এটা একটা পাজল হলো? ঠোঁট বাঁকাল কিশোর পাশা। দশ বছরের ছেলেও বাঁ হাতে সেরে দিতে পারে!
কিন্তু মুসার তা মনে হলো না। তার বয়েস দশ বছরের অনেক বেশি। বাঁ হাত তো দূরের কথা ডান হাতেও সে পারবে না। ড্যাগউডস ওয়াইফ অর্থাৎ ড্যাগউডের স্ত্রীর মানেই তো করতে পারছে না, যদিও ড্যাগউড নামটা পরিচিত লাগছে ওর কাছে।
ডেস্কে পা তুলে দিয়ে আরাম করে বসেছে রবিন। পেন্সিল আর ক্রসওয়ার্ড পাজলের একটা কপি নিয়ে ব্যস্ত। মুসার যতটা লাগছে তার কাছে ততটা কঠিন মনে না হলেও একেবারে সহজও লাগছে না।
হেডকোয়ার্টারে রয়েছে তিনজনে। হাতে কেস নেই। আকাশ খারাপ বলে বেরোতেও পারছে না। নইলে সাঁতার কাটতে যাওয়া যেত। তিন দিন ধরেই আবহাওয়ার ঘোষণা দিয়ে চলেছে টিভিঃ আকাশ মেঘলা থাকবে, যখন-তখন বৃষ্টি নামতে পারে, হালকা ঝড় হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
কিশোর বহুবার দেখেছে, বৃষ্টির সময় যখন ঘরে আটকে থাকে, তখন কেবল গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়ে, আর যেই সে বেরোল অমনি ঝুপঝুপ করে নামে।
এটা কোন ব্যাপারই না, বলে তার সামনে রাখা পুস্তিকাটা টেনে নিল। ধাঁধার আরেকটা কপি। পেছনে নির্দেশনা লেখা রয়েছে। সেটাই পড়ল, হাই স্কুলের ছাত্রদের জন্যে এই ধাঁধার ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাদের বয়েস চোদ্দ থেকে আঠারোর মধ্যে। প্রবেশ মূল্য লাগবে না। মুখ তুলে মুসার দিকে তাকাল সে। পেলে কোথায় এটা?
সুপারমার্কেটে বিলি করছিল। অনেকটা জোর করেই তিনটে কপি গছিয়ে দিল আমার হাতে। যেন জানতই, আমরা তিনজন।
তাই নাকি! ইনটারেসটিং! আবার পড়তে লাগল কিশোর, পুরস্কার; উত্তর মেকসিকোর এক র্যাঞ্চে দুই হপ্তার চমৎকার একটা ছুটি কাটানো। প্রধান প্রধান আকর্ষণের মধ্যে থাকবে ঘোড়ায় চড়া, লেকে মাছ ধরা, ক্যাম্পিং, মুখরোচক মেকসিকান খাবার…
খাইছে, আর পড়ো না, এখনই জিভে পানি এসে যাচ্ছে! এই কিশোর, তোমার জন্যে তো ওটা কিছু না। করে ফেল না সমাধান। আমি শিওর ফার্স্ট প্রাইজটা তুমিই পাবে।
ভুরু নাচাল রবিন। ও পারলে তো ও যাবে। আমরা যাব কি করে?
ও সমাধান করলেই আমরাও দেখে দেখে বসিয়ে নেব। হয়ে যাবে।
কি জানি! হাত ওল্টাল রবিন। সবাইকে যেতে দিলে হয়। আমার বিশ্বাস, অনেকেই পারবে।
তোমার বিশ্বাস ভুল…
হাত তুলে বাধা দিল কিশোর, খালি তর্ক!
ট্রেলারের ছাতে বড় বড় ফোঁটা পড়ার আওয়াজ হলো।
মুখ বাঁকিয়ে মুসা বলল, মেকসিকোতে নিশ্চয় এরকম পচা আবহাওয়া নয়।
পুস্তিকার দিকে তাকিয়ে রয়েছে কিশোর। মুসার কথা কিংবা বৃষ্টির শব্দ ওর কানে ঢুকছে বলে মনে হলো না। পড়ল, লিখে জবাব দিলে চলবে না। টেপে রেকর্ড করে দিতে হবে। প্রথমে… থেমে গেল সে। দ্রুত চোখ বোলাল পাতার বাকি অংশটায়। তাজ্জব ব্যাপার!
কি? জানতে চাইল রবিন, এতে আবার অবাকের কি দেখলে?
পুস্তিকা ছাপাতে পয়সা লাগে, আনমনে বলল কিশোর, যেন নিজেকেই বলছে। আর মেকসিকোতে ছুটি কাটাতে যেতেও পয়সা লাগে। এরকম একটা প্রতিযোগিতার জন্যে কার এত টাকা খরচ করার ইচ্ছে হলো?
কোন ধরনের বিজ্ঞাপন হবে হয়তো, রবিন অনুমান করল। গানের কোম্পানিতে কাজ করে করে ব্যবসায়িক দিকটাই এখন বেশি নজরে পড়ে তার। আসলে ওরা চায় যাতে ধাঁধার জবাব দেয়ার জন্যে তুমি একটা টেপরেকর্ডার কিনতে বাধ্য হও। আর একটা ব্ল্যাংক ক্যাসেট।
মাথা আঁকাল কিশোর। কি জানি। তাহলে কোন্ স্টোর হতে কিনতে হবে সেটা বলল না কেন? কোন্ কোম্পানির জিনিস কিনতে হবে তা-ও বলেনি।
সুপারমার্কেটে লিফলেট বিলি করছিল যখন, মুসা বলল, হয়তো ওখানকারই কোন দোকানের হবে।
মাথা নাড়ল কিশোর। কোন কিছুই ভাল করে দেখ না তুমি। সুপারমার্কেটে ইলেক্ট্রনিকের দোকান কোথায়?
আবার পুস্তিকাটার দিকে তাকাল সে। বেড়াতে তার খারাপ লাগে না, তবে তার চেয়েও বেশি আকর্ষণ রহস্যের প্রতি। ধাঁধা পেলে তার জবাব না পাওয়া পর্যন্ত স্বস্তি নেই। কেবলই খচখচ করতে থাকল মনে, কে এত টাকা খরচ করছে? কেন?
অনেক লিফলেট হয়তো বিলি করেছে, কিশোর বলল। আর জবাব এতই সহজ অনেকেই সমাধান করে ফেলতে পারবে। সুতরাং অনেকেই মেকসিকো যাওয়ার সুযোগও পাবে। অন্তত আমরা তিনজন তো পাবই।
অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল রবিন। তার মানে তুমি এর জবাব দিচ্ছ!
কেন নয়? ভ্রূকুটি করল কিশোর। ড্রয়ার থেকে একটা টেপরেকর্ডার বের করল। একটা ব্ল্যাংক ক্যাসেট বের করে তাতে ঢোকাল। তারপর রেকর্ড করার বোতামটা টিপে দিয়ে বলতে শুরু করল সমাধান।
ঘণ্টাখানেক পর তিনটে ক্যাসেটে তিনজনের শুদ্ধ সমাধান রেকর্ড করে নিয়ে তিনটে খামে ভরে সান্তা মনিকার ঠিকানা লিখল, যে ঠিকানায় জবাব পাঠাতে বলা হয়েছে পুস্তিকায়। এক কোণে নিজেদের নাম-ঠিকানাও লিখল।
ট্রেলারের হাতে বৃষ্টির শব্দ থেমে গেছে।
জলদি চলো, তাগাদা দিল রবিন। পোস্ট করে দিয়ে আসি, আবার বৃষ্টি নামার আগেই।
পরদিন আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেল। আবার দেখা দিল ক্যালিফোর্নিয়ার স্বাভাবিক সূর্য। পরের তিনটে হপ্তা যার যার কাজে ব্যস্ত রইল তিন গোয়েন্দা।
রবিন তার চাকরিতে বাড়তি কাজ করল। দিনে বারো ঘণ্টা করে খাটতে হলো তাকে।
মুসা বাড়ির কাজ করল কিছু কিছু। তবে বেশির ভাগ সময়ই সাঁতার কাটল আর ফারিহার সঙ্গে আড্ডা মেরে বেড়াল। সেই সাথে চলল কারাতের প্র্যাকটিস।
আর কিশোর রইল স্যালভিজ ইয়ার্ডের কাজে ব্যস্ত। দিনে দশ-বারো ঘণ্টা খাটুনি।
একদিন বিকেলে ওয়ার্কশপে একটা নতুন ধরনের সিকিউরিটি ডিভাইস নিয়ে কাজ করছে সে, একটা তালা, ভয়েস অপারেটেড, সাঙ্কেতিক কথা বললে খুলবে। মুসাও আছে ইয়ার্ডে। ওয়ার্কশপের বাইরে ওর গাড়ি মেরামত করছে।
হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল কিশোর, কুকুর হইতে সাবধান!
চমকে গেল মুসা। কি বললে?
কিছু না। বললাম, কুকুর হইতে সাবধান।
তালা খোলার কোডওয়ার্ড এটা। কিন্তু মুসা বুঝতে পারল না। কি যে বলো বলো! এখানে কুকুর দেখলে কোথায়?
জবাব দিতে যাচ্ছিল কিশোর, এই সময় টেলিফোন বাজল। ফিরেও তাকাল না। জানে, রবিন রয়েছে হেডকোয়ার্টারের ভেতরে। আরেকটা এক্সটেনশন সেট রয়েছে এখানে। রক কনসার্টের জন্যে লিফলেট তৈরি করছে রবিন। হতে পারে তার কোন বান্ধবী ফোন করেছে, কিংবা পরিচিত অন্য কেউ।
কয়েকবার বেজেই থেমে গেল রিঙ। মুসা আবার কাজে মন দিল।
খানিক পরেই বেরিয়ে এল রবিন। কিশোর, মেরিচাচী ফোন করেছেন।
আমার সঙ্গে কথা বলতে চায়? কিছুটা অবাকই হলো কিশোর। আবার কাজ নয় তো? ইদানীং মেরিচাচীও কিশোরের বিশেষ ব্যবস্থায় যোগ দিতে আরম্ভ করেছেন। বুঝে গেছেন, অহেতুক অফিস থেকে বেরিয়ে কষ্ট করে হেঁটে না এসে ফোন করলেই হয়ে যায়। হেঁটে আসার আরেকটা কারণ অবশ্য ছিল, পয়সা বাঁচানো। বকেটকে ঠিক করেছে কিশোর। আবার কোন কাজ দেবে নাকি?
কে জানি এসেছে, তোমার সঙ্গে কথা বলতে চায়।
কে?
মিস্টার ডজ, হাসল রবিন। ওই ধাঁধা প্রতিযোগিতা যেটায় দিয়েছিলে তার ব্যাপারে কিছু বলবে।
তাই? কৌতূহলী হলো গোয়েন্দাপ্রধান। প্রতিযোগিতার কথা ভোলেনি। তবে কাজ নিয়ে এতই ব্যস্ত ছিল, ও ব্যাপারে খোঁজ নিতে পারেনি আর। এখন সুযোগ এসেছে। হয়তো জানতে পারবে এত টাকা খরচ করে মেকসিকোতে পাঠাতে কার এমন দায় পড়েছে।
ওরা ঠিক করল, তিনজনেই যাবে মিস্টার ডজের সঙ্গে দেখা করতে। বাড়ির দিকে রওনা হয়েছে, এই সময় বারান্দায় বেরিয়ে এলেন একজন মানুষ। লম্বা, ছিপছিপে। পরনে জিনস, মাথায় একটা দামি স্টেটসন হ্যাট সামান্য কাত করে বসানো।
তিন গোয়েন্দাকে এগোতে দেখে হাত তুলে নাড়লেন। হাই, আমি ডজ মরিস। ওরা কাছে গেলে একে একে তাকালেন সবার মুখের দিকে। তারপর বললেন, কার কি নাম? না না, রাখ, দেখি আমিই আন্দাজ করতে পারি কিনা? মুসার দিকে তাকিয়ে হাসলেন। দেখি, কণ্ঠস্বর শোনাও তো তোমার?
আমি মেকসিকো যাব! বলল মুসা। কি জানি কেন ডজকে পছন্দ করতে পারছে না। পিজা খাব!
রবিনের দিকে তাকালেন ডজ। তোমার?
আমার যেতে বড়ই অসুবিধে। অফিসে অনেক কাজ।
মাথা ঝাঁকালেন ডজ। জোর করেই যেন হাসলেন। তারপর তাকালেন কিশোরের দিকে।
কিশোরও তাকিয়ে রয়েছে তার দিকে। লোকটার ব্যাপারে তার প্রথম ধারণাঃ একটু যেন অস্বাভাবিক। হাসি, ভাবভঙ্গি সবই কেমন যেন মেকি মেকি।
এবার তোমার গলা শোনাও? কিশোরকে বললেন ডজ।
মেকসিকো যেতে চাই, কিশোর বলল।
চকচক করে উঠল ডজের চোখ। উত্তেজনা ফুটল চেহারায়। এগিয়ে এসে হাত মেলালেন কিশোরের সঙ্গে।
ডজ বললেন, ধাঁধা প্রতিযোগিতায় তুমিই জিতেছ। আমার র্যাঞ্চেও যেতে পারবে তুমি।
কিশোর ভাবছে মেকসিকান র্যাঞ্চে যাওয়ার জন্যে অস্থির হয়ে আছে একথাটা সহজে বুঝতে দেয়া চলবে না লোকটাকে। তার আগে কিছু প্রশ্নের জবাব জানা সরকার। বলল সেকথা।
কি জানতে চাও? বলে ফেল।
আর কজন জিতেছে এই পুরস্কার?
শুধু তুমি। একলা।
তারমানে শুধু আমিই ঠিক জবাব দিয়েছি?
দ্বিধা করলেন ডজ। হ্যাঁ।
চিন্তিত ভঙ্গিতে লোকটার দিকে তাকিয়ে রয়েছে কিশোর। বুঝতে পারছে। মিথ্যে কথা বলছেন ডজ। ওর মত একই জবাব পাঠিয়েছে মুসা আর রবিন। তাহলে শুধু তাকেই বিজয়ী ঘোষণা করছেন কেন তিনি?
টাকা আসছে কোত্থেকে? জানতে চাইল সে। এসবের খরচ দেবে কে?
আমি!
কেন?
বিজ্ঞাপনের জন্যে। আমার র্যাঞ্চের বিজ্ঞাপন। হ্যাটটা খুলে নিয়ে আবার মাথায় পরলেন ডজ। আত্মবিশ্বাসে ভরা কণ্ঠ। আমার জায়গাটাকে আমি একটা সামার ক্যাম্প বানাতে চাই, যাতে তোমাদের মত সৌখিন টুরিস্টরা গিয়ে বাস করতে পারে। আর এই প্রতিযোগিতাটা সম্পর্কে সানডে পেপারে ভাল একটা আর্টিকেল ছাপতে চাই।
এতক্ষণে বিশ্বাস করার মত একটা যুক্তি শুনল কিশোর। তবে পুরোপুরি নয়।
আরেকটা প্রশ্ন করতে যাবে, এই সময় নীল রঙের একটা শেভ্রলে গাড়ি দেখল ইয়ার্ডের গেটে। কিশোর মনে করল ঢুকবে, কিন্তু ঢুকল না ওটা। মুহূর্তের জন্যে গতি কমিয়েই আবার বাড়িয়ে চলে গেল। উইন্ডশিল্ডে রোদ পড়েছিল বলে ড্রাইভারকে ভালমত দেখতে পায়নি সে। মনে হলো, একজন মহিলা। সোনালি চুল, চোখে কালো কাচের চশমা। গত দশ-পনেরো দিনে ওই গাড়িটাকে আরও কয়েকবার দেখেছে সে।
আবার ডজের দিকে ফিরল সে। ঠিক আছে, আপনার পুরস্কার আমি গ্রহণ করলাম। কিন্তু একটা কথা। আমার এই দুই বন্ধুকে সাথে নিতে পারব?
ভ্রূকুটি করলেন ডজ। তার মানে ওদের খরচও আমাকে দিতে বলছ?
বলছি, দৃঢ়কণ্ঠে বলল কিশোর।
মাথা থেকে হ্যাটটা খুলে নিয়ে চিন্তিত ভঙ্গিতে কানা মোচড়াতে শুরু করলেন ডজ। পায়ের ওপর শরীরের ভার বদল করলেন। তাকিয়ে রয়েছেন জুতোর দিকে। তারপর মুখ তুলে হাসলেন। বেশ, যাবে ওরাও।
খটকা লাগল কিশোরের। এত সহজে রাজি হয়ে গেলেন ভদ্রলোক! যেন তৈরি হয়েই এসেছেন, কিশোরকে নিতে হলে তার দুই সহকারীকেও নিতে হবে। মুসার কথা মনে পড়লঃ অনেকটা জোর করেই তিনটে কপি গছিয়ে দিল আমার হাতে! ব্যাপার কি!
দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার একটা ম্যাপ দিলেন ওদেরকে ডজ। তার র ্যাঞ্চের কাছাকাছি শহর লারেটোতে কি করে যেতে হবে বলে দিলেন। ছশো ডলার কিশোরের হাতে দিলেন, ওদের রাহা খরচের জন্যে। নিজের ফোন নম্বর দিলেন যাতে সীমান্ত পার হয়েই তাকে ফোন করে জানাতে পারে। ওদেরকে তখন লারেটো থেকে তুলে নিতে পারবেন।
গাড়িতে গিয়ে উঠলেন ডজ। মেকসিকোর নম্বর প্লেট লাগানো। গাড়িটা চেনা চেনা লাগল মুসার। আগেও যেন কয়েকবার দেখেছে। কোথায়? মনে পড়ে গেল। সুপারমার্কেটে একবার। আর একবার দেখেছে ইয়ার্ডের গেটে। সেকথা বলল কিশোরকে।
পরদিন সকালে অন্যান্য দিনের মতই ইয়ার্ডের ডাকবাক্স খুলল কিশোর। চিঠিপত্র কি এসেছে বের করতে গিয়ে দেখল একটা ম্যানিলা খামও রয়েছে। ভেতরে শক্ত চারকোণা একটা জিনিস। ঠিকানায় তার নাম লেখা। ডাক টিকেট নেই। তার মানে ডাকে আসেনি খামটা, কেউ এসে ঢুকিয়ে রেখে গেছে।
হেডকোয়ার্টারে এনে খামটা খুলল সে। একটা ক্যাসেট। আর কিছু নেই। লেবেলে এমন কিছুই লেখা নেই যা দিয়ে বোঝা যায় কি রেকর্ড করা রয়েছে টেপে।
একটা টেপ রেকর্ডারে ভরে বোতাম টিপল সে। নীরবে ঘুরতে লাগল টেপ। অনেক পরে কথা বলে উঠল একটা শান্ত কণ্ঠঃ মেকসিকোতে এসো না, প্লীজ! মারাত্মক বিপদে পড়বে তাহলে! ক্যালিফোর্নিয়াতেই থাকো…
হঠাৎ করেই নীরব হয়ে গেল কণ্ঠটা।
পুরো টেপটা চালিয়ে দেখল কিশোর। আর কোন কথা নেই।
চেয়ারে হেলান দিল সে। মেসেজটা ভাবনায় ফেলে দেয়ার জন্যে যথেষ্ট। তবে আরেকটা ব্যাপার খচখচ করছে ওর মনে। কণ্ঠস্বর চেনা চেনা লাগল। আগে শুনেছে। কোথায়, মনে করতে পারল না।
কয়েক মিনিট পরে মুসা এসে হাজির। ওকে টেপটার কথা বলল কিশোর। আবার চালিয়ে দিল ওটা।
কিশোরকে অবাক করে দিয়ে হাসতে লাগল মুসা। কেউ মজা করেছে তোমার সঙ্গে। রসিকতা।
রসিকতা?
হ্যাঁ। কেন, নিজের কণ্ঠস্বর চিনতে পারছ না?
নিজের কণ্ঠস্বর? অবাক হলো কিশোর।
হ্যাঁ, অবিকল তোমার নিজের কণ্ঠ। নকল করেছে কেউ। তুমি যেভাবে অন্যেরটা নকল করো। এ এক মস্ত রসিকতা।
আমার কণ্ঠ!
ইচ্ছে হলে বাজি ধরতে পারো। আমার গাড়িটা ধরতে রাজি আছি আমি।
জানালার কাছে বসেছে কিশোর। পুরানো বাসটা যেন গড়াতে গড়াতে চলেছে মেকসিকোর ভেতর দিয়ে। বাইরের দিকে তাকিয়ে রয়েছে সে।
প্রথমে ভেবেছিল, মুসার গাড়িতে করেই আসবে। কিন্তু পরে বাদ দিতে হলো ইচ্ছেটা, যখন শুনল মেকসিকোতে পেট্রল পাওয়া কঠিন।
নতুন একটা টী-শার্ট পরেছে সে। তাতে বড় বড় করে স্প্যানিশে লেখা রয়েছেঃ হ্যালো, আয়্যাম ফ্রেন্ডলি। সে আশা করছে এতে লোকে তার প্রতি আগ্রহ দেখাবে, স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলবে, যে ভাষাটা মোটামুটি বুঝতে পারে সে। বলতেও পারে কিছু কিছু।
শক্ত প্রাস্টিকের সীট। শরীর বাঁকিয়ে পেছনে ঘুরে তাকাল সে। অন্য দুজন কি করছে দেখার জন্যে। মেকসিকোর ইতিহাসের ওপর একটা বই পড়ছে রবিন। ওর পাশে বসে আছে অল্প বয়েসী একটা সুন্দরী মেকসিকান মেয়ে। বার বার রবিনের দিকে তাকাচ্ছে। একা চুপচাপ বসে থাকতে থাকতে বিরক্ত হয়ে গেছে মনে হয়। সে চাইছে রবিন পড়া থামিয়ে ওর সঙ্গে কথা বলুক।
দুটো সীটের মাঝখানে ফাঁক খুব কম। মুসার লম্বা পা ঠিকমত জায়গা হয় না। কোনমতে গুটিয়ে নিয়ে বসেছে, তাতে বেশ অস্বস্তিই লাগার কথা। কিন্তু কেয়ার করছে না যেন সে। ঘুমিয়ে পড়েছে।
ওরা দুজনেও টী-শার্ট পরেছে। মাগনা পেয়েছে রবিন। রক গ্রুপকে এই শার্টই সরবরাহ করেছে ওর কোম্পানি। রবিনেরটায় লেখা দ্য সারভাইভারস ও মুসারটায় লেখা ওয়াইল্ড ওয়েস্ট।
রবিনের পেছনে বসা মাঝারি বয়সের এক মহিলা। বাসের অন্য সব মেকসিকান মহিলা যাত্রীর সঙ্গে কোন তফাৎ নেই ওর। বাদামী চামড়া। সুতীর ব্লাউজ গায়ে দিয়েছে, উলের স্কার্ট। লাল একটা শাল দিয়ে মাথা ঢেকেছে, দুই পাশ ছড়িয়ে আছে দুই কাঁধে। কালো চুলের লম্বা লম্বা দুটো বেণি। সান্তা মনিকায় বাসে ওঠার সময়ই মহিলাকে দেখেছে কিশোর। এর পর দুবার বাস বদল করতে হয়েছে। মহিলা রয়েছে ওদের সঙ্গেই।
অবশেষে বই রেখে পাশের মেয়েটার সঙ্গে কথা আরম্ভ করল রবিন। ইংরেজি জানে মেয়েটা। ফলে কথা বলা সহজ হলো। আমি স্প্যানিশ ভাল বলতে পারি না, বলল সে। এই বুয়েনাস ডায়াস-টায়াস জাতীয় দুএকটা শব্দ।
মেকসিকো কেমন লাগছে? জিজ্ঞেস করল মেয়েটা।
মনে হয় ভালই হবে। আগেও যে এখানে এসেছে, সে কথা বলল না রবিন।
এরকম মনে হওয়ার কারণ?
ইয়ে… বলতে গিয়ে থেমে গেল রবিন। ভেবে নিয়ে বলল, আমেরিকায় প্রায়ই মেকসিকান স্ট্রীট মিউজিকের সুনাম শুনি। খুবই নাকি ভাল।
শুধু মিউজিকের জন্যেই? হাসল মেয়েটা। আর কিছু না?
আরও অনেক কিছু। বলবে কিনা দ্বিধা করছে রবিন। এই যেমন, মরুভূমি। চলতে চলতে হঠাৎ থেমে যাচ্ছে বাস। লোকজন নামছে। তারপর যেন নির্জন অঞ্চলে হঠাৎ করেই গায়েব হয়ে যাচ্ছে। একেবারে নো ম্যানস ল্যান্ডের মাঝে। অবাক লাগে। এই মরুভূমির মাঝে কোথায় যায়?
যার যার খামারে। কাউকে কাউকে পাঁচ মাইল কিংবা তারও বেশি হাঁটতে হয় বাস থেকে নামার পর।
এতো! অথচ দেখে মনে হয় যেন এই মিনিট পাঁচেকের পথ হাঁটতে যাচ্ছে। হাসিমুখে নামছে বাস থেকে। দিব্যি চলে যাচ্ছে, যেন কিছুই না।
আসলে তা নয়। মরুভূমির ভেতরে হাঁটাটা সত্যিই কঠিন। তবে আমেরিকানদের মত মুখ গোমড়া করে রাখে না মেকসিকানরা। হাসিখুশি থাকতেই পছন্দ করে।
ছোট একটা শহরে ঢুকে একটা দোল দিয়ে থেমে গেল বাস। ম্যাপ দেখল কিশোর। তারপর ফিরে তাকিয়ে মুসা আর রবিনকে ইশারা করল। আবার বাস বদলাতে হবে।
মেকসিকান মেয়েটাকে গুড বাই জানিয়ে র্যাক থেকে ব্যাগ নামাল রবিন।
ব্যস্ত রাস্তার ছোট একটা কাফের সামনে বাস স্টেশন। বেরিয়েই কাফেটাতে ঢুকে পড়ল তিন গোয়েন্দা।
আমার যা খিদে পেয়েছে না! একটা টেবিলে বসতে বসতে মুসা বলল।
সে আর রবিন খাবারের তালিকা ভাল করে দেখেশুনে অর্ডার দিল বীফ বুরিটুস উইথ রাইস অ্যান্ড বীন। এই খাবারগুলো তেমন ভাল লাগে না কিশোরের। সে অর্ডার দিল দুটো চিকেন টাকোর। কিন্তু খাওয়ার পর বুঝতে পারল ভুলটা কি করেছে।
বাপরে বাপ! কাফে থেকে বেরোনোর সময় বলল কিশোর, আগুন লাগিয়ে দিয়েছে জিভে। এত্তো ঝাল! মরিচ গুলে দিয়েছে!
বাসের দিকে এগোচ্ছে, হঠাৎ তার সামনে এসে দাঁড়াল চামড়ার ছেড়া জ্যাকেট পরা এক লোক। লম্বা, ভারি শরীর, বয়েস বিশ হবে। কিশোরের বুকে ধাক্কা দিয়ে কর্কশ কণ্ঠে স্প্যানিশে বলল, যাচ্ছ কোথায়? বাসে জায়গা নেই।
অবাক হয়ে পরস্পরের দিকে তাকাল তিন গোয়েন্দা। লোকটাকে আগেই দেখেছে। তখন তো বেশ আন্তরিক মনে হয়েছিল। এখন এরকম আচরণ করছে। কেন?
কিশোর দেখতে পাচ্ছে, বাসের অর্ধেক সীটই খালি। ভদ্র ভাবে সেকথা বলল লোকটাকে।
একটুও নরম হলো না লোকটা। বরং আরও জোরে ধাক্কা লাগাল, না, হবে না। বাসে উঠতে পারবে না। চলে যাও এখান থেকে। আমেরিকায় ফিরে যাও, তিনজনেই। তোমাদেরকে এখানে চাই না আমরা।
কিন্তু আমরা যাচ্ছি না, দৃঢ় কণ্ঠে বলল কিশোর। আমি ওই বাসে উঠবই। দয়া করে সামনে থেকে সরুন।
সরা তো দূরের কথা, কিশোরের কাঁধ খামচে ধরল লোকটা। ভাল চাইলে, কেটে পড়। নইলে বিপদ হবে বলে দিলাম।
কয়েক হপ্তা ধরে জুডোর প্র্যাকটিস বেশ জোরেশোরে চালিয়েছে কিশোর। অনেক দক্ষ হয়ে উঠেছে। কিন্তু তবু মনে হলো, বিশালদেহী এই মেকসিকানটার সঙ্গে জুডো খাটিয়েও পেরে উঠবে না। সে কিছু করার আগেই এক ঘুসিতে তার দাঁত ভেঙে দেবে লোকটা। এক ঝাড়া দিয়ে দ্রুত পিছিয়ে এল কিশোর, লোকটা ঘুসি মারলেও যাতে তার মুখে লাগাতে না পারে।
চুপ করে সব দেখছিল এতক্ষণ মুসা। চট করে এখন পাশে চলে এল কিশোরের। কি, হচ্ছেটা কি? লোকটা যে ওদেরকে বাসে উঠতে দিতে চায় না একথা মুসাকে বলল কিশোর।
কেন?
কি জানি। হয়তো আমেরিকানদের পছন্দ করে না।
ও, তাই। কিন্তু আমরা যে সব বলে ঠিক করেছি। বলে দাও ওকে।
ঘুসি মেরে বসল লোকটা। লাগলে চিত হয়ে যেত মুসা। কিন্তু চোখের পলকে সরে গেল সে। পরক্ষণেই আঘাত হানল, কাঁধের সামান্য নিচে, কারাতের শুটোউচি। আরেকটা ঘুসি মারার জন্যে তৈরি হচ্ছিল লোকটা, তার আগেই অবশ হয়ে গেল তার কাঁধের কাছটা। প্যারালাইসিস হয়ে যাওয়া মানুষের মত ঝুলে পড়ল তার হাত চেপে ধরল আহত স্থান। মুসার মুখের দিকে তাকাল।
অপেক্ষা করছে মুসা। সামান্য বাঁকা করে রেখেছে পা। দুই হাত সামনে বাড়িয়ে দিয়েছে, হাতের আঙুল একদম সোজা।
অবাক হয়ে গেছে মেকসিকান লোকটা। আহত জায়গায় হাত চেপেই রেখেছে। তারপর কয়েক ডলা দিয়ে যেন সেখানে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক করার চেষ্টা চালাল।
ডান হাতটা উঁচু করল মুসা। লোকটা আগে বাড়লেই কারাতের কোপ মারবে।
মাথা নাড়ল লোকটা। বিড়বিড় করে বলল, অনেক হয়েছে। ঘাড় মটকে আর মারা পড়তে চাই না! বাপরে বাপ! দশ লাখ পেসো দিলেও না!
মাথা নাড়তে নাড়তেই সরে পড়ল সে।
হেঁচকি উঠল কিশোরের। হেসে ফেলল রবিন আর মুসা। লাল হয়ে গেল কিশোরের গাল।
কী? ভুরু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল রবিন, চিকেন টাকো পেটেও আগুন লাগিয়েছে? খাও আরও।
এই চলো, তাগাদা দিল মুসা। আমাদের বাস রেডি।
বাসে উঠল তিন গোয়েন্দা। কাফেতে সেই লাল শাল পরা মহিলাকে দেখা যায়নি। বাসে উঠে দেখা গেল পেছনের সীটে বসে আছে।
পার্স থেকে কয়েকটা নোট বের করে জানালা দিয়ে বাড়িয়ে দিল। বাদামী একটা হাত দেখতে পেল তিন গোয়েন্দা। পলকের জন্যে চোখে পড়ল পুরানো চামড়ার জ্যাকেটের হাতা।
ওরা সীটে বসতে না বসতেই চলতে শুরু করল বাস।
দীর্ঘ যাত্রার এটাই শেষ পর্যায়। একসময় ঢুলতে শুরু করল তিন গোয়েন্দা। অস্বস্তিকর তন্দ্রা। সারাটা রাতই কাটল প্রায় এই অবস্থায়। জায়গায় জায়গায় পথ ভীষণ খারাপ। ঘুমানো অসম্ভব।
সকাল নটার দিকে লারেটোতে পৌঁছল বাস। গাছে ঘেরা একটা ছোট চত্বরে একসারি বেঞ্চ রাখা, ওটাই বাস স্টেশন।
সীমান্ত পার হয়েই ডজকে ফোন করেছিল কিশোর। বাস থেকে নেমে দেখল, তিনি দাঁড়িয়ে আছেন জীপ নিয়ে। ওদেরকে দেখে খুশি হয়েছেন, তবে বেশ অস্থির। অবাকই লাগল তিন গোয়েন্দার। ওরা গাড়িতে ব্যাগ তোলার সময় বারবার বলতে লাগলেন, র্যাঞ্চে পৌঁছতে দেরি হবে না। কিশোরের মনে হলো, ওদেরকে নয়, নিজেকেই বোঝাচ্ছেন যেন।
চত্বর থেকে বেরিয়েই পেছনে তাকাল কিশোর। আছে। একটা সাইডওয়াকের ওপর দাঁড়িয়ে জীপটার দিকেই তাকিয়ে রয়েছে লাল শাল পরা মহিলা। ওর উদ্দেশ্যে হাত নাড়ল কিশোর। তবে মহিলা তার জবাব দিল না।
তাতে কিছু মনে করল না কিশোর। এটাই বরং স্বাভাবিক। কয়েক হাজার পেসো খরচ করেছে মহিলা, সেই মেকসিকান লোকটাকে দিয়েছে ওদেরকে ঠেকানোর জন্যে। পুরো টাকাটাই জলে গেছে। ঠিকই লারেটোতে পৌঁছেছে তিন গোয়েন্দা।
র্যাঞ্চে পৌঁছতে দুই ঘণ্টা লাগল।
এঁকেবেঁকে, কখনও ঘুরে ঘুরে চলে গেছে পাহাড়ী পথ। পাহাড়ের ঢাল বনে ছাওয়া। সামনে, দূরে একসারি উঁচু পর্বত। ডজ জানালেন, ওটাই সিয়েরা মাদ্রে।
টেলিভিশনে দেখা পুরানো একটা সিনেমার কথা মনে পড়ল রবিনের। হেসে জিজ্ঞেস করল সে, ওই সিয়েরা মাদ্রে পর্বতেই হামফ্রে বোগার্ট আর তার সাথীরা গুপ্তধন খুঁজতে গিয়েছিল, তাই না?
রবিনের কথায় কেন যেন গম্ভীর হয়ে গেলেন ডজ। মাথা নেড়ে বললেন, দ্য ট্রেজার অভ সিয়েরা মাদ্রে শুধুই একটা ছবি। সত্যি নয়। ওই পর্বতে গুপ্তধন নেই।
চট করে পেছনের সীটে বসা মুসার দিকে তাকাল রবিন।
এর খানিক পরেই র্যাঞ্চে পৌঁছল ওরা। কাঠের তৈরি লম্বা, নিচু একটা বাড়ি। চারপাশের খোলা প্রান্তর ঢালু হয়ে নেমে গেছে একটা লেকের ধারে। মাঠে কয়েকটা ঘোড়া চরছে, এছাড়া জীবনের আর কোন চিহ্নই নেই কোথাও।
লেকের দিকে তাকিয়ে রয়েছে মুসা। দুই-তিন মাইল লম্বা আর আধমাইল মত চওড়া হবে লেকটা, আন্দাজ করল সে। ভাবল, মাছ ধরার চমৎকার জায়গা। সাথে করে ছিপ নিয়ে আসায় ভালই হয়েছে। লেকের অন্যপাশে আর কোন বাড়ি-ঘর নেই। কেবল গাছের জটলা। তবে গাছপালার ওপাশে পুরানো একটা বাড়ির টাওয়ার চোখে পড়ছে। গির্জা হতে পারে, কিংবা দুর্গ। হয়তো মানুষ বাস করে ওখানে।
ডজের পিছু পিছু বারান্দায় উঠল ওরা। বড় একটা ঘরে ঢুকল। ফায়ারপ্লেস আছে। আরাম করে বসার জন্যে আছে অনেকগুলো চেয়ার।
খিদে পেয়েছে নিশ্চয়? জিজ্ঞেস করলেন ডজ।
একেবারে মনের কথাটা বলে ফেলেছেন, মুসা বলল।
হাত তালি দিল ডজ। সঙ্গে সঙ্গে এসে ঢুকল একজন মেকসিকান লোক।
ওর নাম পিরেটো, ডজ জানালেন। আমার বাবুর্চি। তিন গোয়েন্দার নাম ধরে ওর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়ার কোন প্রয়োজনই বোধ করলেন না যেন।
পিরেটোর বয়স পঞ্চাশের মত। গাট্টাগোট্টা শরীর। বাদামী মুখের চামড়ায় অসংখ্য ভাঁজ, লম্বা কালো চুল। গায়ে ডেনিম শার্ট, পরনে জিনস, পায়ে কাউবয় বুট। বাবুর্চি না হয়ে র্যাঞ্চ হ্যান্ড বা রাখাল হলেই যেন বেশি মানাত তাকে, ভাবল কিশোর।
দ্রুত স্প্যানিশ ভাষায় লোকটাকে নির্দেশ দিতে লাগলেন ডজ। নাস্তা আর এক্ষুণি শব্দ দুটো বুঝতে পারল কিশোর।
মাথা ঝাঁকাল পিরেটো। চোখের মণি বাদামী, তবে এতটাই গাঢ়, প্রায় কালোই মনে হয়। একটা ব্যাপার লক্ষ্য করল রবিন, কথা বলার সময় ডজের দিকে সরাসরি তাকায় না। কেমন যেন একটা এড়িয়ে চলার প্রবণতা। দুই প্রতিদ্বন্দ্বী রক গায়কের মাঝে যেমন থাকে অনেকটা তেমনি।
ভাল বাবুর্চি পিরেটো। মুসা আর কিশোর শুয়োরের মাংস খায় না, জেনে গেছে। তাই গরুর মাংস ভাজা করে আনল। সেই সঙ্গে প্রচুর ডিম আর গরম গরম রোল।
লম্বা টেবিলটার মাথায় তিন গোয়েন্দার সঙ্গে বসলেন ডজ, তবে খেলেন না কিছু। কাঁটা চামচ দিয়ে একটা রোলকে খোঁচাতে থাকলেন নার্ভাস ভঙ্গিতে। তিন গোয়েন্দার খাওয়া শেষের অপেক্ষা করছেন, যেন কিছু বলার জন্যেই। কিছু একটা ভাবিয়ে তুলেছে মনে হয় তাকে।
পেট ভরল? মুসাকে শেষ টুকরোটা মুখে পুরতে দেখে বললেন তিনি।
বোঝাই হয়ে গেছে। দারুণ লাগল।
উঠে দাঁড়ালেন ডজ। এসো তোমাদেরকে র্যাঞ্চটা দেখাব।
বাইরে বেরিয়ে দ্রুত একটা বেড়ার কাছে নিয়ে এলেন ওদেরকে। অনেকখানি জায়গা ঘিরে বেড়া দেয়া হয়েছে। মাঠের এক ধারে ছোট একটা কাঠের ছাউনি।
এসো, আমার বারো দেখাব। ওদের মতামতের অপেক্ষা না করেই ছাউনিটার দিকে এগিয়ে গেলেন ডজ। ওটার কাছে পৌঁছার আগেই ছাউনি থেকে বেরিয়ে এল একটা গাধা, মেকসিকানরা বলে বারো। বেরিয়েই ওদেরকে দেখে থমকে গেল, তারপর যেন লজ্জা পেয়েই ওদের কাছ থেকে সরে গেল।
মেরুদন্ডের ওপর দিয়ে কালো একটা দাগ গিয়ে কাঁধের কাছটায় ছড়িয়ে পড়েছে জানোয়ারটার। চামড়াটাকে প্রায় সাদাই বলা চলে। বড় বড় কান, লম্বা লেজের মাথায় চুলের ঘন গোছা। সামনের একপায়ে দড়ি বাঁধা। সেটা ছুটিয়ে পালানোর চেষ্টা করল।
যে-কোন পোষা জানোয়ার মুসার পছন্দ। গাধাটাকে আদর করার জন্যে এগোতে গেল সে। থামিয়ে দিলেন ডজ। ছুঁয়ো না। বয়স একেবারেই কম, বড়জোর দুবছর। পোষ মানেনি এখনও।
কয়েক গজ দূরে দাঁড়িয়ে মাটিতে পা ঠুকছে গাধাটা। এলোপাতাড়ি কয়েকবার পেছনের পা ছুঁড়ে যেন বুঝিয়ে দিতে চাইল কাছে গেলে ভাল হবে না।
অনেক বুনো গাধা আছে এখানকার পাহাড়ে, ডজ জানালেন। মাস দুই আগে আমার মাঠে ঢুকে পড়েছিল ওটা। ধরে ফেললাম। ওর নাম রেখেছি শারি। মুসার দিকে তাকালেন তিনি। নাম ধরে ডেকে দেখ। বলো, এদিকে এসো, শারি। দেখ কি করে।
ব্যাপারটা কি? ওদেরকে শিশু মনে করছেন নাকি ডজ? এমন ভাবে কথা বলছেন! তবে যেহেতু জানোয়ারটাকে ভাল লেগেছে তার, ডজের কথামত ডাক দিয়ে বলল, এখানে এসো, শারি। এসো।
লম্বা কানদুটোকে পেছন দিকে শুইয়ে ফেলল শারি। প্রায় ঘাড় ছুঁয়েছে কানের ডগা। ঘোড়ার স্বভাব জানা আছে মুসার। তা থেকেই আন্দাজ করল, সতর্ক হয়ে উঠেছে গাধাটা কিংবা রেগে গেছে। আরেকবার ডাকল নাম ধরে। কাছে তো এলই না, আরেকটু সরে গেল ওটা, দড়ি লম্বা হলে আরও সরত।
তুমি ডাকো, রবিনকে বললেন ডজ।
কি হবে ডেকে? এসব ছেলেমানুষী ভাল লাগছে না রবিনের। বললে আরও সরে যেতে চাইবে।
তা ঠিক। হাসলেন ডজ। কিশোরের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি ডাকবে?
শারির আসা-যাওয়া নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই কিশোরের। এলেই বা কি, না এলেই কি? কিন্তু যে ভঙ্গিতে ওর দিকে তাকিয়ে রয়েছেন ডজ, কৌতূহল হল তার।
বিরক্তি চেপে জোরে ডাক দিল কিশোর, এদিকে আয়, শারি।
অদ্ভুত কান্ড করল শারি। ঝটকা দিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল এদিকে। সরাসরি কিশোরের দিকে। একবার কেঁপে উঠল কানের ডগা। সামনের দিকে বাড়িয়ে দিল।
খাইছে! কান্ডটা কি হলো?
আবার! ফিসফিসিয়ে উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন ডজ। আবার ডাকো!
আগ্রহী হয়ে উঠেছে কিশোর। আবার ডাক দিল, এদিকে আয়, শারি!
দড়ি বাঁধা পা দিয়ে বাতাসে লাথি মারল শারি, দড়িটা খুলে ফেলার চেষ্টা করল। তারপর দৌড়ে এল কিশোরের দিকে। ফুটখানেক দূরে এসে দাঁড়িয়ে গেল। গলা লম্বা করে নাক দিয়ে আলতো গুতো দিল ওর বুকে।
তোমার প্রেমে পড়ে গেছে! মেয়ে, গাধা তো! হেসে কিশোরের কাঁধে চাপড় মারল রবিন। কেমন লাগছে, কিশোর? মাত্র তিনটে শব্দ ব্যবহার করলে। আর জলজ্যান্ত একটা গাধাকে পটিয়ে ফেললে।
পিছিয়ে গেল কিশোর। গাধাটার এই আচরণ অবাক করেছে ওকে। রবিনের কথায় লজ্জা পেয়েছে।
আদর করো ওকে! কিশোরের হাত চেপে ধরল ডজ, যাতে সরে যেতে না পারে। দেখ, কি করে?
প্রচন্ড কৌতূহল চাপতে পারল না কিশোর। আস্তে করে হাত বুলিয়ে দিল শারির মাথায়। ঝট করে কান সোজা করে ফেলল গাধাটা। আবার কিশোরের বুকে নাক ঘষল।
চওড়া হাসি ছড়িয়ে পড়েছে ডজের মুখে। যেন এইমাত্র বিরাট অঙ্কের একটা বাজি জিতে গেছেন, এমনি ভাবভঙ্গি। ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ফেলে কিশোরকে অবাক করে দিয়ে বললেন, নাহ, আর কোন সন্দেহ নেই আমার! আমি এখন শিওর, ও তোমাকে পিঠে চড়তে দেবে। যাও। ওঠো। বয়েস কম হলে কি হবে, যা শক্তি আছে তোমার মত একজন মানুষকে সহজেই বইতে পারবে। সাধে কি আর বলে ভারবাহী গাধা। এমন ভঙ্গিতে কথাগুলো বললেন তিনি, যেন মস্ত এক দুশ্চিন্তা থেকে রেহাই পেয়েছেন।
দ্বিধা করছে কিশোর। গাধার পিঠে চড়ার আগ্রহ নেই। কিন্তু ডজের অতি আগ্রহ অসংখ্য প্রশ্নের ভিড় জমিয়েছে ওর মনে। কিছু একটা ব্যাপার নিশ্চয় রয়েছে এসবের পেছনে। গোয়েন্দা হিসেবে এখন তার উচিত সমস্ত সূত্র খতিয়ে দেখা।
ডান পা তুলে দিয়ে লাফিয়ে গাধার পিঠে চড়ে বসল সে। ঘাড় বাঁকা করে বড় বড় কোমল চোখ মেলে ওকে দেখার চেষ্টা করল শারি। টান টান হয়ে গেছে কান, খাড়া হয়ে আছে মাথার ওপর। সওয়ারি হিসেবে কিশোরকে নিতে মনে হয় আপত্তি নেই তার।
হ্যাঁ, এবার চলতে বলো। ফিসফিস করে শিখিয়ে দিলেন ডজ। গলায় উত্তেজনা।
হঠাৎই কথাটা মনে পড়ে গেল কিশোরের। প্রকাশ করল না সেটা। চলতে বলল গাধাটাকে।
টলমল পায়ে আগে বাড়ল ওটা। জিন, লাগাম কিছুই নেই। শারির গলা জড়িয়ে ধরে রাখতে হলো কিশোরকে, যাতে পড়ে না যায়। একটা সূত্র ধরিয়ে দিয়েছেন তাকে ডজ। মেকসিকোতে তো বটেই, আমেরিকার পশ্চিমাঞ্চলেও কাউবয়রা ঘোড়া চালানোর সময় কিছু বিকৃত শব্দ ব্যবহার করে, যেমন, চলতে বললে বলে গিডিআপ, আর থামতে বললে হুয়া। সেটাই পরখ করে দেখার ইচ্ছে হলো তার। কয়েক কদম এগোতেই বলল সে, হয়া, শারি, হয়া!
সঙ্গে সঙ্গে আদেশ পালন করল গাধাটা। থেমে গেল।
বাহ! এগিয়ে এলেন ডজ। কিশোরকে গাধার পিঠ থেকে নামতে সাহায্য করলেন। চমৎকার শিখে ফেলেছ তো তুমি। গাধাটাকেও পোষ মানিয়ে ফেলেছ।
হ্যাঁ, মুসা বলল। মানুষ, জানোয়ার সব কিছুকেই পোষ মানাতে ওস্তাদ কিশোর পাশা। ও যে কোন কাজটা পারে না, সেটাই বুঝি না মাঝে মাঝে।
মজার কান্ড করল, ডজের দিকে তাকিয়ে বলল কিশোর। ভুল করে হয়তো আমাকে অন্য কেউ ভেবেছে শারি, যার কথা সে শোনে।
তা কি করে হয়? মাথা নাড়লেন ডজ। এখানে যখন এসে ঢুকল, পুরোপুরি বুনো ছিল শারি। সারা জীবনে কেবল দুজন লোককে দেখেছে। আমাকে, আর পিরেটোকে।
কিন্তু আপনাদের দুজনের কারও মতই দেখতে নই আমি। নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটল গোয়েন্দাপ্রধান। জটিল কোন ভাবনা মাথায় ঢুকলেই মাঝে মাঝে এই কাজটি করে সে। তার ধারণা এতে তার ভাবনার একাগ্রতা আসে।
আধঘণ্টা পরে যখন বিশাল ঘরটায় এসে বসল, তখনও চিমটি কাটা বন্ধ হলো না তার। রবিন আর মুসাও বসেছে ওর সঙ্গে। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল সে, মাঠের ধারের ছাউনিটার দিকে। বেড়ার কাছে দাঁড়িয়ে আছে সাদা গাধাটা। এদিকেই তাকিয়ে রয়েছে জানোয়ারটাও। আস্তে করে ডাক দিচ্ছে, যেন চাইছে কিশোর গিয়ে আবার তাকে আদর করুক।
শারি! ছিপটা জোড়া লাগাতে লাগাতে আচমকা চিৎকার করে উঠল মুসা। ঠিক, মনে পড়েছে। শারি হলো গিয়ে ড্যাগউডের স্ত্রীর নাম! যে ধাঁধাটার সমাধান করেছিলে সেদিন, তাতে একটা জবাব ছিল, শারি।
তা ছিল, সায় দিয়ে বলল কিশোর। তবে শুধু শারিই নয়। আরও কিছু জবাব ছিল ওটাতে। আরও সূত্র।
আর কি সূত্র? ব্যাগ খুলতে খুলতে জিজ্ঞেস করল রবিন। কাপড় বের করে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখতে লাগল ওয়ারড্রোবের ড্রয়ারে। ওই গাধাটা কেন তোমার প্রেমে পড়ল, সেই সূত্র?
রসিকতাটা এড়িয়ে গিয়ে কিশোর বলল, গাধাটাকে বলার জন্যে আমাদেরকে যেসব শব্দ বলেছে, ক্রসওয়ার্ড পাজলের উত্তরগুলোই হলো সেসব শব্দ।
তাই? মুসার প্রশ্ন। আর কোনটা?
দেয়ালে হেলান দিয়ে চোখ মুদল কিশোর। ধীরে ধীরে বলতে লাগল, কাম। হিয়ার। গিডি আপ। উওউ। দুর্ভাগ্য কিংবা দুঃখ বোঝাতে ব্যবহার হয় এই উওউ শব্দটা। আর, হুয়া শারি, মানে হলো, থাম। শারি! এবং প্রতিটি কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে গাধাটা।
নিজের বাংকে গিয়ে বসে পড়ল রবিন। চিন্তিত ভঙ্গিতে ভ্রূকুটি করল একবার। বলল, কিশোর, তুমি কিছু একটা ভাবছ।
নীরবে রবিনের দিকে তাকিয়ে রইল কিশোর। জবাব দিল না।
আবার বলল রবিন, মুসাও তো ওই শব্দগুলোই ব্যবহার করেছিল। শারি তো ওর কথা শোনেনি?
জানি, রবিনের মতই অবাক হয়েছে কিশোরও। বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছে না। তবু বলতে হচ্ছে, ওই গাধাটার সঙ্গে কোথাও দেখা হয়েছে আমার। সে জন্যেই আমাকে চিনতে পারছে। অন্তত আমার গলা যে চিনেছে, তাতে কোন সন্দেহ নেই।