৩. লাইব্রেরিতে খোঁজা শুরু করল রবিন

0 Comments

যে সময় আসবে আশা করেছিল তার চেয়ে অনেক পরে লাইব্রেরিতে আসতে পারল রবিন। কোনখান থেকে খোঁজা শুরু করবে?–ঢুকেই ভাবল। টেলিফোন ডিরেক্টরির কথা প্রথমেই বাদ দিয়ে দিল। লাভ হবে না। তবু একবার চোখ বোলাতে অসুবিধে কি?

 লাইব্রেরিয়ানের সঙ্গে দেখা করে কুশল বিনিময় করে এল প্রথমে। তারপর ডিরেক্টরিটা দেখতে বসল। লস অ্যাঞ্জেলেস টেলিফোন বুকে সিয়েটার অভাব নেই। তবে একটা সোগামোসোও চোখে পড়ল না।

 লিসটারের কমপিউটারে করা মেসেজের প্রিন্ট আউটটা বের করে টেবিলে বিছাল সে। শব্দগুলো যেন ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে রয়েছে তার দিকে। সোগামোসোকে দিয়ে শুরু কর…

কি করব? ভাবছে রবিন। মেসেজটায় সাঙ্কেতিক কথা রয়েছে। মানে বের করতে হলে আগে সিয়েটা আর সোগামোসাকে খুঁজে বের করতে হবে। শেষ শব্দ ইনস, আই এন এস। ইনিশিয়ালের সংক্ষেপও হতে পারে ওটা, কিংবা ইমিগ্রেশন অ্যাণ্ড নেচারালাইজেশন সার্ভিসের আদ্যাক্ষর। সিয়েটা হয়ত একজন ইলিগাল লোক এদেশে, অবৈধ ভাবে প্রবেশ করেছে। জানতে পারলে খুব সুবিধে হবে কি? সিয়েটার খোঁজ পেলে তাকে আই এন এস-এর হাতে ধরিয়ে দেয়ার কথা বলেননি তো এলেনাকে লিসটার? দূর! কিছু বোঝা না গেলে রাগই লাগে।

আর এরকম একটা নোটই বা কেন কমপিউটারের মেমোরিতে রেখে গেলেন। লিসটার? কমপিউটারে আগ্রহ নেই এলেনার। মেসেজটা যে দেখবেই এরকম কোন নিশ্চয়তা ছিল না।

হতে পারে, এর চেয়ে ভাল আর কোন উপায় বের করতে পারেননি লিসটার, তাড়াহুড়ায়। হয়ত হঠাৎ করেই আবিষ্কার করেছেন বিপদে পড়তে চলেছেন তিনি। যে লোকটা তাঁর হুমকির কারণ, কমপিউটার সম্পর্কে তার জ্ঞান না থাকলে নিরাপদে থাকবে মেসেজটা। কিন্তু এলেনাও যদি কিছু বুঝতে না পারে, ওই মেসেজ কোন উপকার করবে না তার।

 রেফারেন্সের বই রাখা হয় যেসব তাকে সেখানে এসে দাঁড়াল রবিন। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ওপর অনেক ডিরেক্টরি রয়েছে এখানে। ডেভিড লিসটার ব্যবসায়ী। তার ব্যবসার সঙ্গে যোগামোসোর কোন সম্পর্ক থাকতে পারে। বড় একটা বইতে আমেরিকান কোম্পানিগুলোর তালিকা রয়েছে। নাম রাখা হয়েছে, স্ট্যাণ্ডার্ড অ্যাণ্ড পুয়োরস। সেটাতে সোগামোসো খুঁজল সে। পেল না। তারপর খুঁজল দা ওয়াল স্ট্রীট জার্নাল এবং ফোর্বস ম্যাগাজিনে। সোগামোসোর চিহ্নও নেই। হজ হু-এর। যতগুলো সংস্করণ পেল, সবগুলোতে দেখল, কোনটাতেই পাওয়া গেল না ওই নাম।

বিখ্যাত লোক নয় সোগামোসো, বোঝা গেল। ব্যবসায় জড়িত নয়। পুরোপুরি অন্য কিছু। স্প্যানিশ কোন শব্দ নয় তো? স্প্যানিশ শব্দ ব্যবহার করেছেন লিসটার। স্প্যানিশ টু ইংলিশ ডিকশনারিটা নামিয়ে আনল সে। পেল না। ওটাতেও। বোকা হয়ে গেল। রেফারেন্স সেকশনের সব চেয়ে নিচের তাকটায় রয়েছে ম্যাপ। বড় একটা বই এনে ফেলল টেবিলে। অবশেষে দেখা মিলল সোগামোসোর।

কলাম্বিয়ার একটা শহর সোগামোসো।

দশ মিনিটের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যাবে লাইব্রেরি! ঘোষণা করল পাবলিক অ্যাড্রেস সিসটেমের যান্ত্রিক কণ্ঠ।

ইনডেক্স দেখে দ্রুত পাতা ওল্টাল রবিন। দক্ষিণ আমেরিকার উত্তর-পশ্চিম কোণের একটা ম্যাপ বেরিয়ে পড়ল। কলাম্বিয়া রয়েছে ওখানে। বেগুনী রঙে সীমানা চিহ্নিত করা হয়েছে। শাদাটে রঙে আঁকা রয়েছে অ্যানিডজ পর্বতমালা।

তেরছা দৃষ্টিতে ম্যাপের দিকে তাকিয়ে রয়েছে রবিন। সোগামোসো! ইনডেক্সে বলা হয়েছে, শহরটার লোকসংখ্যা উনচল্লিশ হাজার। তার মানে বড় শহর নয়।

বোগোটার উত্তর-পুবে শাদা পর্বতের গায়ে ছোট্ট একটা ফোঁটা দিয়ে বোঝানো হয়েছে সোগামোসো। এত দূরের একটা অঞ্চলে বৃদ্ধা মহিলাকে খুঁজতে কেন যেতে বলেছেন লিসটার? আসলেই কি তেমন কোন মহিলা আছে? বিশেষ কোন মহিলা? না যে কোন মহিলা হলেই চলবে?

ম্যাপের পাশে সোগামোসোর সংক্ষিপ্ত বিবরণ রয়েছে।

কলাম্বিয়ায় বসতি তেমন জমে ওঠেনি, পড়ছে রবিন। মানুষজন বাস করে শুধু উপকূলের কাছে, আর অ্যানডিজ পর্বতমালার পশ্চিম দিকের পাদদেশে। উপকূলের কাছের ভেজা অঞ্চলে ইক্ষু আর ক্যাকাও-এর চাষ হয়। আর অনেক উঁচুতে, তিন থেকে সাড়ে ছয় হাজার ফুট উচ্চতায় বিশ্বের সব চেয়ে বড় কফি খেত রয়েছে। উপত্যকায় জুনে বার্লি আর গম। পাহাড়ী চারণভূমিতে ভেড়া চরার ব্যবস্থা আছে, তাই বিপুল পরিমাণে ভেড়া পোষা হয় সেখানে। অ্যানটিওকুইয়া ভ্যালিতে রয়েছে টেক্সটাইল মিল। সোগামোসোর কাছে কয়লা আর লোহার খনি রয়েছে, তাই সেখানে গড়ে উঠেছে ইস্পাতের কারখানা। সোনা আর পান্নার খনিও রয়েছে পর্বতের গায়ে। বেশির ভাগ কলাম্বিয়ানই কফির আয় থেকে জীবিকা নির্বাহ করে।

মিটমিট করতে লাগল মাথার ওপরের আলো। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই বন্ধ হয়ে। যাবে লাইব্রেরি, ঘোষণা করল লাউড স্পীকার।

ম্যাপটা ঠেলে সরিয়ে তাড়াহুড়া করে এনসাইক্লোপেডিয়ার তাকগুলোর কাছে, চলে এল রবিন। আমেরিকানায় বেশ কয়েক পৃষ্ঠা জুড়ে লেখা রয়েছে কলাম্বিয়া সম্পর্কে। ব্রিটানিকাতেও বেশ প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। সব পড়ার সময় নেই। রেফারেন্স বই লাইব্রেরির বাইরে নিয়ে যাওয়ারও অনুমতি নেই।

 আবার জ্বলতে লাগল আলো। তাকের কাছে দৌড়ে গেল রবিন। দক্ষিণ আমেরিকার ওপর লেখা দুটো বই বের করল। একটার নাম কলাম্বিয়া, ল্যাও অ্যাণ্ড কনট্রাস্টস। আরেকটা কলাম্বিয়া, ফ্রম নিউ এ্যানাডা টু বলিভার।

মেসেজটা টেবিল থেকে প্রায় ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে দ্রুতপায়ে চেকআউট ডেস্কে চলে এল সে। একটু পরেই বেরিয়ে এল বাইরে, লাইব্রেরির গেটের পাশের সাইকেল র‍্যাক থেকে সাইকেল বের করল। কলাম্বিয়ার ওপরে লেখা বইগুলো পড়তে পারলে খুশি হত। যতগুলো রয়েছে লাইব্রেরিতে। সময় পায়নি। যেদুটো নিয়েছে সেগুলো পড়ার জন্যেই উদগ্রীব হয়ে উঠেছে সে। কোন সূত্র মিলতেও পারে, যা দিয়ে লিসটার রহস্যের সমাধান হবে।

.

প্রায় দশটা বাজে। পায়ের শব্দ শুনতে পেল মুসা। লিভিং রুমে রয়েছে সে আর এলেনা। রেস্টুরেন্ট থেকে ফ্রাইড চিকেন এনে খেয়েছে। ফায়ারপ্লেসে আগুন জ্বেলে দিয়ে আরাম করে বসেছে। বেশি গরম হয়ে গেছে ঘর। তবে বেশ আলো হয়েছে। অন্ধকার ছায়াগুলোকে একেবারে ঘরের কোণে ঠেলে নিয়ে গেছে যেন আগুনের লালচে আভা।

তাস খেলছিল দুজনে। এলেনা জিতছিল। এই সময় থেমে যেতে হল পায়ের শব্দে। শুনেই বুঝল মুসা চিলেকোঠার দিকে যাচ্ছে কেউ। নীরব বাড়িটাতে সেই শব্দ বেশ পরিষ্কার শোনা যাচ্ছে, যেন সমস্ত বাড়িতেই ছড়িয়ে পড়েছে।

দমে গেল মুসা। ওপরতলায় যেতে চায় না সে। লিসটারের বাড়িটা ভাল, লাগেনি। কেমন যেন! ভূত থাকলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এখানকার সব কিছুই তার অপছন্দ। ঠাণ্ডা। ভেজা ভেজা। অনেক ধোয়ামোছা দরকার। দরজা জানালা সব খুলে দিয়ে বোদ বাতাস লাগানো দরকার। আর এমন একটা চিলেকোঠা রয়েছে যেটা কারও প্রয়োজনই নেই, কেউ ব্যবহার করে না। গত রাতেও নাকি পায়ের শব্দ পাওয়া গেছে, অথচ রবিন আর কিশোর গিয়ে কিছুই দেখেনি।

গত রাতে হয়েছিল, আজ আবার শুরু হয়েছে।

মুখ তুলল এলেনা। শুনছ? ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল সে।

না বলতে চাইল মুসা। কিছুই বলতে পারল না। আরেকদিকে মুখ ফেরাল।

পেছনের দরজায় তালা লাগিয়েছিলে? এলেনার প্রশ্ন।

আমি তো মনে করেছি আপনি লাগিয়েছেন।

 উঠে দাঁড়াল এলেনা। রান্নাঘরের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। কেউ ঢুকেছে।

ওপথে ঢুকলে শুনতে পেতাম। দরজা খুললেই টের পেয়ে যেতাম আমরা।

রান্নাঘরের দিকে এগোল মুসা। দরজাটা পরীক্ষা করল। তালা দেয়া। ছিটকানি লাগানো ওপথে। কেউ আসেনি।

নাকি কেউ ঢুকে ভেতর থেকে ছিটকানি লাগিয়ে দিয়েছে?

রান্নাঘরে এসে দরজার দিকে তাকিয়ে রইল এলেনা। ভ্রুকুটি করল। তারপর পিছিয়ে: বেরিয়ে গেল। তাকে অনুসরণ করে হলে চলে এল মুসা। সিঁড়ির দিকে চেয়ে রয়েছে এলেনা।

শুনছো! এলেনা বলল।

জোরালো হয়েছে পদশব্দ। চিলেকোঠার কাঠের মেঝেতে ফাপা আওয়াজ তুলছে।

মরুক! টেলিফোনের দিকে এগিয়ে এল এলেনা। রিসিভার তুলে ৯১১ ডায়াল করল। শয়তানটার কথা পুলিশকে না বলে আর পারছি না।

শয়তান, অর্থাৎ মানুষের কথা বলছে এলেনা। কিন্তু আসলে কি মানুষ? কিশোর বলেছে গতরাতে সিঁড়ি দিয়ে কাউকে উঠতে দেখেনি। কাউকে নামতেও দেখেনি। কিন্তু চিলেকোঠায় গিয়েছিল কেউ। হেঁটেছিল।

আমার ভাল্লাগছে না! বলেই ফেলল মুসা।

শুনলই না যেন এলেনা। লাইনের অন্য পাশে ডিসপ্যাচারকে ঠিকানা বলছে।

 সিঁড়ি বেয়ে উঠতে শুরু করল মুসা। কাঁপছে সে। গলা এত শুকিয়ে গেছে ঢোকই গিলতে পারছে না। তবু উঠছে…এক ধাপ..আরেক ধাপ…আরও এক ধাপ…

চিলেকোঠায় পায়চারি চলছেই। ভূত? নাকি ভূতের চেয়েও ভয়ঙ্কর কিছু?

রিসিভার রেখে মুসাকে অনুসরণ করল এলেনা। সে-ও ভয় পেয়েছে। মুসার কাছাকাছি থাকতে চাইছে।

যখন ছোট ছিলাম, বলল সে। আমাদের বাড়িতে একজন বাবুর্চি ছিল। মানুষকে ভয় দেখানোর ওস্তাদ। বিশেষ করে ছোটদেরকে। ছাতি থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেছিল ও। ও বলেছিল এ বাড়িতে ভূত আছে।

তাড়াতাড়ি হাত নেড়ে বাধা দিল মুসা। আর বলবেন না, প্লীজ!

ওপরের হলে উঠে দাঁড়াল দুজনে। পায়চারি বন্ধ হয়ে গেছে। কান পেতে রইল আবার শব্দ শোনার অপেক্ষায়।

ওপরেও কি কেউ কান পেতে রয়েছে? চিলেকোঠার সিঁড়িতে অপেক্ষা করছে, রেলিঙে হেলান দিয়ে, নিচের দিকে তাকিয়ে? শিকার দেখলেই ঘাড়ে এসে লাফিয়ে পড়ার জন্যে ওত পেতে রয়েছে?

এখানেই থাকি, যেতে চায় না মুসা। একটা চেয়ার নিয়ে এল কমপিউটার। রুম থেকে। বসার ইঙ্গিত করল এলেনাকে।

পুলিশ এসে যদি দেখে, এলেনা বলল। কিছুই নেই, সব সময়ই যেমন থাকে না, তাহলে কি ভাববে বলতো?

পাগল।

ঠিক। আর এরকম করে বাঘ এসেছে বাঘ এসেছে যদি করতে থাকি, এক সময় আসাই বন্ধ করে দেবে ওরা। আমি ফোন করলেই হাসবে। বলবে কিপটে লিসটারের পাগলা মেয়ে ডাকছে।

কিন্তু আমার মনে হয় যতবারই ফোন করুন না কেন পুলিশকে আসতেই হবে। বলা যায় না, কখন সত্যিকারের বিপদে পড়ে যাবেন আপনি। ওই ঝুঁকি ওরা নিতে চাইবে না। এসে কিছু না দেখলে বকাঝকা করবে হয়ত, কিন্তু আসতে ওদেরকে হবেই।

পুরো এক মিনিট চুপ করে থেকে ভাবল মুসা। কিশোর এখন এখানে থাকলে কি করত? প্রমাণ খুজত, যেটা দেখিয়ে পুলিশকে বিশ্বাস করানো যায়। ভাঙা তালা…পায়ের ছাপ! হ্যাঁ, পায়ের ছাপ!

লিসটারের বাথরুমে একটা জিনিস দৈখেছিল মনে পড়ল মুসার। গতকাল ওখানে আটকে ছিল, তখন দেখেছে। বেসিনের ওপরের তাকে রাখা ট্যালকম পাউডারের একটা টিন।

দৌড়ে এসে লিসটারের ঘরে চলে এল সে। বাথরুমে ঢুকল। সুইচ টিপে আলো জেলে, দেখল টিনটা আগের জায়গাতেই রয়েছে। থাবা দিয়ে ওটা নামিয়ে নিয়ে আবার দৌড়ে ফিরে এল হলে। চিলেকোঠার দরজার কাছে মেঝেতে পাউডার ছিটিয়ে দিল।

চোখে প্রশ্ন নিয়ে তার দিকে তাকাল এলেনা।

মানুষ হলে এপথে ছাড়া বোরোতে পারবে না। বুঝিয়ে বলল মুসা, আর এদিকে এলে তাকে দেখতে পাবই। এই পাউডার মাড়িয়ে যেতে হবে। পায়ের। ছাপ রেখে যাবে। পুলিশকে দেখাতে পারব তখন। প্রমাণ।

ঠিক! ঠিক বলেছ! হাততালি দিতে গিয়েও থেমে গেল এলেনা, কিন্তু যদি পায়ের ছাপ পড়ে?

জবাব দিল না মুসা। ড্রাইভওয়েতে ইঞ্জিনের শব্দ হল। দড়াম করে বন্ধ হল গাড়ির দরজা। বাড়ির চারপাশে ঘুরে দেখতে লাগল কেউ। শব্দ হচ্ছে। দেখছে। বোধহয় ঝোপঝাড়ে, কেউ লুকিয়ে আছে কিনা।

সিঁড়িতে অর্ধেক নেমে গেছে এলেনা, এই সময় বাজল কলিং বেল। দরজা খুলে দিল সে। রকি বীচ পুলিশ ডিপার্টমেন্টের দুজন অফিসার দাঁড়িয়ে আছে। এলেনাকে বলতে শুনল মুসা, ওপরে চিলেকোঠায় আসুন।

চলুন, বলল একজন অফিসার। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগল।

আরেকটা শব্দও কানে আসছে মুসার। চিলেকোঠার সিঁড়িতে, নামছে বোধহয় রহস্যময় অনুপ্রবেশকারী।

ঝট করে দরজার দিকে ফিরল সে। এখান থেকেই সিঁড়ির গোড়াটা দেখা যায়।

হঠাৎ করেই থেমে গেল চিলেকোঠার সিঁড়িতে পায়ের আওয়াজ হল না আর। মেইন সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসতে লাগল একজন অফিসার।

সাহস পেয়ে চিলেকোঠার দরজার কাছে উঠে এল মুসা। যেমন পাউডার তেমনি রয়েছে। কোন ছাপ পড়েনি। মানুষের চিহ্নও চোখে পড়ছে না।

ভূত! কোলা ব্যাঙের স্বর বেরোল মুসার কণ্ঠ থেকে। ভূতের বাড়ি এটা!

সব শুনে এলেনা বলল, তোমরা থাকলে থাক! আমি আর এক মুহূর্তও না! মার কাছে চলে যাচ্ছি।

তিন ব্লক পেছনে রয়েছে কিশোর, এই সময় সান্তা মনিকা বুলভার ধরে পুবে মোড়। নিল এনথনির গাড়ি। চার ব্লক পেছনে পড়ে গেল যখন মেফিল্ডে ঢুকল গাড়িটা। গতি কমাল। একটা মার্কেটের পার্কিং লটে নিয়ে গিয়ে ঢোকাল। ডি. এল; ডিপার্টমেন্টাল স্টোর দেখা গেল কমপ্লেক্সের পশ্চিম প্রান্তে। এই ব্রাঞ্চেই লিসটারের ম্যানেজারি করে সে। র‍্যাকে সাইকেল তালা দিয়ে রেখে দোকানের দিকে এগোল কিশোর।

এখন কেনাকাটার সময় লোকের। দোকানদারী ফেলে এই সময়ে ওবাড়িতে কেন গিয়েছিল এনথনি? অবাকই লাগছে তার। দুজনে মিলে ষড়যন্ত্র করছে মিস্টার লিসটারের বিরুদ্ধে? এতে কি লাভ ওদের?

ঠোঁট কামড়াল কিলোর। এনথনির সঙ্গে দেখা করার সিদ্ধান্ত নিল। তাকে– বলবে, সে আর তার বন্ধুরা মিলে এলেনা লিসটারকে সাহায্য করছে। বিশপের– বইয়ের ব্যাপারে কিছু জানে কিনা জিজ্ঞেস করবে। সিয়েটা আর সোগামোসোর। কথাও জানতে চাইবে। এসব প্রশ্ন অবশ্য নতুন নয় এনথনির জন্যে। এলেনার মায়ের রান্নাঘরে লুকিয়ে থেকে তো সবই শুনেছে। তবু তার প্রতিক্রিয়া দেখার কৌতূহল সামলাতে পারছে না কিশোর। এমনও হতে পারে মুখ ফসকে কোন তথ্য দিয়ে ফেলতে পারে এনথনি, যেটা তদন্তের সুবিধে করে দেবে।

 স্টোরের অফিসগুলো রয়েছে তিনতলায়। চিলড্রেনস ডিপার্টমেন্টের পেছনে। ডেস্কের ওপাশে বসা এক মহিলা কিশোরের দিকে তাকিয়ে হাসল। কি সাহায্য করতে পারে জিজ্ঞেস করল। তিন গোয়েন্দার একটা কার্ড দিয়ে নিজের নাম বলে জিজ্ঞেস করল কিশোর মিস্টার এনথনির সঙ্গে দেখা করা যাবে কিনা।

কার্ডটার দিকে তাকাল মহিলা। গোয়েন্দা? কিছুটা অবাক হয়েই আবার কিশোরের দিকে মুখ তুলল।

মিস্টার লিসটারের নিখোঁজের ব্যাপারে কথা বলব, কিশোর বলল। গতকাল এলেনা লিসটারের এনগেজমেন্ট পার্টিতে ছিলাম। মিস্টার এনথনির সঙ্গে ওখানেই। দেখা হয়েছে।

মিস্টার লিসটার? হাসি চলে গেছে মহিলার মুখ থেকে। তিনি নিখোঁজ হয়েছেন?

মিস্টার এনথনি সব জানেন।

কিশোর আর কিছু বলতে চায় না এটা বুঝে ফোন তুলল মহিলা। এক্সটেনশনে ডায়াল করে বলল কিশোর পাশা এসেছে, মিস্টার এনথনির সঙ্গে দেখা। করতে চায়। তারপর বলল মিস্টার লিসটারের সম্পর্কে কথা বলবে।

 ওপাশের কথা শুনল। রিসিভার নামিয়ে রেখে কিশোরের দিকে তাকিয়ে বলল, মিস্টার এনথনি খুব ব্যস্ত। আজ কথা বলতে পারবেন না।

তাই? অতীতে বহুবারই বহুজুন কিশোরের সঙ্গে দেখা করতে অসম্মতি জানিয়েছে, এটা নতুন নয় তার কাছে একটুও নিরাশ হল না। তবে একটা উপায় বের করতেই হবে দেখা করার। এবং আজই। লিটারের কমপিউটারের ফাইলের কথা হয়ত জানে না এনথনি। ওটার কথা শুনলে নরম হতেও পারে।

আমি জানি মিস্টার এনথনি ব্যস্ত মানুষ, শান্তকণ্ঠে বলল কিশোর। কিন্তু তারপরেও আমার সঙ্গে তিনি দেখা করতে চাইবেন। তার জন্যে খবর আছে। মিস্টার লিটারের ব্যাক্তিগত ফাইলে লেখা রয়েছে তার নাম।

মোলায়েম হাসি হাসল গহিলা। বেশ, তোমার কার্ড আর মেসেজ রেখে যাও। তাকে দেব। দরকার মনে করলে ফোন করবেন।

বসকে পাহারা দেয়ার গুরু দায়িত্ব নিয়েছেন যেন মহিলা। কিছুতেই দেখা করতে দেবে না। কিশোরকে সরাতে সর পরিকর। ঘড়ি দেখল কিশোর। পাঁচটার। বেশি। আরেকটু পরেই শেষ হয়ে যাবে, অফিসের সময়। ঠিক আছে, বসি, বলল সে। তিনি বেরোলেই নাহয় কথা বলব।

অনেকক্ষণ বলতে হবে তাহলে। দোকান বন্ধ হতে নটা।

অফিস থেকে বেরিয়ে এল কিশোর। এসকেলেটর, অর্থাৎ চলমান সিঁড়ি নেমে যাচ্ছে নিচে। তাতে উঠল। হাল ছেড়ে দিয়ে ফিরে যাবে? নাকি অপেক্ষা করবে এনথনির জন্যে? কাপড় আর পারফিউমের দোকানের পাশ দিয়ে নামতে নামতে এসব কথা ভাবছে সে। দোতলা থেকে একতলায়, নামল, আসবাব আর নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দোকান ওখানে।

এনথনির জন্যে অপেক্ষাই করবে ঠিক করল কিশোর। অফিস বন্ধ করার। আগে নিশ্চয় তার মেসেজ পেয়ে যাবে ম্যানেজার। ঘাবড়ে গিয়ে কথা বলতে চাইবে। আর তা যদি না করে, লোকটার ওপর চোখ রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। আইলিন লিসটার আর এনথনির মাঝে কোন একটা সম্পর্ক নিশ্চয় আছে। কি, সেটা বের করতে হবে। হয়ত লিটারের কিডন্যাপিঙের সঙ্গেও এর যোগাযোগ রয়েছে।

নিচে আঙিনায় নেমে এল কিশোর। এখন সময় কাটাতে হবে, কয়েক ঘন্টা। কয়েকটা ইলেকট্রনিকের দোকানের সামনে ঘুরল। বিভিন্ন মডেলের স্টেরিও সেট আর রেকর্ড দেখল,। একটা স্ন্যাকস শপে ঢুকে চিকেন বারগার আর কোক খেল। একটা কাপড়ের দোকানে ঢুকে ব্যায়ামের জন্যে কিছু পোশাক পছন্দ করল। একটা বইয়ের দোকানে ঢুকে বই বের করে পড়তে শুরু করে দিল। দোকানদার বিরক্ত হয়ে তার দিকে তাকানো শুরু করতে করতে শেষ করে ফেলল অর্ধেকটা কাহিনী।

বার বার ঘড়ি দেখছে কিশোর। আরও এক ঘন্টার বেশি রয়েছে। একটা আসবাবের দোকানে ঢুকে চামড়ায় মোড়া একটা বড় সোফায় বসল হেলান দিয়ে। চুপ করে বসে থাকা ছাড়া আর কিছু করার নেই।

দোকানের এই কোণটা নীরব, বড় বেশি নীরব। খরিদ্দার বেশি নেই। নিঃসঙ্গ। একজন সেলসম্যান পায়চারি করছে আসবাবের সারির মাঝের লম্বা একটা ফাঁকে। তার পায়ের শব্দ ঢেকে দিচ্ছে মেঝেতে বিছানো কার্পেট। বসে থাকতে থাকতে ঘুম পেয়ে গেল কিশোরের। ঢুলতে শুরু করল। আগের রাতে লিটারের বাড়িতে ভাল ঘুম হয়নি। এখন সেটার খেসারত দিতে হচ্ছে।

চিলেকোঠায় অনুপ্রবেশকারীর কথা মাথায় ঢুকতেই তন্দ্রা টুটে গেল তার। যদিও মাথাটা ঝুলেই রইল বুকের ওপর। এই আরেকটা রহস্য। কি ঘটেছে। চিলেকোঠায়? ভূতে হাঁটাহাঁটি করেছে?

 কিন্তু ভূত বিশ্বাস করে না কিশোর। র‍্যাপারটা অদ্ভুত হতে পারে, কিন্তু ভূত। নয়। কবর থেকে উঠে আসতে পারে না প্রেতাত্মা। গলা কেটে বললেও কিশোরকে অন্তত একথা বিশ্বাস করাতে পারবে না কেউ। ওই শব্দের অন্য ব্যাখ্যা আছে। হতে পারে সাগরের দিক থেকে জোরাল হাওয়া এসেছিল ওই সময়, কোনভাবে শব্দের সৃষ্টি করেছে। তবে এটা একটা সম্ভাবনা, অন্য কিছুও হতে পারে। এই যেমন, বড় ইঁদুর।

আবার ঢুলতে লাগল সে। হঠাৎ চমকে জেগে গেল। চোখ মেলল।

অন্ধকার। চারপাশে তাকিয়ে নানারকম আকৃতি দেখতে পেল সে। কালো কালো অদ্ভুত সব ছায়ামূর্তি যেন। চিনতে অবশ্য দেরি হল না। দোকানের আলমারি, চেয়ার, টেবিল, ওয়ারড্রোব এসব।

 সতর্ক হয়ে গেল সে। দেরি করে ফেলেছে! দোকান বন্ধ হয়ে গেছে। টেরই পায়নি সে কখন বন্ধ করে দিয়ে চলে গেছে সেলসম্যান।

উঠে দাঁড়াল কিলোর। কান পাতল। নিশ্চয় ঝাড়ুদার আছে বাইরে। কিন্তু বাড়ুর শব্দ কানে এল না। পাহারাদার থাকবেই। ওরা এসে তাকে জাগিয়ে দিল না কেন? সেলসম্যানই বা এভাবে দোকান বন্ধ করে দিয়ে চলে গেল কেন? তাকে জাগিয়ে বের করে দিতে পারত।

একটাই কারণ হতে পারে। এমন এক কোণে ঢুকে বসে আছে সে, যেখানে ভাল করে না তাকালে কারও চোখ পড়বে না। তার তিন ফুট দূর দিয়ে হেঁটে গেলেও না।

চোখ ডলল কিশোর। আলমারি আর কিছু উইং চেয়ারের ওপাশে একটা আলো জ্বলছে, ঘোলাটে লাল আভা ছড়িয়ে দিয়েছে শুধু। তার নিচে লেখা রয়েছে একজিট, তার মানে বেরোনোর পথ।

অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে সেদিকে এগোল কিশোর। একব্জিটের কাছে পৌঁছে আরেকটা নির্দেশ দেখতে পেলঃ ইমারজেন্সি একব্জিট ওনলি। অ্যালার্ম উইল রিং ইফ দিস ডোর ইজ ওপেনড। জরুরী অবস্থায় বেরোনোর পথ। দরজা খুললেই সতর্কীকরণ ঘন্টা বেজে উঠবে।

কল্পনায় দেখতে পেল কিশোর, ইমারজেন্সি তোর ঠেলে বাইরে বেরিয়েছে। প্রচণ্ড শব্দে বাজতে আরম্ভ করেছে অ্যালার্ম বেল। জ্বলে-নিভে সঙ্কেত দিতে শুরু করেছে বিশেষ আলো। কোন সন্দেহ নেই টিভি মনিটরের সামনে পাহারাদারও বসে রয়েছে, চোখ রাখছে সর্বত্র। পর্দায় কিশোরকে দেখামাত্র ছুটে আসছে ওরা। পিস্তল বের করে ফেলেছে। মার্কেটের সীমানা পেরোনার আগেই ধরে ফেলা হয়েছে তাকে। তার পরের ঘটনা আর মনে করতে চায় না সে।

কেঁপে উঠল কিশোর। কয়েক মাস আগে একটা ছেলেকে পাওয়া গিয়েছিল। আঙিনার ভেতরে। বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরে। ধরে তাকে প্রথমে ভালমত ধোলাই দিয়েছে পাহারাদাররা, যদিও সেটা আইন বিরুদ্ধ। তারপর পুলিশ ডেকে তাদের হাতে তুলে দিয়েছে। জেলখাটা কিছুতেই এড়াতে পারেনি ছেলেটা। কিশোরের ক্ষেত্রে জেলটা না থাকলেও ধোলাইটা খেতেই হবে। ধরলে কিছু উত্তম মধ্যম না দিয়ে ছাড়বে না প্রহরীরা। তার ওপর রয়েছে লোকাল নিউজপেপারগুলো। ছবিসহ বড় করে ছাপবে সামনের পাতায়, হেডিং লিখবে সুপার মার্কেটে চোর। রাতের বেলা কি কারণে আসবাবের দোকানে ঢুকে লুকিয়ে বসেছিল কিশোর, কিছুতেই বোঝাতে পারবে না রিপোর্টারদেরকে।

ইমারজেন্সি একব্জিটের দিক থেকে ঘুরে দাঁড়াল সে। প্রধান প্রবেশ পথের দিকে চলল। ইস্পাতের মস্ত শাটার লাগানো রয়েছে সেখানে।

সাবধানে এগোল সে। সামান্যতম শব্দ না করে এসে খুঁজে বের করল কর্মচারীদের প্রবেশ পথটা। এই দরজাতেই সাবধান বাণী লেখা রয়েছে। জোর করে বেরোতে গেলেই অ্যালার্ম বেজে উঠবে।

দরজার পাশের একটা ঘড়িতে দেখা গেল রাত এগারোটা বাজে। বাড়িতে খবর দিতে পারেনি কিশোর। রেগে কাই হয়ে যাবেন মেরিচাচী।

খুঁজতে খুঁজতে একটা পে ফোন বের করল সে। স্লটে পয়সা ফেলে বাড়ির নম্বরে ডায়াল করল। মেরিচাচী ধরলেন। কণ্ঠ শুনেই কিশোর বুঝে ফেলল উদ্বিগ্ন হয়ে আছেন। সে নাম বললেই ফেটে পড়বেন এখন। তা-ই করলেন। জিজ্ঞেস করলেন, তুই কোথায়?

আমাদেরকে এলেনা লিসটারের প্রয়োজন, ঘুরিয়ে জবাব দিল, কিশোর। সত্যি কথাই বলল।

কি মাঝে মাঝে আমারও তোকে প্রয়োজন হয়! সেকথা কখনও ভেবেছিস? লিসটারের বাড়ি থেকে বলছিস নাকি? ওর বাপের কোন খোঁজ পাওয়া গেছে?

না। চাচী, শোন, আজ রাতেও থাকতে চাই। তোমার কোন অসুবিধে হবে না। তো?

রাতে আর কি অসুবিধে? ইয়ার্ডের কাজ তো দিনের বেলা। থাকতে চাইলে থাক। তবে সাবধানে থাকবি। বিপদ-আপদ ঘটাবি না।

লাইন কেটে দিলেন তিনি।

ফোন ছেড়ে দিয়ে আবার আসবাবের দোকানে ফিরে এল, ঘরের কোণে তার। সেই সোফায়। সোফাটাকেই এখন তার বাড়ি ভাবতে আরম্ভ করেছে। বসে পড়ল। সকাল হতে অনেক দেরি। কি করে যে রাতটা কাটবে কে জানে।

মোচড় দিয়ে উঠল পেট। খিদে জানান দিচ্ছে। একটা গল্পের কথা মনে পড়ল। একটা ছেলে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে রাতের বেলা আটকা পড়েছিল। রেস্টুরেন্টের রেফ্রিজারেটর থেকে খাবার বের করে খেয়েছিল সে। কিন্তু বিকেলে ভেতরে কোন রেস্টুরেন্ট দেখতে পায়নি কিশোর। আছে বলেও মনে হয় না। রাখার কোন প্রয়োজন মনে করেননি লিসটার। কারণ স্টোরের বাইরেই চত্বরে অনেক খাবারের দোকান রয়েছে।

তবু, খাবার কি খুঁজবে? সুইট কাউন্টার কিংবা ছোটখাট স্ন্যাকস থাকতে পারে কোথাও।

বাতিল করে দিল ভাবনাটা। অতিরিক্ত ঝুঁকির কাজ হয়ে যাবে।

চোখ মুদল সে। আবার তন্দ্রা এসে গেল। ঢুলতে শুরু করল। স্বপ্ন দেখল। লিসটারের বাড়িতে রয়েছে আর কে যেন টোকা দিচ্ছে দরজায়। স্বপ্নের মধ্যেই বুঝতে পারল কে লোকটা, ডেভিড লিসটার। ভেতরে ঢুকতে চাইছেন। আসছি! চিৎকার করে সাড়া দিল কিশোর। যাবেন না! এখুনি আসছি!,

জোর করে যেন টেনে তুলল শরীরটাকে। আলোকিত হয়ে গেছে। লোকজন। দেখতে পেল সামনে। তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। হাসাহাসি করতে লাগল ওরা। সকালের খরিদ্দার। বিজনেস স্যুট পরনে, হাতে খবরের কাগজ। ওদেরই একজন টোকা দিচ্ছিল জানালায়।

জানালা! কাল সন্ধ্যায় যখন বসেছিল তখন তো ওটা ছিল না। এখন এল কোথা থেকে?

  বুঝতে পারল অন্ধকারে অন্য জায়গায় এসে বসেছে। আগের দিন সন্ধ্যায়, শুরুতে যে সোফায় বসেছিল এটা সেটা নয়। ডিসপ্লে উইনডোতে জমায়েত হয়েছে লোকে দোকানের ভেতর তাকে ঘুমোতে দেখে। যেন এটা তাদের কাছে এক। সাংঘাতিক মজার ব্যাপার।

লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল কিলোর। যে কোন মুহূর্তে হাজির হয়ে যেতে পারে প্রহরীরা, চেপে ধরতে পারে তাকে। পুলিশ ডাকবে। তারা খবর দেবে মেরিচাচী আর রাশেদ চাচাকে।

প্রহরীদের গলা শোনা গেল। কর্মচারীদের ঢোকার দরজা খুলছে ওরা।

দৌড়ে গিয়ে বড় একটা টেবিলের নিচে লুকিয়ে পড়ল কিশোর।

আসবাবের সারির মাঝের পথ দিয়ে এগিয়ে এল ওরা। এখানেই আছে, বলল একজন। আশোঁপাশে কোথাও লুকিয়ে পড়েছে।

কিশোর যে টেবিলের নিচে লুকিয়েছে তার কাছে এসে দাঁড়াল আরেকজন। মোটা গলায় বলল, কাল রাতে দেখলে না কেন? কারও চোখে পড়ল না?

সব কটা চেয়ার টেবিলের তলায় তো আর উঁকি দেয়া সম্ভব না, প্রথম লোকটা জবাব দিল। টহল দিই। তখন চোখে পড়লে তো ধরতামই।

লোকগুলো চলে গেলে বেরিয়ে এসে মাথা তুলে উঁকি দিল কিশোর। ডিসপ্লে উইনডোর কাছে দেখতে পেল ওদেরকে। সোফাটার দিকে তাকিয়ে রয়েছে, যেন ওটাই ওদেরকে বলে দেবে কিশোর কোথায় আছে।

পেছনে শব্দ হল। ফিরে তাকাল কিশোর। হাড়সর্বস্ব একজন মানুষ দাঁড়িয়ে রয়েছে দোকানের প্রধান প্রবেশ পথের কাছে। পরনে জলপাই রঙের জাম্প স্যুট। তালা খুলল লোকটা। তারপর টান দিয়ে তুলতে শুরু করল ইস্পাতের শাটার।

পথ পরিষ্কার হয়ে আসছে।

লাফিয়ে উঠে দৌড় দিল কিশোর। একছুটে লোকটার পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে এল বাইরে। চিৎকার চেঁচামেচি কিছুই করল না লোকটা। অবাক হয়ে তাকিয়ে রয়েছে শুধু তার দিকে।

চত্বরে বেরোল কিশোর। এই সময় শুনতে পেল চিৎকার। দেখার জন্যে থামল।, ফিরেও তাকাল না। ছুটে চতুর পার হয়ে অটোমেটিক দরজা দিয়ে বেরিয়ে চলে এল পার্কিং এরিয়ায়।

র‍্যাকে আগের জায়গাতেই বাঁধা রয়েছে সাইকেলটা। খুলতে গিয়ে তাড়াহুড়োয় হাত থেকে চাবিই ফেলে দিয়েছিল প্রায়। কাঁপা হাতে খুলল তালাটা। একটানে সাইকেলটা বের করে নিয়েই চেপে বসল। প্যাডাল ঘোরাতে শুরু করল। পেছনে ছুটে আসছে লোকজন।

এবারও ফিরে তাকাল না কিশোর। এখন একটাই করণীয়, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়া, লোকগুলোর হাতে পড়ার আগেই।

 ভূত বিশ্বাস করি না আমি, ঘোষণা করল কিশোর। ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে রয়েছে। মুসার দিকে।

তা তো বুঝলাম, মুসা বলল। কিন্তু ভূত না হলে কী?

বাতাসের কারসাজি হতে পারে। ইঁদুর হতে পারে, রবিন বলল।

 হেডকোয়ার্টারে আলোচনায় বসেছে তিন গোয়েন্দা। কিশোর বসেছে তার নির্দিষ্ট ডেস্কের ওপাশে। চোখ লাল। ঘুম ঘুম দৃষ্টি। ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে রাতের ধকলের স্বাক্ষর। মুসার চোখেও ক্লান্তি। শুধু স্বাভাবিক দেখাচ্ছে রবিনকে। তিনজনের মধ্যে রাতে একমাত্র তারই ভাল ঘুম হয়েছে।

লাইব্রেরি থেকে যে বই দুটো পড়তে এনেছিল রবিন সেদুটো নিয়ে এসেছে। এখানে। পাতা ওল্টাতে শুরু করল।

ভূত হলেই বা কি? বইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল সে। লিসটারের বাড়িতে নিশ্চয় অনেক দিন ধরে বাস করছে সে। হঠাৎ করে লিসটারকে নিয়ে পরপারে চলে যাওয়ার ইচ্ছে নিশ্চয় তার হয়নি। আমাদেরকে এখন বিশপেরই বই খুঁজে বের করতে হবে। আর সেটা করতে পারলেই লিসটারকেও বের করে আনতে পারব। কাজেই ভূতের ওপর জোর না দিয়ে এখন বিশপের বইয়ের ওপরই জোর দেয়া উচিত। আর সেজন্যে কমপিউটারের মেসেজের মানে বের করতে হবে আমাদের। যাই হোক, তোমাদেরকে থ করে দেয়ার মত খবর আছে আমার কাছে। মুখ তুলল। রবিন। হাসল। হাততালি দেয়ার দরকার নেই। বাহবা দেয়ার দরকার নেই। শোন, আমি সোগামোসো খুঁজে পেয়েছি।

ঘুম থেকে যেন জেগে গেল কিশোর। একেবারে সজাগ। পেয়েছ! কে?

কে নয়, কি। দক্ষিণ আমেরিকার কলাম্বিয়ার একটা ছোট শহর। মাত্র, উনচল্লিশ হাজার লোকের বাস। এখন এলেনা গিয়ে যদি বৃদ্ধা মহিলাকে জিজ্ঞেস করে সে কি চায় তাহলে হয়ত জেনে আসতে পারবে। ওই মহিলা নিশ্চয় সোগামোসোরই বাসিন্দা।

আর সেটা করতে গেলে সিয়েটার ব্যাপারে হুশিয়ার থাকতে হবে তাকে,, মুসা মনে করিয়ে দিল। কমপিউটারের মেসেজে সেকথা বলা আছে।

হ্যাঁ, মাথা ঝাঁকাল রবিন। মহিলাকে জিজ্ঞেস করতে হবে। হুশিয়ার থাকতে হবে যাতে সিয়েটার কানে এসব কথা চলে না যায়।

না, মাথা নাড়ল কিশোর। সিয়েটা কলাম্বিয়ায় নেই। লিসটার কমপিউটারে মেসেজ লেখার সময় অন্তত ছিল না। লিসটার জানতেন না সিয়েটা বৈধ কিনা। আই এন এস-এর কথা উল্লেখ করেছেন তিনি। আই এন এস মানে ইমিগ্রেশন অ্যাণ্ড নেচারালাইজেশন সার্ভিস। সুতরাং ধরে নিতে পারি বেআইনী ভাবে আমেরিকায় প্রবেশ করেছে সিয়েটা, তার কাছে বৈধ কাগজপত্র নেই।

বেশ, রবিন বলল। তাহলে এখানেও হুশিয়ার থাকতে হবে এলেনাকে। যতক্ষণ সোগামোসোয় রওনা না হচ্ছে ততক্ষণ সাবধান থাকতে হবে যাতে সিয়েটার সামনে না পড়ে যায়। কিংবা সামনে পড়লেও কোন কথা ফাঁস না করে দেয়। কিশোর, তোমাকে চিলেকোঠায় যে আক্রমণ করেছিল সে-ই সিয়েটা হতে পারে। তোমার ওপর হামলা চালিয়েছিল একজন মানুষ, ভূত-প্রেত নয়।

ভূত তো হতেই পারে না, কিশোর বলল। মানুষ। জীবন্ত মানুষ।

টেলিফোন বাজল।

এলেনা হয়ত ভাবছে আমরা কি করছি, মুসা আন্দাজ করল। কাল রাতে মায়ের বাড়িতে চলে গিয়েছিল। বাবার ওখানে থাকতে সাহস পায়নি।

তাকে দোষ দেয়া যায় না। রিসিভার তুলে নিয়ে কানে ঠেকাল কিশোর। এলেনার ফোন নয়। আরনি ভিনসেনজো ওরফে হোয়েরটার।

টেলিফোন লাইনের সঙ্গে লাগানো লাউডস্পীকারের সুইচ অন করে দিল কিশোর, সকলের শোনার জন্যে। আপনি ফোন করলেন, অবাকই লাগছে মিস্টার ভিনসেনজো। কাল তো বেরিয়ে চলে গেলেন…

আমাকে কডিই বলবে। ওটা ছদ্মনাম নয়। মিডল নোম। আরনি কডি ভিনসেনজো। বন্ধুরা আমাকে ওই নামেই ডাকে। আর কাল চলে না গিয়ে কি করতে পারতাম। এত বড় অপমান…থাক ওসব কথা। আজ থানায় গিয়েছিলাম। লিসটারের নিখোঁজ হওয়ার ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহী নয় পুলিশ। তেমন মাথা ঘামাচ্ছে না। তবে কিডন্যাপের কথা জানলে হয়ত ঘামাত। আর তখন আমিও তাদের সন্দেহের তালিকায় পড়ে যেতাম।

কারণ লিসটারকে কিডন্যাপের মোটিভ রয়েছে আপনার, কিশোর বলল।

হ্যাঁ, স্বীকার করল আরনি। ওই বুড়ো ভামটাকে একটা শিক্ষা দেয়ার ইচ্ছে ছিল আমার। আমার বাবার সর্বনাশ করার জন্যে।

সহজ সরল স্বীকারোক্তি। বন্ধুদের দিকে তাকাল কিশোর।

সত্যিই বলছে মনে হয়, বিড়বিড় করল রবিন।

মাথা ঝাঁকাল কিশোর। বেশ, বিশ্বাস করলাম আপনার কথা। কিন্তু আমাকে ফোন করেছেন কেন?

তোমাদের ওপর এলেনার বিশ্বাস আছে, তাই আমারও হয়েছে। মিস্টার লিসটারকে খুঁজে বের করতে আমার কোন সাহায্য দরকার হলে, করব। এটা তার জন্যে দয়া নয়, আমার নিজেরই স্বার্থে। যতদিন লিসটার নিখোঁজ হয়ে থাকবে, আমার ওপর সন্দেহ থাকবে তোমাদের। এটা বয়ে বেড়াতে পারব না আমি। কাজেই, আমাকে দরকার হলেই ফোন করবে।

এখনই একটা কথা ভাবছি, কিশোর বলল। মোগামোসো সম্পর্কে কিছু জানেন?

সোগা…সোগা কে?

নামটা আবার বলল কিশোর। কিছু বুঝতেই পারল না আরনি, বলা তো দুরের কথা। সিয়েটার কথা শুনে বলল, ওই নামে কয়েকজনকে চিনি। খুব প্রচলিত এই নাম, অনেকেই রাখে। তাঁদের কেউই লিসটারকে চেনে না এটাও বলতে পারি।

কখনও ঈশ্বরের অশ্রুর কথা বলতে শুনেছেন মিস্টার লিসটারকে? ঈশ্বরের অশ? তা কি করে হয়? কি করে হয় জানি না। তবে ওটা মিস্টার লিসটারের কাছে খুবই জরুরী। সরি। শুনিনি। শুনলে ওরকম একটা কথা মনে না থাকার কথা নয়।

তা ঠিক। আরেকটা প্রশ্ন। সোগামোসোর কথা আমরা জানি। ওটা কলাম্বিয়ার। একটা ছোট শহর। কোকেনের প্রধান ঘাঁটিগুলোর একটা। মাদকদ্রব্য চোরাচালানের সঙ্গে মিস্টার লিসটারের কোন যোগ নেই তো?

মোটেই না, জোর দিয়ে বলল আরনি। মাদককে ঘৃণা করে লিসটার। নেশা করে শুনলেই যত ভাল কর্মচারীই হোক চাকরি থেকে বের করে দেয় সে। আমার কথা বিশ্বাস না হলে এলেনাকে জিজ্ঞেস করে দেখতে পার।

তাকে ধন্যবাদ দিল কিশোর।

যোগাযোগের জন্যে টেলিফোন নম্বর দিয়ে লাইন কেটে দিল আরনি।

অসংখ্য ছেঁড়া সুতো রয়েছে এই কেসে, কিশোর বলল। সব জোড়া দিতে। পারলে রহস্যের কিনারা করা যাবে না। অথচ কোনটার সঙ্গে কোনটার। যোগাযোগ দেখতে পাচ্ছি না এখনও{ দুদিন আগে যে অন্ধকারে ছিলাম এখনও তা-ই রয়েছি।

সোগামোসোও কোন সাহায্য করতে পারবে বলে মনে হচ্ছে না, মুসা বলল। ওখানে গিয়ে বৃদ্ধা মহিলার সঙ্গে এলেনা যোগাযোগ করার আগেই হয়ত এদিকে তার বাপ মরে ভূত হবে।

 স্বাভাবিক মৃত্য যদি হয়, বলল রবিন। বয়েসের কারণে। ও-কে, এর পর কি করব?

এলেনার মা পরামর্শ দিয়েছেন আইলিন লিসটারে খোঁজ নিতে, কিশোর বলল। লিসটারের বাড়িতে তো আর খোঁজা বাদ রাখিনি। এখন জাহাজটায় গিয়ে খুঁজলে মন্দ হয় না। কোথায় আছে ওটা এলেনা নিশ্চয় জানে।

জানতে পারে, মাথা দোলাল রবিন। আর ওখানে বিশপের বইটা খুঁজে বের করতে পারলে তার বাবা মুক্তি পাবে। লিসটারই তখন বলে দিতে পারবে বৃদ্ধা। মহিলাকে কোথায় পাওয়া যাবে, কোথায় মিলবে ঈশ্বরের অশ্রু।

সান্তা মনিকায় এলেনার মায়ের বাড়িতে ফোন করল কিশোর। ফোন ধরল। এলেনা। সে ওদেরকে বলল সেন্ট্রাল কোস্ট মেরিন করপোরেশনের ড্রাই ডকে রয়েছে ইয়টটা। ওটা একটা শিপইয়ার্ড, এলেনা বলল। বোটি ড্রাইভে। ফোন। করে আমি ওদেরকে বলে দিচ্ছি তোমরা যাচ্ছ। তোমাদের যাতে ইয়টে উঠতে দেয়া হয়।

মিনিট কয়েক পরেই কোস্ট হাইওয়ে ধরে সাইকেল চালিয়ে চলল তিন গোয়েন্দা। বিশ মিনিট একটানা প্যাড়াল করে এসে পৌঁছল বোটি ড্রাইভে।

তীর থেকে মাইলখানেকেরও বেশি সাগরের ভেতরে ঢুকে গেছে মানুষের তৈরি এক টুকরো জুমি। মাটি ফেলে ফেলে তৈরি করা। বিশাল এক দানবের আঙুল। যেন। আঙুলের মাথায় জেটি। একটা ইয়ট ক্লাব আর এক সারি দোকানপাট। জেটির দক্ষিণ পাশে। উত্তর পাশে কয়েকটা শিপইয়ার্ড। বড় রাস্তা থেকে প্রায়। কোয়ার্টার মাইল ভেতরে সেন্ট্রাল কোস্ট মেরিন করপোরেশন। ঝড়ের কবল থেকে রক্ষা করার জন্যে বেশ শক্ত বেড়া চারপাশ ঘিরে। গেটে পাহারা দিচ্ছে ইউনিফর্ম পরা দারোয়ান। গেটের পাশে ছোট গার্ডহাউসে বসে আছে সে।

গেটের কাছে এসে থামতে হল তিন গোয়েন্দাকে। পরিচয় দিল কিশোর।

হ্যাঁ, মিস লিটার ফোন করেছিলেন, দারোয়ান বলল। তবে বয়স্ক মানুষ আশা করেছিলাম আমি। যাকগে, মিস যখন বলেছেন, আমার কি এখানে সই করতে হবে। ঈশ্বরের অশ্রু

একটা নোটবুক বের করে দিল লোকটা। এক এক করে সই করল তিন গোয়েন্দা। তিনজনের নামের পাশে নোট লিখল দারোয়ান। তারপর তার পেছনের পেগবোর্ড থেকে একগোছা চাবি নিয়ে কিশোরের দিকে বাড়িয়ে ধরল, আইলিন লিসটারের কেবিন আর হুইলহাউসগুলোতে তালা দেয়া। এটা দরকার হবে।

ডানে দেখাল সে। ওদিক দিয়ে পথ। ওই যে স্কুনারটা, ওটার পাশ কাটিয়ে যেতে হবে। ওই যে, নিচের রঙ চেছে তুলে ফেলা হয়েছে যে। হ্যাঁ, তার পরেই রয়েছে আইলিন লিসটার। ড্রাই ডকে। বড় জাহাজ। কালো খেল। গলুইয়ের কাছে সোনালি রঙে নাম লেখা রয়েছে।

লোকটাকে ধন্যবাদ জানিয়ে সাইকেল চালিয়ে চলল তিন গোয়েন্দা। সাগর থেকে, আসছে তাজা বাতাস। মাথার ওপরে চক্কর দিচ্ছে গাল, কর্কশ চিৎকার করছে। বাতাসে শুকনো শ্যাওলা, ঝিনুক, মাছ আর জাহাজের রঙের মিশ্র গন্ধ। পানি থেকে মেরামতের জন্যে শুকনোয় তোলার পর খোলে লেগে থাকা শ্যাওলা। শুকিয়ে এক ধরনের শুঁটকি শুঁটকি গন্ধ ছড়াচ্ছে।

অনেক জাহাজের পাশ কাটাল ছেলেরা। বেশির ভাগই সেইলবোট। কাঠ আর ফাঁইবারগ্লাসে তৈরি বোটগুলো লম্বায় চল্লিশ থেকে ষাট ফুট। আইলিন লিসটার জাহাজটাকে অনেকটা আলাদা লাগল ওগুলোর তুলনায়, অন্য রকম। ছোট একটা ওশন লাইনার। কালো খোল। শরীরটা শাদা। বিলাসতরীর রূপ দিয়েছে। ইয়টটাকে।

খাইছে! বলে উঠল, মুসা। বুড়োটার রুচি আছে! বাড়িঘরগুলো অমন করে রাখে কেন? এখানে তো কিপটেমি নেই!

থাকবে কি করে, রবিন মন্তব্য করল। এটা কাজের জিনিস যে। কমপিউটার রুমটা দেখনি। কেমন ঝকঝকে তকতকে, দামী মেশিন।

সেইলবোটগুলোকে যেভাবে পানি থেকে টেনে তোলা হয়েছে সেরকম করে তোলা হয়নি এটাকে। কংক্রিটের মস্ত ট্রেঞ্চের ওপর দিয়ে ভাসিয়ে আনা হয়েছে, এটাকেই বলে ড্রাই ডক। ট্রেঞ্চের সাগরের দিকের বিশাল ওয়াটারপ্রুফ গেটগুলো বন্ধ, তালা দেয়া। জাহাজটাকে এখানে আনার পর দমকলের সাহায্যে সমস্ত পানি বের করে দেয়া হয়েছে। খটখটে শুকনো এখন খোলের নিচে। ড্রাই ডকের ভেতরে বিরাট বিরাট ইস্পাতের কাঠামোর ওপরে ডিমে তা দিতে বসা হাঁসের মত করে। যেন বসে রয়েছে আইলিন লিসটার।

সিঁড়ি উঠে গেছে জাহাজের ওপর। প্রথম ডেকে উঠল কিশোর। তারপর রবিন। আর মুসা।

সামনের দিকে এগোল তিনজনে। ব্রিজে ওঠার মই বেয়ে উঠে এল। চাবি বের করল কিশোর। এক এক করে তালায় ঢোকাতে শুরু করল। লেগে গেল একটা। হুইলহাউসের দরজা খুলল সে। ভেতরে ঢুকল ওরা। চারপাশে বড় বড় কাঁচের জানালা। বালি আর লবণ লেগে নোংরা হয়ে আছে। জানালার নিচে কেবিনেট, অনেক ড্রয়ার ওগুলোতে। অল্প আসবাবে সুন্দর করে সাজানো ঘরটা, জাহাজের হুইলহাউস যে রকম হয়।

আমি আশা করেছিলাম অগোছাল হবে, রবিন বলল। মিস্টার লিসটারের যা স্বভাব। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকার কথা সব।

জাহাজের ব্যাপারে হয়ত তার অন্য মনোভাব, কিশোর বলল। পুরনো জিনিস ছড়িয়ে রাখার জায়গা নয় জাহাজ।

কিংবা এমন কাউকে ক্যাপ্টেন বানিয়েছেন, মুসা বলল। যে নোংরামি একদম সইতে পারে না। তার সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে পারছেন না লিটার।

টান দিয়ে একটা ড্রয়ার খুলল কিশোর। সুন্দর করে একটার পর আরেকটা সাজিয়ে রাখা হয়েছে ম্যাপ। দ্রুত ওগুলো উল্টে দেখতে শুরু করল সে। সবই নটিক্যাল চাট, কোথায় প্রবাল প্রাচীর, কোথায় গভীরতা কম, এসব দেখানো রয়েছে। দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলের কাছের চার্ট ওগুলো।

সোগামোসোতে বন্দর নেই, রবিন বলল। ওখানে যেতে চাইলে স্থলপথে। যেতে হবে লিসটারকে। কিংবা ভেনিজুয়েলার কোন বন্দরে নেমে গাড়িতে করে।

আমরা এখানে সোগামোসো খুজুতে আসিনি, মনে করিয়ে দিল মুসা। এসেছি বিশপের বই খুজতে। সেটাই খোঁজা দরকার। কোথায় ওটা?

ভাল প্রশ্ন। একটা ড্রয়ার খুলল রবিন। আরেকটা। তারপর আরেকটা। ড্রয়ারের পর ড্রয়ার ঘেঁটে চলল, যা পেল, বেশির ভাগই চার্ট। আলমারিগুলোতে খুঁজছে মুসা। কিশোর খুঁজছে কয়েকটা খোলা তাকে। জাহাজ চালানোর ওপর কিছু বই পাওয়া গেল, আর কিছু যন্ত্রপাতি, কিন্তু বিশপের বইটা মিলল না। বিশপের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে, এরকম কিছুও না।

 হুইলহাউসের প্রতিটি ইঞ্চি খোঁজার পর বেরিয়ে এসে দরজায় তালা লাগিয়ে দিল কিশোর। দুই সহকারীকে নিয়ে মই বেয়ে আবার নেমে এল ডেকে। দুই ধারেই সারি সারি কেবিন রয়েছে। ওগুলোতে ঢুকে দেখতে লাগল ওরা।

 বেশির ভাগই মনে হল অব্যবহৃত। বাংক আর রেডগুলোতে চাদর বালিশ কিছুই নেই। উল্টে ফেলে রাখা হয়েছে ম্যাট্রেস। নাবিকদের কোয়ার্টারটা দেখে। মনে হল, অল্প কিছু দিন আগেও ব্যবহার করা হয়েছে। বাংকের নিচে একটা টি শার্ট দলা পাকিয়ে ফেলে রেখে গেছে একজন নাবিক। ময়লা ফেলার ঝুড়িতে পড়ে রয়েছে পোভা সিগারেটের গোড়া, দলা পাকানো কাগজ।

অবশেষে সবচেয়ে বড় একটা কেবিনে এসে ঢুকল গোয়েন্দারা। জানালায় পর্দা টানা। অন্ধকার হয়ে আছে ভেতরটা। দরজার পাশের সুইচ টিপল কিশোর। আলো জ্বলল না।

পাওয়ার নেই, বিড়বিড় করে বলল সে। আইলিন লিসটার এখন মরা। জাহাজ।

দরজার পল্লা পুরোটা খুলে দিল কিশোর। চওড়া একটা বিছানা প্লাস্টিকের চাঁদরে ঢাকা। চেয়ার আর টেবিলগুলোও ঢেকে রাখা হয়েছে একই রকম চাদর দিয়ে। কেবিনের একধারে রয়েছে অসংখ্য তাক। তাকের সামনের ধারগুলোতে নিচু রেলিঙ দেয়া, যাতে কোন জিনিস গড়িয়ে পড়তে না পারে।

একটা তাকে টর্চ দেখতে পেল কিশোর। নামিয়ে এনে জ্বালল। সারা ঘরে আলো বোলাল।

হ্যাঁ, এটাই লিসটারের ঘর, মুসা বলল।

তাকের ওপর যা থাকার কথা তা-ই রয়েছে। বই আর বই। যেখানেই ফাঁক। পাওয়া গেছে ঠেসে ভরে দেয়া হয়েছে কাগজপত্র। বইয়ের ফাঁকে টোল পড়ে যাওয়া দুটো টেনিস বলও ঢুকিয়ে রাখা হয়েছে। চামড়ার একটা দস্তানা ফেলে। রাখা হয়েছে একটা বাউলিং ট্রফির পাশে, আরনেস্ট জে. ক্র্যাবস নামে একজনকে ওটা পুরস্কার দিয়েছে ওয়েস্টসাইড কোলারস ক্লাব।

আরেকজনের পুরস্কার লিসটার রেখেছেন কেন? রবিনের প্রশ্ন।

এগিয়ে গেল কিশোর। ট্রফিটার দিকে চোখ। মেঝেতে স্তূপ করে রাখা জিনিসে পা বেধে হুমড়ি খেয়ে পড়ত আরেকটু হলেই। পেছনের দেয়াল থেকে টেনে সরিয়ে আনা হয়েছে একটা তাক। কাত হয়ে রয়েছে ওটা। বইপত্র মেঝেতে ছড়ানো। নিচু হয়ে স্কুপের সব চেয়ে ওপরের বইটা তুলে নিল কিশোর। অনেক পুরনো একটা বই। চামড়ায় বাধানো। শক্ত হয়ে গেছে পুট, ফলে খুলে ছেড়ে দিলেই ঝট করে বন্ধ হয়ে যায়, যেন স্প্রিং লাগানো রয়েছে।

আলো ফেলে ভাল করে দেখল কিশোর। ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে রইল কাভারের ডিজাইনটার দিকে। চোখা, উঁচু চূড়াওয়ালা একটা টুপির মত দেখতে। টুপিটার সামনের দিকে একটা ক্রস।

দুই সহকারীকে দেখাল ওটা সে। বিশপের টুপির মতই তো লাগছে। বিশপের বইটা বোধহয় খুঁজেই পেলাম অবশেষে।

দরজার দিকে ঘুরল সে। ডেকে ফিরে যাওয়ার জন্যে। বাধা পেল। দরজায় দাঁড়িয়ে রয়েছে একজন মানুষ। চওড়া কাধ। নীল রঙের ওয়র্ক শার্ট পরা।

ভালুকের থাবার মত বড় একটা হাত বাড়াল লোকটা। ওটা নিয়ে যেতে পারবে না এখান থেকে। দেখি, দাও!

বারো বিশালদেহী লোকটার পেছনে এসে হাজির হল আরও দুজন। চুপ করে থাকা ছাড়া আর কিছু করার নেই তিন গোয়েন্দার।

বইটা দিতে চাইল না কিশোর। তার হাত থেকে কেড়ে নিল বিশালদেহী লোকটা।

পেছনের একজনের হাতে একটা পাইপ। এক হাতে আলতো করে ধরে ওটার মাথা বাড়ি মারতে লাগল আরেক হাতের তালুতে। এমন ভঙ্গিতে কিশোরের দিকে। তাকাল, যেন তার মাথায় বাড়িটা মারতে পারলে খুশি হত।

বিরক্ত করে ফেলেছে, লোকটা বলল। কি করে যে বেড়া ডিঙিয়ে চলে আসে! আর এলেই কেবল চুরির তাল! এবার আর ছাড়ছি না। চুরির মজা এবার টের পাবে।

আমরা চোর নই, জবাব দিল কিশোর। মিস এলেনা লিসটারের অনুরোধে এসেছি। গেটে সই করেছি। দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করতে পারেন।

সন্দেহ ফুটল লোকগুলোর চোখে। একজনও স্বীকার করতে রাজি নয়, ভুল করেছে।

আমাদের কিছু হলে মিস লিসটারের কাছে জবাব দিতে হবে আপনাদেরকে, গম্ভীর কণ্ঠে বলল আবার কিশোর।

এবং শুধু দিয়েই পার পাবেন না, আরেকটু ঘাবড়ে দেয়ার জন্যে বলল মুসা, আরও ভোগান্তি আছে।

সেটা বুঝতে পেরে রবিন বলল, পুলিশ চীফ ইয়ান ফ্লেচার আমাদের বন্ধু। যান। বিশ্বাস না করলে থানায় ফোন করে দেখতে পারেন। কিশোর পাশা, মুসা আমান আর রবিন মিলফোর্ডকে চেনে কিনা জিজ্ঞেস করুন।

কি বল, ডিক? পাইপওয়ালা লোকটার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল। একজন।

আমাদের বোকা বানাচ্ছে, বলল বিশালদেহী ভালুক। কিন্তু গলায় জোর নেই। তাকিয়ে রয়েছে গেটের দিকে, যেখান দিয়ে ঢুকেছে ছেলেরা।

শিওর হওয়া দরকার, বলল তৃতীয়জন। আগেই কিছু করা উচিত হবে না। গেটে যাওয়ার জন্যে রওনা হল সে।

অপেক্ষা করতে লাগল অন্য দুজন। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ফিরে এল। লোকটা। সঙ্গে এসেছে দারোয়ান। ছেলেদের দিকে তাকিয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, হ্যাঁ, এরাই। আধ ঘন্টা আগে ঢুকতে দিয়েছি।

 তাই, সাংঘাতিক নিরাশ হল যেন বিশালদেহী লোকটা। কিছু কিলচড় দেয়ার জন্যে হাত নিশপিশ করছিল বোধহয়। সেটা আর পারল না। বেশ। কর, যা করছিলে।

বইটা দিন, হাত বাড়াল কিশোর।

সরি! বইটা ফেরত দিল লোকটা। ভুল হয়ে গেছে। অনেক চোরছ্যাচড়। আসে তো, বড় জ্বালাতন করে।

চলে গেল লোকগুলো। লোহালক্কড়ের জঙ্গলে ওরা হারিয়ে না যাওয়া তক অপেক্ষা করল ছেলেরা। তারপর লম্বা দম নিয়ে হাতের রইটার দিকে তাকাল। কিশোর।

তুমি কাঁপছ, মুসা বলল।

দূর! মনে মনে ধমক দিয়ে হাতটাকে কাঁপতে নিষেধ করল কিশোর। ধাপ্পা দিচ্ছিল লোকগুলো। কিছুই করত না।

বইটার মলাট ওলটাল সে। ভয় হল পাতা খুলে ছড়িয়ে যাবে, কিন্তু গেল না। শুকিয়ে খসখসে হয়ে আছে। বেশি জোরে চাপ লাগলে মুড়মুড় করে ভেঙেও যেতে পারে, এমনই মনে হল তার কাছে। বইয়ের মাঝের কয়েকটা পাতা নেই। কেটে নেয়া হয়েছে।

এটা একটা ডায়রি, ঘোষণা করল যেন গোয়েন্দাপ্রধান। কিংবা ডায়রির মতই কিছু। হাতে লেখা। তারিখ রয়েছে। শুরু হয়েছে এনিরো দিয়ে। স্প্যানিশে জানুয়ারিকে এনিরো বলে। জানুয়ারির পয়লা তারিখে বিশপ সান্তাফে বোগোটা নামে একটা জায়গায় গিয়েছিল…

বোগোটা! প্রায় চিৎকার করে বলল রবিন। ওটা তো কলাম্বিয়ায়! তাহলে সোগামোসোর সঙ্গে একটা যোগাযোগ পাওয়া গেল। সোগামোসোও কলাম্বিয়ায়।

ঠিক! শান্ত থাকার চেষ্টা করছে কিশোর, কিন্তু পারছে না, চকচক করছে চোখ। এখন আর স্বীকার করতে বাধা নেই ডেভিড লিসটারের গায়েব হওয়ার সঙ্গে ওই কমপিউটারের মেসেজেরও সম্পর্ক রয়েছে। হয়ত ওটাই আসল কারণ।

কিন্তু বইটার ব্যাপারে কি হবে? মুসার প্রশ্ন। কিশোর, কি আছে, বলত?

 ভ্রূকুটি করল কিশোর। অনেক শব্দই অপরিচিত। লেখাও আবছা। আর এত ঘন, মাঝে মাঝে দুটো লাইন প্রায় এক হয়ে গেছে। আমার পড়ার সাধ্য হবে না, বলল সে। ইংরেজি হলেও পারতাম না, যা অবস্থা।

কিশোরের কাঁধের ওপর দিয়ে তাকাল রবিন। হ্যাঁ। পুরনো দলিলের মত। যেগুলোতে এস লিখলে এফ-এর মত লাগে।

তাহলে আর এখানে দাঁড়িয়ে আছি কেন? মুসা বলল, জলদি চল, প্রফেসর সাইনাসের কাছে চলে যাই। ডক্টর ওয়ালটার সাইনাস, রুক্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসের প্রফেসর, স্প্যানিশ আর মেকসিকান ইতিহাস বিশেষজ্ঞ। বিখ্যাত চিত্র পরিচালক মিস্টার ডেভিস ক্রিস্টোফারের বন্ধু। আগেও অনেক সাহায্য করেছেন তিন গোয়েন্দাকে।

তার কাছে গেলেই ভাল হয়, কিশোর বলল। তবে বইটা নিতে হলে। এলেনার অনুমতি দরকার। আমাদেরকে বইটা খুঁজে দিতে অনুরোধ করেছে সে, যাতে ওটা দিয়ে তার বাবাকে উদ্ধার করে আনতে পারে কিডন্যাপারদের হাত থেকে। হয়ত বইটা নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই তার। বাবাকে উদ্ধার করতে পারলেই খুশি।

তা বটে, একমত হল মুসা। কেসটা এমনই, মাঝে মাঝেই আমি, কিডন্যাপিঙের কথা ভুলে যাই। অথচ ওটাই আসল ব্যাপার।

 মাথা ঝাঁকাল কিশোর। লিটারের কেবিনের দরজায় তালা লাগিয়ে দিল। গেটে এসে চাবির গোছা বুঝিয়ে দিল দারোয়ানকে। তারপর চলল একটা পে ফোন খুঁজে বের করতে। এলেনার মায়ের বাড়িতে ফোন করে এবার আর তাকে পেল না। জবাব দিল আনসারিং মেশিন। একটা মেসেজ রেখে দিয়ে, রকি বীচে লিসটারের বাড়িতে ফোন করল কিশোর।

ফোন ধরল মিসেস বেকার। বলল, ধর। আমি ডেকে আনছি ওকে।

এলেনা লাইনে এলে তাকে সব কথা খুলে বলল কিশোর। দীর্ঘ একটা মুহূর্ত যেন স্তব্ধ হয়ে রইল সে, যেন খবরটা হজম করতে সময় লাগছে, তারপর বলল, থ্যাঙ্ক গুডনেস!

 বইটা কেন এত জরুরী, কিশোর বলল, বের করতে চান? নাকি শুধু পেলেই খুশি, কিডন্যাপারদের দিয়ে দেবেন?

দ্বিধা করল এলেনা। সময় কম। আবার ফোন করেছিল লোকটা। তাকে বলেছি বইটা খোঁজার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি আমরা। আর মাত্র একদিন সময় দিয়েছে।

 তার মানে আগামী কাল পর্যন্ত সময় পাচ্ছি, খুশি হয়ে উঠল কিশোর। ডক্টর সাইনাসের কথা বলল। তিনি হয়ত পড়ে দেবেন। আর তার সময় না থাকলে অন্য কারও কাছে পাঠাবেন। তো বইটা কি নিয়ে যাব?

নিতে পার। আরেক মুহূর্ত দ্বিধা করল এলেনা। সেটাই বোধহয় ভাল হবে। কি জিনিসের জন্যে আব্বাকে আটক করেছে ওরা জানার আগ্রহটা চেপে রাখতে। পারছি না। লেগে যাও কাজে। এছাড়া আর কিছু করারও নেই এখন আমাদের। বইটা যে পেয়েছি লোকটাকে জানানোর উপায় নেই। সে ইচ্ছে করে যখন ফোন। করবে তখন বলতে পারব। তার আগে সম্ভব না।

একটা সেকেণ্ড বিরতি দিয়ে আবার বলল এলেনা, আর বাড়িতে এখন বইটা রাখতেই সাহস পাচ্ছি না আমি। যেটার জন্যে আব্বা কিডন্যাপড় হয়েছে সেটার জন্যে আমারও ক্ষতি করতে পারে অন্য কেউ, বলা যায় না। কাল রাতে কেউ ঢুকেছিল এ বাড়িতে। আমার ঘর, আলমারি, ড্রয়ার সব খুঁজেছে। মনে হচ্ছে চাবি আছে লোকটার কাছে। আব্বাকে ধরে নিয়ে গিয়ে হয়ত তার কাছ থেকে আদায় করেছে। ইচ্ছে মত আসাযাওয়া করতে পারছে এখন লোকটা।

একজন চাবিওয়ালাকে ডাকন, পরামর্শ দিল কিশোর। তালাগুলো বদলে দিয়ে যাক। এভাবে চলতে পারে না। ঠিক আছে, আমরা প্রফেসর সাইনাসের। ওখানে যাচ্ছি। কিছু জানতে পারলে আপনাকে জানাব।

রুক্সটনে প্রফেসর সাইনাসকে ফোন করল কিশোর। ভাগ্য ভাল। গরমের ছুটি শুরু হয়ে গেছে, তবু অফিসেই পাওয়া গেল প্রফেসরকে। নিয়মিত অফিসে আসেন। তিনি ছুটিতেও। ছেলেদের জন্যে অপেক্ষা করতে রাজি হলেন।

তাড়াতাড়ি ইয়ার্ডে ফিরে এল তিন গোয়েন্দা। রাশেদ চাচাকে অনুরোধ করল। পিকআপটা দেয়ার জন্যে। তিনি তখন বেরোচ্ছিলেন, তিন গোয়েন্দাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে নামিয়ে দিয়ে যেতে রাজি হলেন। সেখান থেকে কাজে চলে যাবেন। ফেরার পথে সুযোগ পেলে আবার তুলে নেবেন ওদেরকে। আপাতত এই ব্যবস্থাই মেনে নিতে হল কিশোরকে।

একজন বন্ধুর সঙ্গে অফিসে বসে রয়েছেন প্রফেসর সাইনাস। তার বন্ধুটি ভীষণ রোগা। চকচকে টাক। ইনি ডক্টর ক্রুগার মনটাগো, পরিচয় করিয়ে দিলেন তিনি। আমাদের ডিপার্টমেন্ট অভ রোমান্স ল্যাঙ্গুয়েজের হেড। তোমাদের জন্যেই বসিয়ে রেখেছি। পুরনো স্প্যানিশ পাণ্ডুলিপির প্রতি তাঁর সাংঘাতিক আগ্রহ।

হাসিতে দাঁত বেরিয়ে পড়ল কিশোরের। এরকম একজনকেই আশা করছিল মনে মনে। প্রফেসর সাইনাসের চেয়ে ডক্টর মনটাগোকে দিয়ে বেশি সাহায্য হবে, বুঝতে পারছে সে। বিশপের বইটা বের করে বাড়িয়ে দিল ভক্টরের দিকে।

বই খুলে প্রথম পৃষ্ঠাটার দিকে চেয়েই বলে উঠলেন তিনি, বাহ! পাতার পর। পাতা ওল্টাতে থাকলেন তিনি। হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে মুখ। সাংঘাতিক জিনিস!

কি স্যার? জানতে চাইল কিশোর।

পয়লা জানুয়ারি, সান্তা ফে বোগোটায়, আবার প্রথম পৃষ্ঠায় ফিরে এলেন, মনটাগো। লেখক নিউ গ্রানাডার মানুষের জন্যে ঈশ্বরের কাছে দোয়া করছেন। বলছেন যেন তাদের চেষ্টা সফল হয়। তারপর রয়েছে একটা চিঠির কথা। প্রাসাদে অপেক্ষা করছিল হিজ মোস্ট গ্রেশাস ম্যাজেসটি কিং কার্লোসের চিঠিটা।

বই থেকে মুখ তুললেন ডক্টর। এ তো একটা গুপ্তধন পেয়ে গেছ। এই জার্নালের লেখক সম্ভবত বিশপ ছিলেন। একটা প্রাসাদের কথা লিখেছেন তিনি। আসলে বলতে চেয়েছেন প্যালেস। বিশপের বসত বাড়িকে প্যালেসই বলে। তার কাছে চিঠি লিখতেন রাজা। ওই বিশপ সাধারণ পাদ্রী হলে এভাবে তাঁর কাছে লেখার কথা নয় রাজার। সেটা অবশ্য জানা যাবে একটু পরেই। এসব পুরনো লেখা থেকে তথ্য খুঁজে বের করার কায়দা আছে। কাগজ, কালি এসব পরীক্ষা করে দেখতে হবে। মনে হচ্ছে ডায়রিটা এনরিক জিমিনির, রক্তাক্ত বিশপ বলা হত যাকে!

রক্তাক্ত বিশপ? প্রতিধ্বনি করল যেন কিশোর।

 ঢোক গিলল মুসা। কিছু হয়েছিল নাকি তার?

আসলে, আমাদের সবারই কিছু না কিছু ঘটে, ডক্টর মনটাগো বললেন। জীবন হল একটা সাময়িক ব্যাপার। তাই মৃত্যু থেকে মুক্তি নেই কারও। রক্তাক্ত বিশপের ঠাণ্ডা লেগেছিল। তখনকার দিনে ঠাণ্ডা ছিল মারাত্মক অসুখ। সহজেই নিউমোনিয়ায় রূপ নিয়ে শেষ করে দিত মানুষকে। শোনা যায়, অসুস্থতার সময় তাকে এড়িয়ে চলেছিল তার একজন চাকর। ইচ্ছে করেই। যাতে তার মৃত্যটা তাড়াতাড়ি হয়। তবে নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারে না একথা। সন্দেহটা গাঢ় হয় একটা ব্যাপার থেকে, বিশপের মৃত্যুর পর পরই পালিয়েছিল সেই চাকর। প্রতিদিন জার্নাল লিখতেন বিশপ জিমিনিজ, কিন্তু তাঁর সেই জার্নাল পাওয়া যায়নি।

প্রফেসর সাইনাস দরাজ হাসি হাসলেন তিন গোয়েন্দার দিকে তাকিয়ে। যাও, পেয়ে গেলে আরেকটা রহস্য। পুরনো রহস্য খুঁচিয়ে বের করতে তো ওস্তাদ তোমরা। বেশি না, মাত্র চারশো বছরের পুরনো এই ঘটনা। সূত্রটুত্র এখনও নিশ্চয় কিছু পাবে।

স্বর্ণ জড়িত থাকতে পারে এতে, মনটাগো বললেন। ছেলেদের দিকে তাকালেন। দক্ষিণ আমেরিকায় এসে ঢুকল স্প্যানিশ সৈন্যরা। মার্চ করে এগিয়ে। চলল। চলার পথে যত জমি পড়ল, সব দখল করে নিল রাজা আর রানীর নামে। সোনাও পাওয়া যেত মাঝে মাঝে। জাহাজ বোঝাই করে সেসব সোনাচালান যেত স্পেনে। মূল্যবান, যা কিছু পেয়েছে নিয়ে গেছে স্প্যানিশরা। জোর করে ধরে এনে ইনডিয়ানদেরকে খনির কাজ করতে বাধ্য করেছে। শোনা যায় সোনার খনিতে যে। সব ইনডিয়ানরা কাজ করত তাদের ওপর ভয়াবহ অত্যাচার করেছেন বিশপ জিমিনিজ। সে জন্যেই তার নাম হয়ে গিয়েছিল রক্তাক্ত বিশপ…

ও, কথাটা শোনামাত্রই বিশপের ওপর থেকে শ্রদ্ধা চলে গেল রবিনের। এই ব্যাপার। তাহলে তো তার নাম রাখা উচিত ছিল রক্তখেকো বিশপ।

তবে সত্যিই তিনি অত্যাচারী ছিলেন কিনা জানা যায়নি, মনটাগো বললেন। হতে পারে রাজার লোকেরাই গিয়ে মিথ্যে কথা ছড়িয়েছে। খনির ওভারশিয়ার নিজেই হয়ত ওসব অত্যাচার করেছে, দোষ দিয়েছে বিশপের। শত শত বছর পরে এখন আর কে ঠিক করে করে বলবে?

যাই হোক, বিশপ নাকি পরে নিজের ভুল বুঝতে পেরে অনুতপ্ত হয়েছেন। বৃদ্ধ বয়েসে ইনডিয়ানদের সঙ্গে ভাব করে অতীত পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে চেয়েছেন। লোকে মানুষের ভালটার চেয়ে খারাপটাই বেশি দেখে। ভাল বেশি। হলেও দেখে না, খারাপ কম হলেও সেটা মনে রেখে দেয়। রক্তাক্ত বিশপের বেলায়ও এই ব্যাপারই ঘটেছে। তার কুকর্মগুলোর কথাই বেশি মনে রেখেছে লোকে।

নীরব হয়ে রইল ছেলেরা। ভাবছে সেই চারশো বছর আগের ঘটনার সঙ্গে বর্তমান লিসটার কিডন্যাপিঙের কি যোগাযোগ?

অবশেষে জিজ্ঞেস করল কিশোর, বিশপ জিমিনিজের জার্নালটা কি খুবই দামী কিছু? যেটা খোয়া গেছে?

দ্বিধায় পড়ে গেলেন ডক্টর মনটাগো। দামী? তা সবার জন্যে না-ও হতে পারে। স্কলার আর ঐতিহাসিকদের কাছে হয়ত অমূল্যই হবে, কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে নয়। এই যেমন ম্যাগনা কার্টা-র লেখার খসড়া, কিংবা কলম্বাসকে লেখা রানী ইসাবেলার চিঠির মত অনেক দামে বিক্রি হবে না এটা।

বইটা বগলদাবা করলেন মনটাগো। কিন্তু একজন স্কলারের কাছে? অসাধারণ! আমি আর থাকতে পারছি না। এখনই গিয়ে অনুবাদে বসতে চাই…

না না! রবিন বলল।

সময় পাবেন না! বলল মুসা।

 মানে? হাসি মুছে গেছে মনটাগোর।

এর বর্তমান মালিক কিডন্যাপড হয়েছেন, বুঝিয়ে বলল কিশোর। তাঁকে মুক্তি দেয়ার বিনিময়ে এই বইটা দাবি করেছে কিডন্যাপার। কালকের মধ্যে না দেয়া গেলে কি করে বসে ঠিক নেই।

ও, চিন্তায় পড়ে গেলেন যেন ডক্টর। পরক্ষণেই উজ্জ্বল হল মুখ। তাহলে…ফটোকপি করার সময়…নাহ, হবে না। এরকম বই সাধারণ জেরোক্স মেশিনে করা যাবে না। ল্যাবরেটরিতে পাঠাতে হবে। বিশেষ ব্যবস্থায় ফটোকপি করে নেবে ওরা।

বগলের নিচ থেকে বইটা বের করে ওটার দিকে এমন দৃষ্টিতে তাকালেন ডক্টর। যেন ওটা একটা মহামূল্যবান বস্তু। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাড়িয়ে দিলেন বলে কিশোরের দিকে।

আশা করি, বললেন তিনি। আর এটা নিখোঁজ হবে না। কোনভাবে বাঁচাতে যদি পার…।

চেষ্টা তো নিশ্চয় করব, স্যার, আশ্বাস দিল কিশোর। আর রাখতে পারলে অনুবাদের জন্যে আপনাকেই প্রথম দেব।

দরজার দিকে চলল তিন গোয়েন্দা। হঠাৎ ফিরে তাকাল কিশোর, আচ্ছা, ঈশ্বরের অশ্রুর কথা আপনি কিছু জানেন, স্যার?

ঈশ্বরের অশ্রু? ভুরু কোচকালেন মনটাগো। পান্নার ওই নাম রেখেছে ইনডিয়ানরা। কেন? তার সঙ্গে এই বইয়ের কোন সম্পর্ক আছে?

থাকতে পারে!

Categories: