গুহায় লুকিয়ে থাকার কোন মানে নেই, কিশোর বলল। ডজ আসতে চাইলে ঠিকই চলে আসবে চিহ্ন দেখে দেখে। গুলি করতে করতে ঢুকলে তখন আমাদের কিছুই করার থাকবে না…
তাহলে লুকিয়ে থেকে প্রথম আক্রমণটা আমাদেরকেই করতে হবে, বলল রবিন।
হ্যাঁ, মাথা ঝাকাল কিশোর। একটা বুদ্ধি এসেছে মাথায়। এতে কাজ হতেও পারে।
বলে ফেল।
চলো, ভেতরে গিয়ে বসি। এখানে প্রাইভেসি নেই। হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকতে আরম্ভ করল কিশোর। তাকে অনুসরণ করল অনন্যরা।
মিনিটখানেক পরে কিশোর, টনি আর রবিন বেরিয়ে এল আবার। টনির হাতে তার রাইফেল। বুকের কাছে ধরে রেখেছে। অপেক্ষা করে রইল ডজ পথের বাঁকে অদৃশ্য না হওয়া পর্যন্ত। তারপর দ্রুত নামতে শুরু করল। পাথরে পা পিছলে যাচ্ছে, পরোয়াই করল না। নেমে চলে গেল একটা বড় পাথরের আড়ালে। তাকে অনুসরণ করে গিয়ে রবিনও লুকিয়ে পড়ল।
সুড়ঙ্গমুখের কাছে পড়ে আছে কিশোর। মাথা নিচু করে রেখেছে। যতটা না হলে ডজকে দেখতে পাবে না তার বেশি তুলছে না। রাইফেল বাগিয়ে সাবধানে উঠে আসছে ডজ, শারির পায়ের ছাপ দেখে দেখে। বিশ গজের মধ্যে চলে এল ডজ।
ডজ! চিৎকার করে বলল কিশোর, ডজ! আমি, টনি!
টনি! ঝট করে ট্রিগার গার্ডের ভেতর আঙুল চলে গেল ডজের। কোথায় তুমি?
এই যে এখানে, ওপরে, চেঁচিয়ে জবাব দিল কিশোর। আমার হাতে রাইফেল আছে। আপনার দিকে তোলা।
হেসে উঠল ডজ। তাহলে করো গুলি। ঠিক কোথায় আছ তুমি, জেনে যেতে পারব তাহলে। তারপর খুলি ছাতু করে দেব।
নালার ঠিক মাঝখান দিয়ে এসেছে পায়েচলা পাহাড়ী পথ। সেটা ধরে আবার এগোতে লাগল সে। উঠে আসতে থাকল ওপরে।
কি চাই আপনার? ভয় পেয়েছে যেন, কণ্ঠস্বরকে এমন করে তুলল কিশোর। এখানে এসেছেন কেন?
কথা বলতে। তুমি আর তোমার বাবার সঙ্গে পঞ্চো ভিলার ব্যাপারে কথা বলতে চাই।
রাইফেল ফেলে দিন! কর্কশ কণ্ঠে আদেশ দিয়ে পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল টনি। ডজের পেছনে। নলের মাথা দিয়ে জোরে গুতো মারল লোকটার পিঠে।
অবাক হয়ে গেল ডজ। বিমূঢ়।
কি হলো? ফেলছেন না কেন? আবার গুতো লাগাল টনি। কিশোরের বুদ্ধি কাজে লেগেছে। তার ফাঁদে পা দিয়ে বোকা বনেছে ডজ। সে ভেবেছিল টনির সঙ্গেই বুঝি কথা বলছে। কি কান্ড! মুহূর্ত আগে ছেলেটার কথা শুনেছে ওপরে, এখন শুনছে পেছনে। রাইফেল ফেলল না সে। তবে দ্বিধায় পড়ে গিয়ে নামাতে বাধ্য হলো।
এদিকে ফিরবেন না। মাথাও ঘোরাবেন না। আবার কঠোর গলায় আদেশ দিল টনি।
কিশোর যা আশা করেছিল তাই ঘটল, অন্তত ঘটার উপক্রম হলো।
লাফ দিয়ে আড়াল থেকে বেরিয়ে এল রবিন।
মাথা না ঘোরাতে বলা হয়েছে, তবু ঘোরাতে গেল ডজ। সবে অর্ধেকটা ঘুরিয়েছে ঘাড়, এই সময় বেরোল রবিন। কাজেই তাকে চোখে পড়ল না ওর।
এক হ্যাচকা টানে ডজের হাতের রাইফেল কেড়ে নিয়ে দশ গজ দূরের একটা ক্যাকটাস ঝোপে ফেলে দিল রবিন।
গর্জে উঠল ডজ।
কারাতে যোদ্ধার পজিশন নিয়ে ফেলেছে রবিন। মুসার মত অতটা ওস্তাদ নয় সে, অত শক্তি কিংবা ক্ষিপ্রতাও নেই, তবে মন্দ বলা যাবে না। তার বিশ্বাস, ডজকে কাবু করে ফেলতে পারবে।
কিন্তু রবিনকে আক্রমণ করল না ডজ। আচমকা চরকির মত পাক খেয়ে ঘুরল। হাত লম্বা করে দিয়েছে। ধাপ করে খোলা আঙুলের থাবা গিয়ে বাড়ি মারল টনির মাথায়। টলে উঠে পিছিয়ে গেল টনি। লাফিয়ে এগিয়ে গেল রবিন। কিন্তু ততক্ষণে টনির রাইফেলের নল চেপে ধরেছে ডজ। জোরে এক মোচড় দিয়ে হ্যাচকা টান দিতেই অস্ত্রটা চলে এল তার হাতে। পিছিয়ে গিয়ে সেটা তুলে ধরল রবিনের দিকে। দাঁত বের করে হিসিয়ে উঠল, বিচ্ছুর দল! হাঁটো। নিচের দিকে। রাইফেলের রেঞ্জের বাইরে যাওয়ার আগে থামবে না।
অস্ত্রহীন হয়ে গেছে। কিছুই করার নেই আর দুজনের। টনি কিছু করার চেষ্টা করলেই তাকে গুলি করবে ডজ। ধীরে ধীরে নামতে শুরু করল দুজনে।
পথ ধরে নেমে গেল প্রায় একশো গজ। তারপর ঘুরল ডজ। উঠতে শুরু করল কিশোরের দিকে।
কয়েক গজ উঠে চিৎকার করে ডাকল, বেরিয়ে এসো! নইলে গুলি শুরু করব!
উঠে দাঁড়াল কিশোর। ট্রিগারে আঙুল চেপে বসল ডজের। আরেকটু বাড়লেই গুলি বেরিয়ে যাবে।
বেশ, নেমে এসো এবার। দ্রুত চলে যাও বন্ধুদের কাছে। তবে আগে কয়েকটা প্রশ্নের জবাব দাও।
লোকটাকে জুডোর প্যাচে ফেলার সুযোগ খুঁজতে লাগল কিশোর। কিন্তু রাইফেলের নল যেভাবে ওর দিকে মুখ করে আছে তাতে কিছু করা সম্ভব নয়।
টনির বাবা কোথায়? জানতে চাইল ডজ।
দ্রুত ভাবনা চলছে কিশোরের মাথায়। ডজকে বিশ্বাস করাতে হবে গুহার ভেতরে কেউ নেই।
মুসাকে নিয়ে পানি আনতে গেছে।
ওদের দেখা পাব কি করে? ঝর্নাটা মাইল দুই দূরে। পাহাড়ের আরেক পাশে। এখন থেকে দেখা যায়।
আলতো করে মাথা ঝাঁকাল একবার ডজ হাসল তালগে পেসোগুলোকে পাহারা দেয়ার এখন কেউ নেই, তুমি ছাড়া। এখন গিয়ে তোমার বন্ধুদের সঙ্গে বসে থাক। লুকিয়ে থাকবে। আমার চোখে যাতে না পড়। পিঠে ওলি খেতে না চাইলে জলদি ভাগ।
হতাশ ভঙ্গি করল কিশোর। পরাজিত, বিধ্বস্ত হয়ে যেন দ্রুত নামতে শুরু করল নালার ভেতর দিয়ে।
ও পাথরের আড়ালে হারিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করল ডজ। তারপর মাথা নিচু করে দুহাতে রাইফেল ধরে ঢুকল সুড়ঙ্গের ভেতরে।
ওকে আসতে শুনল মুসা। গুহার ঠিক ভেতরেই অপেক্ষা করছে। আশা করছে, মাথা নিচু করেই ঢুকবে ডজ, ঢুকতে হবে ওভাবেই। ঘাড়ে কারাতের কোপ মারার জন্যে চমৎকার একটা সুযোগ পেয়ে যাবে তাহলে।
হাত তুলল সে। আঙুলগুলো সোজা করে শক্ত করে রেখেছে, গায়ে গায়ে চেপে লেগে রয়েছে একটা আরেকটার সঙ্গে। এভাবে ডজের ঘাড়ে একটা কোপই যথেষ্ট। মাথা তোলার আর সুযোগ পাবে না। ঢলে পড়বে মাটিতে।
গুহায় ঢুকল ডজ। সাপের মত ছোবল হানল যেন মুসার উদ্যত হাত। কিন্তু একটা বারো শব্দ করে ফেলল আর শেষ মুহূর্তে মাথা সোজা করে ফেলল লোকটা। মুসার কোপটা ঘাড়ে না লেগে লাগল তার কাঁধে। হোঁচট খাওয়ার মত ঝাঁকুনি খেয়ে সামনের দিকে এগিয়ে গেল তার শরীরটা। হাত থেকে রাইফেল ছাড়ল না।
লাফ দিয়ে পেছনে চলে এল মুসা। আরেকবার আঘাত হানার জন্যে উঠে গেল হাত। কিন্তু সামলে নিয়েছে ততক্ষণে ডজ। রবিন আর টনিকে পরাজিত করার সময় যেমন বিদ্যুৎ খেলে গিয়েছিল শরীরে, তেমনি খেলল আরেকবার। অসাধারণ ক্ষিপ্র লোকটা। চিতাবাঘকেও হার মানায়। কখন ঘুরল বুঝতেই পারল না যেন মুসা। শুধু দেখল, তার দিকে ঘুরে গেছে ডজ। রাইফেলের নল বুকের দিকে তাক করা।
হাত নামাল মুসা।
পরমুহূর্তে আন্দাজ করল, ডজের তুলনায় তার একটা সুবিধা বেশি। রোদ থেকে ভেতরে এসেছে লোকটা, তীব্র আলো থেকে আবছা অন্ধকারে, চোখে সয়নি এখনও। দ্রুত কিছু করতে পারলে হয়ত কাবু করে ফেলতে পারবে ডজকে, গুলি করার আগেই।
একপাশে সরে গেল সে। বোঝার চেষ্টা করল, ডজ দেখতে পেয়েছে কিনা, কিছু করতে গেলে গুলি খাবে কিনা। কিছুই বুঝতে পারল না। এতগুলো ঘটনা ঘটে গেল মুহূর্তের মধ্যে। ঝুঁকি নিল সে। একপায়ের গোড়ালিতে ভর দিয়ে ঘুরল। পাক শেষ হওয়ার আগেই ঝট করে ওপরে তুলে সোজা বাড়িয়ে দিল ডান পাটা। ডজের বুকের সামান্য নিচে লাগল লাথি।
পুরো একটা সেকেন্ড বাঁকা হয়ে রইল ডজ। শ্বাস নিতে পারছে না।
যথেষ্ট সময় পেল মুসা। লাফিয়ে সামনে এগিয়ে কনুই দিয়ে একেবারে মেপে একটা ভয়াবহ আঘাত হানল ডজের ঘাড়ে। মারটা আরেকটু জোরে হলে মরেই যেত র্যাঞ্চার।
ওটোশি-হিজি-অ্যাটি সহ্য করে দাঁড়িয়ে থাকা কোন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়, ডজও পারল না। ঢলে পড়ল মেঝেতে। কিছু সময়ের জন্যে বেঁহুশ।
অন্য তিনজন যখন গুহায় ঢুকল, তখনও মেঝেতেই পড়ে আছে সে। দড়ি বের করে শক্ত করে বাঁধল তাকে টনি। খানিক আগেও রাইফেল হাতে যে হম্বিতম্বি করছিল, সে এখন পুরোপুরি অসহায়। তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে চারজনে। উত্তেজনা টের পেয়েই বোধহয় খাওয়া থামিয়ে দিয়েছিল বারো দুটো। আবার মুখ নামিয়ে জই তুলে নিয়ে চিবাতে শুরু করল।
মিনিট খানেক পর রবিন বলল, হুঁশ ফেরে না কেন? দশ পর্যন্ত গুনি।
দরকার কি গোনার, কিশোর বলল। যখন ফেরে ফিরবে।
বাইরে বেরিয়ে এল চারজনে।
যেভাবে আশা করেছিলাম ঠিক সেভাবে ঘটল না, হাসল কিশোর। মুসাই শেষ রক্ষা করল। নইলে গিয়েছিল সব ভন্ডুল হয়ে।
হেসে বাতাসেই হাত দিয়ে একটা কোপ মারল মুসা। জিনিস বটে, কারাতে। খালি দুটো হাত আর পা-ই যথেষ্ট, মারাত্মক অস্ত্র হয়ে যায় ব্যবহারের গুণে।
ঠিক, রবিন বলল। কোন দিন ব্রুস লী হয়ে যাও কে জানে! কিশোর, এরপর কি করব আমরা?
প্রথমে ডজের রাইফেলটা বের করে আনব, কিশোরের আগেই জবাব দিল টনি। একটা রাইফেলের চেয়ে দুটো থাকলে অনেক সুবিধে।
দ্রুত সেই ক্যাকটাসের ঝোপে নেমে এল ওরা, যেখানে রাইফেলটা ছুঁড়ে ফেলেছিল রবিন। খুঁজতে শুরু করল।
খুঁজেই চলল, খুঁজেই চলল। প্রতিটি খাঁজ, গর্ত, পাথরের ফাঁকফোকর, কিছু বাদ দিল না। প্রতিটি কাঁটাওয়ালা ক্যাকটাসের পাতা সরিয়ে সরিয়ে দেখল।
পাওয়া গেল না রাইফেলটা।
ইসাবেল! রবিন বলল, ধারেকাছেই কোথাও ছিল। নিয়ে গেছে।
নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটতে লাগল কিশোর। কয়েকবার জোরে জোরে চিমটি কাটার পর বলল, আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে।
কত বুদ্ধি যে থাকে তোমার মাথায়! গুঙিয়ে উঠল মুসা।
আমার ধারণা, কিশোর বলল, ইসাবেল এখানে কোথাও লুকায়নি। চিন্তিত ভঙ্গিটা রয়ে গেছে। ঘাঁটিতে ফিরে গেছে সে।
ঘাঁটি, ভুরু কোঁচকাল মুসা। সেটা আবার কি?
বারোর পিঠ থেকে মালপত্র নামিয়ে নিয়ে গেছে, যাতে কোথাও ক্যাম্প করতে পারে। মিস্টার সাইমন জানিয়েছেন আমাকে, বারোরা খুব বিশ্বস্ত জানোয়ার। সেটার প্রমাণও পেয়েছি আমরা। মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব হলে তাকে আর ছাড়তে পারে না। ফিরে ফিরে যায় তার কাছে। এখন ইসাবেলের বারোটার আকর্ষণ শারির ওপর বেশি, তাই যেতে চাইছে না। কিন্তু যদি শারিকে ওর সঙ্গে যেতে দিই, তাহলে নিশ্চয় পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে আমাকে ইসাবেলের কাছে। যেখানে ঘাঁটি করেছে মহিলা।
তোমাকে? বাঁকা চোখে কিশোরের দিকে তাকাল রবিন। একাই সব ক্রেডিট নিতে চাও? আমরা বাদ পড়ব কেন? সবাই গেলে অসুবিধে কি?
অসুবিধেটা হলো, চারজন অনেক বেশি। একসাথে গেলে দেখে ফেলতে পারে ইসাবেল। আমি একা হলে সারাক্ষণ বারোগুলোর আড়ালে লুকিয়ে থেকে এগুতে পারব। আর শারিকে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা তোমাদের নেই। কাজেই আমাকেই যেতে হচ্ছে।
চুপ হয়ে গেল রবিন। সঙ্গে যাবার মত জোরাল যুক্তি দেখাতে পারল না আর কেউ।
ইসাবেলের ব্যাপারে অদ্ভুত একটা ধারণা বাসা বাঁধছে কিশোরের মনে। ধারণাটা হয়েছে খুব ক্ষীণ সূত্র থেকে। ক্যাম্পের সামান্য আলোয় দেখা কব্জির দাগ। রবিন বলছে কন্ট্যাক্ট লেন্স পরে মহিলা। সামান্য সূত্র, তবে অবহেলা করা উচিত নয়। অতি সাধারণ জিনিসও মাঝে মাঝে জটিল রহস্যের সমাধান করে দেয়। ইসাবেলের কব্জিতে দাগ সত্যিই আছে কিনা সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার একটাই উপায়, আরেকবার কাছে থেকে ভালমত দেখা।
বেশ, যাও, মুসা বলল অবশেষে। তবে সাবধানে থেক। মহিলার কাছে এখন একটা রাইফেল আছে।
বারোদুটোকে গুহা থেকে বের করে আনল টনি। জানাল, ডজের হুঁশ ফিরেছে। আমাকে দেখেই গালাগাল শুরু করল। ছাড়া পেলে আমাকে কি কি করবে, পরিষ্কার করে জানিয়ে দিয়েছে।
ইসাবেলের বারোর পেটে জোরে এক চাপড় মারল কিশোর। চলতে শুরু করল ওটা। পাশে পাশে এগোল শারি। কিশোর ঢুকে পড়ল দুটো জানোয়ারের মাঝখানে। মাথা নুইয়ে রেখেছে, যাতে সহজে কারও চোখে না পড়ে।
ওপরেও উঠল না বারোদুটো, নিচেও নামল না। যতটা সম্ভব সমান্তরাল জায়গা ধরে চলতে লাগল। এখানকার পাহাড়ের এটা এক অদ্ভুত ব্যাপার। খাড়া ঢাল আছে, আবার অনেকখানি জায়গা জুড়ে ঢালের গায়ে সমান জায়গাও আছে, টেবিলের মত।
ওপর দিকে মুখ তুলতে আরও অনেক গুহামুখ নজরে পড়ল কিশোরের। কিন্তু মাটিতে কোন চিহ্ন দেখতে পেল না, যেগুলো বলে দেবে কোন গুহাঁটার দিকে মানুষ গেছে।
চলছেই ইসাবেলের বারো। তারপর কোন রকম জানান না দিয়েই আচমকা থেমে গেল।
ওটার পাশে থমকে দাঁড়াল শারি। মাটিতে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল কিশোর। শখানেক গজ ওপরে পাহাড়ের গায়ে একটা ফাটল মত চোখে পড়ল। পাথরের আড়ালে থেকে, যতটা সাবধানে সম্ভব ক্রল করে এগোল সেটার দিকে।
তাকে অনুসরণ করল না ইসাবেলের বারো। তবে নড়লও না। যেখানে ছিল সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। কাছেই হোট একটা সে ঝোঁপ দেখতে পেয়ে সেদিকে এগিয়ে গেল শারি। পাতা ছিড়ে চিবাতে শুরু করল। দেখাদেখি অন্য বারোটাও গিয়ে তাতে মুখ দিল। কোন শব্দ করল না।
ভুল করলাম না তো? ভাবল কিশোর। পাহাড়ের এই সরু ফাটলে নিশ্চয়ই ঢোকার পথ নেই। আর তাহলে ওখানে ক্যাম্প করাও সম্ভব নয় ইসাবেলের পক্ষে। তবু, আরেকটু কাছে এগিয়ে দেখা যাক, কিছু আছে কিনা।
ঘাড়ে হাত পড়ল এই সময়, শীতল স্পর্শ। শক্ত করে চেপে ধরেছে যেন।
তার মুখের কাছ থেকে একটু দূরেই মাটি থেকে যেন গজিয়ে উঠেছে জিনিসটা। আসলে গেড়ে দেয়া হয়েছে। একটা কাঠের ক্রুশ। আড়াআড়ি বাঁধা দুটো কাঠের বাঁধনের কাছের একটা কোণ আটকে গিয়েছিল ওর ঘাড়ে, মাথা তোলার সময়।
নাম খোদাই করা রয়েছে ক্রুশটাতে। ইগনাসিও।
পেয়ে গেল তাহলে! গুহার বাইরেই কবর দেয়া হয়েছে কংকালটাকে। তার মানে কাছেই কোথাও রয়েছে পঞ্চো ভিলার গুহা। যেটাতে লুকানো রয়েছে পেসোগুলো।
ইসাবেল কি দেখে ফেলেছে? ওই গুহাতে গিয়েই ক্যাম্প করেছে সে? নাকি ওপরে উঠে বসে আছে কোনখানে? ওই ফাটলের ভেতর?
ওপরে থেকে থাকলে এতক্ষণে বারোদুটোকে দেখে ফেলার কথা। দেখে থাকলে জানার চেষ্টা করবে কেন এসেছে ওগুলো।
মাটিতে লম্বা হয়ে পড়ে রইল কিশোর। অপেক্ষা করছে।
মিনিটখানেকের বেশি থাকতে হলো না। মেকসিকান মহিলার পরিচিত মূর্তিটা চোখে পড়ল। পশমের তৈরি ঢিলাঢালা স্কার্ট, লাল শাল, কালো বেনি। গুহা থেকে বেরিয়ে তাকিয়ে রয়েছে নিচে বারো দুটোর দিকে।
হাতে রাইফেল। বোল্ট টানার শব্দ কানে এল কিশোরের।
যাও। নিজেকে বলল কিশোর। সময় হয়েছে ইসাবেল সম্পর্কে সমস্ত কথা জানার।
মাথা নামিয়েই রাখল সে। ভাবছে, যদি তার অনুমান ভুল হয়ে যায়? যদি তার সন্দেহের জবাব রাইফেলের বুলেট দিয়ে দেয় ইসাবেল?
ঝুঁকি না নিলে জানা যাবে না। চিৎকার করে বলল সে, আম্মা, আমি! আমি টনি, আম্মা!
কিশোরের জীবনের দীর্ঘতম দশটি সেকেন্ড নড়ল না ইসাবেল।
তারপর রাইফেল হাত থেকে ফেলে দৌড়ে নামতে লাগল কিশোরের দিকে।
টনি! চেঁচিয়ে বলছে মহিলা, টনি! কোথায় তুই, বাবা! ঠিক আছিস? ভাল আছিস?
স্প্যানিশ ছাড়া অন্য ভাষা না জানার ভান করছে না এখন। পরিষ্কার ইংরেজিতে বলছে।
উঠে দাঁড়াল কিশোর। হ্যাঁ, টনি ভালই আছে। চালাকিটা করার জন্যে আমি দুঃখিত। তবে এছাড়া আপনার সাহায্য পাওয়ার আর কোন উপায় ছিল না। আমাদের সবারই সাহায্য দরকার। টনিরও।
কয়েক গজ দূরে থমকে দাঁড়িয়েছে ইসাবেল। আরও দশটি সেকেন্ড কিশোরের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। হাসল অবশেষে।
এসো, ডাকল সে। বলো আমাকে, কি হয়েছে।
ফিরে তাকাল কিশোর। শান্ত ভঙ্গিতে পাতা ছিড়ছে বারোদুটো। খাওয়া নিয়ে ব্যস্ত। আর কোনদিকে নজর নেই। মহিলাকে অনুসরণ করে ফাটলটার দিকে এগোল সে।
ডজ কোথায়? রাইফেলটা তুলে নিয়ে জিজ্ঞেস করল মহিলা। পাহাড়ের নিচে যতদূর চোখ যায় তাকিয়ে দেখল লোকটা আছে কিনা।
ওকে নিয়ে ভাবনা নেই, গুহায় কি ঘটেছে জানাল কিশোর।
মাথা ঝাঁকাল ইসাবেল। সেফটি ক্যাচ অন করে দিল। টনি আর ওর বাবার চিন্তায় মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছিল আমার। কাল এই গুহাঁটা দেখেছি আমি। ভেতরে দুজনের জিনিসপত্র পড়ে আছে। কিন্তু ঘোড়ার পায়ের ছাপ সব পুরানো। তাই বুঝতে পারিনি কোথায় গেছে ওরা।
কিশোর জানাল, টনির বাবা গেছে ডিনামাইট কিনতে, যাতে গুহার মুখে পড়ে থাকা পাথরের স্থূপ উড়িয়ে দিতে পারে। পঞ্চো ভিলার গুহায় ঢুকতে চায় দুজনে। কয়েকদিনের মধ্যেই ফিরে আসবেন টনির বাবা।
ডজের রাইফেল পেলেন কি করে? জানতে চাইল কিশোর।
রাতে আমি ঘুমিয়ে থাকার সময় বারোটা ছুটে গেল। আজ সকালে খুঁজতে বেরোলাম। ওটাকে তো পাইনি, পেলাম এই রাইফেলটা, একটা ক্যাকটাসের গোঁড়ায়। এতে ডজের নাম খোদাই করা রয়েছে। ডজকে দেখলাম না কোথাও। মনে হল, এটা একটা ফাঁদ হতে পারে। হয়ত আরেকটা রাইফেল নিয়ে কোথাও ঘাপটি মেরে আছে সে। কিংবা বুটের মধ্যে যে ছুরিটা লুকিয়ে রাখে, সেটা হাতে নিয়ে। তাড়াতাড়ি চলে এলাম তখন এখানে। কারণ এদিক থেকে তাকে বেরোতে দেখেছিলাম।
হাসল কিশোর। ইসাবেল যখন রাইফেল তুলে নেয়, তখন ডজের কি অবস্থা সেটা ভেবে। ওই লোকটা লুকিয়ে ছিল না, ছিল হাত-পা বাঁধা অবস্থায় মেঝেতে পড়ে। আর কয়েক মিনিট আগে গেলেই সব দেখতে পেত ইসাবেল। রবিন যেখানে রাইফেল ছুঁড়ে ফেলেছিল, সেখান থেকে টনির গুহাঁটা দেখা যায় না। সেজন্যেই ওটাও দেখতে পায়নি ওর মা।
আবার হাসি ফুটেছে ইসাবেলের মুখে। কি করে বুঝলে আমিই টনির মা? স্প্যানিশ ছাড়া আর কিছু বলিনি আমি। আর এই পোশাকে একটুও আমেরিকান মনে হয় না আমাকে।
শালটা হাতে নিয়ে এক বেনি ধরে টান দিল সে। খুলে চলে এল কালো পরচুলা। পকেটে ভরে রেখে আঙুল চালাল সোনালি চুলে।
মনে হচ্ছিল। স্রেফ সন্দেহ। একটা মুহূর্ত চুপ করে রইল কিশোর। দুটো ব্যাপার পরিষ্কার হওয়া দরকার। সেদিন রাতে আগুনের ধারে বসে যখন কথা বলছিলেন, বার বার হাতের ঘড়িটাকে নিচ থেকে ওপরে ঠেলে তুলছিলেন। চামড়ায় হালকা রঙের একটা দাগ দেখেছিলাম…
নিজের হাত দেখাল কিশোর। এই অভিযানে এসে দীর্ঘ সময় রোদে কাটিয়ে চামড়ার রঙ অন্যরকম হয়ে গেছে। হাত ঘড়ি খুলে নিল সে। সর্বক্ষণ ঘড়ি বাঁধা থাকায় কব্জির কাছে একটা রিঙ তৈরি হয়েছে। ওখানটাতে রোদ লাগতে পারেনি, ফলে চামড়ার আসল রঙ রয়ে গেছে। যেখানে যেখানে রোদ পড়েছে ওখানকার চামড়ার রঙ গাঢ়।
মেকসিকানদের চামড়ার রঙ সাধারণত বাদামী হয়, বলল সে। সারাক্ষণ হাতে ঘড়ি বাঁধা থাকলে ওখানকার চামড়ার রঙ বড় জোর বাদামী হবে, সাদা হতে পারে না কিছুতেই। কিন্তু অ্যাংলোদের চামড়া হয়ে যায় ফ্যাকাসে সাদা।
মাথা ঝাকাল ইসাবেল। খুব চালাক ছেলে তুমি, আমার টনির মত।
আমার বন্ধু রবিনের চোখে পড়েছে আরেকটা জিনিস। আপনার কন্টাক্ট লেন্স। অভিনয় করার সময় অনেক সময় ওসব পরে নেয় অভিনেতারা, ছবিতে তাদের চোখের রঙ বদলে দেয়ার জন্যে। সেটা যখন বলল আমাকে রবিন, সন্দেহটা আপনার ওপর বাড়ল আমার। সূত্রও বলতে পারেন এগুলোকে। মনে হতে লাগল, বাদামীটা আপনার শরীরের স্বাভাবিক রঙ নয়, আর চোখের রঙও মেকসিকানদের মত গাঢ় বাদামী নয়।
না, তা নয়। মাথা নিচু করে লেন্স দুটো বের করে আনল ইসাবেল। বেরিয়ে পড়ল চোখের আসল রঙ। একেবারে টনির মত, নীল। লেন্সগুলো একটা প্লাস্টিকের কেসে ভরে রেখে দিল স্কার্টের পকেটে।
তাছাড়া, কিশোর বলল, আপনাকে ইংরেজি বলতেও শুনেছি আমি। তবে, স্প্যানিশে যখন কথা বলছিলেন, তখন সত্যিই আপনার গলা চিনতে পারিনি। আপনিই আমাকে র্যাঞ্চে ফোন করে বলেছিলেন লেকের ওপাড়ের গায়ে যেতে।
কিশোরের হাত ধরল ইসাবেল। আমি সত্যি দুঃখিত। পিরেটো আমাকে ওই বুদ্ধি বলেছিল। আমি কল্পনাই করতে পারিনি, দাঁড়টা এতটা পচা। আমি তোমাকে খুন করতে চাইনি। কেবল ভয় দেখানোর চেষ্টা করছিলাম…
যাতে শারিকে নিয়ে এখানে আসতে না পারি?
মাথা ঝাকাল ইসাবেল। আমি আতঙ্কের মধ্যে ছিলাম। ডজ এসে টনি আর ওর বাবাকে খুঁজে পেলে খুন করতে পারে, এই ভয়ে। পেসোগুলো পাওয়ার জন্যে সব করতে পারে সে। থামল মহিলা। এতই ভয় পেয়েছিলাম আমি, আরও বোকামি করেছি। বাসে তোমাদেরকে ঠেকাতে চেয়েছি, যাতে র্যাঞ্চে ঢুকতে না পার। তারপর সেদিন রাতে শারিকে চুরির চেষ্টা করেছি। আমার বোঝা উচিত ছিল, ও আমাকে কাছেই ঘেঁষতে দেবে না।
একটা পাথরের আড়াল থেকে ওয়াকিটকি বের করল ইসাবেল। ফিতে আছে ওটার। কাঁধের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাইফেলটা হাতে তুলে নিল আবার। চলো। টনির গুহায়। ওকে দেখার জন্যে অস্থির হয়ে গেছি আমি।
পিরেটোর সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে? জিজ্ঞেস করল কিশোর। ও, তাহলে এটাও জানো! সবই জানো দেখা যায়!
দুটো বারোকে নিয়ে চলেছে কিশোর। হাসল। অনেক কিছুই অজানা আছে এখনও। এই ধরুন; আপনার আসল নাম। ইসাবেল আপনার নাম নয়, তাই না?
না, নেলি। তবে তুমি ইসাবেল বলেই ডাকতে পারো।
আসলে, আমি এমন এক দেশের মানুষ, যেখানে বয়স্কদের নাম ধরে ডাকার নিয়ম নেই। সেটা অভদ্রতা। আমেরিকায় থাকলে কি হবে, রক্তের টান আর সামাজিকতা তো ভুলতে পারি না। আপনাকে আমি আন্টি বলেই ডাকব। নেলিআন্টি।
হাসল ইসাবেল। আচ্ছা, ডেকো।
কিশোর আগের কথার খেই ধরল, আমি জানি পিরেটোর একটা ওয়াকিটকি আছে। নষ্ট হয়ে গিয়েছিল, আমিই মেরামত করে দিয়েছি। আর সেদিন রাতে যখন আমাদের সঙ্গে কথা বলতে এলেন আপনি তখন রবিন আপনারটা দেখে ফেলেছিল।
উদ্বিগ্ন ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল ইসাবেল। আজ সকালে পিরেটোর সঙ্গে যোগাযোগ করার অনেক চেষ্টা করেছি। জবাব নেই। শেষবার যখন কথা বলেছি, বেশি দূরে ছিল না সে। বড় জোর একদিনের পথ। এতক্ষণে চলে আসার কথা…কিছু হয়েই গেল কিনা… দ্বিধা করল মহিলা। ডজ ওকে দেখে ফেলেছে কিনা কে জানে! তাহলে মেরে ফেলবে!
ডজ জানে পিরেটো ওর পিছু নিয়েছে?
না জানলেও আন্দাজ করতে বাধা কোথায়? হতে পারে, এ কারণেই ঘোড়ার পা খারাপের ছুতো দিয়ে রয়ে গিয়েছিল পেছনে। তারপর ঘুরে চলে গিয়েছিল, পিরেটোর জন্যে ঘাপটি মেরে ছিল কোথাও। আমাকেও দেখে থাকতে পারে। একটা বারো আর একজন মেকসিকান মহিলাকে কেয়ারই করবে না সে। কিন্তু পিরেটোকে করবে। ঠেকানোর জন্যে খুন করবে। আবার দ্বিধা করল ইসাবেল। হয়তো করে ফেলেছেও!
আপনি অযথা ভয় পাচ্ছেন, মহিলাকে অভয় দেয়ার চেষ্টা করল কিশোর। পিরেটোকে আমি চিনেছি। ডজ চালাক, সন্দেহ নেই। পিরেটো তার চেয়েও অনেক চালাক। ও অন্য জিনিস।
হ্যাঁ, নিজেকে সান্ত্বনা দেয়ার ভঙ্গিতেই যেন বলল ইসাবেল। ঠিকই বলেছ।
দ্রুত পা চালিয়েছে ওরা। যেতে যেতে কিশোর জানাল, কি করে ডজ তাকে ব্যবহার করেছে পঞ্চো ভিলার গুহা খুঁজে দেয়ার কাজে।
টনির সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছে ইসাবেল, বলল। টেপে রেকর্ড করা কথার চিঠি নিয়মিত পাঠায় টনির নামে পর্বতের ওপাশের গায়ে। টনিও তার জবাব পাঠায় লস অ্যাঞ্জেলেসে। সুতরাং শারির অন্ধ হওয়া থেকে শুরু করে পশু ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া পর্যন্ত সব খররই জানে মহিলা। টনি এ-ও জানিয়েছে, সাবধান করে দিয়েছে, ডজ হয়তো শারির সাহায্যে তাকে আর তার বাবাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করতে পারে পেসোগুলোর জন্যে।
তারপর পিরেটোর কাছ থেকে একটা চিঠি পায় ইসাবেল। তাতে জানিয়েছে, লস অ্যাঞ্জেলেসে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছে ডজ। সেখানে কোথায় উঠবে সে, তা-ও জানিয়েছে পিরেটো। ক্রসওয়ার্ড পাজল প্রতিযোগিতার কথাও জানিয়েছে। খামের ভেতরে ভরে পাজলের একটা কপি পাঠিয়েছে। লারেটোতে প্রিন্ট করেছে ওটা। পাজলে কি লিখেছে, জানা নেই পিরেটোর। তবে সন্দেহ ঠিকই করেছে, ডজ কোন একটা শয়তানীর মতলবে আছে।
আমিও প্রথমে কিছু বুঝতে পারিনি, ইসাবেল বলল। তবে ড্যাগউডস ওয়াইফ কি, বুঝেছিলাম। শারির কথা বলতে চেয়েছে ডজ। হোটেলটার ওপর নজর রাখতে লাগলাম, যেখানে ডজের ওঠার কথা। কয়েক দিন পরেই সেখানে গেল ডজ।
তারপর থেকে র্যাঞ্চারের ওপর কড়া নজর রাখতে লাগল মহিলা। একদিন তার পিছু নিয়ে গিয়ে হাজির হলো পাশা স্যালভিজ ইয়ার্ডে। গেটের কাছ থেকেই দেখল, অফিসের বারান্দায় দাঁড়িয়ে কিশোরের সঙ্গে কথা বলছে লোকটা। গাড়ি একটা ঝোপের আড়ালে রেখে হেঁটে ফিরে এল ইসাবেল। জঞ্জালের আড়ালে আড়ালে নিঃশব্দে চলে গেল কিশোর আর ডজ কি কথা বলছে শোনার জন্যে।
তোমাদেরকে কথা বলতে শুনলাম, ইসাবেল বলল। চমকে গেলাম তোমার গলা শুনে। একেবারে টনির গলা।
দুয়ে দুয়ে চার যোগ করতে আরম্ভ করল তখন মহিলা। অনেক কথাই আন্দাজ করে ফেলল। মেকসিকান রমণীর ছদ্মবেশে তিন গোয়েন্দাকে অনুসরণ করে চলে গেল লারেটোতে।
তোমাদেরকে জিপে তুলে নিতে দেখলাম ডজকে। তখন আমি চলে গেলাম লেকের ওপাশের গায়ে। একটা ঘর ভাড়া নিলাম। যোগাযোগ করলাম পিরেটোর সঙ্গে। বনের ভেতর তোমাদের ওপর চোখ রাখলাম। শারি যখন তোমার কথা শুনে তোমার ভক্ত হয়ে গেল, কি ঘটতে চলেছে বাকিটা অনুমান করতে আর অসুবিধে হল না আমার।
নীরবে পথ চলল কিছুক্ষণ দুজনে। কয়েকটা প্রশ্নের জবাব দেবেন? কিশোর জিজ্ঞেস করল।
করো।
পিরেটোর সঙ্গে আপনার পরিচয় হলো কিভাবে? আপনার আর ডজের মাঝে এমন কি ঘটেছে যে…
একজন আরেকজনকে এতটা ঘৃণা করি, এই তো?
হ্যাঁ।
তাহলে অনেক আগের কথা বলতে হয়। আমি ছোট থাকতেই আমার মা মারা যায়। একটা মেকসিকান কোম্পানিতে মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারের কাজ করত আমার বাবা। মা মারা যাওয়ার পর আমাকে মেকসিকোতে নিয়ে গেল। বাবা থাকত খনির কাজে ব্যস্ত, ওই সময়টাতে আমাকে মাঝে মাঝে দেখতে আসত পিরেটো। এই ব্যাঞ্চের মালিক ছিল তখন সে। ভালই অবস্থা ছিল তার। গরু পালত, ঘোড়া পালত। একদিন এল ডজ…
র্যাঞ্চটা নিয়ে নিল পিরেটোর কাছ থেকে। ডজের অফিসে দেখা দলিলগুলোর কথা মনে পড়ল কিশোরের।
হ্যাঁ। অনেক র্যাঞ্চারের মতই ব্যাংক থেকে টাকা ধার নিয়ে কাজ চালাত পিরেটো। ঋণ-পত্রগুলো কিনে নিল ডজ। শেষ চেষ্টা করতে চাইল পিরেটো। গরু-ঘোড়া বিক্রি করে ধার শোধ করতে চাইল। সে সুযোগ দেয়া হলো না তাকে। র্যাঞ্চ দখল করে নেয়া হলো। আমি গেলাম তখন আদালতে, পিরেটোকে সাহায্য করতে। লাভ হলো না। ওখানেও ঘুষখোর লোক আছে। তাদেরকে টাকা দিয়ে বশ করল ডজ। শেষ পর্যন্ত র্যাঞ্চটা হারাতেই হলো পিরেটোকে।
নিচের উপত্যকার দিকে তাকাল কিশোর। সেখান থেকে দৃষ্টি ছড়িয়ে দিল ওপারের পর্বতের দিকে। সে আশা করল, ইসাবেলের অনুমান ভুল, খানিক পরেই এসে হাজির হবে পিরেটো।
কিন্তু তার কোন চিহ্নই চোখে পড়ল না। আসছে না।
গরম লাগল। যেন আগুনের আঁচ। হঠাৎ করেই ঘটল ঘটনাটা। বাতাসে কোন রকম জানান দেয়নি। বদলে যেতে শুরু করেছে পরিবেশ।
গরম বাড়ছে। অন্ধকার হয়ে আসছে।
ওপরে তাকাল কিশোর। ছড়িয়ে পড়েছে ধূসর রঙের মেঘ কেঁপে উঠল পায়ের নিচের মাটি। পর্বতের চূড়াটা দেখতে পাচ্ছে। তীব্র গতিতে সেখান থেকে ওপরে উঠে গেল একঝলক ধোঁয়া। এর আগে দুবার দেখেছে ধোঁয়া, তার চেয়ে অনেক ঘন এখনকার ধোঁয়া, এবং কালো।
বুঝে ফেলল ব্যাপারটা। ইস, গাধা হয়ে ছিল নাকি এ কদিন! নিজেকেই লাথি মারতে ইচ্ছে করল তার। আরও আগেই বোঝা উচিত ছিল। মুসা তো প্রশ্নই তুলেছিল, মেঘটা অন্য রকম কেন? তারমানে, ওগুলো ধোঁয়া নয়, মেঘও নয়, বাষ্প।
আগ্নেয়গিরি!কথা সরছে না যেন কিশোরের গলা দিয়ে।
ওর হাত আঁকড়ে ধরল ইসাবেল। টেনে দাঁড় করাল। কপালের ওপর হাত নিয়ে এসে সে-ও তাকিয়ে রইল চূড়ার দিকে।
হ্যাঁ, ফিসফিসিয়ে বলল, আগ্নেয়গিরি! সিয়েরা মাদ্রেতেও আছে, জানতাম না। হাওয়াইতে দেখেছি আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত। জানি কি ঘটে। এটা ফাটতে যাচ্ছে!
উকণ্ঠিত হয়ে কিশোরের অপেক্ষা করছে টনি, রবিন আর মুসা। উত্তেজনাটা এতই ভারি লাগছে, ওদের মনে হচ্ছে গাঁইতি দিয়েও ছিদ্র করা যাবে না। বকবক করছিল টনি আর রবিন সময় কাটানোর জন্যে, এখন সেটাও বন্ধ। ভাবছে, কতক্ষণ আর ডজকে ওভাবে রাখতে পারবে? বাঁধন খোলার জন্যে মোড়া-মুড়ি করছে আর চেঁচাচ্ছে লোকটা।
ঘড়ি দেখল মুসা। দুই ঘণ্টা হয়ে গেল! আর কত? সুড়ঙ্গের শেষ মাথায় চলে এল, দেখার জন্যে, কিশোর আসছে কিনা।
চিৎকার থামিয়ে চুপ হয়ে গেল ডজ। যেন বুঝে গেছে, এসব করে কোন লাভ হবে না। যে ভাবে বাঁধা হয়েছে, তাতে শোয়ার চেয়ে বসে থাকাটা সহজ এবং আরামের মনে হলো বুঝি তার কাছে।
টনি, অনুনয় করল ডজ, আমাকে এক গেলাস পানি দেবে? গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। ঢোক গিলতে পারছি না।
পরস্পরের দিকে তাকাল রবিন আর টনি।
মাথা ঝাঁকাল রবিন।
দিচ্ছি, টনি বলল। উঠে গিয়ে মাটির জগটা নিয়ে এল ডজের কাছে।
রবিন যেখানে বসেছে সেখান থেকে ভালমত দেখতে পেল না এরপর যা ঘটল। ডজের মুখের কাছে টনিকে জগটা তুলতে দেখল সে। পরমুহূর্তেই মেঝেতে পড়ে চুরমার হয়ে গেল জগ। টনির গলার পাশে ছুরি চেপে ধরেছে ডজ।
বাঁধন খুলে ফেলেছে ডজ। দড়ির কাটা টুকরো ঝুলছে কব্জি আর গোড়ালি থেকে।
গাধার দল! হা হা করে বুনো হাসি হাসল ডজ। আমাকে ধরার পর সার্চ করা উচিত ছিল। করোনি। বুটের ভেতর ছুরিটা রয়ে গেছে দেখনি।
আরেকটু বাড়াল ছুরির চাপ। নড়লেই গলার প্রধান রক্তবাহী শিরা জুগুলার ভেইন কেটে দেয়ার হুমকি দিল।
রবিন, কর্কশ গলায় ডাকল ডজ। টনির রাইফেলটা নিয়ে এসো। জলদি করো।
খামোকা হুমকি দিচ্ছে না লোকটা। কথা না শুনলে ঠিকই কেটে দেবে টনির শিরা। দেয়ালে ঠেস দিয়ে রাখা হয়েছে রাইফেলটা। তুলে নিয়ে ডজের দিকে এগোল রবিন।
রাখ ওখানেই, ডজ বলল। আর এগোনোর দরকার নেই।
ডজের কণ্ঠস্বরে এমন কিছু রয়েছে, বরফের মত জমে গেল যেন রবিনের রক্ত। টনিকে খুন করার একটা ছুতো খুজছে কেবল র্যাঞ্চার। রাইফেলটা হাত থেকে ছেড়ে দিল রবিন।
টনির গলায় ছুরি চেপে রেখেই হাত বাড়িয়ে রাইফেলটা তুলে নিল ডজ। লাফিয়ে উঠে পিছিয়ে গেল এক পা। ছুরিটা কোমরের বেল্টে গুঁজে রাখল। সেফটি ক্যাচ অফ করে দিয়ে বোল্ড টানল রাইফেলের। কঠিন গলায় আদেশ দিল, যাও, সরো এবার। দেয়ালের দিকে মুখ করে হাত তুলে দাঁড়াও।
কিশোরকে দেখলাম না। তবে অদ্ভুত কিছু একটা…
বলতে বলতে গুহায় ঢুকল মুসা। মুখের কথা মুখেই রয়ে গেল। চোখ বড় বড় করে দেখল দেয়ালের দিকে মুখ করে হাত তুলে দাঁড়িয়েছে রবিন।
হচ্ছেটা কি… এবারেও কথা শেষ করতে পারল না মুসা। চোখ পড়ল ডজের ওপর। ওর হাতে রাইফেল। তাক করে রেখেছে মেঝেতে বসা টনির দিকে। মুসার দিকে ঘুরল নলটা। বাহ, এসে গেছ। যাও, তুমিও যাও দেয়ালের কাছে। টনিকে ধমক দিল, এই, তুমি বসে রইলে কেন?
রবিন জানাল মুসাকে, ওর বুটের ভেতর ছুরি ছিল। সেটা দিয়ে…
চুপ! ধমক দিয়ে তাকে থামিয়ে দিল ডজ। মুসা আর টনিকে আবার যেতে বলল দেয়ালের কাছে।
এতই রাগ লাগছে মুসার, একটা মুহূর্তের জন্যে ভাবল, রাইফেলের পরোয়া না করে ছুটে যাবে কিনা। আবছা অন্ধকারে ছুটন্ত একটা নিশানাকে মিস করতেও পারে ডজ। পরক্ষণেই বাতিল করে দিল ভাবনাটা। পায়ে পায়ে গিয়ে দাঁড়াল দেয়ালের কাছে। তার পাশে এসে দাঁড়াল টনি।
এবার কি করব? ফিসফিস করে বলল মুসা।
কিশোর না আসাতক এভাবেই থাক, ফিসফিস করেই জবাব দিল রবিন।
শুনে ফেলল ডজ। হ্যাঁ, থাক ওভাবেই। একদম নড়বে না। খিকখিক করে হাসল সে। নড়েচড়ে দেখতে পারো অবশ্য। তিনজনের খুলিতে তিনটে গুলি ঢোকাতে পারলে খুশিই হব এখন আমি। ঝামেলা শেষ। রাইফেলের বিরুদ্ধে কিছু করার নেই। চুপ হয়ে গেল ওরা।
এখন যা বলি, শোনো, ডজ বলল আবার। যদি বাঁচতে চাও। টনি, তোমাকে প্রশ্ন করব। ঠিকঠিক জবাব দেবে। নইলে গুলি খাবে তোমার বন্ধুরা।
চুপ করে আছে টনি।
তোমার বাবা কোথায়?
দ্বিধা করছে টনি।
এদিকে ফের।
আদেশ হলো কর্কশ কণ্ঠে।
ঘুরল টনি। দেখল, ডজের আঙুল চেপে বসছে ট্রিগারে।
পর্বতের ওপাশের গায়ে গেছে, জবাব দিল টনি।
কখন ফিরবে?
মিথ্যেটা বেরিয়ে গিয়েছিল মুখ থেকে, শেষ মুহূর্তে সামলে নিল টনি। ডজ যদি বুঝে ফেলে মিছে কথা বলছে সে, রবিন আর মুসার বিপদ হয়ে যাবে।
আরও দুদিন লাগবে।
পঞ্চো ভিলার গুহাঁটা পেয়েছ?
পেয়েছি।
ওটাই যে সেই গুহা কি করে বুঝলে?
ভিলার সৈন্যদের একজনের কঙ্কাল পেয়েছি ওখানে।
হুঁ। এক কাজ করো। দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেল তোমার বন্ধুদের। আমাকে যেমন বাধা হয়েছিল, তেমন করে।
গুহার একধার থেকে গিয়ে দড়ি বের করে আনল টনি।
মুসা, আদেশ দিল ডজ, হাঁটু গেড়ে বসো। হাত আন পিঠের ওপর।
নড়ল না মুসা। গটমট করে তার কাছে এসে দাঁড়াল ডজ। রাইফেলের নল ঠেকাল ঘাড়ে। ঠান্ডা ইস্পাতের স্পর্শে শিউরে উঠল মুসা। ঢোক গিলল।
জলদি করো!
বিড়বিড় করে নিজেকেই একটা গাল দিল মুসা, অসতর্ক হয়েছিল বলে। হাঁটু গেড়ে বসে পিঠের ওপর হাত নিয়ে এল।
ঢিল করে বাঁধল প্রথমে টনি। কিন্তু ফাঁকিটা ধরে ফেলল ডজ। শক্ত করে বাঁধার জন্যে ধমক লাগাল ওকে।
রবিনকেও বাঁধা হলো।
ডজ বলল, এবার কিছু প্রশ্নের জবাব জানা দরকার আমার। বাধাই তো আছি, রবিন বলল। আর জবাব দিয়ে কি হবে?
হেসে উঠল টনি আর মুসা।
চুপ! চেঁচিয়ে উঠল ডজ। রাইফেলের নল দিয়ে খোঁচা মারল রবিনের বুকে। রাগে জ্বলে উঠল রবিনের চোখ। কিছু বলল না। দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করল।
কিশোর গেছে কোথায়? জানতে চাইল ডজ।
আমরাও তো সে কথাই জানতে চাইছি, মুসা বলল। বোধহয় পিজা-টিজা কিনতে গেছে।
বাজে কথা রাখ!
ডজের চেহারা দেখতে পাচ্ছে টনি। জবাব না পেলে অনর্থ ঘটাবে ওই লোক, বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে না তার। সে তখন বলল, ইসাবেলের খোঁজে।
ইসাবেল কে?
আমরা জানি না। শুধু জানি, মহিলা মেকসিকান। তিন গোয়েন্দার কাছে যা যা শুনেছে, সেভাবে চেহারার বর্ণনা দিল। কয়েক দিন ধরে নাকি ওদেরকে অনুসরণ করে এসেছে। আজ সকালে তার বারোটাকে দেখেছি গুহার বাইরে। কাজেই শারির সাহায্যে ওটাকে নিয়ে গেছে কিশোর ইসাবেলকে খুঁজে বের করার জন্যে।
বন্দুক-টন্দুক আছে মহিলার কাছে?
দ্রুত ভাবছে টনি। আছে, সেটা বলা কি ঠিক হবে? ওরা তো নিশ্চিত নয়। বলল, আমরা জানি না।
বেশ। সতর্ক থাকতে হবে আরকি আমাকে। কালো চুলের বেনি। রাইফেলটা রবিনের দিক থেকে টনির দিকে ফেরাল ডজ। আমাকে ভিলার গুহায় নিয়ে চল। কোন চালাকির চেষ্টা করবে না। আমি তোমার পেছনেই থাকব।
গুহা থেকে বেরিয়ে গেল দুজনে। সুড়ঙ্গে ওদের জুতোর শব্দ শোনা গেল।
পদশব্দ মিলিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাঁধন খোলার চেষ্টা চালাল দুই গোয়েন্দা।
হাত খুলতে পারবে? জিজ্ঞেস করল মুসা।
হুডিনির মত জাদু জানলে পারতাম। তুমি?
একই অবস্থা। কিশোরটা যে কোথায় গেল!
চলে আসবে ঠিকমতই, দেখো। ওকে বোকা বানানো কঠিন। সব সময়ই একটা না একটা বুদ্ধি বের করে ফেলে। ডজকে দেখে ফেললেই আন্দাজ করে ফেলবে কি ঘটেছে। তাছাড়া তার সঙ্গে রয়েছে শারি। আগে থেকেই হুঁশিয়ার করে দিতে পারবে কিশোরকে।
তা বটে।…আচ্ছা, একটা গন্ধ পাচ্ছ?
নাক কুঁচকে শ্বাস টানল রবিন। মনে হয় পচা ডিমের।
বাইরে অদ্ভুত কিছু ঘটছে, মুসা বলল। আমি যে তখন বাইরে গিয়েছিলাম, দেখি, কালো হয়ে গেছে সব কিছু। যেন রাত নামছে পর্বতে। ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ছে সমস্ত আকাশে। …হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ, পচা ডিমের মতই গন্ধ।
আগেও কয়েকবার ধোঁয়া দেখেছি, মনে আছে? আচমকা চিৎকার করে বলল রবিন, পচা ডিম নয়, গন্ধক! আগ্নেয়গিরিতে থাকে! খোদা, একটা জ্যান্ত আগ্নেয়গিরির ওপরে বসে আছি আমরা!
কোটর থেকে বেরিয়ে আসবে যেন মুসার চোখ। খাইছে! এই গুহায় থাকলে আমাদের তো কিছু হবে না! কিন্তু কিশোরের? সে তো রয়ে গেল বাইরে।
শুয়ে পড়ুন! বলে উঠল কিশোর। জলদি! শুয়ে পড়ুন!
আগ্নেয়গিরির মুখ থেকে ভলকে ভলকে উঠছে কালো ধোঁয়া। সেদিকে তাকিয়ে রয়েছে ইসাবেল। কালো কুয়াশার মত ঢেকে ফেলেছে পর্বতের চূড়া। মহিলার হাত ধরে টেনে তাকে একটা বড় পাথরের আড়ালে নিয়ে গেল সে।
কি হয়েছে?
আস্তে বলুন! ফিসফিসিয়ে বলল কিশোর। ডজ!
কিছু ছাই ঝরে পড়ল আকাশ থেকে। জোরাল বাতাস বইছে। ধোঁয়া সরিয়ে নিচ্ছে। বাতাসে রাসায়নিক পদার্থের গন্ধ। সাবধানে মাথা বের করে উঁকি দিল কিশোর। আধ মাইল মত দূরে রয়েছে র্যাঞ্চার। এদিকেই আসছে। সে একা নয়।
ওর আগে আগে হাঁটছে টনি। ঘাড়ের পেছনে দুই হাত তোলা। পিঠের দিকে রাইফেল তাক করে রেখেছে ডজ।
টনি! ইসাবেলও দেখেছে ছেলেকে।
হাত চেপে ধরে তাকে আটকে রাখতে হলো কিশোরকে। নইলে ছুটে বেরিয়ে যাচ্ছিল মহিলা।
ওভাবে হবে না, নিচু স্বরে বলল কিশোর। টনিকে বাঁচাতে পারবেন না। গুলি খাবেন ডজের।
যে-কোন মুহূর্তে, ভাবছে সে, বারো দুটোকে দেখে ফেলতে পারে ডজ। টনির ওপর কড়া নজর না থাকলে এতক্ষণে দেখে ফেলত।
রাইফেল তুলল ইসাবেল। ওর হাতে গুলি করার চেষ্টা করি। বাঁট ঠেকাল কাঁধে। নল রাখল পাথরের ওপর।
সাবধানে নিশানা ঠিক করল সে। ট্রিগারে চেপে বসতে শুরু করল আঙুল। টিপে দিল পুরোপুরি।
গুলির শব্দের অপেক্ষা করছে কিশোর। কিছুই ঘটল না। বেরোল না গুলি।
আবার ট্রিগার টিপল ইসাবেল। হলো না কিছু এবারেও। আবার টিপল। আবার।
সেফটি ক্যাচ! কিশোর বলল। অন করা আছে।
দ্রুত হাতে ক্যাচ অফ করে দিল ইসাবেল। আবার নিশানা করল। কিন্তু দেরি হয়ে গেছে। বারো দুটোকে দেখে ফেলেছে ডজ। লাফিয়ে এসে টনির কাঁধ চেপে ধরল। ওর শরীর দিয়ে আড়াল করল নিজেকে।
রাইফেল নামাল ইসাবেল। মৃদু কণ্ঠে স্প্যানিশ ভাষায় কি বলল, বোঝা গেল। গালই দিল বোধহয়।
বেল্ট থেকে ছুরি খুলে নিল ডজ। টনির পিঠে ঠেকাল। ওকে হাঁটতে বলে নিজেও পা বাড়াল পেছনে।
ইসাবেলের কাঁধের ওয়াকিটকিটা নিজেই খুলে নিল কিশোর। সুইচ অন করল মেসেজ পাঠানোর জন্যে। ঠোঁটের কাছে ধরে বলল, পিরেটো! পিরেটো! শুনতে পাচ্ছেন? স্প্যানিশ ভাষায় বলল সে। পিরেটো! কাম ইন! ওভার।
রিসিভ করার জন্যে সুইচ টিপল। নীরবতা।
পরের একটা মিনিট চেষ্টা চালিয়ে গেল কিশোর। একশ গজ দূরে আছে আর ডজ এগিয়ে আসছে। টনির পিঠে ছুরি ঠেকানো।
ওয়াকিটকি নামিয়ে রেখে ইসাবেলের বাহুতে হাত রাখল কিশোর। আপনার উইগ পরে নিন।
তাড়াতাড়ি পকেট থেকে পরচুলা বের করে পরে নিল ইসাবেল। দশ গজ দূরে এসে দাঁড়িয়ে গেল ডজ।
ইসাবেল, বেরিয়ে আসুন, ডাক দিল সে।
নড়ল না ইসাবেল।
ভয় পাবেন না, স্প্যানিশ ভাষায় বলছে ডজ। আমি জানি ওই পাথরের আড়ালেই আছেন আপনি। ছেলেরা আপনার কথা সব বলেছে আমাকে। আমাদেরকে অনুসরণ করে আপনি এসেছেন এখানে। আমার রাইফেলটাও পেয়েছেন। যা হবার হয়েছে। আসুন। দেখি, একটা রফায় আসতে পারি কিনা আমরা।
উঠে দাঁড়াল ইসাবেল। দুহাতে চেপে ধরেছে রাইফেল।
কিশোর বসেই রইল। ভাবছে, মুসা আর রবিনকে কোন ভাবে কাবু করে ফেলেছে র্যাঞ্চার। বোধহয় ওই ছুরি দিয়েই বাঁধন কেটে ফেলেছিল। যেটা ঠেকিয়ে রেখেছে টনির পিঠে। তবে যতক্ষণ ডজ না জানছে সে এখানে রয়েছে, ততক্ষণ চমকে দেয়ার একটা আশা রয়েছে। হয়ত সুযোগ বুঝে কাবু করে ফেলতে পারবে লোকটাকে।
রাইফেলের ট্রিগারে ইসাবেলের আঙুল।
আপনাকে আমি চিনি, ইসাবেল বলল, সিনর মরিস। পঞ্চো ভিলার পেসের খোঁজে এসেছেন।
ঠিকই ধরেছেন, স্বীকার করল ডজ। আপনিও এসেছেন সেজন্যেই।
মাথা কঁকাল ইসাবেল। আমি জানি কোথায় লুকানো আছে ওগুলো। আপনি জানেন না।
জেনে যাব। টনিকে ঠেলা দিল ডজ চলার জন্যে, নিজেও এগোল। এই ছেলেটা আমাকে নিয়ে যাবে সেখানে ও আর ওর বাবা মিলে জায়গাটা বের করে ফেলেছে।
ভুল বলেছে আগে জানত, এখন আর জানে না। কাল আমি গুহাঁটা পেয়ে গিয়ে পেসোগুলো সরিয়ে ফেলেছি। ছুরিটা সরান। তারপর, আসুন কথা বলি, দেখি কি করা যায়।
বেশ। ছুরিটা বেল্টে গুজল আবার ডজ। দুজনেই আমরা সমান সমান অবস্থায় আছি। দুজনের কাছেই রাইফেল। তবে পেসেগুলো এই এলাকা থেকে সরাতে হলে আপনাকে আমার সাহায্য নিতেই হবে। পর্বতের চূড়ার দিকে তাকল সে। ওটাও আর সময় পেল না আগুন ছিটানোর!
এখনও এগোচ্ছে ডজ, ধীরে ধীরে, টনিকে বর্ম বানিয়ে।
থামুন! কড়া গলায় বলল ইসাবেল। কিন্তু বিপদটা আঁচ করতে দেরি করে ফেলেছে।
ওর দিকে তাকিয়ে রয়েছে ডজ। দাঁতে দাঁত চেপে বলল, তুমি! ইংরেজিতে বলছে সে এখন, মেকসিকান উইগ দিয়ে বোকা প্রায় বানিয়ে ফেলেছিলে! কিন্তু ওই নীল চোখ লুকাবে কোথায়, নেলি?
কন্টাক্ট লেন্স লাগাতে ভুলে গিয়েছিল ইসাবেল।
তারপর পলকে ঘটে গেল অনেকগুলো ঘটনা।
রাইফেল তুলতে শুরু করল ইসাবেল। লাফিয়ে একপাশে সরে গেল ডজ। নিশানা করল ইসাবেলের দিকে।
গুলির শব্দ শুনল কিশোর।
ডজের হাত থেকে যেন উড়ে চলে গেল রাইফেলটা। পাঁচ গজ দূরে পাথরের ওপর গিয়ে পড়ল।
লাফ দিয়ে বেরিয়ে এসে একটানে লোকটার কোমরে গোঁজা ছুরি কেড়ে নিল কিশোর।
খটাখট খটাখট শোনা গেল খুরের শব্দ।
ঘোড়া ছুটিয়ে এল পিরেটো। হাতে একটা .৪৫ ক্যালিবারের কোন্ট পিস্তল। সেটা তাক করল ডজের দিকে। হুঁশিয়ার করল, পরের বার আর বাঁটে সই করব না, মাথায় করব। ইসাবেলের দিকে তাকাল। মহিলাও তার রাইফেল তাক করে রেখেছে ডজের দিকে। এইবার সেফটি ক্যাচ অফ করা আছে।
গুলি করো না, ইসাবেলকে বলল পিরেটো। ছেড়ে দাও। গুলি করে মারলে লাশ কবর দেয়ার সময়ও পাব না। আর কবর না দিতে পারলে, খোলা জায়গায় শকুনের খাবার বানিয়ে রেখে গেলে অভিশাপ লাগবে আমাদের ওপর।
ডজের দিকে তাকাল সে। চিৎকার করে বলল, যাও, ভাগ! গিয়ে খুঁজে বের করো তোমার পেসো!
কালো হয়ে গেছে ডজের মুখ, রাগে। চোখে তীব্র ঘৃণা।
যাও! যাচ্ছ না কেন? স্প্যানিশ ভাষায় আবার ধমকে উঠল পিরেটো। পঞ্চো ভিলার গুহায় যাও। টনিকে সঙ্গে নেয়ার আর দরকার নেই। ওটাতে যাওয়ার জন্যে যথেষ্ট চিহ্ন দেখতে পাবে। পায়ের ছাপের ছড়াছড়ি এখন ওপথে।
এক সেকেও পিরেটোর দিকে তাকিয়ে রইল ডজ। ওর চোখে খুনীর দৃষ্টি দেখতে পেল কিশোর। কিন্তু কিছু করার নেই। পুরোপুরি অসহায় এখন। গুলি করে ওর রাইফেলের বাট ভেঙে দিয়েছে পিরেটো। ছুরি কেড়ে নিয়েছে কিশোর। ঘুরে দাঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করল ভিলার গুহাঁটা যেদিকে রয়েছে সেদিকে।
পরস্পরকে জড়িয়ে ধরল মা-ছেলে। ঘোড়া থেকে নামল পিরেটো। হতচ্ছাড়া এই ওয়াকিটকি! কাল রাতে হাত থেকে পড়ে গিয়ে আবার নষ্ট হয়ে গেছে। শব্দই বেরোচ্ছে না।
চূড়ার দিকে তাকাল কিশোর। আরেক ভলক কালো ধোঁয়া বেরোল।
রবিন আর মুসাকে বের করে আনা দরকার, বলল সে। গুহায় আটকা থাকলে মরবে।
মুখের ভেতর দুই আঙুল পুরে জোরে শিস দিল পিরেটো। ঢালের ওপাশ থেকে ছুটতে ছুটতে এল আরেকটা ঘোড়া। চিনতে পারল কিশোর ডজ ওটাতে করেই এসেছিল।
ওটাকে বাঁধা দেখলাম, পিরেটো জানাল। খুলে নিয়ে এসেছি। চলো, জলদি চলো, পালাই এখান থেকে।
কিশোর চড়ল শরির পিঠে। ইসাবেল তার নিজের বারোতে, আর টনি চড়ল ডজের ঘোড়ায়। আগে আগে রওনা হলো কিশোর, টনির গুহার দিকে।
গুহা থেকে শখানেক গজ দূরে থাকতে কি যেন এসে বিধল কিশোরের গালে। তারপর হাতে। কপালে হাত রেখে ওপরে তাকাল সে।
পাথর-বৃষ্টি হচ্ছে!
খুদে পাথর ঝরে পড়ছে আকাশ থেকে। একটা পড়ল কাঁধে। ফেলার চেষ্টা করল ওটাকে সে। ছ্যাকা লাগল হাতে। কিছুতেই শার্ট থেকে খুলতে না পেরে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল। পাথর নয়। ছোট একটা কাচের পুঁতি, আগুনের মত গরম।
পাহাড়ের চূড়ায় ঘটছেটা কি? দেখা যাচ্ছে না এখান থেকে। তবে সাংঘাতিক বিপদ যে আসছে তাতে কোন সন্দেহ নেই।
শারিকে আরও জোরে চলার তাগাদা দিল কিশোর। পেছনে শুনতে পাচ্ছে ঘোড়াগুলোও চলার গতি বাড়িয়ে দিয়েছে। মিনিট খানেক পরেই দেয়ালের মত ঢালটার কাছে চলে এল ওরা। থামল।
জিনের নিচে ভাঁজ করে রাখা কম্বলটা বের করল পিরেটো। ছুরি দিয়ে কেটে ফালা ফালা করতে লাগল।
ততক্ষণে রওনা হয়ে গেছে কিশোর। তাকে ডেকে বলল পিরেটো, তাড়াতাড়ি আসবে।
সুড়ঙ্গে ঢুকল কিশোর। গুহায় এসে দেখল, পিঠে পিঠ লাগিয়ে বাঁকা হয়ে আছে মুসা আর রবিন। মুসা সবে রবিনের বাঁধনের একটা গিঁট খুলেছে।
ডজের ছুরি দিয়ে দ্রুত ওদের বাঁধন কেটে মুক্ত করল কিশোর।
আমি তো ভেবেছি পিজা কিনতে দেরি করছ। হাত-পা ছড়িয়ে, ঝাড়া দিয়ে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক করে নিতে লাগল মুসা। তারপর? কোথায় দোকানটা?
রবিনও মুসার মতই হাত-পা ঝাড়ছে। তাকিয়ে রয়েছে কিশোরের মাথার দিকে। ব্যাপার কি? মাথায় পুঁতি পরার শখ হলো কেন হঠাৎ?
চুলে আঙুল চালিয়ে ওগুলো ফেলার চেষ্টা করল কিশোর। ঠান্ডা হয়ে গেছে পুঁতির মত জিনিসগুলো, কিন্তু আটকে গেছে এমন করে, আঙুল দিয়ে চিরুনি চালিয়ে কিছুতেই সরাতে পারল না। আকাশ থেকে পড়ল। গরম কাচের টুকরো। এসো, বেরোও, জলদি।
সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে মাথা নিচু করে প্রায় দৌড়ে বেরোল ওরা। কাচ-বৃষ্টি বন্ধ হয়েছে আপাতত। কম্বলের লম্বা কয়েকটা টুকরো ওদেরকে দিয়ে বলল পিরেটো, নাও, মাথায় জড়াও। হাতেও পেঁচিয়ে নাও। খোলা রাখবে না। ওর নিজের মাথায় আর হাতে ইতিমধ্যেই জড়ানো হয়ে গেছে।
লাল শালটা দিয়ে মাথা আর কাঁধ ঢেকেছে ইসাবেল।
চলো, এবার যাই, তাগাদা দিল পিরেটো।
কাউকে বলতে হলো না। মুসা চড়ে বসল টনির পেছনে। রবিন পিরেটোর।
এই বার আগে আগে চলল মেকসিকান। আঁকাবাঁকা পাহাড়ী পথে জোরে চলা বিপজ্জনক, কিন্তু পরোয়া করল না সে, বার বার তাগাদা দিতে লাগল ঘোড়াকে। নেমে চলল নিচের উপত্যকার দিকে। যে নালাটা পাহাড়ের ঢালে গভীর খাত সৃষ্টি করে নেমেছে, সেটাতে নেমে আরও তাড়াতাড়ি চলার নির্দেশ দিল পিরেটো। পেছনে ভারি একটা গুড়গুড় শোনা গেল, মেঘ ডাকার মত। বাতাসে গন্ধকের গন্ধ বেড়ে গেছে, শ্বাস নেয়াই কঠিন।
নালায় নামার খানিক পরেই ঘটল ঘটনাটা। আধ মাইল দূরেও নেই আর গুহাঁটা, এই সময় পেছনে ফেটে পড়ল যেন আগ্নেয়গিরি। মুসার মনে হলো, বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয়ে গেছে গোটা পর্বত।
চূড়া থেকে খাড়া উঠে গেল গরম গলিত লাভা, ফোয়ারার মত ঝরে পড়তে লাগল। আরও লাভা ছিটকে উঠল ওপরে। পড়ল, উঠল। প্রতিবারেই আরও বেশি ওপরে উঠে যাচ্ছে। ওপরে উঠে এমন করে ছড়াচ্ছে, দূর থেকে দেখলে মনে হবে বাজি পোড়ানো হচ্ছে। অসংখ্য বোমা ফাটার মত শব্দ হচ্ছে জ্বালামুখের ভেতরে। কানে তালা লাগানোর জোগাড়। শুধু যে লাভা বেরোচ্ছে তা নয়, সাথে করে পর্বতের গভীর থেকে নিয়ে আসছে পাথর। ঢাল বেয়ে গড়াচ্ছে সেগুলো ৷ গনগনে কয়লার মত গরম। নামতে শুরু করেছে লাভার স্রোত।
ক্রমেই জোর বাড়ছে লাভার। শত শত ফুট ওপরে উঠে যাচ্ছে এখন। ব্যাঙের ছাতার মত ছড়িয়ে গিয়ে ধীরে ধীরে ঝরে পড়ছে পাথরের ওপর। ঢাল বেয়ে নামছে। চলার পথে ঢেকে দিয়ে আসছে পাথর, গাছপালা সব কিছু। বাষ্প উঠছে। এদিক-ওদিক থেকে এসে মিলিত হচ্ছে লাভার একাধিক স্রোত। যতই নামছে চওড়া হচ্ছে আরও গলিত লাভার নদী হয়ে নামছে নিচের দিকে।
গরম ছাই, পাথরের কুচি আর কাচের টুকরোর বৃষ্টি পড়তে লাগল যেন অভিযাত্রীদের ওপর। চমকে চমকে উঠছে ভীত জানোয়ারগুলো। গরম পাথর আর কাচের ছ্যাঁকা লাগছে ওগুলোর তোলা চামড়ায়। আর সইতে না পেরে পিরেটোর ঘোড়াটা দাঁড়িয়ে গেল হঠাৎ পেছনের দুই পায়ে ভর করে। পরক্ষণেই মাটিতে নেমে লাথি মেরে যেন তাড়ানোর চেষ্টা করতে লাগল অবাঞ্ছিত বিপদকে। পিরেটোও নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না ঘোড়াটাকে। ওর কোমর জড়িয়ে ধরে রেখেছে রবিন।
শারিকে নিয়ে এসো! চেঁচিয়ে উঠল পিরেটো।
বারোটাকে নিয়ে দ্রুত এগোল কিশোর।
ঘোড়াগুলোর মাঝে ঢুকিয়ে দাও ওকে! পিরেটো বলল। শান্ত করুক!
লম্বা দম নিল কিশোর। তারপর প্রায় চোখমুখ বুজে বারোটাকে নিয়ে এগোল আতঙ্কিত দুটো ঘোড়ার মাঝের সরু ফাঁকে ঢোকানোর জন্যে।
ওদের মাঝে একটা শান্ত জানোয়ারকে দেখে ধীরে ধীরে ঘোড়াগুলোও শান্ত হয়ে এল। দুলকি চালে চলছে শারি। ঘোড়াগুলোও একই রকম করে চলতে লাগল।
পাথর-বৃষ্টি পাতলা হয়ে এল জোরাল বাতাসে। নাকে এসে ঝাপটা মারল বাতাস। গন্ধকের গন্ধে দম আটকে যাওয়ার অবস্থা হলো কিশোরের! তাড়াতাড়ি কম্বলের টুকরো দিয়ে নাকমুখ চাপা দিল। আশঙ্কা হতে লাগল তার, এখান থেকে বেঁচে ফিরতে পারবে তো?
পেছনে ফিরে তাকাল রবিন। এগিয়ে আসছে আগুন-গরম, লাল রঙের গলিত লাভা। পাথর গলিয়ে ফেলছে। আগে আগে ছুটছে প্রাণ ভয়ে ভীত ছোট ছোট জানোয়ারের দল, চিৎকার করে উড়ছে পাখিরা। জ্বলে উঠছে ঝোঁপঝাড়। শিল-নোড়া দিয়ে কাচ গুঁড়ো করার মত একটা শব্দ উঠছে কড়কড় কড়কড় করে। লাভার নদী বয়ে আসার সময়ই হচ্ছে শব্দটা।
গেছি, ভাবল সে। এভাবেই তাহলে মরণ লেখা ছিল কপালে! মুসাকে বলল, যাক, আর দশজনের মত সাধারণ মৃত্যু হচ্ছে না আমাদের।
ঠিক, জবাব দিল মুসা। আগ্নেয়গিরির লাভায় চাপা পড়ে মরার ভাগ্য কজনের হয়?
পর্বতের দিকে তাকিয়ে রয়েছে দুজনে। ছুটে আসা লাভার উত্তাপ এসে লাগছে চোখে, জ্বালা করছে। কিন্তু তার পরেও চোখ বন্ধ করল না, জোর করে পাতা মেলে তাকিয়ে রইল সেদিকে।
কাচ ভাঙার শব্দ বাড়ছে। সেই সাথে মারাত্মক ওই আগুনের নদীর ওপর কালো এক ধরনের আস্তর পড়ছে। জমে যাচ্ছে লাভা। ঢাল বেয়ে গড়ানো কমছে। আশা ঝিলিক দিয়ে গেল রবিনের মনে। গড়িয়ে গড়িয়ে যেন অনেক কষ্টে এগোল আরও কয়েক গজ, আগের সে জোর নেই, তারপর থেমে গেল একেবারেই।
ছাই আর গরম পুঁতি-বৃষ্টিও বন্ধ হয়ে আসছে। দেখতে দেখতে সেসব পেছনে ফেলে এল ভীত ঘোড়া আর বারোগুলো।
অবশেষে বিপদসীমা ছাড়িয়ে আসতে পারল ওরা।
আরও আধ মাইল পর পৌঁছল উপত্যকায়। পিরেটো ওদেরকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল পরের পর্বতটার দিকে। কিছুদূর গিয়ে থামল।
বিষাক্ত ধোঁয়া আর গ্যাসের মধ্যে শ্বাস নিয়েছে, এতক্ষণে তার জের শুরু হলো। কাশতে আরম্ভ করল সবাই। নাক উঁচু করে বড় বড় দম নিয়ে টেনে নিতে লাগল তাজা বাতাস। ফিরে তাকাল আগ্নেয়গিরির দিকে।
পিরেটো দেখতে পেল তাকে প্রথমে। হাত তুলে দেখাল অন্যদেরকে। বহু দূরে একটা মূর্তি লাফিয়ে চলেছে পাথর থেকে পাথরে। পড়ে যাচ্ছে, হাঁচড়েপাঁচড়ে উঠছে আবার, সরে আসার চেষ্টা করছে ভিলার গুহার কাছ থেকে।
পর্বতের ওদিকটায় লাভার স্রোত সবে চূড়ার একটা নিচে নেমেছে, তরল রয়েছে এখনও, নেমে আসতে শুরু করল দ্রুত। সামনে এখন জীবন্ত যা কিছু পড়বে, ধ্বংস করে দেবে ওই মৃত্যু নদী!
পর্বতের ভেতরে শব্দ অদ্ভুত সব কান্ড করে। আগ্নেয়গিরির গর্জনকে ছাপিয়েও কি ভাবে জানি শোনা গেল ডজের আতঙ্কিত চিৎকার। একবারই, তারপর হারিয়ে গেল গলিত লাভার নিচে। ঢেকে দিয়ে ছুটে নামতে থাকল মারাত্মক ওই তরল পদার্থ।
চোখ বন্ধ করে ফেলল চার কিশোর। কিশোর ভাবছে, বাজে লোক ছিল ডজ মরিস, সন্দেহ নেই। কিন্তু তার খাবার খেয়েছে ওরা, তার বাড়িতে থেকেছে, এক সঙ্গে অভিযানে বেরিয়েছে। ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল। সাধারণ ভাবে মরলে এতটা খারাপ লাগত না। কিন্তু এরকম ভয়াবহ মৃত্যু! মনই খারাপ হয়ে গেল।
নিজের বুকে ক্রুশ আঁকল পিরেটো। বিড়বিড় করে প্রার্থনা করল স্প্যানিশ ভাষায়।
তোমাকে বলেছিলাম না, কিশোরকে বলল সে। বিপদ আছে পাহাড়ে। দেখলে তো।
পাহাড়ের পাদদেশের পথ ধরে এগোল আবার ওরা। পিরেটোর পাশে পাশে চলছে ইসাবেল। পিরেটো, কিছু মনে কোরো না। জানি, তোমার লোভ নেই, কিন্তু পেসেগুলো পেলে অনেক সুবিধে হত। র্যাঞ্চটা আবার কিনে নিতে পারতে।
কে জানে? পিরেটো বলল আনমনে, আপনাআপনিই হয়তো আমার র্যাঞ্চ আমার কাছে ফিরে আসতে পারে আবার।
হাসল সে। লোভের ছিটেফোঁটাও নেই সে হাসিতে।
ভিলার গুহাঁটার কথা প্রথম শুনি মায়ের কাছে, জানাল মেকসিকান। মা আমাকে বলেছিল, অভিশপ্ত ওই পেসো কেউ কোনদিন পাবে না। ভিলার বহু লোক মারা গেছে এর জন্যে। এখনও মরা সৈন্যদের প্রেতাত্মা পাহারা দিচ্ছে ওগুলোকে। একটা মুহূর্ত থামল সে। তারপর বলল, পাহারা দিয়ে যাবে আজীবন।
বিপদ সীমার বাইরে থেকে, আগ্নেয়গিরিকে বহুদূর দিয়ে ঘুরে চলতে লাগল দলটা। পর্বতের ওপাশের গাঁয়ে যাবে, যেখানে আগ্নেয়গিরির উৎপাত পৌঁছতে পারে না। তাছাড়া ঘনঘন অগ্ন্যুৎপাত হয় বলে কাছাকাছি থাকেনি লোকে, এমন জায়গায় রয়েছে যেখানে লাভা পৌঁছতে পারে না কোনমতেই। এমনকি গরম ছাইও না।
কথাবার্তা তেমন বলছে না ওরা। কিশোরের মন এখন শান্ত। রহস্যের সমাধান হয়ে গেছে।
পিরেটোর কাছে ভিলার গুপ্তধনের কথা প্রথম শুনেছে ইসাবেল। ১৯১৬ সালে, ওর দাদা ছিল পঞ্চো ভিলার সেনাবাহিনীতে। ইসাবেল পিরেটোকে কথা দিয়েছিল, তার স্বামী আর ছেলে যদি পেসোগুলো খুঁজে পায় তাহলে অর্ধেক দিয়ে দেবে ওকে।
ডজ জানত না গুপ্তধনের কথা। তার কাছ থেকে এটা গোপন রাখা হয়। পিরেটো ঘুণাক্ষরেও কখনও তার সামনে উচ্চারণ করেনি। এই সময় টনি এসে একদিন হাজির হলো অন্ধ বারোটাকে নিয়ে। পিরেটোর সঙ্গে পেসোগুলোর কথা আলোচনা করার সময় শুনে ফেলে ডজ। জেনে যায় টনি আর তার বাবা গুহাঁটা আবিষ্কার করে ফেলেছে।
টনিকে রাজি করাতে না পেরে শেষে শারিকে দিয়ে গুহাঁটা খুঁজে বের করার ফন্দি আঁটে ডজ।
র্যাঞ্চারের বীভৎস মৃত্যুর ধাক্কাটা এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি কিশোর। ডজের লোভই তাকে ওরকম মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে। আগ্নেয়গিরি জেগে উঠেছে এটা দেখার পরেও যদি পেসো আনতে না যেত তাহলে আর এভাবে মরতে হত না।
একটা গর্তের ধারে থামল ওরা, জানোয়ারগুলোকে পানি খাওয়ানোর জন্যে। তারপর আবার এগোনোর পালা। কয়েক মাইল এগিয়ে একটা বিচিত্র শব্দ কানে এল কিশোরের। দূর থেকে আসা অসংখ্য বারোর মিলিত ডাক। সাড়া দিল শারি। বাড়িয়ে দিল চলার গতি।
একটা বন থেকে বেরোতেই জোরাল শোনা গেল আওয়াজ।
বিশাল উপত্যকায় ছড়িয়ে রয়েছে মাইলের পর মাইল তৃণভূমি। শত শত বুনো বারো চরে বেড়াচ্ছে সেখানে। লাফালাফি করছে, খাচ্ছে-দাচ্ছে, চেঁচাচ্ছে।
দাঁড়িয়ে গেছে শারি। খাড়া হয়ে গেছে লম্বা কান, ডগা কাপছে মৃদু মৃদু। হঠাৎ জোরে তীক্ষ্ণ এক ডাক ছাড়ল সে। ওর পিঠ থেকে নেমে পড়ল কিশোর। জিন আর লাগাম খুলে নিল। তারপর আদর করে চাপড় দিল গলায়।
বড় বড় কোমল চোখ মেলে তার দিকে তাকাল শারি। নাক ঘষল গায়ে, যেন বাড়িতে পৌঁছে দেয়ার জন্যে ধন্যবাদ জানাচ্ছে। তারপর এগিয়ে গেল টনির কাছে। ঘোড়ার পিঠে থাকায় ওর বুক নাগাল পেল না বারোটা, পায়েই নাক ঘষল। নিচু হয়ে শারির মাথা চাপড়ে দিল টনি।
আর দেরি করল না শারি। মহা আনন্দে ছুটল স্বজাতির সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্যে।
ইসাবেলের বারোর পেছনে চড়ে বসল কিশোর।
আবার রওনা হলো দলটা। তাড়াতাড়ি করলে অন্ধকারের আগেই পৌঁছে যেতে পারবে গায়ে। ওখান থেকে চিহুয়াহুয়ায় বাবাকে ফোন করবে টনি। জানাবে সে আর তার মা নিরাপদেই পিরেটোর সঙ্গে গাঁয়ে চলে এসেছে।
পরদিন সকালে বাস ধরে আমেরিকায় রওনা হবে তিন গোয়েন্দা।
লস অ্যাঞ্জেলেসে দেখা করব আমি তোমার সাথে, একসময় রবিনকে বলল টনি। রক কনসার্ট আমার খুব ভাল লাগে। তোমার সঙ্গে ঘুরে ঘুরে দেখব। কয়েকটা।
চলে এসো, যে-কোন সময়, খুশি হয়েই দেখাব।
পাশাপাশি চলছে মুসা আর কিশোর। পিরেটো আর ইসাবেলের সঙ্গে। মুসা বলল, একটা কথা আমার মাথায় ঢুকছে না, ডজ কি করে জানল কাস অ্যাঞ্জেলেসেই পাওয়া যাবে টনির মত কণ্ঠস্বরের লোক? যেন একেবারে জেনেশুনেই গেছে, ওখানে রয়েছে কিশোর পাশা। আমেরিকার অন্য কোন জায়গায় গেল না কেন?
জেনেশুনেই তো গেছে, জবাব দিল পিরেটো।
জেনেশুনে গেছে?
তাই তো। হাসল মেকসিকান। তোমরা যে কতখানি বিখ্যাত, তা তোমরা নিজেরাও জানো না। অনেকেই চেনে তোমাদেরকে। বিশেষ করে তোমাদের ওই টিভি অনুষ্ঠান পাগল সঙ্ঘ দেখার পর।
অনুষ্ঠানটা ডজও দেখেছিল নাকি? রবিনের প্রশ্ন।
দেখেছিল। আমিও দেখেছি। টনি যখন র্যাঞ্চে গেল, ওর গলা শুনে তো আমি চমকেই উঠেছিলাম। আরি, টেলিভিশনের মোটুরাম এল কোথেকে! বলেই চোখ পড়ল কিশোরের ওপর। মুখ কালো করে ফেলেছে গোয়েন্দাপ্রধান। সেটা লক্ষ্য করে তাড়াতাড়ি বলল পিরেটো, সরি, কিশোর, তোমাকে রাগানোর জন্যে বলিনি। টেলিভিশনের সৌজন্যে সে-ও জানে, ওই ডাকনাম একদম পছন্দ নয় কিশোরের।
হাসল মুসা। তাহলে এই ব্যাপার। মোটুরামই ডজকে টেনে নিয়ে গেছে রকি বীচে। আসলে আমাদের জন্যে ফাঁদ পাততেই গিয়েছিল লোকটা।
এবং সেই ফাঁদে দিব্যি পা দিয়ে বসেছে রহস্য পাগল কিশোর পাশা, মুচকি হাসল টনি।
নীরবে পথ চলতে লাগল আবার দলটা।
কিশোর ভাবছে, বীন আর চাল সেদ্ধর কথা। যতদিন বেঁচে থাকবে, আর একটা বীন কিংবা চাল দেখতে চায় না সে। যদিও জানে, চাল ছাড়া থাকতে পারবে না। লস অ্যাঞ্জেলেসে থাকলেও সে ভাতেরই পাগল। সে এবং তার চাচা রাশেদ পাশা। ভাত ছাড়া চলে না। আমেরিকাতে থেকেও পুরোদস্তুর বাঙালী।
চলতে চলতে হঠাৎ মুসার চোখ পড়ল রবিনের টি-শার্টের ওপর। লেখা রয়েছেঃ সারভাইভার।
তাই তো! এর চেয়ে সত্যি কথা আর হতে পারে না ওদের জন্যে। সারভাইভার! অনেক কষ্টেই তো বেঁচে ফিরল।
পেছনে ফিরে তাকাল মুসা। তাকিয়ে রইল পর্বতমালার দিকে। এত বিপদ থেকে বেঁচে ফিরে এসেছে, তবু আবার যদি তাকে ওখানে যেতে বলা হয়, নির্দ্বিধায় রাজি হয়ে যাবে, এর এমনই এক আকর্ষণ। এই আকর্ষণই যুগ যুগ ধরে টেনেছে মানুষকে। সাড়া না দিয়ে পারেনি মানুষ। সমস্ত বিপদ, বাধা, ভয় উপেক্ষা করে ছুটে গেছে ওর কাছে। মুসাও তো মানুষ, প্রচন্ড এই আকর্ষণ এড়ানোর ক্ষমতা তার কোথায়?