ঘড়ির গোলমাল – তিন গোয়েন্দা – রকিব হাসানপ্রথম প্রকাশঃ মার্চ, ১৯৯০
ঘড়ির ভেতর থেকে শোনা গেল চিৎকার!
আতঙ্কিত কণ্ঠ। শুরু হলো মৃদু ভাবে, জোড়ালো হতে লাগলো, তীক্ষ্ণ থেকে তীক্ষ্ণতর। কিশোর পাশার মনে হলো, কানের পর্দা ছিঁড়ে যাবে। শিরশির করে উঠলো শিড়দাঁড়া। জীবনে যতো ভয়ঙ্কর চিৎকার শুনেছে সে, তার মধ্যে এটা অন্যতম।
পুরনো চেহারার একটা ঘড়ি, বিদ্যুতে চলে। চলে কিনা সেটা দেখার জন্যেই প্লাগটা সকেটে ঢুকিয়েছিলো, সঙ্গে সঙ্গে ওই চিৎকার। কর্ড ধরে একটানে প্লাগটা বের করে আনলো সকেট থেকে। থেমে গেল। চিৎকার। হাঁপ ছাড়লো সে।
পেছনে শোনা গেল পদশব্দ। পাশা স্যালভিজ ইয়ার্ডে কাজ করছিলো তার দুই সহকারী, মুসা আমান আর রবিন মিলফোর্ড, পাশে এসে যেন ব্রেক কষে দাঁড়ালো।
কি হয়েছে? জিজ্ঞেস করলো রবিন। কে, চিৎকার করলো?
খাইছে! মুসা বললো, উদ্বিগ্ন। কিশোর, ব্যথাট্যাথা পেয়েছো?
মাথা নাড়লো গোয়েন্দাপ্রধান। শোনো, অস্বাভাবিক শব্দ। বলেই আবার প্লগ ঢোকালো সকেটে। বাতাসে ছড়িয়ে পড়লো রক্ত-পানি-করা চিৎকার। টেনে প্লাগ খুলে চিৎকার থামালো।
মারছে? অস্বস্তিতে হাত নাড়লো মুসা। একে শুধু অস্বাভাবিক বলছো কেন? নিশ্চয় ঘড়ির ভূত!
হ্যাঁ, সত্যি অস্বাভাবিক, গোয়েন্দাপ্রধানের সঙ্গে একমত হলো রবিন। ঘড়ি এরকম চিৎকার করে বলে শুনিনি। দেখো, সুইচ টিপলে পাখা গজিয়ে না উড়ে চূলে যায়
হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে ঘড়িটা দেখছে কিশোর। সন্তুষ্ট হয়ে বললো, মম!
হুম্ কি? এই, কী? ভুরু নাচালো মুসা।
অ্যালার্মের লিভারটা অন করা, জানালো কিশোর। দেখি অফ করে আবার প্লগ ঢুকিয়ে… বলতে বলতেই প্লাগটা সকেটে ঢোকালো। আর চিৎকার করলো না। মৃদু গুঞ্জন তুলে চলতে শুরু করলো ঘড়ি।
দেখি এবার অন করে, আবার বললো সে। লিভার অন করতেই চিৎকার করে উঠলো ঘড়ি, তাড়াতাড়ি অফ করে দিলো কিশোর। যাক, একটা রহস্যের সমাধান হলো। ঘন্টা বাজানোর বদলে চিৎকার করে এই ঘড়িটা।
রহস্য দেখলে কোথায় এতে? জিজ্ঞেস করলো মুসা।
ঘড়ি চিৎকার করে, এটা রহস্য নয়? কিশোরের হয়ে জবাব দিলো রবিন। আর, কেন চিৎকার করে সেটাও বোঝা গেল।
কেন নয়, সুধরে দিলো কিশোর। বলো, কখন। অ্যালার্ম লিবার সেট করলে চিৎকার করে। কেন করে, সেই রহস্যের সমাধান এখনও হয়নি।
তারমানে, তদন্ত? মুসা বললো। একটা ঘড়ির ব্যাপারে কি তদন্ত করবে? প্রশ্ন করবে ওটাকে? জবাব না দিলে চাপাচাপি করবে?
মুসার কথায় কান দিলো না কিশোর। বললো, কেন চিৎকার করে বোঝার চেষ্টা করবো। নিশ্চয় কোনো কারণ আছে।
আগ্রহী মনে হলো রবিনকে। কিন্তু শুরুটা করবে কিভাবে?
জবাব না দিয়ে টুলকিটের জন্যে হাত বাড়ালো কিশোর। তিন গোয়েন্দার ব্যক্তিগত ওয়ার্কশপে রয়েছে ওরা। কিট থেকে একটা স্ক্রু-ড্রাইভার বের করে ঘড়ির পেছনের কভার খুলতে শুরু করলো। খুলে, এক নজর দেখেই আবার বললো, হুমম!
আবার হুমম কেন? মুসার প্রশ্ন।
স্ক্রু-ড্রাইভারের মাথা নেড়ে ঘড়ির ভেতরে দেখালো কিশোর। যন্ত্রপাতির মাঝে বসানো আধুলির সমান গোল একটা ডিস্ক। চিৎকারের এটাই কারণ। অ্যালার্ম বেলের বদলে এটা বসিয়ে দিয়েছে কেউ।
কেন? রবিনের প্রশ্ন।
সেটাই তো রহস্য। জানতে হবে কে করেছে কাজটা।
কিভাবে? মুসা জিজ্ঞেস করলো।
দূর, নিরাশ ভঙ্গিতে হাত নাড়লো কিশোর। গোয়েন্দা কোনোদিনই হতে পারবে না তুমি। ভাবতেই জানো না ঠিকমতো…
দাঁড়াও দাঁড়াও, বলি। প্রথমে জানতে হবে ঘড়িটা কোত্থেকে এসেছে।
হ্যাঁ, এই তো মাথা খুলছে।
পুরনো জঞ্জালের মাঝে পেয়েছে। তারমানে রাশেদ আংকেল ওটা কিনে এনেছেন। হয়তো বলতে পারবেন কোন জায়গা থেকে কিনেছেন।
রোজই তো কতো মাল কেনেন, রবিনের কণ্ঠে সন্দেহ। তাঁর মনে আছে?
থাকতে পারে। জঞ্জালের মাঝে পেয়েছি, কথাটা ঠিক নয়। আধ ঘন্টা আগে একটা বাক্স আমার হাতে দিয়েছে চাচা। পেয়েছি ওটার ভেতরেই। আরও কি কি যেন আছে। দেখি।
বেঞ্চের ওপর রাখা একটা শক্ত মলাটের বাক্স। ভেতর থেকে বেরোলো একটা স্টাফ করা পেঁচা-পালক বেশির ভাগই খসে গেছে। পুরনো একটা কাপড় ঝাড়ার ব্রাশ পাওয়া গেল। আরও আছে একটা ভাঙা টেবিল-ল্যাম্পের অর্ধেকটা, চলটা ওঠা একটা ফুলদানী, দুটো বইয়ের দুমড়ানো প্লাস্টিক-কভার, আর আরও কিছু টুকিটাকি। প্রায় সবগুলো জিনিসই বাতিল, ব্যবহারের অযোগ্য।
দেখে তো মনে হয় ঘর পরিষ্কার করেছিলো কেউ, কিশোর বলল। বাক্সে ভরে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছিলো। বেকার বা ভিখিরি কেউ সেটা কুড়িয়ে নিয়ে বিক্রি করেছে পুরনো মালের দোকানে, সেখান থেকে কিনে এনেছে চাচা।
কেন যে কিনলেন? অবাক লাগছে মুসার। ঘড়িটা ছাড়া তো আর সবই বেকার। কোনো কাজে লাগবে না। তবে ঘড়ি বটে একখান। ভাবো একবার, সকালে অ্যালার্মের বদলে ওই ভূতুরে চিৎকার শুনে জেগে ওঠার কথা
হুমম! তৃতীয়বার বললো কিশোর। ভালো না। খুব খারাপ। কাউকে ভয় পাওয়ানোর জন্যে যথেষ্ট। হার্টের অবস্থা খারাপ হলে মারাও যেতে পারে। মেরে ফেলতে চাইলে শুধু তার বেডরুমে ঘড়িটা রেখে দিয়ে এলেই হলো। সহজেই খুন, অথচ কেউ কিছু সন্দেহ করতে পারবে না।
বলো কি! ভুরু কোঁচকালো রবিন। ওরকম কিছুই হলো নাকি?
জানি না। শুধু সম্ভাবনার কথা বলছি। চলো, চাচাকে জিজ্ঞেস করি ঘড়ি কোথায় পেলো?
ওয়ার্কশপ থেকে বেরিয়ে অফিসের দিকে চললো ওরা। কাজে ব্যস্ত ইয়ার্ডের দুই কর্মচারী বোরিস আর রোভার। কয়েকটা পুরনো আসবাবপত্র দেখছিলেন রাশেদ পাশা, ডাক শুনে ফিরে তাকালেন। ছেলেদের মুখ দেখেই বুঝলেন, প্রশ্ন। আছে। মিটিমিটি হেসে, মস্ত গোঁফে তা দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তারপর, ত্রিরত্ন, ব্যাপার কি? খুব উত্তেজিত মনে হচ্ছে।
চাচা, ঘড়িটা দেখালো কিশোর। এটা কোত্থেকে আনলে? একটু আগে যে বাক্সটা দিলে, তার মধ্যে পেয়েছি।
পেয়েছি মাগনা। ফাও বলতে পারো। এটার মধ্যে ছিলো, পুরনো একটা আলমারি দেখালেন তিনি। হলিউডের এক পুরনো মালের দোকান থেকে কিনেছি।
কোন দোকান? মালিকের নাম?
নাম, ডেরিক। অনেক মাল কিনেছি আজ। এক ট্রাক দিয়ে গেছে। আরও এক ট্রাক নিয়ে আসবে। তখন জিজ্ঞেস করো…
এই সময় গেটে শোনা গেল এঞ্জিনের শব্দ। ফিরে তাকাল চারজনে। একটা পিকআপ ঢুকছে। বলে উঠলেন রাশেদ পাশা, ওই যে, এসে গেছে।
আসবাবপত্রের স্তূপের কাছে এসে থামলো গাড়ি। ওভারঅল পরা একজন লোক নেমে এলো, খোঁচা খোঁচা দাড়ি।
এসেছো, বললেন রাশেদ পাশা।
হ্যাঁ, কাছে এসে দাঁড়ালো ডেরিক। নিয়ে এলাম তোমার সব মাল। কপাল ভালো তোমার, রাশেদ, ভালো মাল পেয়েছো, ধরতে গেলে বিনে পয়সায়। কিছু কিছু তো একেবারে নতুন…
আরে দূর! বাতাসে থাবা মারলেন রাশেদ পাশা। বাড়িয়ে বলার স্বভাব তোমার গেল না। এগুলো নতুন? আমি বলে কিনছি…যাক, যা আছে, আছে। কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। দশ ডলার দেবো সবগুলোর জন্যে। ও কে?
দাও। কি আর করা? টাকার খুব ঠেকা, নইলে একশোর কমে দিতাম না…
মেরি আছে অফিসে। ওর কাছ থেকে টাকা নিয়ে যাও। ও, এক মিনিট, এ আমার ভাতিজা, কিশোর। তোমাকে কি জানি জিজ্ঞেস করবে।
জলদি বলে ফেলো, খোকা। তাড়া আছে আমার, বললো ডেরিক।
একটা বাক্সের কথা জানতে চাই, কিশোর বললো। আপনার দেয়া এই আলমারিতে পাওয়া গেছে। বাক্সের ভেতরে এই ঘড়িটা ছিলো। কার কাছ থেকে কিনেছেন, মনে আছে?
ঘড়ি? বিষণ্ণ হাসি হাসলো ডেরিক। হপ্তায় ওরকম কয়েক ডজন ঘড়ি বেচতে আনে আমার কাছে। বেশির ভাগই অচল। কিনি, কোনোটা বিক্রি হয়, কোনোটা ফেলে দিই।
একটা বাক্সের মধ্যে ছিলো এটা, রবিন বললো। ভেতরে একটা স্টাফ করা পেঁচাও…
ও, হ্যাঁ, মনে পড়েছে। স্টাফ করা পেঁচা খুব কমই পাই, সেজন্যেই মনে আছে। কিন্তু কার কাছ থেকে যেন কিনলাম…কার কাছ..নাহ, সরি, মনে করতে। পারছি না, মাথা নাড়লো ডেরিক। প্রায় হপ্তা দুই আগের কথা। মনে নেই। হাজার লোকে বেচতে আনে, কজনের কথা মনে রাখবো?
.
ব্যস, গেল এই কেস, মুসা বললো। ঘড়িটা কোত্থেকে এসেছে তা-ই জানি না, রহস্যের কিনারা করবো কি? কিশোর?
ওয়ার্কশপে ফিরে এসেছে তিনজনে। অন্যমনস্ক হয়ে বাক্সটা নাড়াচাড়া করছিলো কিশোর, মুখ ফিরিয়ে তাকালো, উঁ?…মাঝে মাঝে বাক্সের গায়ে ঠিকানা লেখা থাকে। কোথায় পাঠানো হবে, সেই ঠিকানা।
আমার কাছে মুদী দোকানের বাক্সের মতো লাগছে, রবিন বললো।
আমার কাছেও। কিন্তু ঠিকানা লেখা নেই।
সেই কথাই তো বলছি, আগের কথার খেই ধরলো মুসা। এই কেসের সমাধান আমাদের সাধ্যের বাইরে। …রবিন, কি ওটা?
ছাপার মেশিনটার নিচ থেকে চার কোনা এক টুকরো কাগজ তুলে নিয়েছে। রবিন। কিশোরকে দেখিয়ে বললো, বাক্স থেকে পড়লো।
মুদী দোকানের মালের লিস্টি হবে হয়তো, মুসা বললো।
কিন্তু তার কথা ঠিক নয়। কাগজটায় লেখা রয়েছেঃ
ডীয়ার মিলার
আস্ক রোবিড়
আস্ক বারকেন
আস্ক জেলডা
দেন অ্যাক্ট। দ্য রেজাল্ট উইল সারপ্রাইজ ঈভন ইউ।
জোরে জোরে পড়লো রবিন। চেঁচিয়ে উঠলো, আশ্চর্য! কি মানে এর?
প্রিয় মিলার, বিড়বিড় করে বললো কিশোর। রোবিডকে জিজ্ঞেস করো। বারকেনকে জিজ্ঞেস করো। জেলভাকে জিজ্ঞেস করো। তারপর কাজে নামো। ফলাফল দেখে তুমি পর্যন্ত চমকে যাবে।
আরে সে তো বুঝলাম। কিন্তু এসব কথার মানে কি?
আরেকটা রহস্য। নিশ্চয় চেঁচানো ঘড়ির সঙ্গে যোগাযোগ আছে।
ঘড়ির সঙ্গে যোগাযোগ, কিভাবে বুঝলে?
তাই তো হওয়ার কথা। দুই ইঞ্চি বাই চার ইঞ্চি মাপে কাটা হয়েছে। পেছনে দেখো। এই যে এখানটায়। কি দেখছো?
শুকনো আঠা।
রাইট। তারমানে এই কাগজটা কোনো কিছুতে সাঁটানো ছিলো। ঘড়িটা উল্টে তলা দেখালো সে। এই যে দেখো, এখানেও শুকনো আঠা। আগেই লক্ষ। করেছি। মাপ দেখে আন্দাজ করতে কষ্ট হয় না, এই কাগজ এখানেই লাগানো। ছিলো। বেশি নাড়াচাড়ায় খুলে পড়ে গেছে।
কিন্তু ওরকম একটা কাগজ কেন ওখানে সাঁটতে যাবে? মুসার জিজ্ঞাসা। কে? ওই লেখার মানেই বা কি? মাথামুণ্ডু তো কিছুই বোঝা যায় না।
এতো সহজেই বোঝা গেলে কোনো রহস্যই আর রহস্য থাকতো না।
তা ঠিক। লাভের মধ্যে শুধু আরও একটা রহস্য যোগ হলো, ঘড়ির চেঁচানোর সঙ্গে। আমরা যে অন্ধকারে ছিলাম, সেখানেই রয়েছি। বরং বলা যায় অন্ধকার আরও ঘন হয়েছে। এখন কি করবে?
চেঁছে ঘড়ির নিচ থেকে আঠা তুলবো। কি যেন খোদাই করা রয়েছে। বেশি ছোট, বুঝতে পারছি না। ম্যাগনিফাইং গ্লাস দরকার। চলো, হেডকোয়ার্টারে চলো।
দুই সুড়ঙ্গ দিয়ে হেডকোয়ার্টারে ঢুকলো ওরা। ডেস্কের ওপাশে বসে মাথার ওপরের উজ্জ্বল আলো জ্বেলে দিলো কিশোর। ড্রয়ার থেকে ম্যাগনিফাইং গ্লাস আর ছুরি বের করে কাজে লাগলো। ছুরি দিয়ে চেঁছে আঠা তুলে, খোদাই করা লেখা। পড়ে মাথা ঝোঁকালো নীরবে। রবিনের দিকে ঠেলে দিলো ঘড়ি আর গ্লাস।
রবিনও পড়লো। খুব খুদে অক্ষরে লেখা রয়েছেঃ ডি. টেমপার। মুখ তুলে জিজ্ঞেস করলো, মানে কি? কারও নাম?
বলছি এখুনি, বলে, মুসার দিকে তাকালো কিশোর। মুসা, টেলিফোন গাইডটা দেখি তো, প্লীজ।
পাতা উল্টে চললো গোয়েন্দাপ্রধান। কিছুক্ষণ পর চেঁচিয়ে উঠলো খুশি হয়ে, এই দেখো!
দুই সহকারীও দেখলো, ছোট একটা বিজ্ঞাপন, ঘড়ির দোকানের। ইংরেজিতে লেখা রয়েছেঃ ডি, টেমপার–ঘড়ি মেরামতকারী-অস্বাভাবিক কাজ আমাদের বিশেষত্ব। নিচে হলিউডের ঠিকানা আর টেলিফোন নম্বর লেখা।
মেকাররা অনেক সময়, বললো কিশোর। ঘড়িতে সাঙ্কেতিক চিহ্ন বা নম্বর বসিয়ে দেয়। যাতে পরে আবার চিনতে পারে ওটা কার কাজ। ধোপার দোকানে কাপড়ে যেমন চিহ্ন দেয়। এক ধাপ এগোলাম আমরা। অ্যালার্ম সিসটেম খুলে ডিস্ক কে ঢুকিয়েছে ঘড়িতে, এটা জানলাম। পরের ধাপ, গিয়ে মিস্টার টেমপারকে জিজ্ঞেস করা, কে ঘড়িটা মেরামত করতে দিয়েছিল।
.
হলিউড বুলভারের একটা গলির ভেতর পাওয়া গেল টেমপারের দোকানটা। গলিতে ঢোকে না বিশাল রোলস রয়েস, যেটাতে চড়ে এসেছে তিন গোয়েন্দা। গাড়িটা গলির মুখে রেখে হেঁটে রওনা হলো ওরা। ড্রাইভিং সিটে বসে রইলো ইংরেজ শোফার হ্যানসন।
ধুলোয় ধূসর, জানালার কাঁচের ওপাশে নামটা কোনোমতে পড়া যায়ঃ ডি, টেমপার–ঘড়ি মেরামতকারী। সোনালি রঙের অক্ষরগুলো মলিন হয়ে এসেছে। ভেতরের তাকে অসংখ্য ঘড়ি, ছোট-বড় নতুন-পুরনো, নানা ধরনের নানা আকারের। দরজায় এসে দাঁড়ালো তিন গোয়েন্দা। ওরা ভেতরে পা রাখতেই লম্বা একটা ঘড়ির নিচের কাঠের দরজা খুলে গেল, মার্চ করে বোলো এক খেলনা। সৈনিক, বিউগল বাজিয়ে সময় ঘোষণা করে আবার ঢুকে গেল তার কুঠুরিতে। বন্ধ হয়ে গেল দরজা।
খাইছে! তাজ্জব হয়ে গেছে মুসা। কী কাণ্ড! তবে, চিৎকারের চেয়ে অনেক ভালো।
চলো, মিস্টার টেমপারের সঙ্গে কথা বলা যায় কিনা দেখি। বললো কিশোর।
ঘরে অনেক ঘড়ি, অনেক রকম আওয়াজ। মনে হচ্ছে হাজার হাজার মৌমাছি গুঞ্জন তুলেছে একসঙ্গে।
চামড়ার অ্যাপ্রন পরা ছোটখাটো একজন মানুষ এগিয়ে এলো। চকচকে কালো চোখের ওপরে সাদা ভুরু, যেন দুটো ছোট ছোট ঝোপ। খুশি খুশি কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো, কি চাই? ঘড়ি মেরামত করাবে? নাকি অদ্ভুত কিছু লাগাবে?
না, স্যার, বিনীত কণ্ঠে জবাব দিলো কিশোর, ওসব নয়। একটা ঘড়ির ব্যাপারে জানতে এসেছি। ব্যাগ খুলে ওটা বের করে কাউন্টারের ওপর দিয়ে ঠেলে দিলো সে।
ঘড়িটা দেখলো টেমপার। হুঁ, বেশ পুরনো। দাম কম। এটা মেরামত করে পোষাবে না।
মেরামত করতে আনিনি, স্যার। কিছু মনে না করলে প্রাগটা লাগান।
শ্রাগ করলো ছোট মানুষটা। সকেটে প্লাগ ঢোকালো। সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে উঠলো ঘড়ি। তাড়াহুড়ো করে লিভারটা অফ করে দিলো মেকানিক। ঘড়িটা হাতে নিয়ে পেছনে দেখলো সে। হাসলো। হুঁ, চিনতে পারছি। আমিই লাগিয়েছিলাম। খুব জটিল কাজ।
আপনিই তাহলে চিৎকার শিখিয়েছেন এটাকে? মুসা বললো।
হ্যাঁ। আমি বলেই পেরেছি…যাকগে, কি জন্যে এসেছো? খারাপ হয়ে গেছে?
না, স্যার, কিশোর বললো। রাস্তায় কুড়িয়ে পেয়েছি এটা। কার জিনিস জানি না। নিচে আপনার নাম দেখলাম। ভাবলাম, মালিকের নাম বলতে পারবেন। তার জিনিস তাকে ফিরিয়ে দেবো।
তাই? দ্বিধা করছে টেমপার। কাস্টোমারের নাম গোপন রাখি আমরা। অনেক সময়…
মুফতে দেয়ার ইচ্ছে আমাদের নেই, স্যার, বাধা দিয়ে বললো রবিন। এরকম একটা জিনিস, নিশ্চয় খুব শখের। ফিরিয়ে দিলে হয়তো পুরস্কার দেবেন তিনি…
হাত তুললো টেমপার। বুঝতে পেরেছি। ঠিকই বলেছো, জিনিসটা তার শখের। ঘড়ি জোগাড়ের হবি আছে লোকটার। নাম ক্লক।
ক্লক! একই সঙ্গে বলে উঠলো রবিন আর মুসা।
নাম তো তা-ই বলেছে লোকটা। আমার বিশ্বাস, ওটা তার বানানো নাম। আসল নাম অন্য কিছু। নানা রকম ঘড়ি এনেছে আমার কাছে, বিচিত্র সব, ফরমায়েশ। কোনোটাকে দিয়ে চিৎকার করাতে হবে, কোনোটাকে হাসাতে হবে, কোনোটাকে…
আমার কাছেও আসল নাম মনে হচ্ছে না, টেমপারকে থামিয়ে দিলো। কিশোর। নিশ্চয় ঠিকানা দিয়েছে? বলবেন, প্লীজ? আমরা নিজেই নিয়ে যাবো তার কাছে।
ঠিকানা তো দেয়নি, শুধু ফোন নম্বর। বলে, কাউন্টারের নিচের একটা তাক থেকে মোটা এক রেকর্ড বুক বের করলো টেমপার। পাতা উল্টে এক জায়গায়। এসে থামলো। হ্যাঁ, লিখে নাও। এইচ. ক্লক। নম্বর…
নোটবুক বের করে দ্রুত নম্বরটা লিখে নিলো রবিন।
চলবে তো এতে? টেমপার জিজ্ঞেস করলো। অবশ্য আর কিছু জানতেও পারবো না। জানি না। আর হ্যাঁ, ঘড়ির কাজ করাতে হলে নিশ্চিন্তে চলে এসো। যে-কোনো রকম কাজ।…তোমাদের আর কিছু বলার না থাকলে কিছু মনে কোরো না, আমার কাজ পড়ে আছে…
নিশ্চয়, নিশ্চয়, বললো কিশোর। অনেক ধন্যবাদ, স্যার, আপনাকে।
দোকান থেকে বেরিয়ে সঙ্গীদের বললো, আরেক ধাপ এগোনো গেল। এবার ফোন করতে হবে জনাব ঘড়িকে। মোড়ের বুঁদ থেকেই করি, চলো।
কি বলবে? কিশোর বুদে ঢোকার আগে জিজ্ঞেস করলো মুসা।
ঠিকানা জোগাড়ের চেষ্টা করবো, বলে ঢুকে গেল কিশোর।
মুসা আর রবিনও ঢুকলো। জায়গা কম, গাদাগাদি করে দাঁড়ালো ওরা। মুদ্রা ফেলে ডায়াল করলো কিশোর। ওপাশে রিসিভার তুললো, এক মহিলা।
গুড আফটারনুন, গলাটাকে ভারি করে তুললো কিশোর, বড়দের মতো। দক্ষ অভিনেতা সে, ভালো পারে এসব কাজ। টেলিফোন কোম্পানি থেকে বলছি। ক্রসড সার্কিটের গোলমাল হচ্ছে।
ক্রসড সার্কিট? বুঝলাম না, জবাব এলো।
আমরা কমপ্লেন পেয়েছি, আপনার সেকশনে নাকি বেশি বেশি রঙ নাম্বার হচ্ছে। দয়া করে যদি ঠিকানাটা বলেন? সার্কিট চেক করবো।
ঠিকানা? নিশ্চয়। একশো বারো ফ্র্যাঙ্কলিন স্ট্রীট। কিন্তু বুঝতে পারছি না… কথা শেষ করতে পারলো না মহিলা, তার আগেই শোনা গেল চিৎকার। বয়স্ক কোনো মানুষ আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠেছে। যেন জবাই করার জন্ধ্যে চেপে ধরা হয়েছে তাকে।
হাত থেকে রিসিভার ছেড়ে দিলো কিশোর।
.
হ্যানসন, এই ব্লকটাই মনে হচ্ছে, বললো কিশোর। আস্তে চালান। নম্বরগুলো দেখি।
ফ্র্যাঙ্কলিন স্ট্রীট ধরে ধীরে চালালো হ্যানসন। পুরনো এলাকা। এককালের বিশাল বাড়িগুলো এখন মলিন, বিবর্ণ।
ওই যে! চেঁচিয়ে বললো মুসা।
বাঁকের কাছে গাড়ি রাখলো হ্যানসন। নেমে হেঁটে চললো তিন গোয়েন্দা। আশপাশে চোখ রাখছে। নির্জন লাগছে বাড়িটা, জানালার সমস্ত পর্দা টানা। সামনের দরজায় ছোট্ট সিঁড়ি, মাত্র দুটো ধাপ। তাতে উঠে ঘন্টা বাজালো কিশোর।
অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো। আবার বেল বাজাতে যাবে, এই সময় নড়ে উঠলো দরজা। সামান্য ফাঁক হলো। উঁকি দিলো এক মহিলার মুখ। বয়েস তেমন। বেশি না। তবে খুব ক্লান্ত আর বিষণ্ণ দেখাচ্ছে।
মাপ করবেন, কিশোর বললো। মিস্টার ক্লকের সঙ্গে দেখা হবে?
মিস্টার ক্লক? অবাক হলো যেন মহিলা। ওই নামে তো এখানে কেউ থাকে না।
নামটা বোধহয় আসল নয়, সেজন্যে চিনতে পারছেন না। তিনি ঘড়ি পছন্দ করেন। এখানেই তো থাকার কথা। কিংবা হয়তো থাকতেন।
ঘড়ি? তুমি মনে হয় মিস্টার রোজারের কথা বলছে। কিন্তু মিস্টার রোজার…
বলো না! বলো না! পেছন থেকে চেঁচিয়ে উঠলো একটা ছেলে। বয়েস। ওদেরই মতো হবে। কালো চুল। মহিলাকে ঠেলে সরিয়ে পাশে এসে দাঁড়ালো। ভ্রূকুটি করলো গোয়েন্দাদের দিকে চেয়ে। কথাই বলো না ওদের সাথে, মা। দরজা লাগিয়ে দাও। কেন এসেছে ওরা এখানে?
শোন, টিম, মহিলা বললো। এভাবে কথা বলতে নেই। ছেলেগুলোকে তো ভালোই মনে হচ্ছে আমার। মিস্টার রোজারের খোঁজ করতে এসেছে, দোষটা কোথায়?
একটু আগে কি মিস্টার রোজারই চিৎকার করেছিলেন? ফস করে জিজ্ঞেস করে বসলো কিশোর।
কড়া চোখে তাকালো টিম। হ্যাঁ, সে-ই! গলা চড়ালো সে। ওটা তার মরণ চিৎকার, মরে যাচ্ছিলো!যাও, ভাগো এখন আমাদের অনেক কাজ। ওকে মাটি দিতে হবে।
দড়াম করে দরজা বন্ধ করে দিলো ছেলেটা।
শুনলে তো? চাপা গলায় বললো মুসা। লোকটাকে খুন করে এখন কবর দেয়ার কথা ভাবছে।
পুলিশ ডাকা দরকার, বললে রবিন।
আরও পরে, কিশোর বললো। আগে সব কথা জেনে নিই। বাড়িতে ঢোকার চেষ্টা করি।
দরজা ভেঙে ঢুকবে নাকি?
না, মাথা নাড়লো গোয়েন্দাপ্রধান। ওরাই ঢুকতে দেবে। জানালা দিয়ে উঁকি মারছে টিম… বেলপুশ টিপে ধরলো সে। ধরেই রাখলো, যতক্ষণ না, ঝটকা দিয়ে আবার খুললো দরজা।
ভাগতে বললাম না! গর্জে উঠলো টিম। কেন বিরক্ত করছো?
বিরক্ত করলাম কোথায়? নিরীহ কণ্ঠে বললো কিশোর। আমরা একটা রহস্যের তদন্ত করছি, তোমাদের সাহায্য দরকার। এই যে আমাদের কার্ড।
কার্ডটা পড়ে ভুরু কোঁচকালো টিম।
ব্যাগ থেকে চেঁচানো ঘড়িটা বের করে টিমের হাতে দিলো কিশোর।
কৌতূহল ফুটলো টিমের চোখে। এটাতে রহস্যের কি আছে?
ইলেকট্রিক সকেট কোথায়? কি রহস্য, দেখাচ্ছি, বলতে বলতেই ঘরের ভেতর পা ঢুকিয়ে দিলো কিশোর। বাধা দিতে গিয়েও কি ভেবে সরে দাঁড়ালো। টিম। একটা হলঘর, আবছা অন্ধকার। একপাশ থেকে দোতলায় সিঁড়ি উঠে গেছে। আরেক পাশে বিরাট এক গ্র্যাণ্ডফাদার ক্লক, টিকটিক কানে না এলে চোখে, পড়তো না গোয়েন্দাদের। ঘড়ির পাশে টেবিলে টেলিফোন।
রহস্যময় মিস্টার রোজারের লাশ খুঁজছে মুসা আর রবিনের চোখ, দেখতে পেলো না। ঘড়িটার পাশে দেয়ালে সুইচবোর্ডে সকেট দেখে, সেদিকে এগোলো কিশোর। হাতের ঘড়িটা টেবিলে রেখে, সকেটে প্রায় ঢুকিয়ে লিভার অন করতেই চেঁচিয়ে উঠলো ঘড়ি। প্রতিধ্বনিত হলো বদ্ধ ঘরে। রোম, খাড়া হয়ে গেল দুই সহকারী গোয়েন্দার।
শুনলে তো, প্রাগটা খুলে নিয়ে বললো কিশোর। রহস্যময় না ঘড়িটা?
না, মোটেই অবাক হয়নি টিম। যে কেউ ওরকম চেঁচানি ঢোকাতে পারে, ঘড়িতে। দাঁড়াও, দেখাচ্ছি। গ্র্যাণ্ডফাদার ক্লকের পেছন থেকে একটা কর্ড বের করে প্লাগটা সকেটে ঢোকালো সে। শোনা গেল মোটা গলায় আতঙ্কিত চিৎকার, জবাই করার জন্যে চেপে ধরা হয়েছে যেন।
কিশোরের সন্দেহ নেই, ফোনে এই চিৎকারই শুনেছে।
দ্রুত ঘরে এসে ঢুকলো মহিলা। টিম, দোহাই লাগে তোর… ছেলেদের ওপর চোখ পড়তে থেমে গেল। ও, ঢুকতে দিয়েছে তোমাদেরকে? টিম, হঠাৎ মত বদলালি যে?
ওরাও একটা চেঁচানো ঘড়ি নিয়ে এসেছে, সকেট থেকে প্লাগ খুলে ফেলেছে টিম। ছোট। আগে আর দেখিনি। আমার বিশ্বাস ওটা মিস্টার রোজারেরই। টেবিলে রাখা ঘড়িটা মা-কে দেখালো সে।
মাথা নাড়লো টিমের মা। আমিও দেখিনি। কি করে বুঝলি, ওটা মিস্টার। রোজারের?
বুঝেছি। ঘড়িতে চিৎকার ঢোকানোর বুদ্ধি আর কারও মাথায় আসবে না।
না, তা আসবে না, আবার মাথা নাড়লো মহিলা। ছেলেগুলো পেলো কোথায় এটা, বলেছে?
জিজ্ঞেস করিনি এখনও। পরিচয় দিয়েছে, ওরা গোয়েন্দা। ভাবছি, কথা বলবো ওদের সঙ্গে। মিস্টার রোজারের ঘড়িটা নিয়ে এসেছে যখন। একটা দরজা খুলে ইশারায় ভেতরে যেতে বললো তিন গোয়েন্দাকে।
বড় একটা লাইব্রেরি। এক পাশের দেয়ালে ঝোলানো ফ্রেমে বাধা কয়েকটা তৈলচিত্র। আরেক পাশে বিরাট এক আয়না। বাকি দুদিকের দেয়ালে অসংখ্য তাক, বইয়ে ঠাসা। র্যাক আছে অনেকগুলো।
লাইব্রেরিতে বই থাকবে, সেটা স্বাভাবিক, কিন্তু ওদেরকে অবাক করলো ঘড়ি। ছোট বড় নানারকম ঘড়ি রয়েছে ঘরটায়। মেঝেতে, টেবিলে, তাকে, দেয়ালে। নতুন-পুরনো, ছোট-বড়, দামী-কমদামী। তবে সব কটারই একটা বিশেষত্ব আছে, সবগুলোই বিদ্যুতে চলে। ফলে টিকটিক আওয়াজ না করে তুলেছে গুঞ্জন, যেন শত শত মৌমাছিকে কয়েদ করে রাখা হয়েছে ঘরটায়।
কি দেখছো? গোয়েন্দাদের তাজ্জব করে দিয়ে আনন্দ পাচ্ছে টিম। শুনলে আরও অবাক হবে, এর প্রত্যেকটা ঘড়িই চেঁচাতে পারে।
.
চিৎকারে ভরে গেল যেন ঘরটা।
শুরু হলো শিশুর তীক্ষ্ণ চিৎকার দিয়ে। তারপর গর্জাতে লাগলো একজন রেগে যাওয়া মানুষ। তৃতীয়টা বন্য, হিংস্র চিতাবাঘ। তারপর চারদিক থেকে শুরু হলো চিৎকার, কান্না, ফোপানি, গজানি, ফোঁসফোসানি-মানুষেরও, জানোয়ারেরও।
লম্বা একটা কাউচে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে বসেছে তিন গোয়েন্দা। শিউরে উঠছে ক্ষণে ক্ষণে।
একটা ডেস্কের ওপাশে বসে একের পর এক সুইচ টিপছে টিম। দাঁত বের করে হাসছে মেহমানদের দিকে চেয়ে। অবশেষে সব কটা সুইচ অফ করে দিলো। সে। নীরব হয়ে গেল ঘর।
জীবনে কখনও শুনেছো এরকম? বললো টিম।
ঘরটা কি সাউণ্ডপ্রফ? প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো কিশোর। এতোক্ষণে নিশ্চয় পুলিশকে ফোন করে দিয়েছে প্রতিবেশীরা।
অবশ্যই সাউণ্ডপ্রুফ। এটা মিস্টার রোজারের চেঁচানো ঘর। রাতে এখানে বসে। চেঁচানো শুনতেন…মানে… থেমে গেল টিম।
মিস্টার রোজারের কিছু হয়েছে?
কেন? হবে কেন?
ওই যে, শুনতেন বললে। তারপর থেমে গেলে। ভাবলাম, কিছু হয়েছে।
চলে গেছে, ব্যস। তাতে তোমাদের কি?
আমাদের? না, কিছু না। চেঁচানো ঘড়ি দিয়ে শুরু করেছিলাম। ঢুকলাম। চেঁচানো ঘরে। এখন শুনছি এর মালিকই গায়েব। রহস্য জটিল হচ্ছে আরকি। আচ্ছা, বলতে পারো, কেন এতোগুলো ঘড়িতে চিৎকার ঢোকালেন তিনি? কিছু তো বুঝতে পারছি না।
এতে আর বোঝাবুঝির কি আছে? বলে উঠলো মুসা। মাথায় ছিট ছিলো আরকি। নইলে রাতে একলা বসে চেঁচামেচি শোনে কেউ?
এটা তাঁর হবি ছিলো, মিস্টার রোজারের পক্ষ নিলো টিম। অনেক হবিরই কোনো অর্থ থাকে না। তোমাদেরটার আছে?
আছে, মাথা কাত করলো কিশোর। রহস্যের সমাধান করা। এই যেমন, ঘড়ি-রহস্যের সমাধান করতে এসেছি।
আমি তো বলছি, এতে কোনো রহস্য নেই!
তাহলে ওরকম আচরণ করছো কেন? এমন ভাব করছে, যেন দুনিয়ার সবাইকে ঘৃণা করো। খুলে বলছো না কেন? সব শুনলে হয়তো সাহায্য করতে পারবো।
তোমরা কি সাহায্য করবে? জ্বলে উঠলো টিম। আর আমিও অদ্ভুত আচরণ করছি না। তোমরাই বরং করছে। এখন যাও, ওঠো। একা থাকতে দাও আমাকে প্রায় ছুটে গিয়ে দরজা খুলে দিলো সে। পথ দেখো! আর কখনও আসবে না…আরি!
দরজায় দেখা দিলো একজন লোক। তেমন লম্বা নয়, কিন্তু কাধ খুব চওড়া। তিন গোয়েন্দার দিকে চেয়ে ভুরু কোঁচকালো। কারা ওরা, টিম? বন্ধু নিয়ে এসেছো খেলতে, গোলমাল করতে, আমাকে বিরক্ত করতে? বলে দিয়েছি না, হৈ চৈ আমি একদম পছন্দ করি না?
হৈ-চৈ করছি না আমরা, মিস্টার লারমার, গম্ভীর হয়ে বললো টিম। আর শব্দ তো বাইরে যায় না। এই ঘর সাউণ্ডপ্রুফ। আপনার অসুবিধে-..
হাত নেড়ে তাকে থামিয়ে দিলো লারমার। দীর্ঘ এক মুহূর্ত স্থির তাকিয়ে রইলো তিন গোয়েন্দার দিকে, যেন তাদের চেহারা মনে গেঁথে নিলো। বললো, যাচ্ছি। তোমার মায়ের সঙ্গে কথা বলা দরকার।
দুপদাপ করে পায়ের শব্দ হলো দোতলার সিঁড়িতে।
কাউকে তোমাদের বাড়িতে আনলে তার কি? লারমারের ব্যবহারে কিছুটা অবাকই হয়েছে রবিন। বাড়িটা তোমাদের, তাই না?
না, মিস্টার রোজারের। আমার মা তার হাউসকীপার। তিনি চলে যাওয়ার পর ওপর তলার ঘরগুলো লারমারকে ভাড়া দিয়ে কোনোমতে সংসার চালাচ্ছে মা। যাও, এখন যাও তোমরা। ঝামেলাতেই ফেলেছো…
যাচ্ছি। সহকারীদের দিকে ফিরে বললো কিশোর, চলো যাই। টিমকে বললো, অনেক ধন্যবাদ, টিম, ঘড়িগুলো দেখানোর জন্যে।
হলে ফিরে টেবিল থেকে ঘড়িটা তুলে নিয়ে ব্যাগে ভরলো কিশোর। বেরিয়ে চলে এলো রোলস রয়েসটা যেখানে পার্ক করা আছে।
দূর, কোনো লাভ হলো না, গাড়িতে উঠে বললো মুসা। ঘড়ি জোগাড়ের নেশা আছে লোকটার। ব্যস, রহস্য ওই পর্যন্তই।
হুঁ, বলে কি বোঝাতে চাইলো কিশোর, বোঝা গেল না। হ্যানসনকে বললো, হলিউডে এলামই যখন, মিস্টার ক্রিস্টোফারের অফিসে একবার ঢু মেরে যাই। কি বলেন?
নিশ্চয়ই, বলে এঞ্জিন স্টার্ট দিলো হ্যানসন।
দাঁড়ান, দাঁড়ান! বলে উঠলো রবিন।
সবাই দেখলো, টিম দৌড়ে আসছে। পাশের জানালা নামিয়ে দিলো মুসা। কাছে এসে হাঁপাতে লাগলো ছেলেটা। যাক, ধরতে পেরেছি…দেখো, সত্যি আমার সাহায্য দরকার। থেমে দম নিলো সে। আমার বাবা জেলে, কোনো অপরাধ না করেই। তাকে যদি নিরপরাধ প্রমাণ করতে পারতে, বড় উপকার