২. কঙ্কাল দ্বীপ ভেবে হন্ত দ্বীপে নামিয়ে দিয়ে গেছে

0 Comments

কুঁজের গায়ে একটা ছোট্ট খোঁড়ল। ওতেই ঠাঁই নিল তিন গোয়েন্দা। কোনমতে গাদাগাদি করে বসল। কষ্ট হচ্ছে বটে, কিন্তু বাতাস আর বৃষ্টির কবল থেকে রেহাই মিলল এখানে।

কয়েক মিনিট আগে খোঁড়লটা খুঁজে বের করেছে ওরা। নিশ্চিত হয়ে গেছে, এটা হস্ত দ্বীপ। দ্বীপে ক্যাম্প নেই, মানুষ নেই, জেটি নেই, বোট নেই।

এখানে নামিয়ে দিয়ে গেল কেন হান্ট, কপালে লেগে থাকা পানির কণা মুছতে মুছতে বলল মুসা, বুঝতে পারছি না।

ভুল করেছে। হয়ত, বলল রবিন। কঙ্কাল দ্বীপ ভেবে হন্তে নামিয়ে দিয়ে গেছে।

না, মাথা নাড়ল কিশোর। ভুল করেনি। ইচ্ছে করেই এখানে ফেলে গেছে ব্যাটা। প্রথম থেকেই লোকটাকে ভাল লাগেনি। আমরা গোয়েন্দা, জানল কি করে! কোথাও কিছু একটা গোলমাল হয়েছে।

যা খুশি হোকগে, মুসার গলায় হতাশা। না খেয়ে না মরলেই হল।

সকালে খুঁজে পাবে, বলল কিশোর। ভর রাতেই মাছ ধরতে বেরোয় জেলেরা।

কিন্তু এদিকে কোন জেলে-নৌকা আসার কথা না, রবিনের গলায় সন্দেহ। পড়নি, এক ধরনের লাল পরজীবী কীটের আক্রমণে নষ্ট হয়ে গেছে। এখানকার ঝিনুক? খাওয়া নিরাপদ নয়। মেলভিলের একেবারে দক্ষিণে ঝিনুক তুলতে যায় এখন জেলেরা। ফিশিংপোর্টের এদিকে আসে না। আর কিছুদিন এভাবে চললে গ্রাম ছেড়ে চলে যাবে সবাই।

তবু, কেউ না কেউ আসবেই, জোর দিয়ে বলল কিশোর। আমরা নিরুদ্দেশ হয়েছি, জানবেন। রাফাত চাচা। খোঁজখবর শুরু হয়ে যাবে। আজ এখানে নেমে বরং ভালই হল। ফেয়ারাটা দেখতে পেলাম।

আর বিশেষ কিছু বলার নেই কারও। চুপ হয়ে গেল ওরা। বাইরে ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছে, কিন্তু খোঁড়লের ভেতর মোটামুটি নিরাপদ। যেমন হঠাৎ আসে, তেমনি হঠাৎই আবার চলে যায়, এ-অঞ্চলের ঝড়। তিন কিশোর আশা করল, সকাল নাগাদ থেমে যাবে। শিগগিরই ঢুলতে শুরু করল ওরা।

হঠাৎ তন্দ্ৰা টুটে গেল মুসার। কোথায় আছে বুঝতেই পেরিয়ে গেল। কয়েক মুহূর্ত। তারা চোখে পড়ল। ঝড় থেমে গেছে। তন্দ্ৰা ছুটে যাবার এটাই কি কারণ? না। চোখে আলো পড়েছিল। এখন আবার পড়ল। শখানেক গজ দূর থেকে আসছে, তীব্র আলোর রশ্মি। এক মুহূর্ত স্থির থাকিল, তারপরই সরে গেল। আবার আলো।

লাফিয়ে দাঁড়াতে গিয়ে মাথায় বাড়ি খেল মুসা। ইয়াল্লা বলে চেঁচিয়ে উঠে আবার বসে পড়ল। সাবধানে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে এল খোঁড়লের বাইরে।। গা থেকে রেনকোট খুলে নাড়তে নাড়তে চেঁচিয়ে বলল, এখানে আমরা এ-খা-নে!

মুসার পাশে এসে দাঁড়াল রবিন আর কিশোর।

আবার আলো পড়ল মুসার গায়ে। তারপরই সরে এসে পড়ল। রবিন আর কিশোরের ওপর। এক মুহূর্ত স্থির রইল। চকিতের জন্যে একবার উঠে গেল আকাশের দিকে। একশো গজ দূরে নৌকার পাল দেখতে পেল তিন গোয়েন্দা।

দ্বীপের গায়ে ভিড়েছে নৌকা বলে উঠল মুসা। আমাদেরকে যেতে বলছে…

আকাশে তারার আলো। আবছা অন্ধকার। হাঁটতে শুরু করল তিন গোয়েন্দা।

আবার জ্বলে উঠল টর্চ।

দেখ দেখ! চেঁচিয়ে উঠল রবিন। আমাদেরকে পথ দেখাচ্ছে।

বৃষ্টিতে ভিজে পিচ্ছিল হয়ে আছে মাটি। দৌড়ানো তো দূরের কথা, তাড়াতাড়ি হাঁটাই যাচ্ছে না। তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে একবার আছাড় খেল মুসা। পাথরে ঘষা লেগে ছড়ে গেল হাঁটু।

পানির কিনারে এসে থামল তিন গোয়েন্দা। তীরে ভিড়েছে ছোট একটা পালতোলা নৌকা। পাশে বালিতে দাঁড়িয়ে আছে তাদেরই বয়েসী। এক কিশোর। পরনে পানি নিরোধক জ্যাকেট। প্যান্টটা গুটিয়ে হাঁটুর কাছে তুলে নিয়েছে।

তিন গোয়েন্দার মুখে আলো ফেলল। ছেলেটা। দেখল। তারপর নিজের মুখে আলো ফেলে দেখাল ওদেরকে। হাসিখুশি একটা মুখ। রোদোপোড়া তামাটে চামড়া। কোঁকড়া কালো চুল। কালো উজ্জ্বল এক জোড়া প্ৰাণবন্ত চোখ।

হাল্লো! ইংরেজিতে বলল ছেলেটা। কথায় বিদেশী টান। তোমরা তিন গোয়েন্দা, না?

অবাক হল তিন কিশোর। তাদের পরিচয় এখানে গোপন নেই কারও কাছেই! ঢোল পিটিয়ে জানানো হয়েছে যেন!

হ্যাঁ, আমরা তিন গোয়েন্দা, বলল কিশোর। খুঁজে পেলে কি করে?

কোথায় খুঁজতে হবে, জানতাম, বলল ছেলেটা। মুসার সমান লম্বা। হালকা-পাতলা। আমি পাপালো হারকুস। পাপু ডাকে বন্ধুরা।

তো, পাপু, বলল মুসা। হাসিখুশি ছেলেটাকে ভালই লাগছে তার। কোথায় খুঁজতে হবে, কি করে জানলে?

অনেক লম্বা কাহিনী, বলল পাপালো। এসো, নৌকায় ওঠ। সিনেমা কোম্পানির লোকজন খুব ভাবনায় পড়ে গেছে।

এসকেপ ছবিতে কোন কাজ করছ তুমি? নৌকায় উঠতে উঠতে জিজ্ঞেস করল রবিন।

না না, ধাক্কা দিয়ে নৌকাটা বালির ওপর থেকে পানিতে ঠেলে দিল পাপালো। লাফ দিয়ে উঠে পড়ল। গলুইয়ে। দাঁড় ধরল। পালে হাওয়া লাগতেই তরতর করে ছুটে চলল হালকা নৌকা। দূরে দেখা যাচ্ছে ফিশিংপোট গ্রামের আলো।

কথায় কথায় তিন গোয়েন্দার কাছে নিজের পরিচয় দিল পাপালো। বাড়ি গ্ৰীসের এক ছোট্ট গাঁয়ে। বড় হয়েছে ভূমধ্যসাগর উপকূলে। মা নেই। বাবা স্পঞ্জ শিকারি জেলে। সাগরের তল থেকে স্পঞ্জ তুলে বিক্রি করত। এই ছিল জীবিকা।

খুব দরিদ্র গ্ৰীসের স্পঞ্জ শিকারিরা। ডুবুরির সাজ-সরঞ্জাম কেনার পয়সা নেই তাদের। ফলে কোন যন্ত্রপাতি ছাড়াই ডুব দিতে হয়। দুহাতে একটা ভারি পাথর নিয়ে পানিতে ছেড়ে দেয় শরীর। দ্রুত ড়ুবে যায় তলায়। পাথর ছেড়ে দিয়ে স্পঞ্জ কুড়িয়ে নিয়ে ভেসে ওঠে ওপরে। পাপালোর বাবাও এই কায়দায় স্পঞ্জ তুলে আনত। হঠাৎ একদিন আক্রান্ত হল স্পঞ্জ-শিকারির অভিশাপ বেণ্ড রোগে। অকেজো হয়ে গেল। বন্ধ হয়ে গেল রোজগার। কিছুদিন চলল সঙ্গী জেলেদের দয়ায়। ওই সময় ফিশিংপোটে জেলের কাজ করত পাপালোর চাচা। ভাইয়ের দুরবস্থার খবর পেয়ে কিছু টাকা পাঠিয়ে দিল। ভাই ভাতিজাকে নিয়ে এল নিজের কাছে।

কয়েক বছর ভালই কাটল, বলল পাপালো। তারপরই দেখা দিল দুৰ্ভাগ্য। লাল কীট আক্রমণ করল। ঝিনুককে। ব্যবসা খতম। নৌকা বেচে দিয়ে নিউ ইয়র্কে চাকরি নিয়ে চলে গেল। চাচা। আমি আর বাবা রয়ে গেলাম এখানে। না থেকেই বা কি করব। মাছধরা ছাড়া আর কোন কাজ জানি না। বাবা পঙ্গু। তাকে নিয়ে কোথায় যাব? চাচার ঘাড়ে গিয়ে সওয়ার হতে ইচ্ছে হল না। নিজেরই চলে না, তবু কিছু কিছু করে বাঁচিয়ে মাসে মাসেই টাকা পাঠায় বাবাকে। খুব কষ্টে দিন কাটে আমাদের। একদিন খবর পেলাম, ফিশিংপোটে এক সিনেমা কোম্পানি আসছে। দ্বীপে ক্যাম্প করবে ওরা, ছবির শুটিং করবে। ডুবুরির কাজটা খুব ভাল পারি। আশা হল, একটা কাজ পেয়ে যাব সিনেমা কোম্পানিতে। দ্বীপে ক্যাম্প করবে যখন, নিশ্চয় সাগরের তলায় শুটিং করবে। ডুবুরির দরকার হবে। এল ওরা। গেলাম। কিন্তু কাজ দিল না। আমি বিদেশী। বিদেশীকে দেখতে পারে না। এখানকার লোকে। তবে, আশা ছাড়িনি আমি এখনও।

এগিয়ে চলেছে নৌকা। কানে আসছে কঠিন কিছুতে ঢেউ আছড়ে পড়ার শব্দ।

কোথায় আছি। এখন? জানতে চাইল মুসা। অন্ধকারে নিশানা ঠিক রাখতে পার? অন্ধকারে ডুবো পাহাড়ে বাড়ি লেগে যেতে পারে নৌকা!

শব্দ শুনেই বুঝতে পারি। আমি, কোন পথে চলেছি, বলল পাপালো। ওই যে, ঢেউ আছড়ে পড়ছে প্রবাল প্রাচীরে, বাঁয়ে। দ্য বোনস-এর পাশ দিয়ে চলেছি আমরা। সামনে স্কেলিটন আইল্যান্ড।

সামনে তাকাল তিন গোয়েন্দা। অন্ধকারে পরিষ্কার দেখা গেল না। কঙ্কাল দ্বীপ। কিন্তু অবয়বটা মনে গাঁথা আছে। ওদের। প্লেন থেকে দেখেছে, খুলির আকার। ম্যাপে দেখেছে। মিস্টার ক্রিস্টোফারের দেয়া ম্যাগাজিন পড়ে জেনেছে অনেক খুঁটিনাটি।

আমেরিকার দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে এই দ্বীপ। একে ঘিরে আছে আটলান্টিক উপসাগর। ১৫৬৫ সালে আবিষ্কার করেছিলেন এক ইংরেজ নাবিক, ক্যাপ্টেন হোয়াইট। দ্বীপে নেমেছিলেন ক্যাপ্টেন। এটা ছিল তখন স্থানীয় ইণ্ডিয়ানদের গোরস্থান। কবর বেশি গভীর করে খুড়ত না ইণ্ডিয়ানরা। ফলে পানি আর বাতাসে কবরের ওপরের বালিমাটি সরে গিয়ে বেরিয়ে পড়ত মরার হাড়গোড়। অনেক কঙ্কাল দেখেছিলেন তিনি। দ্বীপের নাম রাখলেন, স্কেলিটন আইল্যান্ড। তারপর কাছের আরেকটা দ্বীপে নামলেন। অনেকটা চৌকোণা ওই দ্বীপ, এক প্ৰান্ত থেকে লম্বা হয়ে বেরিয়ে গেছে সরু সরু পাঁচটা প্রবাল প্রাচীর। ওটার নাম রাখলেন দ্য হ্যান্ড। দুটো দ্বীপের মাঝের একসারি প্রবাল-প্রাচীরের নাম রাখলেন দ্য বোনস। তারপর একদিন আবার জাহাজ নিয়ে চলে গেলেন। ক্যাপ্টেন।

এর অনেক বছর পর দ্বীপগুলোর খোঁজ পেল জলদস্যুরা। ওগুলোকে শীতকালের ঘাঁটি বানাল ওরা। আশপাশে তখনও শহর ছিল। ডাকাতি করে আনা সোনার মোহর খরচ করতে যেত ওরা ওসব শহরে। দুৰ্দান্ত জলদসু্যু ব্ল্যাকবিয়ার্ডও এক শীতে বেরিয়ে গিয়েছিল এখান থেকে।

উৎপাত বেড়ে গেল জলদস্যুদের। ইংরেজ নৌ-বাহিনী তাদেরকে তাড়া করে আনল। এখান পর্যন্ত। দলবল সহ একে একে মেরে শেষ করল দস্যু সর্দারদের। ১৭১৭ সালে মারা পড়ল ব্ল্যাকবিয়ার্ড। এ-অঞ্চলে বাকি রইল। শুধু তখন দুর্দান্ত দস্যু ক্যাপ্টেন ওয়ান-ইয়ার (এক কান কাটা বলেই এই নাম) আর তার দল। ঠাঁই নিল এসে কঙ্কাল দ্বীপে।

গোলমাল শুনে এক রাতে ঘুম থেকে হঠাৎ জেগে উঠল। দস্যুরা। দেখল, তাদেরকে ঘিরে ফেলেছে নৌ-বাহিনীর লোক।

নির্বিচারে ডাকাত জবাই শুরু করল নৌ-বাহিনীর লোকেরা। ওয়ানইয়ার বুঝল, লড়াই করে টিকতে পারবে না। গোলমালের ফাঁকে একটা লংবোটে করে কেটে পড়ল সে। সঙ্গে নিল তার মোহরের সিন্দুক, আর অতি বিশ্বস্ত কয়েকজন সহচর।

দ্বীপে যে কজন ডাকাত ছিল, একটাকেও ছাড়ল না নৌ-বাহিনী, সবকটাকে হত্যা করল। এরপর খেয়াল হল ওদের, এক-কান-কাটা মারা পড়েনি। খোঁজ খোঁজ খোঁজ। বুঝে ফেলল ওরা, পালিয়েছে ওয়ান-ইয়ার। জাহাজ নিয়ে তাড়া করল পেছনে। বেগতিক দেখে নৌকার মোড় ফেরাল ডাকাত সর্দার। হস্তে এসে লুকানোর চেষ্টা করল। শেষরক্ষা করতে পারল না সো। ধরা পড়ল নৌ-বাহিনীর হাতে।

ইংরেজ জাহাজের ক্যাপ্টেন প্রথমেই জানতে চাইল, মোহরগুলো কোথায়?

খিকখিক করে হেসে উঠল এক-কান-কাটা। বলল, সাগর দেবতার খাজাঞ্চিখানায়। চাওগে ওর কাছে। হাতে পায়ে ধরলে দিয়েও দিতে পারে।

অনেক নির্যাতন করা হল এক-কান-কাটা আর তার সহচরদের ওপর। কিন্তু কেউ মুখ খুলল না। ফাঁসির দড়িতে ঝোলার আগেও বলল না কেউ কোথায় আছে মোহরগুলো। তন্নতন্ন করে খোঁজা হল হস্ত আর তার আশপাশের দ্বীপগুলো। কিন্তু মোহরের চিহ্নও মিলল না। ধরেই নিল ইংরেজ ক্যাপ্টেন, মোহরগুলো সব উপসাগরে ফেলে দিয়েছে এক-কানকাটা। ওগুলো আর উদ্ধারের কোন আশা নেই। খানিকটা হতাশ হয়েই দেশে ফিরে গেল ক্যাপ্টেন।

এদিককার সাগর নিশ্চয় তোমার চেনা, তাই না, পাপু? সামনের অন্ধকারের দিকে চেয়ে বলল কিশোর।

নিজের হাতের তালুর মত, জবাব দিল পাপালো। সুযোগ পেলেই এদিকে চলে আসি। ডুব দিই সাগরে। মোহর খুঁজি।

শুনেছি, অনেকেই মোহর খোঁজে। এখানে, বলল রবিন। পায়ও কেউ কেউ।

তুমি পাও-টাও? পাপালোকে জিজ্ঞেস করল মুসা।

দ্বিধা করল পাপালো। তারপর বলল, পাই। তবে ওটাকে না পাওয়া বললেও চলে।

শেষ কবে পেয়েছ? জানতে চাইল কিশোর।

গত হপ্তায়, বলল পাপালো। কোথায় পেয়েছি, বলব না। এটা আমার সিক্রেট। শক্ত হয়ে বস, মোড় ঘোরাব।

মোড় ঘোরালে কেন শক্ত হয়ে বসতে হবে, জিজ্ঞেস করতে গিয়েও থেমে গেল মুসা। জোরে একবার কেঁপে উঠল নৌকা। একপাশে কাত হয়ে গেল পাল, সেই সঙ্গে নৌকাটাও। পাশে আঘাত হানল ঢেউ। ছিটকে পানি এসে লাগল ছেলেদের গায়ে। শক্ত করে দাঁড় ধরে রইল পাপালো।

আরেকবার কেঁপে উঠেই সোজা হয়ে গেল নৌকা। এগিয়ে চলল আবার। সামনে দেখা যাচ্ছে ফিশিংপোটের আলো।

স্কেলিটন আইল্যান্ড এখন পিছনে, বলল পাপালো। গাঁয়ের দিকে এগোচ্ছি আমরা।

পেছনে ফিরে চাইল তিন গোয়েন্দা। দেখা যাচ্ছে না দ্বীপ। শুধু কালো অন্ধকার।

হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল রবিন, দেখ দেখা আলো!

একসঙ্গে জ্বলে উঠেছে অনেকগুলো আলো, ঘুরছে। শোনা যাচ্ছে অদ্ভুত একটা ধাতব শব্দ। আস্তে আস্তে বাড়ছে ঘোরার বেগ। দেখতে দেখতে আলোর এক বিশাল আংটি তৈরি হয়ে গেল।

ইয়াল্লা! ফিসফিস করে বলল মুসা। নাগরদোলা নিশ্চয় ঘোড়ায় চেপে বসেছে স্যালি…

পাপু মুসার কথা শেষ হবার আগেই বলল কিশোর। নৌকা ঘোরাও! দেখব, কিসে ঘোরাচ্ছে নাগরদোলা!

আমি পারব না। মাথা নাড়ল পাপালো। স্যালির ভূত; ঝড় থেমেছে একটু আগে। এখন এসেছে দোলায় চড়তো ইসস, নৌকাটা আরও জোরে চলছে না কেন! একটা মোটর যদি থাকত…

সোজা ফিশিংপোর্টের দিকে ছুটে চলেছে নৌকা। খুশিই হয়েছে মুসা। আর রবিন। হতাশ হয়ে কিশোর। সত্যিকারের ভূত দেখার ইচ্ছে তার অনেক দিনের। এমন একটা সুযোগ হাত-ছাড়া হয়ে গেল।

অন্ধকারে উজ্জ্বল আলোর রিঙ তৈরি করে ঘুরেই চলেছে নাগরদোলা। বাইশ বছর আগে মরে যাওয়া তরুণীর প্ৰেতাত্মা. কথাটা ভাবতেই শিউরে উঠল রবিন।

হঠাৎ থেমে গেল ধাতব শব্দ। নিভে গেল। আলো। এত তাড়াতাড়ি নাগরদোলা চড়ার শখ মিটে গেল স্যালির প্ৰেতাত্মার. আশ্চর্যা-ভাবলী কিশোর। অন্ধকারের দিকে চেয়ে বসে আছে সে। চিমটি কাটছে নিচের ঠোঁটে।

আরও আধা ঘণ্টা পর মিসেস ওয়েলটনের বোডিং হাউসে এসে উঠল তিন গোয়েন্দা। সঙ্গে সঙ্গে টেলিফোনে সিনেমা কোম্পানিকে জানিয়ে দিল মিসেস।

গরম পানিতে গোসল করল তিন গোয়েন্দা। খাওয়া সারল। গরম বিছানায় উঠল।

কম্বলটা গায়ের ওপর টেনে দিতে দিতে বলল কিশোর, ভূতটা দেখতে পারলে ভাল হতা

আমার তা মনে হয় না, ঘুমজড়িত গলায় বলল মুসা। শুয়ে পড়ে কম্বলটা টেনে নিল গায়ের ওপর।

রবিন কিছু বলল না। ঘুমিয়ে পড়েছে।

ঘুম ভাঙল রবিনের। চোখে পড়ল ঢালু হয়ে নেমে যাওয়া চাল। মনে পড়ল, বাড়িতে নেই সে। রকি বীচ থেকে তিন হাজার মাইল দূরে ফিশিংপোটের এক বোডিং হাউসে শুয়ে আছে।

উঠে বসে চারদিকে তাকাল রবিন। একটা ডাবল-বাংকের ওপরের তাকে রয়েছে। নিচের তাকে ঘুমাচ্ছে মুসা। কয়েক ফুট দূরে আরেকটা বাংকে কিশোর।

আবার শুয়ে পড়ল রবিন। আগের রাতে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো ছবির মত খেলতে লাগল। মনের পর্দায়।

দরজায় টোকা দেবার শব্দ হল। খুলে গেল পাল্লা। ঘরে এসে ঢুকল হাসিখুশি, বেঁটে-মোটা এক প্রৌঢ়া। মিসেস ওয়েলটন, বাড়িওয়ালি। রবিনকে জেগে থাকতে দেখে বলল, এই যে, ওঠ, উঠে পড়। নাস্তা তৈরি। নিচে দুজন লোক দেখা করতে এসেছেন তোমাদের সঙ্গে। পাঁচ মিনিটের মধ্যে এসো।

বেরিয়ে গেল মিসেস ওয়েলটন।

লাফ দিয়ে বাংক থেকে নেমে এল রবিন। মুসা কিংবা কিশোরকে ডাকতে হল না। বাড়িওয়ালির গলা শুনে জেগে উঠেছে দুজনেই।

দ্রুত তৈরি হয়ে নিচে নেমে এল ওরা। উজ্জ্বল হলুদ রঙ করা ডাইনিং রুমের দেয়াল, ছাত। সামুদ্রিক জীবজন্তুর খোলস দিয়ে সাজানো হয়েছে। টেবিলে নাস্তা তৈরি। এক ধারে দুটো চেয়ারে বসে কফি খাচ্ছে দুজন লোক। কথা বলছেন নিচু গলায়।

ছেলেদেরকে ঢুকতে দেখেই উঠে দাঁড়াল একজন। বিশালদেহী! কুচকুচে কালো গায়ের রঙ। কোঁকড়া চুল। হাসলেন। ঝিকি করে উঠল। ঝকঝকে সাদা দাঁত। কেমন আছ তোমরা, মুসা ঠিক প্রশ্ন নয়। জবাবের অপেক্ষা না করেই বললেন মিস্টার রাফাত আমান, গতরাতেই এসেছিলাম। ঘুমিয়ে পড়েছিলে। আর জাগালাম না। তাড়াতাড়ি ফিরে যেতে হয়েছে আবার দ্বীপে। উফফ, যা ভাবনায় পড়েছি না প্রতিটি মিনিটই পাহারা দিয়ে রাখতে হয় জিনিসপত্র। কাঁহাতক আর পারা যায়। থামলেন তিনি। তিন কিশোরের ওপর চোখ বুলিয়ে আনলেন একবার। তারপর বললেন, তারপর? তোমাদের কাহিনী বল। গতরাতে কি হয়েছিল?

চেয়ারে বসা দ্বিতীয় লোকটির ওপর চোখ মুসার।

পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি, বললেন মিস্টার আমান। ইনি মিস্টার হোভারসন। এখানকার পুলিশ-চীফ।

পরিচয়ের পালা শেষ হল। চেয়ারে এসে বসল। তিন গোয়েন্দা। নাস্তার ফাঁকে ফাঁকে জানাল তাদের কাহিনী।

পাইপ দাঁতে কামড়ে ধরে চুপচাপ সব শুনলেন হোভারসন। হান্টের কথা আসতেই হাত তুললেন। হান্টা চেহারা কেমন?

জানাল ছেলেরা।

হুমম। চিন্তিত ভঙ্গিতে মাথা দোলালেন পুলিশ-চীফ। হান্ট গিল্ডার মনে হচ্ছে!

চেনেন নাকি? জিজ্ঞেস করলেন মিস্টার আমান।

ভালমত। কয়েকবার জেল খেটেছে। টাকার জন্যে পারে না, এমন কোন কাজ নেই। ধরতে পারলে কয়েকটা কথা জিজ্ঞেস করতাম!

আমারও কয়েকটা প্রশ্ন ছিল, গম্ভীর হয়ে বললেন মিস্টার আমান। জিজ্ঞেস করতাম, কি করে জানল, ছেলেরা আসছে? কি করে জানল, ওরা গোয়েন্দা? আর গতরাতে কেন নির্জন দ্বীপে ফেলে রেখে এল ওদের? ভাগ্যিস, পাপু খুঁজে পেয়েছিল! নইলে জানতেই পারতাম না আমরা!

ঠিক, সায় দিলেন চীফ। প্লেন থেকে নেমেছে ওরা, শুধু এটুকুই জেনেছিলাম। এরপর কি হয়েছিল, কিছুই বুঝতে পারিনি। রোড ব্যারিকেন্ড দিয়ে গাড়ি থামিয়ে কত লোককে যে জিজ্ঞেস করেছিলাম…।

পাপু কি করে জানল, তোমরা দ্য হ্যান্ডে আছ? মুসার দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করলেন মিস্টার আমান। কি বলেছে?

মুসা জানাল, একবার জিজ্ঞেস করেছিল, উত্তরটা এড়িয়ে গেছে পাপালো। পরে আর জিজ্ঞেস করার কথা মনে ছিল না। তারপর উঠল ভূতের কথা।

ভূত দেখেছিলো ভুরু কোঁচকালেন মিস্টার আমান। অসম্ভব! ঝড়ের রাতে নাগরদোলা চড়তে আসে। ভূত, এটা এ এলাকার একটা গুজব।

গুজবই বা বলি কি করে? বললেন হোভারসন। গত দুবছরে অনেকবার দেখা গেছে। ওই ভূত। ঝড়ের রাতে। জেলেরা দেখেছে। স্কেলিটন আইল্যান্ডের ধারে কাছে যেতে চায় না। এখন আর লোকে। থামলেন চীফ। হাসলেন। বিশ্বাস হচ্ছে না। আমার কথা? বেরিয়ে জিজ্ঞেস করে দেখুন লোককে। গতরাতেও দেখা গেছে ভূত, খবরটা ছড়িয়ে পড়েছে। সারা গাঁয়ে। অনেকেই শুনেছে নাগরদোলা ঘোরার শব্দ। আলো দেখেছে স্পাইগ্লাস লাগানো টেলিস্কোপ দিয়ে, কেউ কেউ ভূতকেও দেখেছে। নাগরদোলার একটা ঘোড়ায় চেপে বসেছিল নাকি একটা সাদা মূর্তি। এই শেষ কথাটা অবশ্য বিশ্বাস করিনি। আমি…

কুসংস্কারে খুব বেশি বিশ্বাসী এ গাঁয়ের লোক, বললেন মিস্টার আমান। মাথা দোলালেন। বুঝতে পারছি, আজ আর কেউ যাবে না দ্বীপে কাজ করতে। বিপদেই পড়ে গেলাম দেখছি!

আগামীকালও কাউকে নিতে পারবেন বলে মনে হয় না, বললেন। হোভারসন। তো, মিস্টার আমান, আমি উঠি।। দেখি, হান্টকে ধরতে পারি। কিনা। কিন্তু একটা প্রশ্ন বেশি খচখচ করছে মনে, পাপু কি করে। জানল ছেলেরা দ্য হ্যান্ডে আছে?

সন্দেহের কথা? বললেন মিস্টার আমান। আমার কাছে চাকরির জন্যে এসেছিল একদিন। এখানকার লোকে ভাল চোখে দেখে না। ছেলেটাকে। ও নাকি চোর। এটা জেনে কাজ দিইনি। আমাদের জিনিসপত্র হয়ত ওই চুরি করে, কে জানে!

না, বাবা, জোরে মাথা নাড়ল মুসা, পাপু চোর না! গতরাতে অনেক কথা বলেছি। ওকে ভাল ছেলে বলেই মনে হল। অসুস্থ বাপের দেখাশোনা করে। সময় পেলেই উপসাগরে বেরিয়ে পড়ে নৌকা নিয়ে। মোহর খুঁজে বেড়ায়। না, পাপু খারাপ ছেলে না।

মুসা ঠিকই বলছে, সায় দিলেন পুলিশ-চীফ। ছেলেটাকে দেখতে পারে না লোকে, সেটা অন্য কারণে। এখানকার লোক বিদেশী পছন্দ করে না। ওদের ধারণা, যত কুকাজ, সব বিদেশীরা করে।

যা-ই বলুন, ছেলেটাকে সন্দেহ করি আমি, বললেন মিস্টার আমান। অসুস্থ বাপকে খাওয়ানোর জন্যেই হয়ত চুরি করে। একটা সৎ কাজ করতে গিয়ে আরেকটা অসৎ কাজের সাহায্য নেয়াকে ভাল বলা যায় না। উঠে দাঁড়ালেন তিনি। ছেলেরা, এসো যাই। এতক্ষণে হয়ত দ্বীপে গিয়ে বসে আছেন মিস্টার নেবার। চীফ, পরে আবার দেখা করব। আপনার সঙ্গে। আশা করি, হান্টকে ধরে জেলে পুরতে পারবেন।

কয়েক মিনিট পর। দ্রুতগতি একটা স্পীডবোটে বসে আছে তিন গোয়েন্দা। কঙ্কাল দ্বীপের দিকে ছুটে চলেছে বোট। ফিশিংপোর্টকে গ্রাম বলা হয়, আসলে ছোটখাটো শহর ওটা। ঘুরে দেখার ইচ্ছে ছিল ওদের, কিন্তু সময় মেলেনি।

রাতের বেলা অন্ধকারে কিছুই দেখেনি ছেলেরা। এখন দেখল, অসংখ্য ডক আর জেটি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। এদিক ওদিক। সেই তুলনায় নৌকা-জাহাজ অনেক কম। বুঝতে পারল, ওগুলো সব চলে গেছে উপসাগরের দক্ষিণে। ফিশিংপোটের সীমানা খুব বেশি বড় না। লোকসংখ্যা আগে অনেক ছিল, ইদানীং নাকি কমে গেছে। ব্যবসা ভাল না, থেকে কি করবে। লোকে?

কৌতূহলী চোখে কঙ্কাল দ্বীপের দিকে তাকিয়ে আছে ওরা। মাইলখানেক দূরে আছে এখনও। প্রচুর গাছপালা দ্বীপে। উত্তরপ্রান্তে একটা ছোট পাহাড়।

কঙ্কাল দ্বীপের দক্ষিণে একটা পুরানো জেটির গায়ে এসে ভিড়ল বোট। পাশেই খুঁটিতে বাঁধা আরেকটা মোটরবোট। একপাশ থেকে বুলিছে বিশেষ সিঁড়ি। স্কুবা ডাইভিঙের সময় খুব কাজে লাগে।

জেটির ধার থেকে পথ চলে গেছে। আগে আগে চললেন মিস্টার আমান। পেছনে তিন কিশোর। শিগগিরই একটা খোলা জায়গায় এসে পৌঁছুল ওরা। ঝোপঝাড় কেটে পরিষ্কার করে ফেলা হয়ে জায়গাটা। একপাশে দুটো ট্রেলার দাঁড়িয়ে আছে। বড় বড় কয়েকটা তাঁবু খাটানো হয়েছে মাঝখানে।

ওই যে, মিস্টার জন নেবার, ডিরেক্টর, বললেন মুসার বাবা। গতকাল এসে পৌঁছেছেন ফিলাডেলফিয়া থেকে। জরুরি কাজ সেরে আজই ফিরে যাবেন আবার।

হর্ন-রিমি চশমা পরা একজন লোক এগিয়ে আসছেন। বয়েস চল্লিশের কাছাকাছি। পেছনে তিনজন লোক। একজনের চুল ধূসর। সে গোয়েন্দা। আরেকজনের চুল সোনালি, নাবিকদের মত ছোট ছোট করে। ছাঁটা। যুবক। জোসেফ গ্র্যাহাম। তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে বিশালদেহী এক লোক। চওড়া বুকের ছাতি। বাঁ হাতটা বুলছে বেকায়দা ভঙ্গিতে, বোঝাই যায়। অকেজো। কোমরে বুলছে রিভলভার। জিম রিভান, গার্ড।

আমাদের ক্যাম্প, তাঁবুগুলো দেখিয়ে বললেন মিস্টার আমান। বার্জে করে আনা হয়েছে ভারি মালপত্র। আমরা এখন লোক কম। কয়েকদিন পরে শুটিঙের কাজ শুরু হলেই আসবে। আরও অনেকে। আসবে দামি যন্ত্রপাতি। তখন আর ওই তাঁবুতে কুলাবে না। আরও কয়েকটা ট্রেলার দরকার পড়বে।

কাছে এসে গেলেন পরিচালক।

সরি, মিস্টার নেবার, বললেন রাফাত আমান, দেরিই হয়ে গেল।

না না, ঠিক আছে, হাত তুললেন পরিচালক। ছেলেদের দিকে একবার তাকালেন। আবার ফিরলেন মিস্টার আমানের দিকে। কিন্তু এখানকার অবস্থা তো বিশেষ সুবিধের মনে হচ্ছে না। সবই বলেছে। পিটার। আর হস্তখানেকের ভেতর নাগরদোলাটা ঠিক না করা গেলে, স্কেলিটন আইল্যান্ডের আশা বাদই দেব। ক্যালিফোনিয়ায় ফিরে গিয়ে স্টুডিওতেই একটা পার্ক সাজিয়ে নেব। নাগরদোলা আনা যাবে ভাড়া করে। তবে এখানে করতে পারলেই ভাল হত। সবকিছু আসল। তাছাড়া দ্বীপের দৃশ্য, উপসাগরের দৃশ্য, খুবই চমৎকার।

আশা করছি, ঠিক করে ফেলতে পারব, বললেন মিস্টার আমান। কাঠমিস্ত্রিকে খবর দিয়ে পাঠিয়েছি।

তা পাঠিয়েছেন, কিন্তু আসবে কিনা যথেষ্ট সন্দেহ আছে, গম্ভীর গলায় বললেন পরিচালক। সারা শহর জেনে গেছে, গতরাতে ভূত দেখা গিয়েছে। নাগরদোলা ঘুরেছে।

ভূত ভূত ভূত! মুঠো হয়ে গেল মিস্টার আমানের হাত। চেহারা কঠোর। ওই ভূতের শেষ দেখে ছাড়ব আমি।

পায়ে পায়ে এসে পরিচালকের পেছনে দাঁড়িয়েছে জিম রিভান। আস্তে করে কেশে উঠল। মাফ করবেন, স্যার, গতরাতের ভূতটা বোধহয় আমিই।

Categories: