২. আমিই কিশোর

0 Comments

আমি ওদের চাইতে সিঁড়ির কাছাকাছি, তাই এক দৌড়ে দুটো করে ধাপ ভেঙে উঠে গেলাম। একটু পরেই মেইন ফ্লোরে ফিরে এলাম।

মুহূর্তের মধ্যে সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেলাম।

ফিরে এসো! আমরা তোমাকে কিছু করব না, আমরা তোমাকে সাহায্য করতে চাই! মি. লাউয়ি আমার উদ্দেশে চেঁচালেন। স্কুল এন্ট্রান্সের সবচাইতে উঁচু ধাপে দাঁড়িয়ে তিনি, চেয়ে রয়েছেন আমার দিকে।

আমি এখন রাস্তার দিকে হাঁটা দিয়েছি। স্কুলের খেলার মাঠ পেরিয়ে গেছি, কাজেই ওরা কার্যত আমাকে আর ধরতে পারে না।

আপনাদের কাছ থেকে আমি আর সাহায্য চাই না! পাল্টা চেঁচালাম। সাহায্য করতে চাইলে আপনারা এই তামাশাটা বন্ধ করতেন! ব্যাপারটা হয়তো আপনাদের কাছে মজার কিন্তু আমার কাছে!

কীসের তামাশা? বললেন মি. লাউয়ি। সত্যি বলছি তুমি কী বলছ আমি বুঝতে পারছি না।

ওঁর মুখের চেহারা আর কণ্ঠস্বর অত্যন্ত আন্তরিক। উনি কি অন্যদের মত অভিনয় করছেন? আমাকে যেটা খোচাচ্ছে…যদি ওটা অভিনয় না হয়? সত্যিই যদি ওঁরা আমাকে না চেনেন! কিন্তু সেটা তো অসম্ভব…তাই না?

ঘুরে দাঁড়িয়ে দৌড় দিলাম মেইন স্ট্রীটের দিকে। একটু পরে শ্বাস ফিরে পেতে থামলাম। দস্তুরমত হাঁফাচ্ছি।

কাঁধ ডললাম। ভীষণ ব্যথা করছে এমুহুর্তে। মিস লি-র কথা ভাবলাম। ওঁর মধ্যে কী যেন আছে যেটা খুব পরিচিত লেগেছে। তার কথা যত বেশি ভাবছি কাঁধের ব্যথাটাও বাড়ছে। ওঁকে আগে অন্য কোথাও দেখেছি…কিন্তু কোথায়?…কোথায়?

হা-হা-হা-হা! আমার কানে কার যেন জোরাল খলখল হাসি বাজল। এতটাই চমকেছি, পড়েই যাচ্ছিলাম প্রায়। ঘুরে দাঁড়ালাম।

সরাসরি চোখাচোখি হলো ম্যাকের সঙ্গে।

ম্যাক ভবঘুরে ধরনের লোক। কারও ক্ষতি করে না, কিন্তু ওকে দেখলে আমার ভয়-ভয় করে।

কী, ছেলে, স্কুল পালিয়েছ, না? সামনে ঝুঁকে পড়ে বলল ও। চোখজোড়া লাল। কতদিন গোসল করে না কে জানে। পরনের কাপড়চোপড় ময়লা।

ন-না, তুতলে বললাম। আমি…আহ….

আমার কণ্ঠ মিলিয়ে গেল। মিথ্যে ভাল বলতে পারি না আমি। আর সত্যি কথাটা হচ্ছে, আমি তো আসলেই স্কুল পালাচ্ছি।

কোন চিন্তা নেই, আমি কাউকে বলব না, ম্যাক অস্পষ্ট কণ্ঠে বলল। একটা বাদামি ব্যাগ বাড়িয়ে দিল। ভিতরে খাবার-টাবার কিছু আছে। টেস্ট করবে?

না! বলে এক পা পিছু হটলাম। ঘুরে দাঁড়ালাম। এর কাছ থেকে পালাতে চাই।

এই দুনিয়ায় সবচাইতে কঠিন ব্যাপার কি জাননা? প্রশ্ন করল ম্যাক। হঠাৎই পরিষ্কার হয়ে গেল ওর কণ্ঠস্বর। আমি ঘুরে দাঁড়িয়ে ওর দিকে চাইলাম। ওর চোখজোড়া যেন দীপ্তি ছড়াচ্ছে, দেহ কাঁপছে।

না, কী? প্রশ্ন করলাম।

আমরা আসলে কে সেটা জানা। হ্যাঁ, এটাই। তুমি কি জাননা তুমি আসলে কে? বলে জানো? পাগলের মত হাসতে লাগল আবার ও।

এবং আচমকাই দেখতে পেলাম আমি আর ম্যাকের দিকে চেয়ে নেই। ও মিস লি হয়ে গেছে! তিনি ম্যাকের হেঁড়াখোড়া পোশাক পরে আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসছেন!

কাঁধের ব্যথাটার কী অবস্থা, কিশোর? নরম কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন। স্মিত হাসলেন আমার দিকে চেয়ে। আশা করি শীঘ্রি তোমার ব্যথা কমে যাবে।

মৃদু শব্দে হাসতে লাগলেন তিনি। এবার আমি আবার ম্যাকের মুখের দিকে চেয়ে! হাসছে, কাশছে-ওর মুখের চেহারা টকটকে লাল। হাসতে হাসতে আমার দিকে তর্জনী নির্দেশ করছে।

ঘুরে দাঁড়িয়ে দৌড় দিলাম। কোথায় যাচ্ছি নিজেও জানি না। মেইন স্ট্রীটের সামনে গাছ-পালায় ঘেরা এক টুকরো জমি আর তারপর খোলা মাঠ। সেখানে দৌড়ে চলে গেলাম। কেউ দেখতে পাচ্ছে না নিশ্চিত না হওয়া অবধি ছুটে চললাম।

খোলা মাঠের কাছে এক জায়গায় এসে পৌঁছলাম। প্রকাণ্ড এক গাছের গায়ে হেলান দিয়ে বসে পড়ে চোখ বুজলাম। কতক্ষণ ওখানে ছিলাম জানি না, আচমকা চটকা ভেঙে গেল।

ঘড়ি দেখলাম। ১১:৩৫! নিশ্চয়ই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। চোখ ঘষলাম। আউ! কাঁধের কথা ভুলে গিয়েছিলাম। ব্যথার জায়গাটায় হাত বুলিয়ে চারধারে নজর বুলালাম।

দৃষ্টিসীমার মধ্যে কেউ নেই। শুধু বিশাল, ফাঁকা মাঠটা-বাঁ দিকে গাছ-পালার দঙ্গল আর তার পিছনে মেইন স্ট্রীট।

পেটের ভিতরে গুড়-গুড় করে উঠল। সকালে নাস্তা খাইনি এবং এখন প্রায় লাঞ্চের সময়। এতসব অদ্ভুত ঘটনার মধ্য দিয়ে গেলেও খিদে ঠিকই পেয়েছে আমার। কিছু খাওয়া দরকার।

উঠে দাঁড়ালাম। পেটে কিছু গেলে হয়তোবা এই রহস্যের সমাধান খুঁজে পাব। হয়তো সব কিছুই এখন ঠিকঠাক হয়ে গেছে। আমি স্কুলে ফিরে গেলে হয়তো সবাই আমাকে চিনতে পারবে। আর কোন সমস্যা হয়তো থাকবে না!

আমার জন্য নিশ্চয়ই সবার খারাপ লাগবে। ফলে কেউ আর তামাশা করবে না। আমি নিশ্চিত চাচা-চাচী আর ডন আমার জন্য উদ্বেগ বোধ করছে।

এসব ভেবে মনটা একটু ভাল হলো। প্যান্টের ধুলো ঝেড়ে স্কুলের দিকে রওনা হলাম।

কিশোর পাশা! পিছন থেকে কে যেন ডাকল।

আগে কখনও নিজের নামটা এত মধুর শোনায়নি আমার কানে! দুঃস্বপ্নটা তারমানে কেটে গেছে। সব কিছু আবার স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। ঘুরে দাঁড়ালাম কে ডেকেছে দেখার জন্য।

আমার পুলিস ডিপার্টমেন্টের বন্ধু, সার্জেন্ট কলিন্স। স্কুটারে চেপে আমার পিছনে এসে থেমেছে।

হাই, সার্জেন্ট কল–শুরু করতে গেছিলাম, কিন্তু উনি ত্বরিত আমাকে থামিয়ে দিলেন।

গাছে হাত দিয়ে দাঁড়াও। একদম নড়বে না! গর্জে উঠলেন তিনি। এবং হঠাত্র আমি আমার অসহায় বিভ্রান্তির মধ্যে ফিরে এলাম।

সার্জেন্ট কলিন্স যখন নিশ্চিত হলেন আমার কাছে বিপজ্জনক কোন অস্ত্র নেই, তখন আমাকে ঘুরিয়ে তার মুখোমুখি দাঁড় করালেন।

সার্জেন্ট কলিন্স, এমন করছেন কেন? প্রশ্ন করলাম।

আমার দিকে চাইলেন তিনি।

তুমি আমার নাম জানলে কীভাবে?

একদৃষ্টে তাঁর দিকে চেয়ে রইলাম। ওঁর নাম জানলাম কীভাবে!

গত টার্মে আমরা একসাথে স্টুডেন্ট সেফটি ক্যামপেইনে কাজ করেছি। সার্জেন্ট, আমি কিশোর পাশা। একটু আগেই আপনি আমাকে নাম ধরে ডেকেছেন!

নাম ধরে ডেকেছি কারণ তোমার সাথে এক ছেলের বর্ণনা মিলে যাচ্ছে। আজ সকালে রকি বীচ স্কুলে গিয়ে অদ্ভুত আচরণ করে এসেছে সে।

বর্ণনা মিলে যাচ্ছে? মিলবেই, কারণ ওটাই আমি। আর আমি মোটই অদ্ভুত আচরণ করিনি, করেছে অন্যরা!

তাই বুঝি? বললেন কলিন্স। তুমি বলছ আমরা স্কুল সেফটি প্রোগ্রামে একসাথে কাজ করেছি? সত্যি কথাটা হচ্ছে আমি এই একটু আগে প্রথম তোমাকে দেখলাম। এর আগে জীবনেও দেখিনি।

হাঁটুজোড়া কাঁপতে লাগল আমার। বিশ্বাস হচ্ছে না এমনকী পুলিসও এর সঙ্গে জড়িত!

সার্জেন্ট কলিন্স, আস্তে আস্তে বললাম। প্রোগ্রামে ছিল বাইক চালানোর সময় ছাত্র-ছাত্রীরা যাতে কিছু সেফটি রুল মেনে চলে। রাস্তা পার হওয়ার সময়, কিংবা অচেনা লোকের সাথে কথা বলার সময়। এবার মনে পড়েছে?

হ্যাঁ, প্রোগ্রামটা এমনই ছিল। কিন্তু প্রোগ্রামে আমাকে সাহায্য করেছিল মুসা আমান আর জোয়ান জেনসেন।

মুসা আমান কখনোই এটার সাথে ছিল না! প্রায় আর্তচিঙ্কার ছাড়লাম। জোয়ান আর আমি আপনার সাথে কাজ করেছি।

কলিন্স চোখ সরু করে আমার দিকে চেয়ে রইলেন।

তোমার কোন আইডেন্টিফিকেশন আছে?

নেই। আমি স্কুলে কখনও ওয়ালেট নিয়ে যাই না, নিই শুধু বইয়ের ব্যাগ আর লাঞ্চের টাকা। আর আজকে তো এমনকী বইয়ের ব্যাগও নেই!

সঙ্গে নেই, তবে বাসায় আছে।

হ্যাঁ, মিসেস পোর্টার বলেছেন তোমার বাসার ঠিকানা। ওখানে পাশা পরিবার থাকে, কিন্তু কিশোর নামে কাউকে তারা চেনে না।

রাশেদ পাশা আমার চাচা, আর মেরি পাশা চাচী।

দেখো, ছেলে, তুমি কোন আইন ভাঙনি। তাই আমি তোমাকে ধরছি না, কলিন্স বাধা দিয়ে বললেন, ধৈর্য হারাচ্ছেন পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু আমি তোমাকে সাবধান করছি। তোমার কোন আইডি নেই, অস্তিত্ব নেই এমন একজন বলে নিজেকে দাবি করছ, এবং তোমার ব্যাপারে রিপোর্ট এসেছে তুমি পাবলিক নুইসেন্স, বললেন তিনি। কাজেই পরিষ্কার করে একটা কথা বলে দিই। তোমাকে যদি চব্বিশ ঘণ্টা পর রকি বীচে দেখি, তা হলে তোমার প্রমাণ করতে হবে তুমি কে। বোঝা গেছে?

জি; সার, গোমড়া মুখে বললাম। এরচেয়ে অসহায় আর কখনও লাগেনি।

ভাল, বললেন তিনি। কথাটা মনে থাকে যেন। আমার কিন্তু মনে থাকবে।

ঘুরে দাঁড়িয়ে থপথপ করে স্কুটারের কাছে ফিরে গেলেন। কমুহূর্তের মধ্যেই মেইন স্ট্রীটের দিকে রওনা হলেন।

কলিন্সের অপসৃয়মাণ দেহের দিকে চেয়ে রইলাম। এখন কী করব আমি? এটা কি সম্ভব…যে কোনভাবে…আজ সকালে জেগে ওঠার পর থেকে…মিস লি যা বলেছিলেন আমাকে? আমি এক নতুন মানুষ?

এমন কিছু কি ঘটতে পারে?! অসম্ভব। আমি রকি বীচের কিশোর পাশা। সার্জেন্ট কলিন্স কিংবা অন্য কেউ যদি আমার আইডেন্টিফিকেশন দেখতে চায়, আমি জানি কোথায় পাওয়া যাবে। রকি বীচ জেনারেল হাসপাতালে, আমার যেখানে জন্ম, এবং যেখানে আমার বার্থ রেকর্ড রয়েছে।

শশব্যস্তে গাছ-পালা ভেদ করে ফিরে চললাম। শীঘ্রি বেরিয়ে এলাম মেইন স্ট্রীটে। হাসপাতালটা তিন ব্লক পরে।

ঘড়ি দেখলাম। প্রায় দুপুর। আমি একটার মধ্যে আমার পরিচয়ের প্রমাণ দিতে পারব, এই ফালতু তামাশাটার ইতি টেনে, শেষ কটা ক্লাস করে, সাড়ে তিনটায় ফুটবল প্র্যাকটিসে ঠিকই যোগ দিতে পারব।

মেইন স্ট্রীট ধরে সাবধানে হাঁটছি। কারও সন্দেহ জাগাতে চাই। কিছু ক্রেতা বেরিয়েছে। বেশিরভাগই মহিলা এবং বাকিরা রকি বীচের বয়স্ক বাসিন্দা।

বয়স্ক বাসিন্দা! মি. জেসাপের কথা মনে পড়ল। কোনার দিকে তার দোকান। ওখান থেকে আমি প্রায় প্রতিদিন ক্যাণ্ডি কিনি।

উনি আমাদের নাম জানেন না, কিন্তু কে কোন্ ক্যাণ্ডি খাই তা জানেন। তাকে বলে দিতে হয় না। ভিতরে ঢুকলেই কাউন্টারে পছন্দের ক্যাণ্ডি রেখে দেন। উনি জানেন আমার পছন্দ চকোলেটে মোড়া রেইসিন। সপ্তাহে অন্তত পাঁচদিন তাঁর কাছ থেকে এগুলো কিনি।

জেসাপের ক্যাণ্ডি স্টোরের দিকে এগোলাম। এটা হাসপাতালের এক ব্লক আগে। চকিতে ভিতরে উঁকি দিলাম। দিনের এসময়টায় দোকান প্রায় ফাঁকা।

ভিতরে ঢুকলাম। মি. জেসাপ কাউন্টারের পিছনে বসা। চোখে চশমা। কোলের উপর সকালের খবরের কাগজ।

মুখ তুলে আমার দিকে চেয়ে হাসলেন।

হ্যালো, ইয়াং ফেলো, বললেন। এর মধ্যে অস্বাভাবিক কিছু নেই। উনি সব সময়ই এটা বলেন।

আমরা পরস্পরের দিকে চেয়ে রইলাম। পেটের ভিতরে কেমন জানি গুলিয়ে উঠল। উনি আমাকে চেনেন না! আমার ইচ্ছে হলো এক দোকান প্রায় ফাঁকা কিতে ভিতরে এগোলাম। এটা দৌড়ে দোকান থেকে বেরিয়ে, মেইন স্ট্রীট ধরে ছুটতে ছুটতে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করি: বন্ধ করুন.এসব। আপনারা আমাকে এভাবে। কষ্ট দিচ্ছেন কেন?

যেটা সব সময় নাও সেটাই নেবে তো? চওড়া, বন্ধুত্বপূর্ণ হেসে প্রশ্ন করলেন।

মনটা খুশি হয়ে উঠল। উনি আমাকে চেনেন! ওরা মি. জেসাপকে নিজেদের ষড়যন্ত্রে জড়াতে পারেনি। দ্রলোক সাধারণ এক ক্যারি দোকানদার, কিন্তু আমাকে তিনি সাহায্য করতে পারবেন। আমাকে উনি চেনেন!

হ্যাঁ, মিস্টার জেসাপ, যেটা সব সময় নিই, বলে পকেটে হাত ভরে দিলাম পঞ্চাশ সেন্টের জন্য।

দিচ্ছি, বললেন তিনি। তার আগে বলো সবসময় কোটা নাও।

জমে গেলাম আমি। উনি আমাকে চেনেন না! ঘুরেই দৌড় দিলাম।

হাসপাতালে পৌঁছনোর আগ পর্যন্ত ছুটে চললাম আমি। এখানে কয়েকটা এন্ট্রান্স। একটায় লেখা: ইমার্জেন্সি। অনুভব করলাম এটাও একটা ইমার্জেন্সি, কিন্তু জানি এখন মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে।

মেইন এন্ট্রান্স দিয়ে ভিতরে ঢুকলাম। ওয়েটিং এরিয়ায় বেশ কিছু মানুষ-জন বসা। জনাকয় ডাক্তার আর নার্স চলাফেরা করছে। ইনফর্মেশন ডেস্ক দেখে এগিয়ে গেলাম।

এক ইউনিফর্ম পরা নার্স বইতে কী সব টুকছে।

মাফ করবেন, বললাম। রেকর্ড ডিপার্টমেন্টটা কোথায় বলতে পারেন?

পাঁচতলায়, ডান দিকে এলিভেটর, আমার দিকে মুখ তুলে চেয়ে বলল।

এলিভেটরের জন্য অপেক্ষা করছি, নানা চিন্তা ঘুরতে লাগল মাথার মধ্যে।

এলিভেটরের দরজা খুলে গেল। মুখোমুখি পড়ে গেলাম সার্জেন্ট কলিন্সের। এক লোককে সাহায্য করছেন তিনি। লোকটির বাহুতে কাস্ট করা।

আপনাকে ধন্যবাদ, সার্জেন্ট, লোকটি বলল। আপনি না থাকলে কে আমাকে হাসপাতালে আনত আর ওই ছিনতাইকারীগুলোকে শায়েস্তা করত!

এটাই তো আমাদের কাজ, মিস্টার লেন, আইনকে উপরে তুলে ধরা, কলিন্স জবাবে বললেন। লোকটিকে কথাগুলো বললেও পুরোটা সময় তার দৃষ্টি স্থির রইল আমার উপরে।

মাফ করবেন, বলে, তার পাশ ঘেঁষে এলিভেটরে উঠলাম।

শরীর খারাপ? কলিন্স আমাকে প্রশ্ন করলেন। এলিভেটর থেকে ঝটপট বেরিয়ে গেলেন।

না, ঠাণ্ডা স্বরে জবাব দিলাম। এক অসুস্থ বন্ধুকে দেখতে এসেছি।

কলিন্স একদৃষ্টে চেয়ে রইলেন আমার দিকে।

চব্বিশ ঘণ্টা, বললেন তিনি। এলিভেটরের দরজা লেগে গেল। এলিভেটর পাচতলায় উঠে এলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। রকি বীচ পুলিস ডিপার্টমেন্টকে আমি বন্ধু মনে করতাম। নিজেকে অপরাধী ভাবতে ভাল লাগছে না!

দরজা খুলে গেল। বেরিয়ে এলাম আমি। চারধারে নজর বুলালাম। বড্ড চুপচাপ এখানে। লম্বা হলগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন আর উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত। দেয়ালে এক ডিরেক্টরি দেখলাম।

ওতে নির্দেশ করছে হাসপাতাল রেকর্ড, রুম ৪৩৬। কামরাটা খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত হেঁটে চললাম। বন্ধ এক দরজা দেখলাম। নক করতেই ভিতর থেকে শোনা গেল, কাম ইন।

প্রবেশ করলাম। কাউন্টার ডেস্কের পিছনে সাদা কোট পরা এক লোক বসা।

বিরক্তির ছাপ তার চোখে-মুখে। এক স্পোর্টস ম্যাগাজিনের পাতা উল্টাচ্ছে।

হ্যাঁ, তোমার জন্যে কী করতে পারি? প্রশ্ন করল।

আমি কিছু রেকর্ড খুঁজছি, বললাম।

কী ধরনের রেকর্ড?

উম, বার্থ রেকর্ড।

কার? প্রশ্ন করল। এই প্রথম তাকে আগ্রহী মনে হলো। আমার অস্বস্তি লাগছে, কেননা লোকটা গভীর মনোযোগে আমাকে দেখছে।

আমার নিজের, বললাম। আমি আমার বার্থ রেকর্ড জানতে চাই। এই হাসপাতালে আমার জন্ম।

আমার নাম এবং জন্মতারিখ বললাম।

ঠিক আছে, কোন সমস্যা নেই, বলল লোকটা।

স্বস্তির শ্বাস ফেললাম। ভয় হচ্ছিল কোন সমস্যা হবে।

দেখানো যাবে,যোগ করল লোকটা। একুশ বছরের বেশি বয়সী কাউকে নিয়ে এসো আমরা তোমার ফাইল দেখিয়ে দেব। পত্রিকার পাতায় আবারও ডুব দিল সে।

কী? বলে উঠলাম, কেন?

কারণ এটা স্টেট ল, জানাল লোকটা। একুশ বছরের কম বয়সী কেউ অফিশিয়াল বার্থ রেকর্ড দেখতে কিংবা কপি করতে পারে না। কথা শেষ।

লোকটার দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলাম। লোকটা অহঙ্কারী এবং রূঢ়, এ দুটো স্বভাবই অপছন্দ করি আমি। কিন্তু তারচাইতেও বড় কথা ও আমাকে তথ্য পাওয়া থেকে বঞ্চিত করছে।

ওর নেম ট্যাগ দেখলাম।

বিন, জে, পড়লাম।

আপনার সাহায্যের জন্যে ধন্যবাদ, বললাম। বিন ঘোত করে উঠল। আমার দিকে তাকাল না পর্যন্ত।

আমি ঘুরে দাঁড়িয়ে ঘর ছাড়লাম। এলিভেটরে চড়ে নেমে এলাম রিসেপশন ডেস্কে। অন্য এক নার্স এখন ডিউটিতে। আত্মবিশ্বাসী অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করলাম মুখের চেহারায়। ভিতরে ভিতরে পাতার মতন কাপছি।

মাফ করবেন, বললাম।

ইয়েস, মহিলা বলে আমার দিকে চাইল।

আপনাদের রেকর্ড সেকশনে মিস্টার বিন নামে একজন আছে, তাই না?

এক মিনিট, বলে কম্পিউটার অন করল মহিলা, কটা বাটন টিপে পর্দায় চোখ রাখল। হ্যাঁ, জেমস বিন। রেকর্ডস, পাঁচ তলা। কেন?

এক ডাক্তার আপনাকে বলতে বললেন তাকে এখুনি এক্স-রে রূমে দরকার।

আমার দিকে চেয়ে রইল নার্স।

রেকর্ডের লোককে এক্স-রেতে দরকার? এমন কথা কখনও শুনিনি। কেন দরকার?

জানি না। হয়তো এক্স-রের রেকর্ড নেয়ার জন্যে কাউকে তাদের দরকার, বললাম, নিজেও জানি না কী বলছি।

মহিলা মুহূর্তের জন্য ভ্রূ কুঁচকে শ্রাগ করল। রিসিভার তুলে ডায়াল করল কোন নম্বরে।

হ্যালো, মিস্টার বিন? ফ্রন্ট ডেস্ক থেকে বলছি। আপনাকে এক্সরেতে ডেকেছে। জানি না কেন। মনে হয় গেলেই জানতে পারবেন।

রিসিভার রেখে দিল সে। চারপাশে চোখ বুলিয়ে আমাকে খুঁজল। কিন্তু আমাকে পাবে কোথায়। আমি তখন এলিভেটরে চড়ে পাঁচতলার দিকে উঠে যাচ্ছি।

রেকর্ড রুমের দরজায় তালা মারা নেই, কাজেই ভিতরে ঢুকতে কষ্ট হলো না।

আমার জানা নেই কতক্ষণ সময় পাব। ডিরেক্টরীতে দেখেছি সাততলায় এক্স-রে। বিন এলিভেটরে করে ওখানে যাবে, কাউকে জিজ্ঞেস করবে কে ডেকেছে, জানবে কেউ ডাকেনি, এবং তারপর এলিভেটরে করে নেমে আসবে।

বড়জোর তিন কি চার মিনিট সময় পাব, উপলব্ধি করলাম।

বিনকে রেকর্ডস রুম ত্যাগ করতে দেখে এক দরজার আড়াল নিলাম।

এলিভেটরের জন্য অপেক্ষা করল বিন। সে ভিতরে ঢুকতেই, আমি রেকর্ডস রুমে সেঁধিয়ে পড়লাম। বিনের ডেস্কের পাশ দিয়ে গেলাম। ফাইল ক্যাবিনেটগুলো বছরওয়ারি সাজানো। আমার জন্মসাল খুঁজে নিতে কয়েক সেকেণ্ড মাত্র লাগল। ফাইল হ্যাণ্ডল ধরে টানলাম। খুলল না!

ক্যাবিনেটে এক কি-হোল দেখতে পেলাম। চাবি দরকার! চারধারে নজর বুলিয়ে নিলাম, দস্তুরমত হাঁফাচ্ছি। চাবি, চাবি চাই। চাবি কোথায়? নিশ্চয়ই বিনের কাছে আছে!

ওর ডেস্কের কাছে ফিরে গেলাম। ডেস্কের ড্রয়ারে কয়েকটা কিচেইন। প্রথমটা খপ করে চেপে ধরলাম। প্রতিটা চাবিতে একটা করে বছর।

বুক ধড়ফড় করছে, চাবি হাতড়াতে লাগলাম। অল্প-অল্প কাঁপছে আঙুল। এক ফোঁটা ঘাম টপ করে পড়ল শার্টে। আমার জন্মসাল পাওয়া গেছে! ঘুরেই এক দৌড়ে ফিরে এলাম পিছনের কামরায়।

জ্ঞান হারানো চলবে না-অনুভব করলাম আমি দুবেলা খাইনি-সুটে ঢুকিয়ে দিলাম চাবিটা। ঘুরালাম। ফাইলটা খুলে গেল।

অক্ষর অনুযায়ী সাজানো হয়েছে রেকর্ডগুলো। ঝটপট ফাইলের মাঝখানে চলে গেলাম, খুঁজে পেলাম কে, কিশোর পাব যেখানে।

সামনে একটা শব্দ হলো! গলার কাছে উঠে এল যেন হৃৎপিণ্ড। বিন কি এত তাড়াতাড়ি ফিরে এসেছে? ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে চাইলাম। ডাক্তাররা হলওয়েতে কথা বলার জন্য থেমেছিলেন। এবার আবার হাঁটা ধরেছেন। চেপে রাখা খাসটা ছেড়ে, ফাইলে ফের মন দিলাম।

হুড়োহুড়ি করে কে অক্ষরটা দেখে নিলাম। প্রতিটা ফাইলে বাবামার নাম, এবং শিশুর নাম, ওজন, লিঙ্গ এবং জন্মের সময় দেয়া রয়েছে।

আমার ফাইলটা এখুনি দেখতে পাব। আপন মনে কথা বলতে লাগলাম।

কেনি… কেভিন…কেনেথ…

আমার নাম কোথায়? আবারও প্রথম থেকে দেখলাম। হাত কাঁপছে এখন। বিন যে কোন মুহূর্তে ফিরে আসবে। আমাকে আমার ফাইল খুঁজে পেতে হবে। এবং ওটা এখানেই থাকবে, হাসপাতাল বার্থ রেকর্ড হারিয়ে ফেলে না।

কে অক্ষরের আদ্যোপান্ত আবারও দেখে নিলাম। কোন কিশোরের নাম নেই। কিন্তু আমার তো এই হাসপাতালে জন্ম! রেকর্ড

এখানে থাকতেই হবে। নেই কেন?

তুমি যা খুঁজছ তা মনে হয় এক্স-রেতে পাবে,বলল একটি কণ্ঠ।

মুখ তুলে চাইলাম। দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে বিন। আমার দিকে হেঁটে আসছে।

দ্রুত চিন্তা করতে হবে। বিন কমবয়সী এবং চটপটে ধরনের। এবং নিঃসন্দেহে আমার চাইতে শক্তিশালী।

ফাইল চাবিগুলো তুলে ধরলাম।

বিন, এগুলো ধরুন! চেঁচিয়ে উঠলাম। চাবিগুলো হঠাৎই ছুঁড়ে দিলাম ভােলা এক জানালা লক্ষ্য করে।

না! চিৎকার ছাড়ল বিন। জোরে চুঁড়িনি, এমনভাবে ছুঁড়েছি বিন যাতে জানালা দিয়ে পড়ে যাওয়ার আগেই লুফে নিতে পারে।

বিন চাবিগুলো ধরার জন্য ঝাপ দিতেই, ডেস্কের উপর দিয়ে লাফিয়ে এক দৌড়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলাম আমি। আমি জানি মুহূর্তের মধ্যেই নীচে ফোন করে ওদেরকে সতর্ক করে দেবে সে, জানাবে আমি কী করেছি।

কারও চোখে ধরা না পড়ে হাসপাতাল ত্যাগ করতে হবে আমাকে। হলের ওপাশে একটা সাপ্লাই ক্লজিট দেখতে পেলাম। দরজা খুলতেই ভিতরে অ্যাটেনডেন্টের সাদা উর্দি চোখে পড়ল। ওটা হুক থেকে তুলে নিয়ে পরে ফেললাম।

এলিভেটরে চেপে নেমে এলাম মেইন ফ্লোরে, বেরিয়ে আসার পর মেইন ডেস্কের পাশে লোকজনের ছোটাছুটি লক্ষ করলাম। নার্স লরি কথা বলছে সার্জেন্ট কলিরে সঙ্গে।

ও টীনএজার, কালো চুল, কালো চোখ, পাঁচ ফুট আট ইঞ্চি মত লম্বা, আমি তাকে বলতে শুনলাম। আমার বর্ণনা দিচ্ছে কলিন্সের কাছে।

কলিন্সকে মাথা ঝাকাতে দেখলাম। তিনি ঘুরে দাঁড়িয়ে আমাকে চিহ্নিত করার আগেই এক্সিটের দিকে দ্রুতপায়ে এগোলাম আমি। একটা পত্রিকা তুলে নিয়ে খুলে মুখের কাছে ধরলাম, আমার মুখ যাতে লোকেরা দেখতে না পায়।

এবার সদর দরজা দিয়ে হেঁটে বেরিয়ে এলাম। মেইন স্ট্রীটে পৌঁছনোর পর উর্দি খুলে ফেললাম। ওটা আর পত্রিকাটা ছুঁড়ে ফেলে দিলাম ফ্রন্ট লনে। তারপর শশব্যস্ত রাস্তা ধরে এগিয়ে চললাম।

এখন কোথায় যাব? হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে এসেছি আমি, কিন্তু আমার সমস্যা আরও জটিল হয়েছে। হাসপাতালে আমার জন্ম রেকর্ড নেই কেন? চাচা-চাচী কি এত বছর ধরে আমাকে মিথ্যে বলে এসেছে? আমি কি অন্য কোথাও জন্মেছিলাম? যদি তাই হয়, তা হলে আমাকে বলেনি কেন?

মাথা গুলিয়ে গেল। পেটের ভিতরে আতঙ্ক বাসা বাঁধছে। আমার মনে হয় পুলিশে ধরা দেয়া উচিত।

কারণ আমি হয়তো সত্যিকারের কিশোর পাশা নই। আমি হয়তো অন্য কেউ। আমি হয়তো মি. লাউয়ির বর্ণনা করা সেই ছেলেটির মত, চেষ্টা করছি আমি নই এমন কারও ভূমিকা নিতে।

কিন্তু তা-ই যদি হবে, তবে আজ সকালে নিজের বাসায় আমার ঘুম ভাঙল কীভাবে? এবং কেউ আমাকে না চিনলেও আমি সবাইকে চিনছি কী করে?

সবচাইতে বেশি ভয় লাগছে, এখন আর এটাকে নিছক তামাশা মনে করতে পারছি না। ব্যাপারটা তার চাইতে অনেক জটিল আর বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।

আমি কে প্রমাণ করার নিশ্চয়ই কোন উপায় আছে। স্কুলে লাভ হবে না। হাসপাতালেও না। কোথায় যাব আমি?

বাসায় যাব! জোরে বলে উঠলাম। বাসায় চাচা-চাচীর সঙ্গে আমার প্রচুর ছবি রয়েছে। বই রয়েছে যাতে আমার নাম লেখা। প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট, আমি কে।

ঘড়ি দেখলাম। ১:৩০। চাচা-চাচী আরও কয়েক ঘণ্টা বাইরে থাকবে। নিশ্চয়ই ডনকেও সঙ্গে নিয়ে যাবে। মেইন স্ট্রীট ধরে বাসার দিকে হেঁটে চললাম।

আকাশ হঠাৎই গোলাপী হয়ে গেল। সব কিছু যেন কাঁপছে, এবং কোথায় যেন জোরাল বাজনা শুরু হলো। অদ্ভুত বাজনা, রেডিওতে এমনটা বাজে না।

এক দোকানের সামনে টলতে টলতে গিয়ে দাঁড়ালাম। মেইন স্ট্রীটে আমি ছাড়া কেউ নেই! দু মুহূর্ত পর পর রং বদলাচ্ছে আকাশের। গোলাপী, হলুদ, কমলা, নীল, গোলাপী।

প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হলো কাঁধে। দোকানের জানালার দিকে ঘুরে দাঁড়ালাম। সাহায্য আশা করছি। জানালায় চোখ রাখলাম। চকচকে কালো পোশাক পরে, জানালায় দাঁড়িয়ে, আমার দিকে চেয়ে মৃদু হাসছেন-মিস লি!

Categories: