তিন দিকে ঝাঁপ দিয়ে পড়ল তিন গোয়েন্দা। বিকট শব্দে মাটিতে পড়ল গাড়ি।
ভাঙা কতগুলো গাড়ির আড়ালে লুকিয়ে পড়ল ওরা। দেখছে, শূন্যে দুলছে ভারি ইলেকট্রোম্যাগনেট, যে চুম্বকটার সাহায্যে গাড়ি তোলা হয়। ওটার এক বাড়ি খেলেই মরে যাবে মানুষ। বোঝাই গেছে, অপারেটরের বুদে যে রয়েছে এখন সে ওরকম কিছু ঘটানোরই চেষ্টায় আছে।
বিশাল চুম্বকটার দুলুনি বন্ধ হলে আড়াল থেকে বেরিয়ে এল মুসা। উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করল ক্রেনের বুদে কে আছে।
আগেই বোঝা উচিত ছিল, ফিসফিস করে বলল সে। আমাদের মিস্টার এক্স!
পুরানো গাড়ির আড়াল থেকে বেরিয়ে এল তিনজনে। দেখল, ক্রেনের কেবিন থেকে বেরিয়ে আসছে লোকটা। গায়ে আর্মি ক্যামোফ্লেজ জ্যাকেট। লাফিয়ে নামল পলের কাছে। তার ঘাড়ে এক রদ্দা মেরে তাকে চিৎ করে দিল আবার, যাতে কিছুক্ষণ আর না উঠতে পারে।
এদিকেই আসছে, দুই সহকারীকে পিছিয়ে যেতে ইশারা করল মুসা। আবার গাড়ির আড়ালে লুকিয়ে পড়ল তিনজনে। এমনভাবে থাকার চেষ্টা করল, লোকটা দেখতে না পায়।
জুনের গাড়িটা দেখতেই এসেছে হয়তো, কিশোর বলল। আমাদের মত।
কানে এল কাচ ভাঙার শব্দ। ধোঁয়ার গন্ধ নাকে এলো আর চুপ করে বসে থাকতে পারল না মুসা। মুখ বের করে তাকাল। দেখল, দ্বিতীয় মলোটভ ককটেলটা ছুঁড়ছে মিস্টার এক্স। বোতল ভাঙার শব্দই তখন কানে এসেছে।
সমস্ত প্রমাণ নষ্ট করে ফেলছে! হতাশ কণ্ঠে বলল মুসা।
তাহলে এই ব্যাপার, কিশোর বলল। লোকটা চায় না, গাড়িতে যা আছে আমরা দেখি।
পেট্রল আছে কিনা কে জানে! তাহলে বোমার মত ফাটবে!
আগুন ধরে যেতেই দৌড় দিল মিস্টার এক্স। ইয়ার্ডের গেটের কাছে রাখা তার পোরশেতে গিয়ে উঠল। পিছু নিতে চাইল মুসা। হাত ধরে তাকে টেনে আটকাল কিশোর আর রবিন।
ওকে ধরার দরকার নেই, রবিন বলল। গাড়ির ট্রাঙ্ক দেখতে হবে! যে কাজে এসেছি!
কুইক! তাড়া দিল কিশোর। গাড়িটা পুড়ে যাওয়ার আগেই… পুড়বে তো না, ফাটবে!
গাড়িটার দিকে আরেকবার তাকাল মুসা। তারপর দিল দৌড়। পুরানো জঞ্জালের মধ্যে খুঁজতে আরম্ভ করল। জিনিসটা খুঁজে বের করতে বেশিক্ষণ লাগল না। একটা শাবল। তারপর ছুটল জুনের তোবড়ানো মাসট্যাঙের দিকে। ভেতরের গদিটদি অনেকখানিই পুড়ে গেছে ইতিমধ্যে। পেছনের দিকে এগোচ্ছে আগুন, যেখানে পেট্রল ট্যাংকটা রয়েছে।
শাবল দিয়ে ট্রাঙ্ক খোলার চেষ্টা শুরু করল মুসা। ঘামে ভিজে গেছে কপাল। একটা চোখ সারাক্ষণ রেখেছে আগুনের ওপর। অবশেষ খুলে গেল ট্রাঙ্ক।
পেয়েছি! আনন্দে চিৎকার করে উঠল সে। ভেতরে হাত ঢুকিয়ে দিয়ে বের করে আনল চামড়ার ব্রিফকেসটা। হাতে তুলে নেড়ে দেখাল কিশোর আর রবিনকে। জলদি ভাগ! ফাটবে এখুনি! ট্যাংকের কাছে পৌঁছে গেছে আগুন।
কিন্তু নড়ল না কিশোর। হাসছে। বলল, গাড়ি ভাঙার আগে পেট্রল বের করে নেয়া হয়, যাতে কোনরকম দুর্ঘটনা ঘটতে না পারে। জ্বলবে গাড়িটা, কিন্তু ফাটবে না।
আগে অকথা বলেনি কেন? অভিযোগের সুরে বলল মুসা। তাহলে অত তাড়াহুড়া করতাম না…।
সে জন্যেই বলিনি। ওই তাড়াহুড়াটা না করলে হয়তো সময়মত খুলতে পারতে না ট্রাঙ্কটা। ঠেকায় পড়লেই কেবল মানুষ মরিয়া হয়ে ওঠে।
তুমি যে একটা কি…! জ্বলন্ত চোখে গোয়েন্দাপ্রধানের দিকে তাকাল মুসা।
ফোন করে অ্যামবুলেন্স ডাকা হলো। তারপর পলকে দেখতে চলল তিন গোয়েন্দা, ওর অবস্থা কতটা খারাপ।
তোমরা গোয়েন্দা, শুনেছি, পল বলল। কিন্তু জানতাম না সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধেও লাগতে যাও।
সব সময় লাগি না, কৈফিয়তের সুরে বলল কিশোর।
পলের ব্যবস্থা করে চিকেন লারসেনের বাড়ি রওনা হলো তিন গোয়েন্দা। ওখানে ওদের অপেক্ষায় আছে জুন আর ফারিহা। লারসেন বাড়ি নেই। ফিরতে দেরি হতে পারে।
সদর দরজায় বেল শুনে খুলেই তিন গোয়েন্দাকে দেখে একসঙ্গে বলে উঠল দুজনে, পেয়েছ?।
নীরবে ব্রিফকেসটা তুলে ধরল কিশোর। কি করে এসেছে, তার প্রমাণ দিতে চাইল যেন।
হাসল জুন। ওদেরকে নিয়ে এল বসার ঘরে।
কাচের কফি টেবিলে ব্রিফকেসটা রাখল কিশোর।
অস্থির হাতে সামনের খোপের চেনটা তুলে ভেতর থেকে মরক্কো লেদারে বাঁধাই অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুকটা বের করল জুন। কাঁপা হাতে খুলল শুক্রবারের সেই পাতাটা, যেদিন অ্যাক্সিডেন্ট করেছিল। যেদিনকার ঘটনা স্মৃতি থেকে মুছে গেছে।
এই যে, নিঃশ্বাস দ্রুত হয়ে গেছে ওর।
পুরো একটা মিনিট পাতাটার দিকে তাকিয়ে রইল সে। তারপর নিরাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল, কিছুই নেই। কেবল আর অ্যান্ড ডি।
রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, কিশোর বলল। ডন বারোজের ডিপার্টমেন্ট, তাই না? ওর সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করেছিলে কেন? কি আলোচনা করেছিলে?
কাজ শেখার চেষ্টা করছি আমি। সব বিভাগেই কাটিয়েছি একদিন করে। এর বেশি আর কিছু মনে করতে পারছি না।
ব্রিফকেসের ভেতরে কি আছে দেখলে হয়তো মনে করতে পারবে, আশা করল কিশোর।
ভেতর থেকে একটা তিন রিঙের বাইন্ডার বের করল। প্রায় দুশো ফটোকপি করা কাগজ রয়েছে তাতে। কয়েক মিনিট কাগজগুলো ওল্টাল, তারপর রেখে দিল টেবিলে। চিনতেই পারছি না! ওগুলো দেখে স্মৃতি ফেরত আনার চেষ্টা করছিল সে, ব্যর্থ হয়েছে। ভীষণ হতাশ হয়েছে।
আমি দেখি? অসুবিধে আছে? নোটবুকটার দিকে হাত বাড়াল কিশোর। পয়লা পাতাতেই ডন বারোজের নাম। দ্রুত রিপোর্টটা পড়তে শুরু করল সে। কয়েক মিনিট নীরবে পড়ার পর মুখ তুলল। বলল, সেই শুক্রবারে কি ঘটেছিল বোধহয় বুঝতে পারছি। ডন বারোজের লেখা একটা রিপোর্টের কপি এটা। মালটিসরবিটেন নামে খাবারে মেশানোর একটা উপাদান সম্পর্কে। কয়েক বছর আগে জিনিসটা আবিষ্কার করেছিল ডন। বলছে, মালটিসরবিটেন মেশালে খাবারের স্বাদ অনেক বেড়ে যায়, তবে একটা অসুবিধেও করে। এতই সুস্বাদু হয় খাবার, নেশাগ্রস্ত করে ফেলে মানুষকে।
ভাল খাবার তো লোভী করবেই মানুষকে, রবিন বলল। তাতে অসুবিধেটা কোথায়?
অসুবিধেটা? মালটিসরবিটেনের বেলায় আছে। এফ ডি এ, অর্থাৎ ফেডারেল ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এই উপাদানটা পরীক্ষা করেছিল। নতুন যে কোন খাবার আর ড্রাগ পরীক্ষা করে দেখা ওদের দায়িত্ব। উনাকে মালটিসরবিটেন বাজারে ছাড়ার অনুমতি দেয়নি ওরা। কারণ পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে, ক্যারসিনোজেন হতে পারে ওই জিনিসে।
কি জেন? মুখ বাঁকাল মুসা।
ক্যারসিনোজেন। বুঝিয়ে দিল রবিন, ক্যানসার হয় ওতে।
কেশে গলা পরিষ্কার করে নিল কিশোর। বলতে থাকল, দুর্ঘটনার দিন শুক্রবারে তুমি ডনের সঙ্গে দেখা করেছ। ওই রিপোর্টের কপি পেয়ে গেছ, কাগজটায় টোকা দিল সে। সে দেয়নি। আমার বিশ্বাস, ওর অফিসে ঢুকে কোনভাবে দেখে ফেলেছিলে কাগজটা। অ্যাক্সিডেন্টটা হয়েছে রাতের বেলা। কাজেই অনুমান করছি, বিকেলের দিকে পেয়েছ তুমি। পড়ে অস্থির হয়ে গিয়েছিলে।
জুনের দিকে তাকাল কিশোর। সবকথা মনে করিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে যেন। বলল, এতই ঘাবড়ে গিয়েছিলে, কাগজটা নিয়েই ছুটে বেরোলে ডনের অফিস থেকে দেখে ফেলেছিল সে। তাড়া করেছিল তোমাকে। তোমার গাড়িতে গিয়ে উঠলে। নিজের গাড়িতে করে তোমাকে অনুসরণ করল সে। দুর্ঘটনার জায়গায় আরেক সেট চাকার দাগ যে পাওয়া গেছে সেটা ওরই গাড়ির।
মুসা প্রশ্ন করল, ওই একটা রিপোর্ট অতটা উত্তেজিত করবে কেন জুনকে?
করবেই তো, হাসল কিশোর। জুন হয়তো বুঝে ফেলেছিল, চিকেন লারসেনের নতুন খাবার ড্রিপিং চিকেনে ওই মালটিসরবিটেন মিশিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ডন।
কথাটা সবাইকে হজম করার সুযোগ দিল গোয়েন্দাপ্রধান। তারপর জুনের দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি বুঝে ফেলেছিলে, ডন, কিংবা আরোলা, কিংবা তোমার বাবা ইচ্ছে করেই জেনেশুনে ওই বিষ মেশাতে চলেছেন খাবারে। ড্রিপিং চিকেনে। ওই বিষের ক্রিয়া টের পেতে পেতে রোগীর কয়েক বছর লেগে যাবে। কাজেই সহজে ধরা পড়বে না যে মেশাবে। ইতিমধ্যে লক্ষ লক্ষ লোক নিয়মিত খেয়ে যাবে মালটিসরবিটেন, বুঝতেই পারবে না ক্যানসারে আক্রান্ত হতে যাচ্ছে ওরা। যখন বুঝবে, তখন অনেক দেরি হয়ে যাবে। হয়তো তখনও বুঝবে না কিসের কারণে হয়েছে তাদের ওই মরণ ব্যাধি।
ঠোঁট কাঁপছে জুনের। প্রায় চিৎকার করে বলল, অসম্ভব! আমার বাবা ওরকম পাষন্ড হতেই পারে না!
আমরা এখনও জানি না সেটা। প্রমাণ করতে হবে যে তিনি এতে জড়িত নেই। আর সেটা করায় আমাদেরকে সাহায্য করতে হবে তোমাকে।
মনে মনে ইতিমধ্যেই কিছু একটা করার পরিকল্পনা করে ফেলেছে কিশোর, বুঝতে পারল তার দুই সহকারী। রবিন জিজ্ঞেস করল, কি করতে চাইছ তুমি?
জানতে চাই, ড্রিপিং চিকেনে মালটিসরবিটেন মেশানোর ব্যাপারটা জানেন কিনা মিস্টার লারসেন। কি করে জানব, কেউ কোন পরামর্শ দিতে পারো?
পারি, জুন বলল। বাবা তার সমস্ত কাজের ফিরিস্তি কাগজে লিখে অফিসের আলমারিতে রেখে দেয়।
আঙুল মটকাল কিশোর। আমিও তাই আশা করেছি। বের করে আনতে পারবে?
তালার কম্বিনেশন জানি না।
ও। তাকে না জানিয়ে কাগজগুলো বের করতে হবে। সন্দেহ করলেই সরিয়ে কিংবা নষ্ট করে ফেলতে পারেন।
এক মুহূর্ত ভাবল জুন। তারপর হাসল। বাবার সেক্রেটারির সাহায্য নিলে কেমন হয়? অনেক কিছুই হয়তো জানে ও। কম্বিনেশন জানলেও অবাক হব না। বসের অনেক গোপন খবরই রাখে তার সেক্রেটারি। এটা নতুন কিছু না।
চলো, তখুনি যেতে চাইল মুসা।
না, বাধা দিল জুন। আমি একা যাব। তোমাদেরকে দেখলে মুখ খুলবে না। বাবার বিরুদ্ধে একাজ করছি, ঠিক হচ্ছে কিনা বুঝতে পারছি না…
হচ্ছে, দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করল যেন কিশোর। লক্ষ লক্ষ মানুষকে বাঁচানোর জন্যে কাজটা করছি আমরা। একে অন্যায় বলা যাবে না। কতক্ষণ লাগবে। তোমার?
এই ঘণ্টা দুয়েক।
দুই ঘণ্টা কেটে গেল। ওদেরকে যা যা করতে বলে গেছে জুন, তাই করল। ওর বাড়িতে বসে ওদের ফ্রিজের খাবার খেল, টিভি দেখল, কথা বলল। বিশ্রাম নিল, কিশোর বাদে। এই কাজটা সে কিছুতেই করতে পারল না। ঢিল দিতে পারল না শরীর।
আরেক ঘণ্টা পেরোল।
অবশেষে দরজা খুলে ঘরে ঢুকল জুন। হাতের কাগজ দেখিয়ে সবার দিকে চেয়ে হাসল।
পেয়েছি, ফিসফিস করে জানাল সে। চারপাশে তাকাল, যেন দেখে নিতে চাইছে ওর বাবা শুনে ফেলছেন কিনা। আলমারি খুলে সব কাগজ দেখেছি। কোথাও লেখা নেই মালটিসরবিটেনের কথা। দেখলে তো? আমার বাবা খুনী নয়।
জুনের কাগজটা নিয়ে পড়তে লাগল কিশোর।
মনে হচ্ছে, মুসা বলল। লোকটাকে আর ধরতেই পারলাম না। কেসের এখানেই ইতি।
কাগজটা ভাজ করে পকেটে রেখে দিল কিশোর। মুখ তুলে তাকাল জুনের দিকে। কেউ যদি খাবারে বিষ না-ই মিশিয়ে থাকে, ঘোরের মধ্যে বললে কেন একথা? ব্রিফকেসটার জন্যেই এত অস্থির হয়ে গিয়েছিলে কেন? আর ডন বারোজের নাম ছাপা এই মালটিসরবিটেনের রিপোর্টই বা তোমার কাছে কেন?
জানি না, মাথা নাড়ল জুন।
আমরাও জানি না, কিশোরও মাথা নাড়ল। তবে কয়েকটা ব্যাপার জানি। আমাদের সন্দেহের তালিকা দ্রুত ছোট হয়ে আসছে। তোমার বাবাকে বাদ দেয়া যায়। হেনরি অগাসটাসও বাদ, কারণ তার সঙ্গে কোন সম্পর্ক নেই তোমার। যোগাযোগও নেই। মালটিসরবিটেনের সঙ্গে তাকে জড়াতে পারছি না কোনভাবে। বাকি থাকল ডন বারোজ। সে সহজেই ওই খাবারে বিষ মেশাতে পারে। তবে সে নির্দোষও হতে পারে। অন্য কেউও করে থাকতে পারে কাজটা। যে লোকটাকে বেশি সন্দেহ করছি, যার ব্যাপারে বেশি আগ্রহ আমার এখন, যে রিপোর্টটা আমাদের হাতে পড়তে দিতে চায়নি, সে হলো রহস্যময় মিস্টার এক্স। যে আমাদেরকে ভয় দেখিয়ে সরিয়ে রাখতে চেয়েছিল।
ওই লোকটা কে?, মুসা জিজ্ঞেস করল। বুঝতে পারছ?
আন্দাজ করতে পারছি। ফেলিক্স আরোলা।
তাহলে? ভুরু কোঁচকাল ফারিহা। পুলিশকে ফোন করব?
না। প্রমাণ দরকার। মিরাকল টেস্টে গিয়ে খোঁজ নিতে হবে আমাদের। কি গোপন করার চেষ্টা করছে আরোলা, জানতে হবে।
কিশোর, হুঁশিয়ার করল মুসা। জায়গাটা একটা দুঃস্বপ্ন! সিকিউরিটি ভীষণ কড়া!
বেশ, তাহলে রাতের বেলা যাব। যখন গার্ডেরা সতর্ক থাকবে না। ঘুম থাকবে চোখে।
তাহলে আজ রাতেই করতে হবে কাজটা, জুন বলল। বাবার সেক্রেটারি আরেকটা কথা বলেছে আমাকে, বলতে ভুলে গিয়েছিলাম। আজ সন্ধ্যায় বিরাট এক সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। ড্রিপিং চিকেনের খবর দুনিয়াবাসীকে জানিয়ে দিতে চায় বাবা। বাজারে ছাড়তে যাচ্ছে।
তাই নাকি! সর্বনাশ! বলে উঠল ফারিহা।
চিকেন লারসেনের কথা মনে পড়ল কিশোরের। তিনি বলেছেনঃ লোকে জানতেও পারবে না কিসে আঘাত করেছে ওদেরকে!
বিকেল পাঁচটা। রবিনের গাড়িতে বসে আছে গোয়েন্দারা। লং বীচে মিরাকল টেস্টের অফিস আর গুদাম থেকে কিছু দূরে। জুনদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে যার যার বাড়ি গিয়েছিল। কালো শার্ট প্যান্ট পরে এসেছে। কিশোরের হাতে কালো চামড়ার একটা হাতব্যাগ। কোলের ওপর রেখেছে। জিনিসটা নতুন দেখছে রবিন আর মুসা।
আরোলা বেরোলেই আমরা ঢুকব, ব্যাগটা আঁকড়ে ধরে বলল কিশোর।
ও আছে কি করে জানলে? রবিনের প্রশ্ন।
আছে, জবাবটা মুসাই দিয়ে দিল। ওর গাড়ি দেখছ না? ওই যে। চিনি।
তুমি চিনলে কি করে? রবিন অবাকই হলো।
সেদিন চিকেন লারসেনের বাড়িতে পার্টির পর ওকে অনুসরণ করেছিলাম। ওই গাড়িতে করে মিরাকল টেস্টে এসেছিল সে।
আস্তে আস্তে মিরাকল টেস্টের পার্কিং লট খালি হয়ে যেতে লাগল। ছটার সময় বেরোল আরোলার ধূসর রঙের ক্যাডিলাক অ্যালানটে গাড়িটা। চলে গেল লস অ্যাঞ্জেলেসের দিকে।
চিকেন লারসেনের সাংবাদিক সম্মেলনে গেল হয়তো, অনুমানে বলল মুসা।
গাড়ি থেকে নামল তিনজনে। প্রায় দৌড়ে চলে এল মিরাকল টেস্টের পার্কিং লটে। ঢোকার মুখে এসে দাঁড়িয়ে গেল রবিন। পাহারায় রইল। দরজাটা পরীক্ষা করতে গেল মুসা আর কিশোর।
সিকিউরিটি দেখেছ? গুঙিয়ে উঠল মুসা।
দেখছে। তিনজনেই তাকিয়ে রয়েছে ছোট একটা ইলেকট্রনিক প্যানেলের দিকে। আলোকিত একটা কীপ্যাড রয়েছে সেখানে। কাচের দরজার পাশে ক্রোমের দেয়ালের মাঝে। দরজার ওপাশে গার্ডের ঘর। কাউকে চোখে পড়ছে না।
টহল দিতে গেছে হয়তো, রবিন বলল। এইই সুযোগ। ঢুকে পড়া দরকার।
কীপ্যাডের দিকে তাকিয়ে রয়েছে কিশোর। নিশ্চয় ওর মধ্যে কোন বিশেষ কোড ঢোকাতে হয়। তাহলেই খুলবে। কিন্তু ভুল কোড যদি ঢোকে, কি আচরণ করবে? দারোয়ানকে সতর্ক করার জন্যে সিগন্যাল দিতে আরম্ভ করবে না তো?
কোড না দিলে বোঝা যাবে না। ঝুঁকি নিতেই হবে। চামড়ার ব্যাগটা খুলতে লাগল কিশোর। বলল, একটা ইলেকট্রনিক লক কম্বিনেশন ডিকোডার নিয়ে এসেছি। কীবোর্ডে লাগিয়ে দিলেই কম্বিনেশন পড়ে ফেলতে পারবে। কেমন যেন অবিশ্বাস্য মনে হয়, তাই না? সার্কিট ডায়াগ্রাম দেখে দেখে বানিয়ে ওঅর্কশপে পরীক্ষা করে দেখেছি। কাজ করেছে। এখানে কি করবে কে জানে!
স্ক্রু-ড্রাইভার দিয়ে দ্রুত কীপ্যাডের কভার প্লেট খুলে ফেলল সে। ডিকোডারের দুটো অ্যালিগেটর ক্লিপ লাগিয়ে দিল দুটো বিশেষ তারের সঙ্গে। উত্তেজনায় দুরুদুরু করছে ওর বুক। কাজ করবে তো? সুইচ টিপল। বেশ কিছু টিপটিপ শব্দ আর আলোর ঝলকানির পর যন্ত্রটা কতগুলো নম্বর দিল ওকে।
হয়েছে? দরজার দিকে পা বাড়াল মুসা। চলো, দেখি…
ওর কাঁধ খামচে ধরল কিশোর। দাঁড়াও। কিছু একটা গোলমাল হয়ে গেছে! কালো যন্ত্রটায় হাত বোলাল সে। ঠিকমত কাজ করছে না। যে নম্বরটা দিয়েছে ওটা এখানকার কমবিনেশন নয়। ওঅর্কশপে যে রিডিং দিয়েছিল, সেটা।
ইলেক্ট্রনিক এই যন্ত্রপাতি এ জন্যেই দেখতে পারি না আমি, বিরক্ত হয়ে বলল রবিন। কখন যে বিগড়ে যাবে ঠিকঠিকানা নেই!
সব যন্ত্রই বিগড়ায়, এগুলোর আর দোষ কি? ইলেকট্রনিকস যতটা সুবিধে করে দিয়েছে তার তুলনায় ছোটখাট এসব গোলমাল কিছুই না। হয়তো কোন ক্যাপাসিটর খারাপ পড়েছে, গেছে বাতিল হয়ে, বদলে নিলেই ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু এখন তো আর সময় নেই…
না, নেই। ওই যে, গার্ডও চলে আসছে।
তাড়াতাড়ি যন্ত্রটা ব্যাগে ভরে শার্টের ভেতরে লুকিয়ে ফেলল কিশোর। গোবেচারা মুখ করে রইল। তার ডেস্কের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে দারোয়ান, এই সময় গিয়ে বেল বাজাল রবিন।
দরজা সামান্য ফাঁক করে তিনজনেরই পা থেকে মাথা পর্যন্ত নজর বোলাল দারোয়ান। তারপর জিজ্ঞেস করল, কি চাই?
কিশোর বলল, আমরা ব্ল্যাক মেসেঞ্জার সার্ভিস থেকে এসেছি। নিজেদের কালো পোশাকের ব্যাখ্যাও দিয়ে ফেলল এক কথাতেই। মিস্টার আরোলার অফিস থেকে কিছু একটা বের করে নিতে হবে আমাদেরকে। তিনি বলেছেন, খুবই নাকি জরুরী।
একটা জিনিস নিতে তিনজন দরকার? দারোয়ানের সন্দেহ গেল না।
আমি কি জানি? হাত ওন্টাল কিশোর। আসতে বললেন, এসেছি। আমাকে তার প্রয়োজন।
ওর গাড়ি নেই, কিশোরকে দেখাল রবিন। তাই আমাকেও আসতে হলো।
আর ওরা কেউ অফিসটা চেনে না, রবিন আর কিশোরের কথা বলল মুসা। আমি চিনি। না এসে আর কি করব?
তাই তো, না এসে কি করবে! অকাট্য যুক্তি! আমি তো জানতাম থ্রী স্টুজেসরা মরে ভূত হয়ে গেছে, বিড়বিড় করল দারোয়ান। তবে আর কথা না বাড়িয়ে দরজা খুলে দিল। যাও। কি নেবে নিয়ে জলদি বিদেয় হও, হলের দিকে দেখিয়ে অধৈর্য ভঙ্গিতে হাত নাড়ল সে।
দারোয়ানের নির্দেশিত দিকে এগোল তিন গোয়েন্দা। সমস্ত পথটায় কার্পেট বিছানো রয়েছে। বাঁয়ের পথ ধরল ওরা। ওদিকেই অফিসটা, বলেছে দারোয়ান। ডান দিকে চলে গেছে আরেকটা পথ। পথের শেষ মাথায় ওয়াল নাট কাঠের তৈরি একটা দরজার সামনে এসে থামল ওরা। দরজায় লেখা রয়েছেঃ একজিকিউটিভ সুট।
বেশ বড় সাজানো গোছানো ঘর আরোলার। দুধারে বিশাল জানালা, একেবারে মেঝে থেকে ছাত পর্যন্ত। বাতাসে তাজা ফুলের সুবাস, যদিও একটাও ফুল চোখে পড়ছে না কোথাও। ঘরের মাঝখানে রোজউড কাঠের মস্ত টেবিল। তাতে রয়েছে বিল্ট-ইন টেলিফোন আর কম্পিউটার। এককোণে গোছানো রয়েছে নটিলাস কোম্পানির ব্যায়ামের যন্ত্রপাতি। দেয়ালে ঝোলানো আর তাকে সাজানো রয়েছে অসংখ্য স্মারকচিহ্ন আর পুরস্কার। সুগন্ধ বিশারদ সে। অতীতে কাজের জন্য ওগুলো পেয়েছে। নানা রকম ক্যানডির মোড়ক, আর অন্যান্য খাবারের মোড়ক সুন্দর করে ফ্রেমে বাঁধিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে দেয়ালে। বোঝা যায়, ওগুলো সব তার নিজের আবিষ্কার।
ওসব জিনিস কোনটাই চমকৃত করতে পারল না কিশোরকে, করল কেবল আরোলার ফাইলিং সিসটেম।
কি খুঁজতে এসেছি আমরা? টেবিল টেনিস খেলা যায় এতবড় ডেস্কের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল মুসা।
মালটিসরবিটেনের একটা জার হলেই চলবে, কিশোর বলল। ফাইলিং কেবিনেট খুলতে লাগল সে। ড্রিপিং চিকেনে মেশানো হয়েছে, ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে, এ রকম যে কোন জিনিস হলেও চলবে। যে যে উপাদান মেশানো, নিশ্চয় লিখে রেখেছে কাগজে, ফোল্ডারগুলোর পাতা ওল্টাতে শুরু করল সে।
এখানেও একটা কম্পিউটারের টার্মিনাল রয়েছে, বাথরুম থেকে জানাল রবিন। দামী একটা কোলোনের শিশি খুলে বলল। বাহ, চমক্কার গন্ধ!
কি চমৎকার? জানতে চাইল মুসা।
আচমকা চেঁচিয়ে উঠল কিশোর, ব্রোমিনেটেড সিউডোফসফেট!
কি বললে? বাথরুমের দরজায় উঁকি দিল রবিন। ইদানীং আরও জটিল হয়ে গেছে তোমার কথাবার্তা!
সহজ কথাটা বুঝতে না পারলে আমি কি করব? বলছি, ড্রিপিং চিকেনে ব্রোমিনেটেড সিউডোফসফেট মেশানো হয়েছে। কাগজপত্রে তা-ই লেখা রয়েছে। জুন আমাকে যেসব কাগজপত্র এনে দিয়েছে ওগুলোতে।
মুসাও আজকাল ওরকম করে কথা বলে, মুখ বাঁকাল রবিন। গাড়ির ইঞ্জিনের ব্যাপারে ও যে কি বলে, কিচ্ছু বুঝতে পারি না! এই তো, গত হপ্তায় মেরামত করে দেয়ার সময় কি জানি কি হয়েছিল, বলল!
ঠেলে ফাইল কেবিনেটটা লাগিয়ে দিল কিশোর। গত দুই বছরের পারচেজ অর্ডার, ইনভয়েস আর ইনভেনটরি লিস্ট ঘাটলাম। তাতে মিরাকল টেস্ট কোম্পানি কোন উপাদান কিনেছে বা তৈরি করেছে, এ রকম কথা লেখা নেই। গুদামে গিয়ে খুঁজতে হবে। এখনই!
কার্পেট বিছানো পথ ধরে প্রায় ছুটতে ছুটতে হলঘরে ফিরে এল ওরা। দারোয়ান বসে বসে ঢুলছে। ওদের সাড়া পেয়ে চমকে জেগে গেল, পেয়েছ। তোমাদের জিনিস? জিজ্ঞেস করল সে।
কিশোরের দিকে তাকাল রবিন আর মুসা। জবাব দেয়ার ভারটা ওর ওপরই ছেড়ে দিতে চায়।
না, কিশোর বলল। বললেন তো এখানেই আছে, কিন্তু পেলাম না। গুদামঘরের অফিসে বললেন।
গুদামঘর? দূর, মাথা খারাপ এগুলোর! এই, ওটাকে কি গুদামের অফিস মনে, হয়েছে? তোমাদের কি কমনসেন্স বলেও কিছু নেই!
কমন সেন্স আছে আমাদের দলের চার নম্বর লোকটার, নিরীহ কণ্ঠে জবাব দিল রবিন। কিন্তু সে আজকে আসেনি।
যাও। ডানের পথটা ধরে যাও, যেটাতে কার্পেট বিছানো নেই। তিনটে লাল দরজা পেরিয়ে যাবে। তারপরেই পাবে গুদামঘর। যত্তোসব! ওদের দিকে তাকাল দারোয়ান। দরজা দেখতে কেমন সেটা জানো তো?
ও জানে, কিশোরকে দেখাল মুসা।
হলঘর থেকে বেরিয়ে কার্পেট ছাড়া পথটা ধরল ওরা। একে একে পেরিয়ে এল তিনটে লাল রঙ করা দরজা। ঢুকল বিরাট এক ঘরে। নিঃশ্বাস ফেলতে ভুলে গেল যেন। একটার ওপর আরেকটা সাজিয়ে রাখা হয়েছে অসংখ্য কেমিক্যালের ড্রাম।
লেবেল পড়ে দেখ, নির্দেশ দিল কিশোর। জলদি।
কটা বাজে? ভুরু নাচাল রবিন।
প্রায় সাতটা।
নটায় সম্মেলন শুরু হবে, ভুলে গেলে চলবে না। তাড়াতাড়ি সারতে হবে আমাদের।
ছড়িয়ে পড়ে খুঁজতে শুরু করল তিনজনে। একটু পরেই চিৎকার করে ডাকল রবিন, অ্যাই, দেখে যাও!
ড্রামের সারির ফাঁক দিয়ে ওর দিকে এগিয়ে গেল কিশোর আর মুসা। কংক্রীটের মেঝেতে মচমচ করছে জুতো, চেষ্টা করেও শব্দ না করে পারছে না ওরা। একগাদা টিন আর কাঠের পিপার সামনে দাঁড়িয়ে আছে রবিন। প্রতিটির গায়ে লেবেল লাগানোঃ ব্রোমিনেটেড সিউডোফসফেটস।
পেয়ে গেলাম, যা খুঁজছিলে, রবিন বলল কিশোরকে। এতে কি প্রমাণ হলো?
জবাব না দিয়ে লেবেলে লেখা তারিখ দেখল কিশোর। তারপর বলল, দেখ, কবে এসেছে?
পড়ে মুসা বলল, দুই মাস আগে।
কি ভাবে এল? কিশোরের প্রশ্ন। ভাল করে ইনভয়েসগুলো দেখেছি আমি। দুমাস তো দূরের কথা, গত দুই বছরেও কেনা হয়নি ব্রোমিনেটেড সিউডোফসফেট। এক আউন্সও না।… ছোট টিনও আছে। নিয়ে যাব একটা। ভেতরে আসলে কি আছে দেখা দরকার।
দেখার আর দরকার কি? বলে উঠল একটা কণ্ঠ, আমাকে জিজ্ঞেস করলেই তো বলে দিতে পারি।
পাই করে ঘুরে দাঁড়াল তিন গোয়েন্দা। দাঁড়িয়ে আছে ফেলিক্স আরোলা।
এভাবে মুখখামুখি হয়ে যাব, ভাবতে পারিনি, বলল সে। ভেবেছিলাম, তদন্তটা বাদই দিয়ে দেবে তোমরা। ভুল করেছি। শেষে আমার পেছনেই লাগলে।
পাথর হয়ে গেছে যেন গোয়েন্দারা।
সরি, পিস্তলটা আরেকটু সোজা করে ধরল আরোলা। খরচের খাতায় তোমাদের নাম লিখে ফেলা ছাড়া আর কোন উপায় নেই আমার।
পিস্তল উদ্যত রেখেই চট করে হাতঘড়ি দেখল আরোলা। আর বেশি সময় নেই। একটু পরেই বেভারলি হিলটনে লারসনের সম্মেলন শুরু হবে, জ্যাকেটের অন্য পকেটে হাত ঢোকাল সে।
কি করবে এখন লোকটা? ভাবছে কিশোর।
জ্যাকেটের পকেট থেকে হাতটা বের করল আরোলা। মুঠো বন্ধ। কয়েক মিনিটের মধ্যেই যা করার করে ফেলব। মরার আগে খানিকটা মার্কেট রিসার্চ করতে চাও?
মানে? তীক্ষ্ণ চোখে লোকটার হাতের দিকে তাকিয়ে রয়েছে কিশোর।
মুঠো খুলল আরোলা। মোড়কে মোড়া ক্যানডি। খেয়ে দেখবে একটা?
না, কিশোর, খেয়ো না! হুঁশিয়ার করল মুসা, বিষ!
আরোলার দিকে তাকাল কিশোর। তারপর তার পিস্তলের দিকে, তারপর ক্যানডির দিকে এবং সবশেষে ঘড়ির দিকে। এমনিতেও মরবে ওমনিতেও। খেয়ে দেখলে ক্ষতি কি? পুলিশকে জানিয়ে আসেনি। কেউ উদ্ধার করতে আসবে না ওদের।
তোমার কথার দাম দিই আমি, আরোলা বলল। বুদ্ধিমান ছেলে। অনেক কিছুই বোঝ। সেদিন পার্টিতেই বুঝেছি। তোমাকে মেরে ফেলতে হচ্ছে বলে সত্যিই কষ্ট হচ্ছে আমার। খেয়ে বলো, কেমন লাগে। বলবে?
দিন। কি আর করা? এত করে যখন বলছেন…
এই তো। বলেছিলাম না, তুমি বুদ্ধিমান ছেলে। জীবনে যদি একটা কাজ করে যেতে না পারলে, তো জন্মই বৃথা। ওই পচা বিজ্ঞানীগুলোর মত। কেবল আবিষ্কারই করতে পারে, জিনিসের মার্কেট ভ্যালু আর বুঝতে পারে না কোনদিন।
মনে হচ্ছে আপনি খুব বোঝেন, লোকটার কথা সহ্য করতে পারছে না রবিন। ওকে এত চাপাচাপি করছেন কেন? আপনি খেয়ে টেস্ট করে নিলেই পারেন…
দেখ ছেলে, বেশি ফরফর করবে না! হঠাৎ রেগে গেল আরোলা। তোমার কপাল ভাল যে তোমার বন্ধুর স্বাদ যাচাই করার ক্ষমতা আছে। বাঁচিয়ে রেখেছি সে কারণেই, সকলকে, নইলে এতক্ষণে লাশ হয়ে যেতে, নিজেকে শান্ত করার জন্যে জোরে জোরে দুবার শ্বাস টানল সে। বিড়বিড় করল, লাশের গন্ধও আমার ভাল লাগে।
চিন্তিত ভঙ্গিতে লোকটার দিকে তাকিয়ে রয়েছে কিশোর। মনে হচ্ছে, আরোলার মাথায় গোলমাল আছে। কি জানি, গত কয়েক বছরে হয়তো অনেক মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে সে, খাবারে মালটিসরবিটেন মিশিয়ে। আর অপরাধ বোধের কারণেই চাপ পড়েছে মাথায়, গেছে গড়বড় হয়ে।
দিন, একটা ক্যানডি, শান্ত কণ্ঠে বলল কিশোর। খেয়ে দেখি। তবে এক শর্তে। আমার প্রশ্নের জবাব দিতে হবে।
মাথা ঝাকিয়ে সায় জানাল আরোলা। একটা ক্যানডি দিল কিশোরের হাতে।
মুখে ফেলল কিশোর। তিনটে স্বাদ। লেবু-আসল লেবুর গন্ধ পাচ্ছি, নকল। আর রয়েছে ম্যারাং এবং গ্রাহাম ক্র্যাকারের সর। তিনটে মিলিয়ে লেমন ম্যারাং পাই।
চমকার।
এবার আমার পালা, কিশোর বলল। ওই যে ব্রোমিনেটেড সিউডোেফসফেটস লেখা রয়েছে, ওই টিমগুলোতে আসলে রয়েছে মালটিসরবিটেন, তাই না?
হ্যাঁ। তাতে কি?
কিসে ব্যবহার করতে এনেছেন। আমার বিশ্বাস, আপনি নিশ্চয় জানেন ওই জিনিস খাবারে মেশানোর অনুমতি দেয়নি এফ ডি এ।
আরেকটা প্রশ্নের জবাব চাও তো? তাহলে আরেকটা ক্যানডি খেতে হবে। যে কোন একটা তুলে নাও, শয়তানী হাসি হেসে হাত বাড়িয়ে দিল আরোলা।
খেয়ো না, কিশোর, আরেকবার বাধা দিল মুসা। কায়দা করে খাইয়ে নিচ্ছে।
কিশোরের ধারণা হলো, ক্যানডিগুলোতে অন্য বিষ না থাকলেও মালটিসরবিটেন থাকতে পারে। দুএকটা ক্যানডি খেলে তেমন কোন ক্ষতি হবে না। আর হলেই বা কি? কিছু তো আর করতে পারছে না। বরং যতক্ষণ খেয়ে যাবে ততক্ষণ মারবে না আরোলা। আর ওর কাছ থেকে কথা আদায় করারও সুযোগ মিলবে। আরেকটা ক্যানডি নিয়ে মোড়ক খুলে মুখের ভেতর ছুঁড়ে ফেলল।
চেরি জেল-ও। সেই সঙ্গে রয়েছে ব্যানানা ফ্লোটার আর মাখন, চুষতে চুষতে জানাল কিশোর। আপনার জবাব পেয়েছেন। এবার আমার প্রশ্নের জবাব দিন। মালটিসরবিটেনগুলো দিয়ে কি করবেন?
জবাব দিতে সময় নিল আরোলা। দ্বিধা করছে মনে হলো। অবশেষে বলল, বেশ, বলছি। তোমরা তো আর বেঁচে থাকবে না, বেরিয়ে গিয়ে সব বলতেও পারবে না। গোড়া থেকেই বলি, নইলে পরিষ্কার হবে না। বছরখানেক আগে চিকেন লারসেন এসেছিল আমার কাছে। নতুন একটা খাবার তৈরি করতে আমার সাহায্য চাইল। এমন কিছু, যেটার মত সুস্বাদু জিনিস আর কেউ কখনও খায়নি। শুধু খায়নি তা নয়, ভাবতেই পারেনি কেউ, বিশেষ করে হেনরি অগাসটাসের মত লোকে। বলল, লাভের টাকা আমার সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিতে রাজি আছে। তবে, যে কোন খাবার হলে চলবে না। মুরগীর মাংস দিয়ে তৈরি হতে হবে।
সুস্বাদু করে দিতে বলেছেন, ফোড়ন কাটল রবিন। কিন্তু মিস্টার লারসেন নিশ্চয় বিষ মিশিয়ে দিতে বলেননি।
তুমি চুপ করো! ধমকে উঠল আরোলা। ভেঁপো ছোকরা!, আবার জোরে জোরে দম নিয়ে নিজেকে শান্ত করল সে। মুরগী দিয়ে খাবার তৈরি করা সহজ। সেটা অনেকেই পারে। কিন্তু লোকে বার বার খেতে চাইবে, অর্থাৎ, নেশা হয়ে যাবে, এ রকম কি উপাদান মেশানো যায়? ভাবতে লাগলাম। ফ্লেভার মিশিয়ে যতভাবে সম্ভব সুস্বাদু করার চেষ্টা করলাম। হলো-ও। কিন্তু লারসেন যা চেয়েছে। তা হলো না।
তারপর দিলেন মালটিসরবিটেন মিশিয়ে? জিজ্ঞেস করল কিশোর।
তৃতীয় আরেকটা ক্যানডি খেতে বলল আরোলা। ঘড়ি দেখে বলল, সময় শেষ হয়ে আসছে।… কি মেশালে যে তেমন সুস্বাদু হবে ভেবেই পেলাম না। আমার সাধ্যমত… ও-কি, খাচ্ছ না?
খাব। পরে। বলুন আগে।
কিশোর, সাবধান করল রবিন। খেয়ো না। ড্রিপিং চিকেনে যেমন ক্যারসিনোজেন মিশিয়েছে, ওই ক্যানডিতেও মিশিয়ে থাকতে পারে।
মেশালেই বা কি? ও তো এখনই মরবে এমনিতেই, আরোলা বলল। দশ বিশ বছরের মধ্যে টের পাবে না লোকে, ক্ষতি হবে না। অনেক লম্বা সময়। অনেকে অতদিন বাঁচবে না এমনিতেই। যাই হোক, খাবার যে বিষাক্ত, এটা কোনদিনই টের পাবে না লোকে। ভেবে দেখলাম, ক্যান্সার হয়ে মারা গেলে ধরা পড়ারও কোন আশঙ্কা নেই। ওই রোগ তো আজকাল হরদম হচ্ছে। আমার বানানো খাবার খেয়ে যে হয়েছে, সেটা বোঝার সাধ্য ডাক্তারেরও হবে না। তাই ঠিক করলাম, দেব মিশিয়ে। লারসেনও কিছু জানতে পারবে না। কারণ, তৈরি করা অবস্থায় খাবার আমার কাছ থেকে নিতে হবে তাকে, আগেই বলে দিয়েছি। প্যাকেট করে পাঠিয়ে দেব তার রেস্টুরেন্টে।
ঘড়ির দিকে তাকাল কিশোর। আটটা বাজতে দেরি নেই। সময় ফুরিয়ে আসছে দ্রুত। সেই সঙ্গে ফুরিয়ে আসছে ওদের আয়ু।
আরেকটা প্রশ্ন, বলল সে। আজ রাতে এখানে ফিরে এলেন কেন হঠাৎ করে?
দারোয়ানদেরকে ভাল বেতন দিই আমি। তোমরা ওর সঙ্গে কথা বলে অফিসে ঢোকার পর পরই ফোনে আমার সঙ্গে কথা বলেছে সে। আমার গাড়িতে ফোন আছে, কিশোরের হাতের ক্যানডিটার দিকে তাকাল সে। খেয়ে ফেল। দেরি করলে আর কোনদিনই খেতে পারবে না। স্বাদটা বলে যাও মরার আগে।
মোড়ক খুলল কিশোর। এটা অন্য দুটোর চেয়ে আলাদা। ভারিও বেশি। মিস্টার এক্স আপনার দলের লোক, তাই না? ওই যে, সারাক্ষণ আর্মি ক্যামমাফ্লেজ জ্যাকেট পরে থাকে?
মিস্টার এক্স? হেসে উঠল আরোলা। নামটা তো ভালই দিয়েছ। অবশ্য তোমার সব কিছুই অন্য রকম। ওর নাম জেনার। আমার পাশের বাড়িতেই থাকে। সেনাবাহিনীতে ছিল, বদ স্বভাবের জন্যে বের করে দিয়েছে। মেজাজও খুব খারাপ। অযথাই লোকের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে। ওকে দলে নেয়া বিপজ্জনক। তবে তার সাহায্য নিই মাঝে মাঝে। টাকার বিনিময়ে। যে মুহূর্তে শুনলাম জুনের কাছে তোমরা ডিটেকটিভ, লারসেনের পার্টিতে, মনে হলো, ওই লোককে দিয়ে তোমাদের ভয় দেখাতে পারি, যাতে আমার ব্যাপারে আর নাক না গলাও। ওকে বললাম। সে প্রথমে টেপ করল তোমাদের টেলিফোন।
হুঁ, মাথা দোলাল কিশোর। এ ভাবেই জেনেছে, চাইনিজ রেস্টুরেন্টে আমরা খাবার কিনতে যাচ্ছি। পিটালুসে যাচ্ছি।
হ্যাঁ। কাজের লোক। খুব চালাক। তবে তোমরা ওর চেয়ে বেশি। তোমাদের সঙ্গে চালাকি করে সুবিধে করতে পারেনি, কিশোরের দিকে পিস্তল নাড়ল। আরোলা। ক্যানডিটা খাও!
খেয়ো না, কিশোর, মুসা বলল।
শুনল না কিশোর। মুখে পুরে দিয়ে চুষতে লাগল। বলল, ক্যারামেল।
অত তাড়াহুড়া কোরো না, আরোলা বলল। আরেকটু খাও। ভাল করে বোঝ। তারপর বলো, হাসছে সে।
আরও কিছুক্ষণ চুষল কিশোর। বলল, আরি, তাই তো! বেশ চালাকি করা হয়েছে! ক্যারামেল আপেল। এখন মনে হচ্ছে আপেলের রসই খাচ্ছি।
তোমার কথা মনে রাখব আমি, আরোলা বলল। তোমার সম্মানেই এই ক্যানডির নাম দেব মিস্টার এক্স। ওরকম গালভরা একটা নামই খুঁজছিলাম। দিয়ে সাহায্য করলে আমাকে। থ্যাংক ইউ।
আপনি একজন ব্রিলিয়ান্ট সাইনটিস্ট, বুদ্ধিমান মার্কেটিং ম্যান, কিশোর বলল। কিন্তু ভয়ঙ্কর খুনী।
যা দিনকাল পড়েছে। কাকে যে কখন কি হয়ে যেতে হবে, ঠিকঠিকানা নেই। যাই হোক, আসল কথা হলো, তোমাদেরকে এখন শেষ করে দিতে হবে। কষ্ট লাগছে আমার।
পিস্তলের সেফটি ক্যাচ তো লক করা, কিশোর বলল। অন করে নিন আগে।
তাই নাকি? ওটার দিকে তাকাল আরোলা।
একটা মুহূর্ত দেরি করল না মুসা। সুযোগটা কাজে লাগাল। চোখের পলকে পাশ থেকে এক লাথি ঝেড়ে দিল, কারাতের ভাষায় একে বলে ইওকো-টোবিগেরি। আরোলার হাতে লাগল। উড়ে গিয়ে মেঝেতে আছড়ে পড়ল ওর হাতের পিস্তল।
কিশোর আর রবিনও আক্রমণ করে বসল। কিন্তু লোকটার গায়ে বেজায় শক্তি। কিছু কারাতে-টারাতেও জানে মনে হলো। রবিনের হাঁটুতে লাথি মেরে তাকে বসিয়ে দিল। ঝট করে ঘুরে মুসাকে ঠেকানোর চেষ্টা করল। পারল না। আঘাতটা আটকে ফেলে গন্ধ-বিজ্ঞানীর বুকে প্রচন্ড এক ঘুসি মারল মুসা। নাক কুঁচকে গেল আরোলার। পিছিয়ে গেল।
সময় দিল না মুসা। শূন্যে লাফিয়ে উঠল। মোচড় দিয়ে ওপরে তুলে ফেলেছে ডান পা, একেবারে সোজা। আইইআহ করে কারাতের বিকট চিৎকার করে প্রচন্ড লাথি লাগাল আরোলার বুকে, একই জায়গায়, যেখানে ঘুসি মেরেছিল।
পড়ে গিয়েও উঠে দাঁড়াল আবার আরোলা। পাগলের মত চারপাশে তাকাচ্ছে। কিশোরের এক সেকেন্ড আগে পিস্তলটা চোখে পড়ল তার। দৌড় দিল তুলে নেয়ার জন্যে।
ডাইভ দিয়ে পড়ল আরোলা। একই সঙ্গে কিশোরও ঝাপ দিল। দুজনেই হাত বাড়াল পিস্তলটা তোলার জন্যে। আগে ধরল আরোলা। তুলে নিয়ে হাসতে আরম্ভ করল হা হা করে। তিন গোয়েন্দার মুখোমুখি হওয়ার জন্যে ঘুরল।
এতক্ষণে লক্ষ্য করল আরোলা, পিস্তলের দিকেই নজর ছিল তার বেশি, যাদের সঙ্গে লড়াই করছে তারা কি করছে খেয়াল করেনি। করার সময়ও ছিল না অবশ্য। ব্রোমিনেটেড সিউডোেফসফেটের একটা ভারি পিপা উড়ে এল তার দিকে।
মুসা আর রবিন দুজনে মিলে তুলে ছুঁড়ে মেরেছে। দড়াম করে আরোলার গায়ে লাগল ওটা, পড়ে গেল সে। মেঝেতে পড়ে ফেটে ভেঙে গেল পিপাটা। ভেতরের শত শত পাউন্ড মালটিসরবিটেন ছড়িয়ে গেল মেঝেতে, কিছু পড়ল আরোলার ওপরও।
নিন শিস দিয়ে উঠল রবিন। নিজের ওষুধ নিজেই খানিকটা খেয়ে চাঙা হোন।
ওর কথা শুনতে পায়নি আরোলা। বেঁহুশ হয়ে গেছে মাথায় বাড়ি খেয়ে। ইলেকট্রিকের এক্সটেনশন কর্ড ছিড়ে তার হাত-পা বেঁধে ফেলল মুসা আর কিশোর মিলে।
হুঁশ ফিরল আরোলার। গোঁ গোঁ করে জিজ্ঞেস করল, কি হয়েছে?
তেমন কিছু না, কিশোর বলল। আমাদেরকে মানসিক অশান্তিতে রেখেছিলেন খানিকক্ষণ। তারপর সামান্য মারপিট হলো। চিত হয়ে গেলেন আপনি। এখন বাঁধা আছেন।
পুলিশকে ডাকার সময় নেই এখন, রবিন বলল। পরে ওদের সঙ্গে দেখা হবে আপনার।
পুলিশ? প্রতিধ্বনি তুলল যেন আরোলা।
হ্যাঁ, কিশোর বলল। আপনার বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ করব আমরা। আমাদের পেছনে ভাড়াটে গুন্ডা লাগানো, খাবারে অবৈধভাবে বিষাক্ত উপাদান মেশানো এবং অবশ্যই আমাদেরকে খুন করতে চাওয়ার কথা রিপোর্ট করব। এর যে কোন একটা অভিযোগই আপনাকে জেলে ঢোকানোর জন্যে যথেষ্ট। যাক, সেটা পরে করব, যেন বক্তৃতা দিচ্ছে, এই ভঙ্গিতে বলল গোয়েন্দাপ্রধান। এখন তাড়াতাড়ি আমাদেরকে বেভারলি হিলটন হোটেলে যেতে হবে। বন্ধ করতে হবে সম্মেলনটা। এই, এসো তোমরা।
আধ ঘণ্টা লাগল। মুসা চালিয়েছে বলেই, রবিন চালালে আরও বেশি লাগত। সে মুসার মত বেপরোয়া চালাতে পারে না। হোটেলের সামনে গাড়ি রেখে দৌড়ে ঢুকল ওরা। কোথায় কি হচ্ছে নির্দেশ রয়েছে নিচের লবিতে। পড়ে জানা গেল এমপায়ার বলরুমে সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন চলছে।
প্রথমেই টেলিফোন করে পুলিশ প্রধানকে খবর দিল কিশোর, জানাল ফেলিক্স আরোলার অবস্থা। তারপর ছুট দিল।
বলরুমে ঢুকল না গোয়েন্দারা। দরজার পাশ দিয়ে দৌড়ে গেল রান্নাঘরে। সেখানে দেখতে পেল চিকেন লারসেনকে। পরনে হলুদ জগিং স্যুট। বুকের কাছে লাল আর কমলা পালক আঁকা। অবশ্যই মুরগীর। পাশে দাঁড়িয়ে আছে জুন আর ডন বারোজ। রান্নাঘরের প্রতিটি কাউন্টারে ট্রেতে স্তূপ করে রাখা ধূমায়িত ড্রিপিং চিকেন।
অ্যাই যে, এসে গেছ, ভালুকের মত বিশাল থাবা তুলে এগিয়ে এলেন লারসেন। বাহু দিয়ে পেঁচিয়ে ধরলেন কিশোরের গলা। সত্যি কথাটা বলবে এর জন্যে জীবনে যদি আর তোমার সঙ্গে দেখা করতে ইচ্ছে না হয়, কথা বলতে ইচ্ছে না করে আমার, যদি ধ্বংস হয়ে যাই, যাব। তবু, সত্যি কথাটা জানতে হবে।
আপাতত এই সম্মেলনের কথা ভুলে যান, কিশোর বলল। মারাত্মক বিষ মেশানো রয়েছে ড্রিপিং চিকেনে। ভয়াবহ ক্যারসিনোজেন ভরে দেয়া হয়েছে। পার্টি ক্যানসেল করুন। বাজারে ছেড়ে থাকলে এখুনি সেগুলো ফিরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা করুন। নইলে লক্ষ লক্ষ লোক মারা যাবে।
হাঁ করে কিশোরের দিকে তাকিয়ে রয়েছে লারসেন। রান্নাঘরের সমস্ত খুটুরখাটুর বন্ধ হয়ে গেছে, একেবারে চুপ। তারপর হঠাৎ অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন তিনি, হাহ হাহ হাহ হা! বলেছিলাম না! ওকে আমি পালকপুত্র করে নেবই! আমাকে কেমন বাঁচিয়ে দিল, দেখলে তো ডন…
ডন পালাচ্ছে! চিৎকার করে উঠল রবিন।
সবাই ফিরে তাকাল। লাফাতে লাফাতে দরজার দিকে ছুটেছে ডন বারোজ।
প্রথমেই যে জিনিসটা চোখে পড়ল সেটা তুলে নিল কিশোর আর মুসা মিলে। লম্বা বড় একটা ট্রে। ড্রিপিং চিকেনে বোঝাই। এক দুলুনি দিয়েই ছুঁড়ে মারল ডনকে সই করে। থ্যাপাত করে তার পিঠে গিয়ে লাগল ট্রেটা। সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল ড্রিপিং চিকেন।
ট্রেটা ছুড়েই ডাইভ দিল মুসা। কাঁধ খামচে ধরল ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যাওয়া লোকটার। এক হ্যাঁচকা টানে চিত করে ফেলল মেঝেতে। যেখানে ড্রিপিং চিকেন আর ওগুলোর রস গড়াচ্ছে। মাখামাখি হয়ে গেল ডনের শরীরে।
ভয়াবহ অবাধ্যতা! চেঁচিয়ে উঠল ডন, মুসার হাত থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্যে ছটফট করছে। এর জন্যে কোর্ট মার্শাল হওয়া উচিত তোমার!
কোর্টে তো আপনি যাবেন, বারোজ সাহেব, হেসে বলল কিশোর। ড্রিপিং চিকেনে বিষ মেশানোর অপরাধে।
যা খুশি করতে পারো আমাকে নিয়ে। টরচার করতে পারো। নাম, র্যাংক, সিরিয়াল নাম্বার সব ছিনিয়ে নিতে পারো। কিন্তু মুখ খোলাতে পারবে না, বেশ গর্বের সঙ্গেই বলল ডন। আত্মবিশ্বাসে ভরপুর।
আপনার মুখ খোলানোর দরকারও নেই। যা বলার আরোলাই বলে দিয়েছে আমাদেরকে। পুলিশ চেপে ধরলে আবারও বলবে। চিকেন লারসেনের খাবারে বিষ মিশিয়ে দেয়ার জন্যে যে আপনি ওকে টাকা খাইয়েছেন, সে কথাও বলবে।
মিথুক! বিশ্বাসঘাতক! গলা ফাটিয়ে চিষ্কার করে উঠল ডন। আমি নাকি! সে-ই তো আমাকে টাকা দিল!
হাসি বাড়ল কিশোরের। তাই নাকি? তাহলে আমি ভুল বলেছি। মানে, ভুল আন্দাজ করেছি।
বলে কি? চোখ বড় বড় হয়ে গেছে লারসেনের। বিশ্বাস করতে পারছেন না। অ্যাই, ভাল চাইলে স্বীকার করো সব কথা! ডনকে আদেশ দিলেন তিনি।
জেনারেল, ডন বলল। আপনার ড্রিপিং চিকেনে এমন এক উপাদান মেশানো আছে, কয়েক বছর আগে যা বিষাক্ত বলে ঘোষণা করে দিয়েছে এফ ডি এ। কেমন লাগছে শুনতে?
তুমি আমার সঙ্গে বেঈমানী করেছ! গর্জে উঠলেন লারসেন।
করবই তো। আপনি তো আর আমাকে দশ লাখ ডলার দেননি, ডনও জবাব দিল সমান তেজে। কিন্তু ফেলিক্স আরোলা দিয়েছে।
আর সেই টাকা খেয়ে আপনি খাবারে বিষ মিশিয়েছেন, কিশোর যোগ করল।
দশ লাখ অনেক টাকা। বিশ্বাসী সৈনিককেও বেঈমান বানিয়ে দেয়। আসলে, এসব করতে না এসে অনেক আগেই মারসেনারিতে যোগ দেয়া উচিত ছিল আমার।
আর সহ্য করতে পারলেন না লারসেন। ছুটে গেলেন ডনের কাছে। টান দিয়ে দিয়ে ছিড়ে ফেলতে লাগলেন পকেটে লাগানো মেডেলগুলো, যেগুলো তিনি দিয়েছিলেন কাজের পুরস্কার হিসেবে। তোমার ঘাড়টা মুরগীর ঘাড়ের মত মুচড়ে ভাঙতে পারলে এখন আমি খুশি হতাম! চিৎকার করে উঠলেন তিনি।
এগিয়ে এল কিশোর। আর একটা প্রশ্ন। সে রাতে জুনকে আপনিই তাড়া করেছিলেন, তাই না?
করেছিলাম, স্বীকার করল ডন।
কেন করেছিলেন? বাবার হাত আঁকড়ে ধরে রেখেছে জুন। নইলে যেন পড়ে যাবে।
রিপোর্টটা ছিল আমার ডেস্কের ওপর। ড্রিপিং চিকেনে মেশানোর উপাদানের লিস্ট সহ। অফিস ছুটি হওয়ার পরই সেদিন থেকে গিয়েছিলে তুমি। আমার ঘরে ঢুকে টেবিলে দেখে ফেলেছিলে কাগজগুলো। চেঁচামেচি শুরু করেছিলে। কাগজগুলোতে টপ সিক্রেট লেখা ছিল। অন্যায় ভাবে অনুমতি না নিয়ে পড়ার অপরাধে গুলি করে মারা উচিত ছিল তোমাকে। এ তো রীতিমত গুপ্তচরগিরি।
রিপোর্টটা নিয়ে পালাতে চেয়েছিল জুন, কিশোর বলল। আর আপনি ওকে তাড়া করলেন?
করলাম। তবে ওর ক্ষতি করার কোন ইচ্ছে আমার ছিল না, জুনের দিকে তাকাল ডন। বৃষ্টির মধ্যে তোমার গাড়িটা ঢাল বেয়ে পিছলে পড়ে গেল। ওটা নিছকই দুর্ঘটনা। আমার ব্যাংকের কসম খেয়ে বলছি।
ওকে সাহায্য করলে না কেন তুমি? জিজ্ঞেস করলেন লারসেন।
থেমেছিলাম…সাহায্য করার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু সবার আগে আমার আইডেনটিটি। ওটা তো বাঁচাতে হবে। কাজেই নিজে কিছু না করে পুলিশকে ফোন করলাম। দুর্ঘটনার পুরো বিবরণ জানালাম। নামটা অবশ্যই গোপন রেখে।
বাবা, হাঁপাচ্ছে জুন। এখন আমার মনে পড়ছে। অ্যাক্সিডেন্ট…ভয়ঙ্কর…! কাঁদতে শুরু করল সে। সান্ত্বনা দেয়ার ভঙ্গিতে একহাতে মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন লারসেন।
একটা সময় তো আমরা ধরেই নিয়েছিলাম, কিশোর বলল। এ সবের পেছনে হেনরি অগাসটাসের হাত রয়েছে। তাকে অনুসরণ করে আপনার মুরগীর খামারে চলে গিয়েছিলাম আমরা। ওখানে তাকে বলতে শুনলাম, খামারটা সে কিনে নেবে, মুরগীর খাবার বদলে দেবে।
ওই দুষ্ট মুরগীর ছানাটা কিছু বোঝে না। কোনটা চিকেন ফিড আর কোনটা চিকেন স্যালাড বিন্দুমাত্র ধারণা নেই তার। নিজের খামারের মুরগীদের খাবার কিছুদিন পর পরই বদলাতে থাকে। কতটা ক্ষতি যে করে, বুঝতেই পারে না, লারসেন বললেন। বাজারে গুজব ছড়ায়, আমার ফার্ম সে কিনে নেবে। এসব বলে বলে বোঝাতে চায়, আমি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছি। ও ভাল করেই জানে, খাবার বানিয়ে আমার সঙ্গে পারবে না। আর আমার ব্যবসা কিনে নেয়ার মত অত টাকাও তার নেই। শুধু শুধু শয়তানী করা আরকি।
কিশোর, জুন বলল। এখন তো বুঝতে পারলে, আমার বাবা নির্দোষ। বলো?
হ্যাঁ, অস্বস্তি বোধ করছে কিশোর। লারসেনকে সন্দেহ করেছিল এবং সে কথা বলেছিল বলে। একটা কথা বলবেন? সেদিন স্টুডিওতে কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না, ড্রিপিং চিকেন কামড়ে নিয়েও সেটা বার বার ফেলে দিচ্ছিলেন কেন? আমি ভেবেছি, বিষ মেশানো আছে সেটা বুঝতে পেরেই আপনি খাচ্ছেন না।
খাবারের বিজ্ঞাপনের শুটিঙে সবাই ওরকম করে, লারসেন বললেন। ধর তিরিশ বার তোলা হলো এক ছবি। তিরিশবারই যদি তুমি এক কামড় করে খাও, তাহলে তো গলা পর্যন্ত উঠে আসবে খাবার। একতিরিশ নম্বর কামড়টা বসাতেই ইচ্ছে করবে না আর।
বাবার দিকে ফিরল জুন। বাবা, ওদিকে তো লোক বসে আছে। একশোজন সাংবাদিক নিশ্চয় অস্থির হয়ে উঠেছে ড্রিপিং চিকেনের আশায়। কি করা যায়?
বুকের কাছে আঁকা পালকে হাত বোলালেন লারসেন। উপায় খুঁজছেন মনে মনে। হাসলেন। ব্যবস্থা একটা করেই ফেলব।
ছুটে গেলেন তিনি বলরুমে। দাঁড়ালেন গিয়ে স্পটলাইটের নিচে মাইক্রোফোনের সামনে। গুড ইভনিং, লেডিজ অ্যাও জেন্টেলম্যান, বলতে লাগলেন তিনি। আপনারা নিশ্চয় ভাবছেন, আজ রাতে কেন আপনাদেরকে দাওয়াত করে এনেছি আমি। আপনারা জানেন, আপনাদের মধ্যে অনেকেই ভাবেন আমি দ্রুত টাকা কামানোের তালে থাকি, আর খবরের হেডলাইন হতে চাই। হাহ হাহ হা!
তার হাসিতে যোগ দিল পুরো কক্ষ। চিকেন লারসেনের স্বভাব আর কথাবার্তার ধরন জানা আছে তাদের। কেউ কিছু মনে করল না।
ভদ্রমহোদয়গণ, আমি আজকে আপনাদের দাওয়াত করেছি আমার বিখ্যাত ফ্রাইড চিকেন খাওয়ানোর জন্যে। আর আমি যে ধোকা দিইনি, সেটা প্রমাণ করার জন্যেই কিছুক্ষণের মধ্যে আসছে… পরের শব্দটা বলতে সময় নিলেন তিনি, ভাবতে হয়েছে বোধহয়, পিজা! ঠিক। পিজা! আর শুনে নিশ্চয় আমার মতই আপনারাও অবাক হয়েছেন। কি খাওয়াতে এনে কি খাওয়াচ্ছি ভেবে। হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে কপালের ঘাম মুছলেন লারসেন। তবে কদ্রমহোদয়গণ, নতুন কিছুর ঘোষণা দিতে পারব বলে গর্ব হচ্ছে আমার। আজ রাতে আমি ঘোষণা করছি চিকেন লারসেন সিটি স্নিকার অ্যাওয়ার্ড। প্রতি বছরই কোন না কোন পুরস্কার ঘোষণা করি, জানা আছে আপনাদের। এবারও করছি। আমাদের আজকের বিজেতারা হলো কিশোর পাশা, মুসা আমান, আর রবিন মিলফোর্ড। রকি বীচের অনেকেই চেনেন তাদের, অন্তত নাম শুনে থাকবেন। ওরা তিন গোয়েন্দা বলে নিজেদের পরিচয় দেয়। ওদের সম্মানেই আজকের আমার এই পার্টির আয়োজন। কেন পুরস্কারটা দিলাম ওদের, তা নাহয় গোপনই থাক। আড়ালে আড়ালে অনেক বড় কাজ করে ফেলেছে ওরা, লক্ষ লক্ষ ক্ষুধার্ত মানুষকে অকাল মৃত্যু থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। ওদের প্রতি আমি বিশেষ ভাবে কৃতজ্ঞ, সেই মানুষদেরও কৃতজ্ঞ থাকা উচিত, যদিও ওরা জানেই না কেন থাকতে হবে। ঘুরে তাকালেন তিনি। দরজার কাছে দাঁড়ানো বিস্মিত তিন গোয়েন্দাকে হাত নেড়ে ডাকলেন।
এক এক করে মঞ্চে উঠে এল কিশোর, মুসা, রবিন। স্পটলাইটের নিচে এসে দাঁড়াল। আলোর নিচে থাকার জন্যে গাদাগাদি করে দাঁড়াতে হলো ওদের, কারণ বেশির ভাগটাই জুড়ে রয়েছেন চিকেন লারসেন।
বার বার হাত মেলালেন ওদের সঙ্গে। অনেকগুলো ফ্রী কুপন বিতরণ করলেন, যাতে বিনে পয়সায় গিয়ে লারসেন রেস্টুরেন্টে খেতে পারে। টেলিভিশন ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে হাসলেন, হাত নাড়লেন।
শোন, কণ্ঠস্বর খাদে নামিয়ে তিন গোয়েন্দাকে বললেন তিনি, বিরাট বিজ্ঞাপন হলো। কয়েক মাস ধরে চলবে এটা টিভিতে।
আপনি খুশি থাকলেই আমরা খুশি, জোরে একটা নিঃশ্বাস ফেলল কিশোর।
হ্যাঁ, আমরা ধন্য, বিড়বিড় করল রবিন। ঠিক, বলল মুসা।
অমন পেঁচার মত মুখ করে রেখেছ কেন? লারসেন বুললেন। প্রতিদিন আমার সঙ্গে তোমাদেরকেও দেখানো হবে টিভিতে। লোকে চিনে ফেলবে। ভাল হলো না?
না, গম্ভীর হয়ে বলল কিশোর হলো না। চেনা হয়ে গেলে গোয়েন্দাগিরিতে খুব অসুবিধে হয়। সুবিধেও হয় অবশ্য, কিছু কিছু ক্ষেত্রে, তবে সেটা কম। এনিওয়ে, মেনি মেনি থ্যাংকস! যা হবার তা তো হয়েই গেছে।