ছিনতাই – তিন গোয়েন্দা – সেবা প্রকাশনী
প্রথম প্রকাশ – জুলাই, ১৯৮৮
অবশেষে এল সেই বহু প্রতীক্ষিত দিন।
সাউথ আমেরিকান এয়ারলাইনসের বিমানে চড়ল তিন গোয়েন্দা, সঙ্গে জরজিনা পারকার, যাবে দক্ষিণ আমেরিকার রিও ডি জেনিরোতে। এবার ছুটিতে ব্রাজিল দেখবে ওরা। সমস্ত খরচ দিয়েছেন জিনার বাবা মিস্টার পারকার, এটা তার তরফ থেকে জিনার জন্মদিনের উপহার।
লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে প্লেনে নিউইয়র্ক এসেছে ওরা, এখানে প্লেন বদল করতে হয়েছে।
বসার জায়গা দেখিয়ে দিল সুন্দরী স্টুয়ার্ডেস।
সবাই হাসিখুশি, তবে জিনাকে কিছুটা উদ্বিগ্ন মনে হচ্ছে, রাফিয়ানের জন্যে দুশ্চিন্তা। মানুষের সঙ্গে একসাথে যাওয়ার নিয়ম নেই, প্লেনে জন্তু-জানোয়ারের জন্যে আলাদা ব্যবস্থা।
স্টুয়ার্ডেসকে জিজ্ঞেস করল জিনা, আমার কুকুরটাকে ঠিকমত ভোলা হয়েছে, জানেন?
কিচ্ছু ভেব না। তোমাদের মতই আরামে যাবে কুকুরটাও, আরেকটা হাসি উপহার দিয়ে চলে গেল স্টুয়ার্ডেস।
আশ্বস্ত হলো জিনা। নরম গদিমোড়া সীটে আরাম করে হেলান দিয়ে চারদিকে তাকাল। জানালার ধারে বসেছে সে। তার পাশে মুসা আমান। ওদের পেছনের সীটে কিশোর পাশা আর রবিন মিলফোর্ড।
যাত্রীরা সব অল্পবয়েসী, কিশোর-কিশোরী, কিংবা আরও ঘোট স্কুল লেভেলের ওপরে কেউ নেই। সবারই ছুটি, কেউ পেয়েছে জন্মদিনের উপহার, কেউ বা পরীক্ষায় ভাল ফল করার প্রেজেন্ট-এই বেড়াতে যাওয়া।
হাসছে, কথা বলছে, উত্তেজনা আর খুশিতে গলা ফাটিয়ে চেঁচাচ্ছে কেউ কেউ বা গান ধরেছে বেসুরো গলায়। কোলাহল, কলরবে মুখর করে তুলেছে বিরাট বিমানের বিশাল কেবিন।
খাইছে! ঝকঝকে সাদা দাঁত বের করে হাসল মুসা। চিড়িয়াখানায় ঢুকলাম নাকিরে বাবা?
খানিক পর সবাইকে সীট-বেল্ট বাঁধার নির্দেশ দিল স্টুয়ার্ডেস।
রানওয়েতে চলতে শুরু করল বিমান।
বিমান বন্দরের বড় বড় ভবনগুলো যেন ছুটতে লাগল জানালার পাশ দিয়ে।
আকাশে উঠল বিমান। যাত্রা হলো শুরু।
দেখতে দেখতে ছাড়িয়ে এল শহর। নদী-নালা মাঠ-বন পেরিয়ে বেরিয়ে এল খোলা সাগরের ওপর। নিচে নীল আটলান্টিক।
শোনা গেল স্টুয়ার্ডেসের কণ্ঠ, চুপ করার অনুরোধ জানাচ্ছে। সিনেমা দেখানো হবে।
কেবিনের সামনের দিকে ওপর থেকে সাদা পর্দা নেমে এল। নিভে গেল আলো। ছবি শুরু হলো।
সিনেমা শেষে এল খাবার।
খেয়েদেয়ে আবার জাঁকিয়ে বসে গল্প শুরু করল কেউ, কেউ মিউজিক শুনতে লাগল, কেউ ঘুমিয়ে পড়ল, কেউ বা জানালা দিয়ে তাকিয়ে রইল সাগরের দিকে। দিগন্তজোড়া বিশাল এক নীল চাদর যেন বিছিয়ে রয়েছে, মাঝে মাঝে ছোট-বড় দ্বীপগুলোকে দেখাচ্ছে সবুজ ফুটকির মত। খুব সুন্দর।
স্যান স্যালভ্যাডরে নামল বিমান।
স্টুয়ার্ডেস জানাল, এখানে কিছুক্ষণ দেরি করবে প্লেন, যাত্রীরা ইচ্ছে করলে নেমে খানিকক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে আসতে পারে, চাইলে এয়ারপোর্ট ক্যাফেটেরিয়া থেকে কোকা কোলা কিংবা মিল্কশেক খেয়ে আসতে পারে। অনেকেই নামল।
তিন গোয়েন্দা বসে রইল, কিন্তু জিনা নামল। অনেকক্ষণ রাফিয়ানকে দেখেনি, আবার দুশ্চিন্তা শুরু হয়েছে তার। কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে দেখে আসবে। একবার।
ঠিকই বলেছে স্টুয়ার্ডেস, সত্যি, খুব আরামে রাখা হয়েছে কুকুরটাকে। তার কেবিনে রাফিয়ানই একমাত্র যাত্রী, আর কোন কুকুর কিংবা অন্য জানোয়ার নেই।
ফেরার পথে সরু গলিতে ধাক্কা লাগল একটা লোকের সঙ্গে। দোষটা কার। বোঝা গেল না, দুজনেরই তাড়াহুড়ো। জিনা নাহয় উঠেছে কুকুর দেখতে, কিন্তু লোকটা কেন উঠেছে।
জিনা তাকে চেনে, নাম চ্যাকো। বাচ্চাদের দেখেশুনে রাখার জন্যে চারজন। লোক দিয়েছে ট্রাভেল এজেন্সি, চারজন কেয়ার টেকার, চ্যাকো তাদের একজন।
ভুরু কুঁচকে তাকাল চ্যাকো। দেখে চলতে পারো না?
আপনিও তো দেখে চলতে পারেন, পাল্টা জবাব দিল জিনা।
ক্ষণিকের জন্যে জ্বলে উঠল লোকটার চোখ, তারপর জিনাকে অবাক করে দিয়ে হাসল। মাথা নাড়ল আপনমনেই। নেমে চলে গেল একটা সিগারেটের দোকানের দিকে।
ফিরে এসে বন্ধুদেরকে জানাল জিনা।
মুসা আর রবিন দুজন দুরকম মন্তব্য করল।
ও কিছু না, শান্ত কণ্ঠে বলল কিশোর। বাচ্চাকাচ্চা সামলানো, যা-তা ব্যাপার নাকি। সব তো বিচ্ছু। ওর জায়গায় হলে আমার মেজাজ আরও আগেই খারাপ হয়ে যেত।
কিন্তু তবু মেনে নিতে পারছে না জিনা, ওভাবে না ধমকালেও পারত।
পরে তো আবার হেসেছে, মুসা বলল। তুমিও তো ভাল ব্যবহার করোনি। ধাক্কা মেরেছ, তারপর ক্ষমা চাওয়া তো দূরের কথা, মুখে মুখে আবার তর্ক করেছ। তারপরও মেজাজ ঠাণ্ডা হচ্ছে না তোমার। কে বেশি বদমেজাজী? জিনা, কিছু মনে। করো না, এ-কারণেই লোকে পছন্দ করে না তোমাকে।
তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল জিনা, ওই হারামীটার সঙ্গে আমার তুলনা করছ।
আহহা, হাত তুলল কিশোর, গেল তো লেগে। জিনা এ-রকম যদি করো, আর কখনও তোমার সঙ্গে কোথাও যাব না।
কেন, মুসার দোষ দেখছ না? ও আমাকে বাজে কথা বলছে কেন?
বাজে বলছে কোথায়? ও-তো তোমাকে বোঝাচ্ছে।
থাক! অত বোঝার দরকার নেই আমার, ঝটকা দিয়ে জানালার দিকে ফিরল সে, তাকিয়ে রইল বাইরে।
আবার ছাড়ল বিমান। নিচে ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল আলোকিত রাতের শহর। মাঝে আর কোন স্টপেজ ধরবে না, একেবারে রিও ডি জেনিরোতে গিয়ে নামবে প্লেন।
কমে এল কেবিনের শোরগোল, খানিক পরে থেমে গেল পুরোপুরি। হালকা মিউজিক আর নিঃশ্বাসের শব্দ ছাড়া আর কোন আওয়াজ নেই।
জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রয়েছে জিনা এখনও।
মুসা সীটে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছে, রবিন তুলছে।
কিশোরের ঘুম আসছে না। একটা ম্যাগাজিন টেনে নিল। মন বসাতে পারল। রেখে দিয়ে শেষে লোকগুলোর দিকে তাকাল। চারজন কেয়ার টেকার এক জায়গায় বসেছে।
চ্যাকো ব্যাটার চেহারা মোটেও ভাল না, ভাবছে কিশোর। মস্ত এক ষাড় যেন, গুতো মারার জন্যে তৈরি হয়ে আছে। চারকোণা চোয়াল, আর কি বিচ্ছিরি চওড়া কপাল। ব্যাটার গায়ে মোষের জোর, সন্দেহ নেই, তবে মাথায় ঘিলু কম। বাচ্চাদের পাহারা দেয়ার জন্যে এমন একটা বাজে লোককে কি করে বাছাই করল এজেন্সি?
দ্বিতীয় লোকটার নাম জিম। বয়েস বাইশের বেশি না। মোটামুটি সিরিয়াস। লোক বলে মনে হলো কিশোরের। কারলোর মত ষাঁড় নয়, সুদর্শন। ধোপদুরস্ত পোশাক।
তৃতীয়জন ওরটেগা। বেঁটে, রোগা, চামড়ার রঙ গাঢ় বাদামী। ইংরেজিই বলছে, তবে তাতে কড়া বিদেশী টান, কথা বলার সময় খালি হাত নাড়ে।
পর্তুগীজ নাকি? ভাবছে কিশোর। ব্রাজিলের ভাষা পর্তুগীজ। লোকটার কথায়ও পর্তুগীজ টান, ভাষাটা জানে বলেই বোধহয় তাকে বাছাই করা হয়েছে।
চতুর্থ লোকটার নাম হেনরিক। কিশোরের মনে হলো, ওই একটিমাত্র লোক সত্যিকারের কেয়ার টেকার, বাচ্চাদের কিভাবে সামলাতে হয় জানে। সারাটা দিন ওদের নিয়ে ব্যস্ত থেকেছে, ক্লান্ত হয়ে ঢুলছে এখন ওদের সঙ্গে সঙ্গে।
অন্য তিনজনের দিকে চোখ ফেরাল আবার কিশোর। তাদের চোখে ঘুমের লেশমাত্র নেই। এত উত্তেজিত কেন ওরা? ভাবল সে। কোন কিছুর অপেক্ষায় আছে?
হাই তুলতে শুরু করল কিশোর।
হঠাৎ তন্দ্রা টুটে গেল তার। লাউডস্পীকারে বেজে উঠেছে ক্যাপ্টেনের গমগমে কণ্ঠ। গুড মর্নিং, লেডিজ অ্যাণ্ড জেন্টলমেন। অল্পক্ষণের মধ্যেই রিও ডি জেনিরোতে নামছি আমরা। দয়া করে।
কথা শেষ হলো না, থেমে গেল আচমকা, বিচিত্র কিছু ফিসফাস আর খুটখাট শোনা গেল স্পীকারে।
অবাক হলো কিশোর। কিসের শব্দ? যন্ত্রটন্ত্র খারাপ হয়ে গেল, নাকি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন ক্যাপ্টেন?
দেখল, চ্যাকো আর জিম নেই, ওরটেগা দাঁড়িয়ে আছে ককপিটের দরজার কাছে। পাহারা দিচ্ছে যেন। দৃষ্টি চঞ্চল, একবার কেবিনের দিকে তাকাচ্ছে, একবার দরজার দিকে।
তাজ্জব ব্যাপার তো! এমন করছে কেন?
একজন স্টুয়ার্ডেসের সঙ্গে কথা বলছে হেনরিক। দুজনকেই চিন্তিত মনে। হচ্ছে। সারাক্ষণ লেগে থাকা হাসি উধাও. স্টুয়ার্ডেসের মুখ থেকে। বার বার তাকাচ্ছে স্পীকারের দিকে, হঠাৎ থেমে যাওয়ার কারণ আন্দাজ করতে চাইছে।
শেষে আর থাকতে না পেরে বলল, যাই, দেখে আসি কি হলো?
কিন্তু তাকে ককপিটে ঢুকতে দিল না ওরটেগা।
যাওয়া যাবে না, এত জোরে বলল, কেবিনের সবাই শুনতে পেল। সীটে। গিয়ে বসুন।
বোকা বনে গেল স্টুয়ার্ডেস। ঢোক গিলে বলল, কাকে কি বলছেন? যাওয়া যাবে না মানে? যান, সীটে গিয়ে বসুন। এখানে আসার অনুমতি নেই আপনার, বেআইনী কাজ করছেন।
বিদ্রুপের হাসি ফুটল ওরটেগার ঠোঁটে। কেন বাজে বকছেন? যান, গিয়ে লক্ষ্মী মেয়ের মত চুপ করে বসুন।
মৃদু গুঞ্জন যেন ঢেউয়ের মত বয়ে গেল যাত্রীদের মাঝে।
ওরটেগার হাতে বেরিয়ে এসেছে একটা পিস্তল।
স্টুয়ার্ডেসের দিকে ফেরাল সে নলের মুখ।
.
কি করছেন আপনি, জানেন? জোর নেই স্টুয়ার্ডেসের কণ্ঠে।
জবাব দেয়ার প্রয়োজন বোধ করল না ওরটেগা।
ককপিটের দরজায় দেখা দিল চ্যাকো, তার হাতেও পিস্তল।
আর কোন সন্দেহ রইল না কিশোরের। ফিসফিস করে বন্ধুদের বলল, হাইজ্যাকার!
গুঞ্জন বাড়ল। চেঁচিয়ে উঠল একজন। কি হচ্ছে, জানতে চায়। তার সঙ্গে গলা মেলাল আরও কয়েকজন।
লাফিয়ে উঠল হেনরিক। কি করছ? ভয় দেখাচ্ছ কেন ছেলেমেয়েদের। এসব রসিকতার কোন মানে হয়?
এগিয়ে এসে ধাক্কা দিয়ে আবার তাকে বসিয়ে দিল চ্যাকো। না, হয় না। কিন্তু রসিকতা করছি না, এটা আসল। বসে থাকো চুপচাপ।
তর্ক করে লাভ হবে না, বুঝল হেনরিক, আর কথা বাড়াল না।
আতঙ্কিত ছেলেমেয়েদের দিকে ফিরল চ্যাকো। শোনা খোকাখুকুরা, কর্কশ। কণ্ঠ মোলায়েমের ব্যর্থ চেষ্টা করল, অনুমান করতে পারছ কিছু?
হাইজ্যাক! চেঁচিয়ে উঠল মুসা। প্লেন হাইজ্যাক করেছ।
মুসার বলার ধরন পছন্দ হলো না চ্যাকোর, হাসল বটে, কিন্তু চোখ দুটো শীতল। ঠিক ধরেছ। এখন ভাল-মন্দ তোমাদের ওপর। আমাদের কথা শুনলে কারও কোন ক্ষতি হবে না। যেখানে আছ, থাকো, যা করছিলে করো। গল্প করো, পড়ো, কিংবা মিউজিক শোনো।
কেবিনে বেরিয়ে এল জিম।
তার দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করল চ্যাকো, ওদিকে সব ঠিক আছে?
আছে। ক্যাপ্টেন, কো-পাইলট, রেডিওম্যান, কেউ গোলমাল করবে না।
কি করেছ ওদের? আবার সীট থেকে উঠতে শুরু করল হেনরিক।
বসো, পিস্তল নাচাল চ্যাকো।
মারিনি, বেধে রেখেছি। যাতে নড়তে না পারে, জিম বলল।
তাহলে কি..
হ্যাঁ, অটোমেটিক পাইলটে চলছে প্লেন। এখানকার অবস্থা দেখতে এসেছি। সবাইকে শান্ত করে গিয়ে কন্ট্রোল হাতে নেব। আমিই চালাব প্লেন। চ্যাকো,
সীটের মাঝের গলিপথে আর কেবিনের পেছনে স্থির হয়ে আছে স্টুয়ার্ড স্টুয়ার্ডেসরা। ওরটেগারের কাছে দাঁড়ানো একজন স্টুয়ার্জেসের কাছে এগিয়ে গেল গ্যাকো। পিঠে পিস্তল ঠেকিয়ে বলল, হাঁটো।
বাথরুম আর রান্নাঘরে বিমানের সমস্ত কর্মচারীদের আটকে রেখে এল হাইজ্যাকাররা। তারপর জিম চলে গেল ককপিটে।
চালাতে পারবে তো? বিদ্রুপের হাসি ফুটল ওরটেগার ঠোঁটে। কিশোর বুঝল ওরকম করেই হাসে লোকটা।
পারবে তো বলল, জবাব দিল চ্যাকো।
পারলে ভাল। আমাদের জীবন এখন ওর হাতে। হালকা টুরিস্ট প্লেন ছাড়া। আর তো কিছু চালায়নি। এতবড় প্লেন সামলাতে পারলে হয়।
কড়া চোখে তাকাল চ্যাকো। বেশি কথা বলো। জিম যখন বলেছে চালাতে পারবে, পারবেই। খামোখা ভয় দেখাচ্ছে বাচ্চাগুলোকে।
হাইজ্যাকারদের ওপর থেকে চোখ সরাচ্ছে না জিনা। রোমাঞ্চ ভাল লাগে তার। ভয় পায়নি। অ্যাডভেঞ্চারের গন্ধে রক্ত চঞ্চল হয়ে উঠেছে।
প্রথম চমকটা কেটে গেছে। শত্রুদের ভালমত লক্ষ করছে এখন জিনা। চ্যাকোকে শুরুতে ভাল লাগেনি তার, নিষ্ঠুর মনে হয়েছে, কিন্তু এখন যতখানি খারাপ লাগছে না। আসলে দেখে যতটা মনে হয়, তত খারাপ নয় বিশালদেহী লোকটা.।
একটু আগের কথা কাটাকাটির কথা বেমালুম ভুলে গেল জিনী, আস্তে করে কনুই দিয়ে গুতো দিল মুসার গায়ে। কি ভয় পাচ্ছ?
ভয়? হ্যাঁ, তা-তো পাচ্ছিই। কি ঘটে কিছুই বলা যায় না।
কি মনে হয়? দারুণ একখান অ্যাডভেঞ্চার হবে, না?
তোমার কাছে দারুণ লাগছে। আমার সুবিধের মনে হচ্ছে না। হাইজ্যাকারদের বিশ্বাস নেই। আর আমরা এখানে ভাল থাকলেই কি? বাবা-মা চিন্তা করবে না?
মুসা ঠিকই বলেছে, পেছন থেকে বলল কিশোর। রেডিও অপারেটরকে বেঁধে রেখেছে। রিওর কন্ট্রোল টাওয়ার নিশ্চয় যোগাযোগের চেষ্টা করছে প্লেনের সঙ্গে। জবাব পাবে না।
হ্যাঁ, রবিন একমত হলো। হাইজ্যাকের খবর সব সময়ই খবরের কাগজের হেডলাইন হয়। খুব তাড়াতাড়ি ছড়িয়ে পড়বে খবর। বাবা, মা, সাংঘাতিক দুশ্চিন্তা করবে।
আচ্ছা, শেষ পর্যন্ত ওরা কি করবে বলো তো? জিনা বলল। ইস, রাফিয়ান এখন এখানে থাকলে হত। ওরটেগা আর চ্যাকোকে কাবু করে ফেলতে পারতাম। আবার সব ঠিক হয়ে যেত।
জবাব দিল না তিনজনের কেউ।
বেশি অবাস্তব কল্পনা করছে জিনা। কিন্তু কিশোর আন্দাজ করতে পারছে, কতখানি বিপদে পড়েছে ওরা। প্লেনের সমস্ত কর্মচারী আর যাত্রী এখন হাইজ্যাকারদের হাতের পুতুল, যেভাবে বলা হবে, সেভাবেই কাজ করতে হবে।
ছেলেমেয়েদের গুঞ্জনে মনে হচ্ছে, হাজার হাজার মৌমাছি এনে ছেড়ে দেয়া হয়েছে কেবিনে। কেউ আস্তে কথা বলছে, কেউ জোরে। বেশি বাচ্চা কয়েকজন। ফোপাচ্ছে নিচুস্বরে, থামানো যাচ্ছে না কিছুতেই।
সব আওয়াজ ছাপিয়ে শোনা গেল চ্যাকোর কর্কশ কণ্ঠ, এই, চুপ! শুনছ? চুপ! শোনো, আমার কথা শোনো।
থেমে গেল গুঞ্জন।
তোমাদের কারও কিচ্ছু হবে না, বলল চ্যাকো। কি করব, সেটা পরে বলছি। কেন করেছি সেটা আগে শোনো। প্লেনটা আমাদের দরকার। কিছু মাল। নিরাপদে কলাম্বিয়ায় পার করতে চাই। কাস্টমস গোলমাল করবে, তাই….
সোজা করে বলো না, বাধা দিয়ে বলল ওরটেগা, কিছু মাল স্মাগল করব আমরা।
চোখ বড় বড় হয়ে গেল বাচ্চাদের। শুধু হাইজ্যাকারই নয়, চোরাচালানীর পাল্লায় পড়েছে ওরা।
টাকা নেই আমাদের, বলে গেল চ্যাকো। ভাড়ার পয়সাও নেই। ভাবলাম, একটা প্লেন হাইজ্যাক করতে পারলে কাজ হয়। ঝুঁকিটা নিয়েই ফেললাম। তিনজন কেয়ার টেকারের কাগজপত্র জাল করে তার বদলে আমরা উঠেছি, আসল লোকেরা রয়ে গেছে নিউইয়র্কে, এয়ারপোটে এক বাথরুমে, আটক। তাই কোন অসুবিধে হয়নি। সন্দেহ হয়নি কারও। বুঝতে পারছি, সফল হব, তবে তার জন্যে তোমাদের সহায়তা দরকার।
বাহ, বড় বেশি আত্মবিশ্বাস দেখছি, বলে উঠল হেনরিক। আমাকে আটকাওনি কেন?
তোমাকে এখানে দরকার ছিল। কেয়ারটেকারের ট্রেনিং আছে তোমার, আমাদের নেই। সবাই আনাড়ি হলে মুশকিল। ধরা পড়ে যেতাম, বলল ওরটেগা।
নতুন কাজ নিয়েছি ওই ট্র্যাভেল এজেন্সিতে, বলল হেনরিক। এ-লাইনে। এটাই প্রথম সফর। অন্য তিনজনকে চিনি না বলেই করতে পারলে।
সেজন্যেই তো তোমাকে বেছে নিয়েছি, দরাজ হাসি হাসল চ্যাকো। যাকগে। ছেলেরা, যা বলছিলাম। রিওতেই নামব আমরা।
রিও ডি জেনিরোতে প্লেন নামলে বাঁচার কোন উপায় হয়েও যেতে পারে, ভাবল মুসা।
নামব, বলে যাচ্ছে চ্যাকো, প্লেনের তেল নেয়ার জন্যে। আর কিছু খাবারও দরকার আমাদের। কন্ট্রোল টাওয়ারের সঙ্গে কথা বলছে ক্যাপটেন, আমাদের কি কি দরকার, জানাচ্ছে। নেমে সব তৈরিই পাব আমরা। এখন আসছি আসল কথায়। শুধু বিমানটা দরকার আমাদের। এর স্টাফ আর যাত্রীদের নামিয়ে দেয়াই বরং আমাদের জন্যে নিরাপদ, ঝামেলা অনেক কমে যাবে।
ওরটেগা হয়তো ভাবল, এরপরের বিশেষ কথাগুলো তার নিজের বলা দরকার, তাই চ্যাকোর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল, কাজেই, তোমাদের কোন ভয় নেই। তোমরা গোলমাল না করলে আমরাও করব না। নামিয়ে দেব জায়গামত।
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল যাত্রীরা। গুঞ্জন শুরু হলো।
নিচু কণ্ঠে বন্ধুদের বলল মুসা, ব্যাটারা পাগল, বদ্ধ উন্মাদ! যাত্রীদেরকে নামিয়ে দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্লেনে উঠবে পুলিশ।
আমার তা মনে হয় না, কিশোর বলল। এত সহজ নয় ব্যাপারটা। এসব ভাবেনি, এত বোকা নয় ওরা। কোন মতলব নিশ্চয় আছে।
জানা গেল শিগগিরই।
তবে, হাত তুলল চ্যাকো, গুঞ্জন থামানোর জন্যে নিজেদের নিরাপত্তার কথাও ভাবতে হবে আমাদের। তাই, অন্তত একজন জিম্মি রাখতে হবে।
জিম্মি শব্দটা শুনেই ফ্যাকাসে হয়ে গেল যাত্রীদের মুখ। কার পালা?
জিনা, হুশিয়ার! ফিসফিস করে বলল কিশোর। তোমার দিকে তাকাচ্ছে।
কালো হয়ে গেল জিনার মুখ। চোখের পাতা কাছাকাছি হয়ে যাচ্ছে।
সরাসরি জিনার দিকে তাকিয়ে রয়েছে চ্যাকো। হাসল। তারপর এগিয়ে এল। ধীরে পায়ে।
এই, তুমি উঠে এসো, ডাকল চ্যাকো।
নড়ল না জিনা।
কি হলো? আসছ না কেন? জলদি এসো।
উঠল না জিনা।
এগোল চ্যাকো।
হাত তুলল মুসা। দাঁড়ান। জিম্মি হলেই তো হয় আপনাদের। আমি, আসছি।
পেছন থেকে বলে উঠল রবিন, ওরা থাক। আমাকে নিন।
নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটছে কিশোর। গভীর চিন্তা চলছে মাথায়।
উঠে দাঁড়াল জিনা, না না, কারও দরকার নেই। আমিই আসছি।
ভুরু কুঁচকে গেছে চ্যাকোর। হ্যাঁ, তুমিই এসো। ছেলেদের দরকার নেই। আমার। জিম্মি হিসেবে সুন্দরী কিশোরী খুব ভাল হবে। ছবি আর খবর ছাপা হলে নাড়া দেবে সবাইকে।
এক মিনিট, হাত তুলল কিশোর, ধীরেসুস্থে উঠে দাঁড়াল। মিস্টার চ্যাকো, আরেক কাজ করলে তো পারেন। আমরা চারজন এক জায়গা থেকে একই সঙ্গে বেরিয়েছি, আমাদের চারজনকেই নিন। জিম্মি বেশি হলেই তো বরং আপনাদের সুবিধে।
দ্বিধায় পড়ে গেল চ্যাকো। কি করবে বুঝতে পারছে না। সিদ্ধান্ত নিতে পারছে দেখে শেষে রেগে গেল নিজের ওপরই। ধমক দিয়ে বলল, বড় বেশি ফ্যাচফ্যাচ করছ তোমরা। এটা কি সিনেমা পেয়েছ নাকি? বেশি জিম্মি রাখলে ঝামেলা বেশি, একজনকেই রাখব। যাকে নেব ঠিক করেছি, তাকেই শুধু। এই মেয়ে, এসো।
মুসার সামনে দিয়ে গলিতে বেরিয়ে এল জিনা।
তার হাত ধরতে গেল চ্যাকো।
ঝটকা দিয়ে হাত সরিয়ে নিল জিনা। খবরদার, ষাঁড়, গায়ে হাত দেবে না। চলো, কোথায় যেতে হবে।
পিস্তলের ইশারায় ককপিট দেখাল চ্যাকো। ওখানে। জিমের পাশে চুপ করে বসে থাকবে।
ককপিটের দরজা খুলে দিল ওরটেগা। জিনা ভেতরে ঢুকতেই আবার বন্ধ করে দিল।
শোনো তোমরা, যাত্রীদের বলল চ্যাকো, সীট-বেল্ট বেঁধে নাও। একটু পরেই ল্যাণ্ড করব। কোন চেঁচামেচি নয়, ধাক্কাধাক্কি নয়। সিঁড়ি দিয়ে একজনের পেছনে একজন নেমে যাবে, শান্তভাবে। আমি আর ওরটেগা পিস্তল নিয়ে পেছনে থাকব। কেউ শয়তানী করলেই গুলি খাবে। পুলিশকে বলবে, ওরা কিছু করার চেষ্টা করলে জিম্মি মেয়েটা মরবে। বুঝেছ? আই রিপীট, মরবে!