সেই বাড়িটাতেই উঠল অভিযাত্রীরা, পোনাপেতে, এসে প্রথম যেটায় উঠেছিল। ক্যাপ্টেন ইজরা কলিগ জানাল, মেরামত হয়ে গেছে শুকতারা।
একেবারে আগের মত, বলল সে।
মাছটাছগুলো কেমন আছে? জানতে চাইল কিশোর।
ভাল। তবে অক্টোপাসটা বেশ জ্বালায়। একদিন তো বেরিয়ে পড়েছিল ট্যাঙ্ক থেকে। মাকড়সার মত হেঁটে হেঁটে উঠে চলে এসেছিল ডেকে, আরেকটু হলেই সাগরে নেমে যেত। লোকজন ডেকে অনেক কষ্টে তারপর ধরেছি।
বাড়িতে একটা লম্বা রেডিওগ্রাম পাঠাল কিশোর। আর অনেক টাকার বীমা করে ছোট একটা প্যাকেট পার্সেল করে পাঠাল প্রফেসর এনথনি ইস্টউডের নামে।
মুক্তাগুলো হাত বদল করে অবশেষে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
জামবুর ব্যাপারে খোঁজখবর নিল তিন গোয়েন্দা। জেলেই রয়েছে এখনও। কিশোরের মনে হল, যথেষ্ট সাজা হয়েছে বেচারার। ম্যাকগয়ারকে অনুরোধ করল, তাকে মুক্তি দিতে।
মুক্তি পেল জামবু। একেবারেই অকৃতজ্ঞ লোকটা। কিশোরকে একটি বারও ধন্যবাদ জানাল না। দ্বীপেও থাকল না আর। আমেরিকাগামী যে জাহাজটা প্রথম ধরতে পারল, তাতেই মালা হিসেবে নাম লিখিয়ে পাড়ি জমাল দেশের উদ্দেশে।
ডেংগুর ফেরার অপেক্ষায় উদ্বিগ্ন হয়ে অপেক্ষা করতে লাগল তিন গোয়েন্দা। রিডিঙে ভূল রয়েছে, পার্ল ল্যাগুন খুঁজে বের করতে পারবে না সে। কিন্তু সত্যিই কি পারবে না? খুঁজতে খুঁজতে যদি পেয়ে যায়! কে জানে, হয়ত এখন ল্যাণ্ডনে মুক্তো ভোলায় ব্যস্ত তার লোকেরা। একবার ওখানে গিয়ে পৌঁছতে পারলে একটা, ঝিনুকও রাখবে না ডেংগু, সব তুলে ফেলবে, তাতে কোন সন্দেহ নেই কিশোরের। তারপর ওগুলো থেকে মুক্তা বের করে নিয়ে চলে যাবে। পোনাপেতে আর কোনদিনই ফিরবে না।
কারণ, দ্বীপে ছেলেদেরকে না পেয়ে তাদের লাশ না দেখে, সন্দেহ হবেই ডেংগুর। ভাববে, যে ভাবেই হোক পোনাপেতে ফিরে এসেছে ওরা। স্বভাবতই
এদিকে ঘেঁষতে চাইবে না সে সমস্ত মুক্তা নিয়ে একেবারে নিখোঁজ হয়ে যাবে।
প্রফেসরকে তখন কি জবাব দেবে কিশোর? স্বীকার করতেই হবে দোষটা তার। ডেংগুর ফাঁকিবাজি ধরতে পারেনি। তাকে বোটে তুলে সঙ্গে করে নিয়ে গেছে। নিয়ে গিয়ে একেবারে দেখিয়ে দিয়েছে আসল জায়গা।
আমি একটা গর্দভ! আস্ত গাধা! কথাটা মনে পড়লেই নিজেকে গাল দেয়। কিশোর। এই যেমন এখন দিচ্ছে। অস্থির হয়ে গড়াগড়ি শুরু করল মাদুরে। ঘুম পালিয়েছে। আর এভাবে বসে থাকা যায় না। কিছু একটা করা দরকার। অন্তত গিয়ে দেখা দরকার, অ্যাটলে সত্যি সত্যি যেতে পেরেছে কিনা ডেংগু।
পরদিন ভোরে ঘুম ভাঙতেই বন্দরে রওনা হল কিশোর, ক্যাপ্টেন কলিগকে। বলার জন্যে, ওরা আবার পার্ল ল্যাগুনে যাবে। পুব দিগন্তে তখন সবে উঁকি দিয়েছে সূর্য। বন্দরে এসে দেখল সে, একটা বোট এসে নোঙর করেছে ডকের
শখানেক গজ দূরে। নৌকা নামিয়ে তাতে নামল কয়েকজন পলিনেশিয়ান আর একজন শ্বেতাঙ্গ।
ধক করে উঠল কিশোরের বুক। দৃষ্টি তীক্ষ্ণ করল। কে লোকটা? ডেংগু? সত্যি দেখছে, না কল্পনা।
নৌকাটা আরও কাছে এলে ভালমত দেখা গেল নোকটাকে। ডেংগুই।
দুরুদুরু করছে কিশোরের বুক। ডেংগু নিশ্চয় অ্যাটলটা খুঁজে পায়নি। তাহলে ফিরত না। কিশোরকে দেখলে কি কররে এখন? রাগের মাথায় গুলি করে বসবে?
পালাবে নাকি? গিয়ে ম্যাকগয়ারকে খবর দেবে?
কিন্তু কোনটাই করল না কিশোর। দাঁড়িয়ে রইল স্থাণুর মত।
তীরে পৌঁছে গেল নৌকা। ডকে উঠল ডেংগু। মাতালের মত টলছে। চোখে বন্য দৃষ্টি। খোঁচা খোঁচা দাড়ি। উসকো খুসকো চুল এসে পড়েছে কানের ওপর। পিঠের কুঁজটা আরও প্রকট। ঝুলে পড়ছে কাঁধ, ফলে হাত দুটো অস্বাভাবিক লম্বা লাগছে।
তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল কিশোর, চমকে দেয়ার জন্যে।
ডেংগু দাঁড়াল।
এই যে, ডেংগু, কিশোর বলল। চিনতে পারছ আমাকে?
এক মুহূর্ত চেয়ে রইল ডেংগু। তারপর ঘুরে হাঁটতে শুরু করল। যেন চিনতেই পারেনি।
পলিনেশিয়ান একটা লোকের হাতে সেক্সট্যান্ট, বোধহয় সে-ই নেভিগেটর। বলল, পুরোপুরি মাথা খারাপ হয়ে গেছে।
কি হয়েছিল? জিজ্ঞেস করল কিশোর।
লগবুকের রীডিং দেখে একটা দ্বীপ খুঁজেছে। তার ধারণা, ওই দ্বীপে অনেক মুক্তা আছে। রীডিং মত ওখানে গিয়ে দেখা গেল, কোন দ্বীপ নেই, শুধু পানি। আশেপাশে কয়েক মাইলের মধ্যে কোন দ্বীপ পাওয়া গেল না। মাথায় আগেই গোলমাল হয়ে ছিল, এই ঘটনার পর একেবারে পাগল হয়ে গেল। কি আর করা। বাধ্য হয়ে ফিরে এসেছি।
ডকের শেষপ্রান্তে হৈ-হট্টগোল শোনা গেল। কি হয়েছে দেখার জন্যে ফিরে। তাকাল কিশোর। দুজন মিলিটারি পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি শুরু করেছে ডেংগু। হাত ছাড়াতে পারল না। টেনেহিঁচড়ে তাকে নিয়ে গেল ওরা।
লোকটার জন্যে এখন দুঃখই হল কিশোরের।
জেলে নয়, শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হল ডেংগুকে। এখানে রোগ না সারলে পাঠিয়ে দেয়া হবে স্যান ফ্রানসিসকোর কোন মেনটাল ইন্সটিটিউশনে।
রেডিওতে সেদিনই একটা মেসেজ এল কিশোরের নামে। ম্যাকগয়ারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল ক্যাপ্টেন কলিগ, মেসেজটা নিয়ে এসেছে।
কেবিনে রবিন, মুসা, কুমালো সবাই আছে।
খামটা ছিঁড়ল কিশোর। জোরে জোরে পড়ল :
ভাল কাজ দেখিয়েছ তোমরা। জানোয়ারগুলো পেয়েছি, চমৎকার। খুব খুশি হয়েছে লিসটার। বাকি যা আছে কারগো স্টীমারে তুলে দাও। পার্সেল পেয়েছেন ইস্টউড, তোমাদের অনেক প্রশংসা করেছেন। আর দেরি কর না। যত তাড়াতাড়ি পার, বাড়ি ফিরে এস।
তোমার চাচা, রাশেদ পাশা।