তাড়াতাড়ি বাক্স দুটো মাটিতে নামিয়ে রেখে দৌড় দিল কিশোররা। বরফে ঢাকা পিচ্ছিল নদীর ঢালে বসে রয়েছে জো সারটন। পাশে পড়ে আছে একটা দোমড়ানো তেরপল। নৌকার ওপর থেকে তুলে এনেছে।
পাড়ের ওপর থেকেই জিজ্ঞেস করল কিশোর, কী হয়েছে?
ফিরে তাকাল জো। আঙুল তুলে নৌকাটা দেখাল।
নৌকার তলায় চোখ পড়তে থমকে গেল কিশোর। অসংখ্য ফুটো।
বিলাপ করতে করতে জো বলল, এখন আমার কী হবে! এমনভাবে ফুটো করেছে, এই নৌকা আর মেরামত করা যাবে না। আমি এখন মাছ ধরব কী দিয়ে! ছেলেপুলে নিয়ে না খেয়ে মরব!
কিশোর জিজ্ঞেস করল, কে করল এই ফুটো?
তা কী আর দেখেছি? দেখলে কি আর করতে দিতাম?
জোর চিৎকারে লোক জমায়েত শুরু হলো। নৌকার অবস্থা দেখে সবাই থ। কীভাবে ফুটো হয়েছে জানতে চায় সবাই।
এদিক দিয়েই যাচ্ছিলাম, জো বলল। তেরপলটা নৌকার ওপর থেকে সরানো দেখে টেনে দিতে গিয়েছিলাম। দেখি এই অবস্থা। বলেই আবার বিলাপ শুরু করল, হায়রে! কে আমার এতবড় সর্বনাশ করল রে!
ফুটোগুলো পরীক্ষা করল মুসা। কিশোরকে বলল, গজাল দিয়ে করেছে।
কিশোর জিজ্ঞেস করল, কখন ফুটো করল? রাতে? কিন্তু গজালের মাথায় হাতুড়ি দিয়ে পিটানোর শব্দ তো শোনা যাওয়ার কথা।
চারপাশে তাকাল ও। কোথায় কী আছে দেখল। জেনারেল স্টোরটা বাদ দিলে কাছাকাছি দুটো কেবিন আছে। একটা বন্ধ। লোক থাকে কি না বোঝা গেল না। অন্যটার চিমনি দিয়ে হালকা ধোঁয়া উঠছে।
মিস্টার সারটন, কিশোর জিজ্ঞেস করল, শেষ কখন নৌকাটা ভাল দেখে গেছেন আপনি?
জবাব দিল না জো। যেন কিশোরের কথা শুনতেই পায়নি। আসছে বসন্তে মাছ ধরার মৌসুমে কী ভয়ানক অসুবিধেয় পড়বে লোকটা অনুমান করে কষ্ট হলো কিশোরের। আবার জিজ্ঞেস করল, শেষ কখন নৌকাটা ভাল দেখে গেছেন?
জো বলল, মনে নেই। সম্ভবত রোববারে।
সেদিন নৌকাটাকে ভাল দেখেছিলেন?
দেখেছি।
আপনাকে বিপদে ফেলার জন্যই কি কেউ নৌকাটা নষ্ট করে দিয়েছে, কি মনে হয় আপনার?
জানি না, জানি না, আমি কিছু জানি না! অস্থির ভঙ্গিতে দুই হাত নাড়তে নাড়তে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল জো। প্রশ্ন শুনতে শুনতে বিরক্ত হয়ে গেছি আমি, আর ভাল লাগে না। সবারই খালি প্রশ্ন আর প্রশ্ন! ইডিটাররোডে কে জিতবে-জোসি না টেড? এ বছর স্যামনের মৌসুমে কেমন মাছ পড়বে? কাকে ভোট দেব? এখন শুরু হয়েছে নৌকা নিয়ে প্রশ্ন। অসহ্য!
এত প্রশ্ন কারা করে আপনাকে?
এই যে, তুমিই তো করছ। তোমার মত এমন অনেকেই আছে। অধৈর্য ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল জো। তেরপল তুলে নৌকাটা ঢেকে দিল আবার। যদিও এ নৌকা ঢেকে রাখার আর কোন যুক্তি দেখতে পেল না কিশোর।
দর্শকরা চলে যাচ্ছে। বেশির ভাগই শহরের দিকে। সবচেয়ে কাছের কেবিনটাতে গিয়ে ঢুকল এক মহিলা।
চলো তো, মুসাকে বলল কিশোর, একটু গোয়েন্দাগিরি করে আসি।
মুসাকে নিয়ে ছোট কেবিনটার কাছে এসে দাঁড়াল ও। দরজায় টোকা দিল।
খুলে দিল এক মহিলা। কী চাই?
নিজেদের পরিচয় দিয়ে কিশোর বলল, জো সারটনের নৌকাটা কে নষ্ট করেছে জানার চেষ্টা করছি আমরা। গত কয়েক দিনে কখনও হাতুড়ি পিটানোর শব্দ কানে এসেছে আপনার? বিশেষ করে রাতের বেলা?
হাতুড়ির শব্দ শুনিনি, তবে দুই রাত আগে লুক স্টার্লিং লাকড়ি কাটছিল।
সেটা কি অস্বাভাবিক? মুসার প্রশ্ন।
অস্বাভাবিকই তো, মহিলা বলল। সব সময় দিনের বেলায়ই লাকড়ি কাটে ও। ইলেকট্রিক করাত দিয়ে।
লাকড়ি কাটতে দেখেছেন তাঁকে? না শুধু করাতের শব্দ শুনেছেন?
শুধু করাতের শব্দ, ভুরু কোঁচকাল মহিলা। কেন, তোমাদের কি ধারণা করাত দিয়ে জোর নৌকার তলা ফুটো করেছে?
উঁহু! জবাব দিল মুসা। করাত দিয়ে ওভাবে ফুটো করা যায় না।
মহিলাকে ধন্যবাদ দিয়ে বেরিয়ে এল ওরা।
যাওয়ার পথে লুকের দোকানে থামল দুজনে। লাকড়ি কাটার কথা জিজ্ঞেস করল। লুক জানালেন, তিনি লাকড়ি কাটেননি। রাতের বেলা কাটেনও না। মহিলা করাতের শব্দ শুনে থাকলে ভুল শুনেছে। হতে পারে মুজ হরিণের ডাক শুনেছে, হেসে বললেন। ভুল করে বোকা মুজটা হয়তো লোকালয়ে ঢুকে পড়েছিল।
আপনি ওই বোকা মুজটার ডাক শুনেছেন?
না। আমার বেডরুমটা দোতলার এমন জায়গায়, রাস্তায় খুব জোরে কোন শব্দ না হলে শোনা যায় না।
দ্বিতীয়বার লুকের দোকান থেকে বেরিয়ে এল কিশোর ও মুসা। দোকানের বাইরে ফেলে যাওয়া টিনুকদের বাক্স দুটো নিয়ে কেবিনে ফিরে চলল।
তুষারে ঢাকা নির্জন পাহাড়ী রাস্তা। দুই পাশে কেবিন। ঠাণ্ডার ভয়ে দরজা লাগানো। মুসা বলল, দিনের বেলায়ই লোক চলাচল নেই। রাতে অত ঠাণ্ডার মধ্যে কে বেরোবে? লুকের বোকা মুজের ধারণাটাই বোধহয় সত্যি।
কিন্তু মুজ তো আর গজাল ঠুকে নৌকা ফুটো করতে পারবে না, কিশোর বলল। জোর নৌকাটা যে নষ্ট করেছে সে মানুষ। জানে, রাতে বেরোলে কারও চোখে পড়বে না। সহজেই কাজ সেরে চলে যেতে পারবে।
আচ্ছা, জোর নৌকা নষ্ট করা, টিনুকদের কেবিনে আগুন লাগানো আর জোসির ঘরে লাকড়ি ছুঁড়ে মারার মধ্যে কোন সম্পর্ক নেই তো?
থাকতে পারে, চিন্তিত ভঙ্গিতে জবাব দিল কিশোর। কাকতালীয় ঘটনা আমি বলব না একে। কী রকম প্রতিকূল পরিস্থিতিতে এখানে বাস করে মানুষ, দেখেছ? একটানা দীর্ঘ শীত। সারা দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন। কর্মহীন ঘরে বসে থাকা। স্নায়ুতে ভীষণ চাপ পড়ে। মাথায় গোলমাল হওয়াটাও অস্বাভাবিক নয়। আর পাগল হয়ে গেলে কী না করে মানুষ। যাদের দেখতে পারে না তাদের ওপর আক্রোশ মেটানোর চেষ্টা যদি করে থাকে এ রকম কোনও পাগল, আমি অবাক হব না।
ভাবছি, ব্ৰিণ্ডল জ্যাকের সঙ্গে জো সারটনের সম্পর্কটা কেমন? নিজেকেই প্রশ্ন করল মুসা। জোসি হয়তো বলতে পারবে।
অর্ধেক পথ এসে জোসির সঙ্গে দেখা হয়ে গেল ওদের। জোসি বলল, এলে। আমি তো আরও ভাবলাম, হারিয়েই গেলে বুঝি তোমরা।
জো সারটনের নৌকাটার কথা জোসিকে জানাল মুসা। তারপর জ্যাক আর জোর সম্পর্ক নিয়ে যে কথাটা ওর মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল এতক্ষণ, সেটা বলল।
বহু বছর ধরেই ওদের সম্পর্ক ভাল না, জোসি জানাল। তবে তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। জ্যাকের সম্পর্ক কারও সঙ্গেই ভাল না, একমাত্র টেডের বাবা মিস্টার সিউল ছাড়া।
কিশোরের মনে পড়ল, জো বলছিল ইডিটারোড নিয়ে নানারকম প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে ওকে। ডগজে রেসের সঙ্গে জো কোনভাবে জড়িত কি না, জোসিকে জিজ্ঞেস করল।
ও একজন প্রথম শ্রেণীর রেসার, জোসি বলল। আশপাশের পঞ্চাশ মাইলের মধ্যে ওর মত মাশার নেই। হাস্কি সম্পর্কে গভীর জ্ঞান। তবে এখন আর মাশিং করতে পারে না। কয়েক বছর আগে ছেলের অপারেশনের টাকা জোগাড়ের জন্য বাধ্য হয়ে গাড়িসহ কুকুরগুলোকে বিক্রি করে দিয়েছিল। বেচারা!
দুঃখজনক! আফসোস করল মুসা। কিন্তু সে যদি আর রেসে অংশ গ্রহণ না-ই করে, লোকে ইডিটাররোড রেসের ব্যাপারে ওকে প্রশ্ন করে কেন?
করবেই তো। সে রেস বিষেশজ্ঞ। সম্ভবত, কার ওপর বাজি ধরা উচিত সেটা বুঝতে চায় লোকে। ইডিটারোডের ডগ রেস এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় রেস। বহু টাকার জুয়া চলে। প্রতি বছর বহু লোক ধনী হয়, আবার বহু লোক সর্বস্বান্তও হয়। আমার আর টেডের ওপরও গ্লিটারের লোকে এবার বাজি ধরবে, জানা কথা।
কথা বলতে বলতে কেবিনে পৌঁছল ওরা। বাক্স নিয়ে ভিতরে ঢুকল। জোসি জিজ্ঞেস করল, আরেকবার প্র্যাকটিস রানে গেলে কেমন হয়? পরিশ্রম না করালে চর্বি জমে যাবে কুকুরের গায়ে, অলস হয়ে পড়বে ওরা।
ভালই তো হয়,মুসা বলল। আমি রাজি।
কিশোর বলল, আমারও কোন আপত্তি নেই।
কুকুরের গলায় লাগাম পরাতে জোসিকে সাহায্য করল দুজনে। নদীতে উঠে গতি বাড়াল কুকুরগুলো। লেজ উঁচু করে দিয়েছে। হাঁ করা চোয়ালের এক কোণ দিয়ে বেরিয়ে পড়েছে লাল জিভ।
যাচ্ছি কোথায়? কিশোরের প্রশ্ন।
মিঙ্ক রিভারে, জোসি জানাল। স্লেজের পিছনের রেইলে দাঁড়িয়েছে ও। বার বার পা নামিয়ে ঠেলা দিচ্ছে স্লেজের গতি বাড়ানোর জন্য। বেশি দূরে না।
কত দূর? মুসা জানতে চাইল।
এই পাঁচ মাইল। হাস্কির জন্য এটা কোন দূরত্বই না।
তা তো বুঝতেই পারছি, কিশোর বলল। ইডিটারোড রেসে এগারোশো মাইল দৌড়াবে যারা, তাদের জন্য পাঁচ মাইল আর কী। কটা দল অংশ নিচ্ছে এবার?
নদীর ওপরের বরফের স্তর মসৃণ নয় মোটেও। অসমতল। এবড়ো-খেবড়ো। টিলা-টক্করও আছে। লাফিয়ে উঠল স্লেজ। টিলা পেরিয়ে আসার পর কিশোরের কথার জবাব দিল জোসি, সত্তরআশিটা দল হবে।
হিসেব করল মুসা, সত্তর-আশিটা দলে অন্তত হাজারখানেক কুকুর। অ্যাংকারেজে একটা দেখার মত দৃশ্য হবে
নদীর ওপাড়ে তাকাল ও। পাহাড়ে তো তেমন তুষার দেখছি না। গলে যায় নাকি?
থাকলে তো গলবে, জোসি বলল। শুনে অবাক হবে, আমাদের এদিকটা আসলে এক ধরনের মরু অঞ্চল। বছরে বারো ইঞ্চির বেশি তুষারপাত হয় না। এই বরফ তো তৈরি হয়েছে নদীর পানি জমে।
সামনে রাস্তাটা দুই ভাগ হয়ে গেছে। চেঁচিয়ে উঠল জোসি, জি, ডায়মণ্ড, জি!
দলের কুকুরগুলোকে নিয়ে ডান দিকের পথটা ধরে ছুটল ডায়মণ্ডহার্ট।
আরও মাইল দুই এগোনোর পর ইউকন থেকে সরে এল জোসি, অপেক্ষাকৃত সরু আরেকটা নদীর ওপর দিয়ে স্লেজ ছোটাল। বন্ধুদের জানাল, মিংক রিভারে যাবার এটা শর্টকাট।
মিনিট দশেক পর গতি কমিয়ে দিল কুকুরগুলো। চিন্তিত মনে হলো জোসিকে।
কী হয়েছে? জানতে চাইল কিশোর। দ্বিধা করছে জোসি। সামনে নরম বরফ।
বকের মত গলা বাড়িয়ে দিয়ে সামনে তাকাল কিশোর। ওর চোখে বরফের স্তরে কোন তফাৎ ধরা পড়ল না।
নদীর তলায়ও ঝর্না আছে এখানে, জানো বোধহয়। বরফের স্তর পাতলা হয়ে যাওয়ার কারণটা ব্যাখ্যা করল জোসি, সেগুলো থেকে গরম পানি বেরিয়ে নীচের দিকের বরফ গলিয়ে দেয়। বছরের এ সময়টাতেই এ ঘটনা বেশি ঘটে।
সামনে তো আর এগোনো যাবে না বোঝা যাচ্ছে, মুসা বলল। কী করবে এখন? গাড়ি ঘোরাবে?
এমন একটা জায়গায় চলে এসেছে, ঘোরানোটাও আর সহজ নয়, বুঝে গেছে কিশোর। এখন কুকুরগুলোকে ঘোরাতে হলে পাতলা বরফে উঠতেই হবে।
ইজি, ডায়মণ্ড, ইজি! মোলায়েম স্বরে আদেশ দিল জোসি।
দৌড়াননা বাদ দিয়ে হেঁটে চলেছে কুকুরগুলো। চোখে অস্বস্তি। এদিক ওদিক তাকাচ্ছে।
ইজি, ডায়মণ্ড, সাবধান করল জোসি।
থেমে গেল ডায়মণ্ডহার্ট। চারপাশে তাকাতে লাগল।
হাইক! হাইক! চিৎকার করে উঠল জোসি। নদীর কিনারের দিকে সরে যেতে চায়।
কিছু যদি ঘটে… বলতে গেল জোসি।
বন্দুকের গুলি ফোটার মত শব্দ হলো। ঝট করে ফিরে তাকাল কিশোর। স্লেজের ডান পাশের বরফে চওড়া একটা ফাটল চোখে পড়ল। তীরের কাছে নিরাপদ জায়গায় পৌছে গেছে কুকুরগুলো। কিন্তু নদীর মাঝখানের পাতলা বরফ স্লেজের ভার সইতে পারছে না।
জোসি, কী করব আমরা? চেঁচিয়ে উঠল কিশোর। নেমে যাব?
না-না! চেঁচিয়েই জবাব দিল জোসি। বসে থাকো, যেভাবে আছ!
জমাট বাতাসে প্রতিধ্বনি তুলল যেন তীক্ষ্ণ একটা শব্দ। অনেকটা বন্দুকের গুলির মত, তবে আরও জোরে। বরফের স্তর ভেঙে গেছে। লাফিয়ে নামল জোসি। রেইল চেপে ধরে স্লেজটাকে আটকানোর চেষ্টা করল।
বরফের ভাঙা স্তরের সঙ্গে সঙ্গে ডান পাশে কাত হয়ে যাচ্ছে, স্নেজু। পিছলে নেমে যেতে শুরু করল পানির দিকে।
উঠে দাঁড়াল মুসা। দুই হাত দুই পাশে ছড়িয়ে দিয়ে ভারসাম্য বজায়ের চেষ্টা করল। কাজ হলো না। স্লেজের রেইল এসে ওর গোড়ালি ধরে টান মারল। পিছনে উল্টে পড়ল ও। ফুসফুসের সমস্ত বাতাস বেরিয়ে গেল। বরফ-শীতল পানি যেন গিলে নিল ওকে।
বরফের কিনার খামচে ধরার চেষ্টা করল ও। বরফের নীচে আটকে পড়ে বাস্তবে কাউকে মরতে দেখেনি, তবে সিনেমায় দেখা ভয়ঙ্কর দৃশ্যগুলো ফুটে উঠল চোখের সামনে। নদীর তলায় জুতো ঠেকল। পানি বেশি না। সোজা হয়ে দাঁড়ালে বুক পানি হয়। দশ ফুট চওড়া একটা ফোকর তৈরি হয়েছে বরফে। কিশোর আর জোসির নাম ধরে চিৎকার করে ডাকতে লাগল।
ভয় নেই, দাঁড়িয়ে থাকো, জবাব দিল কিশোর। তোমাকে তুলে আনার ব্যবস্থা করছি আমরা।
বরফের মত ঠাণ্ডা পানি মারাত্মক বিপজ্জনক। দেহের অতি মূল্যবান উত্তাপ শুষে নিয়ে দ্রুত শীতল করে ফেলছে দেহটাকে। মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে, নিজেকে বোঝাল মুসা। ওপরে ওঠার জন্য দাপাদাপি করলে আরও দ্রুত ফুরাবে জীবনীশক্তি।
ধীরে ধীরে পানি আর ভাঙা বরফের টুকরো বুক দিয়ে ঠেলে কিনারের দিকে এগোতে পারে, কিন্তু সাহস করল না। স্রোতের টানে বা অন্য কোনভাবে যদি ডুবে গিয়ে বরফের স্তরের নীচে চলে যায়, আর বেরোতে পারবে না।
দাঁড়িয়ে রইল ও। গায়ের চামড়ায় সুচ ফুটাচ্ছে ভীষণ ঠাণ্ডা পানি।
ওদিকে জেটাকে আটকে ফেলেছে কুকুরের দল, পানিতে পড়তে দেয়নি–স্লেজের মধ্যে পাগলের মত কী যেন খুঁজে বেড়াচ্ছে কিশোর ও জোসি। অমন করে কী খুঁজছে ওরা, বুঝতে পারছে না মুসা। অবশেষে সোজা হয়ে দাঁড়াল জোসি। হাতে একটা কুড়াল। দৌড় দিল বনের দিকে।
ও এখন যাচ্ছে কোথায়? আমি এদিকে জমে মরছি! চিৎকার করে বলল মুসা।
তোমাকে বাঁচানোর জিনিস আনতে গেছে, কিশোর বলল। নড়াচড়া কোরো না। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকো।
পা অবশ! সাড়া পাচ্ছি না! দাঁতে দাঁতে বাড়ি খাচ্ছে মুসার।
হামাগুড়ি দিয়ে মুসার দিকে এগোতে শুরু করল কিশোর। দূরত্ব মাত্র কয়েক ফুট, কিন্তু এই পরিস্থিতিতে সেটাও অনেক। চড়চড় শব্দ করে উঠল বরফ।
ফিরে যাও, কিশোর! চিৎকার করে উঠল মুসা। বরফ তোমার ভার সইতে পারছে না।
চুপ করে থাকো। আমার কাজ আমাকে করতে দাও।
তুমিও যদি পানিতে পড়ে যাও, তাতে আমার কোন উপকার হবে। তারচেয়ে জোসির জন্য অপেক্ষা করো। ও জানে, এখন কী করা দরকার, আমরা জানি না।
ঠিকই বলেছে মুসা। অনিচ্ছাসত্ত্বেও পিছিয়ে গেল কিশোর। বার্চের একটা লম্বা ডাল হাতে ছুটে বেরোতে দেখা গেল জোসিকে। দৌড়ে আসতে লাগল।
কিশোর, নদীর পাড়ে পা রেখে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ো, জোসি বলল। শক্ত করে আমার গোড়ালি চেপে ধরে রাখবে।
কী করতে চাও?
বরফের স্তরে দেহের ওজন সমানভাবে ছড়িয়ে দেয়া গেলে সহজে ভাঙবে না বরফ। উপুড় হয়ে শুয়ে খুব সাবধানে ইঞ্চি ইঞ্চি করে মুসার দিকে এগোতে শুরু করল জোসি। ডালটা সামনে বাড়িয়ে দিল। মুসা, দেখো তো নাগাল পাও নাকি?
ডান হাত যতটা সম্ভব লম্বা করে দিল, মুসা। আঙুলের মাথা থেকে মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরে রয়েছে ডালের মাথা। কিন্তু এখন এটাকেও বিশাল দূরত্ব মনে হচ্ছে। পারছি না তো!
আরেকটু আগে বাড়ল জোসি। বিপজ্জনক জায়গায় চলে এসেছে। এখন?
আবার হাত বাড়াল মুসা। ডালের মাথা এখনও ওর নাগালের বাইরে।
প্রাণপণে জোসির গোড়ালি চেপে ধরে রেখে প্রায় ককিয়ে উঠল কিশোর, চেষ্টা করো, মুসা। ডালটা ধরো।
বড় করে দম নিল মুসা। দেহের শক্তি নিঃশেষ হয়ে আসছে।
ডালটা আরও ইঞ্চি দুয়েক ঠেলে দিল জোসি। এবার?
ডালের মাথায় লক্ষ্য স্থির করল মুসা। তারপর প্রচণ্ড ঝুঁকি নিয়ে ঝাপ দিল। হাত ফসকালে সোজা চলে যেত বরফের তলায়, কিন্তু শেষ মুহূর্তে ধরে ফেলল ডালের মাথা। পা উঠে গেল ওপরে। তাতে দেহটা পুরোই ডুবে গেল বরফ-শীতল পানিতে। শরীর অবশ হয়ে যাওয়াতে ঠাণ্ডাও আর অতটা টের পাচ্ছে না। বুঝতে পারছে, মোটেও ভাল লক্ষণ নয় এটা।
এই তো পেরেছ! ধরে রাখো! খবরদার, ছাড়বে না! চিৎকার করে উঠল কিশোর।
দুই হাতে ধরো, জোসি বলল।
বড় করে দম নিল মুসা। নদীর পিচ্ছিল মাটিতে পা ঠেকাল আবার। ভালমত ধরতে না পারলে ডাল থেকে হাত ছুটে যাবে। অন্য হাতটাও বাড়িয়ে দিল। ডালের গায়ে শক্ত হয়ে চেপে বসল ওর আঙুল।
গুড! ধরে রাখো! ছাড়বে না! জোসি বলল। ইঞ্চি ইঞ্চি করে পিছানো শুরু করল। ডালের সঙ্গে মুসাকেও টেনে নিয়ে আসতে লাগল।
জোসিকে আরও তাড়াতাড়ি পিছাতে সাহায্য করল কিশোর। মুসার মনে হলো অনন্তকাল ধরে টানার পর অবশেষে পানি থেকে তুলে আনা হলো ওকে।
আনন্দে চেঁচিয়ে উঠে মুসার পিঠ চাপড়ে দিল কিশোর।
জোসি বলল, এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করা যাবে না। ডায়মণ্ডহার্টকে দাঁড়িয়ে থাকতে বলে কিশোর-মুসাকে নিয়ে শক্ত জায়গায় চলে এল ও।
কম্বল দরকার, কিশোর বলল।
থরথর করে কাঁপছে মুসা। ভীষণ শীত থেকে বাঁচার জন্য কুঁকড়ে ফেলেছে শরীর।
সবার আগে ওর কাপড় খোলা দরকার, জোসি বলল।
এই ঠাণ্ডার মধ্যে! কিশোর অবাক।
যা বলছি, করো। ভিজে কাপড় গায়ের উত্তাপ শুষে নিচ্ছে। যত দেরি করবে ততই ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। কিশোর; স্লেজে ইমারজেন্সি কিট আছে, জলদি আনো। ওটার মধ্যে স্পেস ব্ল্যাঙ্কেট পাবে। স্পেশাল কম্বল। ওর কাপড়-চোপড় সব খুলে ফেলে গায়ে কম্বল জড়াও। আমি আগুন জ্বালানোর ব্যবস্থা করি।
মুসার আঙুল অবশ। জিপার, বোতাম, কিছুই খোলার ক্ষমতা নেই। কাপড় খুলতে ওকে সাহায্য করল কিশোর। তারপর আলট্রাথিন মেটালিক কম্বলটা জড়িয়ে দিল গায়ে।
দাঁতের কাঁপুনি বন্ধ করতে পারছে না মুসা। এর মধ্যেও জোক বলে শীত ভুলে থাকার চেষ্টা করল। হাসল কিশোর। কথা বোলো না।
না বলে পারছি না তো…
বাদামি রঙের এক গুচ্ছ ঘাস নিয়ে ফিরল জোসি। একটা সমতল পাথর থেকে বরফ সরিয়ে ঘাসগুলো রাখল তার ওপর।
কী ঘাস? জানতে চাইল কিশোর।
মেঠো ইঁদুরের বাসা, জোসি বলল। জ্বলে কী রকম দেখো।
শুকনো ডাল ভেঙে ঘাসগুলোর ওপর ছড়িয়ে দিল ও। তারপর পানি নিরোধক একটা হোল্ডার থেকে দিয়াশলাই বের করে আগুন ধরাতে ব্যস্ত হলো।
চোখের পলকে আগুন ধরে গেল ঘাসে। তাতে ডালপাতা ফেলে আগুনটা বাড়াল জোসি। তৈরি হয়ে গেল অগ্নিকুণ্ড। আগুনের ধার ঘেঁষে বসল তিনজনে। ওদের দেহ যেন শুষে নিতে লাগল প্রাণদায়ী সেই উত্তাপ। হাত-পায়ের সাড় ফিরতে মুখ তুলে তাকাল মুসা। হাসি ফুটল মুখে। কিশোর আর জোসির মাঝেও সংক্রামিত হলো ওর হাসি।
মুসার ভিজা কাপড় আগুনের আঁচে শুকাতে দিয়ে নাস্তা খেতে বসল ওরা। ইমারজেন্সি কিট থেকে বের করল পিচফল আর হার্ডট্যাক ক্র্যাকার অর্থাৎ লবণ মাখানো শুকনো গরুর মাংসের টুকরো। একটা ক্যানে কিছু তুষার গলিয়ে নিয়ে স-নিডলের চা বানাল জোসি। অবশেষে শহরে ফিরে যাওয়ার মত বল পেল মুসা শরীরে। আগুন নিভিয়ে, স্লেজ ঘুরিয়ে, শহরে যেতে তৈরি হলো ওরা।
একদিনের জন্য যথেষ্ট প্র্যাকটিস হয়েছে, কি বলল? হেসে ভুরু নাচাল জোসি।
একদিন না, তিন দিন, কিশোর বলল।
উঁহু, মাথা নাড়ল মুসা, তিন মাস।
যে পথে এসেছিল, সে-পথেই ইউকনে ফিরে এল ওরা। নদীর মাঝখান দিয়ে চলল। আর কোন বিপত্তি ঘটল না। নিরাপদেই ওদেরকে পার করে আনল ডায়মণ্ডহার্ট। হঠাৎ গোঁ গোঁ করে উঠল কুকুরটা। বার বার ফিরে তাকাচ্ছে জোসির দিকে।
জোসি বলল, হ্যাঁ, আমিও দেখেছি!
কাকে? কিশোরের প্রশ্ন।
ডায়মণ্ডহার্টের সঙ্গে কথা বলছি আমি, জোসি বলল। আমাদের দিকেই আসছে দলটা। ডায়মও আগে দেখেছে। দেখে আমাকে জানিয়েছে।
কী করে বুঝলে তুমি? জিজ্ঞেস করল মুসা।
প্র্যাকটিস আর অভিজ্ঞতা দিয়ে, জবাব দিল জোসি।
কই, আমি তো কিছু দেখছি না, কিশোর বলল। আকাশ আর বরফ ছাড়া।
গতি কমাল না ডায়মণ্ডহার্ট। তবে অন্য দলটাকে দেখার জন্য সারাক্ষণ মাথা উঁচু করে রাখল।
এ পথেই আসছে এখনও? জোসিকে জিজ্ঞেস করল মুসা।
হ্যাঁ, জোসি জবাব দিল। চিনতে পেরেছি ওকে। টেড।
এত দূর থেকে চিনলে? মুসা অবাক। শুধু ওই কালো বিন্দুগুলো দেখে?
হ্যাঁ, মাথা ঝাঁকাল জোসি। এ সব আমাদের শিখতে হয়। এখানে দূর থেকে যে চিনতে পারবে না, যে কোন সময় ভয়ানক বিপদ হতে পারে তার। আমি এখান থেকেই বলে দিতে পারব দলটা কত বড়, কত গতিতে ছুটছে, কত দক্ষ মাশার।
কিন্তু টেড এখানে কী করছে? কিশোরের প্রশ্ন।
প্র্যাকটিস, জবাব দিল জোসি।
পঞ্চাশ গজের মধ্যে চলে এল টেড। ভঙ্গিতেই বোঝা যাচ্ছে রাস্তা ছাড়ার কোন ইচ্ছেই নেই ওর। ঝামেলা করতে চাইল না জোসি। ডায়মণ্ডহার্টকে থামতে বলে ব্রেক চাপল। জেটা রাস্তা থের্কে নামাতে জোসিকে সাহায্য করল কিশোর ও মুসা। জোসি কুকুরগুলোকে রাস্তা থেকে সরিয়ে এনে চুপ থাকতে বলল।
সোজা ওদের দিকে ছুটে এল টেড। গতি কমাল না। দ্রতা করেও একটা কথা বলল না কারও সঙ্গে।
জোসি চুপ। তাকিয়ে আছে কিশোর-মুসা। রাস্তা দখল করে রেখে নিজেকে শক্তিমান প্রমাণের চেষ্টা করছে টেড। তবে জোসি বুদ্ধিমান। এ মুহূর্তে কিছু বলার অর্থ ঝগড়া বাধানো। সেটা এড়াতে চাইছে ও। ইডিটারোড রেসের আগে মারামারি করে কুকুরগুলোর ক্ষতি করতে রাজি নয়।
বারো ফুটের মধ্যে চলে এল টেড। হাত তুলে ওকে থামার ইশারা করল জোসি। সামনের দিকে নজর টেডের। জোসিকে দেখেও না দেখার ভান করল। শ্লেজের হুস হুস শব্দ তুলে পাশ কেটে বেরিয়ে গেল।
এত অভদ্র তো দেখিনি! রেগে গেল মুসা।
সাবধান করতে চেয়েছিলাম ওকে, যাতে পাতলা বরফে না ওঠে, গম্ভীর শোনাল জোসির কণ্ঠ।
উঠুক। ঠাণ্ডা পানিতে পড়লে বুঝবে মজা, কিশোর বলল। মরবে, কি বলো? মুসা তো বেঁচে গেল।
এখনও পুরোপুরি বাঁচিনি, পরিস্থিতি হালকা করার জন্য হাসল মুসা। কাপড়ই শুকায়নি ঠিকমত। আরাম পাচ্ছি না।
স্লেজটা রাস্তায় তুলল জোসি। আবার ছুটল।
শহরটা নজরে আসতেই গতি বেড়ে গেল কুকুরগুলোর। লেজ নাড়াও বেড়েছে। শক্তিশালী পেশিতে নতুন শক্তি সঞ্চারিত হয়েছে।
নদীতীরের রাস্তা ধরে দলটাকে ছুটিয়ে নিয়ে এল ডায়মণ্ডহার্ট। কেনলের কাছে এসে থামল।
লাগাম খুলতে জোসিকে সাহায্য করল কিশোর ও মুসা। কুকুরগুলোকে খাবার আর পানি দিল জোসি। তারপর কিশোরদের নিয়ে ঘরে ফিরে চলল।
কেবিনের কাছাকাছি প্রায় চলে এসেছে ওরা, হাত তুলল মুসা, মুন না?
জোসি বলল, কিছু হয়েছে!
মুন ওদের দেখে দৌড়ে আসতে শুরু করল।
জোসি, কয়েক গজ দূরে থাকতে চেঁচিয়ে উঠল মুন, জলদি চলো! বাবার শরীর খুব খারাপ।
কী হয়েছে?
জানি না। খাওয়ার পর থেকে কেমন করছে। চোখে পানি এসে গেছে মুনের। জোসি, আমার ভয় লাগছে। বাবা যদি মরে যায়!