৩. তিন গোয়েন্দা আর জিনার সঙ্গেই রয়েছে রাফিয়ান

0 Comments

ছিনতাই – তিন গোয়েন্দা – সেবা প্রকাশনী
প্রথম প্রকাশ – জুলাই, ১৯৮৮

ভয়ে দুরুদুরু করছে সবার বুক। কিন্তু রাফিয়ানের কথা আলাদা। সে ভয় পেল না। বন্ধুদের সাথে দুর্ব্যবহার করা হচ্ছে দেখে ভীষণ রেগে গেল। লাফিয়ে পড়তে গেল একজন ইনডিয়ানের ওপর।

 না, রাফি, না! চেঁচিয়ে উঠল জিনা। রাফি, খবরদার, মেরে ফেলবে! চোখের সামনে তার প্রিয় কুকুরটাকে খুন হতে দেখতে পারবে না সে।

কি বুঝল রাফিয়ান কে জানে, আর আক্রমণের চেষ্টা করল না।

বন্দিদের দিকে চেয়ে খুশিতে দাঁত বেরিয়ে পড়েছে ইনডিয়ানদের। বিজাতীয় ভাষায় কথা বলছে, তার এক বর্ণও বুঝল না অভিযাত্রীরা।

জংলীদের সারা গা খালি, কোমরের কাছে কিছু পাতা বেশ কায়দা করে জড়িয়েছে, সুন্দর ঝালরের মত ঘিরে রেখেছে সেই বিচিত্র পোশাক। ঝাল বানানোর আগে পাতাগুলোকে লাল আর হলুদ রঙে রাঙিয়ে নিয়েছে। একই ধরনের ছোট ঝালর জড়িয়েছে গোড়ালি আর বাজুতে। একজনের মাথায় লতার। বন্ধনীতে পাখির দুটো পালক গোঁজা। বোঝা যাচ্ছে, সে দলটার নেতা। লোকটার দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করল জিম, কি চাও?

ইংরেজি বোঝার কথা নয় জংলীটার, কিন্তু বোধহয় অনুমান করে নিয়েই। জঙ্গলের দিকে হাত তুলে তার ভাষায় বলল কিছু। তারপর ইশারায় হাটার নির্দেশ দিল বন্দিদের।

ইনডিয়ানদের হাতের জ্বলন্ত মশালের আলোয় বুনোপথ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে।

কোথায় নিয়ে যাচ্ছে আমাদেরকে? ফিসফিস করে জানতে চাইল জিনা। ওদের রাজার কাছে?

তাছাড়া আর কোথায়? তিক্ত হাসি হাসল ওরটেগা। নিজের ওপর মহা খাপ্পা। শালার ঘুম আর রাখতে পারলাম না। তা না হলে…

তা না হলেও কিছু করতে পারতেন না, বাধা দিয়ে বলল কিশোর। এটা বরং ভালই হলো। জেগে থাকলে বাধা দেয়ার চেষ্টা করতেন, আরও খারাপ হত তাহলে।

ঠিকই, কিশোরের কথা মেনে নিল ওরটেগা, দলে অনেক ভারি ইনডিয়ানরা।

ঘন বনের ভেতর দিয়ে সরু একটা পায়ে চলা পথ ধরে এগোচ্ছে ওরা। বিশ্রাম নেয়ায় রবিনের পায়ের ফোলা অনেক কমেছে, কিন্তু সবার সঙ্গে তাল। মিলিয়ে চলতে গিয়ে আবার ব্যথা শুরু হয়েছে। তার মনে হলো, শ-খানেক বছর

একটানা চলে লক্ষ লক্ষ মাইল বুনোপথ পেরোনোর পর একটা খোলা জায়গায়। বেরোল। ছোট ছোট অসংখ্য কুঁড়ে, গাছের ডালপাতা দিয়ে তৈরি। জিভারো ইনডিয়ানদের গ্রাম।

মাঝখানের কুঁড়েটা আশপাশেরগুলোর চেয়ে বড়। বন্দিদেরকে ওটার দিকে নিয়ে চলল জংলীরা।

 বিশাল এক ইনডিয়ান বেরিয়ে এল বড় কুঁড়েটার দরজায়, গায়েগতরে যেন একটা দৈত্য। মাথায় টিউকান পাখির পালক গোঁজা। বোঝা গেল, সে-ই রাজা। কিংবা সর্দার।

তার দিকে বন্দিদের ঠেলে দিল জংলীরা।

লোকটার বয়েস যে কত হয়েছে কে জানে, একশো থেকে দেড়শোর মাঝে যা। খুশি হতে পারে। ছেলেমেয়েদের দেখে অবাক হয়েছে সে। তাদের দিকে নীরবে তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ, তারপর আদেশ দিল কিছু। গমগমে ভারি কণ্ঠ, মেঘ। ডাকল যেন।

দু-দলে ভাগ করে ফেলা হলো বন্দিদের। হাইজ্যাকাররা একদিকে, ছেলেমেয়েরা অন্যদিকে। দু-দিক থেকে প্রত্যেকেরই হাত চেপে ধরল দুজন করে ইনডিয়ান। বন্দিরা. ভাবল, তাদের শেষ সময় উপস্থিত। ভয়ে আতঙ্কে কাঁপছে সবার বুক।

কিন্তু মারল না তাদেরকে ইনডিয়ানরা। টেনে নিয়ে চলল। একটা খালি কুঁড়েতে ছেলেদের ঠেলে দেয়া হলো, হাইজ্যাকারদেরকে আরেকটা কুঁড়েতে। তারপর বাইরে থেকে দরজা লাগিয়ে দিয়ে চলে গেল জংলীরা।

তিন গোয়েন্দা আর জিনার সঙ্গেই রয়েছে রাফিয়ান।

গোটা দুই হোট মশাল জ্বলছে কুঁড়েতে। আধার কাটছে না। সেই ম্লান। আলোয় পরস্পরের দিকে তাকাল চারজনে।

ভাল বিপদে পড়েছি, মুখ খুলল মুসা। বেরিয়েছিলাম বেড়াতে আহ, কি একখান বেড়ান বেড়াচ্ছি। স্বপ্নেও ভাবিনি কখনও এরকম হবে, তাহলে কি আর বেরোই? প্লেন হাইজ্যাক, জঙ্গলের মাঝে ক্রাশ-ল্যাণ্ডিং তারপর এসে পড়লাম নরমুণ্ড শিকারীদের কবলে।

তো-ত্তুমি কি সত্যি মনে করো… কথা আটকে যাচ্ছে রবিনের, ওরা আমাদের মাথা কেটে ট্রফি বানাবে? পায়ের গোড়ালিতে হাত বোলাল সে।

তোমার কি মনে হয়? পাল্টা প্রশ্ন করল কিশোর।

বইয়ে তো পড়েছি অন্যরকম, এক মুহূর্ত চুপ রইল রবিন। কিন্তু বইয়ের সঙ্গে বাস্তবের মিল কতখানি আছে কে জানে। আজকাল নাকি নরমুণ্ড শিকারী আর নেই। জিভারোরা মানুষের মাথার ট্রফি এখনও রাখে শুনেছি-কিন্তু অভিজ্ঞ ভ্রমণকারীদের ধারণা, সেগুলো জ্যান্ত মানুষের মাথা কেটে নয়, যারা মরে যায়, তাদের।

আমিও শুনেছি, কিশোর বলল। মরা মানুষেরই হোক আর জ্যান্ত মানুষেরই হোক, ব্যাটারা ট্রফি বানায়, তাতে কোন সন্দেহ নেই। মিউজিয়মে ওরকম একটা ট্রফি দেখেছি, অনেক পুরানো মানুষের। মাথার আসল আকার নেই, ছোট করে ফেলেছে, একটা টেনিস বলের সমান।

মারছে রে! দেখতে কেমন? জিজ্ঞেস করল মুসা।

খুব খারাপ। গা গুলিয়ে ওঠে।

অত ছোট করে কি করে? জিনা জানতে চাইল।

হাড়-মগজ-মাংস সব বের করে ফেলে। চুল ঠিকই রাখে। তারপর চামড়া শুকাতে শুকাতে এমন অবস্থায় নিয়ে আসে…

থাক থাক, আর বলার দরকার নেই, যথেষ্ট হয়েছে, বাধা দিল মুসা। আমাদের পালানো উচিত, যত জলদি পারা যায়। জংলীদের বিশ্বাস নেই। মরা মানুষের মাথা কাটে বলেছে তো? আমিও বিশ্বাস করি। কাজটা খুবই সহজ। জ্যান্ত মানুষকে মেরে ফেললেই মরে যায়, তখন আর মাথা কেটে নিতে অসুবিধে কোথায়। বই লেখে যারা, ওসব ধড়িবাজ শিকারী আর ভ্রমণকারীদের কথা ছাড়ো।

 কিন্তু পালাই কিভাবে? নিচের ঠোঁটে বার দুই চিমটি কাটল কিশোর। পালিয়ে যাবই বা কোথায়? বড়জোর গিয়ে প্লেনটায় উঠতে পারব। জিম আর তার সঙ্গীদেরও বের করে নিয়ে যেতে হবে। ওদেরকে ছাড়া মাইলখানেও টিকব না এই জঙ্গলে। ধরো, এত কিছু করে পালাতে পারলাম। কিন্তু তারপর কি হবে? আমাদের পিছু নিয়ে ঠিক প্লেনের কাছে হাজির হয়ে যাবে ইনডিয়ানরা, আবার ধরে আনবে।

কিন্তু তাই বলে চুপ করে থাকলে তো হবে না। কিছু একটা করা দরকার।

দেখো আগে এ-ঘর থেকেই বেরোতে পারো কিনা, হাত ওল্টাল কিশোর। তারপর তো অন্য কথা।

দেয়ালের প্রতিটি ইঞ্চি পরীক্ষা করে দেখল জিনা আর মুসা। কিশোর আর রবিন বসে রইল, অযথা কষ্ট করতে গেল না। ইনডিয়ানদের এসব কুঁড়ে সম্পর্কে প্রায় সবই জানা আছে ওদের, বইয়ে পড়েছে। শক্ত সোজা গাছ কেটে গায়ে গায়ে লাগিয়ে গভীর করে মাটিতে পোতা হয়। ওগুলোকে মজবুত করে বাধা হয় পাকা বেত দিয়ে। বোমা মারলেও ওই গাছের বেড়ার কিছু হবে কিনা সন্দেহ, আর ছেলেদের সঙ্গে তো রয়েছে শুধু সাধারণ ছুরি। বেতই কাটতে পারবে নাঃ থাকতো গাছ কাটা।

মাটির মেঝে, কিন্তু নিয়মিত লেপে লেপে সিমেন্টের মত শক্ত করে ফেলা। হয়েছে। সুড়ঙ্গ কেটে যে নিচ দিয়ে বেরোবে, তারও উপায় নেই।

 বেড়া দেখা শেষ। বাকি রইল দরজা।

কিন্তু দরজায় ঠেলা দিয়েই অবাক হয়ে গেল জিনা। খোলা। শুধু ভেজিয়ে রেখে গেছে।

বিশ্বাস হচ্ছে না তার। আস্তে করে ঠেলে ফাঁক করল খানিকটা। উঁকি দিয়ে। দেখল, অনেক কুড়ের সামনে আগুন জ্বলছে। লালচে আলোয় আলোকিত হয়ে আছে পুরো এলাকাটা।

খুব সাবধানে, নিঃশব্দে দরজা আরেকটু ফাঁক করল জিনা। বাকি তিনজনও এসে তার পাশে দাঁড়িয়েছে, না না, চারজন, রাফিয়ানও।

এদিক ওদিক চেয়ে আস্তে বাইরে পা রাখল মুসা।

সঙ্গে সঙ্গে অন্ধকার ছায়া থেকে উদয় হলো একটা মূর্তি। একজন জিভারো যোদ্ধা। আগুনের আলোয় লোকটার মুখ দেখা যাচ্ছে, তাতে ভয়াল কিছু নেই। শান্ত।

আবার পিছিয়ে এসে কুঁড়েতে ঢুকল মুসা। কেন দরজা বন্ধ করেনি ইনডিয়ানরা, বোঝা গেল।

দরজাটা ফাঁকই রইল। ছেলেরাও বন্ধ করল না, পাহারাদারও না।

বুঝলে তো? কিশোর বলল। পালাতে পারব না।

বন্ধ কুঁড়েতে রাফিয়ানের আর ভাল লাগল না। দরজা খোলা পেয়ে লেজ নাড়তে নাড়তে বেরিয়ে গেল খানিক হাঁটাহাঁটি করে আসার জন্যে। ফিরেও তাকাল না পাহারাদার। তার ওপর নির্দেশ রয়েছে ছেলেদের দেখে রাখার জন্যে, কুকুর থাকল না গেল, তা নিয়ে তার মাথাব্যথা নেই।

একটা মতলব এল কিশোরের মাথায়।

শোনো, নিচু স্বরে বলল সে। রাফিকে দিয়ে জিমের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারি আমরা।

কি ভাবে? প্রায় একসঙ্গে প্রশ্ন করল অন্য তিনজন।

সহজ। একটা নোট লিখে রাফির গলায় বেঁধে দেব। বললেই দিয়ে আসবে সে।

 কি লিখব, আমরা পালানোর ঝুঁকি নিতে চাই? আমার বিশ্বাস, ওদের দরজাও আটকানো নেই। কি নীরব দেখছ না? ইনডিয়ানরা সব ঘুমাচ্ছে, মাত্র দুজন পাহারাদার ছাড়া সবাই। একজন আমাদের কুড়ে পাহারা দিচ্ছে, আরেকজন ওদের। একই সঙ্গে দুজনকে ধরে যদি কাবু করে ফেলতে পারি, তাহলেই হলো।

খুব রিস্কি মনে হচ্ছে, রবিন বলল।

যে অবস্থায় পড়েছি, রিস্ক তো নিতেই হবে। পাহারাদারকে কাবু করার কথা বলল বটে কিশোর, কিন্তু কিভাবে করবে সেটা এখনও জানে না। আক্রান্ত হলে নিশ্চয় চেঁচামেচি করবে সে, সারা গ্রাম জাগিয়ে ছাড়বে। তখন?

সেটা পরে দেখা যাবে, ভেবে পকেট থেকে নোটবই বের করে একটা পাতা ছিঁড়ে নিল কিশোর। লিখে, কাগজটা ভাজ করে জিনার হাতে দিল।

আস্তে শিস দিয়ে রাফিয়ানকে ডাকল জিনা। কুকুরটা ফিরে এলে তার কলারে শক্ত করে কাগজটা আটকে দিল। রাফি, এটা জিমকে দিয়ে আয়।

 একবারেই বুঝল বুদ্ধিমান কুকুরটা। বেরিয়ে গেল। ফিরে এল খানিক পরে। কলারে আটকানো আরেকটা কাগজ।

খুলে জোরে জোরে পড়ল কিশোর :

হুট করে কিছু কোরো না। যেখানে রয়েছ, থাকো। আমরা পালানোর উপায় খুঁজছি। আধঘণ্টা পর রাফিকে পাঠাবে।

অপেক্ষার পালা।

আধ ঘণ্টাই অনেক বেশি মনে হলো। রাত বেশি বাকি নেই। অন্ধকার। থাকতে থাকতে না পারলে পরে কঠিন হয়ে যাবে পালানো।

অবশেষে রাফিয়ানকে আবার পাঠানোর সময় হলো।

আরেকটা নোট নিয়ে ফিরে এল রাফিয়ান। খুলে পড়ে বোকা হয়ে গেল ছেলেরা। জিম লিখেছে:

আমরা তিনজন যাচ্ছি। তোমাদের নিতে পারছি না, কারণ, তাতে আমাদের চলা ধীর হয়ে যাবে। নিরাপদ জায়গায় যাওয়ার চেষ্টা করব। পারলে, যত তাড়াতাড়ি পারি সাহায্য নিয়ে ফিরে আসব তোমাদেরকে উদ্ধার করার জন্যে। চিন্তা কোরো না। সাহস হারিয়ো না।

ইয়াল্লা! মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল মুসা। আর কোন উপায় নেই। জংলীদের টফির জন্যে মাথাটা বুঝিখোয়াতেই হলো।

অন্য সময় হেসে ফেলত ওরা, কিন্তু এখন ভাবনা বড় বেশি।

পালানোর আশা শেষ। চুপ করে থাকা ছাড়া আর উপায় কি? এই অবস্থায় ঘুম আসার প্রশ্নই ওঠে না। বেড়ায় হেলান দিয়ে কান পেতে রইল ওরা, হাইজ্যাকারদের পালানোর শব্দ শোনার জন্যে।

সময় যাচ্ছে। নীরবতায় কোন রকম ছেদ পড়ল না। তাহলে কি পালানোর চেষ্টা করছে না ওরা? নাকি ইতিমধ্যেই বেরিয়ে গেছে, নিঃশব্দে?

পুব আকাশে আলোর আভাস দেখা গেল। ফিকে হতে শুরু হলো অন্ধকার, ভোর হয়ে আসছে। জিভারোদের কুঁড়ের সামনে আগুন নিভু নিভু হয়ে এসেছে, সেগুলোতে কাঠ ফেলে আবার বাড়িয়ে দেয়া হলো। কেউ কেউ আর ঘরে ঢুকল না, হাঁটাহাঁটি করতে লাগল, ভোরের তাজা হাওয়া গায়ে মাখছে।

আলো বাড়ল।

হঠাৎ ঝটকা দিয়ে পাল্লা পুরো খুলে গেল। কুঁড়েতে ঢুকল একটা মেয়েলোক। হাতে বেতের ঝুড়িতে ফল। নীরবে ঝুড়িটা ছেলেদের সামনে নামিয়ে দিয়ে বেরিয়ে গেল।

এসো, নাস্তা, ডাকল কিশোর। ইস, এক প্লেট ডিম ভাজা আর রুটি যদি পেতাম।

যা পাওয়া গেছে তাই বা মন্দ কি? দুহাতে দুটো ফল তুলে নিল মুসা, কটাস করে এক কামড়ে অর্ধেকটা মুখে নিয়ে চিবাতে শুরু করল। আঁউম, বেশ মিষ্টি, মুখ খাবারে বোঝাই থাকায় শোনাল বেম্মিট্টি।

 হঠাৎ শোনা গেল চেঁচামেচি। মেয়ে কণ্ঠ। কথা বোঝা গেল না অবশ্যই।

দরজা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখল ছেলেরা, কয়েকজন যোদ্ধা ছুটে যাচ্ছে খানিক দূরের আরেকটা কুড়ের দিকে। ওটাতেই রাখা হয়েছিল হাইজ্যাকারদের। শোরগোল বাড়ল। দেখতে দেখতে পুরো গ্রাম এসে ভিড় জমাল কুঁড়ের সামনে।

পালিয়েছে তাহলে! ফ্যাকাসে হয়ে গেছে মুসার চেহারা। দেখেছ কেমন রেগে গেছে? সব ঝাল না এসে আমাদের ওপর ঝাড়ে এখন ব্যাটারা।

.

দরজার ফাঁক দিয়ে দেখছে ছেলেরা, ইনডিয়ানরা কি করে।

একদল জিভারো যোদ্ধা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তৈরি হয়ে চলে গেল জঙ্গলের দিকে। কেন গেছে, সেটা আর বলে দিতে হলো না ছেলেদের, বুঝল। পলাতকদের কি ধরতে পারবে?

জঙ্গলের ভেতর মিলিয়ে গেল যোদ্ধাদের শোরগোল। গাঁয়ের লোকেরা দৈনন্দিন কাজে ব্যস্ত হলো। কেউ এল না ছেলেদের ঘরের দিকে। আস্তে আস্তে অস্বস্তি দূর হলো ওদের।

মেয়েলোকটা নিশ্চয় বলেছে যে, ছেলেরা কুঁড়েতে রয়েছে। যুক্তি মানে, এমন। কেউ ভাববে না, তিনজন লোকের পালানোর ব্যাপারে ছেলেদের কোন যোগসাজশ রয়েছে। কিন্তু কথা হলো, যুক্তি কতখানি মানে কিংবা বোঝে জিভারোরা?

 দীর্ঘশ্বাস ফেলল মুসা। আল্লাই জানে কি হবে।

বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না। গতরাতে যে পাহারায় ছিল, সেই লোকটা এল। চেহারা দেখে ভালমন্দ কিছু বোঝা গেল না। ইশারায় বাইরে বেরোতে বলল তাদেরকে।

কুঁড়ে থেকে বেরোল ছেলেরা। লোকটার পিছু পিছু সর্দারের কুঁড়ের দিকে এগোল।

কিন্তু সর্দারের কুঁড়েতে না গিয়ে কাছের আরেকটা বড় কুঁড়েতে তাদেরকে নিয়ে এল লোকটা। কুঁড়ের কাছ থেকে বড় জোর দশ কদম দূরে রয়েছে ওরা, এই সময় দরজায় দেখা দিল অদ্ভুত দর্শন এক মুর্তি।

আর দশজন সাধারণ জিভারোর চেয়ে লম্বা, বিকট মুখোশে মুখ ঢাকা। মাথার বন্ধনীতে লম্বা লম্বা পালক গোঁজা। জানোয়ারের চামড়ায় তৈরি বিচিত্র পোশাক পরনে। পালক আর পশুর দাঁতের তৈরি লম্বা মালা কয়েক প্যাঁচ দিয়ে রেখেছে গলায়।

রবিন জানে, বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠানে ওই ধরনের পোশাক, মুখোশ আর মালা পরে জংলী ওঝারা। তাহলে এখন কি কোন বিশেষ অনুষ্ঠান হবে? কি সেটা? ইনডিয়ানদের নিষ্ঠুর কোন দেবতার উদ্দেশ্যে বলি দেয়া হবে বন্দিদের?

অনেকক্ষণ নীরবে একদৃষ্টিতে তাদের দিকে চেয়ে রইল ওঝা। তারপর এগিয়ে এসে আস্তে করে হাত রাখল কিশোরের মাথায়। তার ব্যবহারে ভয় পাওয়ার মত কিছু নেই। একে একে, মুসা, রবিন আর জিনার মাথায়ও একইভাবে হাত রাখল সে।

 আর দাঁড়াল না পাহারাদার, বোধহয় থাকার প্রয়োজন মনে করল না। ঘুরে। চলে গেল।

ওঝার সঙ্গে বন্দিরা একা। অনুমান করতে কষ্ট হলো না, ওই অদ্ভুত লোকটা তাদেরকে তার ছত্রছায়ায় নিয়ে নিয়েছে। কিন্তু তাতে এখুনি খুশি হওয়ার কিছু নেই। কেন নিয়েছে কে জানে?

কুঁড়ের সামনের আঙিনায় লোকের ভিড়, মেয়ে-পুরুষ-বাচ্চারা সবাই চেয়ে রয়েছে এদিকে। ইশারায় গ্রামবাসীকে বুঝিয়ে দিল ওঝা, বন্দিদেরকে তার দায়িত্বে নিয়েছে।

তিক্ত কণ্ঠে রসিকতা করল মুসা, মাকড়সা বলছে মাছিকে : আমার বাড়ি এসো বন্ধু বসতে দেব… বিড়বিড় করে আরও কিছু বলল, বোঝা গেল না। তারপর ওঝার দিকে চেয়ে বলল, গলায় যা একেকখান দাঁত ঝুলিয়েছ না, জংলীদাদা। মানুষের গোশত খাওয়ার সময় ওগুলো লাগিয়ে নাও নাকি?

আহ, চুপ করো! বিরক্ত হয়ে ধমক দিল কিশোর। বিপদ আরও বাড়াবে। দেখছি!.

ছেলেদেরকে তার কুঁড়েতে নিয়ে এল ওঝা। দেয়ালে দেয়ালে ঝলছে নানা আকৃতির অসংখ্য মুখোশ, একেকটার মুখভঙ্গী একেক রকম। আরও নানারকম অদ্ভুত জিনিস রয়েছে, তার মাঝে নরমুণ্ড শিকারী ইনডিয়ানদের তৈরি মানুষের মাথার সঙ্কুচিত ট্রফিও আছে।

এই গল্প নিয়ে দারুণ একখান অ্যাডভেঞ্চার ফিল্ম করতে পারবেন মিস্টার ক্রিস্টোফার, মুসা বলল।

না তা পারবেন, মাথা দোলাল জিনা। কিন্তু আগে আমাদের বেঁচে ফিরে তো যেতে হবে?

অপার্থিব লাগছে ঘরের পরিবেশ। ওঝাকেও কেমন যেন মেকি মনে হচ্ছে। কিশোরের কাছে। কেন, বলতে পারবে না। পুরো ব্যাপারটাই যেন সাজানো অভিনয়।

ঘরে দুজন ইনডিয়ান মেয়ে আছে। কর্কশ কণ্ঠে তাদের কিছু বলল ওঝা।

হাত ধরে নিয়ে ছেলেদের বসাল ওরা। প্রত্যেকের গালে লাল আর হলুদ রঙের আলপনা একে দিল। চামড়ার তৈরি খাটো আলখেল্লা পরতে দিল, সেগুলোতেও লাল-হলুদ আঁকিবুকি। রাফিয়ানের মুখেও কয়েকটা রঙিন পোচ লাগিয়ে দিল একটামেয়ে।

সাজানো শেষ হলে ছেলেদের আবার বাইরে নিয়ে এল ওঝা, অপেক্ষমাণ জনতাকে দেখাল।

সন্তুষ্টির গুঞ্জন উঠল জনতার মাঝে।

কুঁড়েতে ফিরে গেল আবার ওঝা।

যার যার কাজে গেল জনতা। একা হয়ে গেল ছেলেরা। কেউ নেই তাদের কাছে, কোন পাহারাদার নেই।

ব্যাপার কি? মুসা না বলে থাকতে পারল না। মাথামুণ্ড তো কিছুই বুঝছি না।

মুক্তি দিল নাকি? রবিনের প্রশ্ন।

না, মাথা নাড়ল কিশোর, আমার মনে হয় না ব্যাপারটা এত সহজ। নিশ্চয় কোন কারণ আছে এসবের।

মরুকগে! মুখ ঝামটা দিল জিনা। গালে রঙ চড়চড় করছে। চলো, ধুয়ে ফেলিগে।

দাঁড়াও, বাধা দিল কিশোর। অযথা লাগায়নি এগুলো। হয়তো কোন ধরনের ছাড়পত্র। এসো, পরীক্ষা করে দেখি।

ধীরে ধীরে হেঁটে গাঁয়ের একদিকের সীমানায় চলে এল ওরা। তারপরে জঙ্গল। সেদিকে পা বাড়াতেই পথরোধ করে দাঁড়াল পাহারাদার। চেহারায় কোনরকম। ভারান্তর নেই তার, কিছু বলল না।

সেদিক থেকে ফিরে এল ছেলেরা।

চারদিকেই গিয়ে দেখল। সব জায়গায় একই ব্যাপার ঘটল। বোঝা গেল, গায়ের মধ্যে ওরা স্বাধীন, কিন্তু সীমানার বাইরে বেরোতে দেয়া হবে না।

যাক, কিশোর বলল, কিছুটা স্বাধীনতা তো মিলল। সুযোগ বুঝে পালানোর চেষ্টা করব।

নতুন জীবনে মানিয়ে নিতে বাধ্য হলো অভিযাত্রীরা। প্রথম দিনের সেই কুঁড়েটাতেই ঘুমায়। দিনের বেলা গ্রামের এখানে ওখানে কাটায়। কেউ কিছু বলে না।

 তিন দিনের দিন তাদের ডাক পড়ল সর্দারের কুঁড়েতে। ওঝা তাদেরকে সঙ্গে করে নিয়ে গেল। এক এক করে তাদের মাথায় হাত রেখে দ্রুত কিছু বলল সর্দারকে। একটা শব্দ কয়েকবার উচ্চারণ করল : হামু। কিশোরের ধারণা হলো, হামু সর্দারের নাম। সর্দারও একটা শব্দ বার বার বলল : বিটলাঙগোরগা।

মারছে রে। ওঝার নাম… নিচু স্বরে বলতে গিয়ে বাধা পেল মুসা। ঠোঁটে আঙুল রেখে ইশারায় তাকে থামিয়ে দিল কিশোর।

একটা ব্যাপার স্পষ্ট হলো, সর্দারের ওপর যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে ওঝার। দীর্ঘ আলোচনা শেষে ওঝা আবার ছেলেদের নিয়ে বেরিয়ে এল। খুশি খুশি মনে হলো তাকে।

কুঁড়েতে ফিরে কিশোর বলল, ওঝার ব্যাপারে অদ্ভুত কিছু লক্ষ করেছ?

কিছু কি? সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল মুসা। পুরোটাই অদ্ভুত। ওরকম অদ্ভুত মানুষ জিন্দেগীতে দেখিনি।

ওকথা বলছি না। জিভারোদের সঙ্গে পার্থক্য রয়েছে ওর, ঠিক মেলে না।

হ্যাঁ, মাথা ঝাঁকাল রবিন, আমিও খেয়াল করেছি।

তা-তো হবেই, মুসা বলল আলাদাই যদি না হলো, ওঝা কিসের? বিচিত্র পোশাক, অদ্ভুত ব্যবহার আর একটু রহস্য রহস্য ভাব যদি বজায় না রাখে, কেন ভয় করবে লোকে?

আমার মনে হয়েছে, গাল ফুলিয়ে ভেঙচাল জিনা, আস্ত একটা ভাঁড়। একটা রামছাগল। শুধু জিভারো যোদ্ধাদের সঙ্গেই যা কিছুটা মিল রয়েছে:

কই আর মিল? মুসা বলল। সেজেগুঁজে যেতে দেখলাম তো কয়েকটাকে সেদিন।

ফিরে এল যোদ্ধারা। খালি হাতে। হাইজ্যাকারদের ধরতে পারেনি।

আশা হলো ছেলেদের। হয়তো সভ্যজগতে ফিরে যেতে পারবে জিম। তাহলে সাহায্য আসবে।

ওঝাকে নিয়ে আবার কথা উঠল।

আমি আসলে বোঝাতে চাইছি, কিশোর বলল। এ-গাঁয়ের জিভারোরা সাধারণ মানুষ। মনও তাদের ভাল। কিন্তু ওঝার স্বভাব, চালচলন কেমন যেন অন্যরকম। আর, সারাক্ষণ মুখে মুখোশ পরে রাখে কেন?

হয়তো চেহারা খুব কুৎসিত, মুসা বলল। কিংবা মুখে বাজে কোন চর্মরোগ। আছে। অথবা মুখে খোলা বাতাস লাগানো পছন্দ করে না সে।

এমনও হতে পারে, কর্তৃত জাহির করার জন্যেই মুখোশ পরে সে রবিন বলল। কিংবা অলৌকিক কোন ক্ষমতা আছে ওটার।

ওসব হয়তো-টয়তোর ধার দিয়ে গেল না জিনা, সাফ বলে দিল, ওর মুখটা আসলে তাপিরের মত, তাই ঢেকে রাখে।

 বিকেলে গাঁয়ের ভেতর বেড়াতে বেরোল ওরা। ওঝার কুঁড়ের ধার দিয়ে। যাচ্ছে, এই সময় দুজন মেয়ের একজন বেরিয়ে হাত নেড়ে ডাকল তাদের।

দরজায় দেখা দিল ওঝা বিটলাঙগোরগা। ইশারা করল।

বিটলা ডাকছে কেন? মুসার প্রশ্ন।

বিটলামী করার জন্যে, জিনার জবাব।

তোমরা বেশি কথা বলো! কড়া ধমক লাগাল কিশোর।

যেতে দ্বিধা করছে ছেলেরা।

ভয় কি? এসো, ইংরেজিতে বলল কেউ।

ঝট করে তাকাল সবাই। কে? ওঝা ছাড়া ধারেকাছে তো আর কেউ নেই? ইনডিয়ান মেয়েটাও ঢুকে গেছে আবার কুঁড়েতে।

দরজা ছেড়ে সরে দাঁড়াল ওঝা। ছেলেদের ভেতরে ঢোকার পথ করে দিল। তারপর মেয়েদুটোকে কিছু বলল, বেরিয়ে গেল ওরা।

ছেলেরা ঢুকলে দরজা লাগিয়ে দিল ওঝা। আস্তে করে খুলে আনল মুখোশ।

 ইওরোপীয়ান! চেঁচিয়ে উঠল বিস্মিত মুসা।

আপনি ইংরেজি বলেছেন? রবিনের জিজ্ঞাসা।

কে আপনি? জানতে চাইল জিনা।

কিশোর তেমন অবাক হয়েছে মনে হলো না, এ-রকম কিছুই যেন আশা করছিল সে।

হাসল ওঝা। বয়েস পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশ হবে, ধূসর চুল, হাসি হাসি নীল চোখ। মুখের চামড়া ফ্যাকাসে, সর্বক্ষণ মুখোশ পরে থাকে বলেই হয়তো। খুব চমকে। দিয়েছি, না? আসলে আমি বিটলাঙগোরগার অভিনয় করছি, বিটলা নই। শব্দ করে হাসল সে।

কত কত বাজে কথা বলেছে ভেবে লজ্জা পেল মুসা আর জিনা, চোখ তুলে তাকাতে পারল না।

আমার নাম কারলো ক্যাসাডো। ছিলাম বৈমানিক, কপাল-দোষে হয়ে গেলাম। জিভারোদের ওঝা।

আপনাকে আমি চিনেছি, স্যার, কিশোরের কণ্ঠে উত্তেজনা। আপনিই সেই বিখ্যাত কারলো ক্যাসাডো, দুর্ধর্ষ বৈমানিক হিসেকে যার অনেক নামডাক। আপনার অনেক অভিযানের কাহিনী আমি পড়েছি। আপনার নিখোঁজ হওয়ার সংবাদও…

পড়েছ, না? এই রাজিলের। জঙ্গলেই হারিয়েছি আমি, বিষণ্ণ শোনাল। বৈমানিকের কণ্ঠ।

কি হয়েছিল? জিজ্ঞেস করল জিনা।

এঞ্জিনের গোলমাল। নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল প্লেন। বেঁচে যে আছি এটাই আশ্চর্য। প্যারাসুটও আটকে গিয়েছিল, খুলল শেষ মুহূর্তে। আরেকটু দেরি হলেই গেছিলাম। পড়লাম একেবারে জিভারোদের সর্দার হামুর কুঁড়ের সামনে। ভেবেছি, সঙ্গে সঙ্গে আমাকে কেটে ফেলবে। তা-তো করলই না, আমাকে তোয়াজ শুরু করল। পরে বুঝেছি, নীল চোখ আর আকাশ থেকে পতনই আমাকে বাঁচিয়েছে। আমাকে ওরা কালুম-কালুম ভেবেছে।

কালুম-কালুম! মুখ বাঁকাল মুসা।  

জিভারো ইনডিয়ানদের পবন, কিশোর বলল তাকে। বাতাসের দেবতা।

বাহ, বুদ্ধিমান ছেলে, প্রশংসা করল ক্যাসাডো। অনেক কিছু জানো।

ইনডিয়ানরা প্লেন দেখেনি? জিজ্ঞেস করল রবিন।

দেখে, মাঝে-সাঝে। জঙ্গলের ওপর দিয়ে উড়ে যায়। কিন্তু ওগুলো কি জিনিস, জানে না ওরা। সভ্যতার সঙ্গে পরিচয় নেই। আর প্যারাসুট তো দেখেইনি। আমার প্লেনটা গিয়ে পড়েছে ওখান থেকে অনেক দূরে, বাতাসে উড়িয়ে। নিয়ে এসেছে আমাকে।

ওদের ভুল ধারণা ভাঙলেন না কেন?

চেষ্টা করেছি, মানতে রাজি নয়। ওদের ধারণা, দেবতারা সহজে মানুষের। কাছে ধরা দেয় না, তাই নানা রকম বাহানা করে। আমি কালুম-কালুম যদি না-ও হই, তার প্রেরিত দূত যে তাতে কোন সন্দেহ নেই ওদের।

হেসে বলল মুসা, বাঘের সাজে যে সাজিয়েছেন আমাদের, আমরা তাদের কাছে কী? হালুম-হালুম?

হেসে ফেলল ক্যাসাডো। হালুম-হালুম না হলেও অনেকটা ওরকমই। দেবতার বাচ্চা।

ওদের ভাষা শিখলেন কোথায়? জিজ্ঞেস করল কিশোর।

পর্তুগীজ ভাষার কিছু শব্দ মিশে গেছে ওদের ভাষায়। কিছু কিছু জিভারো জানতাম। শুরুতে কাজ চালিয়ে নিয়েছি। থাকতে থাকতে এখন পুরোপুরিই শিখে ফেলেছি।

আপনি চলে যান না কেন?

যেতে দেয় না। আমি নাকি ওদের সৌভাগ্যের ধারক। চলে গেলে আবার যদি দুর্ভাগ্য এসে ভর করে?

তাদের এ-বিশ্বাসের কারণ? রবিন জানতে চাইল।

আমি নেমেছিলাম সর্দারের কুঁড়ের সামনে। এমন এক সময়, যখন জিভারোদের দুঃসময় চলছে। বনে শিকার নেই, প্রচণ্ড খরা। এমনিতেই খাবারের খুব সমস্যা বেচারাদের, খুরা কষ্ট আরও বাড়িয়ে দেয়। খাওয়ার অভাব, লোক। মরছে। ওই সময় আমি নামলাম। যেদিন এলাম, অনেক দিন পর সেদিনই পাঁচট = শুয়োর মেরে আনল শিকারীরা, তার পরদিন থেকে শুরু হলো বৃষ্টি। আসনে আবহাওয়ার পরিবর্তন দেখেই বনে জন্তু-জানোয়ারেরা ফিরে আসা শুরু করেছিল। ইনডিয়ানরা ভাবল, সব আমার দয়া। আমি বলেছি বলেই খাবার আর পানি দিয়েছে কালুম-কালুম। এ-রকম একজনকে কেন ছেড়ে দেবে ওরা?

তা-তো ঠিকই, মুসা বলল। আমরা কালুম-কালুমের ছেলে, বলেছেন বুঝি তাদের?

তোমাদের ভালর জন্যেই বলতে হয়েছে, হাসল বৈমানিক। সারাক্ষণ মুখোশ পরে থাকেন কেন? জিজ্ঞেস করল কিশোর।

থাকতেই হবে যখন, ভাবলাম ক্ষমতা নিয়েই থাকব। দেবতারা নাকি সহজে নিজেদের চেহারা মানুষকে দেখতে দিতে চায় না। তাই মুখোশ বানালাম। একমাত্র সর্দারের সামনে ছাড়া আর কারও সামনে খুলি না। এতে হামুও খুব খুশি, তাকে অনেক বড় সম্মান দেয়া হয়েছে বলে।

পালানোর কথা ভাবেন না?

ভাবি না মানে? পালাতে পারলে বাঁচি। কিন্তু এই গভীর জঙ্গল পেরিয়ে একা। যাব কি করে? সভ্যতা অনেক দূর। সাহস হয় না। এক মুহূর্ত চুপ থেকে বলল, কিন্তু তোমাদের কথা তো কিছু জানা হলো না? কে তোমরা? কি করে এলে?

খুলে বলল সব কিশোর। মাঝে মাঝে কথা যোগ করল অন্য তিনজন।

জিম, চ্যাকো আর ওরটেগা ফিরে যেতে পারলে আমাদের উদ্ধার করবে, সব শেষে বলল জিনা।

অনেকগুলো যদি আছে তাতে। যদি ফিরে যেতে পারে, যদি উদ্ধার করার ইচ্ছে থাকে, এবং যদি ওরা আসার আগেই আমাদের বলি না দিয়ে দেয় ইনডিয়ানরা, মুসা বলল।

অত নিরাশ হও কেন? সান্ত্বনা মুসাকে নয়, নিজেকেই দিল আসলে কিশোর।

দীর্ঘ নীরবতা।

 ক্যাসাডো ভাবছে।

রবিন চুপ।

জিনা চিন্তিত।

মনিবের চেহারা দেখে রাফিয়ানও বিষণ্ণ হয়ে উঠেছে, লেজ নাড়ছে ধীরে ধীরে।

হঠাৎ নীরবতা ভাঙল ক্যাসাডো, আমার প্লেনের রেডিওটা যদি খালি পেতাম। এসওএস পাঠানো যেত।

আমরা যে প্লেনে এসেছি, কিশোর বলল, তাতেও আছে রেডিও। ভাঙা, অর্ধেক মেরামত হয়েছে।

Categories: