ভেলা তৈরি শুরু হল। ল্যাগুনের দিকে ঢালু হয়ে আছে জায়গাটা। ইচ্ছে করেই এই স্থান নির্বাচন করেছে ওরা। চারজনকে বয়ে নেয়ার উপযোগী ভেলা বেশ ভারি হবে, বয়ে নিয়ে গিয়ে পানিতে নামাতে পারবে না। জায়গা ঢালু হলে ঠেলে নামাতে সুবিধে হবে।
তারপরেও বাড়িতে সতর্কতা গ্রহণ করল কিশোর। কয়েকটা কাণ্ডকে পানির সঙ্গে আড়াআড়ি করে রাখল ডাঙায়। এগুলোর ওপর ভেলাটা তৈরি করে গড়িয়ে নিয়ে গিয়ে ফেলবে পানিতে। খুঁটি গেড়ে আটকে দিল রোলারগুলোকে, যাতে আপনাআপনি গড়িয়ে যেতে না পারে।
পনেরো থেকে বিশ ফুট লম্বা সাতটা কাও এনে রাখা হল রোলারের ওপর। লম্বাগুলো রাখা হল মাঝখানে, বেড়ে থাকা অংশটা গলুইয়ের কাজ করবে। পাশেরগুলোর মধ্যে যে কটা মাপে বড় হয়ে গেল, ছোট করে কেটে সমান করে ফেলা হল। খুব কাজ দিল কুড়ালটা, ওটা ছাড়া কাটতে পারত না।
চামড়ার ফিতে দিয়ে একটার সঙ্গে আরেকটা বাঁধা হল কাণ্ডগুলো।
বাঁধা শেষ করে সব দিক থেকে খুঁটিয়ে দেখল কতটা কি হয়েছে।
জাহাজের মতই আকার, বলল কিশোল রোদ থেকে বাঁচার জন্যে একটা কেবিন লাগবে। পালও দরকার।
হেসে উঠল মুসা। কি দিয়ে বানাবে? প্রবাল পাথর?
হেস না হেস না, মাথা নাড়ল রবিন। হাঙরের চামড়া দিয়েই ঘরের চাল হয়ে যাবে। পালও। হতাশ হয়ে পড়ল পরক্ষণে। কিন্তু পাল তুলতে হলে মাস্তুল চাই। কি দিয়ে বানাব? নারকেলের কাণ্ড বেশি ভারি। দাঁড় করানো যাবে না।
যাবে, কিশোর বলল। পরিশ্রম করতে হবে আরকি।
স্কুইডের ঠোঁটের কুড়াল আর ধারাল প্রবালের সাহায্যে কাণ্ড ফাড়তে লেগে গেল ওরা। অনেক ঘাম ঝরানর পর কাণ্ড কেটে বের করল আঠারো ফুট লম্বা একটা দণ্ড। ছুরি দিয়ে টেছে মসৃণ করতে লাগল।
তার পরেও খসখসে রয়েই গেল, সোজা হয়নি ঠিকমত। কিন্তু এটা পেয়েই খুশিতে নাচতে বাকি রাখল ছেলেরা।
ভেলার গলুইয়ের কাছে গর্ত করে ফেলল একটা। তাতে বসিয়ে দিল মাল।
কেবিন আর পাল বানানো যাবে পরেও। এখনই দ্বীপ ছাড়তে তৈরি নয় ওরা, কাজেই ঘরটার প্রয়োজন আছে।
ভেলা বানাতে লেগেছে তিন দিন। রসদ জোগাড় করতে আরও সময় লাগল।
প্রথমেই জরুরি হল পানি। ডুবোঝনাটা প্রায় ফুরিয়ে এসেছে, স্রোতের জোর নেই বললেই চলে। ঝিরঝির করে বেরোয় এখন। যত তাড়াতাড়ি পারা যায় এখন ওগুলো তুলে জমিয়ে ফেলা উচিত। দিনের মধ্যে অসংখ্য বার পালা করে ডুব দিল তিনজনে। প্রতিবারেই তুলে আনল একমালা করে পানি। আগের মত মিষ্টি নেই আঁর, নোনা পানি মিশে যাচ্ছে, যদিও খুব সামান্য।
কুমানোর সঙ্গে পরামর্শ করল কিশোর। পানি বয়ে নিই কি করে? এখন তো পাথরের গর্তে জমিয়েছি। গর্তটা তো আর তুলে নেয়া যাবে না। আর মালাও মোটে একটা। একমালা পানিতে কিছুই হবে না।
ভুরু কোঁচকাল কুমালো। হা, সমস্যাই। আমাদের জেলেরা ছাগলের চামড়া দিয়ে ব্যাগ বানিয়ে নেয়। একটা ডলফিন-টলফিন পেলেও চলত।
দেখা যাক ফাঁদে পড়ে কিনা। কিন্তু আপাতত সমস্যার সমাধান করি কিভাবে? পাথরের গর্তে পানি বেশিক্ষণ থাকবে না, রোদে উড়ে যাবে। ঢাকনা দিয়ে রাখলে থাকবে?।
থাকবে। নারকেলের লাকড়ি গর্তের ওপরে সাজিয়ে তার ওপর পাথর চাপা দিয়ে রাখগে। বলে ছুরি নিয়ে কাজ করতে লাগল কুমালো। ছেলেরা কাজ করেছে একদিন, সে-ও বসে থাকেনি। দুটো ক্রাচ বানিয়ে ফেলেছে। এখন বানাচ্ছে ভেলার জন্যে দাঁড়। বলল, নারকেল দিয়ে কত কিছুই করলাম। ঘর বানালাম, কাপড় বানালাম, ভেলা বানালাম…পানি রাখার পাত্রও বানানো যায়। তবে খুব কঠিন হবে। একটা টুকরো কেটে খোড়ল করে নিতে হবে…
পারব! তুড়ি বাজিয়ে চেঁচিয়ে বলল কিশোর। খোড়ল হুয়ে আছে ওরকম কিছু একটা বেছে নিলেই তো পারি আমরা।
অবাক হয়ে কিশোরের দিকে তাকাল কুমালো।
অন্য দ্বীপটায়, বলল কিশোর। কাল কয়েকটা বাঁশের টুকরো দেখে এলাম। নিশ্চয় ঝড়ে উপড়ে গিয়েছিল, অন্য দ্বীপ থেকে ঢেউয়ে ভেসে এসে ঠেকেছে…
তাহলে তো আর কোন ভাবনাই নেই।
কতটা লম্বা?
আট-দশ ফুট।
ছয় ফুট করে কেটে নাওগে।
কাটতে অসুবিধে হল না। তবে আরেকটা সমস্যা দেখা দিল। ফুটখানেক পর পরই বাশে একটা করে গাঁট, ওগুলো বন্ধ। ছিদ্র না করতে পারলে লাভ হবে না। করবে কি দিয়ে?
সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিল একটা তলোয়ার মাছ। নিজের জীবন দিয়ে বাঁচিয়ে দিল চারজন মানুষকে। ফাদে ধরা পড়ল ওটা। চমৎকার মাংস, কয়েক দিনের খাবারের ব্যবস্থা হয়ে গেল। ওটার তলোয়ার তিন ফুট লম্বা। একটা বাঁশের লাঠির মাথায় তলোয়ারটা বেঁধে লম্বা করে নিয়ে বর্শা বানিয়ে ফেলল মুসা। বাঁশের গাঁট ছিদ্র করার কাজে লাগল সেটা।
সাংঘাতিক শক্ত তলোয়ার মাছের তলোয়ার। একবার একটা মাছ তলোয়ার দিয়ে পালাউ ল্যাণ্ডনে একটা মোটর বোটের তলা ফুড়ে দিয়েছিল। শুধু তাই না, বোটের তলা ফুটো করে ধাতব পেট্রল ট্যাঙ্কে ঢুকে গিয়েছিল ওটার চোখা তলোয়ারের মাথা।
ছয় ফুট লম্বা তিনটে বাঁশের বোতল তৈরি হয়ে গেল। পানি বয়ে নেয়ার আর ভাবনা নেই। বোতলগুলোতে পানি ভরে নিয়ে কাণ্ড-কাটা ছিপি দিয়ে বন্ধ করে দেয়া হল ওগুলোর মুখ।
যাক, পানির অভাবে আর মরছি না, বলল কিশোর।
ঢেউয়ে ভেসে এসে যে শুধু পাকা বাশ ঠেকেছে তাই না, চারাও জল বাঁশের। আগে থেকেই ছিল ওগুলো দ্বীপে। ঝড়ে উপড়ে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল ঝাড়টা। কিছু শেকড়-বাকড় রয়ে গিয়েছিল, হয়ত ওগুলো থেকেই চারা গজিয়েছে। দিনে প্রায় এক ফুট করে বাড়ছে ওগুলো। বাঁশের কেঁাড় খুব ভাল তরকারি। নরম থাকতে থাকতেই ওগুলো কেটে নেয়া হল। ভেলায় করে পাড়ি জমানর সময় খাওয়া যাবে।
বাহ, এখন আমাদের সুদিন, হাসতে হাসতে বলল মুসা। যখন নামলাম, ছিল মরুভূমি। এখন দেখি সব রকমের খাবার জোগাতে আরম্ভ করেছে দ্বীপটা।
রান্নার পাত্রও জোগাল ওদেরকে বাঁশ। ভেতরে পানি ভরে ফুটানো যায়। বাঁশটা পোড়ে না। শুধু তাই না, বাঁশের ভেতর ভরে খাবারও নেয়া যাবে।
তলোয়ার মাছের মাংস ফালি করে কেটে রোদে শুকাল ওরা। নোনাও করা যায়, কিন্তু পদ্ধতিটা জানে না ছেলেরা। কুমালো বলে দিল। সাগরের নোনা পানি এনে রেখে দিতে হবে পাথরের গর্তে। রোদে বাম্প হয়ে উড়ে যাবে পানি। নিচে জমে থাকবে লবণের হালকা আন্তর। লবণও পাওয়া গেল, নোনাও করা গেল মাছের মাংস।
মুক্তার জন্যে ঝিনুক তুলেছে ওরা। কুমালোর দেখাদেখি ঝিনুকের মাংস খেতে আরম্ভ করেছে। স্বাদ না থাকুক, প্রােটিন তো পাওয়া যায়, জীবন বাঁচে। কিন্তু বড় বেশি পচনশীল। একটু রোদেই পচতে শুরু করে। অনেক কায়দা-টায়দা করে শুকিয়ে নিল কিছু ঝিনুকের মাংস। বাঁশে ভরে রাখল। সাগর পাড়ির সময় নেহায়েত ঠেকায় না পড়লে খাবে না।
সাগরের শ্যাওলা তুলেও শুকিয়ে সংরক্ষণ করা হল খাবার হিসেবে।
এই জিনিস কে খায়? নাক কুঁচকাল রবিন। একেবারে শুকনো খড়।
কুমালো জানাল, স্বাদ যা-ই হোক, ভিটামিন আছে। প্রাচ্যের লোকেরা নাকি বেশ পছন্দ করে।
ফিরে আসতে শুরু করেছে পাখিরা। ইতিমধ্যেই চলে এসেছে কিছু। তার মধ্যে রয়েছে ভাড় নামে পরিচিত মেগাপড় পাখি। ওড়ার গতি খুবই সুখ, পাথরের ওপর দিয়ে হাঁটতেও পারে না ভালমত। মানুষকেও ভয় করতে শেখেনি। দুটো পাথর নিয়ে ঠুকতে শুরু করল কুমালো। আজব কোন কারণে ওই শব্দ শুনে লাফাতে লাফাতে দৌড়ে এল পাখিটা।
সহজেই ওটাকে ধরে ফেলল সে। পালক ছাড়িয়ে, কেটে, আগুনে ঝলসে
ওটাকে রেখে দেয়া হল ভেলায় খাবার জন্যে।
আঁচড়ানর শব্দে একরাতে ঘুম ভেঙে গেল মুসার। কী, দেখার জন্যে হামাগুড়ি দিয়ে তাঁবু থেকে বেরিয়ে এল সে। বিরাট একটা গোল পাথর বুকে হেঁটে চলেছে। পানির দিকে। চমকে উঠল সে। প্রথমেই মনে হল, ভূত! চেঁচিয়ে উঠতে যাবে, এই সময় চিনে ফেলল, কচ্ছপ। সাগরের কাছিম। বিশাল। দুশো পাউণ্ড খুব ভাল মাংসের ভাঁড়ার। নিশ্চয় ডিম পাড়ার জন্যে তীরে উঠেছিল, আঁচড়ের শব্দের ব্যাখ্যা এটাই।
এতগুলো মাংস ল্যানে হারিয়ে যেতে দেয়া যায় না। দৌড় দিল মুসা। আঁপিয়ে এসে পড়ল কাছিমের পিঠে। পাত্তাই দিল না জীবটা। আগের মতই গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে চলেছে। পাথরের খাঁজে পা ঢুকিয়ে দিয়ে ওটাকে আটকানর চেষ্টা করল সে। টেনে সহজেই তার পা ছাড়িয়ে নিল ওটা।
লাফিয়ে পিঠ থেকে নেমে পড়ল মুসা। উল্টে ফেলার চেষ্টা করল ওটাকে। বেজায় ভারি। একার সাধ্যে কুলাল না। সাহায্যের জন্যে চিৎকার শুরু করল।
কিশোর আর রবিন বেরিয়ে এসে সাহায্য করার আগেই ল্যাগুনের পানিতে নেমে পড়ল কাছিমটা।
কিন্তু এত সহজে ছাড়ার পাত্র নয় মুসা। কাছিমের পিঠে চড়ে বসল। টেলিভিশনে দেখেছে, কিভাবে পলিনেশিয়ান ছেলেরা কাছিমের পিঠে চড়ে পানিতে ঘুরে বেড়ায়।
গলাটা যেন রাবারের তৈরি। তার ঠিক নিচে শক্ত খোলার কিনার আঁকড়ে ধরল সে। চিত হয়ে গিয়ে শরীরের ভার দিয়ে উল্টে ফেলার চেষ্টা করল ওটাকে।
ওল্টাল না কাছিমটা, তবে ডুবও দিতে পারল না। সাঁতরে চলল ওপর দিয়ে।
সোজা এগিয়ে চলেছে সরু চ্যানেলের দিকে, যেখান দিয়ে সাগরে বেরোনো যায়। দ্রুত ভাবনা চলেছে মুসার মাথায়। সাগরে বেরিয়ে গেলে আর কিছু করতে পারবে না। যা করার এখনই করতে হবে। কি করবে? পেছনের একটা পা চেপে ধরবে? তাহলে হয়ত সাঁতরাতে অসুবিধে হবে কাছিমের।
পাশে কাত হয়ে হাত বাড়িয়ে পেছনের ডান পা-টা চেপে ধরল সে। ধরে রাখল শক্ত করে যাতে নাড়তে না পারে কাছিমটা।
অন্য তিনটা পা ব্যবহার করছে ওটা। ফলে সামনের দিকে না এগিয়ে এক জায়গায় ঘুরতে শুরু করল কাছিম। মুখটা সৈকতের দিকে ফিরতেই পা ছেড়ে দিল মুসা। সঙ্গে সঙ্গে ওই পা ব্যবহার শুরু করল জীবটা। এগিয়ে চলেছে এখন সৈকতের দিকে।
রবিন আর কিশোরকে দেখতে পাচ্ছে মুসা, কুমালোকেও। হৈ চৈ শুনে। বেরিয়েছে।
দাঁড়াও, মাংস নিয়ে আসছি, চেঁচিয়ে বলল গোয়েন্দা সহকারী।
কিন্তু সাগরের কাছিমও, সহজে পরাস্ত হতে চাইল না। মুসাকে পিঠ থেকে ফেলে দেয়ার সব রকম চেষ্টা চালাল। একবার এদিকে ঘুরে যাচ্ছে, আরেকবার ওদিকে। বার বার পেছনের পা চেপে ধরে ওটাকে সঠিক দিকে এগোতে বাধ্য করছে মুসা। এরকম করতে গিয়ে একসময় হাত ছুটে গেল গলার কাছ থেকে। ব্যস, চোখের পলকে ডুব দিল কাছিম। এক ডুবে নেমে এল ছয়-সাত ফুট। গলা চেপে ধরে টেনে আবার ওটাকে ওপরে উঠতে বাধ্য করল মুসা।
সৈকতের ধারে চলে এল কাছিমটা। পানিতে নেমে মুসাকে সাহায্য করল রবিন আর কিশোর কুমালোও করল, যতটা পারল। আরেকটু হলেই তার ভাল পা-টায় কামড়ে দিয়েছিল কাছিম। দাঁত বসাতে পারলে এক কামড়ে অনেকখানি মাংস তুলে ফেলত।
রাখ, করছি ব্যবস্থা, ছুরি বের করল কিশোর।
মাথা ঝাঁকাতে শুরু করল কাছিমটা। অনেক বয়েস হয়েছে। রবারের মত চামড়ায় ভাঁজ। মনে হচ্ছে যেন রেগে গিয়ে মাথা নাড়ছে একজন বুড়ো মানুষ।
মের না, দাদাকে মের না। বাধা দিল রবিন। জ্যান্ত রাখব ওটাকে। ভেলায় করে আমাদের সঙ্গে নিয়ে যাব। তাজা মাংসের দরকার হলে তখন জবাই করতে পারব।
ঠিক, একমত হল কুমালো। একটা কাঠি দিয়ে বালিতে খোঁচা মারছে। তবে ওটা দাদা নয়, দাদী। এই যে দেখ, ডিম পেড়ে রেখে গেছে।
ফুটখানেক গভীর একটা গর্তে প্রায় একশো ডিম পেড়েছে কাছিমটা।
সবাই মিলে টেনেটুনে কাছিমটাকে ডাঙায় তুলল। তারপর ঠেলে চিত করে ফেলল। আর সোজাও হতে পারবে না, পালাতেও পারবে না।
হাসিমুখে ডিমগুলোর দিকে এগিয়ে গেল মুসা। একটা ডিম তুলে নিল। ড্রারে, অবাক কাণ্ড! ভেবেছিল, মুরগী কিংবা হাঁসের ডিমের খোসার মতই শক্ত হবে, তা নয়। নরম, রবারের বলের মত।
ভাঙব কিভাবে? কুমালোক জিজ্ঞেস করল সে।
দাঁত দিয়ে এক জায়গায় কেটে ফেল। কাটা জায়গা মুখে লাগিয়ে চাপ দাও, ভেতরের জিনিস মুখে ঢুকে যাবে। কাঁচা খাওয়া যায়। তবে সিদ্ধ করে নিলে বেশি মজা লাগবে। এগুলোও নিয়ে যেতে পারব ভেলায় করে।
দাদীমাকে তুলে এনে একটা নারকেল কাণ্ডের সঙ্গে গলায় দড়ি দিয়ে বাঁধল ছেলেরা।
ভোর হল। আলোচনা করে একমত হল অভিযাত্রীরা, যথেষ্ট খাবার জোগাড় করা গেছে। এবার রওনা হওয়া যায়।
তাঁবুর ওপর থেকে হাঙরের চামড়াটা নামিয়ে দুই টকুরো করল ওরা। একটা দিয়ে পাল হবে, আরেকটা দিয়ে কুঁড়ের চালা।
পাল তোলার কাছি হিসেবে ব্যবহার করা হল স্কুইডের চামড়া। বাঁশ পেয়েছে, কাজেই পাল বানাতে অসুবিধে হল না।
কেবিনটা অতি সাধারণ। তিনটে বাঁশের টুকরো কেড়ে ধনুকের মত বাঁকা করে আটকে দেয়া হল ভেলায়। ফাঁক ফাঁক করে বসানো হয়েছে ধনুক তিনটে। তার ওপর ছড়িয়ে দেয়া হল চামড়াটা। কোণাগুলো বেঁধে দেয়া হল চামড়ার দড়ি দিয়ে, যাতে বাতাসে উড়ে যেতে না পারে। নৌকার ছইয়ের মতই দেখতে হল জিনিসটা। পাঁচ ফুট চওড়া, তিন ফুট উঁচু। নিচু হওয়ায় সুবিধে, ঝড়ো বাতাসেও উড়িয়ে নেবে না সহজে। লম্বায় হয়েছে আট ফুট। চারজনের জায়গা হয়ে যাবে। আর যেহেতু সামনে পেছনে খোলা, গলুইয়ে চোখ রাখতেও অসুবিধে নেই।
ডিমগুলো সিদ্ধ করে নেয়া হল। তারপর দাদীমাকে ভেলায় তুলে মাস্তুলের সঙ্গে বাঁধা হল শক্ত করে, ছুটতে পারবে না।
যাবার জন্যে তৈরি সবাই। বিষণ্ণ চোখে পরিত্যক্ত ঘরটার দিকে তাকাল ওরা, পুরো দুটো হপ্তা কাটিয়েছে এখানে। ফেলে যেতে এখন মায়া লাগছে। ভেলায় চড়ে সাগরে পাড়ি দেয়ার অনিশ্চয়তায় কাঁপছে বুক।
ঢেউ আর বাতাসের করুণার ওপর নির্ভর করতে হবে ওদের। যাওয়ার চেষ্টা করবে দক্ষিণে। কিন্তু সহজেই পথ ভুল করতে পারে। ঘুরে যেতে পারে উত্তর, পুব কিংবা পশ্চিমে। বাতাসের চাপ কতক্ষণ সহ্য করতে পারবে ওদের পলকা পাল কে জানে! আর দাঁড়ও তেমন মজবুত নয়। স্রোতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে টিকবে?
চেঁচামেচি করে আর গান গেয়ে ভয় ভুলে থাকার চেষ্টা করল ওরা।
ভেলাটার একটা নাম রাখা দরকার, রবিন বলল। কি নাম, বলত?
কিশোর, তুমি বল, মুসা বলল।
আশা। কারণ এখন আশা ছাড়া আর কি করতে পারি আমরা।
ল্যাগুনে ভেলা ভাসাল চার নাবিক। চড়ে বসল তাতে। দাঁড় বেয়ে এগিয়ে চলল চ্যানেলের দিকে।
বাহ, ভালই তো ভাসছে,মন্দব্য করল কুমালো।
নাকও সোজা রাখছে, বলল কিশোর। নারকেল গাছের সরল মসৃণ কাণ্ডকে আরেকবার ধন্যবাদ জানাল সে। বেশ সোজা হয়েছে। কাত হয়ে যাবার প্রবণতা নেই।
নাহ, সত্যিই ভাল হয়েছে, দাঁড় বাইতে বাইতে বলল মুসা।
পাল নামিয়ে রাখা হয়েছে। চ্যানেল পেরোনর পর তারপর তোলা হবে। দাঁড় বেয়ে ভারি ভেলাটাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে যথেষ্ট পরিশ্রম হল চারজনের।
পনেরো মিনিট পর অবশেষে বের করে আনা হল ওটাকে। ভোলা সাগরে বেরোনর আনন্দেই যেন ঢেউয়ের বুকে দুলে দুলে নাচতে আরম্ভ করল আশা।