বাঁচাও! তীক্ষ্ণ চিৎকার। বাঁচাও! খানখান হয়ে গেল নীরবতা।
পুরানো ভাঙা বাড়িটার ভেতর থেকে আসছে আর্তনাদ। শিরশিরে ঠাণ্ডা যোত যেন বয়ে গেল সহকারী গোয়েন্দা মুসা আমানের মেরুদণ্ড বেয়ে।
আবার শোনা গেল চিৎকার। শেষ হলো চাপা ঘড়ঘড় করে। শব্দের ভয়াবহতা বাড়িয়ে দিল আরও।
একটা ব্যারেল পামের গোড়ায় হুমড়ি খেয়ে আছে মুসা, চোখ খোয়া-বিছানো আঁকাঝকা পথের দিকে। কেউ আসছে কিনা দেখছে।
চিৎকার শুনে মুসার মতই পথের অন্য ধারের একটা ঝোপে গিয়ে লুকিয়েছে গোয়েন্দাপ্রধান কিশোর পাশা। চেয়ে আছে বাড়ির দিকে।
অপেক্ষা করছে দুজনেই।
স্প্যানিশ ধাঁচের একটা অনেক পুরানো বিলডিং। অযত্নে বেড়ে পুরানো গাছপালা আর লতার ঘন জঙ্গলে ঘিরে রেখেছে বাড়িটাকে।
আর শোনা গেল না চিৎকার। কিশোর, ফিসফিস করে বলল মুসা। পুরুষ না মহিলা? জানি না, ফিসফিসিয়েই জবাব এল। তবে কোনটার মতই তো লাগল না।
কোনটাই না? ঢোক গিলল মুসা। শিশুও নয়। তাহলে আর একটা সম্ভাবনাই থাকে, যেটা ভাবতেও ভয় পাচ্ছে সে।
আড়াল থেকে বেরোল না ওরা। গরমে ঘামছে দরদর করে। রকি বীচের চেয়ে গরম কি বেশি নাকি হলিউডে?
চারপাশে তাল জাতীয় গাছের ছড়াছড়ি, ঘন ঝোপঝাড়, লতা, আর নানা রকম ফুলগাছ। চমৎকার একটা বাগান ছিল এককালে। কিন্তু অযত্নে অবহেলায় এখন জঙ্গল হয়ে গেছে। ওপাশের বাড়িটাও ঠিকমত চোখে পড়ে না।
এক সময়ের বিখ্যাত অভিনেতা মিস্টার মরিসন ফোর্ডের বাড়ি, চিত্রপরিচালক ডেভিস ক্রিস্টোফারের বন্ধু। প্রিয় কাকাতুয়াটা হারিয়ে খুব মনোকষ্টে আছেন অভিনেতা, বন্ধুকে জানিয়েছেন। পরিচালকই তিন গোয়েন্দাকে অনুরোধ করেছেন ব্যাপারটা একটু তদন্ত করে দেখতে। সেজন্যেই এসেছে কিশোর আর মুসা। গেটের ভেতরে ঢুকেই শুনেছে চিৎকার, লুকিয়ে পড়েছে। কি ঘটে, দেখার অপেক্ষায় রয়েছে।
কিশোর, নিচু স্বরে বলল মুসা, খুঁজতে এলাম কাকাতুয়া। এ-যে দেখছি ভূত! ভূতুড়ে বাড়িতে ঢুকলাম না তো, টেরর ক্যাসলের মত? তিন গোয়েন্দার প্রথম রোমাঞ্চকর অভিযানের কথা মনে করল সে।
খুব আশাব্যঞ্জক, বিশেষ বিশেষ সময়ে কঠিন শব্দ ব্যবহার আর দুর্বোধ করে কথা বলা কিশোরের স্বভাব। আরেকটা কেস বোধহয় পেলাম। চলো, এগোই। কি হয়েছে দেখা দরকার।
ভূতেরা খেলায় মেতেছে। বাজি রেখে বলতে পারি, গিয়ে একটা দরজাও খোলা পাব না, সব তালা বন্ধ। আমাদেরকে দেখলেই ঝটকা দিয়ে দিয়ে খুলে যাবে…
চমৎকার বর্ণনা! বাধা দিয়ে বলল কিশোর। মনে রেখো। ঠিক এভা, গিয়ে বলো রবিনকে, নোট করে নেবে…
দেখো কিশোর, রসিকতার সময় নয় এটা…
কিন্তু মুসার কথায় কান নেই কিশোরের। ঝোপের ভেতর থেকে বেরিয়ে গাছের আড়ালে আড়ালে নিঃশব্দে এগোতে শুরু করেছে বাড়ির দিকে।
মুসাও উঠে দাঁড়াল। পথের অন্য ধারে গাছের আড়ালে থেকে এগোল সে-ও।
বাড়িটা শ-খানেক ফুট দূরে থাকতেই কিসে যেন মুসার পা জড়িয়ে ধরল। টান দিয়ে গোড়ালি ছাড়ানোর চেষ্টা করল সে, বাধন আরও শক্ত হলো। হ্যাচকা টানে পা ছুটিয়ে নেয়ার জন্যে সামনে লাফ দিল। পাল্টা টান দিয়ে ফেলে দেয়া হলো তাকে মাটিতে, কিসে ধরেছে দেখতে পাচ্ছে না ঘন পাতার জন্যে।
কিশোর! চেঁচিয়ে উঠল মুসা। বাঁচাও আমাকে মেরে ফেলল।
ঝোপঝাড় ভেঙে ছুটে এল কিশোর।
দেখো, কিসে জানি টানছে, কোলা ব্যাঙ ঢুকেছে যেন মুসার গলায়, চোখ ছিটকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। টেনে নিয়ে যাচ্ছে গর্তে। অজগর…না না, অ্যানাকোণ্ডা।
ভাবান্তর নেই কিশোরের চেহারায়। শান্তকণ্ঠে বলল, তোমার জন্যে দুঃখ হচ্ছে আমার, মুসা। ভয়ঙ্কর ভিটিস ভিনিফেরায় ধরেছে তোমাকে।
খাইছে! আল্লারে, মরে গেলাম! কিশোর, দোহাই তোমার, ভিটিস বি জানি…বাঁচাও…।
আট ফলার প্রিয় ছুরিটা বের করল কিশোর। ধীরে সুস্থে বসে পেঁচিয়ে কাটতে শুরু করল ভিটিস ভিনিফেরাকে।
টান মুক্ত হতেই লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল মুসা। কিসে ধরেছিল, তাকাল।
নীরব হাসিতে ফেটে পড়ছে কিশোর। ছুরিটা আবার ভাঁজ করে বেল্টে ঝুলিয়ে রাখছে।
ফিক করে হেসে ফেলল মুসা। প্লীজ, কিশোর, রবিনকে বোললা না।
পা ফেলেছিলে লতার ফাঁদে, ভেবেছ সাপ। ওই ভূতের ভয়ই তোমার মনকে . ভারাক্রান্ত করে রেখেছিল, মুসা, উপদেশ দিতে শুরু করল কিশোর। এভাবেই ভয় পেয়ে মরে দুর্বল হৃৎপিণ্ডের লোক, বোকারা ভাবে ভূতে মেরেছে। ভয় আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল তোমার মনকে, ফলে বুদ্ধিসুদ্ধি লোপ পেয়েছিল, বুঝতে পারোনি ওটা সাপ না লতা।
কিশোরের এ ধরনের লেকচারে এখন আর কিছু মনে করে না মুসা, অভ্যস্ত হয়ে গেছে। বলল, ঠিকই বলেছ, ওই চিৎকারই…
সেজন্যেই বিপদে মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হয়। আতঙ্ক বিপদকে আরও বাড়িয়ে দেয়। সেকারণেই মনীষীরা বলেছেন বলেছেন…।
মনীষীরা যেন ভয় পেতেই বলেছেন কিশোরকে, বড় বড় হয়ে যাচ্ছে চোখ। ধীরে ধীরে ঝুলে পড়ছে চোয়াল। চেহারা ফ্যাকাসে। দৃষ্টি মুসার পেছনে।
সত্যি খুব ভাল অভিনেতা তুমি, কিশোর, প্রশংসা করল মুসা। কেন যে টেলিভিশনে অভিনয় বাদ দিলে। গোয়েন্দাগিরির চেয়ে অনেক বেশি উন্নতি করতে পারতে। এভাবে ভয় পাওয়ার অভিনয়… হঠাৎ সন্দেহ হলো তার। ফিরে তাকাল। স্থির হয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে।
অভিনয় করছে না গোয়েন্দাপ্রধান।
বিচ্ছিরি রকম মোটা এক লোক দাড়িয়ে আছে, হাতে ভীষণ চেহারার একটা পুরানো আমলের পিস্তল, পিলে চমকে দেয়। পুরু লেন্সের চশমার জন্যে চোখ দুটো অস্বাভাবিক বড় লাগছে, গোল গোল, যেন মাছের চোখ।
এসো, পিস্তল নাড়লো লোকটা, আগে ঘরে এসো। তারপর শুনব কেন ঢোকা হয়েছে।
মুখ শুকিয়ে গেছে মুসার, পা দুটো যেন দুই মণ ভারি। কোন মতে টেনে টেনে এসে উঠল খোয়া বিছানো পথে। খবরদার, পালানোর চেষ্টা কোরো না, হুশিয়ার করল লোকটা। তাহলে পস্তাবে।
যা বলছে, করো, মূসার কানের কাছে ফিসফিস করল কিশোর। দেখি কি হয়।
পাগলু, জবাব দিল মুসা। পালানোর চেষ্টা করব মরতে? হাঁটতেই তো পারছি না ঠিকমত।
আগে আগে চলেছে দুই গোয়েন্দা।
পেছনে মোটা লোকটার জুতোর মচমচ শব্দে শিরশির করছে মুসার গা, শুয়োপোকা দেখলে অনেকের যে অনুভূতি হয়।
বিশাল সদর দরজার সামনে এসে দাঁড়াল ওরা, ওপরে টালির ছাউনি বেরিয়ে আছে সামনের দিকে।
দরজা খোলো, হুকুম করল লোকটা। জলদি করো। গুলি করার জন্যে আঙুল নিশপিশ করছে আমার।
নব ঘুরিয়ে ঠেলা দিল কিশোর। খুলে গেল দরজা। আবছা অন্ধকার একটা হলঘর।
ডানে ঘোরো, আবার বলল লোকটা। ওই যে, পাশের দরজাটা, খোলো।
আরেকটা বড় ঘরে ঢুকল ওরা। পুরানো আসবাবপত্র। খবরের কাগজ আর বইয়ে ঠাসা। উল্টো প্রান্তের দেয়াল ঘেঁষে সাজানো রয়েছে কয়েকটা বড় বড় চেয়ার, চামড়ায় মোড়া গদি।
যাও, বসো ওখানে।
যা বলা হলো, করল ওরা।
মুখখামুখি দাঁড়িয়ে আছে লোকটা। মুখে সন্তুষ্টির হাসি। পিস্তলের নলের মুখে জোরে ফু দিল, যেন ভেতরে জমে থাকা বালি পরিষ্কার করছে। পথ সুগম করে দিচ্ছে বুলেটের।
এবার বলল, কি চুরি করতে এসেছ?
মিস্টার মরিসন ফোর্ডের কাছে… বলতে গিয়ে বাধা পেল কিশোর।
আমিই মরিসন ফোর্ড।
অ। আপনার কাছেই এসেছি…
কিন্তু এবারও কথা শেষ করতে দিল না ফোর্ড। নাকের একপাশ চুলকাল। আমার কাছে? তাহলে এভাবে লুকিয়ে কেন? চোরের মত?
কে যেন বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার করল, বলে ফেলল মুসা। তাই লুকিয়ে পড়েছিলাম। ভাবলাম ভেতরে চোর-ডাকাত…কত কিছুই তো ঘটছে আজকাল। দিনে-দুপুরেও লোকের বাড়িতে ডাকাত পড়ে।
অ। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে বসল লোকটার। শুনেছ, না?
মিস্টার ফোর্ড, বুঝিয়ে বলল কিশোর, মিস্টার ডেভিস ক্রিস্টোফার পাঠিয়েছেন আমাদের। আপনার নাকি একটা কাকাতুয়া হারানো গেছে, পুলিশ কিছু করতে পারছে না। সেটাই তদন্ত করতে এসেছি আমরা, পাখিটা খুঁজে বের করতে। পকেট থেকে কার্ড বের করে দিল সে। আমি কিশোর পাশা। ও আমার বন্ধু, মুসা আমান।
গোয়েন্দা, না? একনজর দেখেই কার্ডটা পকেটে ঢুকিয়ে রাখল লোকটা। কাকাতুয়া খুঁজতে এসেছ। হাসল।
হাঁপ ছাড়ল মুসা। কিন্তু লোকটার পরের কথায়ই চুপসে গেল আবার।
তোমাদের কথা বিশ্বাস করতে তো ইচ্ছে করছে, চেহারা সুরতও ভালই, চোরের মত না। তোমরা ফিরে না গেলে খুব কান্নাকাটি করবে বাবা-মা, না?
খুব শান্ত ভাবে পকেট থেকে সিগারেট বের করে ঠোঁটে লাগাল লোকটা। পিস্তলের নল প্রথমে ধরল কিশোরের বুক সোজা, তারপর ঘোরাল মুসার দিকে।
টিপে দিল ট্রিগার। চাপা একটা আওয়াজ হলো।
ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলেছিল মুসা, কিছুই ঘটল না দেখে মেলল আবার।
পিস্তলের নলের মাথায় জ্বলছে নীলচে আগুন। সেটা থেকে সিগারেট ধরিয়ে নিচ্ছে মিস্টার ফোর্ড। নাক-মুখ দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল ভকভক করে, ফুঁ দিয়ে আগুন নিভিয়ে পিস্তলটা রেখে দিল টেবিলে।
হায় হায়, ভাবল মুসা, এত ভয় পেলাম। ওই সিগারেট লাইটারটা দেখে? দূর, আমি একটা ভীতুর ডিম। রক্ত ফিরে এল আবার চেহারায়। নড়েচড়ে বসল।
চমৎকার, হাসি হাসি ভাব করে বলল লোকটা। পরীক্ষায় পাশ। নাকি আমার অভিনয় ভাল হয়নি?
আরেকটু হলেই হার্টফেল করতাম, বাড়িতে ঢোকার পর এই প্রথম হাসি ফুটল মুসার মুখে। হাত মেলা। লোকটার নরম তুলতুলে হাতের চাপ খুব শক্ত, দেখে মনে হয় না এরকম হবে।
কিশোরের সঙ্গেও হাত মেলাল লোকটা। এভাবে অভিনয় করে অনেক বয়স্ক লোককেও বেহুশ করে দিয়েছি। আর তোমরা ছেলেমানুষ…ভাল গোয়েন্দাই পাঠিয়েছে ডেভিস। ও-ই বলেছিল, তোমাদের একটা টেস্ট নিতে।
মানে ইয়ে… বিশ্বাস করতে পারছে না যেন কিশোর, মিস্টার ক্রিস্টোফার বলেছেন আমাদের সাহসের পরীক্ষা নিতে!
হ্যাঁ, এই তো, একটু আগে ফোন করল। তবে তোমরা ভালই উৎরেছ। জানাব ডেভিসকে। আর হ্যাঁ, তোমাদের কিছু তদন্ত করতে হবে না, সরি।
কিন্তু আপনিই নাকি মিস্টার ক্রিস্টোফারকে জানিয়েছেন কাকাতুয়া হারিয়েছে? মুসা অবাক।
হারিয়েছিল, মাথা ঝাকাল লোকটা। তাকে জানিয়েও ছিলাম। কিন্তু ওটা যে ফিরে এসেছে, জানানো হয়নি আর। ডিয়ার বিলি, কি কষ্টটাই না দিয়েছে আমাকে।
বিলি? কিশোর জিজ্ঞেস করল, কাকাতুয়াটার নাম?
হ্যাঁ, বিলি শেকসপীয়ার, উইলিয়াম শেকসপীয়ারের…
কিন্তু বাঁচাও বাঁচাও বলে কে চেঁচাল? মুসা বলল, এ বাড়ি থেকেই…
খুব খুঁতখুঁতে তোমরা। গোয়েন্দাগিরির জন্যে ভাল। গলা ফাটিয়ে হাসল লোকটা, দুলে উঠল মস্ত ভুড়ি। ওটা বিলির কাণ্ড। নিজেকে অনেক বড় অভিনেতা ভাবে সে, মাঝেমাঝেই সেটা প্র্যাকটিস করে। আমিই শিখিয়েছিযেন হাজতে আটকে রাখা কয়েদী বিলি, তার ওপর নির্যাতন চলছে…হা-হা-হা।
বিলিকে দেখাবেন, প্লীজ? অনুরোধ করল কিশোর। খুব বুদ্ধিমান পাখি, দেখতে ইচ্ছে করছে।
সরি মেঘ জমল লোকটার চেহারায়। আজ বেশি বাড়াবাড়ি করে ফেলেছিল বিলি। তাকে থামানোর জন্যে শেষে খাঁচার ওপর কাপড় দিয়ে ঢেকেছি। এখন
আবার তুললেই হয়তো চেঁচানো শুরু করবে। মাথাই খারাপ হয়ে গেল, না কী।
ঠিক আছে ঠিক আছে, থাক তাহলে, হাত তুলল কিশোর। তদন্ত করার আর তো কিছু নেই, হতাশ হয়েছে খুব। যাই আমরা, মিস্টার ফোর্ড। আপনার কাকাতুয়া ফিরে এসেছে, এটা অরিশ্যি খুশির খবর।
থ্যাংকু বলল মোটা লোকটা। তোমাদের কার্ড রইল। কখনও দরকার পড়লে ডাকব। তিন গোয়েন্দা, মনে থাকবে।
সদর দরজা পর্যন্ত ছেলেদের এগিয়ে দিয়ে গেল ফোর্ড।
খুব খারাপ লাগছে, আঁকাবাঁকা পথে পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে বলল কিশোর। আশা হয়েছিল, দারুণ একখান কেস মিলেছে। পোড়া নির্জন বাড়ি, আর্তনাদ, অদ্ভুত এক মোটা লোক…বড় বেশি আশা করে ফেলেছিলাম।
আমার ভালই লাগছে, খুশি দেখাচ্ছে মুসাকে। ঢুকেই যা শুরু হয়েছিল, সত্যি সত্যি হলে এ-যাত্রা ঠিক ভূতের হাতে মারা পড়তাম। দরকার পড়লে আবার ডাকবে বলেছে ফোর্ড। না ডাকুক, সেটাই ভাল। ওকে মোটেও পছন্দ হয়নি ডাকবে হেলে এ-যাত্রা ঠিক খুশি দেখাচ্ছে আশা করে ফেলে নির্জন বাড়ি আমার।
হয়তো, কিছু ভাবছে কিশোর। নীরবে এগোল দুজনে, আলগা খোয়ায় জুতোর শব্দ হচ্ছে। হলিউডের একটা পুরানো এলাকা এটা, বড় বড় বাড়ি আছে। কিন্তু প্রায় সব কটাই যত্নের অভাবে ধ্বংস হতে চলেছে। মালিকেরা অভাবী হয়ে পড়েছে অনেকেই, ঠিকমত যত্ন নিতে পারে না। কিংবা যাদের এখনও টাকা আছে, তারা আর পছন্দ করতে পারছে না এলাকাটা। অন্য জায়গায় নতুন বাড়ি করে উঠে গেছে।
গেটের বাইরে পথের মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে কালো রোলস-রয়েস, জায়গায় জায়গায় সোনালি কাজ করা, আয়নার মত চকচকে শরীর, কিন্তু মডেলটা পুরানো। ইচ্ছে করেই বানানো হয়েছে। একবার বাজি জিতে গাড়িটা তিরিশ দিনের জন্যে ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছিল তিন গোয়েন্দা। এখনও দরকার পড়লে করে, তবে ভাড়া দিতে হয়। খরচ দেয় তাদের এক বন্ধু, অগাস্ট অগাস্ট, রক্তচক্ষু উদ্ধারে তাকে সহায়তা করেছিল তিন কিশোর।
বাড়ি চলুন, হ্যানসন, শোফারকে বলল কিশোর। কাকাতুয়াটা ফিরে এসেছে।
তাই নাকি? ভাল, বিশুদ্ধ ইংরেজিতে বলল হ্যানসন, খাঁটি ইংরেজ বলে গর্ব আছে তার। চলুন।
গাড়ি ঘোরাচ্ছে হ্যানসন।
মিস্টার ফোর্ডের বাগানের দিকে চিন্তিত ভঙ্গিতে চেয়ে আছে কিশোর। গাছের জঙ্গলের জন্যে বাড়িটা দেখা যায় না।
মুসা, হঠাৎ বলল সে, ভাল করে দেখো। কোথায় জানি একটা গোলমাল রয়েছে, ধরতে পারছি না।
কি? বাগানে?
বাগান, ড্রাইভওয়ে, পুরো বাড়িটাই। মাথার ভেতরে কিছু একটা খোঁচাচ্ছে, বের করে আনতে পারছি না।
হাসালে। কিশোর পাশা যেটা বুঝতে পারে না, সেটা আমি পারব?
নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটতে শুরু করেছে কিশোর, মুসার কথা কানে ঢুকল বলে মনে হলো না। গভীর চিন্তায় ডুবে গেছে।
হ্যানসনকে গাড়ি থামাতে বলে ভালমত দেখল মুসা। কিন্তু গোলমাল চোখে পড়ছে না। অযত্নে বেড়ে উঠেছে বাগান, মালির হাত না লাগলে উঠবেই, স্বাভাবিক ব্যাপার। ড্রাইভওয়েতে তালের পাতা জমে আছে, মাড়িয়ে গেছে গাড়ির চাকা। এতেও অস্বাভাবিক কিছু নেই।
নাহ্, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না, মাথা নাড়ল মুসা। গাড়ি ছাড়তে বলল হ্যানসনকে।
কিশোরের কোন খেয়ালই নেই যেন।
গোটা দশেক রক পেরিয়েছে গাড়ি, আচমকা চেঁচিয়ে উঠল কিশোের। হ্যানসন! ঘোরান! গাড়ি ঘোরান! কুইক!
ঘোরাচ্ছি, কিশোরের স্বভাব হ্যানসনেরও জানা, কোন কারণ না থাকলে ঘোরাতে বলত না। তাই কোন প্রশ্ন করল না সে।
কিশোর, কি হয়েছে? আবার কেন?
গোলমালটা ধরে ফেলেছি, উত্তেজনায় লাল হয়ে গেছে গোয়েন্দাপ্রধানের মুখ। মিস্টার ফোর্ডের বাড়িতে টেলিফোন লাইন নেই।
লাইন নেই? তাতে কি?
কারেন্টের লাইন আছে, কিন্তু টেলিফোনের নেই। অথচ ফোনে কথা বলল কি করে মিস্টার ফোর্ড, মিস্টার ক্রিস্টোফারের সঙ্গে? মিথ্যে বলেছে। আর তাই যদি হয়ে থাকে, তাহলে আর যা যা বলেছে, সবই মিছে কথা।
মিছে কথা? মাথা নাড়ল মুসা। কেন বলবে?
কারণ লোকটা মিস্টার ফোর্ড নয়। ভণ্ড, প্রতারক। খুব সম্ভব আসল মিস্টার ফোর্ডই তখন বাঁচাও বাঁচাও বলে চেঁচিয়েছিলেন।
নয়টা ব্লক নিঃশব্দে পেরিয়ে এল বিশাল রোলস-রয়েস।
মিস্টার ফোর্ডের গেট দিয়ে ছোট আরেকটা গাড়ি বেরোচ্ছে, মোড় নিয়ে। এগিয়ে আসতে শুরু করল এদিকেই। গতি বাড়ছে, সঁ করে চলে গেল পাশ দিয়ে। পলকের জন্যে ড্রাইভারকে চোখে পড়ল। মোটাসোটা, চোখে চশমা। অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে রেখেছে।
মিস্টার ফোর্ড যাচ্ছেন, চেঁচিয়ে বলল মুসা।
ভুল, শুধরে দিল কিশোর, ও মিস্টার ফোর্ড নয়। হ্যানসন, পিছু নিন।
ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষল শোফার। বন বন করে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে মুখ ফেরাল আবার গাড়ির।
মোড়ের কাছে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে কালো গাড়িটা।
ধরতে পারলে কি করব? প্রশ্ন করল মুসা। ওর বিরুদ্ধে কোন প্রমাণ নেই। বরং আসল ফোর্ডের অবস্থা গিয়ে দেখা উচিত। সাহায্য লাগতে পারে।
দ্বিধা করছে কিশোর। মাথা ঝাকাল। ঠিকই বলেছ। আগে মিস্টার ফোর্ডকে দেখা দরকার, কি অবস্থায় রয়েছেন কে জানে। সরি, হ্যানসন, আবার ঘোরান।
এবার আর বাইরে নয়, কিশোরের নির্দেশে গেটের ভেতরে গাড়ি ঢোকাল হ্যানসন, গাড়িপথ ধরে এগোল।
সরু পথ, এতবড় গাড়ির উপযুক্ত নয়। দুপাশের ঝোপঝাড়ের পাতা, লতার ডগা আর পামের পাতা ঘষা খাচ্ছে গাড়ির গায়ে।
অবশেষে পুরানো বাড়ির গাড়িবারান্দায় এসে থামল গাড়ি, খানিকক্ষণ আগে এখানেই আরেকবার এসেছিল দুই গোয়েন্দা।
মুসা, শান্ত কণ্ঠে বলল কিশোর, যে গাড়িটা বেরিয়ে গেল, ওটার বিশেষ কিছু চোখে পড়েছে?
টু-ডোর, স্পোর্টস মডেল রেঞ্জার, খুব ভাল ইংলিশ কার, বলল মুসা। নতুন ক্যালিফোর্নিয়ার নাম্বার, পুরোটা বলতে পারব না, তবে শেষ দুটো নাম্বার ওয়ান থ্রী।
হ্যানসন, আপনি দেখেছেন নম্বরটা?
না। গাড়ি চালানোয় ব্যস্ত ছিলাম। নজর পথের ওপর। তবে রেঞ্জার ঠিকই। লাল চামড়ার গদি।
যাক, কিছু তথ্য জানা থাকল, বলল কিশোর। পরে মোটা লোকটা আর তার গাড়ি খুঁজে বের করব। দরজা খুলে নামল সে। এখন দেখি মিস্টার ফোর্ডের কি অবস্থা।
কিশোরকে অনুসরণ করল মুসা। বুঝতে পারছে না, কিভাবে পরে লোকটা আর তার গাড়ি খুঁজে বের করবে গোয়েন্দাপ্রধান, দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার লাখ লাখ গাড়ির ভেতর থেকে।
তবে বলেছে যখন, উপায় একটা করবেই কিশোর, তাতে কোন সন্দেহ নেই মুসার।
হঠাৎ থমকে গেল ওরা। বিষণ্ণ বাড়িটা থেকে আবার শোনা গেল সাহায্যের আবেদন, বাঁচাও!…শুনছ কেউ?…প্লীজ, আমাকে ছাড়াও…
জোর নেই তেমন গলায়। মারা যাচ্ছে নাকি? তাড়াতাড়ি বলল মূসা, চলো তো, দেখি।
পেছন দিক থেকে এসেছে আওয়াজ, ওদিকে ছুটল দুই গোয়েন্দা। একটা দরজা সামান্য ফাঁক হয়ে আছে, ওখান দিয়েই বোধহয় বেরিয়ে গেছে মোটা লোকটা, তাড়াহুড়োয় খেয়াল করেনি ভালমত লাগল কি-না।
ঢুকে পড়ল দুজনে। আবছা অন্ধকার। মিটমিট করে চোখে সইয়ে নিল স্বল্প আলো।
কান পেতে শুনছে। নীরব। কোথায় যেন পুরানো তক্তায় চাপ লাগার মৃদু খচখচ,আওয়াজ হলো।
ওই যে, ওই হলটায় ঢুকেছিলাম তখন, হাত তুলে দেখাল কিশোর। চলো, উল্টো দিকের ঘরটায় ঢুকি। ওই যে দরজা।
ঠেলা দিতেই খুলে গেল দরজাটা। বড় একটা লিভিং রুম। ঘুলঘুলি লাগানো মস্ত জানালা আছে একটা।
কে…কে ওখানে? দুর্বল কণ্ঠে বলে উঠল কেউ জানালাটার কাছ থেকে। জানালার নিচে বিশাল এক ফুলের টব, লাল একটা ফুল ফুটে আছে। মুসার মনে হলো, ফুলটাই যেন কথা বলেছে।
কেউ…কেউ এসেছ? গুঙিয়ে উঠল যেন ফুলটা।
টবের ছড়ানো পাতার ওপাশে একটা নড়াচড়া চোখে পড়ল মুসার। বড় বড় পাতাগুলো প্রায় ঢেকে রেখেছে শরীরটা।
ওই যে, চেঁচিয়ে উঠল মুসা।
কাত হয়ে পড়ে আছে রোগা পাতলা একটা দেহ, হাত-পা বাঁধা।
বাঁধন খুলে মিস্টার ফোর্ডকে ধরে ধরে এনে একটা সোফায় বসিয়ে দিল মূসা আর কিশোর। ক্লান্তিতে এলিয়ে পড়লেন তিনি। ফিসফিস করে ধন্যবাদ দিলেন ছেলেদের।
একটা চেয়ার টেনে মুখোমুখি বসল কিশোর। পুলিশকে খবর দিচ্ছি।
না না,আঁতকে উঠলেন ফোর্ড। ফোনও নেই। খবর দেয়া যাবে না। আমাদের গাড়িতে ওয়্যারলেস টেলিফোন আছে।
না, গড়িয়ে পড়লেন তিনি, কনুইয়ে ভর দিয়ে আধশোয়া হয়ে তাকালেন কিশোরের দিকে। তুমি কে? এখানে এলে কিভাবে?
একটা কার্ড বের করে দিল কিশোর। মিস্টার ক্রিস্টোফার তাদেরকে পাঠিয়েছে, জানাল।
ডেভিসের কাছে আমি ঋণী হয়ে গেলাম।
সত্যি বলছেন পুলিশ ডাকব না? আপনাকে জোর করে বেঁধে ফেলে রেখে গেল, এটা অপরাধ
না। তোমরা গোয়েন্দা, তোমরাই আমার কাকাতুয়াটাকে খুঁজে দাও। পুলিশকে আর ডাকছি না আমি। জানিয়েছিলাম ওদের। প্রথমে বলল, হয়তো উড়ে চলে গেছে। আমি চাপাচাপি করায় শেষে বলল, পাবলিসিটির জন্যে নাকি আমি
এমন করছি।
হুঁ, বুঝলাম। এখন ডাকলে আবার বলবে, পাবলিসিটির নতুন ফন্দি করেছেন।
হ্যাঁ, বুঝেছ। তাহলে কোন পুলিশ নয়, কথা দাও?
কথা দিল কিশোর, পুলিশকে কিছু বলবে না। হারানো কাকাতুয়ার ব্যাপারে সব খুলে বলার অনুরোধ জানাল।
বিলিকে খুব ভালবেসে ফেলেছি, বললেন ফোর্ড। ওর পুরো নাম বিলি শেকসপীয়ার। উইলিয়াম শেকসপীয়ার কে ছিলেন, নিশ্চয় জানো।
জানি। দুনিয়ার সেরা নাট্যকারদের একজন। পনেরোশো চৌষট্টি সালে ইংল্যাণ্ডে জন্মেছিলেন, মারা গেছেন যোলোমশা মোল সালে। তার নাটকগুলো এখনও মঞ্চস্থ হয় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। বেশি জনপ্রিয় নাটকটা বোধহয় হ্যামলেট।
বহুবার অভিনয় করেছি আমি হ্যামলেটে, উদ্দীপ্ত হয়ে উঠলেন ফোর্ড। দর্শকরা বলত, খুব ভাল অভিনয় করি। সোজা হয়ে বসে এক হাত রাখলেন বুকে, আরেক হাত সোজা করে নাটকীয় ভঙ্গিতে ভরাট গলায় বললেন, টু বি, অর নট টু বি, দ্যাট ইজ দা কোয়েশচেন। ছেলেদের দিকে ফিরে বললেন, হ্যামলেটের একটা ডায়লগ। সম্ভবত শেকসপীয়ারের লেখার সবচেয়ে পরিচিত লাইন। আমার কাকাতুয়াটাও শিখেছিল, বার বার আউড়াতো।
শেকসপীয়ারের ডায়লগ বলত? মুসা বলল। খুব শিক্ষিত পাখি তো।
তা বলতে পারো। কথায় ব্রিটিশ টান ছিল। একটা মাত্র জন্মদোষ ছিল পাখিটার।
জন্মদোষ? জিজ্ঞেস করল কিশোর।
হ্যাঁ, তোতলামি। সে বলত : টু-টু-টু বি অর নট টু-টু-টু বি, দ্যাট ইজ দা কোয়েশচেন।
আগ্রহে উজ্জল হলো কিশোরের চোখ। শুনলে, মুসা? কাকাতুয়া তোতলায়, এই প্রথম শুনলাম। বোঝা যাচ্ছে, দারুণ একখান কেস পেয়েছি।
মুসারও তাই মনে হলো। তবে কিশোরের মত খুশি হলো না, শঙ্কিত হলো।
বিশ্রাম নিয়ে শক্তি ফিরে পেয়েছেন আবার মিস্টার ফোর্ড। খুলে বললেন সব। তিন হপ্তা আগে পাখিটা কিনেছেন তিনি, এক ফেরিওলার কাছ থেকে। ছোটখাট একজন লোক, কথায় জোরালো মেকসিকান টান, গাধায় টানা ছোট একটা গাড়িতে করে এসেছিল।
এক মিনিট স্যার, হাত তুলল কিশোর। আপনার বাড়িতে এল কি করে সে?
ও, মিস জলি বোরো পাঠিয়েছে, আমার পাশের রকটায়ই থাকে। সে-ও একটা কাকাতুয়া কিনেছে। যখন শুনল, শেকসপীয়ারের ডায়লগ বলে বিলি, ভাবল, আমি ইনটারেসটেড হব। তাই পাঠাল।
তাই? নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটল কিশোর। সব সময়ই কাকাতুয়া ফেরি করে নাকি লোকটা? পাখিই শুধু বিক্রি করে?
তা-তো জানি না, চোখ মিটমিট করলেন ফোর্ড। আমার কাছে যখন এল, সঙ্গে মাত্র দুটো খাঁচা। একটায় বিলি। আরেকটায় অদ্ভুত একটা কালচে পাখি, দেখে মনে হয়েছে বারোমেসে রোগী। ফেরিওলা জানাল, ওটা দুর্লভ কালো কাকাতুয়া। কিন্তু ওরকম কোন পাখি আছে বলে শুনিনি। লোকটা বলল, পাখিটার রোগা চেহারা দেখে কেউ কিনতে চায় না।
ফেরিওলার নাম জিজ্ঞেস করেছিলেন? কিংবা গাড়িটার কোন নাম ছিল?
না, মাথা নাড়লেন অভিনেতা। পুরানো মলিন কাপড়চোপড় পরনে ছিল, কাশছিল বারে বারে। কাকাতুয়াটা বিক্রি করতে পারলে যেন বেঁচে যায়, এমন ভাবসাব। জিজ্ঞেস করায় বলল, তোতলা বলে নাকি কিনতে চায় না কেউ।
গাড়িটা সাধারণ দু-চাকার গাড়ি, না?
হ্যাঁ। কবে যে রঙ করেছে কে জানে। গাধাটার স্বাস্থ্যও বিশেষ সুবিধের না। ডিংগো বলে ডাকছিল।
কিশোর, মুসা বলল, কাকাতুয়াটা চুরি করে আনেনি তো?
মনে হয় না। ভোলাখুলি রাস্তায় নিয়ে বেরোনোর সাহস করত না তাহলে। চিন্তিত দেখাচ্ছে কিশোরকে। তবে একটা ব্যাপার পরিষ্কার, বিলির আসল মালিক নয় সে, বুলিও সে শেখায়নি।
কি করে বুঝলে?
সহজ। মিস্টার ফোর্ড বলছেন, কাকাতুয়াটার কথায় বিশিট টান ছিল। অথচ ফেরিওলার কথায় মেকসিকান্ত টান।
বিষ খেয়ে মরা উচিত আমার, কি শাস্তি হওয়া উচিত তার সে-ব্যাপারে বিন্দুমাত্র স্বজনপ্রীতি দেখাল না মুসা, মনে মনে বলল। এই সহজ কথাটা বুঝলাম না? আমি গোয়েন্দাগিরির অযোগ্য।
মিস্টার ফোর্ড, বলল কিশোর, পাখিটাহারাল কিভাবে খুলে বলুন তো।
বলছি, ছোট্ট কাশি দিয়ে গলা পরিষ্কার করে নিলেন অভিনেতা। দিন তিনেক আগে বিকেলে হাঁটতে বেরিয়েছিলাম। দরজায় তালা লাগাইনি, জানালাও খোলা ছিল। ফিরে এসে দেখলাম বিলি নেই। ড্রাইভওয়েতে গাড়ির চাকার দাগ। আমার নিজের কোন গাড়ি নেই। অনুমান করতে অসুবিধে হলো না, গাড়ি করে এসেছিল, বিলিকে চুরি করে নিয়ে গেছে। ক্ষোভের সঙ্গে বললেন, অথচ পুলিশের বক্তব্য, বিলি উড়ে চলে গেছে। আচ্ছা তুমিই বলো, খাঁচা নিয়ে উড়ে যায় কি করে কাকাতুয়া? সম্ভব? এই হলোগে আমাদের পুলিশ সাহেবদের বুদ্ধি।
না, তা সম্ভব নয়, একমত হলো কিশোের। আজকের কথা বলুন। কি কি ঘটেছিল? কেন এসেছিল মোটা লোকটা? কেনই বা আপনাকে বেঁধে ফেলে গেল?
ওই শয়তানটা! জ্বলে উঠলেন ফোর্ড। প্রথমে এসে বলল, তার নাম হাইমাস, পুলিশের লোক। ভাবলাম, বুঝি মত পালটেছে পুলিশ, আমার পাখিটার ব্যাপারে তদন্ত করতে এসেছে। ডেকে এনে বসালাম ঘরে। নানা রকম প্রশ্ন শুরু করল কাকাতুয়া সম্পর্কে। ফেরিওলার কাছ থেকে আমার প্রতিবেশি কেউ আর কোন কাকাতুয়া কিনেছে কিনা জানতে চাইল। মিস জলি বোরোর কথা বললাম।
শুনে খুব উৎসাহী হয়ে উঠল ব্যাটা। জিজ্ঞেস করল, আমার কাকাতুয়াটা কি বুলি আউড়ায়। বললাম, সে কথা পুলিশকে আগেই বলেছি। দ্বিধাগ্রস্থ হয়ে পড়ল লোকটা। আরেকবার বলার জন্যে অনুরোধ করল। নিছক রুটিন-চেকের খাতিরেই নাকি শুনতে চায়। বললাম : মাই নেইম ইজ বিলি শেকসপীয়ার। টু বি অর নট টু বি দ্যাট ইজ দা কোয়েশচেন।
শুনে খুব উত্তেজিত হয়ে উঠল সে। নোট বই বের করে লিখে নিল।
পাখিটা যে তোতলায় বলেননি তাকে? মুসা জিজ্ঞেস করল।
না, কপালে হাত বোলালেন অভিনেতা। বললে পুলিশ হাসবে মনে করে বলিনি। সোজা কথাই বিশ্বাস করে না, আর তোতলা কাকাতুয়ার কথা করবে।
অথচ, মিস্টার হাইমাস খুব উত্তেজিত হয়ে পড়ল, বলল কিশোর, ঠিক প্রশ্ন নয়। আর কিছু জানাতে পারেন?
না, আর তেমন কিছু… মাথা নাড়তে গিয়েও নাড়লেন না অভিনেতা, হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে পড়েছে। হাইমাস জিজ্ঞেস করেছে, ফেরিওলার কাছে বিক্রি করার মত আর কোন কাকাতুয়া ছিল কিনা। কালো পাখিটার কথা জানালাম। বলতেই এমন উত্তেজিত হয়ে পড়ল।
নিচয় ব্ল্যাকবিয়ার্ড, চেচিয়ে উঠল সে। যা, নিশ্চয় ব্ল্যাকবিয়ার্ড। তার এই ভাবভঙ্গি দেখে সন্দেহ হলো আমার। শিওর হয়ে গেলাম, হাইমাস পুলিশের লোক নয়।
নোট নিতে নিতে মুখ তুলল কিশোর, মিস্টার ফোর্ড, আপনার কাকাতুয়া কেমন তাই জিজ্ঞেস করা হয়নি। কি জাতের? নানারকম প্রজাতি আছে, জানেনই তো।
সরি, জানি না। তবে বিলি খুব সুন্দর, মাথা আর বুক হলুদ রঙের।
হ্যাঁ, তারপর? হাইমাস বুঝল, আপনি সন্দেহ করেছেন?
বুঝবে কি? আমিই তো বলছি। রেগে গিয়ে বলেছি, কিভাবে বলেছেন, অভিনয় করে দেখালেন, তুমি পুলিশের লোক নও। তুমি একটা ভণ্ড, প্রতারক, চোর, আমার বিলিকে চুরি করেছ। জলদি ওকে ফিরিয়ে দাও, নইলে মজা বুঝিয়ে ছাড়ব।
তারপর? জিজ্ঞেস করল কিশোর।
তারপর, বাইরে একটা শব্দ শুনলাম। লাফ দিয়ে উঠে জানালার কাছে চলে গেল হাইমাস। গাড়িপথ ধরে তোমাদেরকে আসতে দেখল। ভাবল, পুলিশ নিয়ে এসেছ। আমাকে কাবু করে হাত-পা বেঁধে ফেলল। মুখে রুমাল গুঁজে দিল, তার আগে কয়েকবার চেচাতে পেরেছি। বেশি ঠেসে ঢোকায়নি রুমাল, পরে আবার ফেলে দিতে পেরেছি। তা নইলে তোমাদের ডাকতে পারতাম না। হাত নাড়লেন ফোর্ড। কিন্তু কেন কি হচ্ছে, কিছুই মাথায় ঢুকছে না। আমি তো কারও কোন ক্ষতি করিনি। আমারই পাখি চুরি করেছে, আমার ওপরই যত…যাকগে, এখন আমার বিলিকে ফেরতে পেলেই হলো। তোমরা সাহায্য করবে?
সাধ্যমত করব স্যার, কথা দিল কিশোর।
মিস্টার ফোর্ডের কাছে আর কিছু জানার নেই। তাকে ধন্যবাদ আর বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে এল দুই গোয়েন্দা।
ডলে ডলে গাড়িটাকে আরও চকচকে করে তুলছে হ্যানসন, ছেলেদেরকে দেখে থেমে গেল। এবার কোথায় যাব, মাস্টার পাশা?
বাড়ি চলুন।
আঁকাবাকা লম্বা গাড়িপথ পেরোচ্ছে রোলস রয়েস। মুসার দিকে ফিরল কিশোর। মনে হয়, হাইমাসই বিলিকে চুরি করেছে। আরও তথ্য জানার জন্যেই ফিরে এসেছে, মিস্টার ফোর্ডের সঙ্গে কথা বলেছে। আমাদের পয়লা কাজ, ওকে খুঁজে বের করা।
আমি ভরসা পাচ্ছি না, সত্য কথাই বলল মুসা। খুব বাজে লোক। তখন সিগারেট লাইটার বের করে ভয় দেখিয়েছে। ঠেকায় পড়লে আসল পিস্তল বের করে গুলিও করে বসতে পারে, ওকে বিশ্বাস নেই। তাছাড়া, কি সূত্র আছে আমাদের হাতে? খুঁজে বের করব কিভাবে?
সেটাই ভাবছি। কোন উপায় নিশ্চয় হ্যানসন, লাগল লাগল।
সতর্ক করার দরকার ছিল না। কিশোরের আগেই ধূসর সেডানটাকে দেখে ফেলেছে হ্যানসন। সাই করে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে রাস্তা থেকে সরিয়ে নিয়েছে রোলস রয়েসকে। পুরানো, অবহেলিত একটা ফুলের বিছানা মাড়িয়ে একেবারে নষ্ট করে দিল। আর কিছু করারও ছিল না।
বেখেয়ালে গাড়ি চালাচ্ছে সেডানের ড্রাইভার। দুর্ঘটনা যে এড়ানো গেছে, এই যথেষ্ট, তা-ও হ্যানসন, সতর্ক থাকায়।