৩. আমিই কিশোর

0 Comments

কী চান? কে আপনি? চেঁচিয়ে উঠলাম।

এবং হঠাই সব কিছু স্বাভাবিক হয়ে এল। মেইন স্ট্রীট আবারও নিজের নির্জন রূপ ফিরে পেল।

ঘুরে জানালাটার দিকে চাইলাম, আমি যেখানে মিস লিকে দেখেছি কিংবা কল্পনা করেছি। এটা নতুন এক চাইনিজ রেস্তোরা, কম দামে ভাল ফাস্ট ফুড পরিবেশনের জন্য নাম কামাতে শুরু করেছে।

মিস লিকে এখন আর দেখা যাচ্ছে না। অন্ধকার জানালা দেখে অনুমান করা যায় এখনও খোলেনি রেস্তোরাঁটা।

রাস্তার দিকে চাইলাম। আমার দিকে ধীরে-ধীরে এগিয়ে আসছে রকি বীচ পুলিশের এক গাড়ি। হাসপাতালের ঘটনাটার পর সার্জেন্ট কলিন্স হয়তো আমাকে খুঁজছেন।

কেটে পড়ব সিদ্ধান্ত নিলাম।

এক গলিতে সাত করে ঢুকে পড়ে মেইন স্ট্রীটের পিছনের গাছগাছালির উদ্দেশে দৌড় দিলাম। মাঠ পেরিয়ে পৌঁছতে হবে বাসায়।

লম্বা পথ পাড়ি দিতে হবে এভাবে গেলে। কাঁধের ব্যথায় মরে যাচ্ছি, এবং খিদেও মরে গেছে। কিন্তু কলিন্সকে এড়াতে হলে এটাই নিরাপদ রাস্তা।

দশ মিনিট বাদে বাসার সামনে এসে দাঁড়ালাম। চারধারে দৃষ্টি বুলিয়ে প্রতিবেশীদের কাউকে দেখতে পেলাম না।

সদর দরজার চাবি ঢোকাতে যাব, এসময় পাশের বাসার মিসেস বার্টন দরজা দিয়ে বেরিয়ে এলেন। হাতে প্লাস্টিকের ময়লা ভরা ব্যাগ।

হাই, মিসেস বার্টন? খোশমেজাজে ডেকে উঠলাম। স্কুল থেকে কেন আগে বাড়ি ফিরেছি তার কারণ জানানোর জন্য মাথা খেলালাম।

কিন্তু এবার ওঁর মুখের চেহারায় যে দৃষ্টি ফুটল সেটি গত কঘন্টা ধরে দেখে আসছি আমি। উনি আমার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে থেকে ভ্রূ কুঁচকালেন।

আহ, হ্যালো, বললেন তিনি, কণ্ঠে বিস্ময়। আমি তোমাকে চিনি?

কী বলব জানি না। আমরা কি কোন খেলা খেলছি? আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি? নাকি অন্য কিছু? কীভাবে জবাব দেব ওঁকে?

আমি অন্য পথ ধরলাম।

আমি পাশা পরিবারের পরিচিত, বললাম। ওঁরা আমাকে এখান থেকে কিছু জিনিস নিয়ে যেতে বলেছেন।

এর বেশি সে মুহূর্তে আর কিছু মাথায় এল না। গত কঘণ্টার কথা  ভাবলে, আমি যে আদৌ চিন্তা করতে পারছি সেটাই এক বিস্ময়।

ওহ, বললেন তিনি, তবে তাকে খুব একটা সন্তুষ্ট মনে হলো না। ডিসপোসাল বিনের দিকে হাঁটতে শুরু করে হঠাৎই ঘুরে দাঁড়ালেন। আমার দিকে চেয়ে রয়েছেন। আচ্ছা, তুমি আমার নাম জানলে কীভাবে?

দীর্ঘ এক মুহূর্ত তাঁর দিকে চেয়ে রইলাম। আমার চোখ মরিয়ার মত একটা জবাব খুঁজছে। ওঁদের মেইলবক্স দেখতে পেলাম। ওটার দিকে তর্জনী নির্দেশ করলাম।

আপনার নাম ওখানে আছে। বার্টন। তাই ভাবলাম আপনিই তিনি।

বক্সের দিকে দুমুহূর্ত চেয়ে থেকে আমার দিকে চাইলেন তিনি। মাথা ঝাঁকিয়ে ঈষৎ হাসলেন। এবার বিনে ব্যাগটা ফেলে সোজা বাসায় ঢুকে পড়লেন।

আমি শ্বাস নিয়ে, চাবিটা তালায় ঢুকালাম। ঘুরালাম। খুলল না। আমার চাবিতে সদর দরজা খুলছে না। এ কীভাবে সম্ভব? সব সময় খুলেছে, কিন্তু এখন খুলছে না কেন?

চাচা-চাচী কি আমাকে ঢুকতে না দেয়ার জন্য তালা পাল্টেছে? সেটা কি সম্ভব? নাকি আমি যে নিজের বাসায় একজন আগন্তুক এটা তার আরেকটা উদাহরণ?

আমাকে বাসায় ঢুকতে হবে। ওখানে আমার প্রশ্নের জবাব রয়েছে। জানালা ভাঙা সম্ভব নয়। মিসেস বার্টন টের পেয়ে পুলিস ডাকবেন।

জানালা! হ্যাঁ, বেসমেন্টের জানালাটা গত ছমাস ধরে ভাঙা চাচা ঠিক করতে চেয়েছিল, কিন্তু করা হয়নি। আশা করছি ওটা এখনও ওভাবেই রয়েছে।

বাড়ির পিছনে দৌড়ে গেলাম। জানালাটা এখনও ভাঙা, ভিতরে ঢুকতে বেশ কষ্টই হবে, তবে ঢোকা যাবে। একটু পরে শরীর গলিয়ে দিয়ে বেসমেন্টে লাফিয়ে নামলাম।

প্রথমে কিচেনে ছুটে গিয়ে, নিজের জন্য একটা বেলনি আর পনিরের স্যাণ্ডউইচ বানালাম লেটুস আর সর্ষে দিয়ে, সঙ্গে পান করলাম আধ-কোয়ার্ট দুধ।

নিজের পরিচিত কিচেনে বসে চাচীর খাবার খাচ্ছি, খানিকটা নিরাপত্তা বোধ এল। বাসার তুলনা আর কিছুতে হয় না।

কিচেনের দেয়ালের ছবিটায় চকিত চাউনি বুলালাম। গত সামারে ভােলা। সান্তা মণিকা বীচে চাচী, আমি আর ডন। চাচার তোলা ছবি।

স্যাণ্ডউইচটা মাটিতে ফেলে দিলাম। ধীরে সুস্থে উঠে দাঁড়িয়ে দেয়ালের কাছে হেঁটে গেলাম।

ছবিতে চাচী আর ডনকে সৈকতে দেখা যাচ্ছে। আমি নেই। আমি জানি ছবি তোলার সময় আমিও ছিলাম। এতে কোন ভুল নেই। কিন্তু এখন, স্কুলের ফুটবল টিমের ছবিটার মত…আমি স্রেফ উবে গেছি। উধাও।

মাথা ঝিমঝিম করছে। ব্যালান্স বজায় রাখতে দেয়ালে হাত রাখলাম। কাঁদব না আর্তনাদ করব ঠিক করতে পারছি না।

না, মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে, নিজেকে বললাম। এসবের নিশ্চয়ই কোন কারণ আছে।

যা-ই হোক না কেন, আমাকে এই রহস্যের সমাধান বের করতে হবে।

লিভিং রুমে গেলাম। এখানে দেয়ালগুলো পারিবারিক ছবি দিয়ে ভরা, আমি অনেকগুলো ছবিতে রয়েছি। বাতি জ্বেলে, বিশাল পিছনের দেয়ালের কাছে হেঁটে গেলাম।

ছবিগুলোর দিকে চেয়ে রইলাম। কোনওটাতেই আমি নেই। চাচা আমার অনেক ছবি তুলেছিল। তার মধ্যে ফুটবল জার্সি পরে তোলা ছবিও ছিল। আরও কিছু ছবি ছিল টিমমেটদের সঙ্গে।

গোটা বিভাগটা উধাও। ফুটবলের ছবিগুলোর বদলে ওখানে শোভা পাচ্ছে ডনের পিউই সকার খেলার ছবি। সেইলবোটে চাচীর ছবি। চাচা-চাচী, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে। আমার কোন ছবি নেই।

আত্মীয়-স্বজন! ডেস্কে রাখা ফোনটার কাছে টলতে টলতে  গেলাম। হয়তো শুধুমাত্র রকি বীচে আমার অস্তিত্ব নেই। অন্যান্য জায়গার মানুষ-জন হয়তো আমাকে চেনে।

রিসিভারটা তুলে নিয়ে শিকাগোতে হিরু চাচাকে ফোন করলাম।

হিরন পাশার অফিস, কানে ভেসে এল হিরু চাচার সেক্রেটারি মিস ক্রেনের পরিচিত কণ্ঠস্বর।

মুহূর্তের জন্য থমকালাম। এটা বড় ধরনের পরীক্ষা। হিরু চাচা যদি আমাকে না চেনে, তা হলে কী করব জানি না আমি।

মিস কেন? প্রশ্ন করলাম।

হ্যাঁ।

মিস ক্রেন, আমি কিশোর। কিশোর পাশা।

ও প্রান্তে বিরক্তি।

কে?

কিশোর পাশা। হিরন পাশার ভাতিজা…গলা বুজে এল আমার।

ওহ, বললেন তিনি। চিনতে পারলাম না। একটু ধরো, তাঁকে দিচ্ছি।

ভয়ে বুকের ভিতরটা জমে গেল। মিস ক্রেনের সঙ্গে বছরের পর বছর ধরে কথা বলেছি আমি। আর এখন তিনি কিনা আমাকে চিনতে পারছেন না।

মুহূর্ত পরে, হিরু চাচার গমগমে কণ্ঠস্বর ভেসে এল।

হ্যালো, হিরন পাশা বলছি। কার সাথে কথা বলছি?

হিরু চাচা? ফিসফিসানির মত শোনাল আমার কণ্ঠ। ভয় পাচ্ছি এরপর না জানি কী শুনব।

কথা বলল, আমি শুনতে পাচ্ছি না, বলল হিরু চাচা। আমি জানি কথা বলা অনর্থক। আমার প্রিয় চাচা আমাকে চিনবে। হয়তো আমার কথা কখনওই শশানেনি। হিরু চাচার মুখ থেকে এ কথা বলে সইতে পারব না আমি।

আমি দুঃখিত, বললাম। আ…আমি মনে হয় রং নম্বরে ফোন করেছি।

ফোন কেটে দিলাম।

কমুহূর্ত নীরবে ডেস্কে বসে রইলাম। এবার আচমকা ঘুষি মারলাম ডেস্ক টপে।

কে আমি? ছাদের উদ্দেশে চেঁচালাম।

কে? কেউ কি বলে দেবে আমাকে? আমার মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে! পাগল হয়ে যাচ্ছি আমি!

দরজায় চাবি ঘোরানোর শব্দ পেলাম। এবার সদর দরজা খুলে যেতে লাগল। কে যেন বাসায় এসেছে।

কে হতে পারে? ঘড়ির দিকে চাইলাম। দুটো বেজে পাঁচ। চাচা-চাচী হতে পারে না। তবে কি ওরা একজন এসে নিশ্চিত হতে চাইছে অচেনা ছেলেটি-আমি-এখানে নেই?

পায়ের শব্দ। প্রথমে মেইন হল-এ, তারপর কিচেনে। কে যেন গুনগুন করছে। গুন-গুন? আজকে বুধবার!

মিসেস ওয়েসলি প্রতি বুধবার আসে অল্প-স্বল্প হাউসকীপিঙের কাজ করতে। কিছুদিন ধরে সে আমাদের হাউসকীপার। মিসেস ওয়েসলি সব সময় গুনগুন করে।

মিসেস ওয়েসলির মত নরম স্বভাবের, ভাল মানুষ দুনিয়ায় কম আছে। অন্যের কষ্ট দেখার চাইতে বরং নিজের হাত কেটে ফেলবে সে।

আমি যদি কোন রসিকতার স্বীকার হয়ে থাকি তবে মিসেস ওয়েসলি হতে পারে তার চূড়ান্ত পরীক্ষা।

দরজার কাছে গিয়ে ধীরে ধীরে ওটা খুললাম।

মিসেস ওয়েসলির পরনে প্যান্ট, সোয়েটার আর অ্যাপ্রন। প্রকাণ্ড এক ব্যাগ থেকে ক্লিনিং সাপ্লাই বের করছে। পুরানো এক লোকগীতির সুর ভাজছে সে।

আমি তাকে ভয় দেখাতে চাই না। কিন্তু আমি নিজেই ভয় পাচ্ছি। ।

এটা আমার জীবনের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। এক ধরনের বাজি ধরতে হচ্ছে আমাকে।

সাবধানে কিচেনের দিকে এগোলাম। মিসেস ওয়েসলি তার সাপ্লাই বিছিয়ে রাখছে কিচেন টেবিলের উপরে। পুরানো সুরটা গুন-গুন করে চলেছে।

মিসেস ওয়েসলি, মৃদু কণ্ঠে বললাম।

উ করে চেঁচিয়ে উঠে আমার দিকে ঘুরে দাঁড়াল সে। চোখাচোখি হলো আমাদের। মুখের চেহারা স্বাভাবিকের চাইতে লাল হয়ে গেল তার। কিছু বলতে শুরু করেছিল, কিন্তু হাতজোড়া উঠে এল বুকে।

মিসেস ওয়েসলি! আপনি ঠিক আছেন তো? চেঁচিয়ে উঠলাম আমি।।

জবাব দিল না সে। সভয়ে আঁতকে উঠে ধপ করে পড়ে গেল মেঝেতে। তার পাশে দৌড়ে গেলাম। কজি তুলে নিয়ে পালস দেখলাম। দুর্বল আর দ্রুত। মিসেস ওয়েসলির হার্ট অ্যাটাক হয়েছে এবং এর জন্য আমি দায়ী!

এক ছুটে ফোনের কাছে গিয়ে ৯১১ ডায়াল করলাম। বাসার ঠিকানায় তখুনি অ্যাম্বুলেন্স পাঠাতে বললাম। এবার দৌড়ে উপরে গিয়ে, একটা বালিশ খুঁজে নিয়ে নেমে এলাম। মিসেস ওয়েসলির মাথার তলায় খুঁজে দিলাম ওটা।

মহিলার চোখ বোজা। শ্বাস-প্রশ্বাস অনিয়মিত। দূরাগত অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন কানে এল, নিশ্চিত হলাম মিসেস ওয়েসলি শীঘি চিকিৎসা সেবা পাবে।

কিন্তু ওরা যখন আসবে তখন আমার থাকা চলবে না। আমাকে চলে যেতে হবে।

সদর দরজা খুলে দুদ্দাড় করে বাইরে বেরিয়ে এলাম। রাস্তা ধরে দৌড় দিলাম। অপর দিক থেকে আসা অ্যাম্বুলেন্সের পাশ কাটালাম।

মিসেস ওয়েসলির যত্ন নিয়েন, বললাম, সাইরেনের শব্দে চাপা পড়ে গেল আমার কথাগুলো উপলব্ধি করলাম এটা অনেকটা প্রার্থনার মত শুনিয়েছে।

রাস্তা ধরে দৌড়চ্ছি, এটা গিয়ে মিশেছে মেইন স্ট্রীটে। আর কোথায় যাব জানি না আমি, কী করব তাও জানা নেই।

স্কুলের ফুটবল মাঠের দিকে এগোলাম। আমার কজন টিমমেট, তাদের মধ্যে রব মিশেলও রয়েছে, প্রি-প্র্যাকটিস ক্যাচ করছে।

ওদেরকে দেখার জন্য থেমে দাঁড়ালাম। হঠাৎই ওদের একজন দেখতে পেল আমাকে। ওরা খেলা থামিয়ে চেয়ে রইল আমার দিকে। রব আমার দিকে আঙুল তাক করল। ও কিছু একটা বলতেই হেসে উঠল সবাই।

সেই পাগলটা, হয়তো এটাই বলেছে।

মেইন স্ট্রীটের দিকে দৌড়ে চললাম। জানি না কেন। কিন্তু কিছু একটা ওদিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে আমাকে। অবাক হয়ে লক্ষ করলাম জোরে ছুটছি না, জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছি না, কিন্তু দুগাল বেয়ে ঘাম গড়াচ্ছে।

একটু পরেই টের পেলাম ওটা ঘাম না, অশ্রু।

আমি কাঁদছি এবং সেজন্য লজ্জাও পাচ্ছি না। কাঁদছি কারণ আমার সঙ্গে যে এই মস্ত রসিকতাটা করেছে সে জিতে গেছে। কিংবা কেউ হয়তো কিছু করেনি। আমি নিজেই হয়তো কাজটা করেছি।

আমি হয়তো আমার পাপের শাস্তি পাচ্ছি। কিন্তু কী করেছি আমি? এবং এর শেষ কোথায়? আমি যে আর সইতে পারছি না।

সামনেই মেইন স্ট্রীট। একটু পরেই শেষ ঘণ্টা বাজবে এবং স্কুল ছুটি হয়ে যাবে। শদুয়েক ছেলে-মেয়ে বেরিয়ে আসবে হাসতে হাসতে, ছুটতে ছুটতে বাড়ির দিকে যাবে।

কিন্তু আমি কোথায় যাব? আমি যাদেরকে চিনি তারা তো আমাকে চেনে না। কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই আমার। কোন কিছু আঁকড়ে ধরার উপায় নেই।

আমার হয়তো রকি বীচ ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত। অন্য কোন শহরে। না, তা হয় না! আমি যেতে চাই না!

আমি আমার পরিবারকে ফেরত চাই। চাই চাচা-চাচী আবার আমাকে ভালবাসুক। আমি চাই ডন যেন আমাকে ভয় না পায়।

আমি চাই বন্ধুরা আমাকে স্বাগত জানাক এবং আমাকে আবার তাদের জীবনের অংশ করে নিক।

আমি বায়োলজি ক্লাসে বসে মি. হালবার্টকে আবারও দেখতে চাই।।

সার্জেন্ট কলিন্সের সঙ্গে আবারও বন্ধুত্বের সম্পর্ক চাই।

আমি চাই ক্যাণ্ডির দোকানে ঢোকার পর বুড়ো জেসাপ জানুক আমার পছন্দের ক্যাণ্ডি কী।

আমি চাই মিসেস ওয়েসলি সুস্থ হয়ে উঠুক।

কিন্তু আমি এ-ও অনুভব করছি একদিনের মধ্যে যদি আত্মপরিচয় প্রমাণ করতে না পারি তবে সার্জেন্ট কলিন্স আমাকে গ্রেপ্তার করাবেন।

মুখ তুলে চাইলাম। লক্ষ করিনি কখন মেইন স্ট্রীট পেরিয়ে শহরের দূর প্রান্তে চলে এসেছি।

চারধারে চোখ বুলালাম। আশপাশে কেউ নেই। না রাস্তায়, না কোন দোকানে।

ব্যাপারটা অদ্ভুত। হঠাৎ করেই চারদিক নির্জন হয়ে গেছে।

এক ঘণ্টাধ্বনির মৃদু শব্দ কানে এল। ঘুরে দাঁড়ালাম। নতুন চাইনিজ রেস্তোরাঁ থেকে আসছে। রেস্তোরার জানালার দিকে চেয়ে রয়েছি, ঘণ্টাধ্বনি যেন জোরাল হলো।

টলমল পায়ে মেইন স্ট্রীট পেরিয়ে রেস্তোরাটার দিকে এগোলাম। এখনও কাউকে আশপাশে দেখতে পেলাম না। এমনকী রাস্তা দিয়ে কোন গাড়িও যাচ্ছে না।

এই রেস্তোরাটা আমাকে টানছে কেন? চিন্তাটা মাথায় এল। কেন জানি এটাকে পরিচিত লাগছে। কিন্তু কেন?

ঘুরে দাঁড়িয়ে হাঁটা ধরব, কানে তালা লাগিয়ে দিল জোরাল ঘণ্টাধ্বনি।

কানে দুহাত চাপা দিয়ে জানালার দিকে চাইলাম-জানালার ওপাশে দাঁড়িয়ে, আমার দিকে চেয়ে মৃদু হাসছেন মিস লি! আমাকে হাতছানি দিয়ে কাছে ডাকলেন তিনি!

চুম্বকের টানে যেন রেস্তোরার জানালায় সেঁটে গেলাম আমি। মিস লি তখনও আমার দিকে চেয়ে মুচকি হাসছেন।

কী ব্যাপার! আপনি আমার কাছে কী চান? চেঁচিয়ে উঠলাম।

ঘণ্টাধ্বনি সহসা থেমে গেল। পিনপতন নিস্তব্ধতা। দৃষ্টিসীমার মধ্যে কেউ নেই।

তুমি কেন এখানে এসেছ তুমি জাননা, কিশোর, বললেন মিস লি। অন্তত আমার তাই মনে হলো। আমি ওঁর কণ্ঠ শুনেছি, যদিও ঠোট নড়তে দেখিনি এবং তার হাসি বন্ধ হয়নি এবং কাচের জানালার ওপাশে দাঁড়িয়ে রয়েছেন তিনি।

কিশোর? আপনি আমাকে কিশোর বললেন? প্রশ্ন করলাম।

সময় হয়েছে, কিশোর, বললেন তিনি। আবারও গলা শুনলাম তার, কিন্তু ঠোট নড়েনি। মৃদু হাসি ধরে রেখেছেন মুখে।

কীসের সময় হয়েছে? প্রশ্ন করলাম। এই খেলা শেষ হওয়ার সময়? নাকি কী ঘটছে তা জানার সময় হয়েছে?

তোমার ভাগ্য জানার সময় হয়েছে, কিশোর।

সাদা এক ন্যাপকিন খুললেন তিনি। ভিতরে এক ফরচুন কুকি। ন্যাপকিনটা ফেলে দিয়ে কুকিটা তুলে ধরলেন মিস লি।।

ওটার দিকে চাইলাম। দুনিয়ার সবখানে চাইনিজ রেস্তোরায় এরকম ফরচুন কুকি দেখা যায়।

এসব কিছুর পিছনে একটা ফালতু ফল কুকি? জিজ্ঞেস করলাম।

দেখো, কিশোর, জবাব এল। মিস লিক কণ্ঠ আমার মাথার ভিতরটা ভরিয়ে তুলল। ফরচুন কুকিটা ভাঙলেন তিনি। গোটা ঘটনাটা যেন স্লো মোশনে ঘটছে।

কুকিটা খসে পড়ল মেঝেতে। মিস লি ছোট, সাদা কাগজের টুকরোটা তুলে ধরলেন। ওটার দিকে চেয়ে স্মিত হাসলেন। এবার  আবার আমার দিকে চাইলেন।

এখানে তোমার ভাগ্য লেখা আছে, কিশোর। পড়ো। পড়ে দেখো।

কাগজের টুকরোটা কাঁচের জানালায় তুলে ধরলেন তিনি। ছোট ছোট অক্ষরে লেখা পড়া কঠিন। প্রথমটায় পড়তে পারলাম না।

চোখ পিটপিট করে পড়ার চেষ্টা করছি, দূরে একটা ঘণ্টা বাজার শব্দ হলো। স্কুল ছুটি হয়ে গেছে।

ফরচুনটা অস্পষ্ট। আমি মর্মোদ্ধার করতে পারলাম না। এবার হঠাই চোখের সামনে পরিষ্কার হয়ে গেল।

ওতে লেখা: আজ তুমি সম্পূর্ণ নতুন একজন মানুষ হিসেবে দিন শুরু করবে। নতুন মানুষ! উনি তো আগেও এটা আমাকে বলেছিলেন। কী মানে এর?

ওঁর দিকে চাইলাম।

কী বলছেন আপনি? এর মানে কি আমি সম্পূর্ণ নতুন মানুষ? কীভাবে…সেটা কীভাবে সম্ভব?

আমরা আমাদের নিয়তিকে এড়াতে পারি না, কিশোর, আমার মাথার মধ্যে মৃদু কণ্ঠে বলল মিস লির কণ্ঠ। চেষ্টা করলে শয়তান আমাদের পথ আগলে দাঁড়াবে।

এবার আলোর ঝিলিকের সঙ্গে সঙ্গে মিলিয়ে গেলেন তিনি। জানালাটা আবারও অন্ধকার, এবং ফাঁকা হয়ে গেল।

রাস্তার দিকে ঘুরে দাঁড়ালাম। এটাই কি জবাব? এটাই কি আমার নিয়তি যে আমি একদম নতুন মানুষে পরিণত হব? কিন্তু আমি তো তা চাইনি! আমি পুরানো কিশোর পাশাই থাকতে চেয়েছি।

অনেক দেরি হয়ে গেছে, কিশোর।

ঘুরে দাঁড়ালাম।

মিস্টার হালবার্ট! চেঁচিয়ে উঠলাম। কোথায় ছিলেন আপনি?

তোমার জন্যে অপেক্ষা করছি, কিশোর। তোমার এখন সম্পূর্ণ নতুন মানুষ হওয়ার সময় এসেছে। পুরানো কিশোর পাশা এখন…হারিয়ে যাবে। এবং তিনি কর্কশ কণ্ঠে হেসে উঠলেন।

কী? কী বলতে চান? জবাব চাইলাম। এবার মেইন স্ট্রীটের দিকে চাইলাম।

এখনও নীরব, তবে হঠাই রাস্তাটা ভরে উঠল মানুষ-জনে। সবাইকে আমি চিনি। হাঁটছে। রাস্তা ধরে। আমার দিকে। নিঃশব্দে।

একটা বৃত্ত তৈরি করে আমার দিকে এগিয়ে আসছে তারা। আমার চাচা। আমার চাচী। ডন। আমার বন্ধু মুসা, রবিন, টিমমেটরা। হাসপাতালের লোকেরা, মি. জেসাপ, সার্জেন্ট কলিন্স, মিসেস ওয়েসলি (মিসেস ওয়েসলি?), মিসেস বার্টন, মি. লাউয়ি, মিসেস পোর্টার, আমার হিরু চাচা, এবং আরও অনেকে।

বৃত্তটা ক্রমেই কাছিয়ে আসছে। নিঃশব্দে, ধীরে ধীরে ঘিরে ফেলছে আমাকে। বন্দি হয়ে পড়ছি আমি।

সবাই হাসছে, দুহাত বাড়িয়ে রেখেছে, আমাকে ছুঁতে চাইছে, আরেকটু হলেই ছুয়ে দেবে, এবং আমার কাঁধ প্রচণ্ড ব্যথায় দপ-দপ করছে। হঠাৎই সবার মুখ হয়ে গেল মিস লি-র মত! আর্তচিৎকার ছাড়লাম আমি!

সোজা হয়ে বসলাম। আমি আমার বিছানায়, নিজের কামরায়।

কাঁধে সাঙ্ঘাতিক ব্যথা। সারা দেহ ঘামে ভিজে গেছে।

ঘড়ির দিকে চাইলাম। সকাল ৭:২৫।

আচমকা চাচা-চাচী হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকল।

কিশোর, কিশোর, তোর ঘুম ভেঙেছে, তুই ঠিক আছিস, আল্লাকে হাজারও শুকরিয়া! চাচী প্রায় ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল।

কেমন ফীল করছিস? রাশেদ চাচা প্রশ্ন করল। ডাক্তার ঠিকই বলেছিল। জ্বরটা শেষমেশ কাটল।

জ্বর? ডাক্তার? বালিশে মাথা রাখলাম। কাঁধের ব্যথায় গুঙিয়ে উঠলাম।

ব্যথাটা কয়েকদিন থাকবে। বিশ্রীভাবে পড়ে গিয়েছিলি কিনা, চাচা বলল।

চাচা, চাচী…কী ঘটছে বলো তো? মনে হচ্ছে আমি…কিছু জিনিস…মিস করছি…।

তবে শোন, বলল চাচী, কালকে ফুটবল প্র্যাকটিসের পর টিমমেটদের সাথে তুই নতুন চাইনিজ ফাস্ট ফুডের দোকানটায় গিয়েছিলি।

ফু লিং? প্রশ্ন করলাম, জানি জবাবটা কী হবে।

হ্যাঁ, চাচা বলল। তোরা কটা এগ রোলের অর্ডার দিয়েছিলি, সস সহ তোদেরকে সেগুলো সার্ভ করা হয়। তুই তোর এগ রোলটায় সস মাখিয়ে দুটো কামড় দিয়েছিলি, তারপরই শুরু হয়ে যায় অ্যালার্জিক রিঅ্যাকশন।

তুই জ্ঞান হারাস, চাচী বলল। পড়ে গিয়ে বাঁ কাঁধে ব্যথা পাস, যে জন্যে ওটা এত টাটাচ্ছে।

ওরা হাসপাতাল থেকে তখুনি অ্যাম্বুলেন্স আনায়। ডাক্তার বলেন ভর্তি করার দরকার নেই। বাসায় শুয়ে ঘুমোলেই ঠিক হয়ে যাবে। উনি বলেন রাতটা হয়তো খারাপ কাটবে, কিন্তু সকালে সব স্বাভাবিক হয়ে যাবে।

চাচী আমার ভ্রূ ঘষল, এখনও ভেজা রয়েছে।

রাতটা কি খারাপভাবে কেটেছে, বাপ? দেখে তো তাই মনে হচ্ছে।

চাচীর দিকে চাইলাম।

চাচী, এত ভাল আমার এর আগে আর কখনও লাগেনি, বলে তাকে জড়িয়ে ধরলাম। তুমি ভাবতেও পারবে না কতটা ভাল লাগছে!

চাচী হেসে উঠে পাল্টা জড়িয়ে ধরল আমাকে।

যা ভয় পাইয়ে দিয়েছিলি! বলল।

আমি নিজেও কম ভয় পাইনি, বললাম।

সত্যিই? কীভাবে? তোর তো জ্ঞানই ছিল না, চাচা বলল।

ওসব কথা থাক, চাচা। এগ রোল সসের অ্যালার্জিক রিঅ্যাকশন অদ্ভুত সব স্বপ্ন দেখায়। আমার শরীর আউট হয়ে গেলেও মন হয়নি।

মাথা ঝাকাল চাচা।

যাক, জ্বরটা কেটে গেছে। দুঃস্বপ্ন আর নেই। বাস্তব দুনিয়ায় ফিরে এসেছিস তুই।

ফিরতে পেরে খুব ভাল লাগছে, বললাম। আমি ক্লান্ত, কিন্তু এত খুশি জীবনে আর কখনও হইনি।

চাচা ঘড়ি দেখল।

অফিসে যাওয়ার সময় হলো। টেক ইট ইযি, চ্যাম্প। ডাক্তার বলেছেন পুরোপুরি সেরে না ওঠা পর্যন্ত ফুটবল বন্ধ।

ঠিক আছে, বলে কাঁধ ডললাম। চাচা বেরিয়ে গেল। চাচী দরজার দিকে এগোল।

আরেকটু ঘুমিয়ে নে, তারপর তোকে নাস্তা দেব, চাচী বলল। বেডরুমের দরজায় থমকে দাঁড়িয়ে আমার দিকে ঘুরে চাইল। ওহ, ভুলেই গেছিলাম। ফু লিঙের লোকেরা এই ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছে। চিকিৎসার সমস্ত খরচ ওরা দিতে চেয়েছে আর আমাদেরকে যে কোন সময় ডিনারের দাওয়াত দিয়ে রেখেছে।

ভাল। তবে এর পরেরবার আমি আর এগ রোল সস খাব না, বললাম।

হ্যাঁ, চাচী বলল, ওরা খুব ভাল মানুষ। ওরা এমনকী একটা গেট-ওয়েল গিফটও পাঠিয়েছে। তোর ড্রেসারে রয়েছে।

চাচী বেরিয়ে গিয়ে পিছনে দরজা লাগিয়ে দিল। আমি উঠে বসে চারধারে নজর বুলালাম। গোটা ব্যাপারটাই স্বপ্ন ছিল। কিন্তু এতই বাস্তব যে আমি আর অমন স্বপ্ন দেখতে চাই না।

ড্রেসারের দিকে চাইলাম। চাচী সাদা এক ন্যাপকিন রেখেছে ওটার উপরে। উপহারটা কী কে জানে।

আস্তে আস্তে বিছানা ছেড়ে ড্রেসারের কাছে গেলাম।

ন্যাপকিনটা খুললাম। ভিতরে এক ফরচুন কুকি।

ন্যাপকিনটা মেঝেতে পড়তে দিলাম। কুকিটা তুলে ধরলাম। ভেঙে খুলে ফেললাম ওটাকে। কুকিটা মেঝেতে পড়ে গেলে কাগজটার দিকে চাইলাম।

ওতে লেখা, আজ তুমি সম্পূর্ণ নতুন একজন মানুষ হিসেবে দিন শুরু করবে। অনুভব করলাম নাড়ির গতি দ্রুততর হলো। অস্পষ্ট হাসির শব্দ কানে এল। সরাসরি বেডরুমের আয়নার দিকে চাইলাম। নিজের প্রতিবিম্বটার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রইলাম।

এসময় তাঁকে দেখতে পেলাম। আমার দিকে চেয়ে মৃদু হাসছেন। মুহুর্তের জন্য। কিন্তু কোন সন্দেহ নেই এটি তিনিই। আয়না থেকে আমার দিকে পাল্টা চেয়ে ছিলেন মিস লি। মুখে স্মিত হাসি।

এবার উধাও হয়ে গেলেন তিনি। হাসির শব্দটা মিলিয়ে গেল।

নড়তে সাহস পাচ্ছি না আমি। আয়নায় নিজের দিকে স্থিরদৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছি। দুঃস্বপ্নটা কি সত্যি শুরু হতে যাচ্ছে? এই ঘর থেকে বেরনোর পর কেউ কি আমাকে চিনবে না?

বেডরুমের দরজা খুললাম। নীচে, কিচেনে চাচী আর ডন কথা বলছে, হাসছে।

ধীরে সুস্থে সিড়ি ভেঙে নেমে গেলাম। নীচে এখন আমি, কিচেনের দরজার কাছে। ভিতরে পা রাখলাম। চাচী আর ডন কথা থামিয়ে আমার দিকে চাইল। চেয়ে রয়েছে একদৃষ্টে।

হাই, আমি বললাম। সামান্য বিরতি, কেউ কিছু বলল না। এবার চাচীর মুখে হাসি ফুটল।

খিদে পেয়েছে? প্রশ্ন করল। ডন দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরল আমাকে।

সে আর বলতে! বললাম। হাতে শক্ত করে ধরে থাকা ফরচুনটা দলা পাকিয়ে ছুঁড়ে মারলাম ওয়েস্ট পেপার বাস্কেটে। দারুণ লাগছে আমার, চাচী, বলে প্রাণ খোলা হাসি দিলাম। মনে হচ্ছে আমি নতুন একজন মানুষ, বলতে গিয়ে চেপে গেলাম।

আমার আসলে পুরানো কিশোর পাশার মতই অনুভূতি হচ্ছে। এবং আমার জন্য সেটাই যথেষ্ট।

Categories: