বেড়ার ওপাশে চলে গেল চোরটা।
এক এক করে ফোকর গলে ছেলেরাও চলে এলো। ছায়ায় ঢাকা নীরব পার্ক। চাঁদ উঠছে। পর্বতের দিক থেকে আসা বাতাসের জোর বেড়েছে আরও। ঝুঁকি দিয়ে কাঁপিয়ে দিচ্ছে পুরনো, নড়বড়ে নাগরদোলার স্তম্ভগুলোকে, ক্যাঁচকোঁচ করছে ওগুলো, নিষ্প্রাণ গোঙানি।
কই? নিচু কণ্ঠে বললো রবিন। গেল কই!
চুপ, ফিসফিসিয়ে বললো কিশোর। শোনো।
বেড়ার ছায়ায় গা ঢেকে দাঁড়িয়ে আছে ওরা। মেরামত করা নাগরদোলার শব্দ হচ্ছে ভীষণ, বহুদূর থেকে শোনা যাবে। পার্কের অন্ধকার ছায়া থেকে কাউকে বেরোতে দেখা গেল না, কেউ নড়লো না। বায়ে, টানেল অভ লাভ-এ ছলাত-ছল করে আছড়ে পড়ছে পানি। মাঝে সাঝে মৃদু হুটোপুটির শব্দ, নিশ্চয় ইঁদুর। এছাড়া আর কোনো আওয়াজ নেই।
বেশিদূর যেতে পারেনি, কিশোর বললো। ভাগ হয়ে খুঁজবো আমরা। নাগরদোলা ঘুরে আমি আর মুসা যাবো ডানে। রবিন, তুমি আর রবি যাও বুয়ে।
এই লোকটাই ডাকাত? রবি প্রশ্ন করলো।
মনে হয়। বেড়ালের ভেতর পায়নি, তাই ট্রেলারে খুঁজছিলো। পেয়ে গিয়ে থাকলে ও এখন মহাবিপজ্জনক। সাবধান, ধরার চেষ্টা করবে না। পিছে পিছে গিয়ে শুধু দেখবে, কোথায় যায়।
বাঁয়ে সুড়ঙ্গের দিকে চলে গেল রবি আর রবিন। মুসা আর কিশোর এগোলো ফান হাউসের হাসিমুখের দিকে।
হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেল মুসা। কিশোর, শব্দ শুনলাম!
স্তম্ভগুলোর নিচে অন্ধকার। সেখান থেকেই এলো শব্দটা। আবার। কাঠের ওপর ভারি জুতোরঘষা লাগার মতো। তারপর, দ্রুত দূরে সরে গেল চাপা পদশব্দ।
দেখেছি, ফিসফিসিয়ে বললো মুসা। ফান হাউসে ঢুকলো।
কে, চিনেছো?
না।
জলদি চলো। বেরোনোর আরও পথ থাকতে পারে।
মুসা দেখেছে, ছায়ায় ছায়ায় ঘুরে গিয়ে ঢুকছে লোকটা। ওরা যেখানে রয়েছে, সেখান থেকে ফান হাউসের মুখ পর্যন্ত একটুকরো খোলা জায়গা, চাঁদের আলোয় আলোকিত। একছুটে জায়গাটা পেরোলো ওরা। ভেতরে ঢুকে কান পাতলো। সরু বারান্দার মতো একটা জায়গা। ছাতের ফুটো দিয়ে আলো আসছে, অন্ধকার কাটেনি তাতে।
সামনে ছাড়া পথ নেই, কিশোর।
মুসার কথার সমর্থনেই যেন মচমচ শোনা গেল। তার পরেই ধুপ, সবশেষে তীক্ষ্ণ চিৎকার। গড়িয়ে পড়ে কাঠের দেয়ালে ধাক্কা খেয়েছে যেন ময়দার বস্তা। আবার শোনা গেল মচমচ, আবার ধুপ, তারপর নীরবতা।
অস্বস্তিতে পড়েছে দুই গোয়েন্দা। পা টিপে টিপে এগোলো আবছা অন্ধকারের ভেতর দিয়ে। একটা দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো।
সাবধানে খুলবে, কথা শেষ করতে পারলো না গোয়েন্দাপ্রধান। মচমচ করে সামনে ঝুঁকে গেল বারান্দাটা। কাত হয়ে গেছে মেঝে। চিত হয়ে পড়লো দুজনে, গড়াতে শুরু করলো।
পাগলের মতো হাত বাড়াচ্ছে ওরা, ধরার মতো যদি কিছু মেলে। কিছুই নেই।
ধুপ করে কাঠের দেয়ালে বাড়ি খেলো মুসা। আঁউক করে উঠলো। পরক্ষণেই তার গায়ের ওপর এসে পড়লো কিশোর।
হাত-পা ছুঁড়ে কোনোমতে উঠে বসলো দুজনেই। হতবাক হয়ে দেখলো, কাত হয়ে যাওয়া মেঝে উঠে যাচ্ছে আবার। জায়গামতো লেগে ছাত হয়ে গেল। মাথার ওপর।
পুরো মেঝেটা কাত হয়ে গিয়েছিলো! বিশ্বাস করতে পারছে না মুসা। নিশ্চয় কোনো কিছুর ওপর ব্যালান্স করা। একটা বিশেষ জায়গায় এসে কেউ দাঁড়ালেই কাত হয়ে যায়।
হ্যাঁ, অনেকটা টেকির মতো। ফান হাউসের মজার কৌশল। ডাকাতটাও নিশ্চয় আমাদের মতোই পড়েছে। গেল কোথায়?
পথ একটাই।
ঘরের দেয়ালে একটা বড় ফোকর দেখা যাচ্ছে। পাইপের মুখের মতো।
হামাগুড়ি দিয়ে ওটার দিকে এগোলো মুসা।
খেয়াল রেখো, পেছন থেকে কিশোর বললো। ওর মধ্যেও কৌশল থাকতে পারে।
ছোট সুড়ঙ্গ। আরেকটা ঘরে বেরিয়ে এলো ওরা। ছাতের ফাটল দিয়ে আলো আসছে।
ছাতই তো! নাকি মেঝে? অবাক হয়ে ভাবলো মুসা। কিশোওওওর! কেঁপে উঠলো গলা।
আবছা আলোয় মনে হলো ওদের, একটা উল্টে থাকা ঘরে রয়েছে। ছাত নিচে, মেঝে ওপরে। মেঝেতে রাখা চেয়ার, টেবিল, কার্পেট, সব উল্টো হয়ে আছে মাথার ওপরে। ওদের পায়ের কাছ থেকে সামান্য দূরে উল্টো হয়ে রয়েছে। একটা ঝাড়বাতি, বাহু নেই। দেয়ালে ঝুলছে ছবি, উল্টো।
ফিসফিস করলো বিস্মিত কিশোর, আরেকটা কৌশল, মুসা। আলো থাকলে আরও ভালোমতো দেখা যেতো।
আমরা সত্যি উল্টো হয়ে নেই তো? মুসার সন্দেহ যাচ্ছে না।
না।…ওই যে, আরেকটা সুড়ঙ্গমুখ। এসো।
প্রথমটার চেয়ে এটা লম্বা। নড়েচড়ে, দোল খায়। ওরা বুঝলো, একসময় ওটাকে ঘোরানোর ব্যবস্থা ছিলো। এখন ঘোরে না যদিও, স্থিরও থাকে না। একজায়গায়। আরেক মাথায় বেরিয়ে, নামার সময় আরেকটু হলেই পড়ে। গিয়েছিলো কিশোর। সোজা হয়েই বললো, শুনছো?
সামনে কোনোখান থেকে আসছে শব্দটা, হালকা পা ফেলছে কেউ। ওদিকে! ফিসফিসিয়ে বললো মুসা, পর মুহূর্তেই চেঁচিয়ে উঠলো, ওরিবাবারে…!
লম্বা-চওড়ায় আগেরটার চেয়ে বড় এই ঘর। ছাতে অসংখ্য গর্ত, ফাটল, বেশ ভালো আলো আসছে। মুসার মনে হলো গভীর সব ছায়া নড়ছে। কিন্তু ছায়ার। কারণে ভয় পায়নি সে। যা দেখালো, সেটা দেখে কিশোরও ঢোক গিললো।
ডানে দেয়ালের কাছে নড়ছে একটা অদ্ভুত মূর্তি। সোজা তাকিয়ে আছে ছেলেদের দিকে। লম্বা, পাকাটির মতো:শরীর, তার ওপর বিশাল এক মাথা। হাত দুটো সরু সরু, যেন মাকড়সার শুড়। কিভূত এক মানব-সর্প যেন, ভাসছে রুপালি চাঁদের আলোয়।
কী-কী ওটা, কি-কিশোর! কাছে ঘেঁষে এলো মুসা। ভূউত না তো?
আরেকবার ঢোক গিললো কিশোর। আ-আমি জানি নাঃ..আমি…, হঠাৎ হাসতে শুরু করলো সে। মুসা, ও কিছু না। আয়না। আয়না ঘরে ঢুকেছি আমরা। বিভিন্ন ভঙ্গিতে সাজিয়ে রাখা হয়েছে বাকা আয়নাগুলো।
আয়না? তাহলে পায়ের আওয়াজ শুনলাম কেন?
আমি…. শুরু করেই বাধা পেলো কিশোর।
ও-ওটাও কি আয়না? জোরে বলতে ভয় পাচ্ছে মুসা
নাক বরাবর সামনে, আয়না থেকে দূরে দাঁড়িয়ে আছে একটা মূর্তি। কান। পেতে রয়েছে যেন। চওড়া কাধ কোমর পর্যন্ত নগ্ন, লম্বা অগোছালো কালো চুল, কালো দাড়ি, চাঁদের আলোয় বেশ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
কোহেন! যথাসাধ্য চেষ্টা করেও কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক রাখতে পারলো না মুসা। শুনে ফেললো কোহেন। পাঁই করে ঘুরলো। এই, এই, বেরিয়ে এসো।
মুসার বাহু আঁকড়ে ধরলো কিশোর। ফিসফিস করে বললো, কথা বলবে না। আমাদের দেখেনি।
গর্জে উঠলো আবার কোহেন। এই, কথা শুনছি। বেরোও। বেরিয়ে এসো।
ওই যে, দরজা! দেখালো মুসা।
অনেকগুলো আয়নার মাঝে দরজাটা। কিশোরের হাত ধরে ওটা দিয়ে ঢুকে পড়লো মুসা। সরু একটা গলিপথে ঢুকলো ওরা, ছাত নেই। দশ কদম মতে গিয়ে দুভাগ হয়ে গেছে পথ। পেছনে কোহেনের কণ্ঠ আর পায়ের আওয়াজ শোনা গেল, দরজাটা দেখে ফেলেছে সে।
বাঁয়েরটা দিয়ে, কিশোর, তাড়া দিলো মুসা। জলদি!
আগে আগে চলেছে গোয়েন্দা-সহকারী। প্রতি দশ কদম পর পরই দুভাগ হয়ে যাচ্ছে পথ। প্রতিবারেই বাঁয়ের পথ ধরছে সে। পেছনে লেগে রয়েছে কোহেন, পায়ের শব্দেই বোঝা যায়।
অবশেষে আরেকটা দরজা পাওয়া গেল। ধাক্কা দিয়ে পাল্লা খুলে একটা ঘরে ঢুকলো ছেলেরা। তাজ্জব হয়ে গেল। আবার সেই আয়না ঘরে ফিরে এসেছে।
মরীচিকা! বিমূঢ়ের মতো বললো কিশোর। ফান হাউসের আরেক মজা! ছাগল বানিয়ে ছেড়েছে আমাদের, গলায় রশি দিয়ে একই জায়গায় ঘুরিয়েছে!
কোহেনও তো এসে পড়লো! গুঙিয়ে উঠলো মুসা।
ঠোঁট কামড়ালো কিশোর। উপায় একটা নিশ্চয় আছে। আবার ওই দরজা দিয়ে ঢুকবো। এবার আর বয়ে যাবো না। ডানে।
আয়নাগুলোর মাঝের দরজা দিয়ে আবার সরু গলিতে ঢুকলো দুজনে। দশ কদম এগিয়ে সরে গেল ডানের পথটায়। পদশব্দ এখনও অনুসরণ করছে ওদের। পেছনে তাকানোর সময় নেই। ছুটছে তো ছুটছেই ওরা। ধীরে ধীরে কমে এলো পেছনের আওয়াজ, মিলিয়ে গেল একসময়। সামনে দেখা গেল একটা ডাবল ডোর। দ্বিধার সময় নেই। ঠেলে পাল্লা খুলে ফেললো মুসা।
দরজার অন্যপাশে বেরিয়ে এলো দুজনে। খোলা আকাশের নিচে ব্রেরিয়ে। এসেছে। একপাশে ফান হাউস, আরেক পাশে টানেল অভ লাভ-এর প্রবেশ পথ।
আহ, বাঁচলাম! জোরে নিঃশ্বাস ফেললো মুসা।
হ্যাঁ, হাঁপাতে হাঁপাতে বললো কিশোর। কাজও হয়েছে। লোকটাকে চিনতে পেরেছি। গিয়ে এখন মিস্টার কনরকে বলতে পারবো, কোহেন…
মড়মড় করে ভেঙে গেল পুরনো পচা কাঠ। ফান হাউসের দেয়াল ফুড়ে বেরোলো ব্যায়ামপুষ্ট শক্তিশালী বলিষ্ঠ দেহটা। চাঁদের আলোয় বন্য হয়ে উঠেছে। চোখজোড়া, জ্বলছে। কোহেন!
ছায়ার ভেতরে হুমড়ি খেয়ে আছে দুই গোয়েন্দা। শ্বাস ফেলতে ভয় পাচ্ছে। তাকিয়ে আছে কোহেনের দিকে।
এখনও দেখেনি, কণ্ঠস্বর যথাসম্ভব খাদে নামিয়ে বললো কিশোর। তবে দেখে ফেলবে।
বেড়ার কাছেও যেতে পারবো না, মুসা বললো। পথ আগলে রয়েছে। কিন্তু যেতে না পারলে…
টানেল অভ লাভ। চলো।
কি হামাগুড়ি দিয়ে এগোলো ওরা। ছায়ার অভাব নেই। লম্বা হয়ে পড়েছে। নাগরদোলার স্তম্ভগুলোর ছায়া। ওগুলোর মধ্যে রইলো ওরা, কোনো অবস্থাতেই আলোয় বেরোলো না। কোহেনের অলক্ষ্যে সুড়ঙ্গে ঢুকে পড়লো।
আর আসছে না, মুসা বললো।
আসবে। ও জানে, আমরা ওকে দেখে ফেলেছি। আমাদের মুখ বন্ধ করার চেষ্টা করবেই। টানেল থেকে বেরোনোর আরেকটা পথ বের করতে হবে আমাদের।
সরু খাল কেটে সুড়ঙ্গের ভেতরে পানি ঢোকানোর ব্যবস্থা হয়েছে। তরল সীসার মতো লাগছে ওই পানিকে। কিনার দিয়ে গেছে পথ। সেই পথ ধরে হেঁটে চললো দুজনে। অনেকখানি ভেতরে ঢুকে সরু একটা কাঠের পুল পাওয়া গেল। শেষ মাথায় কাঠের জেটি। একসময় অনেক নৌকা থাকতো ওখানে, এখন আছে শুধু একটা পুরনো দাঁড়টানা নৌকা।
কিশোর, মুখে বাতাস লাগছে।
লাগবেই। সামনে বোধহয় ভোলা। নিশ্চয় সাগর।
কাঠের ওপর চাপ পড়ার মচমচ শব্দ হলো। নরম সোলের জুতো পরা পায়ের চাপ। কেউ আসছে।
নড়ড়া মা! হুঁশিয়ার করলো কিশোর। একদম চুপ।
সরু পুলের ওপর স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো দুজনে। অনেক ওপরে ছাতের একটা ফোকর দিয়ে চুঁইয়ে আসছে চাঁদের আলো, নড়াচড়া ওখানেই দেখা গেল।
উল্টোদিক দিয়ে নেমে আসবে! মুসা বললো।
ফিরে যাবো? নিজেকেই প্রশ্ন করলো কিশোর।
ওপরে ছায়ামূর্তিটাকে নড়তে দেখা গেল। পিস্তল কক করার নির্ভুল শব্দ কানে এলো দুজনের। আস্তে কিশোরের কাঁধে হাত রাখলো মুসা।
ফিরে গিয়ে বাঁচতে পারবো না, কিশোর বললো। যেদিক দিয়েই বেরোই, চাঁদের আলোয় দেখে ফেলবেই।
ওদের কাছাকাছিই রয়েছে নৌকাটা, জেটির সঙ্গে বাঁধা। সামনের দিকে ছড়িয়ে ফেলে রাখা হয়েছে মোটা ক্যানভাস। নিঃশব্দে পা টিপে টিপে এগোলো ওরা। নৌকায় উঠলো। গায়ের ওপর টেনে দিলো ক্যানভাসটা। অন্ধকারে পড়ে রইলো চুপচাপ, নিঃশ্বাস ফেলতেও ভয়।
সময় যাচ্ছে। মিনিটের পর মিনিট।
পুলে হালকা পায়ের আওয়াজ হলো। কাঠের সঙ্গে ধাতব কিছুর ঘসা লাগলো যেন, দেয়ালে লেগেছে বোধহয় লোকটার হাতের পিস্তল।
তারপর অনেক্ষণ আর কোনো শব্দ নেই।
পূর্ণ নীরবতা।
খালের পানিতে দুলছে নৌকা। ঘষা খাচ্ছে জেটির সঙ্গে।
আবার নড়লো লোকটা। ছেলেদের প্রায় মাথার ওপর চলে এলো জুতোর চাপা শব্দ। জোরে জোরে কয়েকবার নাড়া খেলো নৌকা, যেন ধরে কঁকিয়ে দেয়া হচ্ছে। থেমে গেল একসময়। তারপর শুধুই দুলুনি।
ক্যানভাসের নিচে গুটিসুটি হয়ে থাকা ছাড়া আর কিছু করার নেই।
আরও কয়েক মিনিট পেরোলো। নৌকার গায়ে ঢেউয়ের ছলাত-ছল ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই।
চলে গেছে! ফিসফিসিয়ে বললো মুসা।
জবাব দিলো না কিশোর।
আরও কিছুক্ষণ পর আচমকা চেঁচিয়ে উঠলো, মুসা, জলদি কারনিভলে ফিরে যেতে হবে। রহস্যের সমাধান হয়ে গেছে!
কোহেন?
হ্যাঁ, সে তাড়া করাতেই..ডাকাতটা কি খুঁজেছে, এবং সেটা কোথায় আছে, জানি এখন।
ও পায়নি?
না, সবাই আমরা ভুল জায়গায়…
ভীষণ দুলে উঠলো নৌকা। ধার খামচে ধরলো কিশোর। ক্যানভাসের তলায় ঝট করে উঠে বসলো মুসা। কান পেতে শুনছে। বললো, কিশোর, বড় বেশি দুলছে না? ঘষার শব্দও পাচ্ছি না আর। কি হয়েছে? ক্যানভাস তোলো তো।
দুজনে ঠেলে সরালো ক্যানভাসের চাদর। মুখে আঘাত হানলো বাতাস। উঠে দাঁড়াতে গিয়ে চিত হয়ে পড়লো কিশোর, নৌকার দুলুনিতে।
খোলা সাগরে চলে এসেছি! চেঁচিয়ে উঠলো মুসা। চারপাশে দেখছে।
পরিত্যক্ত পার্কের কালো ছায়াগুলো এখন অনেক পেছনে, ছোট হয়ে আসছে, কারনিভলের আলোকসজ্জা।
নৌকা বাঁধার দড়িটা দেখলো কিশোর। কেটে দিয়েছে! পুলে উঠে দড়ি কেটে দিয়ে চলে গেছে ব্যাটা।
এখন ভাটা, পানির দিকে তাকিয়ে আছে মুসা। স্রোতে পড়েছে নৌকা। দেখছো, কি জোরে ভেসে যাচ্ছি?
জলদি ফেরাও, মুসা!
কি করে? দাঁড় নেই, মোটর নেই। সাঁতরে যে যাবো, তারও উপায় নেই। যা স্রোত আর ঢেউ, সাহস হচ্ছে না।
হুঁ। তুমি না পারলে আমি পারবো? নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটলো কিশোর। এক কাজ করা যায়। সিগন্যাল।
পকেট থেকে হোমারটা বের করলো কিশোর। কয়েকবার চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দিলো। নৌকার তলায় পানি জমে আছে, তাতে ভিজে গেছে পকেট, পকেটে রাখা যন্ত্রটা। হবে না, হতাশ ভঙ্গিতে হাত নাড়লো কিশোর। নষ্ট হয়ে গেছে।
সাহায্যের জন্যে চিৎকার শুরু করলো দুজনে। কিন্তু বাতাসের শব্দে হারিয়ে গেল চিৎকার। তীর থেকে অনেক সরে এসেছে। চারপাশে থৈ থৈ করছে সাগরের কালো পানি। একটা নৌকা চোখে পড়লো না। তীরের আলো এখন দূরে। বড় বড় ঢেউ ভাঙছে নৌকার গায়ে, কিনার দিয়ে ভেতরে ঢুকছে, ছিটে লেগে ভিজছে শরীর।
নৌকার তলায় ঝনঝন করছে দুটো টিনের পাত্র, গায়ে গায়ে বাড়ি লেগে। পানি সেঁচার জন্যে রাখা হয়েছে ওগুলো। একটা তুলে নিলো মুসা। আরেকটা কিশোরকে নিতে বলে সেঁচতে শুরু করলো নৌকায় জমা পানি।
যে ভাবেই হোক, কিশোরকে বললো। ফিরে যেতেই হবে আমাদের।
পারবো না। যা স্রোত। বাতাস অবশ্য বিপরীত দিক থেকে বইছে, অনেক খানি ঠেকিয়ে রাখছে নৌকাটাকে। স্রোতের টানে নইলে এতোক্ষণে আরও দূরে। ভেসে যেতো। বার দুই পাত্র বোঝাই করে ছপাত ছপাত করে পানি ফেললো। মুসা। দাঁড় ছাড়া হবে না, থেমে গেল সে। কিশোরের দিকে তাকালো।
মুসার কাঁধের ওপর দিয়ে সামনে তাকিয়ে আছে গোয়েন্দাপ্রধান। মুসা! ওটা।
ঝট করে ঘুরে চাইলো মুসা।
সামনে বিশাল এক কালো ছায়া। সাগরের নিচ থেকে উঠছে যেন, মাথা তুলেছে ওদের মাথা ছাড়িয়ে অনেক ওপরে।
ঘুরে, যেখান থেকে শুরু করেছিলো, সেখানে এসে দাঁড়ালো আবার রবি আর রবিন। কিশোর বা মুসাকে দেখলো না।
রবি, কিছু হয়েছে, চারপাশে দেখতে দেখতে বললো রবিন। এখানেই তো ওদের আসার কথা।
দেখো! ফান হাউসের দেয়ালে বড় একটা ফোকর দেখালো রবি। নতুন হয়েছে গর্তটা। আমি শিওর।
জ্যোৎস্নায় আরও বিষণ্ণ লাগছে পরিত্যক্ত পার্কটা।
চেঁচিয়ে ডাকলো রবিন, কিশোওর! মুসাআ!
কে জানি আসছে! বলে উঠলো রবি।
ছুটন্ত পায়ের আওয়াজ এসে থামলো বেড়ার ওপাশে, ফোকর গলে ভেতরে ঢুকলো দুজন লোক।
তোমার বাবা, রবি।
কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন মিস্টার কনর, কি ব্যাপার?
আমাদের কিছু হয়নি, বাবা, আমরা ঠিকই আছি। মুসা আর কিশোরকে পাচ্ছি না। আমার ট্রেলারে কি জানি খুঁজছিলো একটা লোক। তাকে তাড়া করে এলাম এখানে। দুভাগ হয়ে খুঁজতে গেলাম। আমি আর রবিন একদিকে, কিশোর আর মুসা আরেকদিকে। তারপর আর ওদের খবর নেই।
কোহেন তাহলে ঠিকই বলেছে!
মিস্টার কনরের পেছনে এসে দাঁড়ালো দাড়িওয়ালা স্ট্রংম্যান। চাঁদের আলোয় চকচক করছে তার ঘামে ভেজা নয় কাধ, আর কালো বুট। বললো, আমিও দেখেছি, রবির ট্রেলারে খুঁজছে। পিছে পিছে ছুটে এলাম এখানে। ফান হাউসে ঢুকে গায়েব হয়ে গেল ব্যাটা।
মুসা আর কিশোরকে দেখেননি? রবিন জিজ্ঞেস করলো।
না তো।
রবি, কনর বললেন। দৌড়ে যাও তো। বাতি নিয়ে এসো। কয়েকজন রাফনেককে আসতে বলবে।
ছুটে চলে গেল রবি।
রবিন আর কোহেনকে নিয়ে পরিত্যক্ত পার্কে খুঁজতে শুরু করলেন কনর। মুসা আর কিশোরকে পাওয়া গেল না।
বাতি আর রাফনেকদের নিয়ে এলো রবি। শক্তিশালী বৈদ্যুতিক লণ্ঠন নিয়ে খুঁজতে বেরোলেন কনর। কোহেন আর রাফনেকদের সঙ্গে নিলেন। ফান হাউসের বাইরে দাঁড়াতে বলে গেলেন রবিন আর রবিকে।
রবি, রবিন বললো। কোহেনও নাকি ট্রেলারের কাছে লোকটাকে দেখেছে। আমরা তাহলে দুজনকে না দেখে একজনকে দেখলাম কেন?
বুঝতে পারছি না, রবিন। দেখা তো উচিত ছিলো।
আমার মনে হয় না দুজন। কোহেনকেই তাড়া করেছি।
কোহেনই ডাকাত?
মাথা আঁকালো রবিন। প্রথম থেকেই ওকে কিশোরের সন্দেহ। তোমরা ওর আসল নাম জানো না। আড়িপাতা স্বভাব। আমাদের ওপর চোখ রাখে। কারনিভল। বন্ধ করার জন্যে বোঝায় তোমার বাবাকে। কিশোর আর মুসাকে সে-ই আটকে রেখে এখন ধোকা দিতে চাইছে, আমাদের। চলো, দেখি তোমার বাবা কি করছেন?
দ্রুত ফান হাউসের দিকে চললো ওরা। ফাঁকফোকর দিয়ে বেরোচ্ছে লণ্ঠনের আলো। ঢোকার মুখেই দেখা হয়ে গেল কনরের সঙ্গে, বেরিয়ে আসছেন।
নাহ, কোনো চিহ্নই নেই, কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বললেন তিনি। যেন বাতাসে মিলিয়ে গেছে!
কোহেন আমাদের বোকা বানিয়েছে, স্যার, আঁঝালো কণ্ঠে বললো রবিন। ও-ই ডাকাত। মুসা আর কিশোর কোথায়, জানে।
কোহেন? কি বলছো? কী প্রমাণ আছে?
আমি শিওর, রবির ট্রেলারের কাছে সে একাই ছিলো। তাকেই তাড়া করেছিলাম আমরা।
দ্বিধা করলেন কনর। এটা তো প্রমাণ হলো না। ভুলে যেও না, কোহেন আমাদের সিকিউরিটি ইনচার্জ। সবখানে চোখ রাখা তার দায়িত্ব। কিন্তু তোমাকেও অবিশ্বাস করতে পারছি না। দাঁড়াও, কোহেনকে জিজ্ঞেস করি।
আবার গিয়ে ফান হাউসে ঢুকলেন তিনি।
বাইরে অপেক্ষা করছে ছেলেরা। অস্বস্তি বোধ করছে। এক এক করে দশ মিনিট পেরোলো। অন্ধকারে পায়চারি শুরু করলো রবিন। সে কি ভুল করেছে?
ফিরে এলেন কনর। থমথমে চেহারা। ফান হাউসে নেই কোহেন! রাফনেকদের নাকি বলে গেছে, কারনিভলে যাচ্ছে। কই, আমাকে তো বললো না! বলতে পারতো। চলো, দেখি।
তাড়াতাড়ি কারনিভলে ফিরে এলো ওরা। কোহেনকে তার তাঁবুতে পাওয়া গেল না, ট্রেলারেও নেই। কেউ তাকে দেখেনি। মুসা আর কিশোরকেও না।
এবার তো আর পুলিশের কাছে না গিয়ে উপায় নেই, শঙ্কিত হয়ে বললেন মিস্টার কনর।
কালো ছায়াটার দিকে হাত তুলে চেঁচিয়ে উঠলো মুসা, কিশোর, ওটা অ্যানাপামু আইল্যাণ্ড! আশোঁপাশের সবচেয়ে ছোট দ্বীপ। তীর থেকে মাইলখানেকও হবে না। ওটাতে উঠতে পারলেও হয়।
পারবো। ওদিকেই তো ভেসে যাচ্ছি।
নৌকার ধার খামচে ধরে বসে রইলো দুজনে। কাছে আসছে দ্বীপটা। খাড়া পাড়, গাছপালা আর পাথর চোখে পড়ছে এখন। পাড়ের নিচে সাদা ফেনার রেখা।
ওইই, ওখানে সৈকত, বাঁয়ে দেখালো মুসা। মনে হয়…, কথা শেষ না করেই ডাইভ দিয়ে পানিতে পড়লো সে। নৌকার পেছনে ধরে ঠেলে, সাঁতরে নিয়ে চললো তীরের দিকে। অসংখ্য ছোট-বড় পাথর মাথা তুলে রেখেছে এখানে। সেখানে। সেগুলোর ফাঁক দিয়ে নৌকাটাকে ঠেলে নিয়ে এলো তীরের কাছে।
অল্প পানিতে নেমে পড়লো কিশোর। দুজনে মিলে টেনেহিঁচড়ে এনে শুকনোয় তুললো নৌকা।
যাক, বাঁচলাম! বালিতে বসে পড়লো মুসা।
কিশোর বসলো তার পাশে। বাঁচলাম আর কই? দ্বীপান্তরে পাঠানো হয়েছে আমাদের। মুসা, এখুনি ফিরে যেতে হবে, নইলে ডাকাতটাকে আটকাতে পারবো না।
বেশি বড় না, দেখছো? কিশোরের কথায় কান নেই মুসার, দ্বীপ দেখছে। ছোট। মানুষজন কিছু নেই। খালি গাছ আর পাথর। কালকের আগে যেতে পারবো না এই দ্বীপ থেকে, তা-ও কপাল ভালো হলে। যদি ধার দিয়ে কোনো নৌকা-টৌকা যায়।
কাল অনেক দেরি হয়ে যাবে। এখানকার প্রায় সব দ্বীপেই ইমারজেন্সি শেল্টার আছে শুনেছি। এটাতেও থাকতে পারে। চলো তো দেখি, কোথায়?
আগে আগে চললো মুসা। বেশি খুঁজতে হলো না। ছোট একটা কেবিন পাওয়া গেল। ভেতরে একটা কাঠের টেবিল, কয়েকটা চেয়ার আর বাঙ্ক। একটা স্টোভ আর টিনজাত কিছু খাবারও সংরক্ষিত আছে। কেবিনের পেছনে একটা ছাউনি। তাতে রয়েছে দুটো ছোট নৌকার মাস্তুল, হাতলশুদ্ধ একটা ছোট হাল, দড়ির বাণ্ডিল, বোর্ড, আর নৌকার জন্যে দরকার আরও কিছু টুকিটাকি জিনিস। হাতুড়ি আর পেরেকও আছে।
রেডিও নিই, কিশোর, মুসা বললো। যে-আশায় এসেছে। কাল সকাল পর্যন্ত থাকতেই হচ্ছে আমাদের। যদি তার আগে কেউ উদ্ধার না করে।
জবাব দিলো না কিশোর। ছাউনির জিনিসগুলোর দিকে তাকিয়ে কি ভাবছে।
মুসা, হঠাৎ বললো সে। পাল হলে তো আমাদের নৌকাটাকে চালানো যায়, তাই না?
যায়। পাল আর হাল থাকলে।
মাস্তুল আর হাল তো এখানেই আছে। নৌকায় আছে ক্যানভাস। পাল তৈরি করা যায়।
বেশি বড় মাস্তুল, বিশেষ ভরসা করতে পারছে না মুসা। স্টেপিং থাকলেও লাগানো যাবে কিনা সন্দেহ।
স্টেপিং?
কিশোর পাশাও তাহলে অনেক কিছু জানে না, হাসলো মুসা। বিদ্যে ঝাড়ার দুর্লভ একটা সুযোগ পেলো। সকেট আর সাপোর্টিং ফ্রেমে মাস্তুল আটকানোর ব্যবস্থাকে নাবিকরা বলে স্টেপিং। মাস্তুলের গোড়া তো কোথাও আটকাতে হয়, নাকি?
এখানে দুটো বুম দেখতে পাচ্ছি। ওগুলোর একটা দিয়ে স্টেপ বানানো যায় না?
নাক চুলকালো মুসা। হয়তো যায়। সীটের মধ্যে গর্ত করে ঢুকিয়ে দিতে পারলে বোর্ড তো আছেই। টুলবক্সে করাত আর বাটালি থাকলে বানিয়ে ফেলা। যাবে। না না, কিশোর, হবে না, ভুলে গিয়েছিলাম!
কেন হবে না?
কীলই নেই নৌকাটার, তিক্তকণ্ঠে বললো মুসা। সেন্টারবোর্ড, সাইডবোর্ড, কিছু নেই। পালে বাতাস ধাক্কা দিলেই নৌকা উল্টে যাবে। আর যদি নেহায়েত কপালগুণে না-ও ওল্টায়, চালানো যাবে না। কিছুতেই সোজা চালানো যাবে না নৌকা।
ধপ করে বসে পড়লো কিশোর। আঙুল কামড়াতে শুরু করলো। তাকিয়ে আছে মাস্তুল আর বুমগুলোর দিকে। খানিক পরে বললো, মুসা, মাস্তুলগুলো ভাসবে?
ভাসতে পারে। কেন, মাস্তুলে চড়ে বাড়ি যাবার কথা ভাবছো নাকি?
মুসার রসিকতায় কান দিলো না কিশোর। মাস্তুলের সঙ্গে যদি পেরেক মেরে বোর্ড লাগিয়ে দিই? বোর্ডের আরেক ধারে পেরেক মেরে লাগিয়ে দিই নৌকার সঙ্গে, তাহলে…
খাইছে, কিশোর, খাইছে! চটাস করে নিজের উরুতে চাটি মারলো মুসা। বাজিমাত করে ফেলেছো! হবে, কাজ হবে এতে! আর যেতে তো হবে মাত্র এক মাইল। বাতাসের গতি ঠিক থাকলে ভারসাম্য বজায় থাকবে নৌকার। চমৎকার!
তাহলে আর দেরি কেন? উঠে পড়লো কিশোর। এসো, চটপট সেরে ফেলি।
চীফ ইয়ান ফ্লেচারকে সব কথা যে বলেছে রবিন, সে-ও প্রায় দুই ঘন্টা হয়ে গেছে। খুজতে বেরিয়েছে পুলিশ। কিন্তু এখনও কিশোর, মুসা কিংবা কোহেনের হদিস করতে পারেনি। কারনিভলের ভেতরে-বাইরে অস্থিরভাবে পায়চারি করছেন চীফ। শো চলছে। উপভোগ করছে দর্শকরা। বুঝতেই পারছে না, সাংঘাতিক ব্যাপার। ঘটে গেছে ভেতরে ভেতরে। উক্তষ্ঠিত হয়ে আছেন মিস্টার কনর, রবি আর রবিন।
তোমার ধারণা কোহেনই ব্যাংক ডাকাত? আরেকবার রবিনকে জিজ্ঞেস করলেন চীফ।
হ্যাঁ।
রকি বীচ থেকে পালালো কিনা বুঝতে পারছি না। অনেকেই দেখেছে বলেছে, অথচ কেউ দেখেনি।
কিশোরও তাই মনে করে।
ওর মনে করার যথেষ্ট কারণ নিশ্চয় আছে। ফালতু কথা বলে না কিশোর।
ওর অনুমান, ডাকাতটা এখনও তার জিনিস খুঁজে পায়নি। আর আমা অনুমান, কোহেনই রবির ট্রেলার ঘেঁটেছে তখন। তারমানে সে-ই ডাকাত লুকানো জিনিস খুঁজছিলো।
হ্যাঁ, হতে পারে।
লোকটা অদ্ভুত, মিস্টার কনর বললেন। সব সময় আলাদা আলাদা থেকেছে আমাদের কাছ থেকে। কারও সঙ্গে মিশতে পারেনি।
হুঁ, চোয়াল শক্ত করে ফেললেন চীফ। খুঁজে বের করবোই তাকে।
দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়েছে পুলিশ, আর কনরের রাফনেকরা। চষে ফেলছে পুরো এলাকা। খোলা অঞ্চল, কারনিভলের তাঁবু, বুদ, ট্রেলার, ট্রাক, কিছু বাদ রাখছে না। সব কটা গাড়ি আর ট্রাক যথাস্থানে দাঁড়িয়ে আছে, কোনোটা নিখোঁজ হয়নি।
কয়েকবার করে পরিত্যক্ত পার্কটায় খুঁজতে গেল ওরা, সাগরের ধারে খুঁজলো। এমনকি কারনিভলের কাছাকাছি পথ, অলি-গুলি-ঘুপচি, বাড়িঘরেও খুঁজে দেখলো।
পেরোলো আরও এক ঘন্টা। তিনজনের একজনকেও পাওয়া গেল না।
এবার সত্যি চিন্তা লাগছে! চীফ বললেন। গেল কোথায়? ওই পার্কটাতেই সূত্র মিলবে। আমিও একবার গিয়ে দেখি।
রাফনেকদের নিয়ে কয়েকজন পুলিশ তখনও পার্কে খুঁজছে। চীফ কাছে যেতে যেতেই চিৎকার শোনা গেল।
ওই যে, প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন ফ্লেচার। নিশ্চয় কিছু পেয়েছে। বেড়ার ফোকর গলে দ্রুত পার্কে ঢুকলেন তিনি। পেছনে ঢুকলেন কনর আর দুই কিশোর। পানির কিনারে জটলা করছে পুলিশ আর রাফনেকরা। কাকে যেন ধরেছে।
ছুটে গেলেন চীফ। জিজ্ঞেস করলেন, ছেলেদের পাওয়া গেছে?
না, চীফ, একজন পুলিশ বললো। একে পেয়েছি।
ঝাড়া দিয়ে হাত ছাড়িয়ে এগিয়ে এলো কোহেন। আমাকে এভাবে ধরেছে কেন, জিজ্ঞেস করুন তো? আমি কি চোর নাকি?
আগে বলো তুমি এখানে কি করছো? কঠিন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন কনর।
সেটা আমার ব্যাপার।
আর চুপ থাকতে পারলো না রবিন। ও-ই ডাকাত! ওকে জিজ্ঞেস করুন, মুসা আর কিশোরকে কি করেছে!
ডাকাত? গর্জে উঠলো কোহেন। আমি ডাকাত নই, গাধা কোথাকার। ডাকাতটাকে তাড়া করেছিলাম। বলেছিই তো।
গত তিন ঘন্টা তাহলে কি করছিলেন? প্রশ্ন করলেন চীফ। আমরা খুঁজতে খুঁজতে হয়রান। কোথায় ছিলেন?
ডাকাতটাকে খুঁজতে এসেছি। আমার সন্দেহ…
মিথ্যে বলছে ও! রাগে চেঁচিয়ে উঠলো রবিন। ওর দাড়িও নকল।
কোহেন সরে যাওয়ার আগেই হাত বাড়িয়ে তার দাড়ি চেপে ধরলেন চীফ। হ্যাঁচকা টান দিতেই খুলে চলে এলো আলগা দাড়ি। সবাই তাকিয়ে রইলো লোকটার দিকে।
বেশ, কোহেন বললো। নাহয় নকলই হলো। তাতে কি? নিজে নিজেই টেনে খুলে ফেলতে লাগলো আলগা চুল, গালের জডুল। বেরিয়ে এলো খাটো করে ছাটা চুল, চেহারার বুনো ভাব দূর হয়ে গেল, ভদ্র চেহারার এক তরুণে পরিণত হলো স্ট্রংম্যান। কারনিভলে সবাই চোখে পড়ার মতো পোশাক পরে। মেকাপ নেয়। চুল-দাড়ি আর জড়ুল ছাড়া স্ট্রংম্যানকে লোকে পছন্দ করবে কেন!
কিন্তু আমাকেও তুমি ধোকা দিয়েছে, কোহেন, কনর বললেন। ওসব পরেই চাকরি নিতে এসেছিলে। বুঝিয়েছে, ওগুলো আসল।
মস্ত থাবা নাড়লো স্ট্রংম্যান। আগে সার্কাসে কাজ করেছি, বলেছি আপনাকে। সার্কাস থেকে কারনিভলে আসে না কেউ। কারনিভল থেকেই সার্কাসে যায়, ভালো করেই জানেন। সম্মান খোয়াতে চায় কে? তাই চেহারা লুকিয়ে রেখেছি।
ও স্ট্রংম্যানই নয়, বলে উঠলো রবি। তাই না, বাবা? নিশ্চয় মাছিমানব টিটানভ।
না, ও টিটানভ নয়।
কিন্তু মিথ্যে বলছে, সন্দেহ নেই! রবিন বললো।
কাঁধ ঝাঁকালো স্ট্রংম্যান, ফুলে উঠলো কাঁধের পেশী। তাই নাকি, খোকা? তাহলে… সাগরের দিকে চোখ পড়তে থেমে গেল সে। আরে…?
চীফ, দেখুন, দেখুন, চিৎকার করে বললো একজন পুলিশ।
সাগরের দিকে তাকালো সবাই। কালো পানি চিকচিক করছে চাঁদের আলোয়। এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখলো ওরা বিচিত্র একটা নৌকা এগিয়ে আসছে পাল তুলে। একপাশে কাত হয়ে আছে নৌকাটা, চ্যাপ্টা কি যেন একটা আটকে রয়েছে একধারে, বোঝা যায় না। আরও কাছে এলে চেনা গেল আরোহীদের, মুসা আর কিশোর।
ওরাই! বলে দৌড় দিলো রবিন।
কিশোওর! মুসাআ! চেঁচিয়ে উঠে রবিও দৌড়ালো।
নৌকা তীরে ভিড়তেই লাফিয়ে নেমে ছুটে এলো দুই গোয়েন্দা। কয়েক মিনিটেই অন্যদের জানা হয়ে গেল, দুজনের সাগর-অভিযানের কাহিনী।
ওটায় চড়ে এসেছো? বিশ্বাস করতে পারছেন না যেন চীফ।
দেখলেনই তো, হেসে বললো কিশোর। মুসা খুব বড় নাবিক। চলুন, কারনিভলে। ডাকাতটা কি খুঁজছিলো, জানি। আমার ধারণা, এখনও পায়নি ওটা।
আর পাবেও না, রবিন বললো। ডাকাতটা ধরা পড়েছে। কোহেনকে দেখালো সে।
না, কোহেন ডাকাত নয়।
গোঁ গোঁ করে বললো কোহেন, সেকথাই তো বলছি ওদের এতোক্ষণ। বিশ্বাসই করে না।
ছদ্মবেশে ঢুকেছে ও, কিশোর, কনর বললেন। রবির ট্রেলার ঘাটতে দেখেছো ওকেই।
না, স্যার, শান্ত, দৃঢ়কণ্ঠে বললো, গোয়েন্দাপ্রধান। নৌকার ক্যানভাসের নিচে লুকিয়ে থাকার সময় বুঝেছি লোক একজন নয়, দুজন। ডাকাতকে তাড়া করেছে কোহেন। ফান হাউসে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলাম আমরা, মনে করেছে আমরাই বুঝি ডাকাত।
কি করে বুঝলে? চীফ জিজ্ঞেস করলেন।
আমাদের দেখেছে বলে চিৎকার করছিলো। যে তাড়া করে সে-ই ওভাবে। চেঁচায়, যাকে তাড়া করা হয়, সে নয়। আসল ডাকাতটা বরং লুকিয়েই থেকেছে আমাদের কাছ থেকে।
হ্যাঁ, যুক্তি আছে। কিন্তু…
তাছাড়া, চীফকে কথা শেষ করতে দিলো না কিশোর, কোহেনের কোমর পর্যন্ত নগ্ন, কোনো কাপড় ছিলো না। শুধু আঁটো পাজামা। হাত খালি। পিস্তল আর ছুরি লুকিয়ে রাখার জায়গাই নেই। অথচ, নৌকার দড়ি কেটে আমাদের ভাসিয়ে দিয়েছিলো, যে লোকটা, তার কাছে ছুরিও ছিলো, পিস্তলও।
ছেলেটা আপনাদের চেয়ে অনেক চালাক, আন্তরিক প্রশংসা করলো স্ট্রংম্যান।
আরও একটা ব্যাপার, কিশোর বললো। রকম পায়ের আওয়াজ শুনেছি। ভারি বুট আর রাবার সোল নরম জুতো। কোহেনের পায়ে বুট, তারমানে ডাকাতটার নরম জুতো ছিলো।
হেসে উঠলো কোহেন। নিন, এবার হলো তো। আমি যে ডাকাত নই, দিলো। প্রমাণ করে।
তবে আপনিও দুধে ধোয়া নন, মিস্টার কোহেন, তাকে ধরলো এবার কিশোর। ছদ্মবেশে ছিলেন, এটা তো ঠিক। কিছু একটা গোপন করে রেখেছেন সবার কাছ থেকে। নিশ্চয় কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে ঢুকেছেন কারনিভলে। আশা করি, চীফের কাছে বলবেন কারণটা। স্ট্রংম্যানের দিকে চেয়ে ঠাণ্ডা হাসি হাসলো সে।
ভুরু কুঁচকে কোহেনের দিকে তাকালেন চীফ।
জোরে নিঃশ্বাস ফেলে হাল ছেড়ে দেয়ার ভঙ্গি করলো কোহেন। তুমি সাংঘাতিক চালাক, কিশোর পাশা। দেখে কিন্তু মনেই হয় না। ধরা যখন পড়েছি, না বলে আর উপায় কি? সত্যিই স্ট্রংম্যান ছিলাম আমি, সার্কাসে, কয়েক বছর আগে ছেড়ে দিয়েছি। গোয়েন্দাগিরিতে বেজায় শখ, তাই শখের গোয়েন্দা হয়েছি চাকরি ছাড়ার পর। আমার আসল নাম ডেনমার বোলার। রবির নানী ভাড়া করেছে আমাকে নাতির ওপর চোখ রাখার জন্যে। মহিলা জানতে চান, কারনিভল সত্যি সত্যি পছন্দ করে কিনা রবি। আর তার কাজে বিপদের সম্ভাবনা কতটা।
দুর্ঘটনাগুলো তাহলে তুমি ঘটাওনি? কঠোর হয়ে উঠেছে কনরের দৃষ্টি।
না। তবে ঘটাতে উদ্বিগ্ন হয়েছি। আপনাকে বার বার কারনিভল বন্ধ করতে অনুরোধ করেছি সেজন্যেই। রবির জন্যে ভয় হচ্ছিলো। ওর কোনো ক্ষতি হলে। ওর নানী আমাকে আস্ত রাখতো না। তাছাড়া, এটাও বুঝতে চাইছিলাম. ওগুলো আসলেই দুর্ঘটনা কিনা?
রবিকে নিরাপদে রাখতে চাইছিলে?
হ্যাঁ, কনর। সেই দায়িত্বই দেয়া হয়েছে আমাকে।
ভ্রূকুটি করলো কিশোর। চমৎকার, মিস্টার কোহেন। নাকি, মিস্টার বোলার? যা-ই হোক, সব কথা বলেননি। আরও কিছু আছে। রবিকে দেখা আপনার দায়িত্ব, তার ট্রেলার দেখা নয়। ওখানে গিয়েছিলেন কেন? নিশ্চয় সন্দেহ করেছিলেন, ডাকাতটা ওখানে খুঁজতে যাবে। ডাকাতের পেছনে কেন লেগেছেন?
দীর্ঘ এক মুহূর্ত চুপ করে রইলো কোহেন, ওরফে বোলার। তারপর মাথা ঝাঁকালো। নাহ, তোমাকে ফাঁকি দেয়া মুশকিল। ঠিকই ধরেছো, স্যান মেটিওতেই বুঝেছি, ডাকাতটা কারনিভলেরই লোক। আমি গোয়েন্দা। পেশাদারী একটা মনোভাব রয়েছে। আশা করেছি, ডাকাতটাকে ধরতে পারলে আমার সুনাম বেড়ে যাবে রাতারাতি। কাজেই তদন্ত শুরু করলাম। কিন্তু অনেক খুঁজেও পেলাম না, ডাকাতটার চেহারার সঙ্গে কারনিভলের কারও চেহারা মেলে না। তারপর কানা বেড়াল চুরি গেল। বুঝলাম, ওগুলোর ভেতরেই জরুরী কিছু লুকিয়েছে ডাকাতটা। থেমে হাত নাড়লো সে। কিন্তু বেড়ালের ভেতরে সে নিজেই খুঁজে পেলো না।
কি সাংঘাতিক! বলে উঠলো রবি। নিশ্চয় ভেতর থেকে পড়ে গেছে।
তার কথায় সায় জানাতে পারলো না কিশোর। আমার তা মনে হয় না, বললো সে। বেড়ালের ভেতরেই রয়েছে এখনও।
কিন্তু কিশোর, প্রতিবাদ করলো রবি। আমার পাঁচটা বেড়ালই ছিলো। ডাকাতটা সবগুলো নিয়ে গেছে।
না, রবি, তুমিও ভুল করছো। আসলে বেড়াল ছিলো ছটা। আমরা দেখেছি।
দেখেছি? হাঁ হয়ে গেছে মুসা। কোথায়?
কোথায়, কিশোর? রবিন জানতে চাইলো।
ধরতে গেলে আমাদের নাকের নিচে। সেজন্যেই দেখেও দেখিনি। রবিদের ট্রেলারে উঠেছিলাম, মনে আছে? ভাঙা, নষ্ট…
পুরস্কার! চেঁচিয়ে উঠলো রবি। মেরামত করার জন্যে রেখেছি ঝুড়িতে। আরেকটা কানা বেড়াল আছে ওখানে! স্যান মেটিওয় পুড়ে গিয়েছিলো।
তারমানে আগুন লাগার সময় শুটিং গ্যালারিতে ছিলো ওটা, বললো কিশোর। ওটাতেই জিনিসটা লুকিয়েছিলো ডাকাত। আগুনে বেড়ালটা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় রবি নিয়ে গিয়ে ঝুড়িতে ফেলে রেখেছে। সেকথা ভাবেইনি ডাকাতটা, তার নিশ্চয় জানা ছিলো না, বেড়াল ছটা আছে। নৌকায় সময় পেয়েছি ভাবার। আমাদের ভাসিয়ে দেয়াটা একটা কথাই প্রমাণ করে, যা খুঁজছে তখনও পায়নি সে। আমরা তার কাজে বাগড়া দেবো বলেই সরিয়ে দিতে চেয়েছে। অনেক ভাবলাম, কোথায় থাকতে পারে জরুরী জিনিস? হঠাৎ মনে পড়লো, ঝুড়িতে ফেলে রাখা বেড়ালটার কথা।
খাইছে! কিশোর, একবারও ভাবিনি আমরা।
আমিও না, তিক্তকণ্ঠে বললো রবি। অথচ আমার হাতের কাছেই রয়েছে।
ডাকাতটাও ভাবেনি, হেসে বললেন চীফ। খুব ভালো কাজ দেখিয়েছো, কিশোর। তোমাকে আমার জুনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে পেলে খুশিই হবো। করবে চাকরিটা? অনারারি পোস্ট।
মৃদু হেসে প্রশ্ন এড়িয়ে গেল কিশোর। বললো, যখন বুঝলাম…! থেমে গেল সে। সতর্ক হয়ে উঠেছে। তাড়াতাড়ি চারপাশে দেখলো। চীফ! কে যেন গেল?
অন্ধকার ছায়ার দিকে তাকিয়ে আছে মুসা। আমিও শুনলাম!
কে গেল? এদিক ওদিক তাকালেন চীফ।
কি জানি, স্যার! বললো একজন পুলিশ। আমরা তো সবাই আছি।
কে যেন দাঁড়িয়েছিলো আমার পেছনে, একজন রাফকে বললো, মনে করতে পারছি না।
চেঁচিয়ে উঠলো রবিন, কোহেন কোথায়?
আশেপাশে কোথাও নেই কোহেন।
জলদি চলুন, কিশোর বললো। কুইক। ছয় নম্বর বেড়ালটার কথা জেনে গেছে!
ছুটতে ছুটতে বেড়ার কাছে চলে এলো সবাই। ফোকর গলে ঢুকলো। কারনিভলের সীমানায়। কিছু দর্শক রয়েছে এখনও। কৌতূহলী হয়ে তাকালো ওরা ছুটন্ত দলটার দিকে।
ছুটে ট্রেলারে ঢুকলো রবি। পরক্ষণেই বেরিয়ে এসে হাত ঝাড়া দিলো। নেই! বেড়ালটা নেই!
সব পথ বন্ধ করে দাও! আদেশ দিলেন চীফ।
খোঁজো, খোঁজো! কনর বললেন। সমস্ত কারনিভল চষে ফেলো!
তাড়াহুড়া করে চলে গেল পুলিশ আর রাফনেকরা।
আর পালাতে পারবে না, চীফ বললেন।
চীফ, কোহেনই নিয়েছে? মুসা জিজ্ঞেস করলো।
বুঝতে পারছি না। একের পর এক মিথ্যে বলে যাচ্ছিলো!
নানী গোয়েন্দা ভাড়া করেনি, রবি বললো। করেছে একটা ডাকাতকে।
অনেক শখের গোয়েন্দাকেই নষ্ট হতে দেখেছি আমি, চীফ বললেন। ক্রিমিনালদের সঙ্গে মেশার সুযোগ বেশি ওদের। খারাপ হতে সময় লাগে না। হতে পারে, ডাকাতটার সঙ্গে হাত মিলিয়েছে কোহেনও।
কোহেন না হলে আর কে, স্যার? মুসার প্রশ্ন। তাকে তো আমরা চিনি না। ধরবো কিভাবে? বেড়ালটা জাস্ট লুকিয়ে ফেলবে। ব্যস, আর চেনা যাবে না। তাকে।
বেড়ালটা নিয়ে প্রমাণ করে দিলো, সে আছে। পালাতে আর দেবো না। যেভাবেই হোক, ধরবোই। কিশোর…আরে, কিশোর গেল কোথায়?
কোন ফাঁকে চলে গেছে কিশোর, কেউ খেয়াল করেনি।
কিশোর? মুসা ডাকলো।
কিশোর? কোথায় তুমি? জোরে ডাকলেন চীফ।
জবাব নেই।
আমাদের সঙ্গে কি এসেছিলো এখানে? মনে করতে পারছে না রবিন।
পার্ক থেকে বেরোনোর আগে পর্যন্ত ছিলো, কনর বললেন।
বেশিদূরে যেতে পারেনি, চীফ বললেন। কাছাকাছিই থাকবে।
যদি ডাকাতটার পিছু নেয়? মুসার গলা কাঁপছে।
শান্ত হও, মুসা, কনর বললেন। চলো, খুঁজি।
এক এক করে সমস্ত ট্রাক আর ট্রেলার খুঁজলো ওরা। তারপর চলে এলো যেখানে শো চলছে সেখানে। পনেরো মিনিট খোঁজাখুঁজি করে না পেয়ে এলো শুটিং গ্যালারির পাশের চওড়া পথটায়। সেখানেও নেই কিশোর।
শো শেষ, কনর বললেন। দেখি ওদেরকে জিজ্ঞেস করে, কিশোরকে দেখেছে কিনা।
বেরোনোর সব পথ বন্ধ, চীফ বললেন। বেড়ার কাছেও লোক আছে। ওদের ফাঁকি দিয়ে পার্কে ঢুকতে পারবে না। ভেতরেই আছে কিশোর।
মারকাস দ্য হারকিউলিসের তাঁবুর কাছে কর্মীদের ডেকে জড়ো করালেন কনর। পুলিশ দেখে অস্বস্তি বোধ করছে অনেকেই। কিশোরকে দেখেছে কিনা জিজ্ঞেস করা হলো।
আমি দেখিনি, অস্বস্তিতে নাক কুঁচকালো লায়ন ট্রেনার।
আগুনখেকো আর দড়াবাজরা মাথা নাড়লো। বিচিত্র ভঙ্গিতে দুই লাফ দিলো খাটো ভাড়, এখনও অভিনয় করছে। হাত তুলে দেখালো বিষণ্ণ লম্বা ভাঁড়কে। ভাঙা ঝাড়ু দিয়ে তলাহীন বালতিতে ময়লা তোলার অভিনয় করলো লম্বা। কিন্তু হাসাতে পারলো না কাউকে। হাসার সময় নয় এটা।
মনে হয় আমি দেখেছি, কেঁদে ফেলবে যেন লম্বা। তাঁবুর পেছনে।
দেখেছো? কাটা কাটা শোনালো চীফের কথা। কার সঙ্গে? কোন তাঁবুর। পেছনে?
জানি না, বিষণ্ণ ভঙ্গিতে মাথা নাড়লো লম্বা। মনে করতে না পারায় বড় দুঃখ পেয়েছে যেন।
হাতে ভর দিয়ে উল্টো হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে পড়ে গেল বেঁটে। তিড়িং তিড়িং করে আবার দুই লাফ দিলো লম্বাকে ঘিরে।
গুঙিয়ে উঠলো রবিন। কিশোরকে ধরে নিয়ে গেছে! আমি জানি!
হ্যাঁ, মুসাও প্রায় ককিয়ে উঠলো। জিম্মি করার অভ্যেস তো আছেই। ডাকাতটার!
শান্ত হও, শান্ত হও, বললেন বটে, কিন্তু চীফ নিজের উদ্বেগই ঢাকতে পারলেন না। যাবে কোথায়? ধূরে নিয়ে গিয়ে বাঁচতে পারবে না।
ধরেই যদি নিয়ে থাকে, প্রশ্ন তুললো রবি। এখনও বেরিয়ে আসছে না। কেন? জিম্মি তো আছেই।
তা-ও তো কথা। বুঝতে পারছি না কিছু।
লম্বা ভাঁড় বলে উঠলো, জিম্মি? মনে পড়েছে। লোকটা পার্কের বেড়ার দিকে দৌড়াচ্ছিলো, ছেলেটাও। ধরে নিলো কিনা বুঝলাম না।
সাগরের দিকে? অবাক হলেন চীফ।
নিশ্চয় সাঁতরে পালানোর চেষ্টা করবে, বললেন কনর। পাহারা পরে বসিয়েছি আমরা, তার আগেই নিশ্চয় বেরিয়ে গেছে।
ইতিমধ্যে দৌড় দিয়েছে মুসা আর রবি। চীফ আর কনরও পিছু নিলেন। কিন্তু রবিন নড়লো না। মাটির দিকে চেয়ে আছে। চীফ! ডাকলো সে। দেখে যান।
ফিরে এলো চারজনেই। আঙুল তুলে দেখালো রবিন। মাটিতে মস্ত এক প্রশ্নবোধক চিহ্ন আঁকা।
খাটো ভাঁড় তখনও লম্বাকে ঘিরে নাচছে। বুড়ো আঙুল নেড়ে বার বার দেখাচ্ছে লম্বা ভাঁড়কে।
আমাদের সাঙ্কেতিক চিহ্ন! বিড়বিড় করলো মুসা। দুই ভাড়ের দিকে তাকালো একবার।
নিশ্চয় কিশোর, বললো রবিন। আমাদের…, বলতে বলতে থেমে গেল। সে। খাটো ভাড়ের দিকে তাকিয়ে আছে স্থির দৃষ্টিতে। চীফ…!
এবারেও রবিনের কথা শেষ হলো না। হঠাৎ ঢোলা জামার পকেট থেকে লম্বা ভঁড়ের হাতে বেরিয়ে এলো একটা পিস্তল। সেটা তাক করে কোনো কথা না বলে। ধীরে ধীরে পিছিয়ে যেতে শুরু করলো প্রধান প্রবেশ পথের দিকে। রঙ করা ফ্যাকাসে-সাদা চেহারায় ধকধক করে জ্বলছে কালো চোখের তারা।
খবরদার, কেউ নড়বে না! সতর্ক করলেন চীফ। যেতে দাও।
অসহায় হয়ে তাকিয়ে আছে ছেলেরা, চীফ নিজে, এবং মিস্টার কনর। চলে যাচ্ছে লোকটা। গেটের কাছে প্রায় পৌঁছে গেছে, হঠাৎ একটা বুদের আড়াল থেকে লাফ দিয়ে বেরিয়ে এলো আরেকজন। লম্বা ভড় কিছু করার আগেই তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো।
কোহেন। পিস্তল ঘোরানোর চেষ্টা করলো লম্বা, পারলো না। লোহার মতো কঠিন আঙুল কব্জি চেপে ধরলো তার। সেই আঙুল ছাড়ানোর সাধ্য হলো না তার, হাত থেকে খসে পড়লো পিস্তল। স্ট্রংম্যানের কবলে পড়ে একেবারে অসহায় হয়ে গেল লম্বা।
যাক, ব্যাটাকে ধরলাম শেষ পর্যন্ত। খুশি হয়ে বললো কোহেন।
নিজের লোকদের ডাকলেন চীফ। ছুটে এলো তারা। শো শেষ হলেও দর্শকরা সব বেরিয়ে যায়নি, ভিড় জমাতে লাগলো। দুজন পুলিশ গেল ভাঁড়কে ধরতে, অন্যেরা লোক সরানোয় ব্যস্ত হলো।
হেসে বললো, কোহেন, গিয়ে ঘাপটি মেরে ছিলাম। জানতাম, আজ বেরোবেই ব্যাটা। কিন্তু ভাঁড়ের ভেতর থেকে যে বেরোবে, কল্পনাও করিনি।
লাফালাফি থামিয়ে দিয়েছে খাটো ভড়। চুল, মুখোশ সব টেনে টেনে খুললো। হাসিমুখে বললো কিশোর, ভাড় সাজার ইচ্ছে আমার অনেকদিনের।
কয়েক সেকেণ্ড স্তব্ধ হয়ে রইলেন চীফ। তারপর কথা ফুটলো মুখে, খুলে বলো সব। কি করে বুঝলে, লম্বুই ডাকাত? আর ভাড় সাজতেই বা গেলে কেন?
বলছি, শুরু করলো কিশোর। লোকটা আমাদের অলক্ষ্যে পার্ক থেকে সরে আসার পরই বুঝেছি, ছয় নম্বর বেড়ালটা নিতে গেছে। আমরা পৌঁছার আগেই বের করে নিয়ে লুকিয়ে ফেলবে। তারপর তাকে চেনা খুব মুশকিল হয়ে যাবে। তাই আপনাদের সঙ্গে না গিয়ে অন্যদিকে গেলাম। বুঝেছি, বেড়ালটা নিয়েই মিশে যাবে লোকের ভিড়ে। যেখানে তাকে চেনা সহজ হবে না।
ওরকম জায়গা কোনটা? দড়াবাজদের তাঁবু। ওরা তখনও খেলা দেখাচ্ছে। ওদিকে পা বাড়াতে যাবো, দেখি ট্রেলারের দিক থেকে একটা লোক দৌড়ে আসছে। চিনলাম। লম্বা ভাঁড়। দৌড়াতে দৌড়াতেই জিনিসটা ঢুকিয়ে ফেললো ঢোলা পাজামার ভেতরে। আমাকে ওখানে ওই অবস্থায় দেখে ফেললে নিশ্চয় চিনে। ফেলতো। তাড়াতাড়ি ঢুকে পড়লাম কাছের তাঁবুটাতে। ঢুকেই চমকে গেলাম। ঢুকেছি ভাঁড়দের তাঁবুতেই।
খাইছে! আঁতকে উঠলো মুসা। যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই রাত… একেবারে বাঘের ঘরে ঢুকে গিয়েছিলে!
মাথা ঝোঁকালো কিশোর। ভয় পেয়েছি খুব। দ্রুত ভাবছি, কি করা যায়। শো দেখানোর অন্যান্য তাঁবুর মতোই ওটারও দুটো অংশ। পেছনের অংশে থাকে অভিনেতাদের মেকাপের সরঞ্জাম, যারা ট্রেলারে মেকাপ নেয় না তাদের জন্যে, জানোই। সোজা ঢুকে পড়লাম সেখানে। বাইরে তার পায়ের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। তখন। যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে। পেছনে ঢুকবে কিনা, জানি না। ঢুকতেও পারে…
কি সাংঘাতিক! চোখ বড় বড় হয়ে গেছে রবির। ভালো ফাঁদে পড়েছিলে! ছুরি-টুরি মেরে বসতে পারতো।
পারতো, সায় জানালো কিশোর। ভয় তো পেয়েছি সেকারণেই। দেখি, খাটো ভাঁড়ের সাজপোশাক পড়ে আছে। খেলা শেষ। সাজপোশাক খুলে রেখে গেছে সে। বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে পরে ফেললাম। ভাগ্যিস, গায়ে লেগেছে। মুখোশ পরাও শেষ করলাম, এই সময় লম্বু ঢুকলো। আমাকে চিনতে পারলো না। অনুরোধ করতে লাগলো, দড়াবাজদের তাঁবুতে গিয়ে আরেকবার যেন খেলা। দেখাই। খেলা দেখানোর নেশায় নাকি পেয়েছে তাকে। আমি তো বিশ্বাস করিইনি, খাটো ভাড়ও করতো কিনা কে জানে। আসলে তখন মরিয়া হয়ে উঠেছে। লম্বু মিয়া। পুলিশকে ফাঁকি দেয়ার জন্যে। বেড়ালটা নিয়ে নিরাপদে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগের জন্যে। প্রথমে চেয়েছিলো, বেড়ালের ভেতর যে সে জিনিস। লুকিয়েছে, এটা কেউ না জানুক। পরে দেখলো, সবাই জেনেই গেছে। আর চালাকি করে লাভ নেই। কোনোমতে বেড়ালটা নিয়ে পালিয়ে যেতে পারলেই তখন হাঁপ ছাড়ে।–
হু, বুঝলাম, বললেন চীফ। কিন্তু বাইরে বেরিয়ে, আমাদের কাছে এসে কেন বললে না, লম্বুই ডাকাত? ভাঁড়ামির কি দরকার ছিলো?
আমি জানতাম, স্যার, ওর কাছে পিস্তল আছে। আমার ভয় ছিলো, সরাসরি আপনাকে বললে বেপরোয়া হয়ে উঠবে সে। পিস্তল বের করে যথেচ্ছা গুলি চালাতে শুরু করলেও অবাক হতাম না। তাতে মারাত্মক কিছু ঘটে যেতে পারতো। তাই চাইছিলাম, ওকে না জানিয়ে কোনোভাবে আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে। বোঝাতে চাইছিলাম, আমি আসলে খাটো ভাড় নই। তা-ও যখন বুঝলেন না, মাটিতে প্রশ্নবোধক আঁকলাম। রবিনের চোখে পড়েছিলো বলেই…।
হ্যাঁ, আরেকটু হলেই দিয়েছিলাম কাচিয়ে, স্বীকার করলেন চীফ। যাক, ভালোয় ভালোয় সব শেষ হলো। বেড়ালটা কোথায়?
ওর পাজামার ভেতরে, লম্বা ভাঁড়কে দেখালো কিশোর।
অস্বাভাবিক ঢোলা পাজামার ভেতর থেকে বের করা হলো বেড়ালটা। ওটার। ভেতর থেকে বেরোলো ছোট একটুকরো কার্ডবোর্ড।
লেফট-লাগেজ টিকেট! টুকরোটা হাতে নিয়ে বিড়বিড় করলেন চীফ। টাকাগুলো নিয়ে গিয়ে লুকিয়ে রেখেছে ওখানে। আরেকটা রহস্যের সমাধান। হলো। এখন দেখা যাক, ভঁড়ের আড়ালে লুকিয়ে আছেন কোন মহাজন।
ভাঁড়ের পরচুলা আর উইগ নিজের হাতে খুললেন চীফ। পিছিয়ে গেলেন এক পা। বোকা হয়ে গেছেন যেন।
ভাঁড়ের মুখোশের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসেছে সাদা-চুল এক বৃদ্ধ। বয়েস পঁয়ষট্টির কম নয়।
ও…ও ডাকাত নয়! মাথা নাড়ছেন চীফ। ও নয়!
আমিও তাই বলতে চাইছিলাম, কনর বললেন। ডাকাতি করার বয়েসই নেই। আর যা-ই করুক, বয়েস কেউ লুকাতে পারে না। আর দেয়াল বেয়ে ওঠাও তার কর্ম নয়।
আমি ডাকাত নই, দীর্ঘশ্বাস ফেললো ভাড়, গোবেচারা চেহারা। দশ হাজার ডলারের লোভ দেখিয়ে আমাকে দিয়ে ট্রেলার থেকে বেড়ালটা চুরি করিয়েছে। পিস্তলটা ও-ই দিয়েছে। কি করে ব্যবহার করতে হয়, তাই জানি না। আপনাদের ভয় দেখিয়ে খুব অন্যায় করেছি। আ-আমাকে…আমাকে মাপ করে দিন।
কে ভাড়া করেছে? চীফ জিজ্ঞেস করলেন।
আড়চোখে কোহেনের দিকে তাকালো ভড়। বললো, কোহেন। আমাকে দশ হাজার ডলার দেবে বলেছে।
লাল হয়ে গেল স্ট্রংম্যান। চেঁচিয়ে উঠলো, মিথ্যে কথা? ব্যাটা মিথ্যুক! আমি…আমি…
আমি সত্যি বলছি, জোর গলায় বললো ভাঁড়। আমাকে ফাঁসিয়ে দিয়ে ও এখন স্বীকার করতে চাইছে না।
কোনো কথা বলছে না কিশোর। স্থির চোখে তাকিয়ে আছে ভাঁড়ের হাতের দিকে। হাসি ফুটলো মুখে। আমাদের বুড়ো ভাঁড়ই মিথ্যে কথা বলছে, চীফ।
কি করে বুঝলে?
ও মোটেও বুড়ো না।
অ্যাঁ? কি বলছো? বিশ্বাস হচ্ছে না মুসার।
হ্যাঁ, সেকেণ্ড। আমরা ভেবেছি, ছদ্মবেশ পরে গিয়ে ডাকাতি করেছে বাদামী চামড়ার লোকটা। আসলে পরে গিয়ে নয়, খুলে গিয়ে করেছে। প্রথম দিন বেড়াল চুরি করার সময় অবশ্য আরেকটা ছদ্মবেশ পরেছিলো। তবে কারনিভলে সব সময়ই ছিলো বুড়ো মানুষের ছদ্মবেশে।
ছাড়া পাওয়ার জন্যে জোরাজুরি শুরু করলো ভাড়, কিন্তু দুজন পুলিশ তাকে দুদিক থেকে চেপে ধরে রাখলো। চুল ধরে টানলেন চীফ, মুখোশ খোলার চেষ্টা করলেন। চুলও খুললো না, মুখের ভাঁজ পড়া চামড়াও আগের মতো রইলো।
ভালো করে দেখলেন আবার চীফ। লোকটার গলার কাছে সূক্ষ্ম একটা দাগ দেখতে পেলেন। নখ দিয়ে খুটে বুঝলেন আলগা। আঙুল ঢুকিয়ে জোরে ওপর দিকে টানতেই খুলে চলে এলো প্লাস্টিকের মুখোশ গলা, মুখ, চুল, সব একটাতে। আলগা কিছু নয়।
বেরিয়ে পড়লো আরেক চেহারা। বাদামী চামড়া।
টিটানভ! সঙ্গে সঙ্গে চিনতে পারলেন কনর। মাছিমানব থেকে ব্যাংক ডাকাত!
টাট্টু কোথায়, দেখুন তো? মুসা বললো।
পাওয়া যাবে না, বললো কিশোর। ওটা আলগা। সময়মতো লাগিয়ে নিতো।
জাহান্নামে যাও; বিচ্ছু কোথাকার! হিসিয়ে উঠলো টিটানভ। হাঁদা ছেলে!
বিচ্ছু ঠিকই, টিটানভ, কঠিন হাসি ফুটলো চীফের ঠোঁটে। তবে হাঁদা বলতে পারবে না। তোমাকেই বরং হাঁদা, গাধা, সব বানিয়ে ছেড়েছে। কিশোরের দিকে ফিরলেন। অনেক প্রশ্নের জবাবই তো দিলে, কিশোর। আর একটা প্রশ্ন। কি করে বুঝলে, ওর মুখে মুখোশ? টেনেও তো কিছু বোঝা যাচ্ছিলো না।
অতি-ধূর্ত অপরাধীও কিছু না কিছু ভুল করেই ফেলে, স্যার। আপনি খুব ভালো করেই জানেন। এই লোকও হাত ঢাকতে ভুলে গিয়েছিলো। বোধহয় তাড়াহুড়োয়। সবসময় তো দস্তানা পরেই থাকতো, দেখেছি। কোথায় খুলে রেখেছিলেন, টিটানভ? পার্কে? আমাদের নৌকার দড়িকাটার সময়? নাকি বেড়ালটা চুরির সময়? . জবাব দিলো না মাছিমানব। ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিলো আরেকদিকে। তার হাতের দিকে এখন সবার চোখ। বাদামী চামড়া সবাই দেখতে পাচ্ছে।
হাঁদা আমাকে বলতে পারো, টিটানভ, বিরক্ত কণ্ঠে বললেন চীফ। চোখ ভোঁতা হয়ে গেছে আমার। নইলে এটা দেখলাম না!
হাসলো কিশোর। নাটকীয় ভঙ্গিতে বললো, সহজ ব্যাপারগুলোই সহজে, চোখ এড়িয়ে যায়।
পরদিন, কেসের রিপোর্ট ফাইল নিয়ে বিখ্যাত পরিচালক ডেভিস ক্রিস্টোফারের অফিসে ঢুকলো তিন গোয়েন্দা।
মন দিয়ে ফাইলটা পড়লেন পরিচালক। মুখ তুলে বললেন, চমৎকার কাহিনী। ভালো ছবি হবে।…এখন, কয়েকটা প্রশ্নের জবাব দাও তো। কারনিভলে ঢুকলো কেন টিটানভ? ব্যাংক ডাকাতির পরিকল্পনা আগেই ছিলো?
ওহিওতে ডাকাতির অপরাধে খুঁজছিলো তাকে পুলিশ, রবিন জানালো। কারনিভলে ঢুকে তাই লুকিয়ে থাকতে চেয়েছে।
আরও একটা কারণ আছে, বললো কিশোর। সে শুনেছে, কারনিভল নিয়ে ক্যালিফোর্নিয়ায় আসবেন মিস্টার কনর। দলে ঢুকতে পারলে পুলিশের চোখ এড়িয়ে সহজে বেড়িয়ে আসতে পারবে টিটানভ। ভাঁড়ের ছদ্মবেশে ঢুকে পড়েছে। কারনিভলে কাজের অভিজ্ঞতা তার আগে থেকেই ছিলো। ভাঁড়ের অভিনয় করতে কোনো অসুবিধে হয়নি। স্যান মেটিওতে আসার পর ব্যাংক ডাকাতির চিন্তা ঢুকলো মাথায়।
বুদ্ধিমান ডাকাত, চিন্তিত ভঙ্গিতে বললেন পরিচালক। ডাকাতি করে টাকা নিয়ে গিয়ে লেফট-লাগেজে রাখলো। ভাঁড়ের ছদ্মবেশে আরেকবার ফাঁকি দিয়ে বেরিয়ে গেল পুলিশকে।
রকি বীচ থেকেও বেরিয়ে যেতো। শুধু যদি জানতো, বেড়াল পাঁচটা নয়, ছটা।
হু। চুপ করে ভাবলেন কিছুক্ষণ পরিচালক। জিজ্ঞেস করলেন, রবি কি বাবার কাছেই থাকবে ঠিক করেছে? নাকি নানীর কাছে চলে যাবে?
বাবার কাছেই থাকবে, মুসা বললো। কোহেন, মানে বোলার রিপোর্ট করেছে তার নানীর কাছে, কারনিভলে ভয়ের কিছু নেই। নিরাপদেই থাকবে রবি। তাছাড়া কাজটা সে পছন্দ করে।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও মেনে নিয়েছেন মহিলা, যোগ করলো কিশোর। ছেলে বাবার কাছে থাকলেই ভালো।
বোলার কি চলে গেছে?
না, রবিন বললো। কারনিভলেই রয়ে গেছে, সিকিউরিটি ইনচার্জ হিসেবে। গোয়েন্দাগিরি করেছে বটে কিছুদিন, কাজটী তার ভালো লাগেনি।
হুঁ। সব কাজ সবার জন্যে নয়। ঘড়ি দেখলেন পরিচালক, মুখে না বলেও বুঝিয়ে দিলেন হাতে সময় কম। আর একটা প্রশ্ন, তারপরেই তোমাদের ছেড়ে দেবো। ওই পনি রাইডের ব্যাপারটা কি? কে বিষ খাওয়ালো ঘোড়াগুলোকে?
ওটা সত্যিই দুর্ঘটনা। খাবারে বিষক্রিয়া।
ও। মিস্টার কনরের ভাগ্য খারাপ। ভালো ঘোড়াগুলো মরে গেল। ভড়ও কমে গেল একজন। আরেকটা বড় আকর্ষণ গেল তাঁর কারনিভলের।
রকি বীচে যতোদিন থাকবেন উনি, ভাঁড়ের অসুবিধে হবে না তার, হেসে বললো মুসা। কিশোর কথা দিয়েছে, ভাঁড়ের অভিনয় সে-ই করবে। কাল যা দেখিয়েছে না, স্যার, কি বলবো। অন্য সময় হলে হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যেতো আমার।
তাই নাকি, তাই নাকি? আরও গম্ভীর হয়ে গেলেন সদাগম্ভীর পরিচালক। সময় করতে পারলে যাবো দেখতে। দেখি, কিছুক্ষণ হেসে মনটা হালকা করে আসতে পারি কিনা।