আর ইঞ্চিখানেক এদিক ওদিক হলেই লেগে যেত একটার সঙ্গে আরেকটা, রোলসরয়েসের চাকচিক্য তো বটেই, বডির মসৃণতাও নষ্ট হত অনেকখানি।
দরজা খুলে ভারিক্কি চালে নেমে গেল হ্যানসন। সেডানের ড্রাইভিং সীটে বসা ছোট্ট মানুষটার মুখোমুখি হলো। কড়া দৃষ্টি নোকটার। দোষ তো করেছেই, উল্টে নেমে এসে কৈফিয়ত চেয়ে বসল, হ্যানসন কিছু বলার আগেই।
দেখেশুনে চালাতে পারো না, গরিলা কোথাকার? চেঁচিয়ে উঠল তীক্ষ্ণচোখে। হ্যানসনের ছয় ফুট দুই ইঞ্চির কাছে তাকে এতটুকু মনে হচ্ছে। তা-ও কি দাপট!
দেখো, বাপু, সম্রান্ত ইংরেজের মত কণ্ঠস্বর যথাসম্ভব নিচু রাখল হ্যানসন, দোষটা আমার নয়, তোমার। এত স্পীডে গাড়ি ঘোরায় কেউ? গেট দিয়ে ঢুকতে চায়? আরেকটু হলেই তো দিয়েছিলে দুটো গাড়িকেই নষ্ট করে।
দেখো, গর্জে ওঠার আগে এক পা পিছিয়ে গেল লোকটা, বেশি সামনে থেকে গালমন্দ করার সাহস হচ্ছে না বোধহয়, চাকরের মুখ থেকে উপদেশ শুনতে চাই না।
ভদ্রভাবে কথা বললা, শান্ত কণ্ঠে বলল হ্যানসন। নইলে ভদ্রতা শিখিয়ে দেব। এক চড়ে ফেলে দেব বত্রিশটা দাঁত।
রাগে ঘুসি পাকিয়ে এগিয়ে এল তীক্ষ্ণচোখে।
আলগোছে তার হাতটা ধরে ফেলল হ্যানসন, আরেক হাতে কলার চেপে ধরে শূন্যে তুলে ফেলল। হাস্যকর ভঙ্গিতে ছটফট করতে লাগল লোকটা, করুণ হয়ে উঠেছে মুখচোখ।
সেডানের পেছনের দরজা খুলে নামল, আরেকজন লোক। দামী বেশভূষা। ধমক দিল, টমাস। গাড়িতে যাও। বেশ ভারি গলা, আদেশ দিতে অভ্যস্ত, বোঝ গেল কণ্ঠস্বরেই। কথায় ফরাসী টান। সরু গোঁফ, ঠোঁটের কোণে একটা বড় তিল।
হাত থেকে টমাসকে ছেড়ে দিল হ্যানসন। . পড়ে যেতে যেতে কোনমতে সামলে নিল টমাস। দ্বিধা করল। ফিরে গেল। গাড়িতে। পেছনে আরেকজন বসে আছে, হোঁতকা, কুৎসিত চেহারা দেখছে।
সরি, হ্যানসনকে বলল দ্বিতীয় যে লোকটা বেরিয়ে এসেছে সে, খুব বাজে কাজ করেছে আমার ড্রাইভার। রোলস-রয়েসটার দিকে চোখের ইশারা করে বলল, খুব সুন্দর গাড়ি। রঙ-টঙ নষ্ট হলে আমারই খারাপ লাগত। তা, তোমার মালিক কে? আমার সঙ্গে একটু কথা বলবেন?
একে একে এত দ্রুত ঘটনাগুলো ঘটে গেছে, বাধা দেয়ার বা কিছু করার সুযোগই পায়নি কিশোর। এখন নেমে এল।
আপনি আমার সঙ্গে কথা বলতে চান?
অবাক হলো বিশালদেহী লোকটা। তুমি মানে আপনি এটার মালিক?
তুমি বললে কিছু মনে করব না, বলল কিশোর। হ্যাঁ, আপাতত আমিই মালিক। পরে কি হবে জানি না।
অ। দ্বিধা করছে লোকটা। তুমি মানে, মিস্টার ফোর্ডের সঙ্গে কথা বলতে এসেছিলাম। তুমি কি তার কিছু হও?
তা, বন্ধু বলতে পারেন। এই তো, আমরাও কথা বলে বেরোলাম।
তাহলে হয়তো বলতে পারবে। আচ্ছা, তার বিলি শেকসপীয়ারের. কি অবস্থা?
পাওয়া যায়নি এখনও। খুব মনের কষ্টে আছেন বেচারা।
এখনও পাওয়া যায়নি, লোকটার মুখ দেখে বোঝা গেল না কিছু ভাবান্তর হয়নি চেহারায়। সত্যি খুব খারাপ কথা। কোন খবরই নেই?
না পুলিশের কাছেই যাচ্ছি, কতদূর কি করল, জানতে। আপনার কথা বলব? সাহায্য-টাহায্য করতে চান নাকি?
না না, তাড়াতাড়ি দু-হাত নাড়ল লোকটা, আমার কথা বলার দরকার নেই। আমি মিস্টার ফোর্ডের বন্ধু। এ-পথ দিয়ে যাচ্ছিলাম। ভাবলাম, খোঁজটা নিয়েই যাই। তোমার কাছেই খবর পাওয়া গেল যখন, এখন-আর যাচ্ছি না। তাড়া আছে। আমার, অন্য সময় আসব। যাই।
নাম-ধাম কিছুই বলল না লোকটা, দ্রুত গিয়ে গাড়িতে উঠে ড্রাইভারকে বলল, টমাস, গাড়ি ছাড়ো। হোটেলে চলো।
ইয়েস, স্যার, ঘোৎ ঘোঁৎ করল তীক্ষ্ণচোখো ড্রাইভার। হ্যানসনের দিকে আরেকবার দৃষ্টির আগুন হেনে গাড়ি পিছাতে শুরু করল। ঘুরিয়ে নিয়ে চলে গেল।
খুব চমৎকার সামলেছেন, স্যার, প্রশংসা করল হ্যানসন। আপনার চাকরি করতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করছি, কিশোরের বার বার নিষেধ সত্ত্বেও অতিবিনয় প্রকাশ করে ফেলে সে মাঝেমাঝে, দীর্ঘ দিনের স্বভাব বদলাতে পারে না।
থ্যাংক ইউ, বলে গাড়িতে উঠল কিশোর।
কিশোর, কৌতুহলে ফেটে পড়ছে মুসা, লোকটার সঙ্গে কিশোরের কি কথা হয়েছে শুনতে পায়নি, এত সহজে তাড়ালে কি করে? মনে তো হলো খুব শক্তপাল্লা। ওসব লোককে চিনি আমি, অন্ধকার গলিপথে সামনে পড়লে ঝেড়ে দৌড় দেব। মনে হলো, তুমিই ওকে ভয় পাইয়ে দিয়েছ?
চেপে রাখা নিঃশ্বাস ফোঁস করে ছাড়ল কিশোর। হেলান দিল গদিতে। তেমন কিছু না। শুধু পুলিশের নাম বলেছিলাম।
আজকাল পুলিশ এত ভয় দেখাতে শুরু করেছে লোককে, গাড়ি পিছিয়ে আবার রাস্তায় তুলছে হ্যানসন, সেদিকে চেয়ে বলল মুসা। আগে জানতাম শুধু বদ লোকেরাই ভয় পায়…।
যারা পালাল, তারাও বদলোক, মুসার কথার পিঠে বলল কিশোর। ড্রাইভারের কোটের তলায় নিশ্চয় শোল্ডার-হোলস্টার আছে। খেয়াল করোনি, হ্যানসন যখন ওকে ধরেছে, বগলের তলায় হাত দিতে যাচ্ছিল? খুন খারাপি অপছন্দ করে না সে। .
পিস্তল? ঢোক গিলল মুসা। ব্যবহার করে?
আরেকটু হলেই আজও করে ফেলেছিল। মনিবের জন্যে পারল না। তার মনিব খুব উঁচুদরের লোক, বোঝাই যায়। এমন একজন মানুষ বন্দুকবাজ ড্রাইভার রেখেছে কেন?
প্রায় নিঃশব্দে, মসৃণ গতিতে আবার চলতে শুধু করেছে রোলস-রয়েস।
ভাবছি, গাল চুলকাল মুসা, এসব লোকের সঙ্গে জড়াচ্ছি কেন? একটা সাধারণ কাকাতুয়া খুঁজতে বেরিয়েছিলাম আমরা।
তা বেরিয়েছিলাম, স্বীকার করল কিশোর। তাহলে? আজব এক মোটা লোকের পাল্লায় পড়লাম শুরুতেই। তারপর আরেক লোক, পোশাক-আশাকে ভদ্রলোক, কিন্তু বন্দুকবাজ পোষে। রহস্যময় এক মেকসিকান ফেরিওলার কথাও শুনলাম। সবাই পাখিটার ব্যাপারে আগ্রহী।
মেকসিকান ফেরিওয়ালা বাদে, শুধরে দিল কিশোর। পাখিটা বেচে দিয়ে গেছে, ব্যস। আর আসেনি।
কিন্তু কেন? তোত একটা কাকাতুয়া এমন কি দামী জিনিস, চুরি করার জন্যে, হাতে পাওয়ার জন্যে খেপে উঠেছে সবাই?
তদন্ত করলে জবাব মিলবে। এ-মুহূর্তে তোমার মতই অন্ধকারে আছি আমি।
থাকার দরকারটা কি? গজগজ করল মুসা। আমি বলি কি, শোনো…
হঠাৎ গতি কমে গেল রোলস-রয়েসের।
কি হয়েছে, হ্যানসন? জিজ্ঞেস করল কিশোর।
এক মহিলা। রাস্তায় এসে উঠেছেন। কিছু হারিয়েছেন বোধহয়।
জানালা দিয়ে মুখ বের করল দুই গোয়েন্দা। ততক্ষণে ব্রেক কষে গাড়ি দাঁড় করিয়ে ফেলেছে হ্যানসন।
বেঁটে, গোলগাল এক মহিলা দাঁড়িয়ে আছেন রাস্তার ওপর, গাড়ি-ঘোড়া আসছে কিনা খেয়ালই নেই। ঝোপের দিকে চেয়ে কাকে জানি ডাকছেন। এসো, লক্ষ্মী,
এসো, জলদি এসো। দেখো কি এনেছি। খুব ভাল সূর্যমুখীর বীচি।
বোধহয় কিছু গণ্ডগোল হয়েছে, গাড়ি থেকে নামতে শুরু করল কিশোর। চলো তো, দেখি।
মহিলার দিকে হাঁটতে শুরু করল দুই গোয়েন্দা। কিন্তু কোন খেয়ালই নেই মহিলার : ঝোপের দিকে চেয়ে মুঠো খুলে দেখালেন, কত ভাল লোভনীয় বীচি এনেছেন! …
মাপ করবেন,কাছে এসে বলল কিশোর। কিছু হারিয়েছেন বুঝি?
অ্যাঁ…হ্যাঁ, পাখির মত মাথা একপাশে কাত করে অনেকটা পক্ষীকণ্ঠেই বললেন মহিলা। এই দেখো না, লিটল বো-পীপকে খুঁজি পাচ্ছি না। কোথায় যে গেছে কে জানে? তোমরা নিশ্চয় দেখোনি, না? লিটল বো-পীপকে?
না, ম্যাডাম, জবাব দিল কিশোর। লিটল বো-পীপ কি কোন কাকাতুয়া?
নিশ্চই, বিস্ময় ফুটল মহিলার চোখে। তুমি জানলে কি ভাবে?
পকেট থেকে কার্ড বের করে দিল কিশোর। আমরা গোয়েন্দা। বুঝতে পারছি, কাকাতুয়াই খুঁজছেন আপনি। ওই যে, ঘাসের ওপর চাটা ফেলে রেখেছেন। হাতে সূর্যমুখীর বীচি, ডাকাডাকি করছেন ঝোপের দিকে চেয়ে। কাকাতুয়া ছাড়া আর কি?
আরও বেশি অবাক হলেন মহিলা। বাহ, বেশ বুদ্ধি তো।
তারপর আরও কয়েকবার ডাকাডাকি করে হতাশ হয়ে দুই গোয়েন্দাকে নিয়ে রওনা হলেন বাড়ির দিকে, লিটল বো-পীপের নিখোজের ব্যাপারে খুলে বলবেন।
হ্যানসন, আপনি এখানেই থাকুন, ডেকে বলল কিশোর।
ইট বিছানো পথ ধরে মহিলার পিছু পিছু চলল দুই গোয়েন্দা। সামনে অনেকগুলো কলা-ঝাড়ের ওপাশে একটা বাংলো।
ছোট লিভিং রুমে দুই গোয়েন্দাকে বসালেন মহিলা, নিজেও বসলেন।
মিস বোরো, বলল কিশোর, কয়েক হপ্তা আগে এক মেকসিকান ফেরিওলার কাছ থেকে কাকাতুয়াটা কিনেছিলেন, না?
হ্যাঁ, চোখ বড় বড় হয়ে গেল তাঁর। আমার নামও জানো দেখছি? তুমি তো খুব ভাল গোয়েন্দা।
আগে থেকেই তথ্য জানা থাকলে ওগুলো বলা শক্ত কিছু না। কিশোর জানাল, মিস্টার ফোর্ড আপনার কথা বলেছেন।
তথ্য জানা থাকলেও অনেকেই বলতে পারে না, বললেন মিস বোরা। আর তথ্য জোগাড় করতেও বুদ্ধি লাগে। যাই হোক, মিস্টার ফোর্ড নিশ্চয় বিলিকে খুঁজে পেয়েছেন।
না, পাননি, মুসা বলল। ওকে খুঁজে বের করার চেষ্টা চালাচ্ছি আমরা। আপনারটা হারাল কি করে, বলবেন, প্লীজ?
দোকানে গিয়েছিলাম, মুখ বাঁকালেন মিস বোরো। বীচি ফুরিয়ে গিয়েছিল। সূর্যমুখীর বীচি খুব পছন্দ করে বো-পীপ। গেট দিয়ে বেরিয়েই মরতে বসেছিলাম, প্রায় চাপা দিয়ে দিয়েছিল আমাকে কালো একটা গাড়ি। বিদেশী গাড়ি। আজকাল লোকে যা বেখেয়ালে চালায় না।
একে অন্যের দিকে তাকাল কিশোর আর মুসা। গাড়িটা কার অনুমান করতে কষ্ট হলো না কারোই।
থামতে বললাম, থামল না, বলে গেলেন মিস বোরো। কি আর করার আছে? ভয় পেয়ে পালিয়েছে যখন? দোকানে গিয়ে বীচি কিনলাম। কোন বীচি ভাল, কোনটা খারাপ, খানিকক্ষণ আলোচনা করলাম দোকানের মেয়েটার সঙ্গে। ফিরে এসে দেখি বো-পীপের খাঁচার দরজা খোলা। সে নেই। বোধহয় দরজা খোলাই রেখে গিয়েছিলাম, এই ফাঁকে বেরিয়ে গেছে। ভাবলাম, কোন ঝোপঝাড়ে গিয়ে লুকিয়েছে। খুঁজতে খুঁজতে চলে গেলাম রাস্তায়…তারপর তো তোমাদের সঙ্গে দেখা।
কালো গাড়িটাকে পরে আর দেখেছেন? জিজ্ঞেস করল কিশোর।
না, মাথা নাড়লেন মিস বোরো। সা করে গিয়ে মোড় নিয়ে হারিয়ে গেল। গাছপালা ঝোপঝাড় বেশি, মোড় নিলে আর দেখা যায় না। ভুরু কোঁচকালেন। ওই মোটা লোকটাই চুরি করেছে বলছ নাকি?
তাই তো মনে হয়, ম্যাডাম, বলল কিশোর। আমার ধারণা, বিলিকেও সেই চুরি করেছে।
সর্বনাশ! অসহায় মনে হচ্ছে মহিলাকে। তাহলে তো আর তাকে পাব না। কি নিষ্ঠুর গো। লোকের মনে কষ্ট দেয়। কিন্তু দুটো কাকাতুয়া চুরি করতে যাবে কেন? ইচ্ছে করলে তো কিনেই নিতে পারে।
এই প্রশ্নটার জবাব মুসারও খুব জানতে ইচ্ছে করছে।
কিন্তু জবাব জানা নেই গোয়েন্দাপ্রধানের। আপাতত এটা রহস্য, বলল সে। আচ্ছা; মিস বোরো, আপনার লিটল বো-পীপ কি কথা বলতে পারে?
নিশ্চয় পারে। লিটল বো-পীপ বলে তার ভেড়াটা হারিয়েছে। কোথায় হারিয়েছে, জানে না। খুঁজে দেয়ার জন্যে ডাকাডাকি করে শারলক হোমসকে। অদ্ভুত কথা, তাই না? কাকাতুয়াকে আরও কত রকম বুলিই তো শেখানো যায়।
তা যায়, নোট বই বের করল কিশোর। ঠিক কি কি বলত বলুন তো?
লিটল বো-পীপ হ্যাজ লস্ট হার শীপ অ্যাণ্ড ডাটু নো হোয়্যার টু ফাইণ্ড ইট। কল অন শারলক হোমস।
দ্রুত লিখে নিয়ে বলল কিশোর, কথায় ব্রিটিশ টান আছে?
আছে। মনে হয়, খুব যত্ন করে শিখিয়েছে কোন উচ্চ শিক্ষিত ইংরেজ ভদ্রলোক।
হু। মিস বোরো, যা মনে হচ্ছে আপনার বো-পীপকে হাইমাসই মানে, মোটা লোকটাই চুরি করেছে। পুলিশকে ফোন করে জানান।
পুলিশ? ও, মাই গুডনেস! আঁতকে উঠলেন মহিলা। ফোন নেই আমার।। তাছাড়া পুলিশের ঝামেলায় যাব না। এত দূরে শহরে গিয়ে ওদের সাহায্য চাইতে বলছ? যাক, লাগবে না আমার। অনুরোধ করলেন, প্লীজ, তোমরাই খুঁজে দাও। দেবে?
তা দিতে পারি, বলল কিশোর। একই সঙ্গে দুটো তদন্ত চালানো এমন কিছু কঠিন না, তাছাড়া চোর যখন একজন।
প্লীজ। তোমার কথা চিরদিন মনে রাখব তাহলে। দেবে শুনেই যা ভাল্লাগছে না।
আরেকটা প্রশ্ন, মিস বোরো, তর্জনী তুলল কিশোর ! মেকসিকান ফেরিওয়ালা দুই চাকার একটা গাধায় টানা গাড়িতে করে এসেছিল, না?
হ্যাঁ। খুব কাশছিল। মনে হচ্ছিল, ভারি অসুখ। বেচারাকে দেখে খারাপই লাগছিল।
কাকাতুয়া বিক্রি করে রসিদ-টসিদ দিয়েছে কিছু?
না-তো। ইস্, বড্ড ভুল হয়ে গেছে, শূন্য দৃষ্টিতে তাকালেন মিস বোরো। চাওয়ার কথা মনেই ছিল না।
গাড়ির গায়ে কোন নাম বা কিছু লেখা ছিল?
মাথা নাড়লেন মিস বোরো। আর কোন তথ্য দিতে পারলেন না তিনি।
মহিলাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বেরিয়ে এল দুই গোয়েন্দা।
বাইরে বেরিয়েই কিশোরের বাহু খামচে ধরল মুসা। কিশোর, কাকাতুয়া দুটোকে কিভাবে খুঁজে বের করবে? কোথায় আছে ওরা কিছুই তো জানি না। একজন শেকসপীয়ার জানে, অরেকজন মাদার গুজ। কিন্তু জঙ্গল থেকে ধরে এনে ওই বুলি তো যে কোন কাকাতুয়াকে শেখানো যায়। অযথা সময় নষ্ট করছি, বুঝলে?
চিন্তিত দেখাচ্ছে কিশোরকে। হাইমসকে দেখে কি মনে হয়েছে তোমার? ছেলেমানুষী করার লোক?
মোটেই না, জোরে মাথা নাড়ল মুসা। পিস্তল-চেহারার লাইটার দেখিয়ে যে রসিকতা করতে পারে, সে ছেলেমানুষী করার লোক নয়।
এক্কেবারে ঠিক। অথচ সেই লোকই দুই রকম বুলি আউড়ায় এমন দুটো কাকাতুয়া চুরি করল কি কারণে? জোরাল কোন যুক্তি নিশ্চয় আছে, এখন বুঝতে পারছি না।
কিন্তু তাকেই বা খুঁজে পাব কি করে?
আমরা গোয়েন্দা, বুদ্ধির খেলা খেলি। কোনভাবে..সরো সরো! ঝাঁপিয়ে এসে পড়ল মুসার ওপর, নিয়ে পড়ল মাটিতে।
খানিক আগে মুসার মাথা যেখানে ছিল, শিস কেটে ঠিক সে-পথে উড়ে চলে গেল কি যেন একটা। ঘাসে ঢাকা নরম মাটিতে গিয়ে গাঁথল।
সরো…ওহ, সরো! ঠেলে গায়ের ওপর থেকে কিশোরকে সরাল মুসা, শ্বাস নিতে পারছি না।
উঠে দাঁড়াল কিশোর।
মুসাও উঠল। জোরে জোরে শ্বাস নিল কয়েকবার।
নিচু হয়ে জিনিসটা তুলছে কিশোর। লাল টালির একটা টুকরো, মিস বোরোর বাংলোর ছাতে যে-ধরনের টালি, ওখান থেকেই ভেঙে নেয়া হয়েছে কিনা কে জানে।
এটা মাথায় লাগলে না মরলেও বেহুশ হয়ে থাকতে কয়েক ঘণ্টা, কিশোর বলল। ভাগ্যিস ঝোপের দিকে চোখ পড়েছিল।
থ্যা-থ্যাংকস, কাঁপছে মুসার গলা। ছুড়ল কে?
দেখিনি। হুঁশিয়ার করল। ও চায় না আমরা বিলি কিংবা বো-পীপকে খুঁজি।
রাতের খাওয়া খেতে বসছে রবিন। বার বার তাকাচ্ছে টেলিফোনের দিকে। এই খানিক আগে ফিরেছে লাইব্রেরি থেকে, পার্ট-টাইম চাকরি করে ওখানে।
ইস্ এখনও ফোন করছে না কেন কিশোর?
খাওয়া শেষ হয়ে এসেছে রবিনের, তা-ও ফোন বাজছে না। উঠে গিয়ে সিংকে। প্লেট চোবাল, ধুয়ে পরিষ্কার করে এনে রাখল আবার জায়গামত।
কাছেই কাজ করছেন মিসেস মিলফোর্ড।
মা, বলল রবিন, কিশোর কোন খবরটবর দিয়েছে?
ও, হ্যাঁ হ্যাঁ, মুখ ফেরালেন তিনি। ভুলেই গিয়েছিলাম। একটা মেসেজ আছে।
কি মেসেজ? উত্তেজিত হয়ে উঠল রবিন। কি লিখেছে?
আগের দিন যা যা ঘটেছে, তাকে জানিয়েছে কিশোর। সঙ্গে সঙ্গে রিপোর্টের ফাইল তৈরি করে ফেলেছে রবিন, এটা তার দায়িত্ব। আজ বিকেলে হেডকোয়ার্টারে কাকাতুয়ার রহস্য নিয়েই আলোচনা করার কথা।
এই যে, লিখে রেখেছি, মা বললেন, পকেট হাতড়ে বের করলেন এক টুকরো কাগজ। কি যে সব বলে কিশোর, মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝি না। ভুলে যেতাম, তাই লিখে রেখেছি। এই যে।
ও ওরকম করেই বলে, মাকে বোঝাল রবিন, হাত বাড়াল কাগজটার জন্যে।
বেশি পড়াশোনা করে তো, বড় বড় কঠিন শব্দ আপনাআপনি মুখে চলে আসে। চাচা-চাচীর সঙ্গেও ওভাবেই কথা বলে। বেশিদিন তোমার সঙ্গে ওভাবে বললে
তুমিও বুঝে যাবে, আর উদ্ভট লাগবে না।
কি বলছে, কিছুই বুঝিনি। জোরে জোরে পড়লেন মিসেস মিলফোর্ড, লাল কুকুর চার। উড়ে এসে জুড়ে বসেছে। তীর বরাবর বুকে হাঁটবে। সহজ সহজ বাক্য, অথচ মানে করতে গেলে মনে হয় গ্রীক। কি বুঝিয়েছে রে?
জবাব নেই। রবিন ততক্ষণে পৌঁছে গেছে দরজার কাছে। ডাকলেন মা। এই রবিন, না বলেই চলে যাচ্ছিস যে?
দরজায় দাঁড়িয়ে ঘুরল রবিন, হতাশ ভঙ্গিতে কপাল চাপড়াল, ওফ্ফো, মা, এই সহজ কথাগুলো বুঝতে পারছ না। ইংরেজিই তো লিখেছে।
কোথায় ইংরেজি। কোন ধরনের কোড। এই, বল না। হ্যাঁ, কোডই। বাইরের লোক যাতে বুঝতে না পারে… কি বলছিস তুই, রবিন? মা অবাক। আমি তোর মা, বাইরের লোক?
তোমাকে বাইরের লোক বললাম নাকি? খালি উল্টোপাল্টা বোঝে। ঠিক আছে, কোন্ কথাটা জানতে চাও?
এই যে, উড়ে এসে জুড়ে বসেছে?
কয়েকটা হারানো কাকাতুয়াকে খুঁজছি আমরা, ওটারই কোড : উড়ে এসে জুড়ে বসেছে।
হুঁ, মায়ের আশঙ্কা দূর হলো, ভয়ের কিছু নেই, বিপদ হবে না ছেলের।
যাওয়ার জন্যে অস্থির হয়ে উঠেছে রবিন, মা আবার প্রশ্ন করার আগেই বলল, আর লাল কুকুর চার মানে…
থাক থাক, ওগুলোর মানে আর জানার দরকার নেই, হাত তুললেন মিসেস মিলফোর্ড। যা, বেশী রাত করিস না। গির্জার ফাদারকে দাওয়াত করতে যেতে হবে। আগামী রোববারে আমাদের এখানেই খাবেন।
লাল কুকুর চার হলো তিন গোয়েন্দার হেডকোয়ার্টারে ঢোকার অনেকগুলো পথের একটা। ওটা দিয়ে ঢোকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে মেসেজে।
স্যালভিজ ইয়ার্ডের বেড়ায় নানা রকম ছবি। এক জায়গায় একটা লাল কুকুর বসে আছে, একটা বাড়িতে আগুন লেগেছে, তা-ই দেখছে। কুকুরটার একটা চোখ আসলে কাঠের গিঁট। আলগা। নখ দিয়ে খুঁচিয়ে ওটা বের করে নিল রবিন, ভেতরে আঙুল ঢুকিয়ে গোপন সুইচ টিপল। আস্তে করে তিন দিকে সরে গেল বেড়ার তিনটে অংশ, গোপন দরজার পাল্লা। ভেতরে ঢুকে আবার সুইচ টিপে দরজা বন্ধ করে দিল সে।
এক জায়গায় অনেকগুলো তক্তা আর লোহার বীম আড়াআড়ি পড়ে আছে মনে হয়, ওভাবেই ওগুলো সাজিয়েছে তিন কিশোর। নিচে দিয়ে পথ। বুকে হেঁটে যেতে হয়। ওপরে একটা তীর চিহ্ন। ট্রেলারটা কোনদিকে আছে, তার নির্দেশ।
বুকে হেঁটে এগিয়ে ট্রেলারের নিচে পৌঁছে গেল রবিন। দুইবার টোকা দিতেই ভেতর থেকে তুলে নেয়া হলো একটা পান্না। হেডকোয়ার্টারে ঢুকল সে।
হেডকোয়ার্টার মানে তিরিশ ফুট লম্বা একটা বাতিল মোবাইল হোম, জঞ্জালের তলায় চাপা পড়ে আছে। সেটাকে সারিয়ে নিয়ে অফিস সাজিয়েছে তিন গোয়েন্দা। নানারকম সুযোগ-সুবিধে আছে তার মধ্যে। ছোট একটা ল্যাবরেটরিও আছে, আছে ফটো প্রসেস করার ডার্করুম।
ডেস্কের ওপাশে নির্দিষ্ট চেয়ারে বসে আনমনে একটা পেন্সিল কামড়াচ্ছে কিশোর। রবিনকে দেখে বলল, এত দেরি যে?
মেসেজ দিতে মা ভুলে গিয়েছিল। তবে আগে দিলেও আসতে পারতাম না, খেয়ে আসতে দিত না। কেন ডেকেছ? জরুরী মীটিং?
হ্যাঁ, মাথা ঝাকাল কিশোর। বিলি শেকসপীয়ার আর লিটল বো-পীপকে খুঁজে বের করা দরকার।
কিভাবে, তাই তো মাথায় ঢুকছে না, মুসা বলল। মোটকা হাইমাসকে চিনি, সন্দেহ করছি ওই ব্যাটাই চুরি করেছে। ব্যস! আর কোন সূত্র নেই। পুলিশ চেষ্টা করলে হয়তো গাড়িটা খুঁজে বের করতে পারে, কিন্তু তারা তো শুনলে হাসে। এক কাজ করলে কেমন হয়? গিয়ে পুলিশ চীফ ইয়ান ফ্লেচারকে ধরলে?
ভুলে যাও কেন? ভুরু নাচাল কিশোর। মিস্টার ফোর্ড আর মিসেস বোরো কেউই পুলিশের সাহায্য নিতে রাজি নন।
তাহলে? দু-হাত নাড়ল মুসা। আমি তো কোন উপায়ই দেখছি না।
উপায় একটা আছে।
আছে? এক সঙ্গে গলা সামনে বাড়াল রবিন আর মুসা।
আছে। ভূত-থেকে-ভূতে।
আরে, তাই তো, হাসল রবিন। এই কথাটা মনে পড়েনি!
আমিও একটা আস্ত গাধা, হতাশা চলে গেছে মুসার কণ্ঠ থেকে, উত্তেজনা ফুটেছে চেহারায়। তা এখুনি শুরু করে দিই না। আগামী কাল সকালেই খোঁজ পেয়ে যাব।
তা করতে পারো, রাজি হলো কিশোর।
আচ্ছা, একটা পুরস্কার ঘোষণা করলে কেমন হয়? প্রস্তাব রাখল রবিন।
তাহলে উৎসাহী হবে বাচ্চারা। তাড়াতাড়ি কাজ হবে।
ঠিকই বলছে। কি পুরস্কার দেয়া যায়?
আমি বলছি, হাত তুলল মুসা। বলব, যে আগে খোঁজ দিতে পারবে, তাকে রোলস-রয়েসে চড়িয়ে এক ঘণ্টা ঘোরাব।
মন্দ না, বলল কিশোর। দেখেছি তো, ছেলেমেয়েরা যেভাবে চকচকে চোখে তাকায় গাড়িটার দিকে। তা নাহয় ঘোরালাম। সেই সাথে কিছু নগদের কথাও বলি? এই বিশ-পঁচিশ ডলার? আরও বেশি আগ্রহী হবে।
তা-ই ঠিক হলো। গাড়িতে এক ঘণ্টা চড়ানো, আর পঁচিশ ডলার পুরস্কার।
চালু করে দেয়া হলো ভূত-থেকে-ভূতে।
রাত করতে মানা করে দিয়েছেন মা। উঠল রবিন।
বাড়ি ফিরে দেখল গুম হয়ে বসে আছেন মা, হাতে রিসিভার।
কি হয়েছে, মা? কোন গোলমাল?।
সেই তখন থেকে কতবার চেষ্টা করছি, মিসেস ফেনারকে আসতে বলব। একা কুলিয়ে উঠতে পারব না, অনেক মেহমান আসবেন, আমাকে একটু সাহায্য করবে সে। লাইনই পাচ্ছি না। সব কটা লাইন এনগেজড! কি যে হলো আজ। একটাও খালি নেই।
ঢোক গিলল রবিন। জানে, কেন খালি নেই লাইন। কিন্তু সে-কথা মাকে বলা যাবে না।
আবার ডায়াল ঘোরাতে শুরু করলেন মিসেস মিলফোর্ড। মা এভাবে কষ্ট পাচ্ছেন, খারাপই লাগল রবিনের। কিন্তু কিছুই করার নেই তার এখন। সে নিজে চেষ্টা করলেও লাইন পাবে না।
দোতলায় নিজের ঘ-১ উঠে এল রবিন। কাপড় ছাড়তে ছাড়তে একটা মোটামুটি হিসাব করল : কালো গাড়িটার খোঁজ চেয়ে তারা তিনজনে পাঁচজন করে বন্ধুকে ফোন করেছে। ওরা করবে আরও পাচজনকে, হয়ে গেল পঁচাত্তর। তারা করবে আরও পাঁচজনকে। হয়ে গেল তিনশো পঁচাত্তর। তারা আরও পাঁচ…হলো আঠারোশো পঁচাত্তর…তারা আবার পাঁচ…নয় হাজার তিনশো পঁচাত্তর… আরিব্বাপরে! লস অ্যাঞ্জেলেস আর হলিউডের কোন ছেলেমেয়ের জানতে আর বাকি থাকে না। লুকাবে কোথায় হাইমাস? নাহ্ কিশোরটা একটা জিনিয়াস, বন্ধুগর্বে আধহাত উঁচু হলো রবিনের বুক।
শুয়ে পড়ল রবিন। বালিশে হাত, তার ওপর মাথা রেখে ভাবতে শুরু করল সে। বিলি শেকসপীয়ার, লিটল বো-পীপ আর তাদের বিচিত্র বুলির কথা। গতকাল থেকেই কিছু আছে, কিন্তু ধরতে পারছে না। এখন আরেকবার চেষ্টা করল। টু-টু-টু বি অর নট…আচ্ছা, কাকাতুয়া তোতলাবে কি করে? সে জানে, এর কোন বৈজ্ঞানিক যুক্তি নেই। ইচ্ছে করেই ভুল শেখায়নি তো? কিন্তু সন্তুষ্ট হতে পারল না রবিন, গোলমালটা ধরতে পারছে না। সেটা অন্য কোথাও।
ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ল সে। মাঝরাতে ঘুমের ঘোরেই যেন কানের কাছে বলল কেউ ও লিটল বো-পীপ হ্যাজ লস্ট হার শীপ অ্যাণ্ড ডাজ নট নো হোয়্যার টু ফাইণ্ড ইট। কল অন শার্লক হোমস।
ঘুম ভেঙে গেল রবিনের। অখণ্ড নীরবতা। ভুলটা আবিষ্কার করে ফেলেছে মগজ। তার মনে পড়ল মাদার গুজ-এ লেখা লাইনটা হলো : লিটল বো-পীপ হ্যাজ লস্ট হার শীপ অ্যাণ্ড ডাজনট নো হোয়্যার টু ফাইণ্ড দেম।
দেম-এর জায়গায় ইট বলে কাকাতুয়াটা।
ব্যাপারটা হয়তো বিশেষ কিছুই নয়। কিন্তু কিশোরের কাছে শিখেছে রবিন, গোয়েন্দাগিরিতে অতি সামান্য ব্যাপারও অবহেলা করতে নেই।
হুম, চিন্তিত ভঙ্গিতে মাথা দোলাল কিশোর, ঠিকই বলেছ, রবিন। এক বচন বহুবচন দুটোর বেলাতেই হয় শীপ, তাই ইট বললেও শুদ্ধ, দেমও শুদ্ধ। কিন্তু…
খাইছে! হাত তুলল মুসা। এই, তোমাদের ব্যাকরণ ক্লাস থামাও। গুঙিয়ে উঠল, স্কুলে শুনতে শুনতেই অবস্থা কাহিল…
হেডকোয়ার্টারে আলোচনায় বসেছে তিন গোয়েন্দা। দশটা বাজতে কয়েক মিনিট বাকি। ভুত-থেকে-ভূতের মাধ্যমে খবর আসার সময় হয়েছে।
কিন্তু ভুল করেছে, মুসার কথায় কান দিল না রবিন। যিনি শিখিয়েছেন, ভুল তাঁরই।
কটা ভুল? বলল কিশোর। বিলি শেকসপীয়ার তোতলায়, সেটা একটা ভুল। মাদার গুজ থেকে শেখানো হয়েছে লিটল বো-পীপকে, সেখানে আরেকটা ভুল।
তাতে কি? মুসার প্রশ্ন। মাত্র তো দুটো। এক গ্রামার ক্লাসেই কয়েক ডজন ভুল করি আমি। আর কবিতা মুখস্থ লিখতে দিলে তো….।
সেটা তোমার হয়, বলল কিশোর। কিন্তু উচ্চ শিক্ষিত একজন ইংরেজ ভদ্রলোক এই সাধারণ ভুল করবেন না। একটা হলে ধরে নিতাম, নাহয় হয়ে গেছে কোনভাবে। কিন্তু দুটো? উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মনে হয়।
উদ্দেশ্যপ্র… শূন্য দৃষ্টি ফুটল মুসার চোখে। তাকে দোষ দিতে পারল না রবিন। কিশোর পাশার ভাবনার সঙ্গে সব সময় তাল মিলিয়ে চলা কঠিন। অনেক সময় খুব বেশি শর্টকাটে এগিয়ে যায় তার মস্তিষ্ক।
ইচ্ছে করে ভুল শিখিয়েছেন বলতে চাইছ? জিজ্ঞেস করল রবিন।
হ্যাঁ। দুটো রহস্য আমাদের হাতে। এক : হাইমাস কেন কাকাতুয়া চুরি করছে? দুই? কেন ওগুলোকে ভুল বুলি শেখানো হয়েছে?
মাথায় ঢুকছে না, মাথা নাড়ল রবিন। এত কঠিন বুলি কেন শেখানো হয়েছে, সেটাও তো আরেক রহস্য। এসব কথা সাধারণত লোকে শেখায় না।
গভীর হচ্ছে রহস্য, বাস্তবে নেই যেন কিশোর, কণ্ঠে খুশির আমেজ। জটিল সমস্যা পেয়ে গেছে সে, জট ছাড়াবে ধীরে ধীরে, তাতেই তার আনন্দ। যে-ই শিখিয়েছে, অনেক ধৈর্যের সঙ্গে কষ্ট করে শেখাতে হয়েছে। নিশ্চয় অহেতুক কষ্ট করেনি। আর হাইমাসও বিনা কারণে কাকাতুয়া দুটোকে চুরি করেনি। নিশ্চয় কোন কারণ আছে।
কিশোর! উত্তেজিত মনে হলো রবিনকে। আরও পাখি তো থাকতে পারে? সেই কালো কাকাতুয়াটা? ব্ল্যাকবিয়ার্ড…
আরি সব্বোনাশ! আঁতকে উঠল মুসা। দুটোতেই মাথা ঘুরছে। আরও আমদানী করছ?
হাসতে গিয়েও থেমে গেল অন্য দুজন। ফোন বেজে উঠেছে। ছোঁ মেরে তুলে নিল কিশোর। হ্যালো হ্যাঁ।…তাই নাকি?…শেষ নম্বর দুটো ওয়ান থ্রী? …ও না না, তাহলে না, সরি। থ্যাংকু। হতাশ হয়ে রেখে দিল রিসিভার।
হলিউডের একটা ছেলে, জানাল সে। গাড়ির নম্বর মিলছে না।
আবার বাজল টেলিফোন। রিসিভার কানে ঠেকিয়ে স্পীকারের সুইচ টিপতে আর ভুল করল না কিশোর। সবাই শুনতে পেল ওপাশের কথা। সান্তা মনিকার একটা ছেলে কালো একটা রেঞ্জার দেখেছে, তবে কয়েক বছরের পুরানো গাড়ি। গাড়িতে ছিল দুই তরুণ দম্পতি। না, এবারেও হলো না।
আরও আটজন ফোন করল। কিন্তু সবগুলো বেঠিক।
নাহ্ কাজ হলো না, হতাশ হয়ে ভাবল কিশোর। ভূত-থেকে-ভূতে সাহায্য করল না এবার তিন গোয়েন্দাকে।