ঘড়ির গোলমাল – তিন গোয়েন্দা – রকিব হাসানপ্রথম প্রকাশঃ মার্চ, ১৯৯০
ধরে রাখো, ছেড়ো না, আদেশ দিলো মারকো।
মুসার হাত মুচড়ে পিঠের ওপর নিয়ে এসেছে ডিংগো।
টেবিল থেকে একটা কাগজ কাটার ছুরি তুলে নিয়ে কিশোরের বুকে ঠেকিয়েছে মারকো। ভয়ানক কণ্ঠে বললো, দাও, যতোগুলো মেসেজ আছে।
চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে কিশোর। মুসা দেখতে পাচ্ছে না তাকে। সে চুপ, থাকলো না। ছাড়া পাওয়ার চেষ্টা চালিয়েই যাচ্ছে। কারাতের স্কুলে শিখেছে, কি করে কব্জি ছাড়াতে হয়। হঠাৎ মাছের মতো মোচড় দিয়ে উঠলো তার শরীরটা। সোজা হয়ে গেল হাত। সামনের দিকে ঝটকা দিয়ে ঝুঁকে গেল মাথা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই মুসার পিঠের ওপর দিয়ে উড়ে চলে গেল ডিংগো। বাড়ি খেলো মারকোর গায়ে। তাকে নিয়ে দড়াম করে পড়লো মাটিতে।
জলদি ভাগো! চেঁচিয়ে উঠলো কিশোর। মেঝেতে মাথা ঠুকে গেছে মারকোর, চিত হয়ে আছে। তার বুকের ওপর চেপে রয়েছে ডিংগো। দুজনেরই হতবিহ্বল অবস্থা। মারকোর হাত থেকে মেসেজটা টেনে নিয়ে দরজার দিকে দৌড় দিলো কিশোর। একই সময়ে দরজায় পৌঁছলে মুসা। ধাক্কা লেগে গেল দুজনের।
ঘড়ি! চিৎকার করে বললো মুসা। ফেলে এসেছো!
থাকুক, থামলো না কিশোর। ওটা লাগবে না।
হাঁপাতে হাঁপাতে এসে গাড়িতে উঠলো ওরা। কিশোর বললো, হ্যানসন, গাড়ি ছাড়ুন, কুইক!
তিন গোয়েন্দার সঙ্গে অনেক দিনের পরিচয় হ্যাঁনসনের, জানে এই সব জরুরী মুহূর্তে কি করতে হয়। বিন্দুমাত্র দেরি করলো না সে, প্রশ্ন করলো না, ছেড়ে দিলো গাড়ি।
আরি, কিশোর, বলে উঠলো মুসা। মেসেজটা তো ছিঁড়ে ফেলেছো!
হাতের দিকে তাকালো কিশোর। তাই তো! অর্ধেকটা ছিঁড়ে নিয়ে এসেছে। বাকি অর্ধেক নিশ্চয় রয়ে গেছে মারকোর হাঙে।
গেল! নিরাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়লো মুসা।
ফিরে গিয়ে নিয়ে আসবো নাকি? নিজেকেই যেন প্রশ্ন করলো কিশোর।
আবার! আর পারবো না। একবারই ছাড়া পেয়েছি অনেক কষ্টে।
নাহ, গিয়েও আর লাভ নেই। এতোক্ষণ নিশ্চয় বাকি অর্ধেক লুকিয়ে ফেলেছে। মারকো। জিজ্ঞেস করলে স্রেফ অস্বীকার করবে।
আর কোথাও যাবো? জিজ্ঞেস করলো হ্যানসন। নাকি সোজা ইয়ার্ডে?
না, যাবো বললো কিশোর। ভুল বারকেনের ওখানে গিয়েছিলাম আমরা জেসিয়াস নয়, আমাদের দরকার হিরাম বারকেনকে, এখন বুঝতে পারছি। ঠিকানা বলে সিটে হেলান দিলো সে।
আচ্ছা, কিশোর, মুসা বললো। মেসেজের জন্যে এতো আগ্রহ কেন। ব্যাটাদের?
বুঝতে পারছি না। মিস্টার কুকের ব্যাপারে এমন কিছু জানে হয়তো, যা আমরা জানি না। মেসেজগুলোকে মূল্যবান ভাবছে। কেন ভাবছে, সেটা আমাদের জানতে হবে।
কিভাবে?
মেসেজের মর্ম উদ্ধার করে।
যদি পারা যায়! নিষ্প্রাণ হাসি হাসলো মুসা। তততদিনে চুল-দাড়ি পেকে সব সাদা হয়ে যাবে আমাদের, মরার সময় হয়ে যাবে। তাছাড়া পুরো মেসেজটা থাকলেও এক কথা ছিলো, ছিঁড়ে তো এনেছে মাত্র অর্ধেকটা।
চেষ্টা তো করতে হবে, বলে চুপ হয়ে গেল কিশোর।
গাড়ি থামলো। বোধহয় এই জায়গাই, হ্যানসন বললো। এবার কোনো বিপদ আশা করছেন? আমি আসবো?
না। বিপদে পড়লে জোরে জোরে চিল্লাবো। মুসা, এসো যাই।
স্প্যানিশ ধাঁচের ছোট্ট সুন্দর একটা বাড়ি, বাগানে ঘেরা। গোলাপের যত্ন করছেন এক বৃদ্ধ। পায়ের শব্দে মুখ ফিরিয়ে তাকালেন।
মিস্টার হিরাম বারকেন? জিজ্ঞেস করলো কিশোর।
মাথা ঝাঁকালেন বৃদ্ধ। হ্যাঁ, আমি। হাতের দস্তানা খুলতে খুলতে জিজ্ঞেস করলেন, কি চাও? অটোগ্রাফ? মৃদু হাসলেন তিনি। বহু বছর পরে আবার অটোগ্রাফ…আ স্ক্রীম অ্যাট মিডনাইট-এ গোয়েন্দার অভিনয় করার পর কতো লোক যে এসেছিলোনাটকটা নিশ্চয় শোনননি? নাকি?
না, স্যার। খুব জমজমাট নাটক হয়েছিলো, তাই না?
খালি জমজমাট! রোম খাড়া করে দিয়েছিলো কতো লোকের। আর চেঁচাতেও পারতো বটে হ্যারি ক্লক। হ্যারি আর হেনরি, দুজনে মিলেই লিখেছিলো। হ্যারির পুট, আর হেনরির কলম। ঘুরিয়ে, পেঁচিয়ে এমন এক কাহিনী দাঁড় করিয়েছিলো…যাকগে, ওসব পুরনো ইতিহাস। তা, তোমাদের অটোগ্রাফ… খাতার জন্যে হাত বাড়ালেন মিস্টার বারকেন।
অটোগ্রাফ নয়, স্যার…
তাহলে কি? কিছুটা নিরাশই মনে হলো ভদ্রলোককে, তবে হাসি মলিন হলো না। চাদা? নাকি নতুন ম্যাগাজিনে বিজ্ঞাপন?
না, ওসব না, স্যার। মেসেজ। মিস্টার কুকের মেসেজ।
ও, মেসেজ! উজ্জ্বল হয়ে উঠলেন আবার বারকেন। নিশ্চয়। বহুদিন ক্লকের কোনো খবর নেই, বছর বছর ক্রিস্টমাস কার্ড ছাড়া। এই প্রথম এলো চিঠি। এসো, ঘরে এসো, দেখি খুঁজে পাই কিনা।
চমৎকার সাজানো গোছানো একটা ঘরে ওদেরকে নিয়ে এলেন বারকেন। সবার আগে চোখে পড়ে পুরনো স্টাইলের বিশাল এক টেপ রেকর্ডার। শেলফে সাজানো সারি সারি টেপের বাক্স।
ডেস্কের ড্রয়ার থেকে একটা খাম বের করলেন তিনি। এই যে। খুলে পড়েছি। সেই পুরনো হ্যারিসন কুক, দুর্বোধ্য সব কথাবার্তা। একটা শব্দও বুঝিনি।
মেসেজটা হাতে নিলো কিশোর। ঝুঁকে এলো মুসা। লেখা রয়েছেঃ
টেক ওয়ান লিলি; কিল মাই ফ্রেণ্ড এলি।
পজিটিভলি নাম্বার ওয়ান।
টেক আ ব্রুম অ্যাণ্ড সোয়্যাট আ বী।
হোয়াট ইউ ডু উইদ ক্লথস, অলমোস্ট।
নট মাদার, নট সিসটার, নট ব্রাদার; বাট পারহ্যাপস ফাদার।
হাইমস? হামস? হোমস? অলমোস্ট, নট কোয়াইট।
খাইছে! এটা কবিতা না, দাঁত ভাঙার মেশিন?
কিংবা মাথা ভাঙার হাতুড়ি, হেসে বললেন বারকেন। মানে বোঝার অনেক চেষ্টা করেছি, বিরক্ত হয়ে হাল ছেড়ে দিয়েছি শেষে। যতদূর জানি, এলি নামে হ্যারির কোনো বন্ধু ছিলনা। অথচ পড়ে মনে হয়, বন্ধু এলিকে খুন করে তার, বুকে একটা পদ্ম রেখে দেয়ার কথা ভাবছে, তাই না? শব্দ করে হাসলেন। সাথে একটা নোটও লিখে দিয়েছে। কেউ নিতে এলে যেন মেসেজটা তাকে দিয়ে দিই। ও, ভালো কথা, তোমাদের পরিচয়ই জানা হলো না এখনও।
নিশ্চয়ই, পকেট থেকে কার্ড বের করে দিলো কিশোর।
কার্ডটা পড়লেন মিস্টার বারকেন। হাত মেলালেন দুই গোয়েন্দার সঙ্গে। তোমরা গোয়েন্দা জেনে খুশি হলাম। একটা কথা, হ্যারির ব্যাপারে যখন আগ্রহ, নিশ্চয় তার দুএকটা নাটক শুনতে চাইবে? মানে, নাটকে তার চিৎকার। আজকালকার ছেলে তোমরা, টেলিভিশন দেখে অভ্যাস। রেডিওতে নাটকের মজা যে কী, জানো না। শুনবে? ওই যে টেপগুলো দেখছো, অনেক নাটক রেকর্ড করা আছে ওগুলোতে। আমার অভিনয় করা সমস্ত নাটক। প্রত্যেকটাতে আছে হ্যারিসন ক্লকের কণ্ঠ।
লোভ হলো দুই গোয়েন্দার। রেডিওর নাটকের কথা অনেক শুনেছে ওরা। রাশেদ পাশাও মাঝে মাঝেই বলেন। সময় থাকলে এই সুযোগ ছাড়তো না, কিন্তু। এখন মোটেই সময় নেই ওদের। মিস্টার বারকেনকে অনেক ধন্যবাদ দিয়ে, শুড় বাই জানিয়ে মেসেজটা নিয়ে বেরিয়ে এলো ওরা। গাড়িতে এসে উঠলো।
হ্যানসনকে ইয়ার্ডে ফিরে যেতে বলে মুসার দিকে তাকালো কিশোর। টিম। আর রবিন কি করেছে কে জানে। সবগুলো মেসেজ একসাথে পেলে সমাধান। করতে সুবিধে হতে গিয়ে এখন ওদেরকে হেডকোয়ার্টারে পেলেই হয়। আর
হেডকোয়ার্টারেই রয়েছে তখন রবিন আর টিম, তবে তিন গোয়েন্দার নয়, পুলিশ হেডকোয়ার্টারে। নতুন ডিউটি অফিসার রবিনকে চেনে না। দুজনকে নিয়ে ঢুকলো চীফের অফিসে। বয়সের কোন
আরে, রবিন তুমি? বলে উঠলেন ইয়ান ফ্লেচার।
চীফকে দেখে হাঁপ ছাড়লো রবিন। হ্যাঁ, স্যার, ধরে আনা হয়েছে।
কি করেছিল?
কি করেছিলো, জানালো ডিউটি অফিসার।
সরি, রবিন, তোমাদের কাছ থেকে এটা আশা করিনি, আন্তরিক দুঃখিত মনে হলো ফ্লেচারকে। খুব অন্যায় করেছে। এতো জোরে গাড়ি চালানো। অন্যের তো বটেই, নিজেরও ক্ষতি হতে পারতো।
ইচ্ছে করে করিনি, স্যার। আমাদের তাড়া করা হয়েছিলো। আরেকটা গাড়ি। ধরে ফেলেছিলো আমাদের। সময়মতো ইনি না গেলে, ডিউটি অফিসারকে দেখালো রবিন। কিছু একটা করতে আমাদের।
তাড়া করেছিলো? হাসি ফুটলো চীফের মুখে। নতুন কোনো কেস-টেস?
হ্যাঁ, স্যার, একটা চেঁচানো ঘড়ি।
বলে চেঁচানো ঘড়ি! আশ্চর্য তো! ঘড়ি আবার চেঁচায় কিভাবে?
আমাদের গাড়িতেই আছে, স্যার। বললে এনে দেখাতে পারি।
অফিসারের দিকে চেয়ে ইঙ্গিত করলেন ফ্লেচার। যাও ওদের সঙ্গে। নিয়ে এসো।
ফিরে এলো খানিক পরে। খালি হাতে। মাথা নাড়লো অফিসার, নেই। ঘড়ি নেই। ওরা বলছে একটা ব্যাগ ছিলো সেটাও দেখলাম না।
আমার বিশ্বাস, স্যার, মুখ কালো হয়ে আছে রবিনের, চুরি করে নিয়ে গেছে!
.
এতো দেরি করছে কেন ওরা? মুসা বললো।
মিস্টার বারকেনের কাছে পাওয়া মেসেজটা টেবিলে রেখে ঝুঁকে দেখছিলো কিশোর, সোজা হয়ে তাকালো। যাই, দেখি, আসছে কিনা।
সর্ব-দর্শনে গিয়ে চোখ রাখলো সে। জানালো, টিমের গাড়ি সবে ঢুকেছে ইয়ার্ডে। .
কিছুক্ষণ পর সাঙ্কেতিক টোকা পড়লো দুই সুড়ঙ্গের দরজায়।ট্র্যাপোর খুলে দিলো মুসা। উঠে এলো রবিন আর টিম। ক্লান্ত, বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে ওদের।
মেসেজ পেয়েছো? জিজ্ঞেস করলো।
হ্যাঁ, তা পেয়েছি, বসতে বসতে বললো রবিন। কিচ্ছু বোঝা যায় না।
দেখি? হাত বাড়ালো কিশোর। ঘড়িটা কই?
নেই।
নেই মানে? তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছে গোয়েন্দাপ্রধানের দৃষ্টি। হারিয়ে ফেলেছো?
চুরি হয়ে গেছে, টিম জানালো, পুলিশ স্টেশনের বাইরে গাড়ি পার্ক করেছিলাম…
পুলিশ স্টেশন? মুসার প্রশ্ন। সেখানে কি করছিলে? ডাকাতে ধরেছিলো নাকি?
বেশি জোরে চালাচ্ছিলাম বলে পুলিশে ধরেছিলো। আগেই পিছু নিয়েছিলো একটা গাড়ি, পাহাড়ের মাঝামাঝি আসতেই ভাড়া করলো। ছুটলাম…
কি হয়েছিলো, জানানো হলো মুসা আর কিশোরকে।
ছেড়ে দিলেন আমাদেরকে চীফ, বলা শেষ করলো রবিন। বলে দিয়েছেন, জরুরী কিছু জানলে, কিংবা বিপদের সম্ভাবনা দেখলেই যেন তাকে জানাই।
হুঁ, আনমনে মাথা ঝোঁকালো কিশোর। জানানোর সময় এখনও হয়নি। কিছুই জানি না এখনও। পুলিশ বিশ্বাস করবে না, হাসবে। ভাববে, হ্যারিসন। ক্লকের রসিকতা। সাহায্য তো পাবোই না, বরং বেকায়দায় পড়ে যেতে পারি।
মারকো আর ডিংগোর কথা বললো কিশোর, মাঝে মাঝে কথা যোগ করলো মুসা।
তাহলে বুঝতেই পারছো, কিশোর বললো! মেসেজ আর ঘড়ির ব্যাপারে ইনটারেস্ট আছে আরও অনেকের। হতে পারে, তোমাদেরকে যে তাড়া করেছে, সে-ই ঘড়িটা চুরি করেছে। পুলিশের সাইরেন শুনে পালিয়ে গিয়ে লুকিয়ে ছিলো কোথাও, তারপর সুযোগ বুঝে গিয়ে হাজির হয়েছে থানার কাছে। কেউ নেই দেখে টুক করে তোমাদের গাড়ি থেকে ব্যাগটা তুলে নিয়ে গেছে।
কিন্তু সেই লোকটা কে? রবিন বললো। ঘড়ি আর মেসেজের ব্যাপারে এতো আগ্রহ কেন?
লারমারের কথা ভুলে গেছো? সে জানে ঘড়ির কথা। আরও কাউকে বলে থাকতে পারে। এক কান দুকান হতে হতে দশ কান হতে বাধা কোথায়? না। জেনে ভুল করে মারকো আর ডিংগোকেও অনেক কথাই বলে এসেছি আমরা। ঘড়ি আর মেসেজ তো বটেই, আমরা কি করছি, সেটাও জেনে গেছে ওরা।
দূর, আমার এসব ভাল্লাগছে না! বাতাসে থাবা মারলো মুসা। তা রবিনের মেসেজে কি লেখা? প্রলাপ-ই?
রবিনের আনা মেসেজটা টেবিলে রাখলো কিশোর। প্রলাপ নয়। তবে একই রকম কঠিন।
কেন ভণিতা করছো? গুঙিয়ে উঠলো মুসা। এটাকে শুধু কঠিন বলে? হাতুড়ি, বলো, হাতুড়ি, মাথায় লাগলেই খুলি খতম, মগজ ঘোলা।
হয়নি, হাসলো কিশোর। হাতুড়ি নয়। ডাবল ব্যারেল শটগান। মাথায় লাগলে খুলি, মগজ সব উড়ে যাবে। এবার খুশি তো?
হ্যাঁ, এইবার ঠিক বলেছো, খুশি হয়ে মাথা দোলালো মুসা।
কাজের কথায় আসি এবার। দেখা যাক, শটগানের ভেতর থেকে কিছু। বেরোয় কিনা। রবিন, মিস্টার মিলার আর মিস রোবিডের সাথে যা যা কথা হয়েছে, সব খুলে বলল। কিছু বাদ দেবে না।
বলতে থাকলো রবিন। কিশোর শুনছে, চুপচাপ, কোনো প্রশ্ন নেই। নোট করে নিচ্ছে মনের খাতায়। রবিনের কথা শেষ হলে বিড়বিড় করলো আনমনে, তাহলে, মিস্টার মিলার হাসপাতালে, অসুস্থ। মিস্টার ক্লক তাঁর কাছেই ঘড়িটা পাঠিয়েছিলেন, মেসেজগুলো জোগাড় করে রহস্যের সমাধানের জন্যে। এখন প্রশ্ন হলো, সমাধান করলে কি বেরোবে?
নিশ্চয় এমন কিছু, যাতে চমকে যাবেন মিস্টার মিলার, রবিন বললো। ঘড়ির নিচে লাগানো মেসেজে তো তাই বলা হয়েছে।
হয়েছে। কিন্তু কি দেখে চমকাবে? কি ঘটবে? সেটাই বুঝতে হবে এখন আমাদের। দেখি চেষ্টা করে, মেসেজগুলোর মানে বুঝতে পারি কিনা।
টেবিলে রাখা মেসেজটার দিক থেকে চোখ ফেরালো টিম। মেসেজ?? নিঃসন্দেহ হতে পারছে না সে। একে মেসেজ বলছো? কোনো ধরনের কোড?
তাছাড়া আর কি? জবাব দিলো কিশোর। মিস্টার ক্লক আর মিস্টার মিলার, দুজনেই রহস্য ভালোবাসেন। ধাঁধা পছন্দ করেন। এমনও হতে পারে; কথাগুলোর মানে জানা আছে মিস্টার মিলারের, আর সেজন্যেই ওভাবে লিখেছেন মিস্টার ক্লক। নিজেরা ঠিকই বুঝতে পারবেন, অথচ অন্য কেউ পারবে না।
তোমার কি মনে হয়? হাত নাড়লো মুসা। তুমি পারবে?
আমার তো মনে হচ্ছে ক্রসওয়ার্ড পাজলস জাতীয় কিছু। প্রতিটি লাইনে একটি করে বিশেষ শব্দ পাওয়া যাবে, ছয় লাইনে ছয়টা। আর ছয়টা শব্দ দিয়ে হবে একটা বাক্য, যেটার মানে বোঝা যাবে সহজেই।
তাহলে তৈরি করে ফেলো বাক্যটা। প্রথম লাইন থেকেই শুরু করো। বলা হচ্ছে, হারিকেনের সময়ও শান্ত থাকে। হারিকেনের সময় কোন জায়গাটা সব চেয়ে শান্ত থাকে?
আমি জানি, বলে উঠলো টিম। স্টর্ম সেলার। ঝড়ের সময় যেখানে গিয়ে আশ্রয় নেয় মানুষ।
তার চেয়েও নিরাপদ ব্যাংকের ভল্ট, তিক্ত কণ্ঠে বললো রবিন।
কি জানি, নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটলো কিশোর, ভল্ট হতেও পারে। আসলেই তো নিরাপদ! এখানে দামী জিনিসের আভাস যখন পাওয়া যাচ্ছে।
দূর, হেঁয়ালি করে কথা বলো না তো! রেগে গেল মুসা।
হেঁয়ালি কোথায়? দামী জিনিস না হলে মেসেজগুলোর জন্যে পাগল হয়ে উঠেছে কেন কিছু লোক? আর দামী জিনিস ব্যাংকের ভল্টেই সব চেয়ে নিরাপদ। এবার দুনম্বর লাইনঃ জাস্ট আ ওয়ার্ড অভ অ্যাডভাইস, পোলাইটলি গিভেন। এখানে একটা শব্দই বিশেষভাবে চোখে লাগে, অ্যাডভাইস! মানে, উপদেশ। অ্যাডভাইসের আর কি কি মনে হয়? প্রতিশব্দ? মুসা, প্লীজ, ডিকশনারীটা দেবে?
বইয়ের তাক থেকে ডিকশনারী এনে দিলো মুসা।
নীরবে পাতা ওল্টালো কিশোর। এই যে, অ্যাডভাইসের প্রতিশব্দ, ওপিনিয়ন! দেখা যাক, মেলে কিনা? ব্যাংক ভল্ট…ওপিনিয়ন.. নাহ্, ঠিক হচ্ছে না।
তা তো হচ্ছেই না, জোর দিয়ে বললো মুসা। ভদ্র ভাষায় আমার পরামর্শ হলো…
মুসাআ! হাত তুললো কিশোর।
কড়া চোখে তার দিকে তাকালো মুসা। থামবো? কেন? আমার পরামর্শ…
তাকে অবাক করে দিয়ে তুড়ি বাজালো হঠাৎ কিশোর। ঠিক বলেছো! পরামর্শ! বলছে পোলাইটলি গিভেন অ্যাডভাইস। পরামর্শও এক ধরনের উপদেশ, ভদ্রভাবে দেয়া উপদেশ। মুসা, দিয়েছ সমাধান করে লাইনটার।
চোখ মিটমিট করছে গোয়েন্দা-সহকারী। যতোটা ভেবেছি, ততোটা কঠিন নয় তাহলে! আশ্চর্য!…কিন্তু আমি এখনও ব্যাংক ভল্টের সঙ্গে পরামর্শ মেলাতে পারছি না।
আমিও না। দেখি, বাকি শব্দগুলো বের করলে মেলে কিনা।
তিন নম্বর লাইন হলো, রবিন বললো, ওল্ড ইংলিশ বোম্যান লাভড ইট। কি ভালোবাসতো? বোম্যানরা একটা জিনিসই ভালোবাসে, সেটা তীর-ধনুক। সে ইংরেজই হোক, আর অন্য দেশীই হোক, আগের দিনেরই হোক, বা এখনকারই হোক।
বোম্যানের আরেকটা মানে যদি করা হয়? ভুরু কুঁচকে, মাথা নেড়ে বললো কিশোর। যদি ধরা হয়, তীরন্দাজ? তাহলে তো যুদ্ধও ভালোবাসবে।
ব্যাংক ভল্ট…পরামর্শ…তীরন্দাজ! চেঁচিয়ে উঠলো টিম, আরো ঘোল্য হয়ে। যাচ্ছে মগজ! মাথাটা এবার সত্যি খারাপ হবে!
কি জানি, ভ্রূকুটি করলো কিশোর। কিন্তু…
বাধা পড়লো কথায়। বাইরে থেকে শোনা গেল মেরিচাচীর কণ্ঠ, ডাকছেন। কিশোওর! কোথায় তোরা? খাবার ঠাণ্ডা হয়ে গেল।
চমৎকার! টেবিলে চাপড় মারলো মুসা। এই হলো গিয়ে একটা কথার মতো কথা। চুলোয় যাক মেসেজ। চলো খেয়ে নিই আগে।
টিমকে খেয়ে যাবার অনুরোধ করলো কিশোর। রাজি হলো না সে। বললো তাকে তাড়াতাড়ি যেতে বলে দিয়েছে মা। আরেকদিন খাবে।
ঠিক আছে, যাও তাহলে, কিশোর বললো। যোগাযোগ রাখবো। আর হ্যাঁ, লারমারের ওপর চোখ রেখো। বলা যায় না, সে-ই হয়তো তোমাদের পিছু। নিয়েছিলো। ঘড়ি চুরি করেছে।
রাখবো, ঘাড় নাড়লো টিম। লোকটাকে আমিও পছন্দ করি না। দেখলেই মনে হয়, কিছু একটা শয়তানীর তালে আছে।
মুখ খুলতে যাচ্ছিলো কিশোর, বাধা পড়লো আবার। টেলিফোন বাজছে। রিসিভার তুলে নিলো। তিন গোয়েন্দা। কিশোর পাশা বলছি।
হাল্লো। কণ্ঠটা প্রথমে চিনতে পরলো না কিশোর। হিরাম বারকেন। হ্যারিসন ক্লকের মেসেজ নিতে আজ বিকেলে এসেছিলে আমার বাড়িতে।
হ্যাঁ, স্যার!
তখন থেকেই ভাবছি তোমাদের জানাবো কিনা। তোমরা যাওয়ার পর একটা ঘটনা ঘটেছে।
ঘটনা?
আরেকজন এসেছিলো মেসেজ চাইতে। লম্বা, কালো চুল, দক্ষিণ আমেরিকার লোক বলে মনে হলো। সঙ্গে তার এক বন্ধু, বেঁটে। বললো, ক্লক নাকি ওদের পাঠিয়েছে।
নিশ্চয় মেসেজ দিতে পারেননি। আমাদেরকেই তো দিয়ে দিয়েছেন।
না, পারিনি। ওরা চাপাচাপি করতে লাগলো কাকে দিয়েছি বলার জন্যে। তোমাদের কার্ড দেখিয়ে দিয়েছি ওদের। নাম ঠিকানা লিখে নিলো। তারপর থেকেই ভাবছি, কাজটা কি উচিত হলো? ওদের ভালো লোক মনে হয়নি আমার, বিশেষ করে লম্বাটাকে। মারকো। এতো বেশি ভদ্র, বিনয়…
দিয়ে দিয়েছেন ঠিকানা, কি আর করা। যাকগে, যা হবার হবে। কষ্ট করে আবার আমাদের ফোন করবেন, অনেক ধন্যবাদ।
লাইন কেটে গেল। রিসিভার রেখে বন্ধুদের দিকে তাকালো কিশোর। মারকো আর ডিংগো এখন আমাদের নাম-ঠিকানা জানে। লারমার জানে। তিনজনেই ঘড়িটা চায়, মেসেজগুলো চায়। লারমার ঘড়িচোর না হলে, অন্য আরেকটা দল আছে। সবাই ইনটারেসটেড। লোক কেউই সুবিধের নয় ওরা। আমাদের বিপদটা বুঝতে পারছো আশা করি?
.
পরদিন সকালে স্যালভিজ ইয়ার্ডে যাওয়ার জন্যে তাড়াহুড়ো করে নাস্তা সারছে রবিন, এই সময় এলো ফোন। লাইব্রেরিয়ান ফোন করেছেন, যেখানে সে পার্টটাইম চাকরি করে। কয়েক ঘন্টা কাজ করে দেয়ার অনুরোধ জানালেন।
সেদিন রবিনের অফ ডে, ইচ্ছে করলে মানা করে দিতে পারে। ইয়ার্ডে রহস্যময় মেসেজ নিয়ে গবেষণা করবে কিশোর আর, মুসা, একথা ভেবে একবার ভাবলো না-ই করে দেয়। শেষে ভাবলো, হয়তো জরুরী দরকার, নয়তো কোনো কারণে আটকে গেছেন লাইব্রেরিয়ান। বললো, বিশ মিনিটের মধ্যে হাজির হবে।
নাস্তা সেরে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়লো রবিন। লাইব্রেরিতে এসে জানলো, অ্যাসিসট্যান্ট লাইব্রেরিয়ানের শরীর খারাপ, আসতে পারবেন না।
দুপুর পর্যন্ত কাজে ব্যস্ত রইলো রবিন। বিকেলটাও তাকে থেকে যেতে বললেন লাইব্রেরিয়ান। কি আর করা। থেকে গেল। সঙ্গে আনা স্যাণ্ডউইস দিয়ে খাওয়া সেরে রেফারেন্স বই খুলে বসলো।
প্রথমেই হারিকেনের ওপর লেখা অধ্যায়টা খুললো। রহস্যময় মেসেজে রয়েছে হারিকেনের উল্লেখ। পড়তে পড়তে একসময় উত্তেজিত হয়ে উঠলো সে, নোট লিখে রাখলো। তারপর বের করলো মধ্যযুগীয় ইংরেজ তীরন্দাজদের ওপর লেখা অধ্যায়। আবার উত্তেজিত হয়ে নোট লিখলো নোটবইয়ে। এরপর পড়লো সাগরের ওপর লেখা লেখাটা। কারণ মেসেজে ওশন শব্দটা রয়েছে। নোট করার মতো কিছু পেলো না এখানে। লাঞ্চের সময় শেষ। বই বন্ধ করে উঠে গেল কাজ করার জন্যে।
পাঁচটার আগে ছাড়া পেলো না রবিন। লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে সাইকেলে চেপে সোজা চললো স্যালভিজ ইয়ার্ডে। দুপুরে বিশেষ কথাগুলো জানার পর থেকে এতোক্ষণ উত্তেজনা চেপে রাখতে খুব কষ্ট হয়েছে তার। এখন আর তর সইছে না।
ইয়ার্ডে ঢুকে বুঝলো, সকালে না এসে ভালোই করেছে। সারাটা দিন মুসা আর কিশোরকে গাধার খাটুনি খাটতে হয়েছে। কয়েক ট্রাক মাল কিনে এনেছেন রাশেদ পাশা। সেগুলো গোছানো তখনও শেষ করতে পারেনি।
উফফ, মরে গেছি, রবিনকে দেখেই বলে উঠলো কিশোর। সকালে মুসা। এলো। সবে হেডকোয়ার্টারে ঢুকবো ঢুকবো করছি, এই সময় চাচা নিয়ে এলো মালগুলো। বোরিস আর রোভারেরও অবস্থা কাহিল আজ।
টিমের কোনো খবর আছে? জিজ্ঞেস করলো রবিন।
ফোন করেছিলো। কাল যাওয়ার পরই নাকি লারমার ধরে জিজ্ঞেস করেছে, এতোক্ষণ কোথায় কি করেছে টিম। ভয়ে বলে দিতে বাধ্য হয়েছে সে। এখানে যা যা শুনে গেছে সব। শুনে নাকি আরও রেগে গেছে লারমার।
রাগলো কেন?
জানে না।
মেসেজগুলো আমাদের হাতে পড়েছে জেনেই হয়তো রেগেছে। আমরা সাবধান করে ফেললে হয়তো তার কোনো অসুবিধে হবে। নোটবই বের করলো রবিন। কিশোর, কি জেনেছি জানো…
আরে, রবিন এসে গেছো? পেছন থেকে বলে উঠলেন মেরিচাচী, কখন। এসেছেন বুঝতেই পারেনি ওরা। ছিলে কোথায়? নিশ্চয় লাইব্রেরিতে। যাক, এসেছো ভালো হয়েছে। নাও, বলতে বলতে ইয়া বড় এক খাতা তার হাতে গুঁজে দিলেন তিনি। মালের লিস্টটা করে ফেলো তো। ভুলটুল কোরো না। আমি যাই, রাতের খাবার লাগবে এতোগুলো লোকের…
এক মুহূর্ত আর দাঁড়ালেন না তিনি। ছেলেদেরকে কোনোরকম প্রতিবাদের। সুযোগ না দিয়ে তাড়াতাড়ি কেটে পড়লেন সেখান থেকে।
নাও, শুরু করো, দুহাত নাড়লো মুসা। আমরা তো মরেছি। তুমি আর বাদ থাকো কেন?
বলো, খাতাটা খুলে কলম নিয়ে তৈরি হলো রবিন।
একটা রকিং চেয়ার, মুসা বললো।
একটা রকিং—চেয়ার। তারপর?
এক সেট বাগান করার যন্ত্রপাতি। মরচে পড়া
এক সেট…বাগান…করার…যন্ত্রপাতি…
আরও এক ঘন্টা কাজ চললো। ক্লান্ত হয়ে ওখানে ঘাসের ওপর বসে পড়লো কিশোর। মুসা শুয়েই পড়লো। রবিন বসলো ওদের পাশে। তার আবিষ্কারের কথা জানানোর জন্যে নোটবই বের করলো আবার। এই শোনো, মেসেজটার মানে বের করতে হবে না?
আমি আর আজ ওসবে নেই, জোরে হাত নাড়লো মুসা। তোমরা পারলে করোগে। আমার একটা আঙুল নড়ানোরও ক্ষমতা নেই।
আমিও ঠিকমতো ভাবতে পারবো না এখন, কিশোর বললো। যা করার কাল সকালে করবো।
কিন্তু কয়েকটা সূত্র পেয়েছি আমি, বললো রবিন। অন্তত দুটো লাইনের সমাধান তো হবেই। মিলে যায়…
সূত্র? বাতাসে খামচি মারলো মুসা। শব্দটাই শুনিনি কখনও।
আচ্ছা, এক কাজ করা যাক না, মুসাকে বললো কিশোর। ওর কথাগুলো তো শুনতে পারি আমরা। তাতে কোনো কষ্ট হবে না। রবিন, বলো, শুনি।
হারিকেনের ওপর একটা লেখা পড়লাম দুপুরে। লিখেছে, হারিকেনের সব চেয়ে নিরাপদ জায়গা হলো ওটার কেন্দ্র। একেবারে শান্ত। অথচ ওই জায়গাকে কেন্দ্র করেই চারপাশে ঘন্টায় একশো মাইল বেগে বইতে থাকে ঝড়।
থামলে কেন? বলে যাও।
হারিকেনের ওই কেন্দ্রকে বলা হয় আই, বাংলায় চোখ। কিছু বুঝলে? আই-এর উচ্চারণ আই, অর্থাৎ আমির মতো। এবং এই আই হলো মেসেজের পয়লা শব্দ।
আমি এখন পয়লা শব্দ যেটা শুনতে চাই, সেটা খাবার, বিষণ্ণ ভঙ্গিতে পেটে হাত বোলালো মুসা।
রবিন, মুসার কথায় কান দিলো না কিশোর, সোজা হয়ে গেছে পিঠ। ঠিক বলেছো! আর কি জেনেছো?
বোম্যান। আগের দিনে ইংরেজ তীরন্দাজরা তীর বানাতে ইউ গাছ দিয়ে…
ইউ গাছ? ফোড়ন কাটলো মুসা। গ্রীক দেবতারা দিয়ে যেতো নাকি? নামও তো শুনিনি।
কটা গাছের নামই বা তুমি জানো? ইউ হলো একজাতের চিরশ্যামল গাছ। বানান, ওয়াই-ই-ডাবলিউ। উচ্চারণ ওয়াই-ও-ইউ দিয়ে তৈরি শব্দ ইউ-এর মতো।
ইউ, মানে তুমি, বিড়বিড় করলো কিশোর। হাতের তালুতে চাপড় মারলো। সে। রবিন, ঠিকই বলেছো। আরেকটা শব্দ পাওয়া গেল .চলো, হেডকোয়ার্টারে। খাবার রেডি হতে দেরি আছে। ততোক্ষণে মানেগুলো বের করে ফেলি।
কাল করলে হতো না? মিনমিন করে বললো মুসা। কিন্তু কিশোর আর রবিন রওনা হতেই সে-ও চললো পিছু পিছু।
পাঁচ মিনিট পর ডেস্ক ঘিরে বসলো তিন গোয়েন্দা।
হ্যাঁ, তাহলে কি পাওয়া গেল? শুরু করলো কিশোর। প্রথম লাইনঃ ইটস কোয়ায়েট দেয়ার ঈভন ইন আ হারিকেন। ধরলাম এই লাইন দিয়ে আই বোঝানো হয়েছে। শব্দটা লিখে নিলো একটা কাগজে। দ্বিতীয় লাইনঃ জাস্ট আ ওয়ার্ড অভ অ্যাডভাইস, পোলাইটলি গিভেন। পরামর্শ বলতে চেয়েছে। কাগজে লিখলো ইংরেজিতে, সাজেশন। এখন তৃতীয় লাইনের ওল্ড ইংলিশ বোম্যান লাভড ইট দিয়ে যদি হয় ইউ… প্রথম দুটো শব্দের পাশাপাশি লিখলো এই শব্দটাও। তাহলে হলোঃ আই সাজেশন ইউনাহ, হলো না। তার চেয়ে বলিঃ আই সাজেস্ট ইউ…।
আই সাজেস্ট ইউ, চেঁচিয়ে উঠলো মুসা। ক্লান্তি আর ক্ষুধার কথা ভুলে গেছে। বেমালুম, হচ্ছে, কিশোর, হচ্ছে! খাইছে, পরের শব্দটা কি? ক
বিগার দ্যান আ রেইনড্রপ; স্মলার দ্যান অ্যান ওশন। জলরাশি বোঝাতে চেয়েছে মনে হয়। জলরাশি তো কত রকমই আছে, নদী-নালা খাল-বিল, পুকুর, হ্রদ, সাগর…
দাঁড়াও, দাঁড়াও, হাত তুললো রবিন। বলেছে, বৃষ্টির ফোঁটার চেয়ে বড়, মহাসাগরের চেয়ে ছোট, সাগরই ধরে নিলাম। কি দাঁড়ালো? সাগর। সী। এস-ই এ, কিন্তু উচ্চারণ এস-ডাবল-ই, সী-এর মতো…
সী, মানে দেখা, বলতে বলতে শব্দটা লিখে নিলো কিশোর।
এখন পাঁচ নম্বর, রবিন বললো। আয়্যাম ফোর। হাউ ওল্ড আর ইউ? হ্যাঁ, এটা বেশ কঠিন। কি বোঝাতে চেয়েছে?
আমার বয়েস চার। তোমার কতো?
এটা তো বাংলা মানে হলো। কিন্তু ইংরেজি শব্দটা কি?
ওই আগের লাইনগুলোর মতোই ঘুরিয়ে বলেছে। বর্ণমালার চার নম্বর। অক্ষরটার কথা বলেনি তো?
চার নম্বরটা কি? উত্তেজিত কণ্ঠে বললো মুসা। বেশ মজা পাচ্ছে এখন। ডি। তাতে কি?
তাতে? অনেকে ডি-এর উচ্চারণ দি-এর মতো করে। যদি ধরি টি-এইচ-ই, দি, বা দা, বা দ্য, লিখে ফেললো শব্দটা, তাহলে মেলে। আর মাত্র একটা শব্দ বের করতে পারলেই ইট সিটস অন আ শেলফ লাইক আ ওয়েল-ফেড-এলফ। কি বোঝা যায়? দুই সহকারীর দিকে তাকালো গোয়েন্দাপ্রধান।
ই-এল-এফ, এল মানে তো হলো একজাতের ভূত, রবিন বললো।
শেলফে ভূতের মতো কি বসে থাকে? মুসার প্রশ্ন। ছারপোকা? তেলাপোকা? টিকটিকি…
এলফ শব্দটাও ব্যবহার করেছে দ্বিধায় ফেলার জন্যে, বললো কিশোর। রবিন, লাইব্রেরিতে শেলফের দিকে তাকালেই কি চোখে পড়ে? এফের মতো বেঁটে মোটা মোটা ভূত…
মোটা মোটা বই! উত্তেজনায় লাফ দিয়ে টুল থেকে উঠে পড়লো রবিন।
হ্যাঁ, বই।
আর ওয়েল-ফেড, মানে পেট-পুরে-খাওয়া বলে বোঝাতে চেয়েছে অক্ষরে বোঝাই..ঠিক, বই-ই। আর কোনো সন্দেহ নেই।
শব্দটা লিখে নিয়ে বললো কিশোর, তাহলে, ছয়টা শব্দ দিয়ে একটা পুরো লাইন হলো। আই সাজেস্ট ইউ সী দা বুক।
বাহ্, চমৎকার, চুটকি বাজালো মুসা। খুব সহজ এর মানে। বইতে কিছু দেখার পরামর্শ দিচ্ছে। কিন্তু কি দেখবো? কোন বইতে দেখবো? আর দেখার পর ওটা দিয়ে কি করবো?
জানা যাবে। আরও দুটো মেসেজ আছে। ওগুলোর মানে বের করতে পারলেই…
কিশোওর! মুসাআ! বাইরে থেকে ডাক শোনা গেল মেরিচাচীর। এইমাত্র দেখলাম এখানে…কোথায় গিয়ে ঢুকলি?।
দূর, এতো তাড়াতাড়ি সেরে ফেললো? বিরক্ত কণ্ঠে বললো কিশোর। অনিচ্ছা সত্ত্বেও উঠে দাঁড়ালো। আজ আর হচ্ছে না। কাল সকালে চেষ্টা করবো। চলো।
.
খেতে খেতে আলোচনা চললো।
বইটা কি বই? একই প্রশ্ন আবার করলো মুসা। বাইবেল?
মনে হয় না, মাথা নাড়লো কিশোর। বড় একটা মাংসের বড়া নিজের প্লেটে তুলে নিয়ে ছুরি দিয়ে কাটতে কাটতে বললো, আন্দাজে কিছু বলে লাভ নেই। কাল অন্য মেসেজগুলোর মানে বের করতে পারলেই…
কী বলছিস তোরা? মুখ তুললেন রাশেদ পাশা। নতুন কোনো কেস পেয়েছিস নাকি?
কতগুলো অদ্ভুত মেসেজ পেয়েছি, চাচা। তোমার আনা ওই চেঁচানো ঘড়িটা দিয়েই শুরু। একটা মেসেজের মানে অবশ্য বের করে ফেলেছি…
এই বকবক না করে চুপচাপ খা তো! ধমক লাগালেন মেরিচাচী। এই বেশি ভেবে ভেবেই অকালে পাগল হবি। কতোবার বলেছি, এতো ভাববি না। সারা দিন গতর খাটাবি, পেট ভরে খাবি, রাতে নাক ডেকে ঘুমাবি। শরীর-মন দুটোই ভালো থাকবে, বাচবিও বেশি দিন। বড় করে এক টুকরো কেক কেটে মুসার পাতে দিতে দিতে বললেন, এই ছেলেটাই ভালো। খেতে পারে, খাটতেও পারে, কথা বলে। কম…
হেসে ফেললো কিশোর। তা ঠিক। বেশি খেলে ঘুম তো আসবেই। এই এখন আমার যেমন আসছে। আজ মেরে ফেলেছো, চাচী। সারা শরীর ব্যথা হয়ে। গেছে।
আরে না, কি যে বলো? মেরিচাচীর পক্ষ নিলো মুসা। বেশি খেলে ঘুম আসবে কেন? বলতে না বলতেই মস্ত এক হাই তুললো সে।
রবিন আর রাশেদ পাশাও হাসতে শুরু করলেন। চেষ্টা করেও গম্ভীর হয়ে থাকতে পারলেন না মেরিচাচী।
খাওয়ার পর বারান্দায় বেরোলো তিন গোয়েন্দা।
আবার যাবে নাকি হেডকোয়ার্টারে? রবিন জিজ্ঞেস করলো।
না, আজ আর না, বললো কিশোর। কাল সকালে।
বিদায় নিয়ে সাইকেলে চাপলো মুসা আর রবিন। রওনা হলো যার যার বাড়ি। দুটো ব্লক একসাথে এসে আলাদা হয়ে দুজনে চললো দুদিকে খেয়াল করলো, ইয়ার্ডের গেট থেকেই ওদের পিছু নিয়েছিলো একটা ছোট ডেলিভারি ভ্যান। এখন অনুসরণ করছে রবিনকে।
দুই বন্ধুকে বিদায় দিয়ে কিশোর ঢুকেছে রান্নাঘরে। টেবিল সাফ করে বাসন পেয়ালা ধুতে সাহায্য করেছে চাচীকে। একের পর এক হাই তুলছে।
দেখে মেরিচাচী বললেন, যা, তুই ঘুমোতে যা। আমি একাই পারবো।
সোজা নিজের ঘরে এসে কাপড় ছেড়ে শুয়ে পড়লো কিশোর। ভেবেছিলো, শোয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়বে। এতো ক্লান্তিতেও ঘুম এলো না। মনে এসে ভিড় জমালো হাজারো ভাবনা। কি আছে মেসেজগুলোতে?
আই সাজেস্ট ইউ সী দা বুক। কি বই? দ্বিতীয় মেসেজে কি আছে জবাবটা? : ভাবনা যতো বাড়ছে, দূর হয়ে যাচ্ছে ঘুম। না, হবে না। দ্বিতীয় মেসেজটার সমাধান না করে ঘুমোতে পারবে না। উঠে বসলো সে।
আবার কাপড় পরে নেমে এলো নিচতলায়। চাচা-চাচী টেলিভিশন দেখছিলেন, অবাক হয়ে তাকালেন।
কি-রে, কিশোর, মেরিচাচী জিজ্ঞেস করলেন। ঘুমোসনি?
ঘুম আসছে না। কতগুলো বাজে ভাবনা ঢুকেছে মাথায়। জঞ্জালের মধ্যে ফেলে দিয়ে আসি ওগুলো। নইলে ঘুমোতে পারবো না।
তোর মাথা সত্যি খারাপ হয়ে গেছে…।
মেরিচাচীর কথা শেষ হওয়ার আগেই বেরিয়ে এলো কিশোর। বারান্দা থেকে নেমে রওনা হলো ওয়ার্কশপের দিকে। মেইন গেট বন্ধ। চলে এলো বেড়ার কাছে। একটা বিশেষ জায়গায় আঙুলের চাপ দিতেই নিঃশব্দে উঠে গেল দুটো সবুজ বোর্ড। হেডকোয়ার্টারে ঢোকার অনেকগুলো গোপন পথের এটা আরেকটা, সবুজ ফটক এক। বেরিয়ে পড়েছে সরু প্রবেশ পথ? ওখান দিয়ে ঢুকলো ওয়ার্কশপে। তারপর দুই সুড়ঙ্গের মুখের ঢাকনা সরিয়ে পাইপের ভেতর দিয়ে চলে এলো মোবাইল হোমে। অফিসে ঢুকলো।
মাথার ওপরের আলোটা জ্বেলে দিয়ে ডেস্কের ড্রয়ার থেকে বের করলো মেসেজগুলো। সে আর মুসা গিয়ে মিস্টার হিরাম বারকেনের কাছ থেকে যেটা এনেছে, সেটা নিয়ে বসলো।
বার বার পড়লো লেখাগুলো। সেই সাথে চলেছে গভীর ভাবনা। ধীরে ধীরে আসতে আরম্ভ করেছে ধারণাগুলো। প্রথম মেসেজটা সমাধান করতে পারায়, দ্বিতীয়টা সহজ হয়ে গেল। সঠিক পথ দেখালো ওকে প্রথমটা-ই।
প্রথম লাইনের শুরুতে একটা ফুল নেয়ার জন্যে বলা হচ্ছে। কাগজে লিখলো। সেঃ টেইকওয়ান লিলি। স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো লেখাটার দিকে। এলিকে মেরে ফেলতে বলা হয়েছে। কিভাবে? হঠাৎ বুঝে ফেললো। ওয়ান লিলি-র ওয়ান এর প্রথম দুটো অক্ষর আর লিলি-র শেষ দুটো অক্ষর বাদ দিলেই হয়ে যায় ই-এল আই, এলি। এলিকে মারতে বলা হয়েছে। দুটো শব্দের মাঝের তিনটে, অক্ষর কেটে দিলো সে। বাকি চারটে অক্ষর একসাথে করতেই হয়ে গেল ওনলি।
ওনলি! একা একাই চেঁচিয়ে উঠলো কিশোর। পেয়েছি! এবার দ্বিতীয় লাইন। বলছেঃ পজিটিভলি নাম্বার ওয়ান।
প্রথম মেসেজটায় আয়্যাম ফোর বলে ডি বুঝিয়েছে। এটাতেও হয়তো ওয়ান বলে আ বোঝাতে চেয়েছে। ওনলির পাশে লিখলো আ। তার মনে হলো, তৃতীয় লাইনে ব্রম শব্দটার ওপর জোর দেয়া হয়েছে। কারণ, ঝাড়ু নিয়ে মৌমাছি তাড়াতে বলা হয়েছে। তারমানে ঝাড়ুটাই এখানে প্রধান। বী মানে মৌমাছি, ইংরেজি দ্বিতীয় অক্ষরের উচ্চারণও বী বী-টাকেই তাড়াতে বলা হয়েছে। ব্রম থেকে বী বাদ দিলে হলো রুম।
ভীষণ উত্তেজিত হয়ে উঠেছে কিশোর। অনর্গল কথা বলছে নিজের সঙ্গে। জোরে জোরে। একা গভীর মনোযোগের কাজ করার সময় এরকম করে মাঝে মাঝে।
এরপর আসছে, বললো সে। হোয়াট ইউ ডু উইদ ক্লথস, অলমোস্ট। কাপড় দিয়ে কি করি আমরা? পরি। পরা ইংরেজি, ওয়্যার। বানান, ডাবুলিউ-ই-এ আর। ওনলি আ রুম-এর সঙ্গে ওয়্যার মেলে না। তাহলে কি মেলে? আরেকটা ওয়্যার, কিংবা হোয়্যার। উচ্চারণ প্রায় একই, কিন্তু বানান আর মানে আলাদা। লিখে ফেললো প্রথম তিনটে শব্দের পাশেঃ ডাবলিউ-এইচ-ই-আর-ঈ। বললো, তাহলে দাঁড়ালো, ওনলি আ রুম হোয়্যার: হ্যাঁ, পরিষ্কার হচ্ছে আস্তে আস্তে।
পাঁচ নম্বর লাইনের মানে বের করা এতো সহজ হলো না। লাইনটার মানে, মা-ও নয়, বোন-ও নয়, ভাই-ও নয়, বাবা হতে পারে। ফাদার বসালে কিছু হয় না। ড্যাড, পপ বসিয়েও হলো না। পরিবারের প্রধান যদি ধরা হয় ফাদারকে? হেড অভ দা ফ্যামিলি? নাহ, হচ্ছে না।
নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটতে শুরু করলো সে। কি বলতে চাইছে? ফাদার ক্রিসমাস? না। ফাদার টাইম? আঁ, ফাদার টাইম! ঘড়ি নিয়ে কারবার যখন… ঠিক, ফাদার টাইম!
দ্রুত লিখে ফেললো ওনলি আ রুম হোয়্যার-এর পাশে ফাদার টাইম। বাকি। রইলো মাত্র একটা লাইন। ফাদার টাইম, অর্থাৎ বাবা ঘড়ি কি করে? সময় দেয়। আর কি করে। শব্দ করে। কিভাবে? মেকানিক্যাল হলে টিকটিক, ইলেকট্রিকে চললে গুঞ্জন না, ঠিক গুঞ্জনও বলা যায় না। আসলে শব্দটা সঠিক ভাবে বোঝানোর কোনো উপায় নেই। সেকথা বলাও হয়েছে, অলমোস্ট, নট কোয়াইট। তাহলে, গুঞ্জন ইংরেজি হলো হামস। লিখে ফেললো শব্দটা, হামস।
পুরো লাইনটা হলোঃ ওনলি আ রুম হোয়্যার ফাদার টাইমস হামস।
হ্যাঁ, ঠিক আছে, আপনমনে মাথা দোলালো কিশোর। শুধু একটা ঘর, যেখানে বাবা ঘড়ি গুঞ্জন করে। কথা হলো, কোথায় গুঞ্জন করে? ওই মুহূর্তে একটা ঘরের কথাই মনে হলো তার। মিস্টার ক্লকের সেই সাউণ্ডপ্রুফ ঘরটা, যেখানে অসংখ্য ঘড়ি রয়েছে। তবে মেসেজ থেকে বোঝা গেল না, কোন বইয়ের ঘড়ির গোলমাল কথা বলা হয়েছে। যাবে, পাওয়া যাবে, নিজেকে আশ্বস্ত করলো সে। ছেঁড়া মেসেজটা বের করলো। নম্বরগুলোর দিকে তাকিয়ে ভাবলো কিছুক্ষণ। প্রথম লাইনে রয়েছেঃ ৩-২৭৪-৩৬৫-১৯৪৮-১২৭-১১১৫-৯
কি বোঝাতে চায়? বইটার ব্যাপারে কিছু? কোনো বিশেষ বইয়ের সাহায্যে কোড মেসেজ তৈরি করা যুদ্ধের সময় বেশ জনপ্রিয় ছিলো, এখনও গুপ্তচর মহলে এর ব্যবহার আছে। বইয়ের পাতা থেকে শব্দ বাছাই করে লাইন তৈরি করে। প্রেরক। কোন পাতার কোন লাইনের কোন শব্দটি নিয়েছে, গুনে নম্বর লিখে দেয়। প্রাপক সেটা খুঁজে বের করে বুঝে নেয় মেসেজের মানে। সহজ কোড, কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নিরাপদ। কারণ, অন্য কারও হাতে পড়লেও তার বোঝার উপায় নেই, কোন বই থেকে নেয়া হয়েছে। সেটা জানে শুধু প্রেরক আর প্রাপক।
সুতরাং কিশোরের জন্যেও বইয়ের নাম জানাটা খুব জরুরী। কিভাবে জানা যাবে? আর বইটা পেলেও কি আধখানা মেসেজ থেকে পুরো লাইনটা বোঝা সম্ভব?
বড় করে হাই তুললো সে। ঘুম পেয়েছে। থাক, আজ রাতের জন্যে যথেষ্ট। হয়েছে। কাল সকালে উঠে আবার চেষ্টা করা যাবে, ভেবে, মেসেজগুলো আবার। ড্রয়ারে ঢুকিয়ে রেখে উঠে দাঁড়ালো কিশোর। ট্র্যাপডোরের দিকে এগোতে যাবে, এই সময় বাজলো টেলিফোন।
এতো রাতে কে! অবাক হলো সে। তুলে নিলো রিসিভার। তিন গোয়েন্দা। কিশোর পাশা বলছি।
অন্য পাশের কণ্ঠটা শুনে স্থির হয়ে গেল সে। জমে গেছে যেন বরফের মতো।
.
এগিয়ে চলেছে রবিন। পেছনে এঞ্জিনের শব্দ শুনছে, কিন্তু ফিরে তাকানোর কথা ভাবলো না একবারও। রাস্তায় গাড়ি থাকতেই পারে।
এক জায়গায় রাস্তার ধারে কোনো বাড়ি-ঘর নেই, খালি জায়গা। ঠিক ওখানটায় এসে পেছন থেকে শা করে সামনে চলে এলো ভ্যানটা, রবিনের পথরোধ করে ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষলো।
লাফিয়ে বেরোলো এক কিশোর। রবিন!
অবাক হয়ে ব্রেক চাপলো রবিন। টিম! উত্তেজিত। সাইকেল থেকে নেমে ঠেলে নিয়ে তার দিকে এগোলো রবিন। কি ব্যাপার, টিম? কিছু হয়েছে?
পেছনের দরজা খুলে লাফ দিয়ে নামলো ছোটখাটো একজন মানুষ। হয়নি, তবে আমাদের কথা না শুনলে অনেক কিছুই হবে, কড়া গলায় বললো সে। খবরদার, পালানোর চেষ্টা কোরো না।
সরি, রবিন, অস্বস্তিতে গলা কাঁপছে টিমের। তোমার কাছে নিয়ে আসতে বললো ওরা। মাকে ঘরে তালা আটকে রেখে এসেছে।
হয়েছে হয়েছে, অতো ব্যাখ্যা করতে হবে না, ধমক দিলো লোকটা। এই, তোমার সাইকেল ছাড়ো। ওঠো গাড়িতে।
চট করে চারপাশে চোখ বোলালো একবার রবিন। নির্জন পথ। সাহায্যের জন্যে যে ডাকবে, সে উপায় নেই। দৌড় দিয়েও সুবিধে করতে পারবে না। সহজেই ধরে ফেলবে তাকে।
হ্যান্ডেল ধরে সাইকেলটা কেড়ে নেয়া হলো তার কাছ থেকে। পিঠে জোরে এক ধাক্কা দিয়ে লোকটা বললো, দাঁড়িয়ে আছো কেন? জলদি ওঠো। টিম, তুমিও।
গাড়িতে আলো নেই। অন্ধকারে উঠে বসলো রবিন। তার পাশে টিম। সাইকেলটা ভ্যানে তুলে দরজা বন্ধ করে তালা লাগিয়ে দিলো লোকটা। বন্দি হলো দুই কিশোর।
আমাদের ক্ষতি করবে না বলেছে, নিচু কণ্ঠে বললো টিম। ওরা শুধু তথ্য চায়। ঘড়ি আর মেসেজগুলো সম্পর্কে। আমি তেমন কিছু বলতে পারিনি, তাই তোমাদের কাছে নিয়ে আসতে বাধ্য করলো। বললো, তোমাদের যে-কোনো একজনকে হলেই চলবে। ইয়ার্ডের ওপর অনেকক্ষণ থেকেই চোখ রাখছিলো। তুমি আর মুসা বেরোতেই পিছু নিলো।
মৃদু ঝাঁকুনি খেতে খেতে ছুটছে ভ্যান। গন্তব্য দুজনের কাছেই অজানা।
কারা ওরা? জিজ্ঞেস করলো রবিন।
একজন, লারমার। আরও দুজন আছে। বেঁটে লোকটার নাম ডিংগো। আর লম্বা আরেকজন আছে, নাম মারকো।
ডিংগো আর মারকো! ওরা দুজনই কাল কিশোরদেরকে ধরেছিলো। একটা মেসেজের অর্ধেকটা ছিঁড়ে রেখে দিয়েছে।
হ্যাঁ, ওরাই। কটা মেসেজ, মানে কী, জানতে চায়। মূল্যবান কোনো জিনিসের ইঙ্গিত রয়েছে মেসেজে। ওদের ধারণা, জিনিসটা কি, কোথায় লুকানো আছে জানি আমরা।
কে বললো আমরা জানি? কিশোরের অনুমান, দামী জিনিস আছে, ব্যস।
আজ বিকেলে ডিংগো আর মারকো এসেছে লারমারের সঙ্গে দেখা করতে। অনেকক্ষণ কথা বলেছে। তারপর এসে ধরলো আমাকে, যা যা জানি বলার জন্যে। বলতে বাধ্য করলো। সরি, রবিন, না বলে উপায় ছিলো না। খুব শয়তান লোক। আমাকে মেরে ফেললেও বলতাম না, কিন্তু মার ওপর অত্যাচার করার ভয়। দেখালো…
আরে না না, তোমার দুঃখিত হওয়ার কিছু নেই। আমি হলেও তা-ই করতাম। তোমার মাকে তালা দিয়ে রেখেছে বললে না?
হ্যাঁ, আমরা যে বাড়িতে থাকি, মানে মিস্টার ক্লকের বাড়িতে। এরাও ক্লক ক্লকই করছিলো। আড়ি পেতে শুনেছি ওদের কথা। লারমার বললো, সে এই বাড়িতে উঠেছে গোপন জায়গা খুঁজতে। এমন একটা জায়গা, যেখানে দামী জিনিস লুকানো থাকতে পারে। রবিন, প্লীজ, তুমি যা জানো বলে দিও। নইলে আমার মাকে ছাড়বে না। বলবে তো?
মুশকিল কি জানো, আমি নিজেই কিছু জানি না, সত্যি কথাই বললো রবিন। একটা মেসেজের সমাধান করেছি। তাতে বলা হয়েছে বইটা দেখতে। কোন বই, জানি না। তাই তিনি কোন
বলতে না পারলে খুব রেগে যাবে ওরা, শঙ্কিত হয়ে উঠলো টিম। ওরা ধরেই নিয়েছে, তোমরা মেসেজের সমাধান করে ফেলেছো। তোমাদের সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়েছে। জেনেছে, আগেও অনেক জটিল রহস্যের সমাধান তোমরা করেছে।
সমাধান আসলে কিশোর করেছে, ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেললো রবিন। ওদেরকে বিশ্বাস করাতে হবে, সত্যিই আমি কিছু জানি না। তাহলেই হয়তো ছেড়ে দেবে। আটকে রেথে তো লাভ নেই, অযথা ঝামেলা বাড়াতে চাইবে না। ওরা।
ওই আশা মনে নিয়েই নীরব হলো দুজনে। ভ্যান চলেছে। মোড় নিচ্ছে মাঝে মাঝে। বুঝতে পারলো না ওরা যাচ্ছে কোনদিকে। দীর্ঘ কয়েক যুগ পরে যেন অরশেষে থামলো গাড়ি। বড় একটা দরজা খোলার শব্দ কানে এলো। ঝনঝন করে উঠে গেল স্পিঙ লাগানো দরজা, বোধহয় কোনো গ্যারেজের। আবার চললো ভ্যান, কয়েক ফুট এগিয়ে থামলো। পেছনে দরজা নামিয়ে দেয়ার শব্দ। ভ্যানের দরজার তালা খুললো খাটো লোকটা, ডিংগো।
নামো, দুজনেই, আদেশ দিলো সে। ভালো চাইলে চুপচাপ থাকবে। নইলে কপালে দুঃখ আছে।
রবিন আগে নামলো, পেছনে টিম। কংক্রীটের মেঝে। চারপাশে চোখ বোলালো রবিন। গ্যারেজই, বড় একটা ডাবল-গ্যারেজ। দরজা নামানো। দুপাশে দুটো জানালা, পর্দা টানা, পাল্লা বন্ধ কিনা বোঝা গেল না। মাথার ওপরে একটা বাল্ব জ্বলছে। আর কোনো গাড়ি নেই। একটা গাড়িই বোধহয় রাখা হয়, কারণ আরেকটা গাড়ির জায়গাকে ওয়ার্কশপ হিসেবে ব্যবহার করে–জিনিসপত্র দেখেই বোঝা যাচ্ছে। একটা ওয়ার্কবেঞ্চ, একটা ব্রোল্যাম্প আর কিছু যন্ত্রপাতি আছে।
বেঞ্চের পাশে কয়েকটা চেয়ার। সেগুলো দেখিয়ে ডিংগো বললো, যাও, বসো। মুখে কুৎসিত হাসি। আরামেই বসো, কষ্ট করার দরকার নেই।
রবিন আর টিম বসলো।
নগ্ন আলোয় ফ্যাকাসে লাগছে লারমারের লম্বা মুখটা, চোখ আর নাকের নিচে অদ্ভুত ছায়া কেমন যেন কিস্তুত করে তুলেছে চেহারাটাকে। এগিয়ে এলো দুই, কদম। তার পেছনে ভ্যান থেকে নেমে হাসিমুখে এগোলো লম্বা লোকটা, মারকো।
দড়ি দিয়ে শক্ত করে বাঁধো, ডিংগোকে আদেশ দিলো লারমার। তারপর কথা।
বেঞ্চের ওপর থেকে দড়ি এনে রবিন আর টিমকে চেয়ারের সঙ্গে পেঁচিয়ে বাঁধলো ডিংগো।
একটা চেয়ার টেনে ওদের মুখোমুখি বসলো লারমার। সাগর কলার মতো মোটা এক সিগার ধরিয়ে আরাম করে টান দিলো কয়েকটা। মুখ-ভর্তি ধোয়া নিয়ে। ফুঁ দিয়ে ছাড়লো দুই বন্দির মুখে। ফিকফিফ করে হাসলো শয়তানী হাসি। তামাক পছন্দ না, না? তোমার বয়েসে আমি অবশ্য খুবই পছন্দ করতাম। কি স্বাদ যে মিস করছো, বুঝতে পারছে না।
স্বাদের দরকার নেই আমার, গম্ভীর হয়ে বললো রবিন। ফুসফুস কালি করার। কোনো ইচ্ছে নেই।
ভালো কথা। বোঝা গেল, নিজের জন্যে মায়াদর আছে। প্রশ্নের জবাব তাহলে সরাসরিই দেবে আশা করি। সিগারে আরেকটা লম্বা টান দিলো সে। হ্যাঁ, টিম নিশ্চয় সব জানিয়েছে?
বলেছে, মেসেজের মানে আপনারা জানতে চান, গলা কাঁপছে রবিনের।
হ্যাঁ, ঠিকই বলেছে। দামী কিছু জিনিস কোথাও লুকানো আছে। মেসেজে আছে ইঙ্গিত। জানতে চাই, সেটা কোথায়। ভুরু কুঁচকে বিকট করে তুললো চেহারাটা। বদলে গেল কণ্ঠস্বর, মেসেজগুলো কিভাবে পেয়েছো, জানি। চেঁচানো ঘড়িটা পেয়ে, হ্যারিসন ক্লকের কথা জেনে গেছো তোমরা। ঠিক গিয়ে খুঁজে বের করেছো হেনরি মিলারকে, তার স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে এসেছে। আরও দুজনের কাছ থেকে দুটো মেসেজ এনেছো। রবিনের চোখে চোখে তাকালো। এখন বলে ফেলো, কি লেখা আছে ওগুলোতে।
আর হ্যাঁ, রবিন জবাব দেয়ার আগেই মারকো বললো, আমি জানতে চাই, হেনরি মিলারের কাছে ওই চেঁচানো ঘড়িটা পাঠানোরই বা কি অর্থ? ভিন্ন ভিন্ন লোকের কাছে কেন পাঠিয়েছে মেসেজগুলো? কি খেলায় মেতেছে হ্যারিসন ক্লক?
ক্লক কি খেলায় মেতেছে, সেটা ও জানবে কি করে? ডিংগো বললো। ক্লকের পেটে খালি শয়তানী বুদ্ধি, কথা পর্যন্ত সোজা করে বলে না। কেন করেছে এসব, একমাত্র ও-ই বলতে পারবে। আর যেহেতু ওকে পাওয়া যাচ্ছে না…
জানাও যাবে না, বাক্যটা শেষ করে দিলো লারমার। ওসব জানার দরকারও নেই আমাদের। মাল কোথায় লুকানো আছে, এটা জানলেই আমি খুশি। নাও খোকা, শুরু করো। মেসেজে কি বলেছে?
জোরে ঢোক গিললো রবিন। ইয়ে, একটা মেসেজের মানে বের করেছি আমরা। লিখেছেঃ আই সাজেস্ট ইউ সী দা বুক। ব্যস। এই একটা লাইনই।
আই সাজেস্ট ইউ সী দা বুক! ঠোঁট কামড়ালো লারমার। কি বই?
জানি না, বলেনি।
দ্বিতীয়টায় নিশ্চয় বলেছে, অধৈর্য হয়ে উঠছে লারমার। কি লিখেছে?
জানি না, আবার ঢোক গিললো রবিন। মানে করার সময়ই পাইনি। ক্লান্ত ছিলাম। আগামী কাল করবো ভেবেছি।
দেখো, ছেলে! কঠোর কণ্ঠে বললো লারমার, মিথ্যে বলো না! দ্বিতীয় মেসেজে কি লিখেছে জলদি বলো!
সত্যি বলছি আমি জানি না। ওটা নিয়ে ভাবিইনি। কাল সকালের জন্যে রেখে দিয়েছি।
সত্যি কথাই বলছে মনে হয়, মারকো বললো।
হয়তো, নিশ্চিত হতে পারছে না লারমার। বেশ, ধরে নিলাম, দ্বিতীয়টার মানে জানো না। তৃতীয়টার? ওটা তো জানো? ওই যে, শুধু নম্বর লেখা আছে যেটায়। অর্ধেকটা আমার কাছে, মারকো ছিঁড়ে রেখে দিয়েছিলো। পকেট থেকে ছেঁড়া কাগজটা বের করে রবিনের নাকের কাছে নাড়লো। কি মানে এসব নম্বরের?
আমি বলতে পারবো না, মাথা নাড়লো রবিন। কিশোর হয়তো পারবে।
ভীষণ হয়ে উঠলো লারমারের কুৎসিত চেহারা। তবে, নিশ্চিত হলো, রবিন। মিথ্যে বলছে না।
তার মানে আরও অপেক্ষা করতে হবে আমাদের, মারকো বললো। সেটা করতে তো আপত্তি ছিলো না, কিন্তু অসুবিধে আছে। ছেলেগুলো বুঝে ফেললেই পুলিশের কাছে যাবে, তাদের নিয়ে যাবে লুকানোর জায়গাটায়। আমাদের আর কিছুই করার থাকবে না তখন। কাজেই দেরি করা যাচ্ছে না। তো, কী করা?
কি আর? খেপা কুকুরের মতো ঘড়ঘড় করে উঠলো লারমার। এখুনি অন্য মেসেজগুলো নিয়ে নিতে হবে। কয়েকটা বাচ্চা ছেলে মানে বের করতে পারলে আমরা কেন পারবো না? ওগুলো লাগবে। এই ছেলে, কার কাছে মেসেজগুলো?
কিশোরের কাছে, জবাব দিলো রবিন। ও এখন ঘুমোচ্ছে।
ঘুমোলে চলবে না, জাগতে হবে। ওকে ফোন করে বলো, মেসেজগুলো নিয়ে। যেন এখানে চলে আসে। আমরা সবাই মিলে সমাধান করবো।
বললেই কি আসবে? প্রশ্ন তুললো মারকো।
বন্ধুকে ভালোবাসে ও, তাই না? রবিনের দিকে চেয়ে ভ্রূকুটি করলো লারমার। ওর কোনো ক্ষতি নিশ্চয় চায় না। আমরা বললে খুশি হয়েই মেসেজগুলো নিয়ে হাজির হবে। তুমি কি বলো, ছেলে?
আমি কি করে জানবো? হতাশ হয়েছে রবিন। সে ভেবেছিলো, মেসেজের মানে জেনে না বললে তাদেরকে ছেড়ে দেবে লারমার। ছাড়লো তো না-ই, বরং কিশোরকে আনানোরও মতলব করেছে ব্যাটারা।
আমি জানি, লারমার বললো। সে আসবে। এক কাজ করো, প্রথমে তোমার বাড়িতে ফোন করো। বাবা-মাকে জানিয়ে দাও, জরুরী কাজে আটকা পড়েছে, রাতে বাড়ি ফিরবে না। কিশোরের ওখানে থাকবে। চিন্তা যাতে না করে। তারপর ফোন করো তোমার কোকড়াচুলো বন্ধুকে। আমাদের নির্দেশ জানিয়ে দাও।
ডিংগো, ফোনটা দাও ওকে, মারকো বললো। হাত খুলে দাও।
ওয়ার্কবেঞ্চের ওপর রাখা যন্ত্রটা তুলে এনে রবিনের কোলে রাখলো ডিংগো। নাও, ধরো।
আমি পারবো না, মরিয়া হয়ে বললো রবিন। কাউকে ফোন করবো না। আমি। যা যা জানি সব বলেছি…এখন…এখন… শুকনো ঠোঁট চাটলো সে। আবার এসব করতে বলছেন!
ডিংগো, ইঙ্গিতে ওয়ার্কবেঞ্চটা দেখালো লারমার। ব্রোল্যাম্পটা জ্বেলে আমার হাতে দাও তো।
কথামতো কাজ করলো ডিংগো।
ব্লোল্যাম্পটা শক্ত করে ধরলো লারমার। হিসহিস শব্দে জ্বলছে উজ্জ্বল হলুদ আগুনের শিখা। ধীরে ধীরে সামনে বাড়ালো ওটা সে। মুখে তাপ লাগছে রবিনের। চোখ বন্ধ করে ফেললো।
কি হলো? রিসিভার তোলো, বললো লারমার।
বাড়িতে নাহয় বললাম, মিনমিন করে বললো রবিন। কিন্তু কিশোরকে ওকে কোথায় পাবো?
হেডকোয়ার্টারে।
বললাম না, ও এখন ঘরে ঘুমোচ্ছ।
তাহলে ঘরেও করবে। আর একটি কথাও নয়। তোলো, রিসিভার ভোলো পাঁচ সেকেণ্ড সময় দিচ্ছি। তারপর প্রথমে চুলে লাগাবো আগুন।