সে রাতে পিরেটোর তৈরি প্রচুর পরিমাণে শিক কাবাব আর বনরুটি দিয়ে ডিনার সেরে সকাল সকাল শুতে গেল তিন গোয়েন্দা।
কয়েক ঘণ্টা পরেই ঘুম ভেঙে গেল কিশোরের। তার বাংকের পাশে জানালার বাইরে দেয়ালে গা ঘষার শব্দ। মাথা উচু করে জানালা দিয়ে দেখল, শারি। কাচের ভেতর দিয়ে নাক ঢুকিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে।
নিচু গলায় ধমক দিল কিশোর। হাত মুঠো করে দেখাল। চলে যেতে বলল গাধাটাকে। কিন্তু গেল না ওটা। এখন মুসা কিংবা রবিন জেগে উঠে যদি ব্যাপারটা দেখে ফেলে, তাহলে টিটকারি দিয়ে দিয়ে তার জান জ্বালিয়ে দেবে। বিড়বিড় করে আপনমনেই গাল দিল গাধাটাকে। তারপর বিছানা থেকে নেমে পেছনের দরজার দিকে রওনা হলো। পাল্লা খোলার সঙ্গে সঙ্গে ভেতরে মাথা ঢুকিয়ে দিল শারি। তার বুকে নাক ঠেকিয়ে ঠেলতে আরম্ভ করল। সরল না কিশোর। গাধার বুকে ঠেলা দিয়ে ওটাকে বাইরে রাখার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু জানোয়ারটা ছোট হলেও গায়ে ভীষণ জোর, বালির বস্তার মত গাট হয়ে রইল যেন। কিছুতেই নড়ানো গেল না। শেষে বাধ্য হয়ে নিজেই বাইরে বেরিয়ে এল। মোলায়েম গলায় ওটার নাম ধরে কথা বলতে বলতে।
চোখের পলকে ঘুরে গেল গাধাটা। চাঁদের আলোয় কিশোর দেখল, ওটার পায়ের দড়ি নেই। মুক্ত। আবার সে ঘরে ঢোকার চেষ্টা করলেই ওটাও সঙ্গে ঢুকবে। আহ, মহা জ্বালাতন! এর হাত থেকে বাঁচা যায় কিভাবে? জবাব একটাই ওটাকে মাঠে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া।
কয়েক পা এগিয়ে থমকে দাঁড়াল সে। বাড়ির একমাথার বারান্দা থেকে কথা শোনা গেছে। একজন পুরুষ, একজন মহিলা। ডজের সঙ্গে কথা না বললেও তি গোয়েন্দার সঙ্গে বেশ ভাল ব্যবহার করেছে পিরেটো, কথা বলেছে। স্প্যানিশ ভাষায় কিশোরের কাছে আমেরিকার কথা জিজ্ঞেস করেছে। লেকটার কথা বলে হুঁশিয়ার করে দিয়েছে, ওটাতে যাতে সাঁতার কাটতে না যায়। পর্বত থেকে নেমে আসা পানি নাকি বরফের মত শীতল, কোন মানুষই কয়েক মিনিটের বেশি টিকতে পারবে না। শুনেই এখন পিরেটোর ভারি কণ্ঠ চিনতে পারল কিশোর। তবে বেশ দূরে। অস্পষ্ট। কি বলছে বোঝা যায় না।
মহিলা কে? জানার কৌতূহল হলো কিশোরের। পা টিপে টিপে এগোল দরজার দিকে। পাশে থেকে চলল শারি। ওটার গলায় হাত বুলিয়ে আদর করতে করতে চলল কিশোর, যাতে শব্দ না করে গাধাটা।
মহিলার কথা এখন বোঝা যাচ্ছে। আমাকে সাহায্য করতেই হবে, পিরেটো। স্প্যানিশ ভাষা। পেয়ে যাওয়ার পর কি করবে আন্দাজ করতে পারছ? ওদেরকে খুনও করে বসতে পারে ডজ!
মুখ খারাপ করে মেকসিকান ভাষায় ডজকে কয়েকটা গাল দিল পিরেটো। বেশ, বলল সে। যতটা পারি, তোমাকে সাহায্য আমি করব। এখন থেকে আমি তোমার দলে।
পিরেটোকে ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নিল মহিলা।
দ্রুত সেখান থেকে সরে এসে বাড়ির ছায়ায় অন্ধকারে লুকিয়ে পড়ল কিশোর। হালকা পায়ের শব্দ এগিয়ে যাচ্ছে চত্বরের দিকে। মহিলা চলে যাওয়ার আগে পলকের জন্যে ওকে দেখতে পেল সে। তবে এদিকে পেছন ফিরে থাকায় মুখ দেখা গেল না। চাঁদের আলো পড়েছে সোনালি চুলে।
কিশোরের গায়ে কাঁধ ঘষছে গাধাটা। এখান থেকেই দেখা যাচ্ছে মাঠে ঢোকার গেটটা খোলা। শারিকে সেখানে নিয়ে গেল কিশোর। তারপর চট করে গেটের এপাশে চলে এসে পাল্লা লাগিয়ে হুড়কো আটকে দিল। বেড়া ডিঙিয়ে চলে এল আবার এপাশে। ওপর দিয়ে মাথাটা এপাশে ঠেলে দিয়ে কর্কশ গলায় ডাকতে শুরু করল গাধাটা। লাফিয়ে পেরোতে পারবে না ওটা, বুঝে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল কিশোর।
ফিরে এল বিছানায়।
পরদিন সকালে ঘর থেকে বেরোনোর আগে সংক্ষেপে সব জানাল দুই সহকারীকে। বলল, জরুরি একটা টেলিফোন করতে হবে। ডজকে ঘণ্টা দুয়েকের জন্যে বের করে নিয়ে যেতে হবে বাড়ি থেকে এবং এই কাজটা করতে হবে রবিন আর মুসাকেই।
কাঁচা মরিচ মিশিয়ে মেকসিকান কায়দায় ডিম ভেজে দিল পিরেটো। কিশোরের খুব পছন্দ এই খাবারটা, কিন্তু পেট ব্যথা করছে, এই ছুঁতো দিয়ে খেল না।
ডজও বসেছেন ওদের সঙ্গে। তাকে জিজ্ঞেস করল মুসা, লেকে মাছ ধরতে যাওয়া যাবে কিনা। ডজ বললেন, যাবে। কিশোর বলে দিল, পেট ব্যথা নিয়ে সে যেতে পারবে না। ঘরেই থাকবে। আধ ঘণ্টা পর ঘরে রইল শুধু সে আর পিরেটো।
কি একটা কাজে সে ঘর থেকে চলে গেল পিরেটো। প্লেটে একগাদা রোল পড়ে আছে। চমৎকার সুগন্ধ। এদিক-ওদিক তাকিয়ে তাড়াতাড়ি তুলে নিয়ে মুখে পুরে চিবাতে শুরু করল সে। একেবারে খালি পেটে থাকা কঠিন। লাঞ্চের সময় হতে অনেক দেরি।
খাওয়া শেষ করে টেলিফোন সেটের সন্ধানে বেরোল সে। পাওয়া গেল লিভিং রুমের পাশে ডজের ছোট অফিসে। পেছনে পাল্লাটা লাগিয়ে দিয়ে এসে ডেস্কের সামনে বসল। ফোন বুক টেনে নিয়ে দেখতে লাগল ক্যালিফোর্নিয়ার ডাইরেক্ট নম্বর কত।
একবার রিঙ বাজতেই তুলে নিলেন ভিকটর সাইমন। বিখ্যাত সেই খোঁড়া গোয়েন্দা এবং লেখক, যার সঙ্গে অনেক কাজ করেছে ওরা।
কোথা থেকে করছে, জানাল কিশোর। তারপর বলল, আমাকে কয়েকটা তথ্য দিতে পারেন? আপনার টার্মিনাল থেকে আমার কম্পিউটার ইনফরমেশন সার্ভিসকে জিজ্ঞেস করলে পেয়ে যেতে পারেন।
করছি।
থ্যাংকস। আমার পাসওয়ার্ডে ঢুকে পড়বেন। ডিটেক্ট লিখতে হবেঃ ডি ই টি ই সি টি। তারপর মেনু উল্টে যাবেন যতক্ষণ এনসাইক্লোপিডিয়া পাওয়া না যায়।
বেশ। সাবজেক্ট কি?
বারো।
কী?
বারো নিশ্চয় চেনেন। ছোট জাতের গাধা। ভারবাহী জন্তু।
বুঝেছি।
বারো সম্পর্কে কি কি জানতে চায়, জানাল কিশোর।
লিখে নিলেন মিস্টার সাইমন। জেনে নিয়ে কিশোরকে জানাবেন বলে কেটে দিলেন লাইন।
কথা বলতে বলতেই ছোট অফিসটা চোখ বুলিয়ে নিয়েছে কিশোর। এমনিতে, অন্য কারও ঘরে হলে ঢোকার আগে অনুমতি নিয়ে নিত সে। কিন্তু এখানে ঢুকে কোন অপরাধবোধ হচ্ছে না তার। শুরু থেকেই ওদের সঙ্গে প্রচুর মিথ্যে কথা বলেছে ডজ। কাজেই সত্য জানার অধিকার রয়েছে তিন গোয়েন্দার।
অনেক প্রশ্ন ভিড় জমাচ্ছে কিশোরের মনে। কেন ক্রসওয়ার্ড পাজল প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করে ওকে এখানে আনা হলো? কেন তার প্রতি এই আগ্রহ? কেন মেকসিকান লোকটা তাকে এখানে আসতে বাধা দিতে চাইল? আর শারিই বা কি করে তাকে এভাবে চিনে ফেলল?
আকর্ষণীয় তেমন কিছু পাওয়া গেল না ডজের ড্রয়ারে, সিয়েরা মাদ্রের বড় বড় কয়েকটা ম্যাপ বাদে। ওগুলোতে পেন্সিল দিয়ে আঁকা প্রশ্নবোধকের ছড়াছড়ি। ডজই এঁকেছে হয়তো। সবচেয়ে ওপরের ড্রয়ারটাতে রয়েছে র্যাঞ্চের দলিলপত্র। ওগুলোতে চোখ বোলাতে লাগল সে। নিচের স্বাক্ষরটা দৃষ্টি আকর্ষণ করল তার।
পিরেটো সানচেনজো!
র্যাঞ্চটা তাহলে পিরেটোই ডজের কাছে বিক্রি করেছে এবং তারপরে নিজের র্যাঞ্চেই নিযুক্ত হয়েছে বাবুর্চি এবং রাখাল। ডজের প্রতি তার রাগের একটা ব্যাখ্যা মিলল।
একেবারে নিচের ড্রয়ারে পাওয়া গেল একটা টেপ-রেকর্ডার। ওটা বের করে ভলিয়ুম কমিয়ে প্লে করে দিল কিশোর।
সঙ্গে সঙ্গে চিনতে পারল নিজের গলা। বার বার শুনল নিজের কণ্ঠঃ কাম। হিয়ার। শারি। গিডি। উত্তউ। শারি। কাম। হিয়ার…
কয়েকবার শোনার পর সাবধানে ক্যাসেটটা রিউইন্ড করে ফিতেটা আবার আগের জায়গায় এনে রেকর্ডারটা ড্রয়ারে রেখে দিল সে।
কয়েক মিনিট পরে টেলিফোন বাজল। মিস্টার সাইমন করেছেন। বললেন, রেডি?
হ্যাঁ, বলুন, কিশোর জবাব দিল। কাগজ কলম নিয়ে তৈরি হলো।
এক এক করে প্রশ্নের জবাব বলে গেলেন তিনি, আর প্রতিটি প্রশ্নের নিচে ফাঁকা জায়গায় লিখে নিল কিশোর। লেখা শেষ হলে ধন্যবাদ জানাল লেখককে।
সাইমন বললেন, যে কোন দরকার হোক, টেলিফোন করো। তোমার ওই গাধা, সরি, বারো তোমাকে কোথায় নিয়ে যায় জানার জন্যে আগ্রহী হয়ে রইলাম।
জানাবে, বলে আরেকবার ধন্যবাদ দিয়ে লাইন কেটে দিল কিশোর। মুসা আর রবিনের সঙ্গে এখন আলোচনায় বসতে হবে। কিন্তু ওদের ফিরতে অরও কম করে হলেও ঘণ্টাখানেক লাগবে। অফিস থেকে বেরিয়ে আবার পাল্লাটা লাগিয়ে দিল সে।
সকাল থেকেই শারিকে দেখছে না। প্রশ্নের জবাবগুলো পেয়ে যাওয়ার পর জানোয়ারটা সম্পর্কে আরও আগ্রহী হয়ে উঠেছে। গিয়ে ওটাকে দেখার সিদ্ধান্ত নিল সে।
মাঠেই পাওয়া গেল পিরেটোকে। বারোটার সঙ্গে রয়েছে। পানি ভরছে ওটার গামলায়। কিশোরকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে লাফিয়ে উঠে ছুটে এল জানোয়ারটা। আদর করে ওটার গলায় চাপড়ে দিল সে।
দুপুরের রোদ বড় কড়া। শার্ট খুলে ফেলেছে মেকসিকান লোকটা। কিশোর দেখল, ওর বুক আর পিঠও মুখের মতই একই রকমের বাদামী। বুঝতে পারছে না এটাই কি ওর আসল রঙ, না দীর্ঘদিন রোদের মধ্যে কাজ করার ফলে ওই অবস্থা হয়েছে।
গাধাটাকে দেখিয়ে কিশোর জিজ্ঞেস করল, পায়ের দড়ি খুলে নেয়া হয়েছে কেন?
কারণ তুমি যতক্ষণ আছ আর পালাবে না। অযথা বেঁধে রেখে লাভ কি?
আমি?
স্প্যানিশ ভাষায় যা বলল পিরেটো, তার মানে করলে দাঁড়ায়, ওটা তোমার প্রতি কৃতজ্ঞ।
কেন, কৃতজ্ঞ কেন?
শারির ধারণা তুমি ওর প্রাণ বাঁচিয়েছ। ওরা খুব ভাল জানোয়ার। বিশ্বাসী। কৃতজ্ঞতা বড় বেশি।
বালতি তুলে নিয়ে হাঁটতে শুরু করল পিরেটো। পেছনে চলল কিশোর। তার সঙ্গে গাধাটা। কিন্তু আর কোন প্রশ্নের জবাব দিতে রাজি হলো না মেকসিকান। বলে দিল তার কাজ আছে।
বেশ কয়েকটা ট্রাউট মাছ ধরে আনল মুসা আর রবিন। শিকে গেঁথে সেগুলো দিয়ে কাবাব বানিয়ে দিল পিরেটো। দুপুরের খাবার সময় হঠাৎ করেই যেন পেট ভাল হয়ে গেল কিশোরের, বেশি খেয়ে সকালেরটা পুষিয়ে নিল।
খাওয়ার পর-পরই দুই সহকারীকে বলল, চলো, হেঁটে আসি। বেশি খেয়ে ফেলেছি, হজম করা দরকার।
রবিন আর মুসা দুজনেই বুঝল ওদের সঙ্গে কথা বলতে চায় গোয়েন্দাপ্রধান। কোন প্রশ্ন না করে ওর সাথে চলল ওরা। হাঁটতে হাঁটতে মাঠ পেরিয়ে চলে এল লেকের ধারে ছোট একটা বনের কাছে। ঢুকে পড়ল ভেতরে।
বনের ভেতরে একটুকরো খোলা জায়গা দেখে সেখানে ঘাসের ওপর বসল। মিস্টার সাইমনকে যে ফোন করেছিল সেকথা জানাল কিশোর। পকেট থেকে বের করল প্রশ্নের জবাব লেখা কাগজটা।
দেখে দেখে বলল, বারোদের শ্রবণশক্তি খুব প্রখর। তবে কুকুরের মত চালাক নয়। গন্ধ শুকে চিনতে পারে না। কণ্ঠস্বর শুনে চিনতে পারে। কাউকে পছন্দ করলে তার ভীষণ ভক্ত হয়ে যায়। কণ্ঠ শুনলে সাড়া দেয়।
তারমানে, রবিন বলল, তোমাকে যে পছন্দ করেছে শারি, সেটা সারাজীবনই এক রকম থাকবে? মুচকি হাসল সে।
রেগে গেল কিশোর। বাজে কথা বন্ধ করো তো!..হ্যাঁ, যা বলছিলাম। এই গাধাটার জন্যেই ওই ক্রসওয়ার্ড পাজলের ব্যবস্থা করেছিলেন ডজ। এমন একটা কণ্ঠস্বর খুঁজছিলেন, যেটা একটা বিশেষ মানুষের কণ্ঠের সঙ্গে মিলে যায়। হবে কোন আমেরিকান, আমাদের বয়েসী, যে গাধাটাকে ভালবাসত।
পিরেটো কি বলেছে জানিয়ে বলল সে, সেই মানুষটা বারোটার প্রাণ বাঁচিয়েছিল। সে কে জানি না। টেপে আমার কণ্ঠ শুনে বুঝতে পারলেন ডজ, সেই লোকটার কণ্ঠস্বরের সঙ্গে আমার কণ্ঠের মিল আছে। যে যে শব্দ দরকার সেগুলোই ক্রসওয়ার্ড পাজলের মাধ্যমে কায়দা করে ঢুকিয়ে দিয়েছেন। টেপে আমি জবাব দিয়ে পাঠিয়েছি। শুধু সেই শব্দগুলো বাদে আর সব মুছে ফেলেছেন। সকালে তার ড্রয়ার খুলে টেপটা পেয়েছি। সেই শব্দ নিয়ে গিয়ে শুনিয়েছেন শারিকে। মনে হয় যান্ত্রিক শব্দ চিনতে পারেনি ওটা। কাজেই জ্যান্ত মানুষটারই প্রয়োজন হয়েছে। ডজের। তখন আমাকে এখানে আনার ব্যবস্থা করেছেন। আমার গলা শোনার আগে পর্যন্ত শিওর হতে পারেননি, কাজ হবে কিনা। সেজন্যেই কাল নার্ভাস হয়েছিলেন। ব্যাপারটা জানার জন্যে আর তর সইছিল না তার। নিয়ে গিয়েছিলেন আমাকে গাধাটার কাছে। তারপর যখন জানলেন, নিশ্চয় খেয়াল করেছ কি পরিমাণ উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলেন।
নীরবে কিশোরের কথাগুলো ভেবে দেখল মুসা আর রবিন।
হুঁ, অবশেষে মাথা দোলাল রবিন। যুক্তি আছে তোমার কথায়…
হ্যাঁ, মুসাও একমত হলো। কিন্তু এতসব ঝামেলা করতে গেলে কেন? না হয় একটা গাধার বাচ্চা তোমার স্বর চিনে সাড়াই দিল। এর জন্য এতগুলো টাকা খরচ করবেন ডজ?
মাথা নাড়ল কিশোর। এর জবাব আমারও জানা নেই। তবে একটা কথা বড় বেশি খচখচ করছে মনে।
কি? জানতে চাইল রবিন।
একটা ব্যাপার হতেই পারে, বুঝিয়ে বলল কিশোর। দুজন মানুষের কণ্ঠস্বরে মিল থাকা সম্ভব। ইয়ার্ডের ডাকবাক্সে একটা টেপ পেয়েছিলাম, মুসা, মনে আছে? ওটাতে রেকর্ড করা কণ্ঠস্বরের সঙ্গে আমার গলা মিলে যায়।
আবার নোটের দিকে তাকাল কিশোর। বারোদের দৃষ্টিশক্তিও খুব তীক্ষ্ণ্ণ। মানুষের চেয়ে অনেক বেশি। শুধু যে গলার স্বর শুনে মানুষকে চিনতে পারে, তাই নয়, চেহারা দেখেও পারে।
মাথা ঝকাল রবিন। হ্যাঁ, তার মানে… থেমে গেল সে।
অন্য দুজনও শুনতে পেল শব্দটা। দ্রুত সরে যাচ্ছে পদশব্দ, বনের গভীরে। উঠে দাঁড়াল তিন গোয়েন্দা। পিছু নিল নিঃশব্দে।
কিন্তু ওদের চেয়ে বনটা অনেক ভাল চেনে যে যাচ্ছে। একটু পরেই ওকে হারিয়ে ফেলল ওরা। আর শুনতে পেল না পায়ের শব্দ। কোন শব্দই নেই আর, পাখির ডাক ছাড়া।
ভাগাভাগি হয়ে গিয়ে পুরো এলাকাটা খুঁজে দেখবে ঠিক করল ওরা।
সেই মতই কাজ করল। খুঁজতে খুঁজতে সবার আগে খোলা জায়গাটায় ফিরে এল কিশোর। তারপর এল মুসা। মাথা নেড়ে ইঙ্গিতে জানাল, লোকটাকে পায়নি। বসে পড়ল ঘাসের ওপর।
আরও মিনিট দশেক পর রবিন ফিরল। পকেটে হাত ঢোকানো। মুখে হাসি। এমন একটা ভঙ্গি, যেন জেনে এসেছে কিছু।
দেখেছ নাকি কাউকে? জিজ্ঞেস করল মুসা
না, জবাব দিল রবিন। একটা গাছের গায়ে হেলান দিয়ে বলল, তবে এই জিনিসটা পেয়েছি।
পকেট থেকে হাত বের করল সে। আঙুলে ধরা জিনিসটা দেখাল।
দেখল কিশোর আর মুসা। তিন ইঞ্চি লম্বা একটুকরো উল। মেকসিকান শালের। রঙ লাল।
শারিকে নিয়ে ভাবনা হচ্ছে আমার, পরদিন সকালে নাস্তার টেবিলে বললেন ডজ।
ডিম ভাজা মুখে পুরে দিয়ে মুসা বলল, কি হয়েছে? মন খারাপ? মুখ গোমড়া? আকাশের তারা দেখে খালি?
টেবিলের নিচ দিয়ে ওর পায়ে লাথি মারল কিশোর।
মুসার কথা যেন কানেই যায়নি ডজের। আবার নার্ভাস লাগছে তাঁকে। খাবার প্রায় খেলেনই না। মাঠে থাকলে বিপদে পড়ে যাবে বারোটা।
সকালে ওটাকে মাঠে দেখেছে মুসা। তার মনে হয়েছে আরামেই আছে জানোয়ারটা। তাজা চেহারা। ঘাস খাচ্ছিল। চোখ চকচকে, চামড়া উজ্জ্বল, মসৃণ। ছাউনির বাইরে ছিল, কিশোরকে দেখেই ছুটে এসেছে। গাধার তুলনায় জোরেই ছোটে।
সেসব বলল না কিশোর। বলা যায় না, চুপ করে থাকলে রহস্যের আরেকটা সূত্র ধরিয়ে দিতে পারেন ডজ। নিরীহ ভঙ্গিতে বলল, শারি কি খাচ্ছে না?
ওর খুর নিয়ে ভাবনা হচ্ছে আমার। কফির কাপে চুমুক দেয়ার আগে ভ্রূকুটি করলেন ডজ। জানো হয়তো, বারোদের আদি নিবাস ছিল উত্তর আফ্রিকায়। যা শক্ত, পাথুরে মাটিতে হেঁটে আস্ত মানুষের নখের মতই ওদের খুরও দ্রুত বাড়ে। শক্ত মাটিতে ঘষা লেগে ক্ষয়ে গিয়ে স্বাভাবিক থাকে। কিন্তু এখানকার মত নরম মাটিতে থাকলে বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে গেলেও অবাক হব না। কাপটা নামিয়ে রাখলেন তিনি। আর এ হারে বাড়তে থাকলে খোঁড়া হতে সময় লাগবে না।
ছেটে ফেলা যায় না? জানতে চাইল মুসা। একবার একজনকে ক্ষুর দিয়ে গাধার খুর চেঁচে দিতে দেখেছিল সে।
নাহ! ভুরু কুঁচকেই রেখেছেন ডজ। ওর মত একটা বুনো বারো কাছেই ঘেষতে দেবে না আমাকে। ওর পা ছোঁয়ার চেষ্টা করলেই লাথি মেরে ঘিলু বের করে দেবে আমার।
কিশোর ভাবল, শারি হয়তো তাকে পা ছুঁতে দেবে। চুপ করে রইল সে। ওর মনে হলো কিছু একটা বলতে যাচ্ছেন ডজ। শারির খুরের ব্যাপার নয়, অন্য কিছু।
মনে হচ্ছে, ডজ বললেন, শেষ পর্যন্ত ছেড়েই দিতে হবে ওকে। যেখান থেকে এসেছে সেই পর্বতেই ফিরে যাক। কিশোরের দিকে তাকাল সে। কিন্তু, গোলমালটা হলো, ও এখন যেতে চাইবে না। কারণ তুমি রয়েছ এখানে।
কিশোরের মনে হলো, বহুদিন ধরেই তো আছে শারি, তার খুরও বেড়েছে, তাহলে এতদিন ওকে ছেড়ে দেয়ার কথা ভাবেননি কেন ডজ? তবে জিজ্ঞেস করল না। আপনা-আপনিই সে কথায় যাবেন। আর ওটা একটা জরুরি সূত্র। তিন গোয়েন্দাকে রহস্য সমাধানে এগিয়ে দেবে একধাপ।
কিশোর, ওকে ছেড়ে আসতে হলে তোমাকে সঙ্গে যেতে হবে, চিন্তিত ভঙ্গিতে বললেন ডজ। আসলে, যেতে হবে আমাদের সবাইকেই। ভাবছি, পর্বতের ওদিকটায় ক্যাম্পিং করতে গেলে কেমন হয়? এক এক করে তিন গোয়েন্দার দিকে তাকালেন তিনি। কি বলো?
কিশোরের কাছে ব্যাপারটা একেবারেই হাস্যকর আর ছেলেমানুষী মনে হলো। একটা গাধাকে ছাড়তে সবাই মিলে যাওয়া! রবিনের দিকে তাকিয়ে দেখল সে-ও ওরই দিকে তাকিয়ে আছে। চোখ টিপল কিশোর।
সাথে সাথে বুঝতে পারল রবিন। তিনজনে মিলে একান্তে আলোচনা না করা পর্যন্ত ব্যাপারটা নিয়ে কথা বলতে মানা করছে গোয়েন্দাপ্রধান।
ডজের দিকে তাকাল রবিন। ঠিক আছে। আমরা জানাব আপনাকে।
কখন? উদ্বিগ্ন হয়ে জানতে চাইলেন ডজ। কত তাড়াতাড়ি…
যত তাড়াতাড়ি আমরা মনস্থির করতে পারব, জবাব দিল মুসা। উঠে দরজার দিকে রওনা হলো সে। দরজার কাছে গিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, কিশোর, চলো ঘুরে আসি।
ইঙ্গিতটা বুঝতে পারলেন কিনা ডজ, কে জানে। চুপ করে রইলেন।
কিশোর আর রবিনও উঠে মুসার পেছনে চলল। বারান্দা থেকে নেমে মাঠের দিকে এগোল তিনজনে। ঘর থেকে যাতে না শোনা যায় এতটা দূরে এসে থামল।
মনে হয় আসল সময় এসে গেছে, ঘাসের ওপর বসে বলল রবিন। পর্বতে যাওয়ার অন্য কোন উদ্দেশ্য আছে। কিশোর, তোমার কি মনে হয়?
আছে, মাথা কঁকাল কিশোর। আর সেটার জন্যেই আমাকে প্রয়োজন ডজের। আমার কণ্ঠ তার প্রয়োজন। যাতে শারি পালিয়ে না যায়। কোথাও আমাদেরকে নিয়ে যাবে গাধাটা। পর্বতের কোন জায়গায়, যেখান থেকে এসেছে।
কোনখান থেকে এল? দূরের উঁচু পাহাড় চূড়ার দিকে তাকিয়ে আছে মুসা। কি আছে ওখানে? স্বর্ণ?
কিংবা সিয়েরা মাদ্রের গুপ্তধন, কিছুটা ব্যঙ্গের সুরেই বলল রবিন। একটা ঘাসের ডগা ছিড়ে নিয়ে দাঁতে কাটতে লাগল। তো, কি ভাবছ, কিশোর? যাবে?
আমি তো যাবই, কিশোরের আগেই বলে উঠল মুসা। ক্যাম্পিং ওর ভীষণ ভাল লাগে। রাতে আগুনের ধারে বসে মাংস ঝলসে খাওয়া, খোলা আকাশের নিচে স্লীপিং ব্যাগের ভেতরে ঘুমানো আহ, কি মজা! তোমরা যাবে না? পথ নিশ্চয় খুব খারাপ হবে।
খারাপ মানে? রবিন বলল। খারাপের চেয়ে খারাপ। পাথর আর বালির ছড়াছড়ি। কিশোরের দিকে তাকাল। তুমি কি বলো?
বেড়াতে খারাপ লাগে না কিশোরের। যেতে কষ্ট হবে। কি আর করা। রহস্যের সমাধান করতে গেলে খাটুনি তো একটু লাগবেই। যত কষ্টই হোক, ভাবল সে, এই রহস্যের কিনারা করেই ছাড়বে।
যাব, রবিনের কথার জবাবে বলল কিশোর। চলো, ডজকে গিয়ে জানাই।
ডজের জন্যে এটা সুখবর। মুসা বলতেই চওড়া হাসি হাসলেন। তাহলে কালই রওনা হওয়া যাক, কি বলো? রাজি হলো তিন গোয়েন্দা।
হাসিমুখে বেরিয়ে গেলেন ডজ। গাড়ি নিয়ে চলে গেলেন লারেটোতে, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার জন্যে। তিন গোয়েন্দা চলে গেল একেক জন একেক কাজে। মুসা গেল লেকে মাছ ধরতে। রবিন বারান্দায় বসল ওর মেকসিকোর ইতিহাস নিয়ে। কিশোর চলল পিরেটোর খোঁজে।
রান্নাঘরে পাওয়া গেল ওকে। একটা ওয়াকি-টকি মেরামত করছে। সব যন্ত্রপাতি খুলে ছড়িয়ে ফেলেছে, কিন্তু জোড়া লাগাতে পারছে না আর।
নাহ, আমাকে দিয়ে এসব হবে না! আনমনেই বিড়বিড় করল লোকটা। আমি রেডিওর কি বুঝি? গাধার মত খুলতে গেছি! আমি হলাম গিয়ে ঘোড়ার রাখাল। ইলেক্ট্রনিক্সের কি বুঝি?
দেখি, আমার কাছে দিন, হাত বাড়াল কিশোর। এসব মেরামত করতে পারি। কি হয়েছিল?
বোবা হয়ে গিয়েছিল। একেবারে চুপ।
ঠিক করে কি করবেন?
ওয়াকি-টকি দিয়ে কি করে? কথা বলব।
এখানে এই জিনিস আর কারও কাছে আছে নাকি? কার সঙ্গে কথা বলতে চায় পিরেটো, ভেবে অবাক হলো কিশোর। লেকের অন্য পাড়ের টাওয়ারটা ছাড়া আশপাশে আর কোন বাড়িই চোখে পড়েনি তার। র্যাঞ্চের কয়েক মাইলের মধ্যে নেই।
জানি না, জবাব দিল পিরেটো।
তাহলে ঠিক করতে চাইছেন কেন?
আরে! নষ্ট হলে ঠিক করব না?
তার জবাবে সন্তুষ্ট হতে পারল না কিশোর। আর প্রশ্ন না করে জিনিসটা নিয়ে বসল। গোলমালটা কোথায় খুঁজে বের করার চেষ্টা করল। মেরামত করতে সাধারণত যে ধরনের তার ব্যবহার হয়, সেটা পেল না। তাই ইলেকট্রিকের তারের ভেতরের সরু তার বের করে নিয়ে কাজ চালানোর চেষ্টা করতে লাগল।
অনেক আমেরিকানের সঙ্গেই আপনার পরিচয় আছে মনে হয়, কাজ করতে করতে বলল কিশোর। অল্প বয়েসী কজনের সঙ্গে জানাশোনা আছে?
নেই, গভীর আগ্রহে কিশোরের কাজ দেখছে পিরেটো। দারুণ হাত তো তোমার! আমেরিকার সবাই পারে নাকি?
সবাই পারে না। কেউ কেউ পারে। তথ্য জোগাড়ের জন্যে আবার প্রশ্ন করল কিশোর, অল্প বয়েসী কোন আমেরিকান এই র্যাঞ্চে ছিল নাকি? বেড়াতে-টেড়াতে এসেছিল?
কবে?
তিন-চার মাসের মধ্যে? শারি যখন এল তখন?
হাত ওল্টাল পিরেটো। কত লোকই তো যায় এপথে। মাঝেসাঝে থামে।
ওদের কারও গলার স্বর কি আমার মত ছিল? মনে আছে?
চেহারার কোন ভাবান্তর হলো না মেকসিকান লোকটার। তবে তার কালো চোখজোড়া হাসছে। উত্তর আমেরিকার সমস্ত মানুষকে একরকম লাগে আমার।
আমি গলার স্বরের কথা জিজ্ঞেস করেছি। যাই হোক, আপনার কাছে একরকম লাগলেও শারির কাছে নিশ্চয় তা লাগে না।
মানুষের চেয়ে বারোর কানের ক্ষমতা অনেক বেশি।
নাহ, সুবিধে হচ্ছে না। কিশোর তথ্য জোগাড় করতে চাইছে এটা বুঝে ফেলেছে পিরেটো। কাজেই মুখ খুলছে না। চাপাচাপি করে লাভ নেই।
যন্ত্রটা মেরামত করে জোড়া লাগিয়ে ফেলল কিশোর। সুইচ অন করল। কল সাইন দিয়ে কোন সাড়া মিলল না। অনেক ভাবে অ্যান্টেনা ঘুরিয়ে দেখল, জবাব এল না। তবে ওয়াকি-টকিটা যে কাজ করছে তাতে সন্দেহ নেই। সাড়া যেহেতু মিলছে না, তার মানে আর কারও কাছে ওয়াকি-টকি নেই। কিংবা হয়তো অন করা নেই।
হয়ে গেছে, বলল সে।
তোমরা আমেরিকানরা বড় চালাক।
কিছু কিছু ব্যাপারে আমেরিকানরা চালাক বটে, তবে কিছু ব্যাপারে আবার বোকাও, ভাবল কিশোর। যাই হোক, সে শুধু আমেরিকান নয়, বাঙালীও। আগামী দিন সকালে ওই মেকসিকান লোকটার চালাকি ধরতে চাইলে ওর আগেই ঘুম থেকে উঠতে হবে তাকে।
ওয়াকি-টকিটা তুলে নিয়ে কিশোরকে ধন্যবাদ জানাল পিরেটো। তারপর কিশোরের হাতটা ধরে আন্তরিক ভঙ্গিতে ঝাঁকিয়ে দিল। সময় করে একদিন অনেক কথা বলব তোমার সঙ্গে। একদিন, যখন… ফোন বেজে ওঠায় বাধা পড়ল তার কথায়। জবাব দেয়ার জন্যে অফিসে চলে গেল। ফিরে এল মুহূর্ত পরেই। তোমার ফোন।
নিশ্চয় ভিকটর সাইমন, ভাবল কিশোর। এখানে আর কারও তাকে ফোন করার কথা নয়।
কিন্তু মিস্টার সাইমন নন। সাড়া দিল একটা মহিলা কণ্ঠ। আমেরিকান। কিশোর পাশা?
হ্যাঁ, কে বলছেন?
তা না জানলেও চলবে। বললেও চিনবে না। তোমাকে একটা জিনিস দেখানো দরকার। তোমার জন্যে খুব জরুরি।
উত্তেজিত হয়ে উঠল কিশোর। কোন কেস হঠাৎ করে নতুন মোড় নিলে এরকম হয় তার। এখানে, র্যাঞ্চে চলে এলেই পারেন।
না! র্যাঞ্চের ব্যাপারে ভীত মনে হলো মহিলাকে। ডজ মরগানের র্যাঞ্চে যাওয়া উচিত হবে না আমার। বিপদে পড়ে যাব।
ডজ বাড়িতে নেই। ল্যারেটোতে গেছেন।
না, তবু যেতে পারব না, ভয় কাটাতে পারছে না মেয়েটা। অন্য কেউ দেখে বলে দিতে পারে ডজকে। আমি তোমার সঙ্গে দেখা করতে চাই। লেকের অন্য পাড়ে চলে এসো।
কি করে যেতে হবে বলে দিল মহিলা। র্যাঞ্চ ছাড়িয়ে কয়েক শো গজ গেলে লেকের পাড়ে একটা নৌকা দেখতে পাবে কিশোর। দাঁড় বেয়ে অন্য পাড়ে গিয়ে উঠে পড়বে ওপরে। বনের ভেতর দিয়ে গির্জার টাওয়ারের কাছে গেলে ছোট একটা গ্রাম দেখতে পাবে। গ্রামের প্রধান চত্বরে অপেক্ষা করবে মহিলা।
একা আসবে, বলে দিল মহিলা। কেউ যদি তোমার সঙ্গে থাকে, কিংবা আসার সময় কেউ তোমাকে দেখে ফেলেছে বলে মনে হয় আমার, লুকিয়ে পড়ব। আর আমাকে দেখতে পাবে না।
কি দেখাতে চাইছেন? জবাব নেই।
কেটে দিয়েছে লাইন।
বারান্দায় এল কিশোর। একমনে মেকসিকোর ইতিহাস পড়ছে রবিন। সাড়া পেয়ে ফিরে তাকাল।
কি?
মহিলার কথা জানাল কিশোর।
হয়তো সেই আমেরিকানের ছবি দেখাবে, আন্দাজ করল রবিন। শারি যার ভক্ত।
শ্রাগ করল কিশোর। তারও এ কথাই মনে হয়েছে। তবে সেটা শুধুই অনুমান।
আমি আসব? জিজ্ঞেস করল রবিন।
একা যেতে বলেছে, জানাল কিশোর।
হুম! তাহলে তো, আর কিছু করার নেই। যাও। লোকজন জোগাড় করে রাখতে পারে। সেক্ষেত্রে তোমার জুডো ব্যবহার করতে হবে আর কি। হাসল রবিন।
জবাব দিল না কিশোর। নেমে পড়ল বারান্দা থেকে। লেকের দিকে চলল। লেকের পাড়ে এসে মুসাকে দেখতে পেল না। কোথায় বসল?
নৌকাটা খুঁজে পেল সহজেই। কাঠের ছোট একটা ডিঙি। সীটের নিচে ঢুকিয়ে রাখা হয়েছে একটা দাঁড়। নৌকাটাকে পানিতে ঠেলে দিয়ে লাফিয়ে উঠে বসল তাতে। দাঁড়ের আংটার মধ্যে ঢুকিয়ে দিল দাঁড়টা।
বাইতে শুরু করল সে।
যতটা সহজ হবে ভেবেছিল ততটা হলো না। নাক সোজা রাখতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে। কারণটা বুঝতে পারছে। তীরে দাঁড়িয়ে অতটা বোঝা যায় না। পানিতে স্রোতের খুব জোর।
বেশি চাপাচাপি করতে গিয়ে হঠাৎ মট করে ভেঙে গেল দাঁড়টা। একটানে স্রোত ভাসিয়ে নিয়ে গেল ভাঙা অংশটাকে। হাতের টুকরোটার দিকে বোকা হয়ে তাকিয়ে আছে কিশোর। পুরানো মনে হয়েছিল তখনই, কিন্তু পচে যে এতটা নরম হয়ে আছে কল্পনাই করতে পারেনি।
দাঁড় দিয়ে নৌকা সোজা রাখতে কষ্ট হচ্ছিল, এখন তো রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল। লেজ চুলকালে সেটাকে কামড়ানোর জন্যে কুকুর যেভাবে এক জায়গায় ঘুরতে থাকে তেমনি করে ঘুরতে লাগল নৌকাটা। নানা ভাবে চেষ্টা করে দেখল কিশোর। কোন কাজ হলো না। স্রোতের টানে ভেসে চলল।
স্রোতের টানে লেকের মাঝামাঝি চলে এসেছে নৌকা, দুই তীরই এখন সমান দূরত্বে। স্রোতের দয়ার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ভাঙা বৈঠা দিয়ে নৌকা বাওয়ার প্রাণপণ চেষ্টা চালাল কিশোর। লাভ হচ্ছে না।
সাহায্যের জন্যে চিৎকার করবে কিনা ভাবল। কিন্তু তাতেই বা কি লাভ? তার চিৎকার পিরেটো কিংবা রবিনের কানে গেলেও আরেকটা নৌকা ছাড়া ওরা এসে সাহায্য করতে পারবে না তাকে।
ছুটে চলেছে নৌকা। লেক বেয়ে গিয়ে পড়বে নদীতে।
সাঁতার ভাল জানে কিশোর। ডাইভ দিয়ে পড়ে ডুব সাঁতার দিয়ে তীরে ওঠার চেষ্টা করতে পারে। মনে পড়ল পিরেটোর হুঁশিয়ারি। পানিতে গোসল করার চেষ্টা কোরো না, কয়েক মিনিটের বেশি এই পানিতে টিকতে পারবে না কোন মানুষ। পানিতে হাত ডুবিয়ে দিয়ে বুঝতে পারল কিশোর, মিথ্যে বলেনি মেকসিকান লোকটা। বরফের মত ঠান্ডা পানি।
যতক্ষণ নৌকায় রয়েছে ততক্ষণ জমে মরার ভয় অন্তত নেই। স্রোত ভাসিয়ে নিয়ে যাবে নদীতে। কতক্ষণ লাগবে যেতে?
গাছপালার আড়ালে অদৃশ্য গ্রামটার কথা ভাবল সে। হয়তো ওখানে কারও নৌকা আছে।
আর কোন উপায় না পেয়ে শেষে বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকারই শুরু করল কিশোর। স্প্যানিশ ভাষায়। কিন্তু দুপুরের এই প্রচন্ড গরমের সময় লেকের তীর নির্জন। একটা মানুষকেও চোখে পড়ল না। ঘেউ ঘেউ করে উঠল একটা কুকুর। কোন মানুষ সাড়া দিল না।
মাথা ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করল কিশোর। বুদ্ধি একটা বের করতে হবে। নদীতে হয়তো এমন জায়গা আছে, যেখানে পানির গভীরতা কম। তাহলে হয়তো কোনমতে উঠে যেতে পারবে তীরে।
এখান থেকে বোঝা যাবে না পানি কতটা গভীর। নদীতে গেলে তার পর। মোহনা আর বেশি দূরে নেই। দেখা যাচ্ছে। কিন্তু নদীটা কোথায়?
তাই তো! কোথায়! উধাও হয়ে গেছে নাকি!
বুঝে ফেলল হঠাৎ। লেকটা সোজাসুজি নদীতে পড়েনি। কারণ লেকের সমতলে নেই নদীটা। তারমানে জলপ্রপাত হয়ে নদীতে ঝরে পড়ছে লেকের পানি। সর্বনাশ!
কিশোর!
চমকে ফিরে তাকাল কিশোর। তীরে দাঁড়িয়ে আছে মুসা। সে তাকাতেই ছিপ নাড়ল।
দাঁড় ভেঙে যাওয়ার কথা নিশ্চয় জানে না মুসা। কিন্তু বুঝতে পারছে কি ভয়ানক বিপদে পড়েছে তার বন্ধু। কিশোর দেখতে পাচ্ছে না, কিন্তু সে পাচ্ছে, তিরিশ ফুট নিচে রয়েছে নদী। প্রচুর পাথর আছে ওখানটায়। পাক খেয়ে খেয়ে ঘুরছে পানি। নৌকা নিয়ে ওখানে পড়লে আর বাঁচতে হবে না। পাথরে লেগে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে ডিঙি…
দৌড় দিল মুসা। লেকের পাড় ধরে প্রপাতের দিকে। যেখান থেকে ঝরে পড়ছে পানি, তার কিনারে এসে থমকে দাঁড়াল। আর বড় জোর ষাট গজ মত পেরোতে হবে কিশোরকে, তারপরেই পৌঁছে যাবে সে যেখানে রয়েছে সেখানটায়।
সুতোর রিলের ক্যাচটা রিলিজ করে দিল মুসা। ছিপটা তুলে ধরল মাথার ওপর। একটা সুযোগ পাবে সে। মাত্র একটা। দ্বিতীয়বার চেষ্টা করার সময়ই মিলবে না আর। শক্ত হয়ে দাঁড়াল সে। ডিঙিটার অপেক্ষায়।
সামনে চলে এল নৌকা। মাথার ওপর ছিপ ঘুরিয়ে বড়শি আর সীসা বাঁধা সুতোর মাথাটা যত জোরে সম্ভব ছুঁড়ে দিল লেকের পানির ওপর দিয়ে।
কিশোরের মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গেল সীসাটা। পড়ল গিয়ে ওপাশের পানিতে। হাত বাড়িয়ে সুতোটা ধরে ফেলল সে।
টেনো না! সাবধান করল মুসা, ছিড়ে যেতে পারে! সীসাটা ধরে রাখ শুধু। সুতো ধরে পানি থেকে সীসাটা টেনে তুলে ধরে রাখল কিশোর।
খুব হুঁশিয়ার হয়ে আস্তে আস্তে সুতো গোটাতে আরম্ভ করল মুসা। এক ইঞ্চি এক ইঞ্চি করে, এমন ভাবে, যাতে টান খুব কম পড়ে। অনেক বড় মাছ যেভাবে খেলিয়ে তোলে অনেকটা তেমনি করে। নাইলনের সুতো যথেষ্ট শক্ত, কিন্তু তারপরেও যে-কোন মুহূর্তে ছিড়ে যেতে পারে।
সুতোয় টান লাগছে, আর একটু একটু করে এদিকে ঘুরে যাচ্ছে নৌকার গলুই।
সুতো আরও কয়েক ফুট গুটিয়ে ফেলতে পারল সে।
মাঝখানের চেয়ে তীরের কাছাকাছি স্রোত অনেক কম। সেখানেই নিয়ে আসার চেষ্টা করছে মুসা।
আরও কিছুটা গোটাল। কমে আসছে নৌকা আর তার মাঝের দূরত্ব। স্রোতের টান থেকে প্রায় বেরিয়ে এসেছে নৌকাটা।
সুতো ছিড়ল নৌকাটা তীর থেকে দশ গজ দূরে থাকতে। তবে এখন আর অতটা ভয় নেই।
ভাঙা দাঁড়টা দিয়ে জোরে জোরে বাইতে শুরু করল কিশোর। কিন্তু দাঁড়ের চ্যাপ্টা মাথার বেশির ভাগটাই ভেঙে যাওয়ায় পানিতে তেমন চাপ রাখতে পারছে না ওটা।
সুতোর টানে যেমন ইঞ্চি ইঞ্চি করে এগিয়েছিল নৌকা, এখনও তেমনিই এগোতে লাগল।
তারপর হঠাৎ করেই ভাঙা ডান্ডার মাথা দিয়ে মাটি নাগাল পেয়ে গেল কিশোর। লগি দিয়ে বাওয়ার মত করে বাইতে শুরু করল সে। আরেকটু এগোল নৌকা। পানি ওখানে ফুটখানেক গভীর। লাফিয়ে নেমে পড়ল সে। গলুই ধরে টেনে নৌকাটাকে টেনে নিয়ে এল কিনারে।
দৌড়ে এল মুসা। ওকে নৌকাটা ডাঙায় তুলতে সাহায্য করল।
থ্যাংকস! এছাড়া বলার মত আর কিছুই তখন খুঁজে পেল না কিশোর।
আজকে সবচেয়ে বড় মাছটা ধরলাম, হেসে বলল মুসা। পিরেটোকে বলব, তোমাকে যেন শিকে গেঁথে কাবাব বানিয়ে দেয়। লাঞ্চে খেতে পারব।
আরেকটু হলেই কবরে যাওয়ার ব্যবস্থা হয়ে গিয়েছিল।
পায়ের শব্দ শোনা গেল। দুজনেই দেখল দৌড়ে আসছে রবিন। কিশোর ওকে রেখে চলে আসার পর পড়ায় আর মন বসাতে পারেনি। কৌতূহল চাপতে না পেরে কিশোর কি করে দেখার জন্যে চলে এসেছিল লেকের ধারে। দেখেছে, অসহায় হয়ে নৌকায় করে ভেসে চলেছে গোয়েন্দাপ্রধান। ওকে বাঁচানোর কোন বুদ্ধিই বের করতে পারেনি সে।
দারুণ, মুসা, কাছে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল রবিন। একটা কাজ করেছ। হলিউডের পরিচালকরা ওরকম একটা দৃশ্যের শট নিতে পারলে বর্তে যেত।
হাসল মুসা। আমি তো ভেবেছিলাম দ্য ট্রেজার অভ দ্য সিয়েরা মাদ্রের শুটিং হবে, তুমি বানিয়ে দিলে জজ! মুশকিল হলো, এই কথাটা কিছুতেই শোনানো যাবে না মেরিচাচীকে। বাহবা নিতে গিয়ে বকা খেয়ে মরব, কেন তোমাকে একলা যেতে দিলাম এই জন্যে।
কিশোরও হাসল। এই না হলে বন্ধু! বসে পড়ে ভেজা জুতো আর মোজা টেনে টেনে খুলছে সে। পানিতে মাত্র কয়েক সেকেন্ড ছিল, তাতেই নীল হয়ে গেছে ঠান্ডায়। ভাগ্যিস সাঁতরে তীরে পৌঁছার চেষ্টা করেনি।
রিলের হাতল ঘুরিয়ে সুতোটা গুটাতে লাগল মুসা। রবিনকে বলতে লাগল কিশোর, কি ঘটেছে। মুসাও শুনছে ওর কথা। টেলিফোনে অচেনা কণ্ঠ। তারপর দাঁড় ভেঙে যাওয়া। কি যেন একটা রহস্য আছে বলে মনে হচ্ছে তার।
জিজ্ঞেস করল মুসা, স্রেফ ভেঙে গেল?
গেল। এতটাই পচা ছিল। ইচ্ছে করেই হয়তো রেখেছে ওই জিনিস। ডান্ডার মাথা পরীক্ষা করে দেখে বলল কিশোর, যাতে জোরে চাপ লাগলেই ভেঙে যায়। আমাকে খুন করতে চেয়েছে। এমন কায়দা করেছে, সবাই যাতে মনে করে ব্যাপারটা একটা দুর্ঘটনা।
রবিনের দিকে তাকাল সে। কাউকে দেখেছ লেকের পাড়ে?
নৌকার কিনারে বসেছে রবিন। মাথা ঝাকাল। দেখেছি। অন্য পাড়ে। একজন মহিলা। একপলক দেখলাম, তারপরেই হারিয়ে গেল বনের ভেতরে। মনে হচ্ছিল, তোমার ওপর নজর রেখেছিল সে। তুমি তখন প্রপাতের দিকে চলেছ।
দেখতে কেমন? জিজ্ঞেস করল মুসা। বলেই মাথা নাড়ল, না না, বলার দরকার নেই, বুঝতেই পারছি। সেই মেকসিকান মহিলা। লাল শাল পরেছিল যে।
মাথা নাড়ল রবিন। না। ও নয়। আমার কাছে একে আমেরিকান মনে হয়েছে। নীল জিনস পরনে, গায়ে হালকা রঙের শার্ট আর…
আর সোনালি চুল, বলে দিল কিশোর। অবাক হলো রবিন। অতি-মানবিক কোন ক্ষমতা আছে নাকি তোমার!
পরদিন সকালে পর্বতে যাওয়ার জন্যে তৈরি হলো তিন গোয়েন্দা।
জীপের পেছনে বেঁধে লারেটো থেকে একটা হর্স বক্স নিয়ে এসেছেন ডজ। চাকা লাগানো, চারপাশে কাঠের বেড়া দেয়া একটা ঠেলাগাড়ির মত। মাঠ থেকে একটা ঘোড়া ধরে নিয়ে এসেছে পিরেটো। ওটার পিঠে জিন বাঁধতে ওকে সাহায্য করছে মুসা। ঘোড়াটা খুব শান্ত। মুসা যখন ওটাকে টানতে টানতে নিয়ে চলল ট্রেলার হোমে তোলার জন্যে, একটুও বাধা দিল না।
ওটার সঙ্গে রইল সে, পরিচিত হওয়ার জন্যে। গলা চাপড়ে আদর করল, ডলে উলে চকচকে করে দিতে লাগল চামড়া। পিরেটো আর কিশোর এই সময় গেল শারিকে আনার জন্যে। মেকসিকান লোকটার সঙ্গে একা থাকার সুযোগ পেয়ে খুশিই হলো গোয়েন্দাপ্রধান। সাবধানী পিরেটোর কাছ থেকে কোনভাবে যদি কিছু তথ্য জোগাড় করতে পারে।
লেকের ধারে ওই যে নৌকায় উঠেছিলাম আমি, জিজ্ঞেস করল কিশোর। ওটা কি সব সময়ই ওখানে থাকে?
নৌকা তাহলে আর কোথায় রাখবে? রান্নাঘরে?
ওটা কার?
এই র্যাঞ্চের।
কেউ কি ব্যবহার করে?
মাঝেসাঝে।
কি কাজে?
মাছ ধরার কাজে।
ভীষণ চালাক লোকটা। এভাবে ওর কাছ থেকে তথ্য জোগাড় করতে পারবে বলে মনে হলো না কিশোরের। তবে একটা কথা জানতে হবে যে করেই হোক।
লেকের অপর পাড়ে সোনালি চুলওয়ালা যে আমেরিকান মহিলাকে দেখেছে, নিশ্চয় সে-ই ফোন করেছিল ওকে, সন্দেহ নেই। হতে পারে ওই মহিলাই পচা দাঁড়টা রেখেছিল। কিন্তু তাহলে ওই দাঁড় দিয়ে নৌকাটাকে এপাড়ে আনল কি করে? আর সে নিজেই বা ফিরে গেল কিভাবে?
ওপাড়ের গায়ে যেতে চাইলে, চেষ্টা চালিয়ে গেল কিশোর, কিভাবে যাবেন?
হেঁটে।
কিন্তু লেক তো অনেক গভীর। হাঁটা যায়?
ওদিকটায় অত গভীর নয়। নদীর উজানের দিকে দেখাল পিরেটো। তাছাড়া বড় বড় পাথর আছে, ওগুলোর ওপর দিয়েই হাঁটা যায়।
মাথা ঝাঁকাল কিশোর। জবাব এটাই হবে। ওই পাথরের ওপর দিয়েই হেঁটে পার হয়ে গেছে আমেরিকান মহিলাটা। আর রাতের বেলা বারান্দায় ওর সঙ্গেই হয়তো কথা বলেছিল পিরেটো। তারমানে ওকে চেনে সে।
গায়ে আপনার কোন বন্ধু আছে নাকি?
একজনকে চিনি। বার আর ক্যানটিনার মালিক, আমার খালাত ভাই।
কোন আমেরিকানকে চেনেন না? সোনালি চুলওয়ালা একজন মহিলা?
শারি যে মাঠে থাকে ওটার গেটের কাছে পৌঁছে গেছে ওরা। ফিরে তাকাল পিরেটো। বোকামি করছে ও। সে কথা বলেছিও ওকে। ভীষণ ভয় পেয়েছে। ভয় পেলে লোকে উল্টোপাল্টা কাজ করে বসে। তোমার যে কোন ক্ষতি হয়নি, তাতে আমি খুশি। কিন্তু…
কিশোরের কাঁধে হাত রাখল পিরেটো। পর্বতে গিয়ে সাবধানে থাকবে। সতর্ক করে দিল সে। ভয়ানক বিপদের জায়গা।
কিশোরকে দেখে উত্তেজিত হয়ে ছুটে আসছে শারি।
দরজা খুলে দেয়া হলো। কিশোরের গায়ে নাক ঘষতে লাগল জানোয়ারটা।
ওটার কানের পেছনটা চুলকে দিল কিশোর। ও-যাই করুক, চুপ করে থাক বারোটা। কিন্তু আর কাউকে কাছেই ঘেঁষতে দেয় না। পিরেটোকেও না। দূর দাঁড়িয়ে আছে সে। কিশোরকে বলল, জিন আর লাগাম ছাড়া চড়তে পারবে। কিন্তু পরানোটাই হলো মুশকিল। যতই পছন্দ করুক তোমাকে, যেই জিন পরাবে মাটিতে গড়াতে শুরু করবে, পিঠ থেকে ওটা খুলে না ফেলে আর থামবে না।
চোখ বড় বড় হয়ে গেল কিশোরের। তাই নাকি?
জীপটা রসদপত্র দিয়ে প্রায় ভরে ফেলেছেন ডজ। বীন আর চালের বস্তা, চিনি, কফি ও প্রয়োজনীয় আরও খাবার নিয়েছেন। ঘোড়ার জন্যে নিয়েছে জই। স্লীপিং ব্যাগ আর রাইফেল নিয়েছেন। মালপত্রের ফাঁকে জায়গা নেই বললেই চলে ওখানেই কোনমতে গাদাগাদি করে বসেছে মুসা আর রবিন। কিশোর বসেছে ডজের পাশে। হাতে লম্বা একটা দড়ি, এক মাথা বাঁধা রয়েছে গাধার গলায় জীপের পেছন পেছন আসছে বারোটা।
গেট থেকে বেরিয়ে এসে ফিরে তাকাল কিশোর। দাঁড়িয়ে রয়েছে পিরেটো কিশোর তাকাতে হাত তুলল। কি বোঝাতে চাইল? সাবধান করল? না গুডবাই?
ঘুরে ঘুরে উঠে গেছে পাহাড়ী পথ। চার-পাঁচ মাইলের বেশি গতি বাড়াচ্ছে না ডজ। যাতে শারির আসতে অসুবিধে না হয়।
বালি আর পাথর বিছানো রয়েছে পথ জুড়ে। এক ঘণ্টা চলার পর সরু হয় এল পথ। ঢুকে গেল পাইন বনের ভেতরে।
আরও এক ঘণ্টা পর জীপ থামালেন ডজ, ইঞ্জিন ঠান্ডা করার জন্যে। পানি পড়ার শব্দ কানে আসছে। দড়ি ছোটানোর জন্যে টানাটানি শুরু করল শারি।
মনে হয় পানি খেতে চাইছে, কিশোর বলল। আমি যাচ্ছি ওর সঙ্গে। নই পালাতে পারে।
বারোটাই ওকে পথ দেখিয়ে নিয়ে এল ছোট একটা পার্বত্য নালার কাছে। টলটলে পরিষ্কার পানি। দেখার পর কিশোরেরও খেতে ইচ্ছে করল। পিপাসা অবশ্য আগেই পেয়েছে। পিরেটোর কাছে শুনেছে, সিয়েরা মাদ্রের ঝর্না থেকে পানি খেতে মানা নেই, তবে বদ্ধ জলাশয় থেকে খাওয়া একদমই উচিত নয়। হাঁটু গেড়ে বসে আঁজলা ভরে পানি তুলে খেতে শুরু করল সে। তার পাশেই মুখ নামিয়ে খাচ্ছে শারি।
পানি খাওয়া শেষ করে পাতা চিবুতে লাগল বারো। ওর জন্যে সঙ্গে করে কিছু আনা হয়নি। ঘোড়ার মত বেছে খায় না বারো, কাজেই ওগুলোর জন্যে তেমন ভাবনা নেই। ছাগলের মত যা খুশি খেতে পারে। পিরেটো একথা বলেছে, কিশোরকে। ঠিকই বলেছে। এখন তার প্রমাণ পাওয়া গেল।
মিনিট কয়েক ঘাস আর লতাপাতা খেল শারি। এই সময় শোনা গেল ডজের ডাক। অধৈর্য হয়ে উঠেছেন। বারোটাকে নিয়ে যাওয়ার জন্যে টানতে লাগ কিশোর। চেঁচিয়ে বলল, আয়, আয়, দেরি হয়ে গেল! কানেই তুলল না ওটা পেট না ভরা পর্যন্ত খেয়েই চলল।
রেগে গেলেন ডজ, কিন্তু কিছু বলারও নেই। বারোটা আসতে না চাই কিশোর কি করবে? সমস্ত রাগ যেন গিয়ে পড়ল ইঞ্জিনের ওপর। স্টার্ট দিয়ে অযথাই এক্সিলারেটর বাড়িয়ে গোঁ গোঁ করালেন কয়েক সেকেন্ড। খাবার বানিয়ে প্যাকেট করে দিয়েছিল পিরেটো। সেগুলো দিয়ে লাঞ্চ করেছে সবাই। রবিন, মুসা আর ডজ খেয়েছেন। কিশোর কেবল বাকি। তার স্যান্ডউইচগুলো নিয়ে বড় বড় কামড় দিয়ে খেতে শুরু করল। জীপ ততক্ষণে চলতে আরম্ভ করেছে। একহাতে গাধার দড়ি ধরে রেখে আরেক হাতে খাচ্ছে কিশোর।
আরও ঘণ্টা তিনেক চলার পর বালিতে ঢাকা সরু পথও অদৃশ্য হয়ে গেল।
এখানে জীপ রেখে যেতে হবে আমাদের, ডজ বললেন।
মালপত্র নামাতে লাগল ওরা। বাক্স থেকে ঘোড়াটাকে নামিয়ে আনল মুসা। হর্সবক্স সহ জীপটাকে পাইন বনের ভেতরে নিয়ে গেলেন ডজ। ডালপাতা দিয়ে ঢেকে দেয়া হলো দুটো গাড়িকেই। ভারি ভারি বোঝাগুলো তোলা হলো ঘোড়ার পিঠে। শারির কাঁধে স্লীপিং ব্যাগগুলো তুলে দিয়ে বেঁধে ফেলল কিশোর।
তুমি আগে আগে যাও, কিশোরকে বললেন ডজ। বারোটাকে ঢিল দিয়ে দাও। ও যেদিকে যায় সেদিকেই যাবে। ওটাই পথ দেখাক।
চট করে বন্ধুদের দিকে তাকাল একবার কিশোর।
আবার শুরু হলো চলা। শারির পিঠে বসল কিশোর। যার যার ব্যাকপ্যাক পিঠে নিয়ে হেঁটে চলল রবিন আর মুসা। সবার পেছনে ঘোড়ায় চেপে আসছেন ডজ।
কয়েক মিনিট চলার পরেই বুঝে গেল কিশোর, গাধার পিঠে চেপে যাওয়াটা কতটা কষ্টকর। একটা মুহূর্তের জন্যে অসতর্ক হতে পারছে না।
দেখতে দেখতে গাছপালার মাথার ওপরে উঠে এল দলটা। ঢালের গায়ে এখন আর গাছ নেই, বন নিচে পড়ছে ক্রমশ। খাঁড়া পাথুরে ঢালে হাঁটতে ভীষণ অসুবিধে হচ্ছে রবিন আর মুসার। বার বার পা পিছলে যাচ্ছে আলগা পাথরে।
শারির কিছুই হচ্ছে না। পিরেটো বলেছে, পাহাড়ি ছাগলের মতই পাহাড় বাইতে পারে বাবোরা। তা তো হলো, কিন্তু কিশোর তো আর ছাগল নয়, বারোও নয়, কাজেই পিঠ থেকে পড়ে যাওয়া এড়ানোর জন্যে শারির গলা জড়িয়ে ধরে রাখতে হলো ওকে। ছেড়ে দিলে গড়িয়ে পড়ে যাবে পিঠ থেকে এবং তারমানে পাহাড় থেকেও গড়িয়ে পড়া।
কষ্ট হচ্ছে কিশোরের, তবে ডজের চেয়ে কম। বারোর মত পাহাড় বাওয়ায় দক্ষ নয় ঘোড়াটা। ঠিকমত ঠিক জায়গায় পা ফেলতে পারছে না। মাঝে মাঝেই এগোতে না পেরে থেমে যাচ্ছে। পিঠ থেকে নেমে তখন এগোনোর জন্যে ওটাকে ঠেলতে হচ্ছে ডজকে। কখনও বা লাগাম ধরে টেনে কোন উঁচু পাথর পার করিয়ে আনছেন। ফলে সময় নষ্ট হচ্ছে। খানিক পরেই দেখা গেল মুসা আর রবিনের প্রায় আধ মাইল পেছনে পড়ে গেলেন তিনি।
সবার আগে রয়েছে কিশোর। আর সবাই অনেক পেছনে। ওদেরকে এগিয়ে আসার সময় দেয়ার জন্যে শারিকে থামতে বলল সে, হয়া! হুয়া!
শুনতেই পেল না যেন বারোটা।
তখন ওটার কানের কাছে চিৎকার করে বলল কিশোর, হয়া! হুয়া! থামার বিন্দুমাত্র লক্ষণ নেই বারোটার। অনেক দিন পর পাহাড়ে চড়ার সুযোগ পেয়েছে বোধহয়, এগিয়ে চলেছে মহা আনন্দে। কারও জন্যে অপেক্ষা করার প্রয়োজনই বোধ করছে না। লাগাম টেনে বোঝাতে চাইল কিশোর, ওর হুকুম মেনে চলা উচিত। পাত্তাই দিল না বারো।
তারপর কিশোর যখন হাল ছেড়ে দিয়েছে, এই সময় হঠাৎ করেই থমকে দাঁড়াল।
এতই আচমকা, আরেকটু হলেই পিঠ থেকে পড়ে যেত কিশোর। যেন ব্রেক কষে দাঁড়িয়েছে জানোয়ারটা। একটা সমতল জায়গার কিনারে এসে পৌঁছেছে। পাথরের ছড়াছড়ি, তার ফাঁকে ফাঁকে গজিয়ে উঠেছে ঘাস। ঠিক সামনেই মাথা তুলেছে একগুচ্ছ ক্যাকটাস।
কিশোর আন্দাজ করল, আবার খেতে চায় শারি। শরীরটা ঢিল করে দিয়ে লাফিয়ে নামল পিঠ থেকে। তার নিজের বিশ্রামের জন্যেও জায়গাটা চমৎকার। ক্যাকটাসের পাশে একটা চ্যাপ্টা মসৃণ পাথর দেখতে পেল। ওটার দিকে এগোতে গেল সে।
সঙ্গে সঙ্গে গলা বাড়িয়ে দিল শারি, পথ আটকাল কিশোরের। পাশ কাটিয়ে সে যখন এগোনোর চেষ্টা করল, তার শার্টের ঢোলা জায়গায় কামড়ে ধরল ওটা।
রেগেই গেল কিশোর। এই, কি হয়েছে? কি করতে চাস? ঘাস খেতে কি মানা করেছি নাকি তোকে! টেনে শার্টটা ছাড়ানোর চেষ্টা করল সে। কিন্তু ধরে রাখল শারি।
হাল ছেড়ে দিল কিশোর। বারোর সঙ্গে পারবে না। ওটা যখন কিছু করবে বলে গো ধরে, কারও সাধ্য নেই সেকাজ থেকে বিরত করে। আপাতত যেখানে রয়েছে সেখানেই থাকতে চাইছে। কিশোরকেও থাকতে বলছে। কাজেই নড়ানো সম্ভব না।
যখন ওটার ঘাড়ে চাপড় দিয়ে আদর করল কিশোর, তখন ছাড়ল শার্ট। কিন্তু পথ ছাড়ল না। যেতে দিতে চায় না কিশোরকে। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে ক্যাকটাসের জটলাটার দিকে।
এই সময় বারোটার কানের দিকে চোখ পড়ল কিশোরের।
ঘাড়ের সঙ্গে একেবারে লেপটে রয়েছে।
ঘাড়ের বড় বড় রোমগুলো লেপটে নেই, সাধারণত যেভাবে থাকে। দাঁড়িয়ে গেছে। ভয়ে কাঁপছে থিরথির করে।