৩. বেড়াল নিতে যাচ্ছে! রবিন বললো

0 Comments

নড়তে ভুলে গেছে যেন ছেলেরা। ছুরিহাতে উঠে দাঁড়িয়েছে লোকটা। আচমকা, একটা বেড়াল টেনে নিয়ে পোঁচ মারলো। চিরে ফেললো পেট। দ্বিতীয়টার চিরলো। তৃতীয়টারও। তারপর টেনে টেনে বের করতে লাগলো ভেতরের তুলা, ছোবরা, কাঠের গুঁড়ো। সমস্ত কিছু ছড়াতে লাগলো টেবিলে। ছোবড়া আর তুলার। ভেতর খুঁজতে লাগলো কি যেন।

জোরে জোরে নিঃশ্বাস পড়ছে। ছুরিটা টেবিলে ফেলে হতাশ ভঙ্গিতে বসে পড়লো চেয়ারে। কঠোর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ছেঁড়া বেড়ালগুলোর দিকে, পারলে চোখের আগুনেই ভস্ম করে ফেলে।

পায়নি, ফিসফিস করে বললো রবিন।

না, কিশোর বললো। ডিকেরটার ভেতরে থাকতে পারে। চলো, চলো, ও বেরোবে! কুইক!

লাফিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে লোকটা। হাত বাড়ালো চেয়ারে রাখা হ্যাঁটের দিকে।

 কাছেই হিবিসকাসের গোটা তিনেক ঘন ঝোপ। ওগুলোর ভেতরে এসে প্রায়। হুমড়ি খেয়ে পড়লো তিনজনে। বেরিয়ে, দরজা লাগিয়ে দ্রুত পায়ে এগিয়ে এলো। লোকটা। ঝোপের দিকে চোখ তুলে তাকালো না। লম্বা পা ফেলে হারিয়ে গেলে বাড়ির আড়ালে। গাড়ির দরজা বন্ধ করার শব্দ হলো। স্টার্ট নিলো, ইঞ্জিন। শা করে ছুটে বেরিয়ে গেল নীল গাড়িটা।

বেড়াল নিতে যাচ্ছে! রবিন বললো।

 চলো, আমরাও যাই, বললো রবি।

আমাদের সাইকেল, ওর গাড়ি। আর কেলহ্যাম স্ট্রীট এখান থেকে পাঁচ মাইল। তোমাদের কারনিভলের কাছাকাছি।

হতাশ দৃষ্টিতে পরস্পরের দিকে তাকালো ওরা।

কিছুই করতে পারছি না আমরা! গুঙিয়ে উঠলো রবিন। কিশোর, কিছু একটা করো!

কি করবো? ঝোপ থেকে বেরোলো কিশোর। থমথমে চেহারা। বাড়িটার দিকে চেয়ে হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। পারবো হয়তো! দেখো দেখো, টেলিফোনের তার! বলতে বলতেই দৌড় দিলো সে। দরজা দিয়ে ঢুকতে পারলো না। তালা লাগানো।

জানালা! চেঁচিয়ে উঠলো রবি।

লিভিং রুমের জানালার পাল্লায় ঠেলা দিতেই খুলে গেল। এক এক করে। চৌকাঠে উঠে টপাটপ ভেতরে লাফিয়ে পড়লো তিনজনে।

ফোনটা কোথায় দেখো! তাগাদা দিলো কিশোর। সবখানে খোজো!

ওই যে, কিশোর, হাত তুলে দেখালো রবি। ওই যে, ঘরের কোণে মেঝেতে রেখে দিয়েছে।

ছুটে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসলো কিশোর। ছোঁ মেরে রিসিভার তুলে কানে ঠেকালো। আস্তে করে আবার ক্রেডলে রেখে দিয়ে মাথা নাড়লো। নষ্টহ্! ফেস করে ছাড়লো ফুসফুঁসে চেপে রাখা বাতাস।

হলো না তাহলে? রবিন বললো।

জানি না, নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটলো কিশোর। সাইকেল নিয়ে যেতে পারি-লাভ হবে বলে মনে হয় না। বাড়িতে লোক না থাকলে অবশ্য…

না থাকলে কি বসে থাকবে মনে করেছো? তালা ভেঙে ঢুকে নিয়ে যাবে।

 কাছেপিঠে পাবলিক টেলিফোন নেই? রবি জিজ্ঞেস করলো।

গুঙিয়ে উঠলো কিশোর। তাই তো! আমার মগজ ভোঁতা…, কথা শেষ না করেই থেমে গেল।

বাইরে পায়ের শব্দ, এগিয়ে আসছে। তাড়াতাড়ি গিয়ে জানালা দিয়ে উঁকি দিলো রবিন। ঝট করে মাথা নুইয়ে ফেললো আবার। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ফিরে এসে জানালো, লোকটা ফিরে এসেছে!

চলো বেরিয়ে যাই, উদ্বিগ্ন হয়ে বললো রবি।

সময় নেই, মৃদু কাঁপছে রবিনের কণ্ঠ।

আঙুল তুলে দরজা দেখালো কিশোর, পেছনের ঘরে ঢোকার। দৌড়ে গিয়ে ঢোকার সময় ধাক্কাধাক্কি লাগিয়ে দিলো ওরা। আগে ঢুকলো রবি, পেছনে রবিন, সবার শেষে কিশোর। ছোট ঘর। আসবাবপত্র কিছু নেই। জানালায় খড়খডির। জন্যে আলো আসতে পারছে না। তাড়াতাড়ি দরজাটা লাগিয়ে দিয়ে ওটা ঘেঁষে। দাঁড়ালো ওরা।

লিভিং রুমের দরজা খোলার শব্দ হলো, বন্ধ হলো।

দীর্ঘ নীরবতা।

তারপর ছেলেদের চমকে দিয়ে খলখল করে হেসে উঠলো লোকটা। খসখসে গলায় বললো, খুব চালাক, না? অতি চালাকের গলায় দড়ি, ভুলে গেছো!

একে অন্যের দিকে তাকালো ওরা।

আবার শোনা গেল হাসি। তিন-তিনটে মাথা জানালায়, ভেবেছো দেখিনি? আরও সাবধানে উঁকি দেয়া উচিত ছিলো। তোমাদের অনেক আগে দুনিয়ায়। এসেছি, বাছারা, চোখ পেকেছে, কান পেকেছে। তিন বুদু, বোকামির শাস্তি পাবে এখন।

দরজায় তালা লাগানোর শব্দ হলো। তারপর আরেকটা ভারি ধাতব শব্দ, লোহার দণ্ড আড়াআড়ি ফেলে পাল্লা আটকানো হয়েছে, যাতে তালা ভাঙলেও দরজা খুলতে না পারে। নাও, থাকো এখন, বললো খসখসে কণ্ঠ। একটা কথা মনে রেখো। আর আমার ধারেকাছে আসবে না। হাসলো না আর। দূরে সরে গেল পদশব্দ। দড়াম করে বন্ধ হলো সামনের দরজা। ভারি নীরবতা যেন চেপে বসলো ছোট্ট বাড়িটার ওপর।

জানালা, বললো কিশোর। গিয়ে খড়খড়ি তুলেই থমকে গেল। শিক লাগানো। বিড়বিড় করলো, নিশ্চয় এটা ঘড়ি মেকারের স্টোররুম ছিলো!

জানালা খুলে চেঁচাই, রবিন বললো।

গলা ফাটিয়ে চেঁচালো ওরা। কেউ শুনলো না। কেউ এলো না। রাস্তা অনেক দূরে, বাড়িঘর আরও দূরে। ওদের চিৎকার কারও কানে গেল না। কয়েক মিনিট পর পা ছড়িয়ে মেঝেতেই বসে পড়লো রবি। জানালা খোলায় ঘরে আলো এসেছে। এই প্রথম. চোখে পড়লো আরেকটা দরজা।

ছুটে গেল কিশোর। লাভ হলো না। ওটাও শক্ত করে আটকানো, তালা দেয়া।

আমাদের দৌড় এখানেই শেষ, হতাশ কণ্ঠে বললো রবি। বেড়ালটা নিয়ে যাবে সে। আটকাতে পারবে না।

এখনও আশা আছে, বলে উঠলো কিশোর। দিনিজসপ্রে! মুসা আমাদের বিপদ সঙ্কেত পাবে।

পকেট থেকে খুদে হোমারটা বের করলো গোয়েন্দাপ্রধান। মুখের কাছে এনে জোরে জোরে বললো, সাহায্য! সাহায্য!

খুব মৃদু গুঞ্জন শুরু করলো যন্ত্রটা।

লাল আলো জ্বলবে এখন মুসার হোমারে, বললো কিশোর। সত্যিই শুনবে তো–তিনজনে একই কথা ভাবছে। সাহায্য করতে আসবে ওদেরকে?

ডাণ্ডার ওপরই বসে আছে মুসা। পর্বত থেকে আসা কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস সুচের মতো বিধছে চামড়ায়। কাপ তুলে দিচ্ছে গায়ে। আকাশ মেঘলা থাকায় সন্ধ্যার আগেই সন্ধ্যা নামছে। প্রবেশ পথের লোকজন এখন শুধু ছায়া।

যারা যারা বেরিয়েছে, তাদের একজনকেও ফিরতে দেখেনি। অথচ কারনিভলে শো শুরু হতে আর মাত্র ঘন্টাখানেক বাকি। গেল কোথায় সবাই? কিশোর, রবিন আর রবিই বা কোথায় গেল? কারনিভল খোলার আগেই তো রবির ফেরার কথা। কিশোর বা রবিনেরও এতো দেরি করার কথা নয়, অন্তত একটা মেসেজ তো পাঠানো উচিত ছিলো।

উদ্বিগ্ন হলো মুসা।

মাঝে মাঝে কিশোর এমন আচরণ করে, না, রাগ লাগে তার। কোথায় যাচ্ছে, বলে গেলে কি ক্ষতি হতো বাবা? না, সব কাজ শেষ করে, সফল হয়ে এসে তারপর বলা! যত্তোসব! তার এসব নাটকীয়তার কারণে আগে অনেকবার বিপদে পড়েছে তিন গোয়েন্দা, তা-ও স্বভাব বদলাতে পারে না। গিয়ে খোঁজ করবে?

করাই উচিত। মাটিতে নামলো মুসা। ফান হাউসের বিশাল মুখটা তার দিকে চেয়ে যেন ব্যঙ্গ করে হাসছে এই ভর সন্ধেবেলা। দ্রুত ওটার পাশ কাটিয়ে এসে মাথা গলিয়ে দিলো বেড়ার ফোকরে।

কারনিভলে নাগরদোলার ঘোড়াগুলোর ক্যানভাস সরানো হয়েছে। বাজনা বাজছে। বুদে পাওয়া গেল না রবিকে। ঠোঁট কামড়ালো মুসা। কোথায় গেছে? কানা বেড়াল কেনার বিজ্ঞাপন দিয়েছে যে, তার বাড়িতে দুজনকে নিয়ে যায়নি তো কিশোর? কিন্তু তাহলেও কি এতো দেরি করার কথা?

হয়তো জরুরী কোনো কাজে আটকে গেছে, মনকে বোঝালো মুসা। আসবে। কারনিভল খোলার আগেই চলে আসবে। আর এসেই প্রথমে মুসাকে খুঁজবে, তার রিপোর্ট শুনতে চাইবে। তাকে না পেলে চিন্তা করবে…

এই সময় মনে পড়লো হোমারটার কথা। পকেটেই তো রয়েছে। বিপদে পড়লে জরুরী সঙ্কেত পাঠাবে কিশোর।

তাড়াতাড়ি পকেট থেকে যন্ত্রটা বের করলো মুসা। নাহ, নীরব। লাল আলোও জ্বলছে না।

মেঝেতে বসে মুখ তুলে গোয়েন্দাপ্রধানের দিকে তাকালো রবি। সিগন্যাল কতদূর। যাবে, কিশোর?

তিন মাইল, বলেই আরেকবার গুঙিয়ে উঠলো কিশোর। উঁহুহু, কারনিভল এখান থেকে পাঁচ মাইল। মুসা আমাদের সঙ্কেত পাবে না।

আবার একে অন্যের দিকে তাকালো ওরা।

 আবার চেঁচালে কেমন হয়? রবিন পরামর্শ দিলো। কেউ না কেউ, একসময় না একসময় আমাদের চিৎকার শুনতে পাবেই।

যদি ততোক্ষণ গলায় জোর থাকে আমাদের, বললো কিশোর। শোনো, বেরোনোর উপায় আমাদেরকেই করতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, এমন কোনো ঘর নেই, চেষ্টা করলে যেটা থেকে বেরোনো যায় না। কোথাও না কোথাও দুর্বলতা, থাকেই। সেটা পাই কিনা, খুঁজে দেখি।

কিন্তু কোথায় খুঁজবো? রবি বললো।

হয়তো কিছু একটা মিস করেছি আমরা। রবিন, দেয়ালগুলো দেখো তুমি। পাইপ গেছে যেখান দিয়ে, সেসব জায়গা ভালোমতো দেখবে। আমি জানালাগুলো দেখছি। রবি, তুমি দরজা দেখো। কোণের আলমারিটাও বাদ দেবে না।

নতুন উদ্যমে কাজে লাগলো ওরা।

কিন্তু অল্পক্ষণ পরেই আবার দমে গেল রবি। দরজাগুলো আগের মতোই লাগলো তার কাছে, কোথাও দুর্বলতা পেলো না। দেয়ালে কিছু পেলো না রবিন।

থামলে কেন? চালিয়ে যাও, উৎসাহ দিলো কিশোর। চালিয়ে যাও। কিছু না। কিছু পাওয়া যাবেই।

জানালার প্রতিটি ইঞ্চি পরখ করছে গোয়েন্দাপ্রধান। চার হাতপায়ে ভর দিয়ে এখন দেয়ালের নিচের অংশ দেখছে রবিন।

আলমারির ভেতরে খুঁজছে রবি। হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠলো, দেখে যাও! দেখে যাও! হাতে একপাতা টাইপ করা কাগজ, আলমারিতে পেয়েছে। কারভিলের ইটিনর্যারি। কোথায় কোথায় যাবে, কোনখান থেকে কোনখানে, সেই তালিকা। আমাদেরটার। ক্যালিফোর্নিয়ার পুরো শিডিউল রয়েছে।

তাহলে এই লোকটা তোমাদের কারনিভলেই কেউ, নিজের যুক্তির স্বপক্ষে প্রমাণ পেয়ে খুশি হলো কিশোর।

কিংবা ওদের কারনিভলকে অনুসরণ করছে, অন্য যুক্তি দেখালো রবিন।

রবি, জিজ্ঞেস করলো কিশোর। লোকটার গলা চিনেছো? কথা যে বললো, চেনা চেনা লাগলো?

না কখনও শুনিনি।

মিনিটখানেক চুপ করে রইলো কিশোর, ভাবলো। গলাও হয়তো নকল। করেছে। খসখসে ভাবটা কেমন যেন মেকি।

রবি আর রবিন দুজনেই গিয়ে আলমারিতে খুঁজতে লাগলো আবার। কয়েকটা তাকে মলাটের বাক্স আর পুরনো হার্ডবোর্ড বোঝাই। এক তাকে অদ্ভুত একটা পোশাক পেয়ে টেনে বের করলো রবিন। দেখো তো, এটা কি? আমি চিনতে পারলাম না।

 কালো কাপড়ে তৈরি, আলখেল্লার মতো একটা পোশাক, তবে ঢোলা নয়, আঁটো। কাঁধের সঙ্গে জোড়া দেয়া হুড–তাতে মাথা, কান, গাল সব ঢেকে যায়, শুধু মুখের সামনের দিকটা খোলা থাকে।

ভুরু কোঁচকালো কিশোর। কারনিভলের পোশাক-টোশাক না তো? রবি?

অবাক হয়ে পোশাকটা দেখছে রবি। নীরবে-এগিয়ে এসে হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে লাগলো। ইতিমধ্যে তাক থেকে একজোড়া জুতো বের করলো। রবিন। ওগুলো অদ্ভুত। কালো ক্যানূভাসে তৈরি, রবারের সোল। তলাটা বিচিত্র, অনেকটা সাকশন কাপের মতো দেখতে।

দেখে আরও অবাক হলো রবি।

কি, চিনেছো? কিশোর জিজ্ঞেস করলো।

মাথা নাড়লো রবি। আমাদের কারনিভলে কেউ পরে না, কিন্তু, আবার মাথা নাড়লো সে। বলতে দ্বিধা করছে। ঠিক শিওর না, তবে যদূর মনে পড়ে, মাছিমানব টিটানভ পরতো ওরকম পোশাক।

কী মানব? রবিন অবাক।

মাছিমানব। আমি তখন ছোট, নানীর কাছে থাকি। শিকাগোর এক ছোট সার্কাসে পার্টটাইম কাজ করতো বাবা। টিটানভ শো দেখাতো তখন ওই সার্কাসে। তার শো আমি দেখেছি। বেশিদিন থাকতে পারেনি ওখানে। চুরির দায়ে চাকরি যায়। পরে শুনেছি, জেলে গেছে। হয়তো আবারও চুরি করে ধরা পড়েছিলো পুলিশের হাতে।

জেল! কিশোর বললো। টাট্টু আঁকা লোকটার সঙ্গে তার চেহারার মিল আছে?

চেহারা মনে নেই। তবে বয়েসের মিল আছে। মাছিমানবের পোশাক ছাড়া দেখিনি তো কখনও..,

এই পোশাকটা কি ঠিক ওরকম?

হ্যাঁ। জুতোগুলোও। এরকম জুতো ছাড়া খেলা দেখাতে পারে না। মাছিমানবেরা। তলায় সাকশন কাপ দেখছে না, উঁচু দেয়াল বেয়ে উঠতে কাজে লাগে। প্রায় যে-কোনো দেয়াল…

কিন্তু রবির কথাই কানে ঢুকছে না কিশোরের। আনমনে বিড়বিড় করলো, সেদিনের সেই বুড়ো চোর…পার্ক থেকে গায়েব হয়ে গেল…উঁচু বেড়া ডিঙিয়ে… তুড়ি বাজালো। ঠিক! মাছিমানবের পক্ষেই সম্ভব!

জন্তুজানোয়ারও সামলাতে পারতো টিটানভ, আরেকটা জরুরী তথ্য জানালো রবি। সিংহও।

জলদি বেরোতে হবে এখান থেকে! মাথা ঝাড়া দিলো কিশোর। নইলে বেড়ালটা হাতিয়ে নিয়ে যাবে চলে। আর ধরা যাবে না। চেঁচাও, চেঁচাও! ফাটিয়ে ফেলো গলা!

জানালার কাছে সমবেত হয়ে আবার চিৎকার শুরু করলো ওরা।

ইস, এখনও আসছে না কেন কিশোররা? উৎকণ্ঠা বাড়ছে মুসার। শেষে আর থাকতে না পেরে মনস্থির করে ফেললো, খুঁজতেই বেরোবে।

আধঘন্টা পর সাইকেল চালিয়ে স্যালভিজ ইয়ার্ডে ঢুকলো সে। সন্ধ্যা ঘনিয়েছে। বোরিসকে দেখা গেল, ছোট ট্রাকটা থেকে মাল নামাচ্ছে। নামানো প্রায়। শেষ।

সাইকেল থেকে না নেমেই জিজ্ঞেস করলো মুসা, বোরিসভাই, কিশোর আর রবিনকে দেখেছেন?

না তো! সারাদিনই দেখিনি। কিছু হয়েছে?

বুঝতে পারছি না। আমি…

মুসা, হাত তুললো বোরিস। কিসের আওয়াজ? ভোমরা ঢুকেছে নাকি তোমার পকেটে?

উত্তেজিত না থাকলে আগেই খেয়াল করতো মুসা। বোলতায় কামড়ালো যেন তাকে। ঝট করে পকেটে হাত ঢুকিয়ে বের করে আনলো যন্ত্রটা। সিগন্যাল! চেঁচিয়ে উঠলো সে, বোরিসভাই, বিপদে পড়েছে ওরা! জলদি চলুন।

একটাও প্রশ্ন করলো না আর বোরিস। প্রায় লাফিয়ে গিয়ে উঠলো ট্রাকের ড্রাইভিং সীটে। সাইকেল রেখে মুসা গিয়ে বসলো তার পাশে। ইয়ার্ডের গেট দিয়ে। ছুটে বেরোলো ট্রাক।

মুসার হাতে হোমার। দিকনির্দেশ করছে কাঁটা। পথ বাতলে দিতে লাগলো বোরিসকে, বায়ে, বোরিসভাই…আবার বায়ে…এবার সোজা…

পথের ওপর বোরিসের দৃষ্টি, মুসার নজর যন্ত্রের ডায়ালে। উড়ে যেতে পারলে যন্ত্রের কাটা একদিকেই নির্দেশ করতো। যেহেতু মাটি দিয়ে যেতে হচ্ছে, পথ সরাসরি যায়নি, ঘোরাঘুরি হচ্ছে, ফলে কাটাও একবার ডানে, একবার বায়ে সরছে।

বলে যাচ্ছে মুসা, ডানে, বোরিসভাই–বাঁয়ে…আবার বায়ে…এবার ডানে!

ধীরে ধীরে বাড়ছে যন্ত্রের শব্দ।

এখানেই! মুসা বললো। কাছাকাছিই হবে কোথাও!

নির্জন একটা পথে এসে পড়েছে ট্রাক। এই সন্ধেবেলা একটা লোককেও দেখা গেল না রাস্তায়। ধীরে চালাচ্ছে এখন বোরিস। মুসার নজর পথের দুপাশে। কাউকে দেখলো না, কোনো নড়াচড়া নেই। আবার তাকালো কাঁটার দিকে।

ডানে, বোরিসভাই। এখানেই আছে কোথাও।

কিছু তো দেখছি না, মুসা! উদ্বেগে ভরা বোরিসের কণ্ঠ।

দাঁড়ান, দাঁড়ান! চেঁচিয়ে উঠলো মুসা। পিছে, পেছনে যান! বেশি এগিয়ে। গেছি!

ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষলো বোরিস। ট্রাকটা পুরোপুরি নিশ্চল হওয়ার আগেই ব্যাক-গীয়ার দিলো। বিকট শব্দে প্রতিবাদ জানালো ইঞ্জিন, পিছাতে শুরু করলো গাড়ি।

পথ থেকে দূরে ছোট হঁটের বাড়িটা দেখালো মুসা। বোরিসভাই, আমার মনে হয় ওখানে।

গাড়ি পার্ক করে লাফ দিয়ে নামলো বোরিস। মুসাও নামলো। বাড়িটার দিকে দৌড় দিলো দুজনে।

কয়েক মিনিট পর, হাসিমুখে বেরিয়ে এলো কিশোর, রবিন আর রবি। দরজা ভেঙে ফেলেছে বোরিস আর মুসা মিলে।

খাইছে! হেসে বললো মুসা। কিশোর, তোমার দিনি…দিনি…

দিনিজসপ্রে।

হ্যাঁ। দিনি…দিনি… বাংলা শব্দটা কিছুতেই উচ্চারণ করতে না পেরে রেগে গেল মুসা।

ধ্যাত্তোর, নিকুচি করি দিনিফিনির! সহজ নাম রাখো।…হ্যাঁ, যা বলছিলাম, হোমারটা সত্যি কাজে লাগলো। এতো তাড়াতাড়ি…

এই, কে তোমরা! ধমকের সুরে বলে উঠলো কেউ।

ফিরে তাকালো ওরা। রাস্তার দিক থেকে আসছে ছোটখাটো একজন মানুষ। কাছে এসে আবার ধমক দিলো, এখানে কি? হায় হায়রে,আমার দরজা-টরজা সব ভেঙে ফেলেছে! আদালতে পাঠাবো আমি তোমাদেরকে! জেলের ভাত খাওয়াবো!

লোকটার মুখোমুখি হলো কিশোর। শান্তকণ্ঠে বললো, সরি স্যার, ইচ্ছে করে ভাঙিনি। একটা বাজে লোক আমাদের এখানে এনে বন্দি করেছিলো। বাইরে থেকে। তালা লাগিয়ে চলে গেল। বহুত চিল্লাচিল্লি করেছি, কেউ শোনেনি। লোকটার হাতে টাট্টু আঁকা, পাল-তোলা-জাহাজের ছবি, কালো চামড়া। কোন দেশী, বলতে পারবো না। চেনেন? আপনার ভাড়াটে?

আটকে রেখেছে? টাট্টু? কি বলছো তুমি, ছেলে? বৃদ্ধ বললো। আজ সকালে এক ভদ্রলোককে ভাড়া দিয়েছি। দেখে তো সহজ-সরল মানী লোক মনে হলো। বুড়ো মানুষ। কোথায় নাকি সেলসম্যানের চাকরি করে। টাট্ট তো দেখিনি! যা-ই হোক, ব্যাপারটা রহস্যময় মনে হচ্ছে। পুলিশে রিপোর্ট করবো আমি।

হ্যাঁ, তাই করুন, স্যার। পুলিশকেই জানানো দরকার। দেরি না করে এখুনি। যান, প্লীজ।

মাথা ঝাঁকালো লোকটা। দ্বিধা করলো, ঘুরে আবার ফিরে চাইলো, তারপর আবার ঘুরে হাঁটতে শুরু করলো রাস্তার দিকে।

লোকটা কিছুদূর এগিয়ে গেলে কিশোর বললো, চলো, আমরাও যাই। তাড়াতাড়ি করলে এখনও হয়তো ধরা যায় ব্যাটাকে। বোরিসভাই, চব্বিশ নম্বর। কেলহ্যাম স্ট্রীট। কুইক!

সাগরের ধারে পুরনো, বড় বড় সব বাড়ি। পথের দুধারে গাছপালা, কড়া রোদেও নিশ্চয় ছায়া থাকে। নীল গাড়িটা দেখলো না ছেলেরা।

জানতাম, ব্যাটাকে ধরা যাবে না, নিরাশ কণ্ঠে বললো মুসা।

হ্যাঁ, অনেক দেরি করিয়ে দিলো, সুর মেলালো মুসা।

কোনো কারণে ওর দেরি হলেই বাঁচি, আশা করলো, কিশোর। পথের। মাথায়, ওই বাড়িটাই বোধহয় চব্বিশ নম্বর। ইস, অন্ধকারও হয়ে যাচ্ছে। যান। এগোন।

তিনতলা সাদা একটা বাড়ি। চারপাশে বড় বড় গাছ। বাগানে ফুলের বেড। ড্রাইভওয়েতে একটা গাড়ি, সেই নীল গাড়িটা নয়। মোড় নিয়ে সেদিকে চললো। বোরিস, এই সময় আলো জ্বললো বাড়ির ভেতরে।

এইমাত্র এলো? কিশোর তাকিয়ে আছে সেদিকে, লোকজন কে আছে দেখতে চায়। এর

বাড়ির সামনে এনে গাড়ি রাখলো বোরিস।

 মহিলাকণ্ঠের চিৎকার শোনা গেল বাড়ির ভেতর থেকে, চোর! চোর। ধরো! ধরো!

এক ঝটকায় ট্রাকের দরজা খুলে লাফিয়ে নামলো বোরিস।

ছেলেরাও নামলো হুড়াহুড়ি করে। মুসা চেঁচিয়ে বললো, নিশ্চয় টাট্টুওলা!

 দৌড় দিয়েছে বোরিস.। পেছনে ছেলেরা ছুটলো।

 একনাগাড়ে চেঁচিয়ে চলেছেন মহিলা।

দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে যেন দাঁড়িয়ে গেল মুসা। হাত তুলে দেখালো বাড়ির একপাশে। আবছা অন্ধকারে সবাই দেখলো, খাড়া দেয়াল বেয়ে নেমে আসছে। একজন মানুষ। কি ধরে নামছে, সে-ই জানে। কয়েক ফুট বাকি থাকতে লাফিয়ে পড়লো মাটিতে, জানালা দিয়ে আসা আলোর মাঝে। কোনো ভুল নেই, সেই লোকটা। বগলে লাল-কালো ডোরাকাটা কানা বেড়াল।

ও-ব্যাটাই! চেঁচালো রবিন। বেড়ালটা পেয়ে গেছে।

ধরো, ধরো চোরটাকে! রাগে চিৎকার করে উঠলো রবি।

রবির গলা শুনে ফিরে তাকালো লোকটা। ছেলেদের দেখলো, বোরিসকে দেখলো, তারপর ঘুরে দিলো দৌড়। একদৌড়ে গিয়ে ঢুকে গেল বাড়ির পেছনে গাছপালার ভেতরে।

খেপা ষাঁড়ের মতো গোঁ গোঁ করতে করতে পিছু নিলো বোরিস। কিন্তু বিশালদেহী ব্যাভারিয়ানের তুলনায় লোকটা অনেক দ্রুতগতি। বোরিস আর ছেলেরা গাছের জটলার ভেতরে থাকতেই রাস্তায় উঠে গেল সে।

বোরিসকে ছাড়িয়ে গেল মুসা, রাস্তায় উঠলো। পেছনে হাঁপাতে হাঁপাতে আসছে অন্যেরা। সবাই দেখলো, রাস্তার পাশে রাখা নীল গাড়িটাতে উঠলো চোর। ইঞ্জিন স্টার্ট নিলো, শাঁ করে বেরিয়ে গেল গাড়ি।

নাহ, পারলাম না! দাঁড়িয়ে পড়লো মুসা।

গেল! পাশে এসে দাঁড়ালো রবি।

যাবে কোথায়? আশা ছাড়তে পারছে না রবিন। লাইসেন্স নম্বর আছে, পুলিশ খুঁজে বের করে ফেলবে।

তাতে সময় লাগবে, নথি, গোয়েন্দাপ্রধানের কণ্ঠে হতাশার সুর। তবে তাড়াতাড়িতে কোনো সূত্র ফেলে গিয়ে থাকতে পারে। চলো, বাড়ির ভেতরে চলো। দেখি খুঁজে। ৩

বাড়ির কাছে এসে দেখলো, সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে আছেন একজন সুন্দরী মহিলা, পেছনে একটা ছেলে। দলটাকে দেখে সতর্ক হলেন তিনি, চোখে সন্দেহ। চোরটাকে চেনো তোমরা?

চিনি, ম্যাডাম, কিশোর বললো। পাজী লোক। এ-বাড়িতে আসবে, জানতাম। তাই পিছে পিছে এসেছি। দেরি না হলে…

তোমরা চোর ধরতে এসেছো? বিশ্বাস করতে পারছেন না মহিলা। ওরকম। একটা ক্রিমিন্যালকে? তোমরা তো ছেলেমানুষ।

কালো হয়ে গেল কিশোরের চেহারা। এই ছেলেমানুষ কথাটা শুনলে মেজাজ খারাপ হয়ে যায় তার। বয়েস কম হলেই যেন বুদ্ধিশুদ্ধি থাকতে নেই, ক্ষমতা থাকতে পারে না, অবহেলার যোগ্য। আমরা ছেলেমানুষ সন্দেহ নেই, ম্যাডাম, ইচ্ছে থাকলেও কণ্ঠের ঝাঁঝ পুরোপুরি চাপতে পারলো না সে। কিন্তু অনেক বুড়ো মানুষের চেয়ে আমরা অভিজ্ঞ, অন্তত চোর ধরার ব্যাপারে। শুধু চোর নয়, ঝানু। ঝানু ডাকাত, ধরেছি। …আপনি নিশ্চয় মিসেস ট্যানার?

তুমি কি করে নাম জানলে? মহিলা অবাক।

 চোরটা যে এখানেই আসবে, জানতাম, মহিলার প্রশ্নের জবাব দেয়ার প্রয়োজন মনে করলো না কিশোর। তার কপাল ভালো, আটকে ফেলেছিলো আমাদেরকে। এখানে এসে ওকে পাবো, তা-ই আশা করিনি। তা আপনি বোধহয়। এই এলেন?

হ্যাঁ, ডিককে নিয়ে বাইরে বেরিয়েছিলাম। কয়েক মিনিট আগে এসেছি। এসেই ওপরে চলে গেল সে। গিয়েই চিৎকার শুরু করলো।

দশ-এগারোর বেশি না ছেলেটার বয়েস। বললো, চিৎকার করবো না তো কি। সিঁড়িতে দেখি চোরটা, ঘাপটি মেরে ছিলো। আমাকে দেখেই নেমে এসে আমার হাত থেকে বেড়ালটা কেড়ে নিলো!

ওটা নিয়েই বেরিয়েছিলে নাকি? জিজ্ঞেস করলো কিশোর।

হ্যাঁ। পুরস্কার পেয়েছি তো, বন্ধুদের দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলাম।

এই জন্যেই। বোঝা গেল, মাথা দোলালো কিশোর। এজন্যেই এতো দেরি করেছে। খুঁজেছে, বেড়ালটা পায়নি। বসেছিলো। যেই তোমার হাতে দেখেছে, খাবলা মেরে নিয়ে পালিয়েছে।

ডিকের হাত থেকে নিয়ে নামছিলো, আমাকে দেখে আবার উঠে গেছে, মিসেস ট্যানার বললেন। বোধহয় দোতলার জানালা দিয়ে বেরিয়েছে।

বেরিয়ে দেয়াল বেয়ে নেমেছে, মুসা বললো।

মাছিমানবের মতো, যোগ করলো রবিন।

ডিক, জিজ্ঞেস করলো কিশোর। বেড়ালটার ভেতরে কিছু পেয়েছো? ছিলো?

কি করে জানবো? আমি কি খুলেছি নাকি?

কথাটা ঠিক। কেন খুলতে যাবে ডিক?

যা দরকার, নিয়ে পালিয়েছে, আফসোস করলো রবিন। আর শয়তানটাকে খুঁজে পাবো না।

লাইসেন্স নম্বর তো আছে, মুসা বললো। পাবো না কেন?

পেতে সময় লাগবে, মুসা,একই কথা আরেকবার বললো কিশোর। এখন…

এখন আর আমাদের কিছু করার নেই, বাধা দিয়ে বললো বোরিস। পুলিশকে ফোন করো।

পুলিশকে? কিশোরের ইচ্ছে নেই। কিন্তু বোরিসভাই…

কোনো কিন্তু নয়। এখুনি যাও, ফোন করো। লোকটা আস্ত বদমাশ। কখন যে কি করে বসে ঠিক নেই। পুলিশকে অবশ্যই জানানো দরকার।

রবিনও বোরিসের সঙ্গে একমত হয়ে বললো, ঠিকই, কিশোর, এখন আর। আমাদের কিছু করার নেই।

করো না, মুসাও বললো। মিস্টার ফ্লেচারকেই ফোন করে সব কথা বলো।

দীর্ঘশ্বাস ফেললো কিশোর। ঝুলে পড়লো কাধ। বেশ, হাতের তালু চুলকালো সে। মিসেস ট্যানার, আপনার ফোনটা ব্যবহার করা যাবে?

নিশ্চয়। করো।

দল বেঁধে ঘরে ঢুকলো সবাই। কিশোরই ফোন করলো থানায়। পুলিশ চীফ, ইয়ান ফ্লেচারকে পাওয়া গেল। শুনে বললেন, আসছেন। লাইন কেটে রিসিভার হাতে রেখেই রবিনকে বললো কিশোর, এক কাজ করো না। তোমার বাবাকে, ফোন করে জিজ্ঞেস করো, কারনিভলের কোনো কর্মচারী অনুপস্থিত কিনা।

অনুপস্থিত? কি সাংঘাতিক, কিশোর, তোমাকে আগেই বলেছি, ওরকম টাই ওলা কেউ নেই আমাদের কারনিভলে।

ছদ্মবেশ নেয়া কঠিন কিছু না। হাতের টাট্টু ঢেকে রাখাও সহজ।

হু। ঠিক আছে, করছি। বাবাকে পাওয়া মুশকিল হবে। শো-এর সময় এখন, নিশ্চয় খুব ব্যস্ত। তবু, দেখি।

হ্যাঁ, দেখো, রবিন বললো।

 ডায়াল করে রিসিভার কানে ধরে রইলো রবি। ওপাশে রিঙ হয়েই চলেছে, ধরছে না কেউ। বললাম না পাওয়া যাবে না। অফিসে নেই। বক্স অফিসে বলে দেখি, ডেকে আনতে পারে কিনা।

পুলিশের সাইরেন শোনা গেল। রিসিভার তখনও কানেই ঠেকিয়ে রেখেছে। রবি। বাড়ির বাইরে এসে থামলো গাড়ি। কয়েকজন পুলিশ নিয়ে ঢুকলেন ইয়ান ফ্লেচার।

সংক্ষেপে তাকে সব জানালো ছেলেরা।

যাক, নম্বর রেখে কাজের কাজ করেছে, চীফ বললেন। পাওয়া যাবে। তা, বেড়ালগুলো কেন চায়, বুঝেছো?

না, স্যার, রবিন বললো।

ভেতরে দামি কিছু থাকতে পারে, বললো মুসা। কিশোরের ধারণা, স্মাগলিং কেস।

মাথা ঝোঁকালেন চীফ। অসম্ভব না। ঠিক আছে, সীমান্ত রক্ষীদের হুশিয়ার করে দিচ্ছি, নীল গাড়িটা আর কানা বেড়াল দেখলেই যেন আটকায়, বলেই বেরিয়ে গেলেন তিনি।

তখনও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে রবি।

কিশোর চুপ করে আছে। বেড়ালের ভেতর কি আছে, জানার আগেই পুলিশ ডাকতে হলো বলে তার মন খারাপ। পুলিশকে সব জানিয়ে চমকে দেয়া আর হলো না। এতো দেরি লাগছে? …রেখো না, চেষ্টা করো।

আবার ডায়াল করলো রবি।

কিছুক্ষণ পর ফিরে এলেন ফ্লেচার। আগের চেয়ে গম্ভীর। কিসে হাত দিয়েছো, জানো না তোমরা। খবর নিতে গিয়ে জানলাম, ওরকম একটা লোক, হাতে টাট্টু আঁকা, গত হপ্তায় ব্যাংক ডাকাতি করে পালিয়েছে। সাত লাখ ডলার। নিয়ে গেছে।

নিশ্চয় স্যান মেটিওতে, তাই না, স্যার? ইয়ান ফ্লেচার বলার আগেই বলে। ফেললো কিশোর।

তুমি কি করে জানলে? কিশোরের দিকে তাকিয়ে রইলেন চীফ।

কারনিভলে আগুন, স্যার। স্যান মেটিওতে লেগেছিলো। আমার স্থির বিশ্বাস, ওই বেড়াল-চোর রবিদের কারনিভলের কেউ। ডাকাতির পর আগুন লাগার জন্যে সে-ই দায়ী।

তুমি শিওর?

শিওর। কাকতালীয় ঘটনা এতো বেশি ঘটতে পারে না। আপনি কারনিভলে গিয়ে…

পেয়েছি, কিশোর, বলে উঠলো রবি। বাবাকে পেয়েছি।

বাবার সঙ্গে কথা বলছে রবি, চুপ করে শুনছে সবাই। কি জবাব আসে শোনার জন্যে অধীর। একজন পুলিশ এসে ডাকতে আবার বেরিয়ে গেলেন চীফ।

হ্যাঁ, বাবা, কি সাংঘাতিক, রবি বলছে। আমি দুঃখিত, বাবা। সবাই আছে? হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি এখুনি আসছি, রিসিভার রেখে দিয়ে কিশোরের দিকে ফিরলো সে। বাবা বলছে আমি ছাড়া সবাই আছে এখন। শো শুরু হয়েছে। এক্ষুণি যেতে হচ্ছে আমাকে। গিয়ে খাওয়ার সময়ও পাবো না, গ্যালারিতে ঢুকতে হবে।

 খাওয়ার কথায় চমকে উঠলো মুসা। খাইছে রে খাইছে! এতোক্ষণ না খেয়ে আছি! মনেই ছিলো না। হায় হায় হায়, নাড়ি তো সব হজম।

কিশোর ছাড়া সবাই হাসলো। সে গভীর চিন্তায় নিমগ্ন।

ফিরে এলেন চীফ। জানালেন, গাড়িটা পাওয়া গেছে। এখান থেকে মাত্র চার ব্লক দূরে, রাস্তার পাশে বেড়ালটাও ছিলো গাড়িতে। পেট কাটা, ভেতরে কিছু নেই। ঘাসের ওপর চাকার দাগ। হয় চোরটা আরেকটা গাড়ি রেখে এসেছিলো ওখানে, নয়তো অন্য কোনো গাড়ি এসে নিয়ে গেছে। মনে হচ্ছে, যা দরকার, পেয়ে গেছে। যতো তাড়াতাড়ি পারে রকি বীচ থেকে পালানোর চেষ্টা করবে এখন। তবে পুলিশও সতর্ক, পালাতে দেবে না। ধরা পড়বেই। সময় লাগবে আরকি, কিশোরের দিকে তাকালেন। তোমাদের আর কিছু করার নেই। বাড়ি চলে যাও।

পরদিন রবিন বা মুসা, দুজনের কেউই বেরোতে পারলো না। বাড়িতে জরুরী কাজ, ব্যস্ত থাকতে হলো। কাজ করলো বটে, কিন্তু মন পড়ে রইলো ইয়ার্ডে। চোরটাকে ধরতে পারেনি, সেটা একটা ব্যাপার। তার ওপর কয়েকবার ফোন করেও কিশোরকে পায়নি। সে নেই।

ডিনারের সময় অন্যমনস্ক হয়ে রইলো রবিন।

হেসে বললেন তার বাবা, চীফের কাছে শুনলাম, একটা ডাকাতকে ধরতে ধরতেও নাকি ধরতে পারোনি।

জানতামই না যে ও ডাকাত, বাবা। কারনিভলের একটা ছেলেকে সাহায্য করতে গিয়েছিলাম। কেঁচো খুঁড়তে বেরোলো সাপ।

পারলে মানুষকে সাহায্য করা উচিত। ঠিকই করেছ।

ডাকাতটার আর কোনো খোঁজ পাওয়া গেছে, বাবা? চীফ কিছু বললেন?

ধরতে পারেনি এখনও। পুলিশ সতর্ক রয়েছে।

এই খবরে খুশি হতে পারলো না রবিন। খাওয়া শেষ করে বেরিয়ে পড়লো, ইয়ার্ডে যাবে। ভাবছে, এই প্রথম একটা কেসে সফল হতে পারলো না তিন গোয়েন্দা।

হেডকোয়ার্টারে পাওয়া গেল কিশোরকে। সামনে একগাদা খবরের কাগজ, পড়ছে, মাঝে মাঝে নোট নিচ্ছে।

কি করছো? রবিন জিজ্ঞেস করলো।

মাথা নাড়লো গোয়েন্দাপ্রধান, বোঝালো এখন কথা বলতে চায় না। কিছুটা বিরক্ত হয়েই কয়েকটা শামুক আর ঝিনুক দেখতে লাগলো রবিন, স্কিন ডাইভিঙের। সময় ওগুলো তুলে এনেছে ওরাই। সময় কাটে না। শেষে গিয়ে চোখ রাখলো সর্ব দর্শনে। ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে স্যালভিজ ইয়ার্ডটাই দেখতে শুরু করলো। রোদেলা দিন ছিলো, গোধূলি তাই যেতে দেরি করছে এখনও।

ট্রাক বোঝাই করে মাল এনেছেন রাশেদ আঙ্কেল, রবিন জানালো।

আনমনে ঘোঁৎ করলো একবার কিশোর। পড়া বাদ দিয়ে চোখ বন্ধ করে। ভাবনায় ডুবে গেল।

আবার সর্ব-দর্শনে চোখ রাখলো রবিন। কিছুক্ষণ পর বললো, মুসা আসছে।

 এবার ঘোঁৎও করলো না কিশোর।

ট্রাপডোর দিয়ে উঠে এসে দীর্ঘ এক মুহূর্ত কিশোরের দিকে তাকিয়ে রইলো মুসা। রবিনের দিকে চেয়ে ভুরু নাচালো, কি করছে?

আমাকে জিজ্ঞেস করছো কেন? দেখছো না?

এতো খবরের কাগজ কেন? আবারও রবিনকেই জিজ্ঞেস করলো মুসা। টাট্টুওলার জন্যে বিজ্ঞাপন দেবে নাকি পেপারে?একটা টুলে বসলো।

চোখ মেললো কিশোর, হাসলো। তার আর দরকার হবে না, সেকেণ্ড। লোকটা কোথায় আছে, জানি।

জানো? চেঁচিয়ে উঠলো রবিন। কোথায়?

যেখানে ছিলো, সেখানেই। রকি বীচে। কারনিভলে।

বাবা বললো, লোকটাকে নাকি ছয় জায়গায় দেখা গেছে? চীফ নাকি বলেছেন তাকে।

আসলে সাত জায়গায় হবে।

আরমানে তুমি ভুল করছে। এখানে নেই সে।

পত্রিকাগুলো ভালোমতো দেখে, তবেই বলছি। সাতজন লোক সাত জায়গায় দেখেছে লোকটাকে, দুশো মাইলের ব্যবধানে। সে-কারণেই বলা যায়, কেউই দেখেনি তাকে। ওরা মিথ্যে বলেছে।

মাথা আঁকিয়ে রবিন বললো, তোমার কথা বুঝতে পারছি। কিন্তু সে যে এখানেই আছে, এ-ব্যাপারে শিওর হলে কি করে?

উঠে ছোট ঘরটায় পায়চারি শুরু করলো কিশোর। ওই ব্যাংক ডাকাতির ওপর লেখা যতোগুলো খবর বেরিয়েছে, সব পড়লাম। তিনটে কাগজে লিখেছে, স্যান মেটিওর দুটোয়, আর লস অ্যাঞ্জেলেসের একটাতে। আজ সকালে স্যান মেটিওতে গিয়েছিলাম।

কোথায় গিয়েছিলে? লাফিয়ে উঠে দাঁড়ালো মুসা।

স্যান মেটিওতে, হাসলো কিশোর। তোমরা তখন ব্যস্ত। একজন ঘর পরিষ্কার করছিলে, আরেকজন বাগান সাফ…আমারটাও কাজই, তবে অন্যরকম। পুরনো মাল কিনতে পাঠালো চাচা, বোরিস আর রোভারকে সঙ্গে দিয়ে…

দীর্ঘশ্বাস ফেললো মুসা। ধপ করে বসে পড়লো আবার টুলে। কিছু মানুষের। কপালই থাকে ভালো। কাজের মাঝেও আনন্দ। আর আমি শালার কপালপোড়া, সেদিন করলাম বাগান সাফ, আজ করতে হলো ঘরবাড়ি পরিষ্কার, নাক দিয়ে বিচিত্র শব্দ করে ক্ষোভ প্রকাশ করলো সে। ওই করে করেই মরবো।

ডাকাতির ব্যাপারে কি জানলে, কিশোর? রবিন জিজ্ঞেস করলো।

অনেক কিছু। কারনিভলে শুক্রবার রাতে আগুন লেগেছে। সেদিন, স্যান। মেটিওতে ব্যাংক খোলা ছিলো বিকেল ছটা পর্যন্ত। আর যেহেতু উইকএণ্ড, কারনিভল শুরু হয়েছিলো নির্দিষ্ট সময়ের আগেই। তাছাড়া সেদিন ওখানে কারনিভলের শেষ দিন। রাতেই স্যান মেটিও ছাড়ার কথা, রকি বীচে এসে খোলার কথা শনিবারে।

খাইছে! ডাকাতটা কারনিভলের লোক হলে মহা সুযোগ।

হ্যাঁ, সুযোগটা নিয়েছিলো সে। আগাগোড়া কালো পোশাক, মাথায় কালো হুড, পায়ে কালো টেনিস শু পরে ডাকাতি করতে গিয়েছিলো।

মাছিমানব টিটানভ! রবিন বললো।

মাথা নেড়ে সায় জানালো কিশোর। অনেকেই তার হাত দেখতে পেয়েছে। শার্টের হাতা গুটিয়ে কনুইর ওপর তুলে রেখেছিলো।

নিশ্চয় টাট্টুও দেখেছে লোকে।

হ্যাঁ। ছটা বাজার পাঁচ মিনিট আগে ব্যাংকে ঢুকলো সে। একজন গার্ডকে ধরে নিয়ে ভল্টে ঢুকলো। ওকে জিম্মি করেই বেরিয়ে এলো টাকা নিয়ে। তারপর মাথায় বাড়ি মেরে লোকটাকে বেহুশ করে ব্যাংকের পেছনের গলি দিয়ে দিলো দৌড়। সে দৌড় দিতেই ব্যাংকের ঘন্টি বাজিয়ে দেয়া হলো। কয়েক মিনিটেই পৌঁছে গেল পুলিশ।

ডাকাতটাকে নিশ্চয় ধরতে পারেনি? মুসা বললো।

না, পারেনি। কি করে যে পালালো, সেটাই বুঝতে পারেনি কেউ। গলিটায়। তন্ন তন্ন করে খুঁজেছে পুলিশ। অন্ধগলি ওটা, একদিক খোলা। তিনদিকে তিনটা বিরাট উঁচু বাড়ি, সব জানালা বন্ধ। গলি থেকে যে বাড়িতে ঢুকবে সে উপায়ও ছিলো না। ভোলা মুখ দিয়ে ঢুকেছে পুলিশ। সেদিক দিয়েও যেতে পারেনি। ডাকাতটা। অথচ, গায়েব।

পার্ক থেকে যেভাবে গায়েব হয়েছিলো, বিড়বিড় করলো রবিন।

দেয়াল বেয়ে উঠেছে, বললো মুসা। মাছিমানব।

আমার তাই ধারণা, নিচের ঠোঁটে টান দিয়ে ছেড়ে দিলো কিশোর। দেখতে দেখতে ছড়িয়ে পড়লো খবর। কারনিভলের বাইরে তখন পাহারায় ছিলো একজন। পুলিশ। ডাকাতির খবর সে-ও শুনেছে। কারনিভলে ঢোকার জন্যে হুড়োহুড়ি করছে লোকে, ওদেরকে শান্ত করার জন্যে এগিয়ে গেল সে। লোকের ধাক্কায় পড়ে গেল একজুন, কোট গেল উল্টে। তার কালো শার্ট দেখে ফেললো পুলিশ। সন্দেহ হলো। গিয়ে লোকটার হাত ধরে হ্যাঁচকা টানে কোটের হাতা নামিয়ে দিলো। দেখে ফেললো টাট্টু…

কাকতালীয় হয়ে গেল না? মুসা বললো। লোকটার পড়ে যাওয়া। আর পড়বি তো পড় একেবারে পুলিশের সামনে।

হ্যাঁ, হয়েছে। তবে এটা নতুন কিছু না। অনেক বড় বড় রহস্য সমাধান। হয়েছে এরকম কাকতালীয় ঘটনা থেকে। বলা যায়, অপরাধীদের দুর্ভাগ্যই এসব। যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই রাত হয়, প্রবাদটা তো আর খামোকা হয়নি। যাই হোক, ভিড়ের মধ্যে লোকটাকে আটকাতে পারলো না পুলিশ। এক ঝাড়া মেরে হাত ছাড়িয়ে দৌড় দিলো। কাছেই আরেকজন পুলিশ ছিলো, চেঁচিয়ে সাহায্যের জন্যে তাকে ডাকলো প্ৰথমজন। খবর পেয়ে আরও পুলিশ ছুটে এলো। ঘিরে ফেলা। হলো পুরো এলাকা। নিশ্চিত হলো, ডাকাতটাকে ধরে ফেলবেই। কিন্তু

আগুন লেগে গেল! বলে উঠলো রবিন।

হ্যাঁ। ডাকাত ধরার চেয়ে আগুন নেভাননা জরুরী। সেদিকে নজর দিলো পুলিশ। আগুন নেভার পর আবার ডাকাত খুঁজতে লাগলো। কিন্তু পেলো না। না। ডাকাত, না টাকা।

কোথায় গেল? রবিনের প্রশ্ন।

যাবে আবার কোথায়? কারনিভলেই ছিলো। ভালো করেই জানে সে, পুলিশের চোখ ফাঁকি দেয়ার জন্যে ওটাই সব চেয়ে নিরাপদ জায়গা। স্যান মেটিও থেকে বেরিয়ে আসার জন্যেও। সেসব বুঝে, ভেবেচিন্তেই প্ল্যান করেছে সে। কখন। ডাকাতি করবে, কোনদিক দিয়ে পালিয়ে এসে কোথায় লুকোবে, সবু। সহজ, নিরাপদ পরিকল্পনা।

 কিন্তু পুলিশ দেখে ফেলায়, বললো রবিন। অসুবিধায় পড়লো ডাকাতটা। আগুন লাগিয়ে দিলো, সবার নজর সেদিকে ঘুরিয়ে দেয়ার জন্যে। এই সুযোগে ছদ্মবেশ খুলে বেরিয়ে এলো সে।

তারমানে, মুসা বললো। আমরাও সেদিন ওকে ছদ্মবেশেই দেখেছি?

তাই তো মনে হয়, বললো কিশোর। মুখে রঙ লাগিয়েছিলো, কিংবা প্লাস্টিকের মুখোশ। চুলেও রঙ করেছিলো নিশ্চয়। হয়তো নাকটাও আলগা। হাতে নকল টাট্ট।

হু, মাথা দোলালো মুসা। ওরকম একটা ছবি সবার চোখেই পড়ে।

সবাইকে দেখানোর জন্যেই লাগিয়েছে। আসল হলে কিছুতেই দেখাতো না, বরং লুকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করতো। আমার বিশ্বাস, লোকটার বয়েস বেশি না, টাট্টুও নেই। নিশ্চয় মাছিমানব টিটানভ। কারনিভলের অভিজ্ঞ কর্মী বলেই মিস্টার কনরকে বোকা বানাতে পেরেছে।

কিন্তু মাছিমানবের খেলা তো দেখায় না।

অন্য খেলা দেখাচ্ছে।

কিন্তু তাকে চিনতে পারছেন না কেন, মিস্টার কনর?

হয়তো কাছে থেকে দেখেননি আগে। তাছাড়া অনেক দিন জেলে ছিলো টিটানভ। এতোদিনেও চেহারা বদলায়নি, এটা জোর করে বলা যায় না। তার ওপর হয়তো এমন কোনো সাজ নিয়েছে, যাতে চেহারার আরও পরিবর্তন হয়। এসব করতে কোনো অসুবিধে হয় না তার। কারনিভলে প্রত্যেক কর্মীরই আলাদা। ট্রেলার আছে।

বুঝলাম, হাত তুললো মুসা। আচ্ছা, বেড়ালগুলো কেন দরকার তার? ভেতরে টাকা রেখেছিলো?

সেটা তো সম্ভবই না। এতো টাকা, জায়গাই হবে না। তবে, টাকাগুলো কোথায় লুকিয়েছে, সেই নির্দেশ রয়েছে হয়তো। কিংবা লকার-টকারের চাবি।

হু, রবিন বললো। তা-ই করেছে। আগুন লাগানোর পরই কাজটা করেছে। যাতে তাকে সার্চ করা হলেও পুলিশ কিছু না পায়।

আমারও তাই মনে হচ্ছে, একমত হলো মুসা।

বেড়াল নিয়ে তো যথেষ্ট হাঙ্গামা করলো। টাকাগুলো বের করবে কখন? এখনি বের করে নিয়ে পালাবে, নাকি আরও কিছুদিন থাকবে কারনিভলে?

থাকাটাই তো স্বাভাবিক, কিশোর বললো। ওখানেই নিরাপদ। আমি হলে তা-ই ভাবতাম–যদি বুঝতাম আমার চেহারা চিনছে না কেউ, আমাকে ডাকাত বলে সন্দেহ করছে না। পুলিশ কড়া নজর রেখেছে। হুট করে কেউ এখন কারনিভল ছাড়লেই তাকে সন্দেহ কররে। নাহ, সে বেরোবে না। রকি বীচে থাকতে কিছুতেই নয়।

তো, আমাদের এখন কি করা? মুসা জিজ্ঞেস করলো। কারনিভলে আর যাবো-টাবো?

হ্যাঁ, যাবো। চলো।

দুই সুড়ঙ্গ দিয়ে বেরোলো ওরা। সাইকেল নিয়ে রওনা হলো কারনিভলে। সাঁঝ হয়েছে তখন। পর্বতের দিক থেকে আসা বাতাসের বেগ বাড়ছে।

কারনিভলের কাছে এসে গেটের বাইরে সাইকেল পার্ক করলো তিন গোয়েন্দা। লোক ঢুকতে আরম্ভ করেছে। তাদের সঙ্গে মিশে গেল ওরাও।

হঠাৎ শোনা গেল চিৎকার। এদিক ওদিক দৌড় দিলো কেউ, কেউ ছুটে গেল সামনে।

কারনিভলে কিছু হয়েছে! চেঁচিয়ে বললো মুসা।

 অ্যাকসিডেন্ট! বলে উঠলো রবিন।

 দৌড়াতে শুরু করেছে ততোক্ষণে কিশোর।

ভিড় ঠেলে বেরিয়ে এলো তিন গোয়েন্দা। কাত হয়ে মাটিতে পড়ে আছে নাগরদোলাটা। চেঁচিয়ে রাফনেকদের আদেশ নির্দেশ দিচ্ছেন মিস্টার কনর।

রবিকেও পাওয়া গেল সেখানে।

কি হয়েছে, রবি? মুসা জিজ্ঞেস করলো।

জানি না, ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললো রবি। ঘুরছিলো। সওয়ারি নিতে তৈরি, হঠাৎ ইঞ্জিন থেকে ধোঁয়া বেরোতে শুরু করলো। কাত হয়ে পড়ে গেল দোলাটা। তিনটে ঘোড়া ভেঙেছে, দেখো।

নাগরদোলাটা আবার খাড়া করার জন্যে আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে রাফনেকরা। ভাঙা ঘোড়াগুলো মেরামতে ব্যস্ত কয়েকজন। ইঞ্জিন পরীক্ষা করছেন মিস্টার কনর।

কয়েকজন কর্মী এসে ঘিরে দাঁড়ালো তাঁকে। উঠে দাঁড়িয়ে কপালের ঘাম। মুছলেন তিনি।

আর কতো অ্যাকসিডেন্ট দেখবো, কনর? কড়া গলায় জিজ্ঞেস করলো কোহেন।

আপনার যন্ত্রপাতিই খারাপ হয়ে গেছে, বললো মারকাস দ্য হারকিউলিস। আমরা ভয় পেতে শুরু করেছি।

যন্ত্রপাতি যে খারাপ হয়নি, কনর বললেন। ভালো করেই জানো।

নাগরদোলা অতো সহজে ভাঙে না, বিষণ্ণ কণ্ঠে বললো সদাবিষঃ লম্বা ভড়। এটা আগাম হুঁশিয়ারি! আনলাকি শো। অবশ্যই বন্ধ করে দেয়া উচিত।

হ্যাঁ, আনলাকি শো! আগুনখেকোও একমত। হয়তো কিঙের ছাড়া পাওয়াটাও দুর্ঘটনাই ছিলো। তাহলে আরও তিনটে দুর্ঘটনার শুরু হলো।

গুঞ্জন উঠলো কর্মীদের মাঝে। কেউ মাথা ঝাঁকালো, কেউ দোলালো।

বন্ধই করে দেয়া উচিত, মিস্টার কনর, বললো এক দড়াবাজ।

বড় জোর আজকের রাতটা চালাতে পারেন, লম্বা ভাড় বললো। তারপর আর একটা শো-ও নয়।

চালাবেন কি করে? কোহেন জানতে চাইলো। নাগরদোলা না চললে তো আমাদের বেতনই দিতে পারবেন না…

অসহায় ভঙ্গিতে হাত নাড়লেন কনর। কাজ করতে করতে উঠে এসে জরুরী গলায় তাকে কি বললো একজন রাফনেক। কনরের উদ্বিগ্ন চেহারায় হাসি ফুটলো। আধঘন্টার মধ্যেই ঠিক হয়ে যাবে নাগরদোলা। একটা বিয়ারিং ভেঙেছে, আর কিছু না। যাও, যার যার কাজে যাও।

আরও খারাপ অ্যাকসিডেন্ট হবে, আমি জানি, বিড়বিড় করলো লম্বা ভাঁড়।.

তবে বেশির ভাগ কর্মীর মুখেই হাসি ফুটলো আবার। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে চলে গেল যার যার বুদের দিকে, কোহেন ছাড়া।

শো দেখানো বিপজ্জনক হয়ে উঠছে, কনর, বললো স্ট্রংম্যান। এতো অ্যাকসিডেন্ট! শো বন্ধ করে দেয়া উচিত, বলে আর দাঁড়ালো না।

চেয়ে রইলেন কনর। চোখ ফেরালেন ছেলেদের দিকে। উৎকণ্ঠা ঢাকতে পারছেন না, ঢাকার চেষ্টাও করলেন না। তার ভবিষ্যৎ, তাঁর ছেলের ভবিষ্যৎ, সব নির্ভর করছে এই কারনিভলের ওপর।

কাজ করবে ওরা, বাবা? রবি জিজ্ঞেস করলো।

করবে। বেশি আশা করে না কারনিভলের লোকে। গণ্ডগোলের কথা সহজে। ভুলে যায়। আর কোনো দুর্ঘটনা না ঘটলেই হলো।

নাগরদোলাটা ঠিক হবে?

হবে, গম্ভীর হয়ে গেলেন। সে-জন্যে ভাবি না আমি। ভয় পাচ্ছি অন্য কারণে। মেকানিক বললো, বিয়ারিঙে শক্ত কিছু ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছিলো। কয়েকটা বন্টু আলগা করে দিয়েছিলো। ঘোরার সময় বিয়ারিঙ আটকে যাওয়ায় প্রচণ্ড চাপে ছিঁড়ে গেছে বল্টুগুলো।

স্যাবোটাজ! রবিন বলে উঠলো।

হ্যাঁ। ঠিকই আন্দাজ করেছিলে তোমরা, গোলমাল চলছে এই কারনিভলে। কেউ ধ্বংস করে দিতে চাইছে।

না, স্যার, কিশোর বললো। কারনিভলের ক্ষতি করার জন্যে করছে না ডাকাতটা।

ডাকাত? মানে ব্যাংক ডাকাত? কিশোরের দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে কনর। স্যান মেটিওতে যে ডাকাতি হয়েছিলো?

হ্যাঁ। আপনার কারনিভলেরই লোক সে।

জ্বলে উঠলেন মিস্টার কনর। বুঝে শুনে কথা বলো, ছেলে! পুলিশ অনেক খোঁজাখুঁজি করেছে, পায়নি।

আপনার কারনিভলের লোক বলেই তো পায়নি। আগুন লাগিয়ে সবার নজর অন্যদিকে সরিয়ে দিয়েছে। পুলিশকে তো ফাঁকি দিয়েছেই, সেই সুযোগে ছদ্মবেশ খুলেছে, কানা বেড়ালের ভেতরেও কিছু লুকিয়েছে।

তুমি ভুল করছো, কিশোর। ওই চেহারার কেউ নেই এখানে। ওরকম টাট্ট কারও হাতে নেই।

কি করে বুঝবেন? বলে ফেললো মুসা। ছদ্মবেশে থাকে। হাতের টাট্টাও নকল।

নীরবে তিন গোয়েন্দার ওপর চোখ বোলালেন কনর। হ্যাঁ, সেটা সম্ভব। কিন্তু কে…।

আমি জানি, বাধা দিয়ে বললো কিশোর। আমি শিওর, ডাকাতটা মাছিমানব টিটানভ।

টিটানভ? কি বলছো!

ঠিকই বলছি। ওর পালানোর ধরন, আলমারিতে পাওয়া কাপড়, সবই প্রমাণ করে লোকটা ওই মাছিমানব…

না, কিশোর, হাত তুলে তাকে থামালেন কনর। টিটানভ নয়। তোমার কথায় যুক্তি আছে, স্বীকার করছি। কিন্তু পুলিশ্নের মুখে সব শোনার পর আমার প্রথমেই মনে হয়েছিলো ওর কথা। আমিও ভেবেছি, এই কারনিভলে লুকিয়ে আছে। সে, আমি চিনতে পারছি না। কারনিভলের পোশাক পরা থাকলে, সাজ ধরে থাকলে চেনা কঠিন। তাই সবাইকে পোশাক ছাড়া দেখেছি। টিটানভের মতো। লাগেনি কাউকে।

দে-দেখেছেন…, তোতলাতে শুরু করলো কিশোর।

দেখেছি। বেশির ভাগই ওরা বয়স্ক। আরেকটা কথা, কারনিভলে ডাকাত থাকলে আগুন লাগা আর কিঙের ছাড়া পাওয়ার ব্যাপারটা নাহয় বোঝা গেল, কিন্তু পনি রাইডের কথা কি বলবে? আর এখন এই নাগরদোলা নষ্ট করা? 

দমে গেছে কিশোর। মনে তো হচ্ছে গোলমাল পাকানোর জন্যে।

ঠিক তাই। গোলমাল পাকিয়ে কারনিভলের সর্বনাশ করে দিতে চায়, বলতে দ্বিধা করছেন কনর। শেষে বলেই ফেললেন, হয়তো এর মূলে রবির নানী। ডাকাতটাই কানা বেড়ালের পেছনে লেগেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে সে বাইরের লোক। যা চাইছিলো, পেয়ে গেছে, আর এখানে আসার দরকার নেই তার। নাগরদোলা নষ্ট করায় তার হাত নেই।

হতে পারে, মুসা বললো।

তবু, চোখ খোলা রাখতে বলবো তোমাদের। আর কোনো দুর্ঘটনা যাতে ঘটাতে না পারে কেউ। আমার কাজ আছে। যাও, তোমরা গিয়ে কারনিভল দেখো, নজরও রাখো। খুব সাবধানে থাকবে।

থাকবো, কথা দিলো রবি।

হাসলেন কনর।

সরে এলো ছেলেরা। নিচের ঠোঁট কামড়ালো কিশোর। বললো, আমি এখনও বিশ্বাস করি, আমার অনুমানই ঠিক। .

কিন্তু মিস্টার কনরের কথায়ও যুক্তি আছে, রবিন বললো। নাগরদোলা নষ্ট করার কোনো কারণই নেই ডাকাতটার।

এতোক্ষণে হয়তো বহুদূরে পালিয়েছে সে, বললো রবি।

আমার মনে হয় না, জোর দিয়ে বললো কিশোর। এখানেই আছে এখনও। কারনিভল বন্ধ করে দেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে, যাতে অন্য কর্মীদের ভিড়ে মিশে যেতে পারে সে, যাওয়ার সময় কারো সন্দেহ না হয়।

পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার জন্যে অপেক্ষা করবে না? প্রশ্ন তুললো রবি।

হয়তো করবে। আচ্ছা, ঠিক করে বলো তো পাঁচটাই বেড়াল ছিলো তো? না আরও বেশি?

পাঁচটাই।

বুঝতে পারছি না…, আনমনে নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটলো কিশোর। বেড়ালের ভেতর থেকে পড়ে-উড়ে যায়নি তো? হয়তো বেড়ালের ভেতরে পায়নি। তাহলে নিশ্চয় গিয়ে ট্রেলারটায় খুঁজবে, যেটাতে বেড়ালগুলো রাখা ছিলো! রবি, কোথায় ট্রেলারটা?

 যেখানে এখন থাকার কথা। শুটিং গ্যালারির কাছে। সারাক্ষণ যাতে চোখ রাখতে পারি।

কিন্তু এখন রাখছ না! চেঁচিয়ে উঠলো কিশোর। রাখতে পারোনি, কারণ, নাগরদোলাটা পড়ে যাওয়ায় দেখতে চলে এসেছে!

 খাইছে! চমকে উঠলো মুসা। আরেকবার!

কেন নয়? এরকম করে দুবার সফল হয়েছে আগে। দোলাটার ক্ষতি সামান্য। কারনিভল বন্ধের চেষ্টায় থাকলে ওটা একেবারে বিকল করে দিতো। জলদি, শুটিং গ্যালারিতে। কুইক! বলতে বলতেই দৌড় দিলো সে।

দর্শকের ভিড় বেড়েছে।

তাদের পাশ কাটিয়ে গ্যালারির পেছনে চলে এলো ছেলেরা। আলো এখানে কম, ছায়া বেশি। কিন্তু দেখতে অসুবিধে হলোনা, মাটিতে ছড়িয়ে আছে পুতুল, খেলনা, পুরস্কারের নানা জিনিস।

আরি, ভেঙে ফেলেছে? আঁতকে উঠলো রবি।

দেখো দেখো! হাত তুললো রবিন।

চারজনেই দেখলো, ট্রেলারের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো একটা মূর্তি। দৌড় দিলো অন্ধকারের দিকে। খোলা জায়গার পরে একসারি তাঁবু পেরিয়ে, বেড়ার ফোকর গলে পার্কে ঢুকে যাওয়ার ইচ্ছে।

ধরো ব্যাটাকে! বলেই পেছনে ছুটলো মুসা।

Categories: