ছিনতাই – তিন গোয়েন্দা – সেবা প্রকাশনী
প্রথম প্রকাশ – জুলাই, ১৯৮৮
নীরবে সীট-বেল্ট বেঁধে নিল যাত্রীরা।
এঞ্জিনের শব্দ ছাড়া আর কোন আওয়াজ নেই, টু শব্দ করল না কেউ। নিজেদের কথা ভাবছে ওরা, জিনাকে নিয়ে চিন্তিত নয়–তিন গোয়েন্দার কথা অবশ্য আলাদা। বিপদ যে সামান্যতম কমেনি, এটা বোঝার বুদ্ধি আছে। ছেলেমেয়েদের। জিম যদি ঠিকমত প্লেন ল্যাণ্ড করাতে না পারে? যদি ক্র্যাশ করে? যদি নামার সঙ্গে সঙ্গে গুলি চালাতে শুরু করে পুলিশ?
নিচে রানওয়ে আর বিমান বন্দরের বাড়িঘর দেখা যাচ্ছে।
নামতে শুরু করল প্লেন। সবাই চুপ। প্রচণ্ড উত্তেজনা। ঠাণ্ডা এয়ারকুলড কেবিনেও দরদর করে ঘামছে অনেকে।
অবশেষে নিরাপদেই নামল বিমান। চারপাশ থেকে ছুটে এল অসংখ্য মূর্তি। তাদের মাঝে ইউনির্ফম পরা পুলিশও রয়েছে।
রেডিওতেই সমস্ত নির্দেশ দিয়ে রেখেছে হাইজ্যাকাররা। প্লেনের ধারেকাছে যাতে কোন গাড়ি না আসে, বলে দিয়েছে। গাড়ি এল না। পুলিশদের হাতেও কোন অস্ত্র নেই। একটা বিশেষ দূরতে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল ওরা।
পরিকল্পনা মাফিকই হচ্ছে সব কিছু। একে একে নেমে গেল ছেলেমেয়েরা, খালি হাতে। তাদের মালপত্র সব রয়ে গেল বিমানে।
বিমানের কর্মচারীদের মুক্তি দেয়া হলো। তারাও নেমে গেল একে একে। কেউ কোন গোলমাল করল না। চ্যাকোর হাতে পিস্তল। ওরটেগা একটা সাব-মেশিনগান। বের করে নিয়েছে। তার ওপর ককপিটে জিম্মি রাখা হয়েছে এক কিশোরীকে। কাজেই কিছু করার চেষ্টা করল না কেউ।
.
খুব ধীরে ধীরে কাটছে জিনার সময়। দুঃস্বপ্নের মাঝে রয়েছে যেন সে। জিমের পাশে বসে ভাবছে, এরকম বিশ্রী অবস্থায় জীবনে কখনও পড়েনি। এখন পর্যন্ত খারাপ কিছু করেনি হাইজ্যাকাররা, কিন্তু চাপে পড়লে করবে না এর নিশ্চয়তা কোথায়?
জিনাকে অবাক করে দিয়ে তার কাঁধে হাত রাখল জিম। আলতো চাপ দিয়ে। বলল, মন খারাপ কোরো না। কোন ক্ষতি হবে না তোমার। দিন কয়েকের মধ্যেই মুক্তি দেয়া হবে। হাসল সে। আমরা অমানুষ নই। বেআইনী কাজ হয়তো করছি, কিন্তু খারাপ লোক নই।
জেনেশুনে তাহলে করছেন কেন?
একবার খারাপ পথে পা দিলে, ফেরার রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। একটা প্রাইভেট অ্যাভিয়েশন ক্লাবের ইনস্ট্রাকটর ছিলাম। গাধার মত একদিন ওখানকার ক্যাশ চুরি। করে বসলাম। তারপর থেকে জড়িয়ে পড়লাম নানারকম অপরাধের সঙ্গে, আর ফিরতে পারলাম না। এখন তো অনেক বেশি দেরি হয়ে গেছে।
কে বলল? আমার তা মনে হয় না। ইচ্ছে করলে এখনও ফিরতে পারেন, সময় আছে, নরম গলায় বলল জিনা। সত্যি বলছি, যদি হাইজ্যাকার না হতেন, চোরাচালান না করতেন, আপনাকে আমি পছন্দই করতাম।
হাসল শুধু জিম, জবাব দিল না। সামনে ঝুঁকে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। কি হচ্ছে, দেখল।
একটু বাদেই উড়ব আবার, বলল সে। আমাজনে প্লেন নিয়ে যেতে পারব আশা করছি। ওখানে ল্যাণ্ড করব। অস্থায়ী একটা রানওয়ে তৈরি করা হয়েছে ওখানে। একটু থেমে যোগ করল, আমাদের বন্ধুরা কাছেই থাকবে। অনেকদিন, থেকেই ওরা স্মাগলিঙের সঙ্গে জড়িত।
অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল জিনা। যে কোন মুহূর্তে রিও ছাড়বে প্লেন, একা হয়ে যাবে তখন। বন্ধুদের কাছ থেকে দূরে সরে যাবে। হঠাৎ করেই মনে পড়ল। রাফিয়ানের কথা। আছে তো, না তাকেও নামিয়ে দিয়েছে? রাফিয়ান সঙ্গে থাকলে অনেক ভরসা পায় জিনা, বিপদে-আপদে সাহায্য পাবে।
জানালা দিয়ে দেখছে জিনা, বাইরে সবাই ব্যস্ত। অসংখ্য পুলিশ ঘিরে রেখেছে। প্লেনটাকে, কিন্তু বিষদাত ভাঙা সাপের অবস্থা হয়েছে ওদের, কিছুই করতে পারছে। না। অসহায় ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে প্লেনে তেলভরা দেখছে শুধু।
বিমানের কর্মচারী আর যাত্রীরা ঢুকে যাচ্ছে এয়ারপোর্টের মেইন বিল্ডিঙে, তাদেরকে ঘিরে রয়েছে এক ঝাঁক রিপোর্টার। নিশ্চয় তাদের মাঝেই রয়েছে, কিশোর, মুসা আর রবিন।
আচ্ছা, কিশোর কি করছে? এত সহজে হাল ছেড়ে দেয়ার ছেলে তো সে নয়। ক্ষীণ আশা হলো জিনার, কিশোর যখন মুক্ত রয়েছে, কিছু একটা সে করবেই। জিনাকে উদ্ধার করার সব রকম চেষ্টা চালাবে, বুদ্ধি একটা ঠিক বের করে ফেলবে।
মুসা আর রবিনের কথা ভাবল। কি একেক জন সোনার টুকরো ছেলে। তাকে বাঁচানোর জন্যে স্বেচ্ছায় নিজেদেরকে বিপদে ঠেলে দিতে চেয়েছিল। আর সে কিনা ওদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে, সারাক্ষণ ঝগড়া বাধিয়ে রাখে।
বাবা-মার কথা মনে পড়তেই চোখে পানি এসে গেল জিনার। তারা ওকে কত ভালবাসেন, অথচ সে খারাপ ব্যবহার করে তাদের সঙ্গে। সেই মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিয়ে। ফেলল জিনা, আর কারও সঙ্গেই খারাপ ব্যবহার করবে না। ভাল হয়ে যাবে। কিন্তু ভাল হওয়ার কথা তো পরে, আগে এখান থেকে বেরোতে তো হবে। মুক্তি পেলে তবে না…
ককপিটে ঢুকল চ্যাকো, তার পেছনে ওরটেগা।
এবার যাওয়া যায়, জিম, চ্যাকো বলল।
রানওয়েতে চলতে শুরু করল প্লেন। দুরুদুরু করছে জিনার বুক। সময় অনেক দীর্ঘ মনে হচ্ছে।
অবশেষে মাটি ছাড়ল প্লেন, দ্রুত ওপরে উঠতে লাগল।
জিম ঘোষণা করল, অলটিচিউড বারো হাজার মিটার। স্পীড এক হাজার কিলোমিটার।
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল চ্যাকো আর ওরটেগা।
সেরে দিলাম কাজ! হাসি ফুটল ওরটেগার মুখে। নিরাপদ। জিনাকে ধন্যবাদ। ওর জন্যেই কেউ পিছু নিতে সাহস করবে না।
জিনাকে বলল চ্যাকো, ইচ্ছে করলে ঘোরাঘুরি করতে পারো। বলেছি না, তোমার কোন ক্ষতি করব না।
কেবিনের দরজা খুলে দিল সে।
জিনা বেরোল। চেঁচিয়ে উঠল, তোমরা! তোমরা এখানে।
চিৎকার শুনে দরজায় উঁকি দিল চ্যাকো। তাজ্জব হয়ে গেল। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। সেই ছেলে তিনটে, জিনার বন্ধু। বোধহয় সীটের নিচে। লুকিয়ে ছিল এতক্ষণ। বেশ খুশি খুশি লাগছে ওদের।
যাওনি? কেবিনে নামল চ্যাকো।
নাহ, যেন কিছুই না এমনি ভঙ্গিতে বলল কিশোর। জিনাকে দেখিয়ে বলল, ও রয়ে গেছে। ফেলে যাই কি করে?
ছিলে কোথায়?
সীটের নিচে।
হু, এত ব্যস্ত ছিলাম, গুণে দেখার কথা মনে হয়নি। তাছাড়া ভাবতেও পারিনি, ঝুঁকি নিয়ে কেউ রয়ে যাবে প্লেনে। শুধু বন্ধুর সঙ্গে থাকার জন্যেই রয়ে গেলে?
একসঙ্গে বেরিয়েছি, রবিন বলল, একসঙ্গে যাব। বিপদের মোকাবেলা করতে। হলেও একসঙ্গেই করব। একা রেখে গেলে ওর বাপ-মাকে গিয়ে কি জবাব দেব?
প্রশংসা ফুটল চ্যাকোর চোখে। কাজটা বোধহয় ভাল করলে না। যাকগে, আমাদের কি? ঝামেলা বাড়ল বটে, কিন্তু সুবিধেও হলো। নিজেকে বোঝাচ্ছে সে। একজন জিম্মির চেয়ে চারজন
পাঁচ, শুধরে দিল জিনা। যদি রাফিয়ানকে নামিয়ে না দিয়ে থাকেন?
রাফিয়ান? কুঁচকে গেল চ্যাকোর ভুরু।
আমার কুকুর। আপনার সঙ্গে যে ধাক্কা লাগল, ওকেই তখন দেখতে গিয়েছিলাম। আপনি গিয়েছিলেন কেন?
হাসল চ্যাকো। জানোয়ারের ঘরের পাশেই বিমানের ভাড়ার। অস্ত্রপাতিগুলো ওখানেই রেখেছিলাম।
আর কিছু না বলে ককপিটে চলে গেল সে। জিম. আর ওরটেগাকে খবরটা জানানোর জন্যেই হয়তো।
কিশোরের হাত ধরল এসে জিনা। থ্যা-থ্যাংকিউ..
খাইছে! বলে উঠল মুসা। যেন শুধু কিশোরই থেকেছে। আমরা থাকিনি?
হাসল জিনা মুসা আর রবিনেরও হাত ধরে ঝাঁকিয়ে দিল। ধন্যবাদ দিল বার। বার। ওরা রয়ে যাওয়ায় সে কৃতজ্ঞ বোধ করছে, জানাল নির্দ্বিধায়।
সহজ হয়ে গেল পরিবেশ।
পরের কয়েক ঘণ্টায় হাইজ্যাকারদের সঙ্গেও সম্পর্ক সহজ করে নিল চার। অভিযাত্রী। বাবুর্চি আর স্টুয়ার্ডের দায়িত্ব নিল চ্যাকো। ট্রেতে খাবার সাজাতে গিয়ে ভুলভাল করে ফেলল। হেসে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিল রবিন। দুজনে মিলে খাওয়া সরবরাহ করল সবাইকে।
জিমের পাশে খাবারের ট্রে নামিয়ে রাখল রবিন।
থ্যাংকস, জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রয়েছে জিম। অন্ধকার হয়ে যাবে। শিঘ্রী। তখন আর খেতে পারব না। এতবড় প্লেন এর আগে কখনও চালাইনি তো, সারাক্ষণ সতর্ক থাকতে হচ্ছে।
তিনজনের কাজ একা করছ, আর কি? সাহস দিল ওরটেগা। ভালই তো চালাচ্ছ।
আরও কয়েক ঘণ্টা লাগবে, চ্যাকো বলল। পারবে তো?
চেষ্টা তো করতেই হবে, বলল জিম। রেডিওতে যোগাযোগ করতে হবে ওদের সঙ্গে। নামার নির্দেশ চাইব। না না, এখন না, আরও অনেক পরে।
আমাদের কখন যেতে দেবেন? জিজ্ঞেস করল কিশোর। আমাজনের ওদিকে তো ঘোর জঙ্গল। সভ্য লোকালয় আছে?
ভেব না, জবাব দিল ওরটেগা। জঙ্গলের মাঝে মিশনারিদের ক্যাম্প আছে। ওখানে দিয়ে আসব। ওরাই তোমাদের পৌঁছে দেবে লোকালয়ে।
সংবাদটা বিশেষ আশাব্যঞ্জক মনে হলো না ছেলেদের কাছে, কিন্তু কি আর করা। এতেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে।
রাত নামল। জিনা বলল, এসো, ঘুমাই। দুশ্চিন্তা কমবে।
কেবিনের সীটে বসে ঘুমানোর চেষ্টা করল ওরা।
সবাই ঘুমাল, কিন্তু জিনার চোখে ঘুম নেই। রাফিয়ানের কথা ভাবছে। কয়েকবার চ্যাকোকে অনুরোধ করেছে সে, রাফিয়ানকে কেবিনে নিয়ে আসার। জন্যে। রাজি হয়নি চ্যাকো, কুকুর পছন্দ করে না।
সামনের দিকে একটা সীটে চ্যাকোর নাক ডাকার শব্দ শোনা গেল।
নিঃশব্দে উঠে দাঁড়াল জিনা। চুপি চুপি চলল কেবিনের পেছন দিকে।
তখন প্লেনের পেছনের দরজা দিয়ে উঠেছিল রাফিয়ানের কামরায়। এদিকের পথ চেনে না। কিন্তু থামল না জিনা। একের পর এক দরজা খুলে উঁকি দিতে লাগল ভেতরে। ভাড়ারটা পেল। চ্যাকো বলেছে, ভাঁড়ারের সঙ্গেই রয়েছে জন্তু জানোয়ারের ঘর।
কি করে জানি টের পেয়ে গেল রাফিয়ান, জিনা কাছাকাছি রয়েছে। বোধহয় গন্ধ পেয়েছে। চাপা গোঁ গোঁ করে উঠল সে।
দরজা খুলে ছুটে গিয়ে রাফিয়ানের গা ঘেঁষে বসে পড়ল জিনা। পিঠে হাত বুলিয়ে, মাথায় আলতো চাপড় দিয়ে আদর করতে লাগল। রাফি, কষ্ট পাচ্ছিস? তোর তো পাওয়ার কথা না। আরামেই আছিস। আমরাও অবশ্য খুব একটা খারাপ নেই, হাইজ্যাকাররা লোক ভাল। বুঝলি রাফি, এবার আর কোন রহস্যের সমাধান নয়। অ্যাডভেঞ্চার, পিওর অ্যাডভেঞ্চার।
হউ! লেজ নেড়ে বলল রাফিয়ান, একমত হলো যেন জিনার কথায়। হউ! হউ!
রাফিয়ানের মুখের দিকে তাকাল জিনা। ঠিক বলেছিস। অ্যাডভেঞ্চার মানেই অ্যাকশন। দাঁড়া, আগে নেমে নিই। তোর সাহায্যে হাইজ্যাকারদের ফাঁকি দিয়ে পালাব আমরা। ও হ্যাঁ, কিশোর, মুসা আর রবিনও আছে। আমাদের ছেড়ে যায়নি।
হউ! বলল আবার রাফিয়ান।
কুকুরটার বাঁধন খুলে দিল জিনা। তাকে নিয়ে ফিরে এল কবিনে। কিন্তু নিজের সীটে পৌঁছার আগেই ভীষণভাবে দুলে উঠল বিমান। তাল সামলাতে না পেরে, উল্টে পড়তে পড়তে একটা সীট খামচে ধরে সামলে নিল সে কোনমতে।
হলো কি? সোজা হয়ে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল জিনা।
জেগে গেছে চ্যাকো। লাফিয়ে উঠল।
ধাক্কার চোটে তিন গোয়েন্দাও জেগে গেল।
আবার কেঁপে উঠল বিমান, গা ঝাড়া দিচ্ছে যেন দুরন্ত ঘোড়া।
ককপিটের দিকে ছুটল চ্যাকো। ছেলেরা পিছু নিল।
রেডিওর কাছ থেকে উঠে গিয়ে জিমের পাশে ঝুঁকে দাঁড়িয়েছে ওরটেগা, নজর কন্ট্রোল প্যানেলের দিকে। নিয়ন্ত্রণ নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে জিম।
কি হলো? জিম উদ্বিয়।
ফিরে তাকাল না জিম। এই সময় আবার কেঁপে উঠল প্লেন, প্রচণ্ডভাবে। সামান্য কাত হয়েই আবার সোজা হলো। কি জানি, বুঝতে পারছি না, দাঁতে দাঁত চেপে রেখেছে সে। কিছু একটা…
কথা শেষ করতে পারল না, দুলে উঠল বিমান ভীষণভাবে।
সোজা করার জন্যে প্রাণপণ চেষ্টা চালাল জিম, কিন্তু এবার আর ঠিক হতে চাইছে না বিমান। গোলমাল একটা কিছু হয়েছে। কি, বুঝতে পারছি না। চালানোয় কোন ভুল হয়নি আমার।
চ্যাকো আর ওরটেগার মুখ কালো। নিঃশ্বাস ফেলতে ভুলে গেছে যেন ছেলেরা। রাফিয়ানও উদ্বিগ্ন, অদ্ভুত কোন উপায়ে টের পেয়ে গেছে বিপদ।
মরব না তো, জিম? ওরটেগার গলা কাঁপছে। নামাতে পারবে তো?
কন্ট্রোল কথা শুনতে চাইছে না, জিম জানাল। খারাপের দিকেই যাচ্ছে। জোর নেই গলায়। জাদ তো আর জানি না, অলৌকিক কিছু ঘটাতে পারব না।
ঝাঁকুনি দিয়ে নাক নিচু করে ফেলল প্লেন। গাঢ় অন্ধকারে শা শা করে মাটির দিকে ছুটে চলল।
চুপ করে রয়েছে ছেলেরা। রক্ত সরে গেছে মুখ থেকে। নিজেদের অজান্তেই একে অন্যের হাত ধরে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেন শক্তি সঞ্চয় করছে। রাফিয়ান জিনার পা ঘেষে রয়েছে।
কন্ট্রোলের ওপর আরও ঝুঁকে গেছে জিম। তার দুপাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে চ্যাকো আর ওরটেগা, আতঙ্কিত।
মাত্র কয়েক সেকেণ্ড পেরোল, কিন্তু ওদের মনে হলো, কয়েক যুগ।
অবশেষে মাথা সোজা করল জিম। জলদি গিয়ে সীটে বসে সীট-বেল্ট বাধা। ক্র্যাশ-ল্যাণ্ড করা ছাড়া আর কোন উপায় দেখছি না। চলেছে জঙ্গলের ওপর দিয়ে, নামতে পারলে হয় এখন, গোপন না করে সত্যি কথাই বলল সে।
সবাই বুঝল, বাঁচার আশা কম।
আরে, মুখ অমন কালো করে রেখেছ কেন? হাসার চেষ্টা করল কিশোর, সীট-বেল্ট বাধছে। আগেও বিপদে পড়েছি, উদ্ধারও পেয়েছি, নাকি?
কই কালো কই? এই তো হাসছি, কিন্তু জিনার হাসিটা কান্নার মত দেখাল।
সাধ্যমত চেষ্টা করছে জিম। অলটিমিটারের ওপর চোখ, প্লেনের নাক সোজা করার চেষ্টা চালাচ্ছে। সোজা হলে গতি অন্তত সামান্য কমবে, তাতে নাক সোজা করে মাটিতে গিয়ে গাঁথবে না প্লেন।
কিন্তু কথা শুনল না প্লেন, খামখেয়ালির মত চলেছে। নাক তো সোজা করলই, বিপদ আরও বাড়ানোর জন্যেই যেন বিপজ্জনক ভঙ্গিতে কাত হয়ে গেল। একপাশে। কোথায় যাচ্ছে, অন্ধকারে কিছুই দেখতে পাচ্ছে না জিম।
পাহাড়-টাহার নেই তো? তাহলে আর কিছুই করার থাকবে না। পাহাড়ের ধাক্কা খেলে আর ভাবতে পারল না সে।
পরের কয়েকটা মুহূর্ত ভয়াবহ এক দুঃস্বপ্নের মাঝে কাটল যেন ওদের। হঠাৎ প্রচণ্ড ঝাঁকুনিতে সামনে ঝুঁকে গেল সবাই, টান টান হয়ে গেল সীট-বেল্ট। আরও কাত হয়ে পুরো আধচক্কর ঘুরল বিমান, সোজা হলে সামান্য, পরক্ষণেই তার ধাতব শরীর ছেঁড়ার তীক্ষ্ণ চড়চড় শব্দ কানে এল। আরেকবার প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিয়ে স্থির হয়ে গেল নাক নিচে, লেজ ওপরে তুলে।
আরও কয়েক মুহূর্ত কেউ নড়ল না!
সবার আগে সামলে নিল জিনা। না না, ভুল হলো, রাফিয়ান। তাকে কোলে নিয়ে দুহাতে আঁকড়ে ধরে রেখেছে জিনা। তার গাল চেটে দিল কুকুরটা। লেজ নেড়ে চেঁচিয়ে উঠল, খউ! খউ!
রাফি, সব ঠিক হয়ে গেছে, না? দুর্বল লাগছে জিনার, সারা শরীর কাঁপছে। রাফিয়ানকে ছেড়ে দিয়ে কাঁপা হাতে বেল্ট খুলল। ঘুটঘুঁটে অন্ধকার, আলো নিভে গেছে। অন্যেরা ঠিক আছে তো?
এই সময় সাড়া দিল মুসা, আল্লাহরে! দুনিয়ায় আছি, না দোজখে?
মুসা, তুমি ভাল আছ? উৎকণ্ঠায় ভরা জিনার কণ্ঠ।
তা আছি। তবে দুনিয়াতে, না আল্লাহর কাছে, বুঝতে পারছি না। তুমি?
দুনিয়াতেই আছ। আমি ভাল। কিশোর আর রবিনের কি খবর?
ওরাও সাড়া দিল, ভাল। তবে পুরোপুরি অক্ষত কেউই নয়, কমবেশি আহত হয়েছে সবাই। কারও চামড়া ছড়েছে, কেউ কনই কিংবা হাটুতে ব্যথা পেয়েছে।
অন্ধকারে চ্যাকো আর ওরটেগার কথা শোনা গেল। ওরাও ঠিকই আছে বোঝা গেল। কিন্তু জিমের কি অবস্থা?
ককপিটে গিয়ে ঢুকল তার দুই সহকারী। জিমের নাম ধরে ডাকল চ্যাকো। সাড়া নেই। বিড়বিড় করে কিছু বলে একটা টর্চ খুঁজে বের করে জ্বলল।
কন্ট্রোল প্যানেলের ওপর ঝুঁকে পড়ে রয়েছে জিম। দ্রুত পরীক্ষা করে দেখল ওরটেগা। না, মরেনি, বেহুশ হয়ে গেছে।
কপাল কেটেছে। বাড়ি খেয়েছে ভালমতই।…এই যে, হুশ ফিরছে।
চোখ মেলল জিম, আপনাআপনি হাত চলে গেল কপালের কাটায়। প্লেন অনড় হয়ে রয়েছে বুঝতে পেরে হাসল, পেরেছি তাহলে।
হ্যাঁ, পেরেছেন, পেছন থেকে বলে উঠল কিশোর। ওরাও এসে ঢুকেছে। ককপিটে। দারুণ দেখিয়েছেন। আগুন ধরছে না কেন এখনও?
আর ধরবেও না। ভাগ্য ভাল আমাদের। ধরলে নামার সময় ধাক্কা যখন লেগেছে, তখনই ধরে যেত।
প্লেনের বিশ্বাস নেই, নিশ্চিন্ত হতে পারছে না জিনা। ধরে যেতেও পারে। চলুন বেরিয়ে যাই।
না, ধরবে না, বলল জিম। বাইরে যাব কোথায়? যা অন্ধকার, আর জঙ্গল। কি বিপদ রয়েছে কে জানে। তার চেয়ে এখানেই আপাতত নিরাপদ। ভোরে উঠে বেরোব। তখন দেখব কোথায় পড়েছি, কিভাবে উদ্ধার পাব।
হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন, একমত হলো কিশোর।
খুঁজে ফাস্ট-এইড কিট বের করল জিনা। জিমের কপালের রক্ত পরিষ্কার করে মলম লাগিয়ে ব্যাণ্ডেজ বেঁধে দিল।
সীটগুলোকে মেলে বিছানা বানিয়ে শুয়ে পড়ল সবাই। ঘুমাতে পারলে ভাবনা। অনেকখানি দূর হবে, ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করতে পারবে। তাছাড়া যা ধকল গেছে সারাটা দিন, ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ছে শরীর।
কিন্তু নরম গদিতে আরামে শুয়েও সহজে ঘুম আসতে চাইল না। নানারকম। ভাবনা ভিড় করে আসছে মনে।
সবার আগে ঘুম ভাঙল মুসার। বাইরে উজ্জল দিন, জানালা দিয়ে আলো আসছে। আশেপাশে চেয়ে দেখল, তার বন্ধুরা সবাই ঘুমিয়ে আছে। তিন হাইজ্যাকারের কাউকেই দেখা যাচ্ছে না। কেটে পড়ল নাকি?
রেডিওর কাছ থেকে শোনা গেল ওরটেগার গলা, যন্ত্রটাকে গালমন্দ করছে। খারাপ হয়ে গেছে বোধহয়, চালু করতে পারছে না। টু শব্দও তো করছে না। করি কি এখন?
এই সময় হাজির হলো জিম আর চ্যাকো। বাইরে বেরিয়েছিল। চেহারা দেখেই বোঝা গেল, খবর ভাল না।
কিশোর, জিনা আর রবিনেরও ঘুম ভাঙল। ভুরু কুঁচকে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে জিমের দিকে তাকাল জিনা।
খালি জঙ্গল, জানাল জিম। তবে এই জঙ্গলই বাঁচিয়ে দিয়েছে আমাদের। কাদামাটি বেশি, জলাভূমিই বলা চলে। কলামবিয়ার বর্ডার থেকে দূরে, ইয়াপুরার কাছে রয়েছি, আমাজন এলাকার মধ্যে। সভ্যতা অনেক দূর। ওরটেগা, রেডিওর, খবর কি? কাজ করছে?
না, ফিসফাসও করে না। ভাল আটকান আটকেছি। এ-থেকে বেরোতে পারব কিনা যথেষ্ট সন্দেহ আছে আমার।
কাছেই একটা ছোট পাহাড় আছে, রুক্ষ কণ্ঠে বলল চ্যাকো। টিলা বলাই ভাল। ওতে চড়ে দেখা দরকার, কোন দিকে কি আছে। তারপর ঠিক করা যাবে। কি করব।
চলো, আমিও যাচ্ছি তোমার সঙ্গে, জিম বলল।
আমরা আসি? অনুরোধ করল কিশোর। হাত-পা সব শক্ত হয়ে গেছে, একটু নাড়াচাড়া দরকার।
হাত নাড়ল জিম। ক্ষতি কি? এসো।
ওরটেগাকে রেডিওর কাছে রেখে বাকি সবাই নেমে এল বিমান থেকে।
.
দেখে স্তব্ধ হয়ে গেল ছেলেরা।
এমন জঙ্গল আর কখনও দেখেনি। বড় বড় গাছ, এত উঁচু আর এমনভাবে ডালপালা ছড়িয়েছে, সূর্যের আলো ঢুকতে পারে না ঠিকমত। পায়েরতলায় ভেজা। নরম মাটি, জলাভূমি বলা না গেলেও কাদাভূমি বলা চলে। তার ওপর সবুজ। শ্যাওলা। কাদায় পা দেবে যায়। সাবধানে চলতে হচ্ছে। কে জানে কোথায়। ঘাপটি মেরে রয়েছে চোরাকাদার মরণফাঁদ।
কিছুক্ষণ হাটার পর মাটি শক্ত হয়ে এল।
যে পাহাড়টার কথা বলেছে চ্যাকো, আসলেই ওটাকে টিলা বলা উচিত গাছপালার মাথা ছাড়িয়ে খুব সামান্যই উঠেছে। পাথুরে, খুদে কৃত্রিম পর্বত যেন রাফিয়ান পাহাড়ে চড়তে পারে না বিশেষ, কিন্তু এটাতে চড়তে তারও অসুবিধে হলো না।
চুড়াটা চোখা নয়, বিশাল ছুরি দিয়ে পোঁচ মেরে কেটে ফেলা হয়েছে যেন, সমান। দাঁড়ানোর চমৎকার জায়গা। নিচে তাকিয়ে অবাক না হয়ে পারল না ওরা। অস্ফুট শব্দ করে ফেলল কেউ কেউ। ঠিক যেন তাদের পায়ের নিচ দিয়ে বয়ে চলেছে ইয়াপুর নদী, পুবে। নদীর দুই তীরে চওড়া চরা, হলুদ বালি চিকচিক করছে। রোদে। তিন কিলোমিটার মত উঁচু উঁচু পাথরের চাইয়ের মাঝে ঢুকে হারিয়ে গেছে। নদীটা। তার পরে ছড়িয়ে রয়েছে পাহাড় শ্রেণী, মহান অ্যাণ্ডিজের বিশাল পার্বত্য এলাকা।
অপরূপ সে সৌন্দর্য থেকে জোর করে দৃষ্টি সরিয়ে আনতে হলো। একে অন্যের দিকে তাকাল অভিযাত্রীরা, নীরবে। লোকালয়ের চিহ্নমাত্র নেই কোথাও। জীবনের সাড়া নেই। চারপাশে গাছপালার বিস্তারের মাঝে এমন জায়গায় হারিয়েছে। ওরা, পথ খুঁজে পাওয়া মুশকিল।
বললাম না, ভাল আটকান আটকেছি, তিক্ত কণ্ঠে বলল চ্যাকো। বেরোনোর পথ নেই। রেডিও খারাপ, এসওএস পাঠাতে পারব না। খাবার-দাবার যা আছে, খুব তাড়াতাড়িই ফুরিয়ে যাবে। তিন-চারজনের আন্দাজ নিয়েছিলাম, তাতেও বেশি দিন চলত না। তার ওপর আরও তিন-চারটে মুখ যোগ হয়েছে। এমন ভাবে তাকাল সে, কুঁকড়ে গেল ছেলেরা।
কি আছে চ্যাকোর মনে? তাদেরকে এই জঙ্গলে ফেলে চলে যাবে না তো।
ছেলেদের মনের কথা বুঝতে পেরে হাসল জিম, ভয় পেয়ো না। তোমাদের ফেলে যাব না। ভাগাভাগি না হয়ে জোট বেঁধে এই বিপদ থেকে বাঁচার চেষ্টা করব। পরিস্থিতি হালকা করার জন্যে বলল, ধরা যাক, আমরা ভ্রমণকারী, নতুন দেশ আবিষ্কারে বেরিয়েছি। হাহ্-হা।
হাসল বটে জিম, কিন্তু তার চোখের উৎকণ্ঠা দূর হলো না।
নীরবে পাহাড় বেয়ে নেমে আবার ফিরে চলল ওরা।
বাতাসে আর্দ্রতা এত বেশি, অসহ্য মনে হচ্ছে গরম। চটচটে ঘাম, যেন আঠা মাখিয়ে দেয়া হয়েছে শরীরে। অস্বস্তিকর। ঘন ঝোপঝাড়ের দিকে তাকালে গায়ে কাটা দিয়ে ওঠে। মনে হয়, অন্ধকারে ঘাপটি মেরে আছে হিংস্র সব নাম-না-জানা। জানোয়ার, যে কোন মুহূর্তে এসে ঘাড়ে লাফিয়ে পড়বে।
বিমানে ফিরে দেখল হতাশ হয়ে বসে আছে ওরটেগা।
নাহ, হলো না, দেখামাত্র বলল সে। অনেক সময় লাগবে মেরামত করতে, আদৌ যদি মেরামত হয়। কয়েক দিন এমন কি কয়েক হপ্তাও লাগতে পারে। ততদিনে না খেয়েই মরে যাব।
এত ভেঙে পড়লে চলবে না, জিম বুলল। প্ল্যান করে এগোতে হবে। এখনই বাঁচার আশা ছেড়ে দিলে মরবই তো.। যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ, হাল ছাড়ব না। কিছুতেই। উপযুক্ত লোক জিম, নেতা হওয়ার গুণ তার আছে।
প্লেনটা আমাদের হেডকোয়ার্টার, বলল সে। এখান থেকেই আশপাশে অভিযান চালাব, পথ খুঁজে বের করব।
খাবারের কি হবে? মনে করিয়ে দিল মুসা।
হ্যাঁ, ঠিক, কিশোরও বলল, খাবার?
কিছু খাবার তো আছে। ওগুলো থাকতে থাকতে রেডিও ঠিক হয়ে গেলে, বেঁচে যাব।
এরপর কাজে লাগল জিম। সব খাবার বের করে নিজের দায়িত্বে নিল। হিসেব। করে খেতে হবে।
ফুরিয়ে গেলে কি করব? প্রশ্ন করল চ্যাকো।
পানির ভাবনা নেই, বলল জিম। নদীর পানি এনে ভালমত ফুটিয়ে খেলেই অসুখের ভয় থাকবে না। তবে হ্যাঁ, শিকার একটা বড় সমস্যা।
কয়েকটা পিস্তল আর একটা সাব-মেশিনগান ছাড়া আর কোন অস্ত্র নেই হাইজ্যাকারদের কাছে। ফাঁদ পাততে জানে না। বলতে গেলে, জঙ্গলে টিকে থাকার কোন অভিজ্ঞতাই তাদের নেই।
আলাপে কান না দিয়ে নতুন রেডিও মেরামতে মন দিল ওরটেগা। বুঝতে পারছে, তাদের সবার জীবন এখন ওই যন্ত্রটার ওপর নির্ভর করছে, যে ভাবেই হোক সারাতে ওটাকে হবেই। কিন্তু এমন ভাঙা ভেঙেছে, সারানোও খুব কঠিন। কিছু স্পেয়ার পার্টস আছে প্লেনের যন্ত্রপাতির ইমারজেন্সি বক্সে। আর কিছু বদলাতে পারবে অন্যান্য যন্ত্রপাতি থেকে খুলে এনে। কিন্তু তারপরেও ঠিক হবে তো? তেমন ভাল টেকনিশিয়ান নয় ওরটেগা।
কাজ মোটামুটি ভাগ করে নিয়েছে ওরা। চ্যাকো রান্না করে, তাকে সাহায্য করে রবিন আর জিনা। জিমের সঙ্গে শিকারে যায় মসা, পাওয়া যায় না প্রায় কিছুই, তবু রোজ বেরোয়। ওরটেগা রেডিও নিয়ে থাকে, তাকে সহায়তা করে কিশোর। রাফিয়ানও অকেজো থাকে না। শিকারে যায়, রাতে পাহারা দেয়। তার খাবারটা সে অর্জন করেই নেয়।
হাইজ্যাকার আর জিম্মিদের মাঝের ফারাকটা আর নেই, বন্ধু হয়ে গেছে ওরা।
কয়েক দিন চলে গেল, কিন্তু রেডিও ঠিক হলো না। হতাশ হয়ে মাথা নাড়ল। ওরটেগা, আমার ক্ষমতায় কুলাবে না।
খাবারও ফুরিয়ে এসেছে, বিষণ্ণ কণ্ঠে বলল চ্যাকো। জিম, কিছু একটা করো। আর তো দেরি করা যায় না।
কিছু একটা করা দরকার, তাড়াতাড়ি সবাই একমত হলো এতে। কিন্তু কি করবে। রেডিও অচল, হাইজ্যাকাররা বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছে না। বাইরে থেকে সাহায্য আসার কোন আশা নেই। একটাই পথ আছে, বেরিয়ে পড়া। তারপর ভাগ্য ভাল হলে বাচবে, নইলে মৃত্যু। বিকল্প আর কিছু নেই।
খাবার যা অবশিষ্ট আছে গুছিয়ে নেয়া হলো। ফাস্ট-এইড কিট, কয়েকটা কম্বল, রান্নার সরঞ্জাম আর আরও দুয়েকটা টুকিটাকি জিনিস বেধে ভাগাভাগি করে কাঁধে তুলে নিল ওরা, বেরিয়ে পড়ল নিরুদ্দেশ যাত্রায়।
কয়েক দিন প্লেনটাই ছিল তাদের ঘর, এখন ছেড়ে যেতে খারাপ লাগছে। বার। বার পেছনে ফিরে তাকাল ওরা। আর যাই হোক, নিরাপদ আশ্রয় তো অন্তত ছিল।
ঘন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলল দলটা, সাতজন মানুষ আর একটা কুকুর। কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে গেল ইয়াপুরার তীরে।
কিশোর পরামর্শ দিল, নদী ধরেই এগোনো যাক। খাবার আর গোসলের পানি পাব। সবচে বড় কথা, পথ হারানোর ভয় থাকবে না। নদীর ধারে মানুষের বসতি থাকার সম্ভবনাও বেশি।
সবাই রাজি হলো। নদীর ধার ধরেই এগোল ওরা।
খোলা চরা, গাছপালার ছায়া নেই। কড়া রোদ। ভীষণ গরম। দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ল সকলে। ঝামেলা বাড়াল রবিন। একটা পাথরে হোঁচট খেয়ে পড়ে পায়ে ব্যথা পেল। ওই পা-টা অনেক দিন আগে একবার ভেঙেছিল পাহাড়ে চড়ার সময়, আবার চোট লাগল ওটাতেই। খোঁড়াতে শুরু করল সে।
জোর করে রবিনের বোঝা ভাগ করে নিল মুসা আর কিশোর।
দাঁতে দাঁত চেপে চলেছে জিনা। ঘোড়ায় চড়া আর ব্যায়ামের অভ্যাস আছে। বলে হাঁটতে পারছে এখনও। মুসা কষ্ট সহ্য করতে পারে, কাজেই কিশোর কিংবা জিনার মত হাঁপিয়ে ওঠেনি সে।
বেচারা রবিনের অবস্থা করুণ। মুখ চোখ লাল হয়ে গেছে, পায়ের গোড়ালি ফুলে গেছে, পা ফেলতে কষ্ট হচ্ছে তার। তবু টু শব্দ করছে না, এগিয়ে চলেছে। সবার সাথে, কিন্তু খুব মন্থর।
ইসসি, দেরি করিয়ে দেবে দেখছি, বলল চ্যাকা।
রবিনের দিকে ফিরে হাসল জিম। সান্ত্বনা দিয়ে বলল, যতক্ষণ পারো, হাঁটো। পারলে বয়ে নিয়ে যাব। ভয় নেই।
রোদ যতই চড়ছে, গরমও বাড়ছে সেই অনুপাতে। দুপুরের দিকে তো মনে হলো, সেদ্ধ হয়ে যাবে একেকজন। থামল। কাপড় খুলে ঝপাং করে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ল মুসা।
একে একে সবাই নামল।
অনেকক্ষণ ধরে গোসল করল ওরা। তারপর গাছের ছায়ায় খেতে বসল। ভ্যাপসা গরম না থাকলে, আর পর্যাপ্ত খাবার থাকলে পিকনিক ভালই জমত।
বিকেলের দিকে যেন সহ্যশক্তির পরীক্ষা শুরু হলো। বিরূপ প্রকৃতি যেন। দেখতে চায়, তার দাপট কতখানি সইতে পারে অভিযাত্রীরা। রাফিয়ানের পর্যন্ত জিভ বেরিয়ে গেল।
রবিনের অবস্থার আরও অবনতি হয়েছে। ডাল কেটে, তাতে কম্বল বেঁধে। স্ট্রেচার বানিয়ে বয়ে নেয়া হচ্ছে তাকে। খুব লজ্জা পাচ্ছে রবিন, নিজেকে দোষারোপ করছে। আছাড় খেয়ে পা ভাঙার জন্যে নিজেকেই দায়ী করছে।
পায়ের মাংসপেশীতে খিচ ধরে গেছে জিনা আর কিশোরের। আধমন ভারি মনে হচ্ছে একেকটা পা।
সামান্যতম প্রাণের সাড়া নেই কোথাও। এ-এক অদ্ভুত জঙ্গল। ভয় ভয়। লাগে। নীরবতা যেন ভারি হয়ে ঠাই নিয়েছে এখানে। কথা বলতে অস্বস্তি লাগে।
হঠাৎ করে ঝাঁপিয়ে পড়ল রাত। সাঝ প্রায় হলোই না, এই দেখা গেল শেষ। বিকেল, পরক্ষণেই ঝপাত করে রাত্রি।
থামো, বলল জিম। এখানেই রাত কাটাব।
দিনটা যেমন গরম গেছে, রাতটা তেমনি ঠাণ্ডা হবে, গত কদিনে বুঝে গেছে ওরা। শুকনো ডালপাতা জোগাড় করে আগুন জ্বালল জিম। কয়েকটা কাঁচা ডাল কেটে তাতেও আগুন ধরাল। জুলবে ধীরে, ধোয়া হবে বেশি। মশা তাড়ানোর ব্যবস্থা। কিন্তু এই ধোয়ায় কি আর মশা যায়? ভারি চাঁদরের মত ঝাঁক বেধে এসে অভিযাত্রীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
আগুনের চারপাশ ঘিরে বসে রাতের খাওয়া সারল ওরা। সবাই বিষণ্ণ। মন। হালকা করার জন্যে রসিকতা করল কিশোর, আমি যখন দাদা হব, তিন কুড়ি নাতিপুতি হবে, তাদেরকে এই অভিযানের গপ্পো শোনাব। চোখ এত্তো বড় বড় করে শুনবে ওরা। বিশ্বাস করতে পারবে না। বাবা-মাকে গিয়ে সেকথা জিজ্ঞেস করবে, সত্যি কিনা। ওরা ধমক দিয়ে বলবে, বাজে বকিস না। বুড়োহাবড়াটার সঙ্গে থেকে থেকে ছেলেগুলোর মাথাও গেল। খালি মিছে কথা। হি-হি।
কেউ হাসল না।
মুসা বলল, ইস, কি আমার গল্পরে! তা-ও যদি ইনডিয়ানরা আক্রমণ করে ধরে। নিয়ে যেত, শেষে অনেক কষ্টে পালাতাম, নাহয় এককথা ছিল। প্লেন থেকে নেমে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাওয়া, রাতে মশার কামড় খাওয়া, হলো নাকি কিছু
এটা? যা জঙ্গল, বাঘ তো দূরের কথা, একটা শেয়ালও নেই।
এত বড় বড় কথা বোলো না, অন্য ধার থেকে হুঁশিয়ার করল চ্যাকো। ইনডিয়ান নেই কে বলল তোমাকে? সিনেমায় যেমন দেখো, তেমনটি হয়তো নেই। কিন্তু যারা আছে, তারাও কম হারামী না।
আছে নাকি এদিকে? চিত হয়ে ছিল, কনুয়ে ভর দিয়ে আধশোয়া হলো রবিন।
আছে। জিভারো ইনডিয়ানদের এলাকা এটা।
জিভারো? জিনা মুখ তুলল।
হ্যাঁ, জিভারো। অনেক ইনডিয়ানদের মত ওরাও নরমুণ্ডের ট্রফি রাখে। যদি টের পায় আমরা আছি, চোখের পলকে এসে হাজির হবে। কিছু বোঝার আগেই দেখব আমাদের ঘিরে ফেলেছে।
থাক থাক, আর বলবেন না, হাত নাড়ল মুসা। পরক্ষণেই হয়তো দেখব। বর্শার মাথায় আমাদের কাটা মুণ্ডগুলো শোভা পাচ্ছে! ভয়ে ভয়ে জঙ্গলের দিকে তাকাল সে। আমার রোম খাড়া হয়ে যাচ্ছে।
হঠাৎ টককো, টকো করে বিচিত্র একটা শব্দ হলো ঝট করে জঙ্গলের দিকে তাকাল ছেলেরা। কিসের শব্দ?
সর্বনাশ, জিভারো! ভীষণ ভয় পেয়েছে যেন চ্যাকো, এমনি ভঙ্গিতে ফিসফিস করে বলল, জঙ্গলের মধ্যে একজন আরেকজনকে সঙ্কেত দিয়ে জানাচ্ছে, শিকার। পাওয়া গেছে।
আবার শোনা গেল টককো টককো। আরও কাছে।
আহ, তোমরা কি শুরু করলে? মৃদু ধমক দিল জিম। খামোকা ভয় দেখাচ্ছ ছেলেগুলোকে!
খামোকা ভয়? জিমের কথা বুঝতে পারল না মুসা।
জিভারো না ঘোড়ার ডিম, ওরটেগার শয়তানী:.. কথাটা শেষ করল না জিম। এই, কম্বল খোলো। শোয়া দরকার।
আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না! মুসার মত জিনাও অবাক। শব্দ তো একটা হয়েছে। সবাই শুনেছি আমরা। শয়তানীটা কিসের?
ভেনট্রিলোকুইজম! বুঝে ফেলেছে কিশোর। ওরটেগা এই বিদ্যে জানে। আমাদের ভয় দেখানোর জন্যে সে-ই করেছে ওই শব্দ।
ও, এই ব্যাপার। স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ল মুসা। বুকে ফুঁ দিতে দিতে বলল, ইস, কি ভয়টাই না পাইয়ে দিয়েছিলেন।
কম্বলের বাণ্ডিল খুলছে ওরটেগা। শব্দ করে হাসল।
চ্যাকোও হাসল।
কম্বল খোলা শেষ হলে ওরটেগা ডাকল, এসো, শুয়ে পড়া যাক।
এক মিনিট, বাধা দিয়ে বলল জিম। একজনকে পাহারায় থাকতে হবে। পালা করে পাহারা দেব। ওরটেগা, শুরুতে তুমি থাকো। মাঝরাতের দিকে আমাকে তুলে দিয়ো। শেষরাতে আমি চ্যাকোকে তুলে দেব।
আমি আর মুসাও পাহারা দিতে পারব, কিশোর প্রস্তাব রাখল।
না না, দরকার নেই। তোমরা ঘুমাও। প্রয়োজন হলে বলব।
শোয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমিয়ে পড়ল সবাই। গা ঘেঁষাঘেঁষি করে রয়েছে। ছেলেরা। জিনার গা ঘেঁষে আছে রাফিয়ান। চোখ বোজা, কিন্তু কান খাড়া। সামান্যতম শব্দ হলেই জেগে যাবে।
কিন্তু এতবড় একটা জঙ্গলেও জাগিয়ে দেয়ার মত কোন শব্দ ঢুকল না। রাফিয়ানের কানে। খালি মশার বিরক্তিকর একঘেয়ে গান, আর আগুনে কাঠ। পোড়ার মৃদু চড়চড় ছাড়া আর কোন আওয়াজই নেই। ও হ্যাঁ, আছে, নিঃশ্বাসের শব্দ। আর মশার ঘ্যানর ঘ্যানরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নাক ডাকাচ্ছে চ্যাকো।
কমে আসছে দেখে আগুনে কয়েকটা কাঠ ফেলল ওরটেগা। পাহারা দেবে। কি? সারাদিনের অমানুষিক পরিশ্রমে তার চোখও ঢুলুঢুলু, টেনে মেখের পাতা খোলা রাখতে পারছে না। কখন যে ঘুমিয়ে পড়ল, টেরও পেল না।
ঘুম ভেঙে গেল মুসার। মাথা তুলে রাফিয়ানের দিকে চেয়ে দেখল, সে-ও সতর্ক হয়ে উঠেছে। চোখ মেলা। স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে জঙ্গলের দিকে।
কনুইয়ে ভর দিয়ে উঠে জঙ্গলের দিকে তাকাল মুসা। কিছুই দেখল না। শব্দ একটা হয়েছে, সে নিশ্চিত। নাহলে ঘুম ভাঙল কেন?
বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে হলো না। চারপাশে হঠাৎ জীবন্ত হয়ে উঠল জঙ্গল।
ঝোপঝাড় ভেঙে ছুটে এল একদল মানুষ। সে-কি বিকট চিৎকার ওদের। হাতে বল্লম। কয়েকজনের কাছে পুরানো আমলের বন্দুক। ঘিরে ফেলল অভিযাত্রীদের।
জিভারো! ফিসফিসিয়ে বলল আতঙ্কিত চ্যাকো। এবার আর রসিকতা নয়। কিছুই করতে পারল না অভিযাত্রীরা। দেখতে দেখতে বুনো লতা দিয়ে শক্ত করে বেধে ফেলা হলো ওদের। দুই হাত দুই পাশে রেখে বুক আর পিঠের ওপর। দিয়ে এমনভাবে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে বেঁধেছে, হাত নড়ানোরও উপায় রইল না।