পালা করে ভেলায় উঠে বিশ্রাম নেয় ওরা। শক্ত কাণ্ডের ওপর শুয়ে থাকা, মুখের ওপর ঢেউ ভেঙে পড়া, মোটেই আরামদায়ক নয়। ঘন্টাখানেক পর সাগরে নেমে বরং আরামই লাগে।
আবার অনেকক্ষণ ধরে সাঁতার কেটে ভেলায় উঠতে পারলে সেটাও খানিকটা স্বস্তি।
তবে যতই সময় কাটতে লাগল এই আরাম আর স্বস্তি কোনটাই থাকল না।
দিনটা তো কাটল যেমন তেমন, রাতটা বড় বেশি দীর্ঘ মনে হল। ঘুমানো অসম্ভব! সারাক্ষণ জেগে থাকা, সতর্ক থাকা, ঢেউ এসে নাকে ঢোকে কিনা সে। খেয়াল রাখা, এক মহা বিরক্তিকর ব্যাপার। তন্দ্রা এলে, সামান্য অসতর্ক হলেই নাকেমুখে ঢুকে প্রায় শ্বাসরুদ্ধ করে দিতে চায় পানি।
তার ওপর রয়েছে জলজ জীবের ভয়। আতঙ্কিত করে রেখেছে ওদের। চেনাঅচেনা অদ্ভুত সব প্রাণী নিচ থেকে উঠে আসছে আজব ভেলাটাকে পরীক্ষা করে দেখতে। সাগরে এত প্রাণী আর কখনও দেখেনি ওরা।
সাগরে অবশ্য এত প্রাণীরই বাস। কিন্তু জাহাজে কিংবা নৌকায় থেকে সেগুলো খুব কমই দেখা যায়। ওপর থেকে বড়জোড় কিছু ডলফিন আর উড়ুক্কু মাছ, ব্যস। গভীর পানির জীবেরা দানবীয় জলযানের কাছে আসতেই ভয় পায়।
এমনকি দুই কাণ্ডের প্রায় ডুবো ডুবো ভেলার চেয়ে সাত কাণ্ডের ভাসমান। ভেলাটাও অনেক বেশি ভয়াল ছিল ওগুলোর কাছে। এ দুটোকে নিজেদের মতই কোন প্রাণী ভাবল বোধহয় মাছেরা, তাই দেখতে এল।
নিচে তাকালেই দেখা যায় অসংখ্য আলো। যেন ওপরের তারাজ্বলা আকাশের মতই নিচেও আরেকটা আকাশ রয়েছে।
বেশি দেখছে মুসা। ওই যে গেল একটা লণ্ঠন মাছ।…একটা তারাখেকো।…খাইছে! ওটা কি?
বিশাল দুটো চোখ অলস ভঙ্গিতে অনুসরণ করে চলেছে ভেলাটাকে। প্রায় এক ফুট ব্যাস, জ্বলছে, হলদে-সবুজ আলো।
ওটা আমাদের পুরানো দোস্ত, কিশোর বলল। জায়ান্ট স্কুইড।
কেঁপে উঠল রবিন। ও দোন্ত হতে যাবে কেন! শুঁড় বাড়িয়ে ধরবে না তো ব্যাটা?
ধরতেই পারে,মুসা বলল। থাক, এসব অলক্ষুণে কথা বল না। বল, ও খুব ভাল মানুষ, এখুনি চলে যাবে। বলে ভেলায় ঠেলার জোর কিছুটা বাড়াল সে।
পেছনে পড়ল চোখ দুটো।
উদয় হল আরও বিচিত্র একটা জীব। স্কুইডের চোখের মতই অনেকটা, জ্বলন্ত, আরও অনেক বড়। ওটার ব্যাস আট ফুটের কম না। রূপালি আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে। ভেলার একেবারে নিচে চলে এল ওটা। ছয় ফুট নিচ দিয়ে অনুসরণ করে চলল। মস্ত এক পূর্ণিমার চাঁদ যেন।
বোবা হয়ে গেছে যেন ছেলেরা। মুসার বাহুতে হাত রাখল কুমালো। কাপছে মুসা। অন্য দুজনের অবস্থাও ভাল নয়। চোখই যার এতবড়, সেই দানবটা কত বড়!
চোখ নয় ওটা, কুমালো বলল। ওটা চন্দ্র মাছ। চাঁদের মতই গোল আর জ্বলে তো, সেজন্যে ওই নাম।
গোল মাছ? মুসা বলল। যাহ, বানিয়ে বলছ, আমরা যাতে ভয় পাই।
না, বানিয়ে বলছি না। মাথাটা দেখতে পাচ্ছি আমরা।
তাহলে বাকি শরীরটা কোথায়?
বাকি কোন শরীর নেই। মাথা ছাড়া আর কিছু নেই ওটার। সেজন্যেই অনেকে বলে মাথা মাছ। আরও একটা নাম আছে ওটার, সূর্য মাছ। দিনের বেলা, প্রায়ই ভেসে থেকে রোদ পোয়ায় তো।
মাথা ছাড়া আর কিছু নেই? বিশ্বাস করতে পারছে না মুসা।
থাকে, ছোট বেলায়। লেজ। ধীরে ধীরে খসে যায় ব্যাঙের পোনার মত। আসলে মাথা ঠিক নয় ওটা, পুরো শরীরটাই। ওটার ভেতরেই রয়েছে ওর পেট আর শরীরের অন্যান্য যন্ত্রপাতি। সাঁতার কাটার জন্যে পাখনাও আছে।
বেশ বড়। ওজন নিশ্চয় টনখানেকের কম না।
হ্যাঁ। আরও বড় হয়। মাঝে মাঝে ক্যানুর তলা ঠেকে যায় পানির নিচে ভেসে থাকা মাথা মাছের গায়ে। মনে হয় ডুবো চরায় লেগেছে।
কয়েক মিনিট ধরে ভেলাটাকে অনুসরণ করল সাগরের চাঁদ। ওটা থাকতে থাকতেই এল চারটে সাপের মত জীব। রক্ত ঠাণ্ডা করে দেয়া চেহারা। ওগুলোর আলো নেই, চাঁদ মাছের আলোয় দেখা গেল কুৎসিত ভঙ্গিতে শরীর মোচড়াচ্ছে। আট-দশ ফুট লম্বা, মানুষের উরুর সমান মোটা।
সাপ নাকিরে বাবা? মুসা বলল।
না, মোরে, ছুরি বের করল কুমালো। এক ধরনের বান মাছ। এ-ব্যাটাদের ব্যাপারে হুঁশিয়ার। সব খায়। মানুষের মাংসেও অরুচি নেই।
হারামী জীব! বিড়বিড় করে বলল কিশোর।
হ্যাঁ, রবিন বলল। বইয়ে পড়েছি, প্রাচীন রোমানরা নাকি মোরে ইল পুষত, এক পুকুরে অনেকগুলো। রোজ সকালে ওগুলোর নাস্তার জন্যে জ্যান্ত মানুষ ফেলে দিত পুকুরে। যুদ্ধবন্দী কিংবা গোলামদের।
হাতে ছুরি নিয়ে সতর্ক দৃষ্টিতে পানির নিচে তাকিয়ে আছে কুমালো। আমরা ওদেরকে বলি ক্যামিচিক। অর্থাৎ ভয়ানক জীব। ব্যাটারা উভচর। গাছ বেয়ে ওপরে উঠে সাপের মত ওত পেতে থাকে। নিচে দিয়ে শিকার গেলে ঝাঁপিয়ে পড়ে তার ওপর। পোনাপৈতে একবার একজনকে কামড়ে দিয়েছিল একটা মোরে। সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে নেয়ার পরেও বাঁচেনি লোকটা, দুদিন পর মারা যায়।
ভেলার নিচ দিয়ে কয়েকবার আসা-যাওয়া করল ওগুলো। কুমালাৈর মত মুসাও ছুরি বের করে তৈরি হয়ে আছে।
ভেলায় এসে উঠবে না তো? জিজ্ঞেস করল সে।
উঠতেও পারে। অনেক সময় নৌকায়ই উঠে পড়ে চুরি করে। ওঠার সময় লেজটাকে কাজে লাগায় ওরা। দুনিয়ার বেশির ভাগ প্রাণীই আক্রান্ত না হলে হামলা করে না। কিন্তু মোরের ওসব দ্রতা নেই। অযথাই লাগতে আসে। এক ইঞ্চি লম্বা দাঁতের সারি, ছুরির মাথার মত চোখা আর ধারাল।
ছুরির বাঁট শক্ত করে চেপে ধরল মুসা। আসুক। প্রথম যে ব্যাটা আসবে, মুণ্ড কেটে ফেলব।
তাতে আরও খারাপ হবে। রক্তের গন্ধে হাজির হয়ে যাবে হাঙর। তাছাড়া ঘাড়ের চামড়া সাংঘাতিক শক্ত ওগুলোর। সহজে কাটবে না। তবে লেজের চামড়া নরম।
চলে গেল একটা বান। খানিক পরেই আলতো ছোঁয়া লাগল মুসার পিঠে। সে ঘাড় ফেরার আগেই ছুরির বাঁট দিয়ে গায়ের জোরে বাড়ি মারল কুমালো।
যাক, বলল সে। এই একটা আর জ্বালাতে আসবে না।
মুহূর্ত পরেই এল আরেকটা। মুসার প্রায় মুখে লেজ বুলিয়ে গেল। তার দিকেই বানগুলোর নজর কেন, বোঝা গেল না। পিঁপড়েরাও তার প্রতিই বেশি আকৃষ্ট হয়। আমাজানের জঙ্গল আর আফ্রিকাতেও সেই প্রমাণ পাওয়া গেছে। এখন শুরু করেছে। বান মাছগুলো। কাণ্ডের ওপর দিয়ে সাপের মত গড়িয়ে এল লেজ, আলতো ছোঁয়া লাগল মুসার মুখে। তারপরই উঠে এল মোটা শরীরটা, কুৎসিত মুখটা এগিয়ে আসছে নিঃশব্দে। হাঁ করা চোয়ালে তীক্ষ্ণ দত। তারার আলোয় অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কুমালোর মতই ছুরি দিয়ে লেজে বাড়ি মারল মুসা। যন্ত্রণায় মোচড় দিয়ে উঠল বানের শরীর, লাফ দিয়ে নেমে গেল পানিতে।
চন্দ্র মাছের কাছে আর কোন সর্পিল ছায়াকে চোখে পড়ল না।
দুর্বল লাগছে মুসার। বান মাছগুলো আতঙ্কিত করে দিয়েছে তাকে, কাহিল। লাগছে সে-জন্যেই। ভেলায় উঠে শুয়ে পড়ল। ঘুম এসে গেল সঙ্গে সঙ্গে, কিন্তু পরমুহূর্তেই জেগে উঠল নাকে-মুখে পানি ঢুকে যাওয়ায়।
সবাই বুঝল, এখন ঘুমাতে না পারলে হয়ত মাথাই খারাপ হয়ে যাবে মুসার।
ওঠ, উঠে বস, কুমালো বলল। ঘোর। আমার কাঁধে মাথা রাখ…হ্যাঁ, ঘুমাও এবার।
তর্ক করতেও ইচ্ছে হল না মুসার। কুমালোর কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ল। ঢেউ এখন আর তার নাক ছুঁতে পারছে না।
বাতাস বাড়ছে। শীত করতে লাগল ওদের। ভোরের দিকে অসহ্য হয়ে উঠল ঠাণ্ডা। দিগন্তে সূর্যের আগমনে তাই খুশি হল খুব। তরে ঘন্টাখানেকও লাগল না, দূর হয়ে গেল খুশি। ভাবল, এর চেয়ে ঠাণ্ডা রাতই আরামের ছিল।
ঘুমিয়ে বেশ ঝরঝরে হয়েছে মুসার শরীর। ফলে ক্ষুধাও লেগেছে, পিপাসাও। অনন্যরা ঘুমাতে পারেনি, ফলে এই অসুবিধেটা দেখা দেয়নি এখনও।
তবে ক্ষুধার কথাটা কাউকে বলল না সে।
নিজের হাতের তালু দেখল, অন্যদেরগুলোও দেখল। নোনা পানিতে ভিজে কুঁচকে গেছে চামড়া।
।মরেছি, বলল মুসা। চামড়ার যা অবস্থা, আর বেশিক্ষণ এই অবস্থা চললে খসে যাবে। রসিকতা করল, দাও দাও, কোল্ড ক্রীমের কৌটাটা দাও।
অন্যেরা ক্লান্ত। কাজেই ভেলার বড় মোটরটা হল এখন মুসা। জোরে জোরে ঠেলতে লাগল। আশা তাদেরকে নিরাশ করবে বলেই মনে হচ্ছে।
বেলা যতই বাড়ল, বাড়ল ক্ষুধা আর পিপাসা, সবারই। পানিতে থাকায় একটা উপকার হয়েছে, রোমকূপ দিয়ে আর্দ্রতা ঢুকছে, ফলে দ্রুত পানিশূন্যতার হাত থেকে রেহাই পেয়েছে শরীর। ডাঙায়থাকলে আরও অনেক আগেই প্রচণ্ড পিপাসা পেত। এখানে ধীরে ধীরে আসছে পিপাসা, কিন্তু আসছে তো। রাত নাগাদ এত বেড়ে গেল, এখন যদি কেউ বলে এক গেলাস পরিষ্কার পানি দেবে, বিনিময়ে মুক্তা তিনটে দিয়ে দিতে হবে, সামান্যতম দ্বিধা করবে না কিশোর।
এই রাতে নিজেকে বালিস বানানর প্রস্তাব দিল মুসা। সবাই তার কাঁধে পালা করে মাথা রেখে ঘুমিয়ে নিক। প্রথমে ঘুমাল রবিন। তারপর কুমালো। সব শেষে কিশোর। শেষ দিকে নিজের চোখও আর খুলে রাখতে পারল না মুসা। কুমালে আর রবিন ভেলা ঠেলছে। কাণ্ড ধরে ভেসে রয়েছে সে। কাঁধের ওপর কিশোরের মাথা।
ঘুমিয়ে পড়ল মুসা। প্রায় একই সঙ্গে চমকে জেগে উঠল সে আর কিশোর। দুজনেই নাকেমুখে পানি ঢুকে গেছে। কাশতে আরম্ভ করল।
পরদিন সকালে কোথা থেকে এসে হাজির হল একঝাঁক বোনিটো। ভেলার সঙ্গে সঙ্গে চলল। বার বার ছোঁ মারল অভিযাত্রীরা, কিন্তু একটাকেও ধরতে পারল না।
বড়শির সুতো বানাতে পারলে কাজ হত, কাণ্ডের দিকে তাকিয়ে বলল। কুমালো। নারকেলের ছোবড়া দিয়ে তো বানানো যায়। কাণ্ডের আঁশ দিয়েও বোধহয় হবে।
দিনের অনেকটা সময় ব্যয় করল ওরা আঁশ বার করতে। জোড়া দিয়ে, পাকিয়ে তৈরি করে ফেলল একটা সুতো, যদিও মাত্র পাঁচ ফুট লম্বা। তবে শক্ত। বাকল কেটে একটা বড়শি বানাল কুমালো। সুতোর মাথায় বাঁধল সেটা। কিন্তু টোপ নেই।
টোপ ছাড়াই বড়শিটাকে পানিতে ঝুলিয়ে রাখল ওরা। আশা করছে, যদি কোন একটা বোকা বোনিটো খাবার মনে করে গিলে ফেলে?
চলে গেল বোনিটোর ঝক। অন্যান্য মাছ এল গেল, বড়শির দিকে নজর দিল কেউ।
আরেকটা ভয়ঙ্কর রাত পেরোল, কাটল দুঃসহ দিন। নোনা পানিতে ভিজে আর কাণ্ডের সঙ্গে ঘষা লেগে ঘা দেখা দিতে লাগল শরীরে। পা ফুলে যাচ্ছে। একধরনের ঝিনঝিনে অনুভূতি। লাল লাল দাগ পড়ছে, কোথাও কোথাও ফোসকা।
এই অবস্থাকে বলে ইমারসন ফুট, কিশোর বলল। এরপর দেখা দেবে ফোঁড়া। নোনা পানির ফোঁড়া।
রোদে পুড়ে গেছে চামড়া। টকটকে লাল হয়ে উঠেছে চোখ, ভীষণ জ্বালা করছে।
পানির অভাবে শুকিয়ে ঠোঁট ফেটে গেছে। ফুলে উঠেছে জিভ, মুখগহুর ভরে দিয়েছে যেন। কথা বলতে অসুবিধে হয়। নোনাপানি দিয়েই গরগরা করল মুসা, গিলেও ফেলল খানিকটা।
সাবধান, হুঁশিয়ার করল কিশোর। পেটে খুব সামান্য গেলে ক্ষতি নেই। কিন্তু একবার খাওয়া শুরু করলে আর লোভ সামলাতে পারবে না।
শরীরের লবণ দরকার হয়, প্রতিবাদের সুরে বলল মুসা। খেলে ক্ষতিটা কি বুঝি না।
বেশি খেলে প্রথমে জ্ঞান হারাবে, রবিন বলল। তারপর দুটো ব্যাপার ঘটতে পারে। হুঁশ ফিরে পাবে, তবে মাথায় গণ্ডগোল হয়ে যাবে। কিংবা একেবারেই আর ফিরবে না।
তাতেই বা কি? তিক্তকণ্ঠে বলল মুসা। এমনিতেই পাগল হব, কিংবা মরব। তারচে খেয়েই মরি। কপালে হাত রেখে সামনে তাকাল সে। পাগল বোধহয় হতেই শুরু করেছি। নানারকম গোলমেলে জিনিস দেখছি।
কি দেখছ? মেঘ করেছে। মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। ওই তো, দক্ষিণ-পশ্চিমে দেখাল সে। আমি জানি, চোখের ভুল…
ভুল নয়! চেঁচিয়ে উঠল রবিন। সত্যি বৃষ্টি হচ্ছে, আধ মাইল দূরেও হবে না। চল চল, জলদি চল!
চারজনে মিলে ঠেলতে শুরু করল ভেলাটাকে। দ্রুত সাঁতরে চলল মেঘের দিকে।
কিন্তু হতাশ হতে হল ওদেরকে। ওরাও পৌঁছে সারল, বৃষ্টি থেমে গেল। হেসে উঠল রোদ, যেন ব্যঙ্গ করল অভিযাত্রীদের।
দেখ দেখ, ওই যে আরেকখানে হচ্ছে? রবিন দেখাল এবার। সিকি মাইল পশ্চিমে। কাছেই, ওটাতে সময়মত পৌঁছানো যাবে এই আশায় ভেলা ঠেলে নিয়ে চলল ওরা। হালকা বাতাসে ভেসে এসেছে একটুকরো কালো মেঘ, ওটা থেকেই। বৃষ্টি পড়ছে।
সাঁতরে চলেছে ওরা। মেঘটাকেও ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বাতাস। ওরা যতই জোরে সাঁতরায়, বাতাসও ততই জোরে বয়। যেন খেলা জুড়েছে ওদের সঙ্গে। ওরা ক্লান্ত হয়ে পড়ছে, কিন্তু বাতাসের ক্লান্তি নেই। তবু আশা ছাড়তে পারল না ওরা। : অবশেষে ঝরে ঝরে শেষ হয়ে গেল মেঘটা। রোদ দেখে বিশ্বাস করার উপায় নেই কয়েক মিনিট আগেও কেঁপে বৃষ্টি হচ্ছিল ওখানে।
কি মনে হয়? মুসা জিজ্ঞেস করল। সবই কি আমাদের কল্পনা?
নিশ্চয় না, বলল কিশোর। আমরা সবাই দেখেছি, তাই না? কেউ জবাব দিল না দেখে কুমালোকে বলল, কথা বলছ না কেন? দেখিনি?
মনে তো হল…, দ্বিধা করছে কুমালো। আসলে, কোন কিছুকেই আর বিশ্বাস করতে পারছি না।
এই যে আরেক কাণ্ড, এটাকেও বিশ্বাস করতে পারছি না! চেঁচিয়ে উঠল মুসা। অথচ হাতে লাগছে। ধরতেও পারছি। বড়শিটা বেঁধে রাখা হয়েছে কাণ্ডের সঙ্গে, তাতে আটকা পড়েছে একটা অ্যালবাকোর মাছ। মাছটা তুলে দেখাল সে। কালো, চকচকে শরীর। বেশি বড় না, মাত্র দেড় ফুট। তবে বেশ মোটাসোটা, ভাল মাংস।
ছুরি নিয়ে ক্ষুধার্ত হায়েনার মত মাছটাকে আক্রমণ করল ওরা। দেখতে দেখতে কাঁটাগুলো ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকল না। ছোট একটা টুকরো সরিয়ে রাখল কুমালো, বড়শির টোপের জন্যে।
অনেকটা সুস্থ বোধ করল ওরা, পিপাসাও কমল সামান্য। অ্যালবাকোরের রসাল মাংসে পানি আছে। তবে একেকজনের ভাগে যেটুকু পানি পড়ল, বড় এক চামচের বেশি না।
বড়শিতে টোপ দেয়ায় তাড়াতাড়িই আকৃষ্ট হল শিকার, একটা বাচ্চা করাত মাছ। ধরা পড়ার পর আর রেহাই নেই, তুলে ওটাকে যত দ্রুত পারল সাবাড় করে দেয়া হল, টোপের জন্যে খানিকটা মাংস রেখে।
শিশু করাত যেখানে আছে, ধাড়িও থাকতে পারে। একটু পরেই দেখা গেল। ওটাকে। আলোড়ন তুলল পানিতে।
ওই দে! কুমালোকে দেখাল মুসা।
ছোট মাছের ঝাঁককে আক্রমণ করেছে বিশাল এক করাত মাছ। যোলো ফুটের কম হবে না। করাত দিয়ে দুটুকরো করে ফেলছে মাছগুলোকে, তারপর গপাগপ গিলছে। মারাত্মক ওদের করাত। তিমিকেও ছেড়ে কথা কয় না। অনেক সময় হারেও তিমি।
বিশাল করাতের কাছ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করল ওরা। কাটা মাছের টুকরো ভেসে উঠছে পানিতে। নিয়ে আসছে ওগুলো মুসা আর কুমালো। জমাচ্ছে জেলার ওপর।
রক্তের গন্ধে এসে হাজির হল মস্ত এক টাইগার শার্ক। কাটা মাছগুলো খেতে শুরু করল।
এটা মোটেই পছন্দ হল না করাত মাছের। সোজা গিয়ে করাত চালিয়ে দিল হাঙরের গায়ে। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোল হাঙরের। পালাবে না পাল্টা আক্রমণ করবে ঠিক করতে পারছে না যেন।
দশ মিনিটের মধ্যে হাজির হয়ে যাবে হাঙরের পাল, শঙ্কিত হয়ে বলল কুমালো। চল, এখানে থাকা আর নিরাপদ না।
ভেলা ঠেলে তাড়াতাড়ি ওখান থেকে সরে এল ওরা। পেছনে তাকিয়ে দেখল, খানিক আগে যেখানে ছিল ওরা সেখানকার পানি যেন টগবগ করে ফুটছে। অসংখ্য হাঙর এসে হাজির হয়েছে। রক্তাক্ত হয়ে গেছে পানি।
আরও দূরে সরে এল ওরা। তারপর কাঁচা মাছ খাওয়ায় মন দিল।
বড় উপকার করল করাতটা, চিবাতে চিবাতে বলল মুসা। নাহ, ততটা দুর্ভাগা নই আমরা। কপাল মাঝে মাঝেই ভাল হয়ে যায়।
কিন্তু তারপর যতই সময় গেল কপাল আবার খারাপ হতে লাগল। মাছ আর চোখেই পড়ে না এখন। শুধু জেলিফিশ। ঘন হয়ে ছড়িয়ে আছে মাইলের পর মাইল জুড়ে। খুব সাবধানে চলতে হচ্ছে ওগুলোর ভেতর দিয়ে। জেলিফিশের শুড়ে মারাত্মক বিষ। বড় বড় মাছকেও অবশ করে ফেলে।
জেলিফিশের সব চেয়ে খারাপ প্রজাতিগুলোর একটা সী ব্লাবার। লাল রঙ, সাত ফুট পুরু, একেকটা শুঁড় একশো ফুট লম্বা। সাঁতার কাটার সময় সাঁতারুর শরীরে অনেক সময় জড়িয়ে যায় ওই শুঁড়, বিষাক্ত হুল ফুটতে থাকে চামড়ায়। তখন অন্যের সাহায্য ছাড়া ওই শুঁড় খোলা তার পক্ষে প্রায় অসম্ভব।
কম-বেশি হুল অভিযাত্রীদের সবার শরীরেই ফুটল। জেলিফিশের এলাকা থেকে সরে আসার পরেও অনেকক্ষণ থাকল ওই হুলের জ্বালা। আশার গায়ে লেগে আছে থিকথিকে জেলির মত জিনিস, জেলিফিশের গা থেকে লেগেছে, ওগুলোও বিষাক্ত।
পরদিন দেখা গেল একটা পাখি। মৃত্যুদ্বীপ থেকে আসার পর এই প্রথম পাখি চোখে পড়ল ওদের। কিছুক্ষণ পর উড়ে এল আরও অনেক পাখি, নডি, বুবি। পাক খেয়ে খেয়ে উড়তে লাগল ভেলাটাকে ঘিরে।
এরমানে, কুমালো বলল। ডাঙা দূরে নয়।
রক্তলাল উৎসুক চোখ মেলে ডাঙা খুঁজল চারজোড়া চোখ। কিন্তু দিগন্তের কোথাও নারকেল গাছের একটা মাথাও চোখে পড়ল না।
কোন কিছুই আর ভাল লাগছে না এখন ওদের। সব কিছুতেই বিরক্তি। এমন কি নিজেদের সান্নিধ্যও খারাপ লাগছে, সইতে পারছে না একে অন্যকে। বুঝতে পারছে কিশোর, এই অবস্থা আর দুদিন চললেই পাগল হয়ে যাবে সবাই।
মুসা বলল, রবিনকে একই ভেলায় আর সইতে পারছে না সে। রবিন ঘোষণা করে দিল, হাতের কাছে কিছু একটা পেলেই মুসার মুখে ছুঁড়ে মারবে ওটা।
প্রত্যেকেই ভাবছে, সে ছাড়া বাকি তিনজন পাগল। আবোল-তাবোল কথা বলছে। দেশী ভাষায় অনর্গল বকবক করে যাচ্ছে কুমালো। কিশোর বলল, আর পানিতে থাকছি না আমি। এবার সৈকতে উঠব।
হেসে উঠল মুসা। ডুব দিয়ে কিশোরের পা টেনে ধরে তাকে ডুবিয়ে রাখল কিছুক্ষণ। ভেসে উঠে হা হা করে হেসে বলল, কেমন উঠলে সৈকতে? দিলাম তো ঠেকিয়ে।
মেঘ দেখতে পেল কিশোর। অথচ মেঘের চিহ্নও নেই কোথাও। তারপর দেখল নারকেল গাছের মাথা। সবুজ গাছপালায় ছাওয়া দ্বীপ। পাহাড়ের ওপর থেকে বনের মাথায় ঝরে পড়ছে জলপ্রপাত।
খেয়ালই করল না ওরা, কখন বাতাসের বেগ বাড়ল, কালো মেঘ জমল, ফুCে উঠল সাগর। বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি শুরু হল। ওপরের দিকে হা করে পানি খাওয়ার কথাও মনে এল না কারও। তবু করল, শরীরের স্বাভাবিক তাগিদেই বোধহয়। অনেক দিন পর পাকস্থলীতে ঢুকল মিষ্টি পানি।
কুঁসে উঠল সাগর। ছোট্ট ভেলাটাকে ঠেলে নিয়ে চলল দক্ষিণ-পশ্চিমে। নিজেদের অজান্তেই অনেকটা, কাণ্ডগুলো আঁকড়ে ধরে রইল ওরা।
ঝড়ের অন্ধকার মিশে গেল রাতের অন্ধকারের সঙ্গে। ঘোরের মধ্যে থেকে যেন কিশোরের কানে আসছে বাতাসের গর্জন, অনুভব করছে ঢেউয়ের দোলা।
তারপর শুনতে পেল আরেকটা গর্জন। বাতাসের নয়। তীরে ঢেউ আছড়ে পড়ার।
বিচিত্র কাণ্ড শুরু করেছে ভেলাটা। কিসের টানে যেন দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসছে আবার, আবার এগোচ্ছে…
কয়েকবার এরকম করে হঠাৎ টান লেগে ছিঁড়ে গেল বাঁধন। আলাদা হয়ে গেল দুটো কাণ্ড। আর আঁকড়ে ধরে রাখতে পারল না কিশোর। ডুবতে শুরু করল। পায়ের তলায় ঠেকল মাটি!
ধাক্কা দিয়ে আবার তাকে ভাসিয়ে ফেলল ঢেউ। আবার ভোবাল। আবার ভাসাল। অবশেষে দেখল, কোমর পানিতে দাঁড়িয়ে আছে সে।
হ্যাঁচকা টানে তাকে চিত করে ফেলল আবার পানি। টেনে নিয়ে গিয়ে ছুঁড়ে ফেলল বালিতে।
হাঁচড়ে-পাঁচড়ে আরও কিছুদূর উঠে গেল কিশোর। ঢেউ পৌঁছতে পারছে না এখানে। চিত হয়ে শুয়ে পড়ল বালিতে।
তারপর শুধুই অন্ধকার।