চোখ মেলে বিছানায় উঠে বসলাম। আড়মোড়া ভেঙে হাই তুললাম।
আউ! বাঁ কাঁধ ব্যথা করছে! কাঁধ ডলে দেয়াল ঘড়ির দিকে চাইলাম।
সকাল সাতটা পঁচিশ? চাচা-চাচী আমাকে ডাকেনি কেন? স্কুলে তো দেরি হয়ে যাবে আমার! বিছানা থেকে লাফিয়ে নেমে বাথরুমের দিকে এগোলাম। আয়নায় কাঁধটা দেখে নিলাম। জখমটা গুরুতর, কালশিটে পড়ে গেছে। কীভাবে হলো এটা? গতকালকের ফুটবল প্র্যাকটিসের সময়? নাকি দুএকদিনের মধ্যে বাইক থেকে পড়ে গেছিলাম? মনে করতে পারলাম না।
কাঁধ নিয়ে ভাবতে ভাবতে নীচে নেমে এলাম। রাশেদ চাচা, মেরি চাচী আর ডন টেবিলে ব্রেকফাস্ট করতে বসেছে।
থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম। আমার চেয়ারটা নেই। আমার জন্য খাবারও দেওয়া হয়নি।
আজব তো! বললাম, ফাঁকা জায়গাটার দিকে চেয়ে রয়েছি। ডন, ঠাট্টা করছ আমার সাথে? আমার চেয়ার কোথায় সরিয়েছ? এখন মজার সময় নয়। স্কুলে দেরি হয়ে যাবে।
হঠাৎই অনুভব করলাম ঘরে কীরকম পিনপতন নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে। চাচা-চাচী আর ডনের দিকে চাইলাম।
চাচা চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াচ্ছে। চাচী সরে গিয়ে ডনের পিছনে দাঁড়াল। ভাবখানা এমন যেন ওকে রক্ষা করছে! ওরা তিনজন আমার দিকে এমনভাবে চেয়ে রয়েছে, আমি যেন…অচেনা কেউ।
এখানে কী ঘটছে? বলতে শুরু করলাম।
আমরাও সেটাই জানতে চাই, ইয়াং ম্যান, ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বলল চাচা। গম্ভীর শোনা তার কথাগুলো।
থমকে গেলাম আমি, চোখ পিটপিট করলাম, হাসার চেষ্টা করলাম।
আগে বলল আমার চেয়ার কই? বললাম।
চাচী ঝুকে পড়ে ডনের কানে কানে কী যেন বলল। মনে হয় ওকে নিজের কামরায় যেতে বলছে।
আমরা যতক্ষণ না আসি ঘরেই থাকিস, চাচীকে বলতে শুনলাম।
ও কি খারাপ লোক, আণ্টি? আমার দিকে আঙুল তাক করে বলল ডন।
হ্যাঁ, আমি খুব খারাপ লোক, বলে কটমট করে চাইলাম ওর দিকে। আমি কিশোর পাশা, খুনে দানব।
ডন, চলে যা! চাচী বলল, এবং ডন চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠে বেরিয়ে গেল কিচেন থেকে।
চাচা ঘুরে দাঁড়িয়ে চাইল আমার দিকে। মুখের চেহারা কঠোর। সরাসরি চোখ রেখেছে আমার চোখে।
শোনো, ইয়াং ম্যান, বলল, আমরা এখানে কোন ঝামেলা চাই। তুমি এক্ষুনি চলে যাও এবাড়ি ছেড়ে। দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাও, আমরাও ভুলে যাব ঘটনাটা, নইলে-
নইলে কী? কী বলছ তুমি এসব, চাচা?
নইলে, চাচী চাচার কথাগুলো শেষ করল, আমরা পুলিস ডাকতে বাধ্য হব। আর আমাদেরকে চাচা চাচী বলা বন্ধ করো। আমরা তোমার চাচা-চাচী নই এবং কোন কিশোর পাশার নামও আমরা শুনিনি!
ঠিক আছে, শ্রাগ করলাম। তোমরা যা বলো। স্বীকার করতেই হবে এটাই এখন অবধি আমাদের সেরা পারিবারিক কৌতুক। কিন্তু আমাকে এর শেষ দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। কারণ এখন বাজে পৌনে আটটা, আর পনেরো মিনিট পর প্রথম ঘণ্টা পড়বে।
ভাবতেই পারছি না আমাকে ব্রেকফাস্ট মিস করতে হচ্ছে, বলে কিচেনের দরজার দিকে এগোলাম। স্কুলে ক্যাফেটেরিয়া থেকে দুই পিরিয়ডের ফাঁকে একটা আপেল খেয়ে নেব।
দরজার কাছে বইয়ের র্যাক। স্কুল ব্যাগ নেওয়ার জন্য দাঁড়ালাম ওখানে। ব্যাগটা নেই। আরেকটা ঠাট্টা?
অনেক হয়েছে, বললাম, কিন্তু আমার স্কুল ব্যাগ কোথায়?
তোমাকে চলে যেতে বলা হয়েছে, কথা কানে যায়নি? চাচা বলল।
বই ছাড়া স্কুলে যাব কীভাবে, চাচা? বললাম।
আর নয়। আমি এবার পুলিস ডাকছি, চাচী বলল, কিচেন ফোনের দিকে পা বাড়াল।
এখুনি বেরিয়ে না পড়লে দেরি হয়ে যাবে। না হয় একদিনের জন্য কোন ক্লাসমেটের বই ধার নিয়ে নেব।
ঠিক আছে, আমি যাচ্ছি, বললাম। রকি বীচ পুলিস ডিপার্টমেন্টকে আমার শুভেচ্ছা। গত বসন্তে সার্জেন্ট কলিন্স আমাকে স্কুল প্রজেক্টে সাহায্য করেছিল। সবাই ভাল থেকো, চলি।
স্কুলে পৌঁছতে আমার যতক্ষণ সময় লাগে, আজকে এসব মশকরার জন্য তার চাইতে আগেভাগে পৌঁছে যেতে হবে।
বাপ রে, চাচা-চাচীকে আগে কখনও এমন করতে দেখিনি। আজকে কি এপ্রিল ফুল? নাহ্, এখন অক্টোবরের মাঝামাঝি। তা হলে ওরা এমন করল কেন?
এর তল বের করতে হলে আমাকে সন্ধে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। এখন আমার সামনে সারাদিনের ক্লাস এবং তারপর দুঘণ্টার ফুটবল প্র্যাকটিস। সামনে বড় ম্যাচ আমাদের, দলের সেরা পাস রিসিভার হিসেবে অনেক দায়িত্ব আমার। প্রচুর খাটতে হবে।
এসব ভাবছি এসময় এক মিনিভ্যান স্টপ সাইনে এসে দাঁড়াল। ভ্যানটাকে সঙ্গে সঙ্গে চিনতে পারলাম। আমাদের ফুটবল কোচ হেনরির। উনি আমাকে লিফট দিলে দুমিনিটের মধ্যে স্কুলে পৌঁছতে পারব।
হাই, কোচ হেনরি! চেঁচিয়ে উঠে হাত নাড়লাম।
আজকের আবহাওয়া নাতিশীতোষ্ণ। সামনের জানালা খোলা তার। আমার গলা শুনতে পেয়ে ঘাড় ফিরিয়ে চাইলেন। কোচ হেনরি শুধু যে ভাল কোচ তা-ই নয়, ভাল মানুষও। সব সময় শিষ্যদের সাহায্য করতে একপায়ে খাড়া।।
আমাকে লিফট দেবেন? আমার একটু দেরি হয়ে গেছে।
আমাকে অবাক করে দিয়ে কোচ হেনরি আমার দিকে চেয়ে রইলেন দুমুহূর্ত। চিনতে পারার কোন লক্ষণ নেই তাঁর দৃষ্টিতে। মুখে চিরাচরিত হাসি নেই। আমি আবারও গলা ছাড়ার আগেই অ্যাক্সিলারেটরে পা দাবিয়ে রওনা হয়ে গেলেন তিনি।
আমি ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলাম। ভ্যানটা রাস্তা ধরে দূরে স্কুলের দিকে চলে গেল।
আমি কমিনিট দেরি করে স্কুলের মাঠে পৌঁছলাম। ছেলে-মেয়েরা সামনের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে, প্রথম ঘণ্টা পড়ার অপেক্ষা করছে। রকি বীচে এখনই সম্ভবত আমি সেরা সময় কাটাচ্ছি। আবহাওয়া, ফুটবল মৌসুম, বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গ-অসাধারণ।
মুসাকে দেখলাম উপরের ধাপে। ও স্কুল টিমের কোয়ার্টারব্যাক।
আমাদের কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে কথা বলছে ও, তাদের মধ্যে জোয়ান জেনসেনও রয়েছে, সে প্রধান চীয়ারলিডার। মুসা নিশ্চয়ই মজার কিছু বলেছে, কারণ সবাই হাসছে।
অ্যাই! চেঁচিয়ে উঠে সিড়ি ভেঙে দৌড়ে উঠতে লাগলাম। কী খবর তোমাদের?
কেউ আমার দিকে চাইল না। মুসা কথা চালিয়ে যাচ্ছে।
শনিবার হ্যামিল্টনদের মজা দেখাব, বলল মুসা। আমাদের পাস রিসিভাররা ওদের মত ভাল না হলেও আমরা ওদেরকে হারাতে পারব।
পাস রিসিভাররা ওদের মত নয়? মুসা আমাকে ছোট করছে কেন? আমি হ্যামিল্টনদের যে কোন পাস রিসিভারের চাইতে কোন অংশে কম নই।
মুসা, আমি এবছর আটবার টাচডাউন করেছি। সেটা নিশ্চয়ই খুব খারাপ নয়, বললাম।
এই প্রথমবারের মত দলটা ঘুরে দাঁড়িয়ে আমার দিকে চাইল।
অপেক্ষা করলাম মুসা কিছু একটা বলবে। দলের সবাই আমার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে। একটু নার্ভাস বোধ করতে লাগলাম আমি।
কেউ কিছু বলছ না কেন? বললাম।
আমি বলছি, বলল মুসা। এক কদম আগে বেড়ে সরাসরি আমার চোখে চোখে চাইল। ওর চোখের দৃষ্টি দেখে মেরুদণ্ড বেয়ে হিমস্রোত নেমে গেল আমার। তুমি আমাদের চেনো দেখা যাচ্ছে, বলল ও। কিন্তু একটা প্রশ্নের জবাব দাও তো…তুমি কে?
হাসিতে ফেটে পড়লাম। ঠেকাতে পারলাম না।
তোমরা সবাই মিলে মজা করছ! বললাম।
কীসের মজা? প্রশ্ন করল জোয়ান। কে এ?
ওর এবং অন্যদের মুখের চেহারা দেখে মনে হচ্ছে ওরা আমাকে চেনে না।
মুসার দিকে ঘুরে দাঁড়ালাম।
শোনো, মুসা, বাসাতেও মশকরা করে আমার বইয়ের ব্যাগ লুকিয়ে ক্লান্ত হয়েছে। কাজেই ইংরেজি আর বায়োলজি ক্লাসে তোমার বইগুলো আমাকে ধার দিয়ো, কেমন?
মুসারমুখের চেহারায় ব্যঙ্গ ফুটল। এক পা পিছু হটল ও।
কী বলতে শুরু করেছিল, কিন্তু এসময় স্কুলের ঘণ্টা বাজল।
মুহূর্তে সবাই স্কুল বিল্ডিঙের দিকে পা বাড়াল। আমি প্রথমে যাব তিনতলার হোমরুম ক্লাসে। সিঁড়ির দিকে এগোচ্ছি, দেখা হয়ে গেল রবিনের সঙ্গে।
অ্যাই, রবিন, পাশ কাটানোর সময় বললাম। ও আমার দিকে চেয়ে ভ্ৰ কুঁচকাল, কিন্তু চলা থামাল না। কী ব্যাপার, রবিন? কিছু হয়েছে?
রবিন পিছু ফিরে আমার দিকে চাউনি বুলাল। ভ্রূ কুঁচকানো এখনও।
কী আবার হবে? পাল্টা বলল ও। তোমাকে চিনতে পারলাম। সিঁড়ি ভেঙে নেমে গেল ও।
চিনতে পারল না মানে? আজব তো। সিঁড়ির মাথায় থেমে দাঁড়ালাম। মনে হচ্ছে সেভেন্থ গ্রেডের সবাই আমার সঙ্গে তামাশা করছে।
ছেলে-মেয়েরা দ্রুতবেগে আমার পাশ কাটাচ্ছে, শেষ ঘণ্টা পড়ার আগেই পৌঁছতে চাইছে হোমরুমে। উপলব্ধি করলাম আমারও তাই করা উচিত।
রুম নম্বর ২০৩-এ প্রবেশ করলাম। জানালার পাশে, আমার ডেস্কের উদ্দেশে পা বাড়ালাম। ওখানে পৌছে দেখি জো লেমন আমার সিটে বসা।
তুমি মনে হয় ভুল সিটে বসেছ, ডেস্কের পাশে দাড়িয়ে বললাম। জো বিশালদেহী ছেলে, মোটেই বন্ধুভাবাপন্ন নয়। নোটবইতে কী সব টুকছিল।
জো মুখ তুলল। কয়েক মুহূর্তের জন্য আমার দিকে চোখ পিটপিট করে চাইল। এবার ধীরে সুস্থে উঠে দাঁড়াল। ও আমার চাইতে পাক্কা চার ইঞ্চি লম্বা। আমার মুখের উপর আস্তে আস্তে গর্জন ছাড়ল, তুমি…আমাকে…কী…বললে?
গলাটা কেমন শুকনো ঠেকল। কাঁধের ব্যথাটা আবারও শুরু হলো।
বললাম তুমি আমার সিটে বসেছ। তুমি সবসময় আমার এক সিট পিছনে বসো। এটা কোন ব্যাপার না, কিন্তু তুমি সরে গেলে আমি আমার সিটে বসতে পারতাম।
কে এ? বলে চারধারে নজর বুলাল জো। অন্যান্য ছেলে-মেয়েরা আমাদের দিকে চেয়ে রয়েছে। বেশিরভাগ শ্রাগ করল। কেউ কেউ হেসে উঠল।
বিরক্ত লাগতে শুরু করেছে আমার। বাসায় আর ক্লাসের বাইরে ঠাট্টা-ইয়ার্কি মেনে নেয়া যায়। কিন্তু ক্লাস বসতে চলেছে, এখন এসব ভাল লাগছে না। তা ছাড়া জো লেমন আমার বন্ধু নয়। ও কেন মশকরা করবে আমার সঙ্গে? আমি এমনকী ওকে পছন্দও করি না।
দেখো, জো, মশকরা করছ বুঝতে পারছি, কিন্তু আমি এখন আমার সিটে বসতে চাই। তুমি পিছনে গিয়ে-
এসময় শেষ ঘণ্টা পড়ল। মিসেস ফিশার, আমাদের হোমরুম টিচার সবাইকে চুপ করে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে বললেন।
সবাই যার যার সিটে বসে পড়ো, বললেন তিনি। পিছনের দিকে চাইলেন। জো আমার সিটে বসা। আমি ডেস্কের পাশে বোকার মত দাঁড়িয়ে। ওখানে কী হচ্ছে? মিসেস ফিশার প্রশ্ন করলেন।
মিসেস ফিশার, জো লেমন আমার সিটে বসে আছে, ছাড়তে চাইছে না, বললাম।
মিসেস ফিশার করিৎকর্মা মানুষ। আমি জানি এ সমস্যার সমাধান এখুনি হয়ে যাবে।
কিন্তু তুমি কে, ইয়াং ম্যান? প্রশ্ন করলেন তিনি।
চারপাশে নজর বুলিয়ে নিলাম। কমুহূর্ত লেগে গেল উনি কী বলছেন বুঝতে।
আমি কে? বলতে গিয়ে গলা চড়ে গেল সামান্য। মিসেস ফিশার ফিফথ গ্রেড থেকে আমার হোমরুম টিচার।
হ্যাঁ, তোমার নামটা প্লিজ, সাড়া দিলেন তিনি।
মিসেস ফিশারও তামাশায় যোগ দিয়েছেন! ভাল ফ্যাসাদেই পড়া গেছে। কিন্তু মিসেস ফিশার তো কখনও ঠাট্টা করেন না। ঠিক করলাম আমিও খেলে যাব।
আমার নাম কিশোর পাশা, মিসেস ফিশার। মিসেস ফিশার ডেস্কে বসলেন, কিছু কাগজ-পত্র পরীক্ষা করলেন তিনি। এবার মুখ তুলে আমার দিকে চাইলেন।
এই হোমরুমে নতুন কোন স্টুডেন্ট নেয়া হয়েছে এমন কোন ননাটিশ দেয়নি হেড অফিস। তুমি বরং মেইন ফ্লোরে গিয়ে ব্যাপারটা তাদেরকে চেক করে দেখতে বলল, বললেন মিসেস ফিশার।
ইয়েস, ম্যাম, বললাম। দরজার দিকে এগোলাম। রব মিশেলের পাশ কাটাতে হলো। সামনের দিকে বসা সে। আমাদের ফুটবল টিমের সেন্টার। আজকে প্র্যাকটিসে দেখা হবে, রব, বললাম। রব এমনভাবে আমার দিকে চাইল, আমি যেন মঙ্গলগ্রহ থেকে এসেছি।।
হলওয়ে এখন নির্জন, ছেলে-মেয়েরা সব তাদের হোমরুমে। সিঁড়ি ভেঙে নেমে যাওয়ার সময় মাথায় খেলে গেল এক ঘণ্টা আগে আমি ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে কী কী ঘটেছে।
আমি যাদেরকে চিনি তারা সবাই নাটক করছে। তারা আমাকে কেন বেছে নিয়েছে বুঝলাম না। এর শেষ কোথায় তাও জানা নেই আমার। কিন্তু আমাকে ব্যাপারটা জানতে হবে। স্কুল ফ্রন্ট অফিসটা আমার ঠিক সামনে।
অফিসে প্রবেশ করে দেখি মিসেস পোর্টার তাঁর সেক্রেটারি ডেস্কে বসা, কম্পিউটারে কাজ করছেন। মিসেস পোর্টার আমাকে ছোটকাল থেকেই চেনেন।
হাই, মিসেস পোর্টার, বললাম। তিনি মুখ তুলে চেয়ে মৃদু হাসলেন। আমি অনেকখানি স্বস্তি বোধ করলাম।
গুড মর্নিং, বললেন তিনি। আমি তোমার জন্যে কী করতে পারি?
ঠিক জানি না…ব্যাপারটা বেশ মজার। আমার প্রথমে প্রশ্ন করা উচিত-আপনিও কি এই জোকটার সাথে জড়িত?
আমার দিকে চেয়ে রইলেন তিনি।
জোক? কীসের জোক?
ভাল! ওরা মিসেস পোর্টারকে এরমধ্যে জড়াতে পারেনি। মিসেস পোর্টার আমাকে এই রহস্যের সমাধানে সাহায্য করতে পারবেন।
মানে আজ সকাল থেকে দেখছি চাচা-চাচী থেকে শুরু করে যার সাথেই দেখা হচ্ছে তারা সবাই আমাকে না চেনার ভান করছে। মিসেস ফিশার এমনকী আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছেন ব্যাপারটার জট খোলার জন্য। হাসির ব্যাপার না?
মাথা ঝাঁকালেন মিসেস পোর্টার, আমার দিকে চাইলেন।
তোমার নাম কী?
আমি একদৃষ্টে চেয়ে রইলাম তার দিকে। ঠিক শুনেছি তো?
আহ, মিসেস পোর্টার, আমি ভেবেছিলাম আপনি এই তামাশাটার সঙ্গে নেই, বললাম।
আমি কোন তামাশা করছি না, বললেন মিসেস পোর্টার। কিন্তু তুমি তোমার নাম না বললে আমি তোমাকে কোন সাহায্য করতে পারব না–
আমি কিশোর পাশা, মিসেস পোর্টার, আপনি কে মনে করেছেন? আমি সেভেন্থ গ্রেডার, হোমরুম ২০৩-এ আছি, ফুটবল টিমের প্লেয়ার–
চেঁচাচ্ছ কেন? বললেন মিসেস পোর্টার, কম্পিউটারের কি টিপতে লাগলেন।
আমি একটু আপসেট হয়ে পড়েছি, বললাম, প্রথমে বললেন আপনি জোকটার মধ্যে নেই, কিন্তু এখন দেখছি আছেন।
জোক হচ্ছে এখানে, বললেন মিসেস পোর্টার, কম্পিউটার স্ক্রীনের দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে। কিন্তু জোকটা করছ তুমি।
তার মানে? প্রশ্ন করলাম। কম্পিউটার ফাইলে কিশোর পাশা নামে কারও রেকর্ড নেই। এখন তো নেইই, আগেও ছিল না।
এই প্রথমবারের মত সামান্য আতঙ্ক বোধ করলাম।
কম্পিউটার পারফেক্ট নয়, ভুল করে, বললাম। ঘুরে তাঁর চেয়ারের কাছে এলাম। কম্পিউটার স্ক্রীনের দিকে দৃষ্টি আমার।
নিজেই দেখো, বললেন মিসেস পোর্টার। এখানে K অক্ষরের মধ্যে কোথাও তোমার নাম নেই।
কম্পিউটারের কথা বাদ দিন, মিসেস পোর্টার। আমার দিকে তাকান-আমি কিশোর পাশা, আমাকে আপনি ছোটকাল থেকে দেখছেন! ঠাট্টাটা অনেক বেশি হয়ে যাচ্ছে না, আপনিই বলুন? আমি ক্লাসে ফিরে যেতে চাই, আমার বইগুলো ফিরে পেতে চাই, এবং চাই এই ননসেন্স বন্ধ হোক!
ঘন-ঘন শ্বাস নিচ্ছি এবং আমার কাঁধ এখন রীতিমত টাটাচ্ছে। ইতিকর্তব্য ঠিক করতে পারছি না। কাউকে বিশ্বাস করার উপায় নেই। সবাই আমার সঙ্গে তামাশা করছে। এর চাইতেও খারাপ ব্যাপার…আমার সন্দেহ হচ্ছে এটা আসলেই তামাশা কিনা। কিন্তু এ ছাড়া আর কীই বা হবে। আমি এক সকালে ঘুম থেকে উঠলাম আর তারপর কেউ আমাকে চিনতে পারছে না এটা কীভাবে সম্ভব!
আহ, কিশোর… পিছন থেকে কে যেন বলল।
ঘুরে দাঁড়ালাম। গভীর ভাবনায় এতটাই ডুবে ছিলাম, টেরই পাইনি মিসেস পোর্টার কখন বেরিয়ে গিয়েছিলেন কামরা ছেড়ে এবং এখন ফিরেছেন। তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে মিস্টার লাউয়ি, স্কুলের সাইকোলজিস্ট। সব ছাত্রের সাধারণ পরীক্ষা নেন তিনি, এবং কারও বিশেষ কাউন্সেলিঙের দরকার পড়লে তাও করেন।
মি. লাউয়ি আমার নাম ধরে ডেকেছেন।
বলুন, মিস্টার লাউয়ি? বললাম। অনুভব করলাম বড় ধরনের বিপদের মুখোমুখি হতে পারি। স্কুলের সাইকোলজিস্টকে ডেকে এনেছেন কেন মিসেস পোর্টার?
তুমি আমার নাম জানো? বিস্মিত শোনাল মি. লাউয়ির কণ্ঠ।
অবশ্যই জানি, জবাব দিলাম। আপনি স্কুলের সাইকোলজিস্ট, ছাত্র-ছাত্রীদের ইন্টেলিজেন্স টেস্ট নেন।
ঠিক বলেছ, বললেন মি. লাউয়ি। তা ছাড়া যে সব ছেলে-মেয়ে সামান্য…আপসেট ফীল করে আমি তাদেরকেও হেল্প করি। তুমি কি আপসেট, কিশোর?
ভীষণ আপসেট, মিস্টার লাউয়ি। সবাই বলছে তারা আমাকে চেনে না। আপনি হলেও আপসেট হতেন।
মি. লাঙলিঙের মরবের সাধারণীড়িয়ে মন মরালাম, স্ট্রেই
হ্যাঁ, হ্যাঁ, জানি। কিন্তু, আহ্, মিসেস পোর্টার বলছেন তুমি নাকি নিজেকে এ স্কুলের ছাত্র হিসেবে দাবি করছ। কিশোর, আমরা দুজনই জানি সেটা সত্যি নয়।
আচ্ছা, ওরা এবার স্কুলের সাইকোলজিস্টকেও এ খেলায় জড়িয়েছে।
আমি সিদ্ধান্ত নিলাম নিজের যুক্তি দিয়ে পাল্টা লড়াই করব।
মিস্টার লাউয়ি, আমি যদি এখানকার ছাত্র না-ই হব তা হলে সবার নাম…এমনকী আপনারও নাম জানলাম কীভাবে?
আমরা সেটাই ভাবছি, কিশোর, ঠাণ্ডা গলায় বললেন তিনি। তুমি আমাদের নাম জাননা কীভাবে? আমি তোমার বয়সী এক ছেলের কেসের কথা জানি। সে মরিয়া হয়ে উঠেছিল বিশেষ একটি স্কুলে অ্যাটেও করার জন্যে। সেজন্যে সে সমস্ত ফ্যাকাল্টি মেম্বার আর কিছু ছাত্র-ছাত্রীর নাম মুখস্থ করেছিল। বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে স্কুলটাতে অ্যাটেও করার চেষ্টা করেছিল ও। তবে প্রথম দিনই সে ধরা পড়ে যায়। ব্যাপারটা আসলেই দুঃখজনক।
আপনি বলছেন আমার মাথা খারাপ এবং আমি এখানকার ছাত্র নই।
ঠিক তা না, মৃদু কণ্ঠে বললেন মি. লাউয়ি। কিন্তু, কিশোর, আমরা কখনও কখনও কোন কিছু এত বেশি করে চাই যে কল্পনার লাগাম ছেড়ে দিই।
এটা কি আমার কল্পনা, আমি এবছরের ফুটবল টিমের স্টার্টিং মেম্বার? বলতে গিয়ে গলা চড়ে গেল আমার। মি. লাউয়ি আর মিসেস পোর্টার পরস্পর দৃষ্টি বিনিময় করে আমার দিকে চাইলেন।
তুমি ফুটবল টিমে আছ? মি. লাউয়ি প্রশ্ন করলেন। কণ্ঠস্বর শান্ত। সান্তনা দেয়ার চেষ্টা টের পাওয়া যায়।
হা! টিমের ফটো ঝুলছে এই অফিসের বাইরের দেয়ালে, বললাম আমি।
তা হলে গিয়েই বরং দেখা যাক, বললেন মি. লাউয়ি।
হল ফাঁকা আর চুপচাপ এখনও, তবে শীঘি সরগরম হয়ে উঠবে। প্রথম ক্লাসের ঘন্টা পড়বে যে কোন মুহূর্তে। আমি সোজা এগোলাম ফুটবল টিমের ফটোটার দিকে, ফ্রেমে বাঁধিয়ে যেটা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে মেইন হলওয়েতে।
আমি রোজ ছবিটার সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকি। গর্ব বোধ হয় আমার। ফুটবল টিমের সদস্য হিসেবে আলাদা এক অনুভূতি কাজ করে, কেননা গায়ে-গতরে অন্যদের মত শক্তিশালী নই কিনা। আমি সামনের সারিতে। সেন্টার রব মিশেল আর কোয়ার্টার ব্যাক মুসার ঠিক মাঝখানে।
মিস্টার লাউয়ি, আমি যদি এ স্কুলের ছাত্র না হই তবে এর কী ব্যাখ্যা দেবেন
কথা বন্ধ হয়ে গেল আমার। ফটোটার দিকে চাইলাম। সামনের সারিতে রয়েছে রব মিশেল। তার পাশে দাঁড়িয়ে মুসা আমান। কিন্তু আমি নেই। ফটো থেকে আমি উধাও!
মি. লাউয়ি উকি মেরে ছবিটা দেখলেন।
তোমাকে দেখতে পাচ্ছি না, কিশোর। তুমি ছবিতে কোথায় দাঁড়িয়েছ?
এক পা পিছু হটলাম।
ওরা-ওরা ছবিতে কারসাজি করেছে। আমি টিমে আছি। আমি স্টার্টিং রাইট এণ্ড। যাকে খুশি জিজ্ঞেস করুন!
কিশোর, তুমি আমার সাথে এসো। আমাদের আরও কথা বলা দরকার, মি. লাউয়ি বললেন। হাত বাড়িয়ে আমার কাঁধে রাখলেন, যে কাঁধটা টাটাচ্ছে।
আউ! চেঁচিয়ে উঠে, সত করে সরে গেলাম। সে মুহূর্তে ঘন্টা বাজল এবং হলগুলো ভরে গেল ছাত্র-ছাত্রীতে। শশব্যঙে ক্লাসরুমের দিকে চলেছে তারা।
মি, লাউয়ির কাছ থেকে সরে পড়ার জন্য ছেলে-মেয়েদের স্রোতকে কাজে লাগালাম। লাউয়ির মনে কী ছিল কে জানে, কিন্তু আমি এতে জড়াতে চাই না।
আমি জানি একজন ফ্যাকাল্টি সদস্য আছেন যিনি অদ্ভুত এই খেলায় নিজেকে জড়াবেন না। মি, হালবার্ট, আমার বায়োলজি টিচার। তিনি আমাদেরকে সব সময় সত্য আর জ্ঞানের শিক্ষা দেন, বায়োলজির পাশাপাশি। মি. হালবার্টের কাছে আমাকে যেতে হবে।
ভাগ্যক্রমে, বায়োলজি আমার প্রথম ক্লাস, তাই দ্রুত পায়ে সায়েন্স ডিপার্টমেন্টের দিকে এগোলাম। কোনা ঘুরতেই দেখতে পেলাম মি. লাউয়ি স্কুলের এক দারোয়ানের সঙ্গে কথা বলছেন।
ঝট করে সরে গেলাম। আমাকে যাতে দেখতে না পায়। আমার ধারণা মি. লাউয়ি লোকটিকে আমার উপর নজর রাখতে বলছেন।
মি. লাউয়ি আর দারোয়ান দুদিকে চলে যেতেই, ক্লাসরুমের দিকে পা বাড়ালাম আমি। শেষ ঘণ্টা পড়ে গেছে ইতোমধ্যে, সুতরাং সবাই এখন যার যার ক্লাসে বসে পড়েছে।
দরজাটা বন্ধ। টান মেরে খুলে প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়লাম ভিতরে।
মিস্টার হালবা–বলতে শুরু করেছিলাম, কিন্তু শব্দটা আটকে গেল আমার গলায়।
মি. হালবার্ট সামান্য স্থূলকায়। মাথায় পাতলা, সাদা চুল, বয়স রাশেদ চাচার মত। কিন্তু ক্লাসের সামনে যিনি দাঁড়িয়ে তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক মানুষ। বছর পঁচিশেকের এক মহিলা টিচার। ভদ্রমহিলা হালকা-পাতলা, তেমন লম্বা নন-সম্ভবত চাইনিজ।
আমার দিকে চাইলেন তিনি।
কী চাই? আমার ক্লাসে ডিস্টার্ব করছ কেন? মিস্টার হালবার্ট কোথায়? প্রশ্ন করলাম। কে? মহিলা বললেন। মিস্টার হালবার্ট…যিনি এই ক্লাসটা নেন! বললাম।
অ্যাই, সেই পাগলটা আবার এসেছে, যে বলছিল ফুটবল টিমে আছে, রুমের মাঝখান থেকে একটি কণ্ঠ শোনা গেল।
কণ্ঠস্বর লক্ষ্য করে চাইলাম। মুসা এ কথা বলেছে।
মুসা, আমাকে সাহায্য করো, আমরা না বন্ধু? চেঁচিয়ে উঠলাম। ওরা এমনকী হলওয়ের ছবি থেকেও আমাকে বাদ দিয়েছে।
মিস লি, এর মাথার স্ক্রু ঢিলে।
জোয়ান জেনসেন। জোয়ান! ক্লাসে ও আমার স্টাডি পার্টনার। ও এমন কথা বলতে পারল!
মিস লি আমার দিকে এগিয়ে এলেন।
তুমি ভুল ক্লাসরুমে এসেছ, ইয়াং ম্যান।
আমার মনে হয় ও ভুল গ্রহে এসেছে! বলল মুসা। গোটা ক্লাস হেসে উঠল। আমার বিশ্বাস হলো না। ওরা এমনভাবে আমাকে নিয়ে হাসছে, আমি যেন ভাড়, সঙ!
হাসো, হাসো! চেঁচিয়ে উঠলাম, চোখ জ্বালা করছে অনুভব করলাম। কে তোমাদের চায়! দৌড় দেয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়ালাম।
শোনো, মিস লি মৃদু কণ্ঠে বললেন। ঘুরে দাঁড়িয়ে তার দিকে চাইলাম।
বলুন।
আজকে নিজেকে তোমার একদম নতুন মানুষ মনে হচ্ছে, তাই না?
বিস্মিত হলাম। দ্রমহিলা কী বলছেন জিজ্ঞেস করতে চাইলাম। কিন্তু উনি মুহূর্তের জন্য আমার দিকে চেয়ে হাসলেন। এবং তারপর, যেন বাতাসের ধাক্কায়, ক্লাসরুমের দরজাটা দড়াম করে লেগে গেল আমার মুখের উপর। হলওয়েতে একাকী দাঁড়িয়ে রইলাম আমি।
ওই যে ও! আমার উদ্দেশে কে যেন চেঁচিয়ে উঠল। ঘুরে চাইলাম। দারোয়ান আমাকে দেখে ফেলেছে। হঠাৎই সে আর মি. লাউয়ি দৌড়ে আসতে লাগল আমার দিকে। আমাকে পালাতে হবে!