৪. গুপ্তধন খুঁজতে গুহায়

0 Comments

চোরটা কি চায়? ভারি গলায় জিজ্ঞেস করল জিম। তোমাদেরকে এখানে নিয়ে এসেছে কেন?

কিছুই চায় না, গম্ভীর হয়ে বলল কিশোর। ও আনেনি আমাদেরকে, নিজেরাই এসেছি। গুহাটা দেখতে।

কিশোরের দিকে চাইল একবার জিম। নরম হল গলার স্বর, ছেলেটা ভাল না। পাকা চোর, হাতেনাতে কেউ ধরতে পারেনি। আজ পর্যন্ত। ওর কাছ থেকে দূরে থাকার পরামর্শই দেব আমি। এখন এসো। জোসেফ গ্র্যাহাম ফিরে এসেছে। তোমাদেরকে যেতে বলেছে।

ক্যাম্পের দিকে রওনা হল ওরা। রাগ পড়ে গেছে জিমের, অন্তরঙ্গ হয়ে উঠছে ছেলেদের সঙ্গে।

গুহায় কেন গিয়েছিলে? এক সময় জিজ্ঞেস করল জিম। গুপ্তধন খুঁজতে? কিছু নেই। সাগরের তলায় ছড়িয়ে গেছে মোহর। কোনদিনই আর পাওয়া যাবে না। তন্ন তন্ন করে খুঁজেছে লোকে, পায়নি। কচিত কখনও এক-আধটা মোহর সৈকতে পড়ে থাকতে দেখা যেত আগে। আজকাল আর তা-ও দেখা যায় না। হাসল গার্ড। সাগরদেবতা কোন জিনিস নিলে আর ফেরত দেয় না। এই তো, বছর দুই আগে, দশ লাখ ডলার নিল…

দশ লাখ ডলার! ভুরু কুঁচকে গেছে কিশোরের।

হ্যাঁ, অকেজো বাঁ হাত দেখিয়ে বলল জিম। ওই টাকার জন্যেই আমার হাতটা গেল…

কৌতূহলী হয়ে পড়ল তিন গোয়েন্দা। কাহিনীটা শোনাতে অনুরোধ করল জিমকে।

এক পরিবহন কোম্পানিতে চাকরি করতাম। সে সময়। টাকা-পয়সা কিংবা মূল্যবান জিনিসপত্র এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব নিত কোম্পানি। আমি ছিলাম একটা আমার কারের গার্ড। ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে পৌঁছে দিতে হত বিভিন্ন জায়গায়। কিছু নিয়মিত কাজ ছিল। তার মধ্যে একটাঃ প্রাইভেট ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিয়ে মেলভিলের ন্যাশনাল ব্যাংকে জমা দিয়ে আসা। দিয়ে আসতাম। ঠিকঠাক মতই চলছিল সব। নির্দিষ্ট কোন একটা পথে চলাচল করতাম না আমরা।

আজ এ পথে গেলে পরের বার অন্য পথে, তারপরের বার আরেক পথে। নির্দিষ্ট কোন সময়ও মেনে চলতাম না। ডাকাত লুটেরাকে ফাঁকি দেবার জন্যেই এই সাবধানতা। কিন্তু তারপরেও একদিন ঘটে গেল। অঘটন…

জিমের কথা থেকে জানা গেল, ঘটনার দিন, ফিশিংপোটের এক ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে মেলভিলে চলেছিল আর্মর কার। গাড়িতে দুজন লোক। ড্রাইভার আর জিম। পথে এক জায়গায় গাড়ি থামিয়ে দুপুরের খাবার খেতে নামল দুজনে। গাড়িটা পথের পাশে পার্ক করে তালা লাগাল সিন্দুকে। তারপর ঢুকল রেস্টুরেন্টে। বসল গিয়ে জানালার কাছে, ওখান থেকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল গাড়িটা।

খাওয়া শেষ করে বেরোল দুজনে। হঠাৎ পাশের একটা পুরানো সিডান গাড়ি থেকে বেড়িয়ে এলো মুখোশপরা দুজন লোক। হাতে রভলভার। ড্রাইভারের পায়ে গুলি করল। একজন। আরেকজন বাড়ি মোরল জিমের কাঁধে, মাথায়। সঙ্গে সঙ্গে বেহুশ হয়ে পড়ল জিম।

গার্ডের পকেট থেকে সিন্দুকের চাবি বের করে নিলো ডাকাতেরা। আমার কারে উঠে বসল। গুলির শব্দ কানে গিয়েছিল একজন কনস্টেবলের। ছুটে এলো সে। গুলি করল দুই ডাকাতকে লক্ষ্য করে। একজনের হাতে গুলি লাগল। গাড়ি নিয়ে পালিয়ে গেল। ডাকাতেরা।

পুলিশ স্টেশনে ফোন করে দিল কনস্টেবল। সাড়া পড়ে গেল। রোড ব্লক করে দিল পুলিশ। কড়া পাহারা বসে গেল রাস্তায় রাস্তায়।

সাঁঝের একটু পরে পাওয়া গেল গাড়িটা, রক্তাক্ত। খালি। একটা পরিত্যক্ত বোট হাউসের কয়েক মাইল দূরে। বোঝা গেল, জলপথে পালিয়েছে ডাকাতেরা।

মাঝরাতে কোস্ট গার্ডদের পেট্রল বোট একটা সাধারণ বোটিকে ভাসতে দেখল উপসাগরে, কঙ্কাল দ্বীপের কাছাকাছি। বোটের একজন কি যেন ফেলছে পানিতে। তাড়াতাড়ি কাছে চলে এলো কোস্ট গার্ডের বোট। দুজন লোক অন্য বোটটাতে। দুই ভাই, ডিক এবং বার্ড ফিশার। দুজনেই খুব ক্লান্ত, হাল ছেড়ে দিয়েছে। বাডের বাহুতে গুলির ক্ষত, রক্ত ঝরছে। লুট করা টাকার একটি নোটও পাওয়া গেল না বোটে।

ব্যাপারটা বুঝেছ তো? নোটের বাণ্ডিল পানিতে ফেলে দিয়েছিল দুই ডাকাত। অনেক খোঁজাখুঁজি করা হয়েছে। পরে, কিন্তু একটা নোটও আর পাওয়া যায়নি। পানিতে ভিজে নিশ্চয় গলে—ছিড়ে গিয়েছিল কাগজের নোট।

টাকা ফেরত দিল না। তা ব্যাটাদের জেল হয়েছিল তো?

হয়েছিল। হোভারসনের রিভলভারের বুলেটে আহত হয়েছে বাড। কিন্তু বিমল ধরা যায়নি, তাই মাত্র চার বছর করে জেল হয়ে গেল দুই ভাইয়ের। জেলখানায় ভাল ব্যাবহারের জন্যে অর্ধেক শান্তি মওকুফ করে। দেয়া হয়েছে ওদের। ছাড়া পেয়েছে হপ্ত দুয়েক আগে। কিন্তু আমার হাত আর ফিরে পেলাম না, জিমের কণ্ঠে ক্ষোভ। কাজও গেল কোম্পানি থেকে। এরপর আর ভাল কোন কাজ পাইনি আজ পর্যন্ত। ইচ্ছে করে, ব্যাটাদেরও হাত ভেঙে দিই…

মুসার বাবা দাঁড়িয়ে আছেন জেটিতে। মোটর বোটে ডুবুরির পোশাক আর অন্যান্য যন্ত্রপাতি তুলছে জোসেফ গ্র্যাহাম।

এই যে, তিন গোয়েন্দাকে দেখে বলে উঠলেন মিস্টার আমান। যাও, বোটে উঠে পড়। চোখ বুজে নির্ভর করতে পার জোসেফের ওপর। খুব ভাল ডুবুরি।

ছেলেদেরকে বোটে তুলে দিয়ে চলে গেলেন মুসার বাবা।

বোট ছাড়ল জোসেফ গ্র্যাহাম। বেশ বড়সড় বোট। এক জায়গায় স্তুপ করে রাখা ডুবুরির সাজ-সরঞ্জাম। ওগুলো দেখিয়ে বলল জোসেফ, আধুনিক জিনিস। খুব ভাল। তো, ডুবুরির কাজ কেমন জান-টান?

মুসা জানাল, প্রাথমিক পরীক্ষায় পাশ করেছে ওরা। সুরকেল ব্যবহার করতে জানে ভালই।

গুড, খুশি হয়ে বলল জোসেফ। এ-বি-সি-ডি থেকে আর শুরু করতে হল না।

দ্রুত এগিয়ে চলেছে বোট। হলুদ একটা বিয়ার কাছে এসে থামিয়ে দিল জোসেফ। নোঙর ফেলল। বলল, আমাদের নিচে একটা ভাঙা জাহাজ আছে। না না, কোন গুপ্তধন নেই। ড়ুবে যাওয়া বেশ কয়েকটা জাহাজ আছে। এদিককার পানিতে। সব কটাই তন্ন তন্ন করে খুঁজেছে ডুবুরিরা। আমাদের নিচে আছে একটা স্প্যানিশ ইয়ট, অনেক বছর আগে ড়ুবেছে। এখানে মাত্র পঁচিশ ফুট গভীর পানি। নিশ্চিন্তে ডুব দিতে পাের। ডিকম্প্রেশনের ভয় নেই।

ফেস মাস্ক আর ফ্লিপার পরে নিলো ছেলেরা। টেনেন্টুনে পরীক্ষা করে দেখল জোসেফ। ঠিকমতই পরা হয়েছে। একটা আলমারি খুলে গ্যাস ট্যাংক, হোস কানেকশন আর ভারি ডাইভিং বেল্ট বের করল সে। বলল, এখানকার পানি খুব ভাল। পরিষ্কার, গরম। ওয়েটসুট পরার দরকার নেই। রবিন, প্রথমে তুমি চল আমার সঙ্গে। সব সময় কাছাকাছি থাকবে, আলাদা হবে না। মুহূর্তের জন্যেও। বুঝেছ?

মাথা কাত করে সায় দিল রবিন।

গ্যাস ট্যাংক, বেল্ট বাড়িয়ে দিল জোসেফ। এগুলো পরে নাও।

পরে নিতে লাগল রবিন। তীক্ষ্ম চোখে তার দিকে চেয়ে রইল জোসেফ। নাহ, পরতে জানে ছেলেটা। ভালই শিক্ষা দিয়েছে ইনস্ট্রাকটর, ভাবল সে।

বোটের পাশ থেকে ঝুলে আছে দড়ির সিঁড়ি। সিঁড়ি বেয়ে পানিতে নামল জোসেফ। সাগরের দিকে পিঠি দিয়ে হাত ছেড়ে দিল সিড়ি থেকে। ঝুপ করে পড়ল চিত হয়ে। ড়ুবে গেল। তার পর পরই একই কায়দায় ডুবল রবিন।

ফ্লিপার নেড়ে দ্রুত ড়ুবে চলল। জোড়া লেগে গেছে পায়ের ভাঙা হাড়। কোন অসুবিধে হচ্ছে না। সাঁতরাতে। কুসুম গরম পানি। স্বচ্ছ। খুব ভাল লাগছে তার।

নতুন এক পৃথিবীতে এসে প্রবেশ করেছে যেন। নিচে একটা বিশাল কালো ছায়া! ড়ুবে যাওয়া ইয়ট। জোসেফের পাশাপাশি জাহাজটার দিকে নেমে চলল রবিন।

কাত হয়ে পড়ে আছে। ইয়ট। সামনের দিকে বিরাট এক ফাটল হাঁ করে আছে। আরও কাছে গিয়ে দেখা গেল, শ্যাওলায় ঢেকে আছে জাহাজের গা। আশেপাশে সাঁতরে বেড়াচ্ছে ছোট ছোট মাছ।

রবিনের আগে আগে সাঁতরাচ্ছে এখন জোসেফ। ফ্লিপার নেড়ে চলে গেল জাহাজের ওপর দিয়ে, পেছন দিকে।

দুটো বড় গলদা চিংড়ির ওপর নজর আটকে গেল। রবিনের। আরও কাছ থেকে দেখার জন্যে এগিয়ে গেল। হঠাৎ জোরে ঝাঁকুনি লাগল পায়ে। থেমে যেতে হল।

কিছু একটা শক্ত করে চেপে ধরেছে তার ডান পা।

পানির তলায় এই প্রথম বিপদে পড়ল রবিন। আতঙ্কিত হয়ে পড়ল। জোরে লাথি মেরে পা ছাড়ানোর চেষ্টা করল। পারল না। চাপ বাড়ল পায়ে। পেছনে টানছে।

পেছনে ফিরে চাইতে গেল রবিন। ফেস মাস্কে হাত লেগে গেল। নিজের অজান্তেই। সঙ্গে সঙ্গে যেন অন্ধ হয়ে গেল সে, সামনের কিছুই দেখা যাচ্ছে না। পানি ঢুকে পড়েছে মাস্কের ভেতর। উত্তেজনায় ভুলে গেল, কি করে পানি বের করে দিতে হয়।

হঠাৎ কাঁধ চেপে ধরল। কেউ। চমকে উঠল রবিন। ধরেই নিলো, দানবটা এবার শেষ করতে এসেছে তাকে। কিন্তু না, পিঠের ট্যাংকে তিন বার আলতো টোকা পড়ল। জোসেফ ফিরে এসেছে তাকে উদ্ধার করতে।

শান্ত হয়ে এলো রবিন। উত্তেজনা আর আতঙ্ক চলে গেল। মনে পড়ল, কি করে পানি বের করে দিতে হয়।

মাথা ডানে ঘোরােল রবিন। আস্তে করে এক আঙুলে চাপ দিল মাস্কের বা পাশে। সামান্য ফাঁকা হল মাস্ক। জোরে শ্বাস ফেলল। সে। বুদবুদ তুলে বেরিয়ে গেল বাতাস, সঙ্গে নিয়ে গেল মাস্কের ভেতরের পানি। আঙুল সরিয়ে আনতেই আবার জায়গামত বসে গেল মাস্ক। অন্ধকার সরে গেল চোখের সামনে থেকে।

প্রথমেই জোসেফের ওপর চোখ পড়ল। রবিনের। এদিক ওদিক মাথা নাড়ছে লোকটা। আঙুল তুলে পেছনে দেখাল। ফিরে চাইল রবিন। হায় হায়, এর জন্যেই এত ভয় পেয়েছে সো জাহাজের একটা দড়ি পেচিয়ে গেছে তার পায়ে।

বাঁকা হয়ে দড়ি ধরল রবিন। খুলে ফেলল। পা থেকে। নিজের ওপরই রাগ হচ্ছে। অযথা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। কয়েক ফুট দূরে সরে গেছে জোসেফ। হয়ত এখুনি ওঠার ইঙ্গিত করবে।

কিন্তু না, উঠল না জোসেফ। ডান হাতের বুড়ো আঙুল আর তর্জনীর মাথা এক করে একটা রিং তৈরি করল। দেখাল। রবিনকে। তার মানে, সব কিছু ঠিকঠাকই আছে। পাশে চলে এলো রবিন। দুজনে সাঁতরে চলল অ্যাবার।

পুরো জাহাজের সামনে থেকে পেছনে একবার সাঁতরাল ওরা। তারপর চারদিকে এক চক্কর দিল। আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে ছোট ছোট মাছ। ভয় পাচ্ছে না। দুজন সাঁতারুকে বড় জাতের কোন মাছ মনে করছে। হয়ত।

অসংখ্য গলদা চিংড়ি দেখতে পেল রবিন। ইস, একটা স্পীয়ার গান যদি থাকত সঙ্গে। কয়েকটাকে ধরে নিয়ে যাওয়া যেত।

আরও কিছুক্ষণ সাঁতরাল ওরা। তারপর ওপরে ওঠার ইঙ্গিত করল জোসেফ।

ধীরে ধীরে ওপরের দিকে উঠতে লাগল। দুজনে, কোনরকম তাড়াহুড়ো করল না। মোটর বোটের তলা দেখা যাচ্ছে, অদ্ভুত কোন দানব যেন। ভুসূস করে পানির ওপর মাথা তুলল দুজনে।

দড়ির সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল জোসেফ। তাকে অনুসরণ করল রবিন।

কেমন লাগল? আগ্রহী গলায় বলল মুসা। হাত ধরে রবিনকে বোটে উঠতে সাহায্য করল।

ভালই লাগত, কিন্তু গুবলেট করে ফেলেছি, বলল রবিন। দাঁড়ি পেচিয়ে গিয়েছিল পায়ে। মাথা ঠিক রাখতে পারিনি।

জোসেফও জানাল, কিছু কিছু ভুল করেছে রবিন। পানির তলায় কোন কারণেই আতঙ্কিত হয়ে পড়া চলবে না, এর ওপর ছোটখাট এক বক্তৃতা দিল। বলল, এরপর ইয়টের কাছ থেকে দূরে থাকতে হবে।

মন খারাপ করার কিছু নেই, হেসে বলল জোসেফ। পানির তলায় হঠাৎ কোন বিপদে পড়ে গেলে মাথা ঠিক রাখা সত্যি কঠিন। রবিনের কপাল ভাল, দড়িতে আটকেছে পা। অক্টোপাসের কবলে পড়েনি। তবে, অক্টোপাস কিংবা হাঙর আক্রমণ করে বসলেও মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে। না না, চমকে ওঠার কিছুই নেই। এদিককার পানিতে ওই দুটো জীব দেখা যায় না খুব একটা। হ্যাঁ, এবার মুসার পালা।

তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিল মুসা।

দড়ির সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেল দুই ডাইভার। পানির তলায় ড়ুবে গেল মাথা। কি কি ঘটেছে পানির তলায়, কিশোরকে খুলে বলল রবিন। শেষে বলল, পরের বার আর এমন ভুল…

একটা ডাক শুনে থেমে গেল রবিন। চাইল। একশো গজ দূরে ছোট একটা পালের নৌকা। নিঃশব্দে এগিয়ে আসছে। হাত নেড়ে তাদের ডাকছে পাপালো।

দেখতে দেখতে কাছে চলে এল নৌকা। দ্রুত অভ্যস্ত হাতে পাল নামিয়ে ফেলল পাপালো। হাসল। ঝকঝাঁক করে উঠল সাদা দাঁত।

আমার সম্পর্কে নিশ্চয় অনেক খারাপ কথা বলেছে। জিম, বলল পাপালো। বিশ্বাস করেছ তো?

না, বলল রবিন। বিশ্বাস করিনি। তোমার সম্পর্কে কোনরকম খারাপ ধারণা আমাদের নেই।

খুব খুশি হলাম, হাসল আবার পাপালো। বোটের গায়ে হাত ঠেকিয়ে নৌকা থামাল।

বোটে ফেলে রাখা ডুবুরির-সরঞ্জামগুলোর দিকে চাইল একবার সে, চকচক করছে চোখ। গলার স্বর নির্লিপ্ত রেখে বলল, ইয়টটার কাছে যেতে এত সাজসরঞ্জাম লাগে না। পানি খুবই অল্প। কোন যন্ত্রপাতি ছাড়াই যেতে পারি। আমি ওখানে।

শুনেছি, গ্ৰীক স্পঞ্জ শিকারিরা যন্ত্রপাতি ছাড়াই একশো ফুটের বেশি পানির তলায় ডুব দিতে পারে, বলল রবিন।

ঠিকই শুনেছি, গর্বিত স্বরে বলল পাপালো। আমার বাপ দুশো ফুট নিচে চলে যেতে পারত। কোমরে একটা দড়ি বাঁধা থাকত শুধু, টেনে তোলার জন্যে। দাম রাখতে পারত তিন মিনিট। মেঘ ঘনিয়ে এল। তার চেহারায়। কিন্তু অসুস্থ হয়ে পড়েছে। বাবা। আর কোনদিন ডুব দিতে পারবে না। প্রায়ই বলে, আবার গ্রীসে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে তার। কিন্তু টাকা কোথায়? যদি কোনদিন গুপ্তধন পেয়ে যাই, বাবাকে নিয়ে দেশে চলে যাব আমি। একটা মোটরবোট কিনিব। মাছ ধরব সাগরে। আহা, ওখানকার জেলেদের জীবন কত সুন্দরা আবার হাসি ফিরল। পাপালোর চেহারায়। দ্বিধা করল এক মুহূর্ত। তারপর বলল, আগামীকাল গুপ্তধন খুঁজতে যাব। আমার সঙ্গে যাবে তোমরা?

নিশ্চয়!। প্রায় চেঁচিয়ে উঠল রবিন। খুব মজা হবে।

এতক্ষণ চুপচাপ কথা শুনছিল কিশোর। বলল, শুধু গুপ্তধন খুঁজলে, আর সাঁতার কেটে বেড়ালে তো চলবে না। আমাদের। যে কাজে এসেছি, তা-ও কিছু করার দরকার। তারপর দুজনকেই অবাক করে দিয়ে জোরে হ্যাঁ-চু-চোহা। করে উঠল সে।

ঠাণ্ডা লাগল নাকি তোমার? গোয়েন্দাপ্রধানের দিকে চেয়ে বলল রবিন।

কিশোর কোন জবাব দেয়ার আগেই বলে উঠল। পাপালো, খবরদার, ঠাণ্ডা লাগলে ডুব দিতে যেয়ো না! ভীষণ কানব্যথা করবে। আচ্ছা, চলি এখন। কাজ আছে। কাল দেখা হবে।

আবার পাল তুলে দিল পাপালো। চলতে শুরু করল নৌকা। রোদে চকচক করছে উপসাগরের পানি। তাতে ভর করে উড়ে চলল যেন হালকা পালের নৌকা।

কয়েক মিনিট পর। পানির ওপর মাথা তুলল। মুসা আর জোসেফ। বোটে উঠে এল।

ফেস মাস্ক খুলে ফেলল মুসা। হাসল। দারুণ! কিশোর, এবার তোমার পালা।

খুব একটা আগ্রহী মনে হল না কিশোরকে। শরীর ভাল লাগছে না। পিঠে ট্যাংক বেঁধে মাস্কটা টেনে নামাল মুখের ওপর। জোসেফের পিছু পিছু পানিতে নেমে গেল সিঁড়ি বেয়ে।

রবিন! উত্তেজিত মনে হল মুসাকে। জন, কি দেখেছি?

কি?

কিছু একটা দেখেছি। ইয়টের ফুট পঞ্চাশেক তফাতে। উঠে আসছি তখন। বালিতে পড়ে আছে, চকচকো আমার মনে হয় মোহর! আবার যখন ডুব দেব, দেখে আসব ওটা।

তুমি শিওর?

ঠিক শিওর না। তবে চকচকে কিছু একটা দেখেছি, এটা ভুল নয়। এখানকার লোকে তো বলেই, উপসাগরের তলায় ছড়িয়ে গেছে মোহর।

মাঝে মধ্যে পাওয়াও যায়।

কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেল রবিন। ভেসে উঠেছে। কিশোরের মাথা। তার পাশেই জোসেফ। কিশোরের ফেস মাস্ক সরে গেছে একপাশে। তাকে ধরে রেখেছে জোসেফ। ঠেলে দিচ্ছে বোটের দিকে।

কি হয়েছে? জিজ্ঞেস করল রবিন।

তেমন কিছু না, অভয় দিয়ে বলল জোসেফ। কি করে জানি মাস্ক সরে গেল ওর। ভাগ্য ভাল, গভীর পানিতে ছিল না।

বোটে উঠে এল দুজনে। বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে কিশোরের চেহারা। মাস্ক খুলে রাখতে রাখতে বলল, কান ব্যথা করছিল। হাঁচি পেল হঠাৎ। আটকাতে পারলাম না। মাস্ক সরে গেল। পানি ঢুকে গেল মুখে। মাস্ক আর জায়গামত সরাতে পারলাম না।

আবার হাঁচি দিল কিশোর।

ঠাণ্ডা লেগেছে, বলল জোসেফ। আজ আর ডুব দিতে পারবে না। আগামী তিন-চার দিনেও পারবে বলে মনে হয় না।

আমারও তাই মনে হচ্ছে, সায় দিয়ে বলল কিশোর। গতকাল প্লেনে এয়ারকুলারের বাতাস একটু বেশি ঠাণ্ডা ছিল। তার ওপর রাতে বৃষ্টিতে ভিজেছি। ঠাণ্ডা ধরে ফেলেছে।

পুরোপুরি সুস্থ না হয়ে আর ডুবতে এসো না, পরামর্শ দিল জোসেফ। হাঁচি কিংবা কাশি থাকলে তো নয়ই। ঠিক আছে, তুমি বাস। মুসা আর রবিনকে ঘুরিয়ে আনি কয়েকবার। নাকি তোমরাও আর যেতে চাও না?

না না, যেতে চাইব না কেন? বলে উঠল মুসা।

পালা করে ডুব দিতে লাগল মুসা আর রবিন। প্রথমবারের চেয়ে বেশিক্ষণ ড়ুবে থাকে এখন। চকচকে জিনিসটা আবার দেখা যায়। কিনা, সেদিকে নজর রাখল। দুজনেই। কিন্তু দেখতে পেল না। আর।

বিকেল হয়ে গেল। আর কোনরকম বিপদ ঘটল না। সেদিনকার মত ডোবার কাজে ইস্তফা দেবার সিদ্ধান্ত নিল জোসেফ। একা একা একবার ডুব দেবার অনুমতি চাইল মুসা। কি ভেবে রাজি হয়ে গেল তাদের ইনস্ট্রাক্টর।

অনেকক্ষণ পরে, শঙ্কিত হয়ে পড়েছে জোসেফ, এই সময় ভেসে উঠল মুসার মাথা। বোটে এসে উঠল। এক হাতে মুঠো করে রেখেছে কি যেন।

ফেস মাস্ক খুলে ফেলল মুসা। দেখ!

মুসার খোলা মুঠোর দিকে চাইল তিনজনে। একটা উজ্জ্বল বড় মুদ্রা। ধারগুলো ক্ষয়ে গেছে।

এ-কি! চেঁচিয়ে উঠল। জোসেফ। চোখ বড় বড় হয়ে গেছে। ডাবলুনা মুসার হাত থেকে মোহরটা তুলে নিয়ে দেখল ভাল করে। সতেরোশো বারো সালের। স্প্যানিশ। মুসা, খবরদার এটার কথা কাউকে বোলো না!

কেন? অবাক হল মুসা। ছিনিয়ে নেবে?

না, তা নেবে না। তবে শয়ে শয়ে লোক চলে আসবে গুপ্তধন খুঁজতে। বারোটা বাজিয়ে ছাড়বে আমাদের শুটিঙের।

Categories: