৪. তিন গোয়েন্দা ও ব্ল্যাকবিয়ার্ড

0 Comments

পরদিন সকালে। ইয়ার্ডে কাজকর্ম বিশেষ নেই। মেরিচাচীকে বলে-কয়ে অনুমতি নিয়ে বোরিস আর রোভারকে ডিয়েগোদের ওখানে পাঠাল কিশোর। কুঁড়ে মেরামতের কাজে ছেলেটাকে সাহায্য করার জন্যে। ডিয়েগো আর তার চাচা, দুজনকেই খুব পছন্দ হয়েছে তার। ঠিকমত খেতে পায় না, এত গরীব, কিন্তু আত্মসম্মান বোধ কি প্রচণ্ড।

দুপুরের পর ফিরে এল দুই ব্যাভারিয়ান ভাই।

হাসিমুখে ট্রাক থেকে নামল বোরিস। হাতে কার্ডবোর্ডের একটা বাক্স। ওয়ার্কশপের কাছে কিশোরকে দেখে এগোল।

বাক্সটা দেখেই চিনল কিশোর। এটাতে করেই ব্ল্যাকবিয়ার্ডকে ফেরত দিয়ে গিয়েছিলেন মহিলা।

বাক্সটা বাড়িয়ে ধরল বোরিস। ডিয়েগো দিল।

নিয়ে মুসার হাতে দিল কিশোর।

পকেট থেকে একটা চিঠিও বের করে দিল বোরিস।

বাক্স আর চিঠি নিয়ে ওয়ার্কশপে ঢুকল তিন গোয়েন্দা।

দড়ি কাটো, মুসাকে অনুরোধ করল কিশোর।

বাক্সের দড়ি কেটে ডালা তুলতেই ফড়ফড় করে উঠল কালো ময়না, হলুদ ঠোঁট তুলে তাকাল মুসার দিকে।

আরিব্বাপরে! ব্ল্যাকবিয়ার্ড, চমকে সরে এল মুসা।

হেসে রবিনকে বলল কিশোর, চিঠিটা পড়ে তো কি লিখেছে।

পড়ল রবিন :

ডিয়ার সিনর কিশোর, সিনর ব্ল্যাকবিয়ার্ডকে পাঠালাম। গতকাল দুপুরের খাওয়ার সময় এসে হাজির। আপনারা আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। আরও একটা কারণে পাঠিয়ে দিলাম, সিনর মোটকা এসে কেড়ে নিয়ে যেতে পারে। চমৎকার একটা ঘর হয়েছে আমাদের, আপনাদের সৌজন্যে। এক হাজার ধন্যবাদ।

–ডিয়েগো রটরিজ।

রবিনের চিঠি পড়া শেষ হওয়ার অপেক্ষায় ছিল যেন ময়নাটা, লাফিয়ে বেরিয়ে এসে বসল বাক্সের কিনারে। কৌতুহলী চোখে তাকাল অসাবধানে বাক্সের কোণে ফেলে রাখা মুসার একটা আঙুলের দিকে।

সময়মত খেয়াল করল মুসা, চেঁচিয়ে এক টানে সরিয়ে আনল আঙুল, না না, আর না! কালই শিক্ষা হয়ে গেছে আমার, লতিটা এখনও শুকায়নি। ব্যাটা তো একেবারে রক্তচোষা ডাকাত। মরলে নির্ঘাত ড্রাকুলা হবে।

তার কথার জবাবেই যেন বার কয়েক ডানা ঝাপটাল পাখিটা, গম্ভীর কণ্ঠে বলল, আয়্যাম ব্ল্যাকবিয়ার্ড দা পাইরেট। আহ্যাভ বারিড মাই ট্রেজার হোয়্যার ডেড ম্যান গার্ড ইট এভার। ইয়ো-হো-হো অ্যাণ্ড অ্যা বটল অভ রাম!

হ্যাঁ, বাবা, তুমি ডাকাতই।

হেসে উঠল অন্য দুজন।

এতে অপমানিত বোধ করল বোধহয় ব্ল্যাকবিয়ার্ড। আরও গম্ভীর হয়ে মুখ খারাপ করে গাল দিল গোটা দশেক।

হেডকোয়ার্টারে আলোচনায় বসেছে তিন গোয়েন্দা। তাদের মাথার ওপরে ঝোলানো খাঁচায় রাখা হয়েছে ব্ল্যাকবিয়ার্ডকে, খাঁচাটা বানানো হয়েছিল টমের জন্যে, সেই রেসিং হোেমার কবুতরটা। ময়নার ভাব-ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে, মহাজ্ঞানী সে, ছেলেদের সব কথা শুনছে যেন মন দিয়ে, দরকার হলেই উপদেশ কিংবা পরামর্শ দেবে।

বিলি শেকসপীয়ার আর লিটল বো-পীপ আছে হাইমাসের কাছে, কিশোরের কথার পিঠে বলল মুসা। ও-তো কাল বললই, চারটে কাকাতুয়া আছে তার কাছে। সোজা গিয়ে এখন তাকে বলতে পারি, মিয়া, পাখিগুলো ফেরত দিলে দাও, নইলে যাচ্ছি পুলিশের কাছে। আসলে তো যাব না পুলিশের কাছে, কারণ দুজনকে কথা দিয়ে এসেছি, কিন্তু সেটা হিপোকে বলতে যাব কেন?

হুমম, আনমনে নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটছে কিশোর। সমস্যা আছে। একটা কথা ঠিক, মিস্টার সিলভার চাইছিল, কাকাতুয়াগুলো হাইমাস পাক।

সেটা সমস্যা হলো নাকি? রবিন প্রতিবাদ করল। সিলভার চেয়েছিল কিনে নিক। কিন্তু হাইমাস তো করেছে চুরি। মুসা ঠিকই বলেছে। চলো, গিয়ে পুলিশের ভয় দেখাই। সাথে বোরিস আর রোভারকে নিয়ে যাব। বেশি তেড়িবেড়ি করলে বাপের নাম ভুলিয়ে ছাড়বে মোটকার।

ঠিক আছে, কার্ড বের করে দিল কিশোর। এই যে, হাইমাসের টেলিফোন নম্বর।

পড়ল রবিন। লেখা আছে :

হাইম হাইমাস
রেয়ার আর্ট ডিলার
লণ্ডন-প্যারিস-ভিয়েনা

তার নিচে হাতে লেখা রয়েছে হলিউডের একটা অ্যাপার্টমেন্টের ঠিকানা আর টেলিফোন নম্বর।

আগে ফোন করো, রবিনকে বলল কিশোর। তোমাকে দেখেনি, গলা চিনবে। বলো, হলদে ঝুঁটিওলা একটা কাকাতুয়া আছে তোমার কাছে, বিক্রি করতে চাও। বলো, এক মেকসিকান ফেরিওলার কাছ থেকে কিনেছেনতোমার মা। হাইমাসের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করো, জিজ্ঞেস করো কোথায় দেখা করতে চায়। আমরা সবাই যাব ওখানে।

ডায়াল করল রবিন। ভাবছে, গুছিয়ে ঠিকমত বলতে পারবে তো মিছে কথাগুলো?

কিন্তু মিথ্যে বলার দরকার হলো না। অ্যাপার্টমেন্টের অপারেটর জানাল, দুই দিন আগে ঘর ছেড়ে চলে গেছেন মিস্টার অ্যাণ্ড মিসেস হাইমাস।

স্পীকারে কিশোর আর মুসাও ওপাশের কথা শুনতে পাচ্ছে। জিজ্ঞেস করো তো, কাকাতুয়াগুলোও নিয়ে গেছে কিনা? বলল কিশোর।

অপারেটর জানাল, তাঁদের সঙ্গে কোন কাকাতুয়া ছিল না। কারণ অ্যাপার্টমেন্ট কর্তৃপক্ষ ভাড়াটেদের পশুপাখি সঙ্গে রাখতে দেন না, এ-ব্যাপারে খুব কড়াকড়ি।

রিসিভার রেখে দিয়ে বলল রবিন, গেল। হাইমাসকে কোথায় পাওয়া যাবে, তা-ও জানি না এখন।

চমৎকার অগ্রগতি, নাক কুঁচকাল মুসা। খালি পিছিয়ে আসা।

এটা আপাতত হচ্ছে, সহজে নিরাশ হওয়ার ছেলে নয় কিশোর। এক ঠিকানায় নেই, নিশ্চয় আরেক ঠিকানায় আছে। এমন কোথাও যেখানে কাকাতুয়া রাখতে বাধা নেই। বেশি ভাড়ার বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টে আর বোধহয় থাকবে না, ওসব জায়গায় নানারকম ফ্যাকরা, অন্তত তার জন্যে। তাছাড়া এমন কোথাও থাকবে না যেখানে কাকাতুয়াগুলো খুব সহজে চোখে পড়ে।

আর আমার কোন কথা নেই, হাত ডলছে মুসা। মাথায় কিছু ঢুকছে না।

রবিন কোন নতুন আইডিয়া দিতে পারো? নথি-গবেষকের দিকে তাকাল গোয়েন্দাপ্রধান।

হ্যাঁ, কিছু বললা, মূসাও অনুরোধ করল। কিন্তু দোহাই, কিশোরের মত কঠিন করে বলো না।

সবগুলো ঘটনা আবার গোড়া থেকে ভেবে দেখা দরকার। মাঝখান থেকে ঢুকেছি আমরা, বলল রবিন, মিস্টার ফোর্ডের কাকাতুয়া চুরি হওয়ার পর। অথচ

ব্যাপারটা শুরু হয়েছে আরও অনেক আগে থেকে।

ইয়ো-হো-হো অ্যান্ড অ্যা বটল রাম! কর্কশ চিৎকার করে উঠল ময়নাটা।

বলো, রবিন, হাত নাড়ল কিশোর, বলে যাও। অন্যের মুখে শোনার সময় চিন্তা করতে সুবিধে হয় আমার।

আমার ধারণা, রবিন বলল, সব কিছুর মূলে ওই ইংরেজ লোকটা, ক্যাপ্টেন লঙ জন সিলভার, শুরুটা সে-ই করেছে। কয়েক মাস আগে ডিয়েগোর চাচার ওখানে এসে উঠল। বেআইনী ভাবে পালিয়ে এসেছিল ইংল্যাণ্ড থেকে। সঙ্গে একটা চ্যাপ্টা বাক্স, যেটাতে মূল্যবান কিছু ছিল, যেটা বিক্রি করতে ভয় পাচ্ছিল সে।

কিশোরের দিকে তাকাল রবিন। কোন প্রতিবাদ বা মন্তব্য করল না কিশোর।

মারাত্মক কোন অসুখে ভুগছিল সিলভার, আবার বলল রবিন, যে অসুখ সারার নয়। দ্রুত মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বুঝতে পারছিল লোকটা। মরার আগে বাক্সটা কোথাও লুকিয়ে ফেলল, তার গুপ্তধনসহ, সত্যিই যদি কোন গুপ্তধন থেকে থাকে বাক্সে। রেখে গেল সাতটা পাখি, বিচিত্র কিছু বুলি শিখিয়ে।

হ্যাঁ, সত্যি বিচিত্র, বিড়বিড় করল মুসা। মাথা ঘুরিয়ে দেয়ার মত।

নোটবই দেখে বলল রবিন, লম্বা একটা চিঠি লিখে ডিয়েগোকে পোস্ট করতে দিল সিলভার। বলল, চিঠি পেয়ে মোটা এক লোক আসবে, স্যানটিনোকে হাজার ডলার দিয়ে নিয়ে যাবে পাখিগুলো। কিন্তু ঠিক সময়ে এল না হাইমাস। ঠেকায় পড়ে কাকাতুয়াগুলো তার আগেই বিক্রি করে দিতে বাধ্য হলো স্যানটিনো। এসে কাকাতুয়া না পেয়ে রেগে গেল মোটা লোকটা। ওগুলোর খোজে বেরোল। খুঁজে খুঁজে বের করে ফেলল চারটি পাখি। আমাদের জানামতে দুটো সে চুরি করেছে, অন্য দুটোও হয়তো তাই করেছে, কিংবা কিনে নিয়েছে। কি করেছে জানি না।

বিলি শেকসপীয়ার চুরি হওয়ার পর কেস হাতে নিয়েছি আমরা। এখন আমাদের কাছে রয়েছে ব্ল্যাকবিয়ার্ড, কোন কারণে এটাকেই বেশি মূল্যবান মনে করছে হাইমাস। গেল পাঁচটা, বাকি আর দুটো পাখির কোন খোঁজ নেই। কিন্তু পাখিগুলো লোকটার কাছে কেন এত মূল্যবান, জানি না আমরা। এ-ও জানি না, নতুন কোন জায়গায় উঠেছে হাইমাস। দম নিল রবিন। এ-যাবৎ যা যা ঘটেছে, এই হলো সারমর্ম। লম্বা লেকচার শেষ করল সে।

লুক আণ্ডার দা স্টোনস বিয়ণ্ড দা বোনস! ডানা ঝাপটে চেঁচিয়ে উঠল ব্ল্যাকবিয়ার্ড। আই নেভার গিভ আ সাকার অ্যান ইভন ব্রেক!

বেশ সাজিয়ে বলেছ, রবিনের দিকে চেয়ে মাথা কাত করল কিশোর। আমি আরও কিছু যোগ করছি। মিস্টার সিলভার বইয়ের পোকা ছিল, খুব পড়ত। নিজের ছদ্মনামটা কি রেখেছে খেয়াল করেছ? ক্যাপ্টেন লঙ জন সিলভার। ট্রেজার আইল্যাণ্ড বইয়ের সেই বিখ্যাত জলদস্যুর নামে নাম। ডাকাত সিলভারের কাঁধে থাকত একটা কাকাতুয়া, আর আমাদের মিস্টার সিলভারের কাঁধে ময়না।

তা-তো বুঝলাম, মুসা বলল। কিন্তু এসব কি প্রমাণ করে?

জলদস্যুর সঙ্গে নাম মিলিয়ে রাখাটা প্রমাণ করে, কিছু একটা চুরি করেছে সে, হয়তো তার সেই রহস্যময় গুপ্তধন, যেটা বিক্রি করার সাহস হয়নি। চুরি করেছে বলেই হয়তো।

তার সাহিত্যপ্রেমের আরেক নমুনা, নাম বাছাই, বলে গেল কিশোর। কিভাবে কাকাতুয়াগুলোর নামকরণ করেছে লক্ষ করেছ? বিলি শেকসপীয়ার, লিটল বো-পীপ, ব্ল্যাকবিয়ার্ড দা পাইরেট, শার্লক হোমস, রবিন হুড, ক্যাপ্টেন কিড।

এবং স্কারফেস, মনে করিয়ে দিল মুসা।

ওটা কোন বই থেকে নয়। মারপিটের কোন সিনেমার হীরো কিংবা ডাকাতের নাম হবে। যাই হোক, ওই একটা ছাড়া বাকি সব নামই বই থেকে নেয়া, ক্লাসিক থেকে, নয়ত ইতিহাস থেকে।

আচ্ছা, কথার মাঝেই বলে উঠল রবিন, তার গুপ্তধন কোন বইও তো হতে পারে? অনেক পুরানো দুর্লভ পুঁথি আছে, যে কোন যাদুঘর পেলে হাজার হাজার ডলার দিয়ে লুফে নেবে।

ভুরু কোঁচকাল কিশোর। হতে পারে। কিন্তু মনে করে দেখো, সিলভার অন্য কথা বলেছে। বলেছে? রামধনুর একটা টুকরোর নিচে একপাত্র সোনা। বই বলে মনে হয়?

না, সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল মুসা। কিন্তু তাতে কি? বিলি আর বো-পীপ কোথায় আছে জানি না, এমনকি হাইমাস কোথায় তা-ও অজানা। দেয়ালে ঠেকেছি আমরা, পথ বন্ধ।

কিন্তু ফোকর আছে, নাটকের সংলাপ বলছে যেন কিশোর।

গতকাল হাইমাসকে বলতে শুনেছি দুটো কাকাতুয়া এখনও নিখোঁজ। ওই দুটোকে জোগাড় করব আমরা। ব্ল্যাকবিয়ার্ড সহ আমাদের কাছে থাকবে তখন তিনটে, হাইমাসের কাছে চারটে। আগে পরে সেকথা সে জানবেই, নিতে আসবে।

কোন দরকার নেই, দু-হাত নাড়ল মুসা। আবার ওই হিপোর মুখোমুখি হব? আমি পারব না। তাছাড়া কাকাতুয়া চুরি করতেও যেতে পারব না আমি লোকের বাড়িতে।

কে চুরি করতে বলেছে তোমাকে? কিনে নেব।

যেন দোকানে আছে, গিয়ে নিয়ে এলেই হলো। কোথায় আছে তাই তো জানি না।

জানতে হবে, শান্ত কণ্ঠে বলল কিশোর। আবার চালু করে দেব ভূত-থেকেভূতে। কাকাতুয়া পছন্দ করে অনেক ছেলেমেয়ে, আর সেগুলো যদি ক্লাসিক ডায়ালগ বলে তাহলে কোন কথাই নেই। বাচ্চাদের চোখে পড়বেই পড়বে। হলিউডের একটা ম্যাপ বের করে এক জায়গায় আঙুল রাখল সে। এখানকার তিনটে ছেলেকে চিনি আমি।ওরা ছড়িয়ে দেবে খবর।

খুব সহজেই কাজ হলো এবার।

এটাই তো মনে হচ্ছে, হাতের কাগজটার দিকে চেয়ে ঠিকানা মিলিয়ে নিল মূসা দুটো ঠিকানা লিখে নিয়েছে, তার একটা মিলছে। গাড়ি রাখুন।

রাস্তার ধারে রোলস নামিয়ে আনল শোফার। হ্যানর্সন নয়, নতুন আরেকজন। বেঁটে, শয়তানী ভরা চাহনি, নাম ক্র্যাব। মুসার মনে হলো কাঁকড়ার দাঁড়ার মতই হাত নাড়ে লোকটা। রবিনও রয়েছে গাড়িতে। দুজনের কেউই পছন্দ করতে পারছে নতুন শোফারকে। সকালে রোলস-রয়েসের জন্যে ফোন করেছিল কিশোর, কোম্পানির ম্যানেজার জানিয়েছে জরুরী কারণে ছুটি নিয়েছে হ্যানসন। নতুন ড্রাইভার দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছে গাড়ি।

এঞ্জিন বন্ধ করে দুই গোয়েন্দার দিকে ফিরে হাসল ক্র্যাব। কিশোর আসেনি সঙ্গে। বোরিস আর রোভার গেছে পুরানো মাল আনতে। চাচা-চাচী গেছেন আরেক কাজে। ফলে বাধ্য হয়ে ইয়ার্ডে পাহারায় থাকতে হয়েছে কিশোরকে।

কিছু তদন্ত করতে যাচ্ছ তোমরা? জিজ্ঞেস করল ক্র্যাব। হ্যানসন বলেছে। তোমাদের কথা। এসব ব্যাপারে আমিও খুব ইনটারেসটেড। যাও, আমি গাড়িতে আছি। দরকার পড়লে ডেকো। নিজের কপালে টোকা দিল। চোর-ডাকাতের স্বভাব রেকর্ড করা আছে এখানে।

লোকটার অহঙ্কারী ভাবসাব ভাল লাগল না মুসার। বলল, চোর-ডাকাত ধরতে যাচ্ছি না। একটা হারানো কাকাতুয়া খুঁজতে যাচ্ছি।

হারানো কাকা:… থেমে গেল ক্র্যাব, বিষয় পছন্দ হলো না। কিংবা হয়তো ভাবল মুসা তার সঙ্গে রসিকতা করছে। গম্ভীর হয়ে একটা খবরের কাগজ টেনে নিয়ে পড়ায় মন দিল।

ভূত-থেকে-ভূতে চালু করে দেয়ার কয়েক ঘণ্টা পরই দুটো কাকাতুয়ার খোঁজ পাওয়া গেছে। আরও কিছু তথ্যও জানা গেছে। কদিন ধরেই নাকি কয়েকটা কাকাতুয়ার জন্যে দ্বারে দ্বারে ঘুরেছে মোটা এক লোক, শেষে ক্যাপ্টেন কিড আর শারলক হোমস নামের দুটো কাকাতুয়া পেয়ে ডবল দাম দিয়ে কিনে নিয়ে গেছে।

বাকি দুটো কাকাতুয়া, স্কারফেস আর রবিন হুডকে নিতে এসেছে এখন রবিন আর মুসা। ওগুলোর বর্তমান মালিকেরা বিক্রি করতে রাজি হলে কিনে নিয়ে যাবে, আর তা নাহলে রেকর্ড করে নিয়ে যাবে কাকাতুয়া দুটোর বুলি। টেপরেকর্ডার নিয়ে এসেছে সে-জন্যে সঙ্গে করে।

সিমেন্টে বাঁধানো পথ ধরে হাঁটতে শুরু করল দুই গোয়েন্দা। দু-ধারে উঁচু পাতাবাহারের ঝাড়। পথের শেষ মাথায় পুরানো একটা বাড়ি, নতুন প্লাসটার করা হয়েছে।

ওরা বাড়িটার ফুট বিশেক দূরে থাকতেই খুলে গেল সামনের দরজা। বেরিয়ে এল ওদের চেয়ে সামান্য বেশি বয়েসী একটা ছেলে। টিংটিঙে তালপাতার সেপাই, মুসার চেয়ে লম্বা, বাঁকা নাক। দুই গোয়েন্দাকে দেখে বত্রিশ দাঁত বের করে হাসল।

এহহেরে! আবার এসেছে জ্বালাতে! বলে উঠল মুসা। এই রবিন সরো, সরো, শুঁটকির গন্ধ লাগবে গায়ে।

রকি বীচে ফিরে এসেছে আবার তিন গোয়েন্দার চিরশত্রু টেরিয়ার ডয়েল।

মুসার কথায় কিছুই মনে করল না টেরি। হাসি আরও বিস্তৃত হলো। হাতের খাঁচাটা তুলে ধরে এগোল কয়েক পা, বলল, এটার জন্যেই এসেছ, না?

খাঁচার ভেতরে একটা কাকাতুয়া। হলদে ঝুঁটি। এক চোখ কানা, ভয়ানক কোন লড়াইয়ে স্বজাতির ঠোঁট কিংবা নখের আঘাতে হারিয়েছে বোধহয় চোখটা।

কাকাতুয়া? বিস্ময় চেপে রাখতে পারল না মুসা। বলেই ফেলছিল, এটার জন্যেই এসেছে।

কিন্তু তাড়াতাড়ি বাধা দিল রবিন। কাকাতুয়া? ওই কানা পাখি আমাদের কি কাজে লাগবে, মিস্টার শুঁটকি?

কিন্তু ধাপ্পাটা কোন কাজে লাগল না। টেরি জানে, এটার জন্যেই এসেছে রবিন আর মুসা।

গতরাতে এসেই শুনল্লাম কাকাতুয়ার খবর, হেসে মুসার দিকে চেয়ে চোখ টিপল টেরি, রাগানোর জন্যে। তা কালু মিয়া কাকাতুয়া দিয়ে কি করবে? ভেজে খাবে?

শুঁটকির ভর্তা বানিয়ে খাব, রেগে গেল মুসা।

হা-হা করে হাসল টেরি। দারুণ বলেছ হে কালু মিয়া। বুদ্ধি খুলছে আজকাল। তো তোমাদের খোকা শারলক কই? কাকাতুয়ার খবর চেয়েছে কেন?

শার্টের হাতা গোটাতে শুরু করল মুসা।

হাত চেপে ধরল রবিন। টেরিকে জিজ্ঞেস করল, তুমি খবর পেলে কি করে?

এটা একটা প্রশ্ন হলো নাকি? আমেরিকার সব ছেলেই তো জানে, দুটো কাকাতুয়ার খোঁজ চায় শারলক পাশা। আমিও শুনলাম বন্ধুদের কাছে। তাই সকাল সকালই চলে এসেছি। চল্লিশ ডলারে কিনেছি এটা। নেবে নাকি? দেড়শো ডলার লাগবে।

এক আধলা দিয়েও নেব না আমরা, জবাব দিল রবিন। ওই কাতুয়া চাইনি আমরা, কানা কাকাতুয়া।

তাই নাকি? তাহলে অযথা সময় নষ্ট করছি। আরেক কাস্টোমার আগেই বলে রেখেছে আমাকে। পুরো দেড়শো দেবে। চলি, বাই-বাই। পা বাড়াল টেরি।

আই নেভার গিভ আ সাকার অ্যান ইভন ব্রেক! হঠাৎ কর্কশ গলায় বলে উঠল কাকাতুয়াটা।

অবাক হয়ে পাখিটার দিকে তাকাল টেরি। ভাবল, বকাটা তাকেই দিয়েছে। রেগে গিয়ে ধমক লাগাল, শাটাপ! গটমট করে হেঁটে গেল গাড়িবারান্দার এক দিকে। এঞ্জিন স্টার্ট নিল। শাঁ করে ঝোপের ওপাশ থেকে বেরিয়ে এল নীল একটা স্পোর্টস কার, চালিয়ে নিয়ে চলে গেল টেরি।

শুঁটকি কার কাছে বেচবে? রবিনকে জিজ্ঞেস করল মুসা। হাইমাস?

জবাব দিতে পারল না রবিন। তাড়াতাড়ি নোট বই বের করে লিখে নিল, স্কারফেস—মানে কানা কাকাতুয়াটা কি বুলি আউড়েছে।

একটা তো গেল, বলল মুসা। চলো, দেখি আরেকটা পাই কিনা।

ক্র্যাবকে আরেক ঠিকানায় যেতে বলল মুসা।

কয়েক রক পরেই বাড়িটা। এত পুরানো বিলডিং, জায়গায় জায়গায় প্ল্যাস্টার খসে গেছে, বেরিয়ে পড়েছে ইটের পাজর।

গাড়ি থেকে নেমে বাড়িটার দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলল মুসা, ভাবছি, ভূতথেকে-ভূতের সুবিধে যেমন, অসুবিধেও তেমনি। সবাই জেনে যাচ্ছে খবর, শত্রুরাও জেনে যাচ্ছে। ফলে বেকায়দা হয়ে যায়। শুঁটকি তো কয়েকবারই অসুবিধেয় ফেলল এভাবে।

রবিন হুডকে না নিয়ে গেলেই বাঁচি, বলল রবিন।

পাওয়া গেল রবিন হুডকে। কোন কারণে খোঁজ পায়নি বা খবরই জানেনি শুঁটকি, কিংবা আগ্রহ দেখায়নি। যা-ই হোক, নিতে পারেনি, বা নেয়নি। আছে। বাড়ির মালিকের মাথা জুড়ে বিশাল টাক। জানাল, কেনার সময় একবারই কথা বলেছিল কাকাতুয়াটা, সেজন্যেই কিনেছে, তারপর একেবারে জবান বন্ধ। আর একটি বারও বুলি আউড়ায়নি। বাড়িওয়ালী গেছে রেগে। স্বামীকে কদিন ধরেই চাপ দিচ্ছে কাকাতুয়াটা বিদেয় করে দিয়ে একটা ক্যানারি কেনার জন্যে।

কাজেই, সস্তায়ই পাওয়া গেল কাকাতুয়াটা। পঁচিশ ডলারে কিনেছিল বাড়িওয়ালা, পঁচিশ ডলারেই বিক্রি করে দিল দুই গোয়েন্দার কাছে। টীকাটা গুণে নিয়ে পকেট রেখে বলল, কেন কিনছ, বুঝতে পারছি না। কথা জানে ব্যাটা, কিন্তু বলে না। দেখো, তোমরা বলতে পারো কিনা। বাচ্চারা অনেক সময় অনেক কিছু পারে, যা বুড়োদের পক্ষে অসম্ভব।

থ্যাংক ইউ, স্যার, বলল রবিন। দেখব চেষ্ট করে।

কাকাতুয়াটাকে নিয়ে বেরিয়ে এল ওরা।

বিষণ্ণ হয়ে খাঁচায় বসে আছে রবিন হুড। ছেলেদের দিকে ফিরেও তাকাল না।

তাজ্জব ব্যাপার? বলল মুসা। কথা বলে না কেন?

দেখা যাক, কিশোর বলাতে পারে কিনা…আরে, গাড়িটা গেল কোথায়? এখানেই তো ছিল।

আশেপাশে গাড়িটাকে খুঁজল ওরা। কিন্তু নেই।

ওই ক্র্যাবের বাচ্চাকে দেখেই ভাল্লাগেনি আমার, গোমড়া মুখে বলল মুসা। ব্যাটা আমাদের ফেলে চলে গেছে।

তা-তো গেছে, যাই কি করে এখন? আরেকটা গাড়ি কিংবা ট্যাকসির জন্যে, এদিক ওদিক তাকাল রবিন। যেন তার মনের খবর জানতে পেরেই ঘ্যাচ করে এসে পাশে থামল একটা ঝরঝরে ভ্যান। ড্রাইভিং সীট থেকে জানালা দিয়ে মুখ বের করল এক মহিলা। রোলস-রয়েসটাকে খুঁজছ? ওদিকে চলে যেতে দেখলাম।

কেন যে গেল বুঝতে পারছি না, কপাল চুলকাল রবিন।

যাবে কোথায় তোমরা?

জানাল মুসা।

এসো, বাস স্টেশনে নামিয়ে দেব। ওদিকেই যাচ্ছি, আমন্ত্রণ জানাল মহিলা।

মহিলাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাল মুসা। এসো, রবিন। কি আর করা। উইলশায়ার থেকে বাস ধরব।

মহিলার পাশে উঠে বসল মুসা।

রবিন উঠল তার পাশে। চিন্তিত। চেনা চেনা লাগছে মহিলার কণ্ঠস্বর, আগে কোথাও শুনেছে।

চলতে শুরু করেছে ভ্যান।

আরে, ওদিকে কোথায়? তাড়াতাড়ি বলল রবিন। উল্টোদিকে যাচ্ছেন তো। উইলশায়ার ওদিকে।

উইলশায়ারে যাচ্ছেটা কে? পেছন থেকে বলে উঠল একটা কর্কশ কণ্ঠ, কথায় ব্রিটিশ টান। অন্যখানে যাচ্ছি আমরা।

চমকে ফিরে চাইল দুই গোয়েন্দা।

সীটের পেছনের একটা পার্টিশন সরে গেছে। আরাম করে বসে আছে হাইমাস। গোল মুখে কুৎসিত হাসি।

আমার সঙ্গে যাবে তোমরা, যেখানে নিয়ে যাব, আবার বলল হাইমাস। একটু গোলমাল করেছ কি… কথাটা শেষ করল না সে। ইয়া বড় এক ছুরি বের করল। পাতলা ঝকঝকে বাঁকা ফলা, হাতলের কাছটায় একটা সাপের ছবি খোদাই করা।

এটার নাম সর্প-ছুরি, ভীষণ ভঙ্গিতে ছুরিটা নাড়ল সে। হাজার বছর আগে দামেসকে তৈরি হয়েছিল। এটার একটা বাজে ইতিহাস আছে। বারোজন লোককে খুন করেছে ইতিমধ্যেই। আরও এক বা দুজনকে খুন করতে কোন আপত্তি থাকার কথা নয়। তেরো নম্বর কে হতে চাও? আনলাকি থারটিন?

Categories: