বেশি থেকে নিচে, কিশোর বলল। প্রায় দুই মিনিট। পলিনেশিয়ানদের কাছাকাছি। ওদের ওস্তাদ ডুবুরিরাও তিন মিনিটের বেশি পারে না।

উঠে বসল মুসা। আমার কিছু হয়নি, খসখসে কণ্ঠে বলল সে। ব্যাগটা তোল। দেখি, কি আছে।

দড়ি টেনে থলেটা তুলে আনা হল। পানির ওপরে তোলার আগে ওটার তলা দুহাত দিয়ে ধরল রবিন, যাতে ফেটে না যায়। সৈকতে ঢালা হল ঝিনুকগুলো। পনেরোটা। বড় বড়, কালো।

ভেতরে কি আছে দেখার জন্যে তর সইছে না ওদের। একের পর এক ঝিনুক খুলে মুক্তা খুঁজল! একটাও পেল না।

নিরাশ দৃষ্টিতে উপসাগরের, কালো পানির দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল মুসা। আবার যেতে হবে, তাই না!

হবে। কতবার যে যাওয়া লাগে, কে জানে! ঠিক আছে, আমি এবার চেষ্টা করে দেখি, বলল কিশোর।

দস্তানা পরে নাও,হাতের আঙুল দেখাল মুসা। দেখ, কি অবস্থা হয়েছে।

কুমালোর দস্তানা জোড়া নিয়ে এল কিশোর। তারপর থলে আর পাথর নিয়ে নেমে পড়ল পানিতে। পা নিচে রাখার চেষ্টা করল না সে। মাথা নিচের দিকে করে ঝিনুক তুলতে শুরু করল, পা দুটো ওপরে দুলছে সাগরের শ্যাওলার মত।

ঝিনুক ভরা শেষ করে ওপরে উঠতে লাগল। ধীরে ধীরে, সময় নিয়ে, চাপের সঙ্গে শরীর সইয়ে। কিন্তু তারপরেও তাকে যখন ডাঙায় টেনে তোলা হল, সটান চিত হয়ে শুয়ে পড়ল। ফোঁটা ফোঁটা রক্ত বেরোতে শুরু করল নাক-কান-মুখ দিয়ে। হাপরের মত ওঠানামা করছে বুক।

আ-আমি…তোমার মত… হাঁপাতে হাঁপাতে বলল সে। তোমার মত উভচর নই…

আবার টেনে তোলা হল থলেটা।

ঝিনুক খুলতে শুরু করল তিনজনে। এক এক করে খুলে ফেলল বারোটা, কিছু নেই।

তেরো নম্বরটা খুলতে খুলতে মুসা বলল, আনলাকি থারটিন। এটাতে তো থাকবেই না। বলেই দিল ছুরি ঢুকিয়ে। ডালা খুলে মাংসের ভেতরে আঙুল ঢুকিয়েই স্থির হয়ে গেল। গোল গোল হয়ে গেছে চোখ, ঝুলে পড়েছে নিচের চোয়াল। দ্রুত হয়ে গেল নিঃশ্বাস।

খাইছে! পেয়েছি!

দুআঙুলে টিপে ধরে জিনিসটা বের করে আনল মুসা। দীর্ঘ একটা মুহূর্ত কারও মুখে কথা ফুটল না। স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রয়েছে ওটার দিকে।

ইয়া আল্লাহ! অবশেষে ফিসফিসিয়ে বলল মুসা। এত দেখি ফুটবলের সমান!

ফুটবলের সমান অবশ্যই নয়, তবে মারবেলের সমান। মিউজিয়মে মুক্তা দেখেছে ওরা, ওগুলোর কোনটাই এর অর্ধেক বড় নয়। চমৎকার আকৃতি। একদিকে কাত করে ধরলে হয়ে যায় সাদা, আরেক দিকে ধরলে মনে হয় স্বচ্ছ, আকাশ আর ল্যাগুনের রঙে রঞ্জিত হয়ে যায়। পাথর নয়, যেন জীবন্ত।

কিশোরের হাতের তালুতে মুক্তাটা ফেলে দিল মুসা। আরও অবাক হল কিশোর। এত ভারি! তারমানে খুব ভাল জাতের মুক্তা। দুআঙুলে ধরে ঘুরিয়ে

ফিরিয়ে দেখতে লাগল। সূক্ষ্মতম দাগও নেই।

আরেক হাত দিয়ে রোদ আড়াল করল কিশোর। তার পরেও জ্বলছে মুক্তাটা, তবে এখন আর সূর্যের মত নয়, চাঁদের মত।

আনমনে বিড়বিড় করল বিস্মিত রবিন, প্রফেসর দেখলেও চমকে যাবেন!

তারমানে তার পরীক্ষা সফল হয়েছে, মুসা বলল।

নিশ্চয় হয়েছে। তবে তাঁকে দেখাতে নিয়ে যাওয়াটাই মুশকিল। হারিয়ে যেতে পারে। চুরি হতে পারে। পোনাপেতে গেলে ডেংগু ব্যাটা আমাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে পারে, অবশ্য যদি কোনদিন যেতে পারি।

যা, ঝুঁকি আছে, হাসি ফুটল কিশোরের মুখে। রতের মালিক হওয়ার এই এক অসুবিধে। সব সময় চিন্তা, কখন কি হয়ে যায়। চল, কুমালোকে দেখাই।

তাবুর অন্ধকারেও মুক্তার আগুন নিভল না। কুমালোর চোখের সামনে জিনিসটা তুলে ধরল কিশোর। শিস দিয়ে উঠল পলিনেশিয়ান। এত সুন্দর জিন্দেগিতে দেখিনি। আমাদের এদিকে এতবড় মুক্ত পাওয়া যায় না। তবে অন্যখান থেকে এনে বীজ ছড়ালে যে হয়, এটা প্রমাণ করে দিলেন তোমাদের প্রফেসর। দেখি, মালাটা দাও তো। পানি আছে না?

মালার পানিতে মুক্তাটা ফেলে দিল কুমালো। খুব দ্রুত তলিয়ে গেল ওটা। ভাল ওজন।

তোমার কাছেই থাক, কিশোর বলল। আমরা নানারকম কাজ করি, হারিয়ে ফেলতে পারি। ওটা সঙ্গে রাখলে কোন কাজই করতে পারব না।

মাপ চাই ভাই! আমি পারব না। ওটার ভাবনায় ঘুমাতে পারব না সারারাত। তুমিই রাখ।

অনিচ্ছা সত্তেও মুক্তাটা নিয়ে প্যান্টের পকেটে রাখল কিশোর। তবে রাখার আগে নারকেলের ছোবড়ায় ভালমত জড়িয়ে নিল, যাতে পকেট থেকে ফসকে পড়তে না পারে। মুক্তার উত্তাপ নেই, তবু তার মনে হল জ্বলন্ত একটা কয়লার টুকরো রয়েছে পকেটে, চামড়ায় হ্যাঁকা দিচ্ছে। মুক্তা তো পেল না, রাতদিন সব সময়ের জন্যে একটা দুর্ভাবনার ডিপো জোগাড় করল যেন।

যা হবার হবে, জোরে নিঃশ্বাস ফেলে বলল সে। চল, কাজে যাই। একটায় সন্তুষ্ট হবেন না প্রফেসর। আরও কয়েকটা লাগবে।

দিনটা শেষ হওয়ার আগেই সেদিন আরও দুটো মুক্তা যোগ হল প্রথমটার সঙ্গে। দ্বিতীয়টা কিছু ছোট, তৃতীয়টা আরও বড়।

তোমাদের আসা সার্থক হল, বলল কুমালো। মুক্তা পেলে। নিশ্চিন্ত হলে এতদিনে।

নিশ্চিন্ত? মুখ বাঁকাল কিশোর। দুশ্চিন্তার কারখানা তৈরি করলাম বরং। এগুলো প্রফেসরের হাতে তুলে দেয়ার আগে আর স্বস্তি নেই আমার কপালে।

সে-রাতে কিশোর দেখল দুঃস্বপ্ন। দেখল, ওদের ভেলা উল্টে গেছে। গভীর পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে সে। তার প্যান্টটা কামড়ে ছিঁড়ে খুলে নিয়ে যাচ্ছে একটা হাঙর। হাঙরের মুখটা ডেংগুর মত। মুখে শয়তানী হাসি। হাঙরের আবার হাতও আছে, সেই হাতে তিনটে মুক্তা।

জেগে গেল সে। ঘামে ভিজে গেছে শরীর। চট করে হাত চলে গেল প্যান্টের পকেটে। না, হারায়নি, আছে মুক্তাগুলো।

Categories: