গত রাতে, খুলে বলল সব জিম, একা ছিলাম। আমি দ্বীপে। মিস্টার আমানের দিকে চেয়ে বলল, আপনারা সব চলে গেলেন ছেলেদেরকে খুঁজতে। পাহারা দিচ্ছিলাম। হঠাৎ কানো এল মোটরবোটের শব্দ। চোরটোর এল মনে করে দেখতে চললাম। পার্কের কাছ দিয়ে চলেছি, হঠাৎ মনে হল নাগরদোলাটার কাছে কে যেন দাঁড়িয়ে আছে। এগোলাম। দৌড়ে চলে গেল একটা মূর্তি। তাড়া করলাম, কিন্তু ধরতে পারলাম না। কোথায় জানি লুকিয়ে পড়ল। অবাক হলাম! ব্যাটা নাগরদোলার কাছে কি করছিল? নতুন বসানো মোটরটা চুরি করতে আসেনি তো? পরীক্ষা করে দেখলাম মোটরটা। দুটো স্কু খোলা। হ্যাঁ মোটর চুরি করতেই এসেছিল। আবার স্কু টাইট দিয়ে সব ঠিক আছে কিনা দেখার জন্যে সুইচ টিপলাম। চালু হয়ে গেল মোটর, আলো জ্বলে উঠল, ঘুরতে লাগল। নাগরদোলা। ঠিক আছে সব। আবার অফ করে দিলাম মোটর। এটাই দেখেছিল লোকে।
কিন্তু ভূত বলে উঠলেন মিস্টার আমান। সাদা পোশাক পরা ভূত দেখেছে লোকে। এর কি ব্যাখ্যা?
রেনকোট পরেছিলাম, স্যার, বলল, গার্ড। হলুদ রঙের। হুডও ছিল মাথায়। দূর থেকে অন্ধকারে সাদা ধরে নিয়েছে লোকে।
হুঁ। মাথা ঝোঁকালেন মুসার বাবা। বুঝেছি। কিন্তু একটা কাজ ভুল হয়ে গেছে, জিম। সকালেই শহরে যাওয়া উচিত ছিল, তোমার। তুমিই গতরাতে নাগরদোলা ঘুরিয়েছ, জানিয়ে এলে ভাল করতে।
ঠিকই বলেছেন, স্যার, মাথা নিচু করে বলল জিম। ভুলই হয়ে গেছে।
এক কাজ কর, বললেন মিস্টার আমান। আরও দুজন গার্ড নিয়ে এসো ফিশিংপোর্টে গিয়ে। বুঝতে পারছি, একা কুলাতে পারবে না। চোর আবার আসবে। কয়েকজন যদি আসে, একা পারবে না। ওদের সঙ্গে। হ্যাঁ, জেলেফেলেদের কাউকে এনে না। ওগুলোকে বিশ্বাস নেই। নিজেরাই চুরি করে বসতে পারে। ভাল লোক আনবে।
চেষ্টা করে দেখব, স্যার।
চোরের ওপর চোখ রাখার জন্যে এনেছিলাম ছেলেদেরকে, পরিচালককে বললেন মুসার বাবা। কিন্তু হল না। সারা শহর জেনে গেছে, ওরা গোয়েন্দা। কি করে জানল, বুঝতে পারছি না।
মনে হয় আমি পারছি, স্যার, বলল জিম। ছোট্ট শহর ফিশিংপোর্ট। ঘটনা খুব বেশি ঘটে না। ওখানে। ছোটখাট কিছু ঘটলেই সেটা নিয়ে হৈচৈ পড়ে যায়। আপনি আর মিস্টার নেবার ফোনে আলাপ করেছেন। প্ৰযোজকের সঙ্গে। শুনেছে অপারেটর। ওই মেয়েগুলো কেমন হয়, জানেনই তো! কোন কথাই পেটে রাখতে পারে না। আর এত বড় একটা খবর, চুরি হচ্ছে সিনেমা কোম্পানির জিনিসপত্র। হলিউড থেকে গোয়েন্দা আসছে। তদন্ত করতে। কি করে চেপে রাখবে? আপনার ফোন ছেড়েছেন একদিকে, অন্যদিকে রঙ চড়িয়ে বন্ধু-বান্ধবদের কাছে খবর পরিবেশন সারা হয়ে গেছে অপারেটরদের। দেখতে দেখতে ছড়িয়ে পড়েছে মুখরোচক খবর।
প্ৰায় গুঙিয়ে উঠলেন চীফ টেকনিশিয়ান। এসব হতচ্ছাড়া এলাকায় কাজ করাই মুশকিল! শেষ পর্যন্ত হলিউডেই বুঝি ফিরে যেতে হবে!
থাকতে পারলেই ভাল হত, রাফাত, বললেন পরিচালক। চেষ্টা করে দেখুন, নাগরদোলাটা ঠিক করতে পারেন কিনা। আমাকে এখুনি ফিরে যেতে হচ্ছে। এদিকটা সামলান, যেভাবে পারেন। জোসেফ, প্লীজ ফিশিংপোটে পৌঁছে দেবে আমাকে?
চলুন, বল সহকারী-পরিচালক। ঘুরে হাঁটতে শুরু করল জেটির দিকে।
ছেলেদের দিকে ফিরলেন মুসার বাবা। চল, পার্কটা দেখিয়ে আনি তোমাদের। জোসেফ ফিরে এলে ডাইভিং করাতে নিয়ে যাবে।
খুব ভাল হবে, বাবা, চল, বলল মুসা।
খুব বেশি হাটতে হল না। ধসে পড়া একটা বেড়া ডিঙিয়ে পার্কে ঢুকাল ওরা। পরিত্যক্ত পার্ক। এককালে সাইনবোর্ডে নাম ছিলঃ প্লেজার পার্ক। এখন আর সাইনবোর্ড নেই, অনেক আগেই নষ্ট হয়ে গেছে। দুটো খুঁটির একটা আছে, তা-ও হেলে রয়েছে। সিমেন্টে তৈরি বিশ্রাম নেবার আসনগুলো বেশিরভাগই ভেঙেচুরে নষ্ট হয়ে গেছে। বেঁকেচুরে মরচে অংশ খুলে ভেঙে পড়ে আছে কাঠামোর কাছেই। খুব শক্ত করে তৈরি নাগরদোলাটাকে। দাঁড়িয়ে আছে এখনও, তবে শরীরের বেশিরভাগই ক্ষতবিক্ষত। একই অবস্থা হয়েছিল হয়ত নাগরদোলাটারিও, কিন্তু এখন মেরামত হয়েছে। জায়গায় জায়গায় নতুন কাঠ। সিরিষা দিয়ে ঘষে তুলে ফেলা হয়েছে রঙ, নতুন করে লাগানো হবে। কেমন যেন ভূতুড়ে চেহারা। এই দিনের বেলায়ও গা ছমছম করে উঠল মুসার।
এই পার্ক আর এর প্রমোদ্যযন্ত্রগুলো কি কাজে লাগবে, খুলে বললেন মিস্টার আমানঃ একটা লোককে ভুল করে খুনের দায়ে দণ্ডিত করা হয়েছে, সে-ই নায়ক। আসল খুনী অন্য লোক। পুলিশের হাত থেকে পালিয়ে গেল দণ্ডিত লোকটা। খোঁজখবর নিয়ে বের করে ফেলল। কে খুনী। পিছু নিল। টের পেয়ে পালাতে চাইল খুনী। কিন্তু পারল না। তার পেছনে লেগে রইল নায়ক। শেষে স্কেলিটন আইল্যান্ডে এসে লুকাল খুনী। শেষ দৃশ্যটা এরকমঃ একদল লোক আসবে এই পুরানো পার্কে পিকনিক করতে। তাদের সঙ্গে মিশে গিয়ে গা ঢাকা দিতে চাইবে খুনী। কিন্তু নায়কের চোখ এড়াতে পারবে না। নাগরদোলায় চড়ার সময় ঠিক তাকে চিনে ফেলবে। তাড়া করবে। মারপিট গোলাগুলি শুরু হবে। ভয় পেয়ে হুড়াহুড়ি ছুটাছুটি শুরু করবে পিকনিকে আসা দলটা। কিছুতেই নায়কের সঙ্গে পেরে উঠবে না খুনী। শেষে গিয়ে উঠবে নাগরদোলায়। দোলাটা চলতেই থাকবে, ওই অবস্থায়ই নায়কের সঙ্গে মারপিট হবে তার। দোলা থেকে পড়ে গিয়ে মরবে খুনী।
খাইছে! দারুণ কাহিনী প্ৰায় চেঁচিয়ে উঠল মুসা। ছবিটা দেখতেই হবে!
এখানে শুটিং করা গেলে, দৃশ্যটা আরও আগেই দেখতে পারবে, হেসে বললেন মিস্টার আমান। তো আমি যাই। কিছু কাজ করি গিয়ে। তোমরা ঘুরেফিরে দেখ। আধঘণ্টার ভেতরেই ফিরে আসব জোসেফ। পা বাড়াতে গিয়েও থেমে পড়লেন। আর হ্যাঁ, খবরদার, গুপ্তধনের খোঁজখবর বেশি কোরো না! লোকে ঘুণাক্ষরেও যদি ভেবে বসে মোহরের খোঁজ পেয়ে গেছ তোমরা, তাহলে সর্বনাশ হবো দলে দলে লোক ছুটে আসবে। মোহর খুঁজতে শুরু করবে। বারোটা বাজবে শুটিঙের। গত পঞ্চাশ বছরে খুব একটা খোঁজাখুঁজি হয়নি, মোহর পাওয়া যায়নি সৈকতে। লোকে ভুলেই গেছে ব্যাপারটা। ভুলেই থাকতে দাও।
পাহাড়ের ওদিকে গেলে কোন ক্ষতি আছে? জিজ্ঞেস করল কিশোর। ওতে নাকি একটা গুহা আছে। কথিত আছে, জলদস্যুরা বন্দীকে ধরে এনে ওখানে পুরে রাখত।
আমিও শুনেছি, বললেন মিস্টার আমান। যেতে চাইলে যাও। কিন্তু আধঘণ্টার ভেতর ফিরবে। ঘুরে হাটতে শুরু করলেন তিনি।
ঘুরে ঘুরে পার্কটা দেখতে লাগল তিন কিশোর।
জায়গাটা কেমন যেন ভূতুড়ো বিড়বিড় করে বলল মুসা। গা ছমছম করছে আমার।
কিশোর, তুমি চুপ করে আছ কেন? জিজ্ঞেস করল রবিন। কিছু ভাবছ মনে হচ্ছে?
অ্যাঁ…হ্যাঁ, নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটা থামাল কিশোর। রাফাত চাচার ধারণা, চুরি করছে জেলেরা। সিনেমা কোম্পানির আর সবারও তাই ধারণা, তোমরা দুজনও হয়ত এটাই ভাবছ।
ভাবছি তো। জেলে ব্যাটাদেরই কাজ, বলল মুসা। ব্যবসা খারাপ। খেতে পায় না। সেজন্যেই চুরি করছে।
আমার কিন্তু তা মনে হয় না, বলল কিশোর।
অপেক্ষা করে রইল রবিন আর মুসা।
যন্ত্রপাতি চুরি করার পেছনে অন্য কারণও থাকতে পারে, বলল গোয়েন্দাপ্রধান। কঙ্কাল দ্বীপ থেকে সিনেমা কোম্পানিকে তাড়াতে চাইছে হয়ত কেউ। বাইশ বছর ধরে নির্জন পড়ে আছে দ্বীপটা। তা-ই থাকুক, এটাই হয়ত চায় ওই লোক।
টেরর ক্যাসলের ওপর জন ফিলবির যেমন মায়া বসে গিয়েছিল, হাসল মুসা। কঙ্কাল দ্বীপের ওপরও তেমনি কারও আকর্ষণ আছে বলতে চাইছ? নইলে সিনেমা কোম্পানিকে তাড়াতে চাইবে কেন?
সেটাই রহস্য, মাথা ঝোঁকাল কিশোর। চল, গুহাটা দেখে আসি।
পার্ক থেকে বেরিয়ে এল ওরা। গাছপালার ভেতর দিয়ে পাহাড়ের দিকে উঠে গেছে একটা পায়ে চলা পথ। আগের রাতের ঝড়ে ভেঙে পড়েছে অনেক গাছপালা। পথের ওপর ডালপাতা বিছিয়ে আছে। ওসবের মধ্যে দিয়ে চলতে অসুবিধে হচ্ছে, বিশেষ করে রবিনের। তার ভাঙা পা সারেনি পুরোপুরি।
দশ মিনিট পর পাহাড়ের মাথার কাছে উঠে এলো ওরা। পাহাড় না। বলে বড় টিলা বলাই উচিত। কিন্তু নাম পাহাড়, জলদসু্যুর পাহাড়। ঠিক চুড়ার কাছে গুহামুখ, খুদে একটা আগ্নেয়গিরি যেন। ভেতরে উঁকি দিল তিন গোয়েন্দা। অন্ধকার।
ভেতরে পা রাখল ওরা। তেরছা হয়ে নেমে গেছে। সুড়ঙ্গ। সুড়ঙ্গ পেরিয়ে একটা গুহায় এসে ঢুকল তিন কিশোর। বেশ বড় হলরুমের মত গুহা। লম্বাটে। শেষ প্রান্তটা সরু। সুড়ঙ্গ দিয়ে আলো এসে পড়ছে, গুহার ভেতরে আবছা অন্ধকার।
গুহার মাটি আলগা, হাঁটতে গেলে পা দেবে যায়। অসংখ্যবার খোঁড়া হয়েছে প্রতিটি ইঞ্চি, তার প্রমাণ।
নিচু হয়ে একমুঠো মাটি তুলে নিলো কিশোর। আঙুলের ফাঁক দিয়ে ছাড়তে ছাড়তে বলল, গুপ্তধন খুঁজেছে লোকে। গত সোয়াশো বছরে কয় সোয়াশো বার খোঁড়া হয়েছে। এখানকার মাটি, আল্লাই জানে! সব গাধা! এমন একটা খোলা জায়গায় এনে গুপ্তধন লুকিয়ে রাখবে, জলদস্যুদের এত বোকা ভাবল কি করে!
ঠিক, মাথা ঝাঁকাল মুসা। আঙুল তুলে সরু প্ৰান্তটা দেখিয়ে বলল, ভেতরে আরও গুহা আছে মনে হচ্ছে টর্চ আনলে ঢুকতে পারতাম।
গোয়েন্দাগিরি করছ, গুহায় ঢুকতে এসেছ, টর্চ আননি কেন? হাসল কিশোর। রবিনের দিকে ফিরল, তুমি এনেছ?
গুহায় ঢুকব, ভাবিনি।
আমিও ভাবিনি, বলল রবিন।
গোয়েন্দাদের জন্যে টর্চ একটা অতি দরকারি জিনিস, সব সময় সঙ্গে রাখা উচিত, আবার হাসল কিশোর। তবে, আমিও রাখতে ভুলে যাই। আজ গুহায় ঢুকব, জানি, তাই মনে করে সঙ্গে নিয়ে এসেছি!
গুহার সরু প্ৰান্তে এসে দাঁড়াল ওরা। টর্চ জ্বালল কিশোর। পাথুরে দেয়াল। দেয়ালে অসংখ্য তাক, প্রাকৃতিক। মসৃণ। এখানেই ঘুমাত হয়ত জলদস্যুরা, ঘষায় ঘষায় মসৃণ হয়ে গেছে। কে জানে, বন্দিদেরকে হয়ত হাত-পা বেঁধে এখানেই ফেলে রাখা হত। অসংখ্য ফাটল, খাঁজ দেখা গেল। দেয়ালের এখানে ওখানে। একপাশে, মাটি থেকে ফুট ছয়েক উচুতে একটা খাঁজে এসে স্থির হয়ে গেল টর্চের আলো। সাদা একটা বস্তু। ওপরের দিকটা গোল।
খাইছে রে! চেঁচিয়ে উঠল মুসা। ঘুরে দাঁড়িয়েই ছুটি লাগাতে গেল। তারপরেই ঘটল অদ্ভুত একটা কান্ড চমকে থেমে গেল সে।
তাকের ওপর বসে আছে যেন মানুষের মাথার খুলিটা। চক্ষু কোটির দুটো এদিকে ফেরানো। দাঁতগুলো বীভৎস ভঙ্গিতে হাসছে নীরব হাসি, দুই পাটি দাঁতের মাঝে সামান্য ফাঁক। ওই ফাঁক দিয়েই এলো যেন কথাগুলোঃ ভাগ, ভোগে যাও জলদি। দীর্ঘশ্বাস পড়ল। আমাকে শান্তিতে একা থাকতে দাও! এখানে কোন গুপ্তধন নেই।
কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই ছুটতে শুরু করল মুসা। ঠিক তার পেছনেই রবিন। প্রায় উড়ে চলে এল যেন সুড়ঙ্গমুখের কাছে। পাথরে হোচট খেল মুসা। হুমড়ি খেয়ে পড়ল। তার গায়ে পা বেধে গিয়ে গোয়েন্দা সহকারীর ওপরই পড়ল নথি। দুই সহকারীর গায়ে হোচট খেতে গিয়েও কোনমতে নিজেকে সামলে নিল গোয়েন্দাপ্রধান।
হাঁচড়ে পাঁচড়ে উঠে দাঁড়াচ্ছে দুই সহকারী। ফিরে চাইল একবার কিশোর। না, তাড়া করে আসছে না খুলি। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল আবার। নিচু হয়ে তুলে নিল টৰ্চটা। ভয়ে হাত থেকে খসে পড়েছিল।
মড়ার খুলি কথা বলতে পারে না, সময় পেয়ে সামলে নিয়েছে আবার কিশোর। উঠে দাঁড়িয়েছে দুই সহকারী, পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। তাদের দিকে ফিরে বলল, কথা বলতে হলে জিহবা দরকার, কণ্ঠনালী দরকার। খুলির ওসব কিছুই নেই।
হা হা করে হেসে উঠল খুলি। চমকে আবার দৌড় দিতে যাচ্ছিল দুই সহকারী, থেমে গেল খাঁজের পেছনে চোখ পড়তেই। না, খুলি হাসেনি। একটা মাথা দেখা যাচ্ছে। কোঁকড়া চুল। খুলি হাতে নিয়ে লাফিয়ে নেমে এল মাথার মালিক। আবার হাসল জোরে জোরে। নিম্পাপ। কালো দুটো চোখের মণি জ্বলজ্বল করছে টর্চের আলোয়।
তারপর? খুলিটা পেছনে ছুড়েঁ ফেলে দিল পাপালো হারকুস। চিনতে পার?
নিশ্চয়, জবাব দিল কিশোর। প্ৰথমে দৌড় দিয়েছিলাম, তারপরই মনে হল গলাটা কেমন চেনা চেনা। টর্চ তুলে নিতে আসার সাহস করেছি সেজন্যেই।
তারমানে, ভয় পাইয়ে দিতে পেরেছি। তোমাদের? আবার হাসল পাপালো। জলদস্যুর ভূত ভেবে কি একখান কান্ডই না করলে! মুসা আর রবিনের গোমড়া মুখের দিকে চেয়ে আবার হা হা করে হেসে উঠল সে।
আমি ভয় পাইনি, গম্ভীর গলায় বলল কিশোর। শুধু চমকে গিয়েছিলাম। মুসা আর রবিন… দুই সহকারীর পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে থমকে গেল সে। ভেড়া বনে গেছে যেন মুসা আর রবিন।
আমিও ভয় পাইনি, বিড়বিড় করে বলল রবিন। পা দুটো কথা শুনল না, কি করব! খালি ভাগিয়ে নিয়ে যেতে চাইল…
আমারও একই ব্যাপারা বলল মুসা। খুলির ওদিক থেকে কথা শোনা যেতেই পা দুটো চনমান করে উঠল। ছুটিয়ে বের করে নিয়ে যেতে চাইল গুহার বাইরে। তাই, ইচ্ছে করেই তো হোচট খেলাম…
হো হো করে হেসে উঠল পাপালো। দারুণ কৌতুক! হাঃ হাঃ হাঃ…
কিশোরও হেসে ফেলল। হাসিটা সংক্রমিত হল মুসা আর রবিনের মাঝেও ।
চল, বাইরে যাই, হাসি থামিয়ে বলল কিশোর। খোলা হাওয়ায় বসে আলাপ করি।
বাইরে বেরিয়ে এল। চার কিশোর। পাহাড়ের গায়ে হেলান দিয়ে হাত-পা ছড়িয়ে বসল।
এখানে কখন এলে? পাপালোকে জিজ্ঞেস করল কিশোর। কি করে জানলে, আমরা গুহায় ঢুকব?
সহজ, বলল পাপালো। নৌকা নিয়ে ঘোরাফেরা করছিলাম। তোমাদের বোট চোখে পড়ল। কোথায় যাবে, বুঝতে পারলাম। দ্বীপের উল্টো দিকে বোট ভিড়িয়ে নেমে পড়লাম। গাছপালার আড়ালে আড়ালে চলে গেলাম ক্যাম্পের কাছে। দেখলাম, পার্কের দিকে যাচ্ছি। নাগরদোলাটার কাছেই একটা ঝোপের ভেতর লুকিয়ে বসে রইলাম। জানলাম, গুহায় ঢুকবে তোমরা। চট করে ঝোপ থেকে বেরিয়ে গাছের আড়ালে আড়ালে চলে এলাম এখানে। লুকিয়ে বসে রইলাম খাঁজের আড়ালে। খুলিটা ছিল অন্য একটা তাকে। খাঁজে নিয়ে গেছি। আমিই।
কিন্তু লুকিয়ে দ্বীপে নামতে গেলে কেন?? জানতে চাইল রবিন। জেটিতে নৌকা বেঁধে এসে আমাদের সঙ্গে দেখা করলেই পারতে? এতসব লুকোচুরি কেন?
গার্ড শান্ত গলায় বলল পাপালো। জিম রিভানের ভয়ে। দেখলেই তাড়া করে। এখানকার সবাই তাড়া করে আমাকে। উজ্জ্বল চোখ দুটোতে বিষণ্ণতা।
কেন? জিজ্ঞেস করল মুসা।
লোকের ধারণা, আমি খারাপ, ধীরে ধীরে বলল পাপালো। আমরা গরীব, তারওপর বিদেশী, কাজেই চোর। ফিশিংপোর্টে অনেক লোক আছে, যারা সত্যিই খারাপ। ওরাই চুরি করে, নাম দেয়। আমার। বলেঃ ওই গ্রেশান কুত্তাটার কাজ।
পাপালোর জন্যে দুঃখ হল তিন গোয়েন্দার।
আমরা তোমাকে অবিশ্বাস করি না, পাপু, বলল মুসা। কত রকমের লোক আছে দুনিয়ায়। মানুষকে কষ্ট দিয়ে মজা পায়। ওদের কথায় কান দিও না… আচ্ছা, গতরাতে এত তাড়াতাড়ি আমাদেরকে খুঁজে পেলে কি করে, বল তো?
সেটাই সহজ, উজ্জ্বল হয়ে উঠল আবার কালো চোখজোড়া। হাক স্টিভেনের রেস্তোরাঁয় ঝাড় দিই। আমি। বাসনপেয়ালা মেজে দিই। দুডলার করে পাই রোজ। খুব ভাল লোক হাক। ও সাহায্য না করলে না খেয়েই মরতে হত…
দুডলারে দুজন মানুষের খাওয়া হয়। চোখ কপালে উঠল। রবিনের। বেঁচে আছ কি করে?
আছি, কোনমতে, সহজ গলায় বলল পাপালো। পুরানো ভাঙা একটা কুড়ে ঘরে ঘুমাই। এক সময় ঝিনুক রাখত। ওখানে জেলেরা। কাজে লাগে না এখন, ফেলে রেখেছে। ভাড়া দিতে হয় না। আমাকে। সীম আর রুটি কিনতেই খরচ হয়ে যায় দুডলার। মাছ ধরতে জানি, তাই বেঁচে আছি। বাবা অসুস্থ। ভাল খাওয়া দরকার। কিন্তু কোথায় পাব? মাঝে মাঝে বাবার কষ্ট দেখলে আর সইতে পারি না। ছুটে বেরিয়ে আসি কুড়ে থেকে। পাগলের মত ঘুরে বেড়াই উপসাগরে, খুঁজে ফিরি সোনার মোহর। মানুষের দয়া আমি চাই না, ঈশ্বর আমাকে সাহায্য করলেই যথেষ্ট।
অনেকক্ষণ কেউ কোন কথা বলতে পারল না। আর। নোনাপানি ছুয়ে ছয়ে আসছে। হাওয়া, শই শই শব্দ, সাগরের দীর্ঘশ্বাস যেন।
কোমরের বেল্টে গোঁজা ছুরি খুলে নিয়ে খামোখাই মাটিতে গাঁথছে পাপালো। থমথমে পরিবেশ হালকা করার জন্যে হাসল। নিজের দুঃখের সাতকাহনই গেয়ে চলেছি। আসল কথা থেকে দূরে সরে গেছি। অনেক। হ্যাঁ, কি যেন জিজ্ঞেস করছিলে?
গতরাতে এত তাড়াতাড়ি আমাদেরকে খুঁজে পেলে কি করে? মনে করিয়ে দিল মুসা।
সকালে হাক স্টিভেনের ওখানে বাসন মাজছিলাম। হঠাৎ কানে এলো, হাসাহাসি করছে কয়েকজন লোক। একজন বললঃ গোয়েন্দা, না! গোয়েন্দা আনাচ্ছে। আসুক না আগে হাত দেখিয়ে ছাড়ব ব্যাটাদের!
নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটতে কাটতে হঠাৎ থেমে গেল কিশোর। হাতা শব্দটা কোন বিশেষ ভঙ্গিতে উচ্চারণ করেছিল?
তুমি কি করে বুঝলে ভুরু কোঁচকাল পাপালো। জবাবের অপেক্ষা না করেই বলল, ওই শব্দটা বলার সময় জোর দেয় সে। ঝড়ের সময়ই তোমাদের নিরুদ্দেশের খবর ছড়িয়ে পড়ল। বুঝে গেলাম, কোথায় পাওয়া যাবে তোমাদেরকে।
দ্যা হ্যানড…হস্ত…হাত, বিড়বিড় করল কিশোর। চিমটি কাটছে ঠোঁটে।
পুরানো গলাবন্ধ শার্টের তলায় হাত ঢোকাল পাপালো। আমাকে যখন বিশ্বাস কর তোমরা…একটা জিনিস দেখাচ্ছি… ছুরিটি মাটিতে রেখে চামড়ার তেল চিটচিটে একটা থলে বের করে আনল সে। প্লাস্টিকের সুতোয় বাঁধা মুখ।
বাঁধন খুলল পাপালো। চোখ বন্ধ করা সবাই, হাসি হাসি গলায় বলল। হাত বাড়াও।
হাসল তিন গোয়েন্দা। চোখ বন্ধ করে হাত সামনে বাড়াল। সবার ডান হাতের তালুতে একটা করে বস্তু রাখল পাপালো। এবার চোখ খোল!
অবাক হয়ে দেখল তিন গোয়েন্দা, তিনটে পুরানো সোনার মোহর।
বুড়ো আঙুলের সাহায্যে চকচকে মুদ্রার ধারটা পরীক্ষা করল রবিন। ক্ষয়ে গেছে। লেখা পড়ল। ষোলোশো পনেরো! চোখ বড়বড় হয়ে গেছে তার। এত পুরানো।
স্প্যানিশ ডাবলুন! হাতের মোহরটার দিকে চেয়ে আছে কিশোর। জলদস্যুদের গুপ্তধন!
ইয়াল্লা! কোথায়, কোথায় পেয়েছ এগুলো?
সাগরের তলায়, বালিতে পড়েছিল, বলল পাপালো। খুঁজলে আরও পাওয়া যেতে পারে। সিন্দুক কোথাও লুকিয়ে রাখেনি ওয়ান-ইয়ার, নৌকা থেকে পানিতে ফেলে দিয়েছিল। অনেক আগের ঘটনা। সিন্দুকটা নিশ্চয় পাচে ভেঙে নষ্ট হয়ে গেছে। মোহরগুলো ছড়িয়ে পড়েছে বালিতে। ঢেউয়ের জন্যে এক জায়গায় নেই। আর এখন। একটা পেয়েছি স্কেলিটন আইল্যান্ডের দক্ষিণে, একটা ড়ুবে যাওয়া ইয়টের কাছে। সুন্দর ইয়ট ছিল। এককালে, ধ্বংস হয়ে গেছে এখন। কয়েকদিন পরেই দুটো মোহর পেয়েছি আরেক জায়গায়। মনে হয়। ওখানে আরও…
জোরে গাল দিয়ে উঠল। কেউ, এই হারামজাদা, শুয়োরের বাচ্চা, এখানে কি করছিস!
চমকে ফিরে তাকাল তিন গোয়েন্দা। বিনয়ী জিম রিভানের এ-কি। মূর্তিা রাগে কাঁপছে। চোখ মুখ লাল। ছুটে আসছে। বেকায়দা ভঙ্গিতে পাশে ঝুলছে অকেজো হাতটা। হারামজাদা আবার গাল দিয়ে উঠল। সে। একবার না বলেছি, এদিক মাড়াবি না। আজ অ্যায়সা ধোলাই দেব… থেমে গোল সে।
জিমের দৃষ্টি অনুসরণ করে ফিরে তাকাল তিন গোয়েন্দা। তাদের পাশে নেই পাপালো। ছায়ার মত নিঃশব্দে উঠে চলে গেছে ওখান থেকে।