ঘড়ির গোলমাল – তিন গোয়েন্দা – রকিব হাসানপ্রথম প্রকাশঃ মার্চ, ১৯৯০
কিশোর, মহাবিপদে পড়েছি! টেলিফোনে ভেসে এলো রবিনের কণ্ঠ। তোমার সাহায্য লাগবে!,
হয়েছে কি? উদ্বিগ্ন হলো কিশোর।
মিস্টার লারমার, মারকো আর ডিংগো ধরে নিয়ে এসেছে আমাকে টিমকেও।
কিভাবে কি ঘটেছে, জানালো রবিন। শেষে বললো, মাকে বলে দিয়েছি আজ রাতে তোমার সঙ্গে থাকবো। মিস্টার লারমারের ইচ্ছে, তুমি মেরিচাচীকে বলে আসো, আমার সঙ্গে থাকবে। কেউ কিছু সন্দেহ যেন করতে না পারে। হুমকি দিচ্ছেন, কথামতো কাজ না করলে নাকি খুব খারাপ হবে আমাদের। থামলো এক মুহূর্ত। তবে, মেসেজগুলো যদি আনো, আর কাউকে কিছু না বললো, তাহলে ছেড়ে দেবেন কথা দিয়েছেন। কিশোর, কি ভাবছো? কথা শুনবে? আমার পরামর্শ, শুনে না, পুলিশকে…
চটাস করে চড় পড়লো। আঁউ করে উঠলো রবিন। ভেসে এলো লারমারের কর্কশ কণ্ঠ, শোনো ছেলে, বন্ধুকে বাঁচাতে চাইলে, তার অঙ্গহানী করাতে না চাইলে, যা বলেছি করবে। মেসেজগুলো নিয়ে জাঙ্কইয়ার্ডের গেটে দাঁড়িয়ে থাকবে। ঠিক আধ ঘন্টা সময় পাবে। ইতিমধ্যে পৌঁছে যাবে আমার ভ্যান। তুলে আনবে তোমাকে। খবরদার, কাউকে কিছু বলতে পারবে না। বুঝেছো? কথা না শুনলে প্রথমে তোমার বন্ধুর দুটো কাটা আঙুল উপহার পাবে, তারপর একটা কান, তারপর…
ঠিক আছে, মিস্টার লারমার, বাধা দিয়ে বললো কিশোর। আমি আসছি। গেটে দাঁড়িয়ে থাকবো। গাড়ি পাঠান।
এই তো বুদ্ধিমান ছেলে। কিশোরের মনে হলো আনন্দে ঘোৎ ঘোঁৎ করলো একটা শুয়োর। লাইন কেটে দিয়ে নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটলো একবার। মুসাকে ডাকবে? না; থাক। অযথা তাকে এসবে জড়িয়ে লাভ নেই। লারমারকে ঠিক বিশ্বাস করা যাচ্ছে না। কি করবে, বোঝার উপায় নেই। হয়তো মিথ্যে হুমকি দেয়নি। মেসেজগুলো চাইছে। দিয়ে দিলেই যদি ঝামেলা চুকে যায়, দেয়াই উচিত। মানে তো জানা-ই হয়ে গেছে দুটোর।
তিনটে মেসেজই-ছেঁড়াটা সহ-গুছিয়ে শার্টের পকেটে নিলো কিশোর। ট্র্যাপড়োরের দিকে এগোতে গিয়ে আবার থামলো। সাবধান হতে দোষ কি? ফিরে এসে একটা কাগজে নোট লিখলোঃ ঘড়ির ঘরে খোঁজ করো আমাদেরকে। তার স্থির বিশ্বাস, ওর ঘরেই রয়েছে সমস্ত রহস্যের চাবিকাঠি; কাগজটা পেপার ওয়েইট চাপা দিয়ে এসে নামলো দুই সুড়ঙ্গে।
হামাগুড়ি দিয়ে পাইপ বেয়ে চলে এলো মুখের কাছে। মুখ বের করে দেখলো আশপাশটা। কারও থাকার কথা নয় এখন এখানে, তবু দেখলো। ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় হুঁশিয়ার করছে, তাকে। পাইপ থেকে বেরিয়ে হেঁটে গেল সবুজ ফটক এক-এর দিকে।
সবে পৌঁছেছে, খুলবে, এই সময় ছায়া থেকে বেরিয়ে এলো একটা ছায়ামূর্তি। জঞ্জালের সাথে মিশে ছিলো।
পাঁই করে ঘুরেই সুড়ঙ্গের দিকে দৌড় দিলো কিশোর। কিন্তু লোকটার সঙ্গে পারলো না। ছুটে এসে পেছন থেকে জাপটে ধরলো তাকে। মুখ চেপে ধরলো কঠিন থাবা, যেন লোহার সাঁড়াশি। কানের কাছে কথা বললো হাসি হাসি একটা কণ্ঠ, তারপর? আবার আমাদের দেখা হলো। এবং এইবার আমিই জিতবো।
কথায় ফরাসী টান। চিনতে পারলো কিশোর। শোঁপা! ইউরোপের কুখ্যাত ইন্টারন্যাশনাল আর্ট থিফ। আরেকবার ওর সঙ্গে প্রতিযোগিতা হয়েছিলো তিন গোয়েন্দার, ওকে ভুলবে না কিশোর। তাকে আর মুসাকে আটকে ছিলো ভয়াবহ গোরস্থানে, প্রচণ্ড কুয়াশার মধ্যে, মনে পড়তে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো।
তাহলে আবার বললো শোঁপা, চিনতে পেরেছে। সেবারেই বুঝেছো, বেশি। চালাকি পছন্দ করি না আমি। কিছুক্ষণের জন্যে ছাড়তে পারি এখন, কথা বলবো। চেঁচাতে পারবে না। চেঁচালে নিজেই ক্ষতি করবে। বিশ্বাস করো কথাটা।
বিশ্বাস করলো কিশোর। কোনোমতে মাথা ঝাঁকালো।
মুখ থেকে হাত সরালো শোঁপা। তারা, আর দূর থেকে আসা ইলেকট্রিক বাল্বের আবছা আলোয় লোকটার মুখের আদল দেখতে পেলো কিশোর। হাসিটাও চেনা পেল।
খুব অবাক হয়েছে না? শোঁপা বললো। কেন, একবারও মনে পড়েনি আমার কথা? এক মিলিয়ন ডলারের চোরাই ছবি, অথচ শোঁপা তার কাছে থাকবে না, এটা কোনো কথা হলো?
চোরাই ছবি? চমকে গেল কিশোর। সেটাই খুঁজছেন নাকি?
কেন, তুমি জানো না? কণ্ঠেই প্রকাশ পেয়ে গেল, বিস্মিত হয়েছে শোঁপা। পাঁচটা চমৎকার ছবি, দশ লাখ ডলার দাম, বছর দুই আগে চুরি গিয়ে এখনও নখোঁজ হয়ে আছে। সেগুলো খুঁজতেই এসেছি আমি। তুমি নিশ্চয় জানো, না। জানার ভান করছে। নইলে কিসের তদন্ত করছো কদিন ধরে?
মিথ্যে বলবো না, একটা চেঁচানো ঘড়ির রহস্য ভেদের চেষ্টা করছি। কিছু সূত্র হাতে এসেছে। বুঝতে পারছিলাম, মূল্যবান কোনো জিনিসের সাথে এর সম্পর্ক আছে। কি জিনিস, জানতাম না।
ঘড়ি? হ্যাঁ, জিনিসটা আমাকে অবাক করেছে। টুকরো টুকরো করে…
আপনি চুরি করেছেন? কাল আপনিই রবিন আর টিমকে তাড়া করেছিলেন?
আমিই করেছি। তোমাদের পেছনেও লোক লাগিয়েছিলাম, কিন্তু গাধাগুলো লেগে থাকতে পারলো না, হারিয়ে ফেললো। গাড়ি রেখে তোমার বন্ধুরা থানার ভেতরে ঢুকলো। এই সুযোগে নিয়ে গেছি ঘড়িটা। সমস্ত যন্ত্রপাতি খুলে ফেলেছি। কোনো সূত্র পেলাম না। আমি ভেবেছি, খোদাই করে কোথাও কিছু লেখা আছে। তুমি নিশ্চয় কিছু পেয়েছো। তোমার যা ব্রেন আর চোখ, নজর এড়াতেই পারে না। কি পেয়েছো?
আপনাকে কেন বলবো? জানেন, আমি চেঁচালে এখুনি ছুটে আসবে বোরিস আর রোভার। ওদের একজনের সঙ্গেই পারবেন না আপনি। ধরে থানায় নিয়ে যাওয়াটা কোনো ব্যাপারই না।
শব্দ করে হাসলো শোঁপা। ভালো, খুব ভালো। তোমার মতো সাহসী ছেলেদের পছন্দ করি আমি। কিন্তু তুমিই বা কি করে ভাবলে, আমি একা এসেছি? ইচ্ছে করলে আমিও তোমাকে…যাকগে, হুমকি দিয়ে লাভ নেই। আমি তোমাকে একটা অফার দিচ্ছি, বিনিময়ে কিছু চাইবো। আমি তোমাকে সাহায্য করবো, তুমিও আমাকে করবে।
আমাকে কি সাহায্য করবেন?
ক্লকের বাড়ির যে ছেলেটার সঙ্গে তোমার বন্ধুত্ব হয়েছে, টিমের কথা বলছি। ওর বাবা জেলে। তাকে নির্দোষ প্রমাণ করতে সাহায্য করবো তোমাকে। আমি ছবিগুলো নিয়ে যাবো, তুমি মানুষটাকে জেল থেকে বের করে আনবে। নাকি, রাজি নও??
দ্রুত ভাবছে কিশোর। মাথা আঁকালো। বেশ, করবো। যদি আপনি কথা রাখেন। আরও একটা কাজ করতে হবে আপনাকে।
কী?
সব কথা খুলে বললো কিশোর। রবিন আর টিম এখন কোথায় কি অবস্থায় আছে, আধ ঘন্টার মধ্যে ভ্যান আসবে ইয়ার্ডের গেটে তাকে তুলে নেয়ার জন্যে, নিয়ে যাবে লারমার, মারকো আর ডিংগো যেখানে দুই কিশোরকে আটকে রেখেছে, সেখানে।
ফরাসী ভাষায় কি যেন বললো- শোঁপা। ইংরেজিতে বললো, ওই গাধাগুলো! এতোখানি এগিয়ে যাবে, ভাবিনি। ভেবেছিলাম, ওরা কিছু বোঝার আগেই ছবিগুলো বের করে নিয়ে হাওয়া হয়ে যাবো।
ওদের কথাও জানেন আপনি? অবাক হয়ে বললো কিশোর।
জানি না মানে! শুনলে অবাক হবে, আরও অনেক কিছু জানি আমি। দুসপ্তা ধরে আছি এই শহরে, সূত্র খুঁজছি। তদন্তের নিজস্ব কায়দা আছে আমার। এখানকার অনেক চোর-ডাকাত আর অপরাধীর টেলিফোন লাইন টেপ করে রেখেছি আমি, ওদের গোপন আলোচনা শুনি। ঠিক আছে, তোমার বন্ধুদের মুক্তিরও ব্যবস্থা করবো। ছবিগুলো বের করে নিয়ে চলে যাবো আজ রাতেই। কাল এ-সময়ে থাকবো পাঁচ হাজার মাইল দূরে। হ্যাঁ, ওরা যেভাবে বলেছে, সেভাবেই কাজ করে যাও। গেটে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকো। গাড়ি এসে যেখানে নিয়ে যায়, যাও. লোকজন নিয়ে তোমাদের পেছনেই থাকবো আমি। কিচ্ছু ভেবো না, যা করার আমিই করবো!
কি করবেন?
সেটা তোমার জানার দরকার নেই।
শোঁপাকে বিশ্বাস করা ছাড়া উপায় নেই। সবুজ ফটক এক দিয়ে বেরিয়ে ঘরের দিকে চললো কিশোর। চেঁচানো ঘড়ির ব্যাপারে জড়িয়ে পড়েছে বলে নিজেকেই গাল দিচ্ছে এখন। রবিন আর টিমকে মুক্ত করতে পারবে তো ফরাসীটা? পারবে, আশা করলো সে।
বসার ঘরে ঢুকে দেখলো, চাচা-চাচী তখনও টেলিভিশন দেখছেন। বললো, রবিন ফোন করেছে। রাতটা ওদের বাড়িতেই কাটাবে। এরকম মাঝে মাঝেই গিয়ে থাকে কিশোর। অমত করলেন না রাশেদ পাশা। মেরিচাচীও কিছু বললেন না। অনুমতি নিয়ে নিজের ঘরে চলে এলো সে। গরম জ্যাকেট পড়লো।
আবার নিচতলায় নেমে, চাচা-চাচীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাইরে বেরোলো কিশোর। গেটের দিকে এগোলো।
ওখানে তার জন্যে অপেক্ষা করছে শোঁপা। এগিয়ে এসে কিশোরের কাঁধে হাত রেখে বললো, একটুও চিন্তা কোরো না। সব ঠিক হয়ে যাবে। গাড়ি এলে। সোজা উঠে পড়বে। ওদের যাতে কোনো সন্দেহ না হয়। বুঝেছো?
বলে আর দাঁড়ালো না শোঁপা। ঘুরে হাঁটতে শুরু করলো। মিলিয়ে গেল অন্ধকারে। গাড়িটা কোথায়, দেখতে পেলো না কিশোর। ইয়ার্ডের আরেক পাশে হয়তো লুকিয়ে রাখা হয়েছে।
দাঁড়িয়ে আছে কিশোর। অন্ধকার খুব বেশি। আর নীরব। কেঁপে উঠলো একবার সে, ঠাণ্ডায় নয়।
হেডলাইট দেখা গেল। ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে একটা ছোট ভ্যান। কিশোরের পাশে এসে দাঁড়ালো। ঝটকা দিয়ে খুললো দরজা। মুখ বের করলো। ডিংগো।
আছো, খসখসে কণ্ঠস্বর। এসো, ওঠো।
.
হলিউডের দিকে চলেছে গাড়ি। চালাচ্ছে মারকো। ডিংগো আর মারকোর মাঝে গাদাগাদি করে বসেছে কিশোর।
মেসেজগুলো নিয়েছে তো? একসময় জিজ্ঞেস করলো মারকো।
নিয়েছি, শান্ত কণ্ঠে জবাব দিলো কিশোর।
গুড, বললো ডিংগো। আরি, মারকো?
রীয়ার-ভিউ মিররের দিকে তাকিয়ে আছে মারকো। দেখেছ, মনে হয় ফলো কুরছে।
ফলো! চেঁচিয়ে উঠলো ডিংগো। খপ করে চেপে ধরলো কিশোরের হাত। এই ছেলে, পুলিশকে…
না, স্যার, তাড়াতাড়ি বললো কিশোর। আতঙ্কিত। সবটা অভিনয় নয়। শোঁপার গাড়িটা দেখে ফেলেছে ওরা। সত্যি সত্যি বিপদ হতে পারে এবার।
পুলিশ নয়? কঠিন কণ্ঠে বললো মারকো। তাহলে কে? কি হলো, কথা বলছো না কেন? কে?
আমি কি করে জানবো? পুলিশকে বলিনি। কাউকেই জানাইনি আমি।
কে তাহলে?
মেসেজের কথা জানে এমন কেউ হতে পারে। কাল ঘড়িটা চুরি হয়ে গেছে, টিমের গাড়ি থেকে। আমরা তো ভেবেছি আপনারা নিয়েছেন।
আমরা নিইনি।
তাহলে ওই লোকটাই নিয়েছে, বুড়ো আঙুল দিয়ে ইঙ্গিত করলো কিশোর। আমার ওপর চোখ রেখেছিলো হয়তো। এখন পিছে পিছে আসছে। কোথায় যাচ্ছি দেখতে চায়।
হ্যাঁ, তা হতে পারে, মাথা দোলালো ডিংগো। ঘড়ি খোয়া যাওয়ার কথা লারমারকে বলেছে টিম। তার মানে মিথ্যে বলেনি। মালের পেছনে আরও লোক লেগেছে। মারকো, জলদি খসাও।
খসাচ্ছি। দেখি কততক্ষণ লেগে থাকতে পারে।
আরও মিনিট দুই একই গতিতে গাড়ি চালালো মারকো। ফ্রীওয়ের কাছে এসে, হঠাৎ গতি বাড়িয়ে দিলো, পলকে ফ্রীওয়েতে উঠে ঢুকে গেল গাড়ির ভিড়ে। দেখতে দেখতে চলে এলো অনেকগুলো গাড়ির মাঝামাঝি। তীব্র গতিতে ছুটে চলেছে গাড়িগুলো, হলিউডের দিকে।
লস অ্যাঞ্জেলেস আর হলিউডের মাঝে বিছিয়ে রয়েছে যেন ফ্রীওয়ের জাল, নানাদিক থেকে বেরিয়ে একটার সঙ্গে আরেকটা মিশেছে অসংখ্য পথ, আশপাশের সমস্ত এলাকার সঙ্গে লস অ্যাঞ্জেলেস শহরের যোগাযোগ রক্ষা করেছে। সারাটা দিন আর রাতেরও বেশির ভাগ সময় অগুণতি গাড়ি চলাচল করে ওসব পথে। রাতের এই সময়েও সিক্স লেন হাইওয়ের একটা লেন ফাঁকা নেই। নানারকম গাড়ি আর ট্রাক ছুটে চলেছে ভীষণ গতিতে।
অ্যাক্সেলারেটরে পায়ের চাপ বাড়িয়ে পাশে সরতে শুরু করলো মারকো, গাড়ির ভিড় থেকে বের করে আনতে চায় ভ্যান। মিনিট দুয়েক পর পেছনের গাড়িটা আর দেখা গেল না, হারিয়ে গেছে বোধহয় বড় বড় কয়েকটা ট্রাকের পেছনে। সন্তুষ্ট হতে পারলো না মারকো। আরও দশ মিনিট ধরে কয়েকবার করে গাড়ির ভিড়ে ঢুকলো আর বেরোলো। শেষে আউটার লেনে বেরিয়ে শা করে মোড় নিয়ে নেমে এলো একটা একব্জিট র্যাম্প-এ-হাইওয়ে থেকে বেরোনোর মুখ।
নিচের সিটি স্ট্রীটে নেমে গতি কমালো মারকো। তাকালো রীয়ার-ভিউ মিররের দিকে। এতোক্ষণে সন্তুষ্ট হলো। নেই।
স্বাভাবিক গতিতে চলছে এখন ভ্যান। মনে মনে দমে গেছে কিশোর। শোঁপার ওপর ভরসা করেছিলো সে। কিন্তু মারকোর সাথে পারেনি শোঁপার ড্রাইভার, সাহায্যের আশাও শেষ।
কিছুক্ষণ পর দুটো বাড়ির মাঝের গলিপথে ঢুকলো ভ্যান। মোড় নিয়ে ঢুকলো। একটা ড্রাইভওয়েতে। বড় একটা গ্যারেজের সামনে এসে দাঁড়ালো। একবার হর্ন বাজালো মারকো। মুহূর্ত পরেই গ্যারেজের একটা দরজা উঠে গেল। ভ্যান ভেতরে ঢুকতেই নেমে গেল আবার।
একপাশের দরজা খুলে মারকো নামলো। আরেক পাশেরটা খুলে কিশোরকে নিয়ে নামলো ডিংগো।
লারমারকে দেখতে পেলো কিশোর। তার পেছনে বসে আছে রবিন আর টিম, চেয়ারের সঙ্গে বাঁধা।
কোনো অসুবিধে হয়েছিলো? জিজ্ঞেস করলো লারমার। দেরি করে ফেলেছো।
একটা গাড়ি পিছু নিয়েছিলো, মারকো জানালো। ওটাকে খসাতে সময় লাগলো। ছেলেটা বলছে পুলিশ নয়। ঘড়ি-চোরটা হতে পারে। কাল টিমের বাড়ি থেকে নাকি নিয়ে গিয়েছিলো।
আসেনি, ভালোমতো দেখেছো তো?
মাথা ঝাঁকালো মারকো।
গুড। কড়া চোখে কিশোরের দিকে তাকালো লারমার। কোনো চালাকি টালাকি করলে বুঝবে মজা। তো, মেসেজগুলো এনেছো তো? হাত বাড়ালো। দেখি?
পকেট হাতড়ে একটা কাগজ বের করলো কিশোর। এই যে, মিস্টার লারমার, পয়লা মেসেজটা।
হাতে নিয়ে পড়লো লারমার। কিশোরের লেখা কাগজঃ আই সাজেস্ট ইউ সী দা বুক। হ্যাঁ, তোমার বন্ধু বলেছে-এটার কথা। কি বই?
জানি না।
দ্বিতীয় মেসেজে কিছু বলেনি?
এই যে, স্যার, নিয়ে এসেছি। নিজের চোখেই দেখুন।
ওনলি আ রুম হোয়্যার ফাদার টাইম হামস! মানে কি?
বোধহয় মিস্টার ক্লকের ঘড়ি-ঘরের কথা বলেছে। সেখানে অসংখ্য ঘড়ি, সারাক্ষণ গুঞ্জন করছে।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঠিকই বলেছো। তা-ই বুঝিয়েছে। কিন্তু তন্ন তন্ন করে খুঁজেছি ঘরটা, কিছুই পাইনি। দেখি, তৃতীয় মেসেজের অর্ধেকটা আছে আমার কাছে, পকেট থেকে ছেঁড়া কাগজটা বের করলো লারমার।
কিশোরও পকেটে হাত ঢোকালো।
এই সময় ঘটলো ঘটনা। ঝনঝন করে ভাঙলো দুপাশের জানালার কাঁচ। ঝটকা দিয়ে পাল্লা খুলে গেল। পর মুহূর্তেই হ্যাঁচকা টানে পর্দা সরলো। জানালার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে দুজন নীল পোশাক পরা লোক, হাতে অটোমেটিক পিস্তল।
হাত তোলো! লারমার, মারকো আর ডিংগোকে আদেশ দিলো একজন পুলিশ। কুইক!
পুলিশ! চেঁচিয়ে উঠলো ডিংগো।
বিড়বিড় করে স্প্যানিশ ভাষায় কি বললো মারকো, বোঝা গেল না।
চুপ! ধমকে উঠলো আরেকজন পুলিশ। জলদি হাত তোলো। পালাতে পারবে না। যা বলছি করো।
ধীরে ধীরে হাত তুললো ডিংগো আর মারকো। লারমার পিছিয়ে গেল ওয়ার্কবেঞ্চের কাছে। মনে হলো, কিছু একটা অস্ত্র খুঁজছে।
কিন্তু পুলিশের নজর আছে ওর ওপর। চিৎকার করে উঠলো প্রথম লোকটা, এই, কি করছো? হাত তুলতে বললাম না?…আরে, পুড়ছে কী!
মেসেজগুলো পুড়ছে! চেঁচিয়ে বললো কিশোর।
বেঞ্চের ওপর ব্রোল্যাম্পটা জ্বলছে, তার শিখাতেই কাগজগুলো পোড়াচ্ছে লারমার। দেখতে দেখতে পুড়ে ছাই হয়ে গেল ওগুলো।
নাও, করো এবার সমাধান, দাঁত বের করে হাসলো লারমার।
প্রথম দুটো মনে আছে আমার, পুলিশের দিকে তাকিয়ে বললো কিশোর। কিন্তু তিন নম্বরটা…, হাত ওল্টালো সে। নাহ, ক্লক কি বোঝাতে চেয়েছে, জানবো না!
কেন, মগজ খাটাও, হেসে উঠলো লারমার। ডিংগো আর মারকোর দিকে চেয়ে হাসি মুছে গেল। গাধা কোথাকার! হিসিয়ে উঠলো সে। খসিয়ে দিয়ে না এসেছিলে! এই বিচ্ছু ছেলেটা টেক্কা মেরে দিলো তোমাদের ওপর। পুলিশকে ঠিকই খবর দিয়ে এসেছে। আর তোমরা… রাগে বাক্যটা শেষ করতে পারলো না সে, দাঁতে দাঁত চাপলো।
বিশ্বাস করুন, পুলিশকে কিচ্ছু বলিনি আমি, লারমারের মতোই অবাক হয়েছে কিশোরও। কি করে ঘটলো এটা, বুঝতে পারছে না।
পিস্তল ধরে রাখো, মিক, একজন পুলিশ আরেকজনকে বলে সরে গেল জানালার কাছ থেকে। ঘুরে গিয়ে তুলে দিলো গ্যারেজের দরজা। ঘরে ঢুকলো, ততীয় আরেকজন। পেছনে আবার নামিয়ে দেয়া হলো দরজা।
ছায়া থেকে আলোয় এসে দাঁড়ালো লোকটা। হাসি হাসি মুখ। বললো, বাহ, চমৎকার। সব কিছু কন্ট্রোলে এসে গেছে।
কপাল কুঁচকে ফেললো কিশোর। কোনোমতে শুধু বললো, মিস্টার শোঁপা! বুঝতে পারছে না, পুলিশের সঙ্গে চোরের খাতির হৃলো কিভাবে।
.
হ্যাঁ, আমি, বললো শোঁপা। বিখ্যাত আর্ট থিফ, তিন মহাদেশের পুলিশ যার জ্বালায় অস্থির। লারমারের দিকে তাকালো। কি করে ভাবলে, তোমাদের মতো তিনটে শুয়োপোকা আমাকে টেক্কা দিয়ে বেরিয়ে যাবে?
মনে হলো, লারমারও শোঁপার নাম শুনেছে। কালো হয়ে গেছে মুখ, চোখে অস্বস্তি। দুই সহকারীর মতোই নীরব। কিছু করার নেই। পরিস্থিতি আয়ত্তের। বাইরে চলে গেছে।
কিন্তু…কিন্তু… বুঝতে পারছে না কিশোর। আপনাকে খসিয়ে দিয়েছিলো ওরা। আমি নিজেও দেখেছি, আপনার গাড়িটা দেখা যায়নি। চিনে এলেন কি করে?
যে পেশায় আছি, সাবধান তো হতেই হয় আমাকে, তাই না, হালকা গলায় বললো শোঁপা। এগিয়ে এসে কিশোরের জ্যাকেটের পকেটে হাত ঢুকিয়ে ঘোট, চ্যাপ্টা একটা জিনিস বের করলো। এটা ইলেকট্রনিক সিগন্যালিং ডিভাইস। ইয়ার্ডে তোমার সঙ্গে কথা বলার সময় এক ফাঁকে ঢুকিয়ে দিয়েছিলাম। আমার গাড়িতে রেডিও রিসিভার আছে। তোমার পকেটে যন্ত্রটা একনাগাড়ে সঙ্কেত দিয়ে, যাচ্ছিলো। কাজেই, ফ্রীওয়েতে গাড়ি দেখে অনুসরণ করতে হয়নি আমাকে। পরিষ্কার বুঝতে পারছিলাম কখন কোন দিকে যাচ্ছে ভ্যান। তোমরা গ্যারেজে ঢোকার কয়েক মিনিট পরেই চলে এলাম আমরাও। তারপর আর কি? আমার দুজন সহকারীকে পাঠালাম কাজ শেষ করতে।
মিস্টার শোঁপা! কথা বললো রবিন। চেয়ারে বাধা, স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে। রয়েছে লোকটার দিকে। কাল আপনিই আমাদের গাড়ির পিছু নিয়েছিলেন, না? ঘড়ি চুরি করেছেন।
বাউয়ের কায়দায় মাথা নোয়ালো শোঁপা। সরি, বয়, আমিই। তবে তোমাদের কোনো ক্ষতি করার ইচ্ছে ছিলো না। বরং সাহায্যই করতে চেয়েছি, যাতে কাজে আরও তাড়াতাড়ি সফল হও। সে যাক, সময় খুব কম। নইলে আরও কথা বলতাম তোমাদের সঙ্গে, ভালোই লাগছে। হাজার হোক, পুরনো বন্ধু, হাসলো সে। সহকারীদের দিকে চেয়ে বললো, দাঁড়িয়ে আছো কেন? হাতকড়া লাগাও।
গ্যারেজের মাঝখানে ইস্পাতের একটা খুঁটি বসানো রয়েছে, ছাতের ভার রাখার জন্যে। পিস্তলের মুখে তিন চোরকে ওই খুঁটির কাছে নিয়ে গেল দুই পুলিশ। তিনজনকে মুখোমুখি দাঁড় করালো। তিন জোড়া হাতকড়া দিয়ে একজনের ডান হাতের সঙ্গে আরেকজনের বা হাত বেঁধে দিলো। খুঁটিটাকে কেন্দ্র করে ঘুরতে পারবে ওরা এখন। বসতে পারবে, দাঁড়াতেও পারবে, কিন্তু যেতে পারবে না কোথাও।
বাহ, ভালো বুদ্ধি করেছে, প্রশংসা করলো শ্রোপা। এবার যাওয়া দরকার। কাজ পড়ে আছে।
এক মিনিট, শোঁপা, লারমার বললো। এক সাথে কাজ করলেও তো পারি, আমরা। সুবিধে হয় তাহলে। জিনিসগুলো তাড়াতাড়ি খুঁজে বের করতে পারবো। কি বলো?
কি সুবিধে হবে? লারমারের কথায় গুরুত্বই দিলো না শোঁপা। তোমরা যতোখানি জানো, আমিও জানি। আমাকে ফাঁকি দিয়ে একাই মেরে দিতে। চেয়েছিলে। মারো এখন। তোমাদের সাথে কাজ করার কোনো দরকারই এখন। আমার নেই। দেখতেই পাচ্ছো, পুলিশ আমার সঙ্গে রয়েছে। নীল পোশাক পরা। দুজনকে বললো, ছেলেগুলোকে খোলো। হ্যারি ক্লকের বাড়িতে যেতে হবে: আবার।
কিছুক্ষণ পর গ্যারেজ থেকে বেরিয়ে এলো তিনজন লোক, আর তিন। কিশোর। কালো একটা সেডান গাড়িতে চড়ে স্বাভাবিক গতিতে এগিয়ে চললো হলিউডের রাস্তা ধরে।
আপনমনেই হাসলো শোঁপা।
কি ভাবছো? পাশে বসা কিশোরকে জিজ্ঞেস করলো সে। নিশ্চয় আশা ছেড়ে দিয়েছিলে। আমার গাড়িটা হারিয়ে যেতে দেখে।
হ্যাঁ, তা দিয়েছিলাম, স্বীকার করলো কিশোর। চমকে গিয়েছিলাম জানালায়। পুলিশ দেখে। সত্যি বলবো? অসমাপ্ত কাজ পছন্দ নয় আমার। সব শেষ করে গিয়ে পুলিশ ডাকার আলাদা মজা…
জোরে হেসে উঠলো শোঁপা। পুলিশ, না? ভেবো না, তোমার মজা নষ্ট হয়নি। ওরা পুলিশ নয়। পুলিশের পোশাক পরে আছে। পুরনো কাপড়ের দোকান থেকে ওরকম ইউনিফর্ম সহজেই জোগাড় করা যায় আজকাল সেই যে প্রবাদ। আছে নাঃ বাইরের চেহারা দেখে ভুলো না। হাহ্ হাহ্ হা!
ঢোক গিললো কিশোর। তেতো হয়ে গেল মন। তাকে কেউ বোকা বানিয়ে আনন্দ পাক, এটা সহ্য করতে পারে না সে। শোঁপার প্রতি তার বিদ্বেষ বাড়লো।
টিম, গায়ের সঙ্গে চেপে বসা টিমকে বললো কিশোর। মিস্টার শোঁপার সঙ্গে চুক্তি হয়েছে আমার। তোমাকে আর রবিনকে মুক্ত করবেন। তার কথা তিনি রেখেছেন। আরও একটা কাজ করার কথা দিয়েছেন তিনি, তোমার বাবাকে নির্দোষ প্রমাণ করবেন।
করবেন? প্রায় চেঁচিয়ে উঠলো টিম। ইস্, কি ভালোই না হতো!
ভেবো না, শোঁপা বললো, হয়ে যাবে। আমি যখন হাত দিয়েছি…শোঁপার জন্যে কঠিন কিছুই নেই। হ্যাঁ, কিছু কথা তোমাদের জানানো দরকার। কিশোর, নিশ্চয় আন্দাজ করতে পারছো, হ্যারি কুক ভালো লোক ছিলো না। বাইরে অভিনেতার খোলস, আসলে ছিলো চোরের সর্দার। দামী দামী ছবি চুরি করে সেগুলো ধনী ক্রেতার কাছে বিক্রি করা ছিলো তার দলের কাজ।
হুঁ, সে-জন্যেই, বলে উঠলো রবিন, নাম পাল্টে রহস্যময় আচরণ করতো ক্লক। চোর ছিলো, বলেই। চুরি করে এনে রান্নাঘরে ছবিগুলো তাহলে সে-ই লুকিয়েছিলো।
চুরি হয়তো সে করেনি, অন্য কেউ করে এনে তার হাতে দিয়েছে। অনেক সহকারী ছিলো তার। ডিংগো তাদের একজন। আগে জকি ছিলো। জকি মানে, জানো তো? রেসের ঘোড়ার পেশাদার ঘোড়সওয়ার। ডিংগোর আরও সহকর্মী ছিলো। সব কজন অসৎ। ফলে মাঠ থেকে বের করে দেয়া হলো ওদেরকে। ছোট হালকা শরীর, জানালা দিয়ে সহজেই ঢুকতে পারে। তাই ওদেরকে বেছে নিলো ক্লক। ছবি চুরি করে এনে ক্লকের কাছে দিতো ওরা। ক্লক সেগুলো নিয়ে গিয়ে বিক্রি করতো ধনী দক্ষিণ আমেরিকানদের কাছে। যাদের কাছে বেচতো, তারাও লোক সুবিধের না।
বছর দুই আগে কয়েকটা ছবি চুরি করার পর বেশি গোলমাল শুরু করলো পুলিশ। ওগুলো পাচার করার সুযোগ পেলো না ক্লক। যার কাছে বিক্রি করার কথা, ছিলো, সেই লোকটা জড়িয়ে পড়লো রাজনৈতিক গণ্ডগোলে, ধরে তাকে জেলে। ভরে দিলো তার দেশের সরকার। ছবিগুলো লুকিয়ে ফেলতে বাধ্য হলো ক্লক। ইচ্ছে ছিলো, সময় সুযোগমতো পরে কারো কাছে বিক্রি করবে। ইতিমধ্যে ঠাণ্ডা হয়ে আসবে পরিস্থিতি।
ডিংগো আর মারকোর টাকা দরকার। কয়েক দিন পর আরও তিনটে ছবি চুরি করে আনলো ওরা। আগেরগুলোই বিক্রি করতে পারেনি ক্লক, আরও তিনটে নিয়ে কি করবে? কিন্তু সে-কথা শুনতে চাইলো না দুই চোর। ওরা চাপাচাপি শুরু করলো টাকার জন্যে। ক্লককে বললো, টাকা দিতে না পারলে ছবিগুলো ফেরত দিয়ে দিক। আগের পাঁচটা ছবি লুকিয়ে ফেলেছে ক্লক, বের করতে চাইলো না। দশ লাখ ডলারের মাল, কে হাতে পেয়ে ফেরত দিতে চায়?
একটা রফা হয়তো হয়ে যেতো, কিন্তু কাকতালীয় একটা ব্যাপার ভণ্ডুল করে দিলো ক্লকের সমস্ত পরিকল্পনা। পুলিশের চোখ পড়লো টিমের বাবার ওপর। শেষ তিনটে ছবি চুরির ব্যাপারে তাকে সন্দেহ করে বসলো ওরা। এটা বুঝতে পেরে এক চাল চাললো ক্লক। ছবিগুলো লুকিয়ে রাখলো রান্নাঘরে। যাতে ওগুলো খুঁজে পায় পুলিশ, দোষ চাপে গিয়ে বেকার ডেলটনের ঘাড়ে।
আ-আমার বাবাকে ফাঁসিয়েছে! ক্লঅক! তিক্ত কণ্ঠে বললো টিম, বিশ্বাস করতে পারছে না। অথচ আমি আর মা ভাবতাম কতো ভালো মানুষ!
এই দুনিয়ায় লোক চেনা মুশকিল! হ্যাঁ, তোমার বাবাকে ক্লকই ফাঁসিয়েছে। এর কিছুদিন পরই রহস্যজনক ভাবে নিরুদ্দেশ হয়ে গেল। আমার বিশ্বাস, টাকার জন্যে চাপ দিচ্ছিলো ডিংগো, মারকো আর লারমার। দিতে পারেনি বলেই পালিয়েছিলো ক্লক। দক্ষিণ আমেরিকাতে লুকিয়েছিলো। পুলিশ আর সহকারীদের চোখে ধুলো দিলেও আমাকে ফাঁকি দিতে পারেনি। দুনিয়ার সব জায়গায় লোক আছে আমার।
যোগাযোগ করলাম ওর সাথে। চুক্তিতে আসতে চাইলাম। ঘঘাড়েল লোক, কিছুতেই রাজি হলো না। রাগ করে চলে এলাম। নিজেই খুঁজে বের করার চেষ্টা, করলাম ছবিগুলো। কিছু দিন পর অসুখে পড়লো ক্লক। ডাক্তার বলে দিলো, বাঁচবে না। লোকের মুখে শুনলাম, টিমের বাবার জন্যে অনুতপ্ত সে। তাদের জন্যে কিছু করতে চায়। অদ্ভুত কতগুলো মেসেজ লিখে কয়েকজন বন্ধুর কাছে পাঠালো। সেই সাথে একটা আজব চেঁচানো ঘড়ি। এর কিছু দিন পর মারা গেল সে।
ঘড়ি আর মেসেজগুলো কেন পাঠালো, জানেন? রবিন জিজ্ঞেস করলো। তার চেয়ে পুলিশের কাছে একটা চিঠি লিখে সব বলে দিলেই কি ভালো হতো না? নির্দোষ জানলে টিমের বাবাকে ছেড়ে দিতে পুলিশ, হয়তো বিনা দোষে জেলে পাঠানোর জন্যে ক্ষতিপূরণও দিতো।
আসলে ক্লক লোকটাই ছিলো জটিল। সহজ কাজ সহজভাবে না করে খালি প্যাঁচের মধ্যে যেতো। তবে কেন করেছে, তারও নিশ্চয় কোনো কারণ আছে। সবগুলো মেসেজের সমাধান হলেই বুঝতে পারবো।
মেসেজ তো পুড়িয়ে ফেলেছে, মনে করিয়ে দিলো কিশোর। মানে আর বের করবেন কিভাবে?
কেন, মনে নেই? একবার পড়লেই তো সব মনে থাকে তোমার, উৎকণ্ঠা। চাপা দিতে পারলো না শোঁপা, প্রকাশ পেয়ে গেল কণ্ঠস্বরে।
প্রথম দুটো মনে আছে, কিন্তু তৃতীয়টার মানেই বের করতে পারিনি। অর্ধেকটা আমার কাছে, বাকি অর্ধেক লারমারের…প্রথম মেসেজটাতে লিখেছেঃ আই সাজেস্ট ইউ সী দা বুক। দ্বিতীয়টাতেঃ ওনলি আ রুম হোয়্যার ফাদার টাইম হামস।
বই? কিসের বই? ঘড়ি কোন ঘরে গুঞ্জন করে, সেটা বোঝা সহজ। জানি আমরা। আমার মনে হয়, ওই ঘরটায় গেলেই সব রহস্যের সমাধান হয়ে যাবে।
মোড়ের কাছে গাড়ি রাখতে বললো শোঁপা।
নেমে সবাই হেঁটে চললো ক্লকের বাড়ির দিকে। ওদেরকে বাড়ির ভেতরে নিয়ে এসে মায়ের খোঁজে চললো টিম। মাআ! মাআ! বলে ডাকলো।
ভাঁড়ার ঘর থেকে শব্দ শোনা গেল। দরজায় জোরে জোরে কিল মারছে।
দরজার বাইরের হুড়কো খুলে দিলো, টিম। সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা খুলে বেরিয়ে এলো তার মা। তুই এসেছিস, টিম! ওই শয়তান লারমার আর সঙ্গীরা! আটকে ফেললো ভাঁড়ারে.. .আরে, পুলিশ নিয়ে এসেছিস দেখি। ভালোই হয়েছে। এখুনি ব্যাটাদের অ্যারেস্ট করতে বল।
ওদের ব্যবস্থা হয়েছে, ম্যাডাম, টিমের মায়ের সামনে এসে ফরাসী কায়দায় বাউ করলো শোঁপা। আপনাদের ভালো চাই।
মা, ইনি মিস্টার শোঁপা। বলছেন, বাবা নাকি নির্দোষ।
তাই নাকি? ইনি জানেন আমার স্বামী নিরপরাধ?
জানি, ম্যাডাম। তবে সেটা পুলিশের কাছে প্রমাণ করতে হরে। আর সেই প্রমাণ রয়েছে মিস্টার ক্লকের ঘরে। ও, ক্লক কে জানেন না বোধহয়। রোজার, জেমস রোজার। তার আরেক নাম হ্যারিসন ক্লক। লাইব্রেরির কিছু জিনিস নষ্ট করতে হতে পারে, সবই আপনাদের ভালোর জন্যে। আপত্তি আছে?
আপত্তি! মোটেই না। তবু টিমের বাবাকে ছাড়িয়ে আনুন।
থ্যাংক ইউ। আপনি এখানেই থাকুন। রবিন, টিম, তোমরাও থাকো। আমরা ঢুকি। শোনো, কারো সাথে যোগাযোগ করবে না। ফোন এলে ধরবে না। ঠিক আছে?
ধরবো না, টিমের মা বললো। ছেলেদের নিয়ে রান্নাঘরে যাচ্ছি আমি। খেয়েছি সেই কখন। খিদেয় পেট জ্বলছে। আপনারা যান, মিস্টার শোঁপা।
মহিলাকে আরেকবার ধন্যবাদ দিয়ে কিশোরের দিকে ফিরলো শোঁপা। চলো, পথ দেখাও।
.
ঐদিকে যখন মহা-উত্তেজনা, মুসা ওদিকে ড্রইং রুমে বাবার সঙ্গে বসে টেলিভিশন দেখছে। চোখই শুধু রয়েছে পর্দায়, মন বসাতে পারছে না। হ্যারিসন ব্লক আর তার আজব ঘড়ির কথা ভাবছে।
বাবা, জিজ্ঞেস করলো মুসা, হ্যারিসন ক্লকের নাম শুনেছো? রেডিওতে নাটক করতো। নানারকম চিৎকার করতো আরকি।
হ্যারিসন ক্লক? চিনি। তেমন পরিচয় ছিলো না। গোটা দুই ছবির শুটিং করার সময় দেখা হয়েছে তার সঙ্গে। চেঁচাতে পারতো! রক্ত ঠাণ্ডা করে দিতো। একেবারে। পুরানো একটা নাটকে এক কাণ্ড করেছিলো সে।
কাণ্ড! আনমনে হাত বাড়িয়ে সামনের টেবিলে রাখা প্লেট থেকে কয়েকটা পোট্যাটো চিপসতুলে মুখে পুরলো মুসা। কি কাণ্ড, বাবা?
অ্যাঁ? মুসার কথায় মন নেই বাবার। ওয়েস্টার্ন ছবি হচ্ছে টিভিতে। কাহিনীতে গতি এসেছে।
আরার একই প্রশ্ন করলো মুসা।
পর্দা থেকে চোখ না সরিয়ে অনেকটা অন্যমনস্ক হয়েই জবাব দিলেন মিস্টার আমান।
চোখ মিটমিট করলো মুসা। তার বাবা এখন যে তথ্যটা জানালেন, নিশ্চয় জানে না কিশোর। মেলাতে পারছে না মুসা, কিন্তু মনে হচ্ছে, কোথায় একটা যোগসূত্র রয়েছে। কিশোর হয়তো বুঝবে। ডাকবে নাকি? বলবে? তথ্য মূল্যবান হলে, কাঁচা ঘুম থেকে ডেকে তুললেও কিছু মনে করবে না কিশোর।
দ্বিধা করছে মুসা। এই সময় বলে উঠলেন মিস্টার আমান, অনেক রাত হয়েছে। যাও, ঘুমাতে যাও।
যাচ্ছি।
সিঁড়ির গোড়ায় পৌঁছতে না পৌঁছতেই হাই উঠতে আরম্ভ করলো তার। ভাবলো, থাক এখন। সকালে জানালেই হবে কিশোরকে।
.
লাইব্রেরিতে ঢুকেই কাজে লাগলো শোঁপা, মুহূর্ত সময় নষ্ট করলো না। দুই সহকারীকে দরজা-জানালার সমস্ত পর্দা টেনে দিতে বলে, নিজে গিয়ে আলো জ্বাললো। চোখ বোলালো সারা ঘরে।
শত শত বই, নিজে নিজেই কথা বলতে লাগলো। তিনটা পেইনটিং, বাজে। বড় একটা আয়না। অনেক ঘড়ি। দেয়ালে কতগুলো খোপ, বহু জিনিস রাখা যাবে। মেসেজে বলেছে, বইয়ে দেখার জন্যে। দ্বিতীয়টাতে বলেছে, ঘড়ির ঘরে খুঁজতে। তৃতীয়টায় বলেছে…কিশোর, দেখি তো তোমার অর্ধেকটা।
বের করে দিলো কিশোর।
নম্বরগুলো দেখতে দেখতে ভুরু কুঁচকে গেল শোঁপার। কোন পাতা, আর কতো নম্বর শব্দ, সেটা বোঝাতে চেয়েছে। বইটা পেলে কয়েক মিনিটের ব্যাপার। কিন্তু কোন বই? কিশোর, কোন্ বইয়ের কথা বলেছে?
বুঝতে পারছি না। বইটা হয়তো এ-ঘরেই আছে।
হুঁ, আমারও তা-ই মনে হয়। এসো না কয়েকটা খুঁজে দেখি।
কাছের তাকটা থেকে তিন-চারটে বই নামিয়ে উল্টে-পাল্টে দেখলো শোঁপা। তারপর আবার তুলে রেখে দিলো।
না, কিছুই বোঝা যায় না। এতো বই, কটা দেখবো? পুরো মেসেজটা থাকলে…তোমার মাথাটা খাটাও তো কিশোর। পারলে তুমিই পারবে।
নিচের ঠোঁটে জোরে জোরে চিমটি কাটতে আরম্ভ করলো কিশোর।
মিস্টার শোঁপা… কিছুক্ষণ পর বললো সে।
হ্যাঁ?
মেসেজগুলো হেনরি মিলারের জন্যে পাঠানো হয়েছিলো। তিনি হয়তো সমাধান করতে পারবেন। অন্তত কোনো সূত্র-টুত্র তো দিতে পারবেনই। নিশ্চয় বইটার নামও জানেন।
ঠিক বলেছো, তুড়ি বাজালো শোঁপা। ফোন করে জিজ্ঞেস করো।
কিন্তু তিনি তো হাসপাতালে।
অ্যাঁ! তাহলে? ঝুলে পড়লো শোঁপার চোয়াল, আর কোনো উপায়?
তার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করতে পারি। জানতেও পারেন।
যাও। জলদি করো।
রবিনকে দিয়ে বরং করাই। তার সঙ্গে মহিলার পরিচয় আছে, কথা হয়েছে।
মিসেস ডেলটনের সঙ্গে বসে তখন চা খাচ্ছে রবিন আর টিম।
কি হলো, কিশোর? কিছু পেয়েছো? রবিন জিজ্ঞেস করলো।
নাহ্। তোমাকে একটা কাজ করতে হবে, কি করতে হবে বুঝিয়ে বললো। কিশোর।
হলঘরে গিয়ে ডিরেক্টরি থেকে মিস্টার মিলারের নম্বর বের করে ডায়াল করলো রবিন। ফোন ধরলেন মিসেস মিলার, গলা শুনেই চিনতে পারলো সে। মেসেজের কথা বলে, বইটার কথা জিজ্ঞেস করলো। তিনি কি কিছু বলতে পারবেন?
ওপাশে কয়েক সেকেণ্ড নীরবতা, বোধহয় ভাবছেন মহিলা। তারপর বললেন, একটা বইয়ের নাম খুব মনে পড়ছে। বইয়ের কাহিনী ক্লকের, লিখেছে হেনরি। এতো বেশি আলোচিত হয়েছে, স্পষ্ট মনে আছে নামটা। আ স্ক্রীম অ্যাট মিডনাইট। চলবে?
নিশ্চয়! টেলিফোনেই চেঁচিয়ে উঠলো রবিন। থ্যাংক ইউ, থ্যাংক ইউ! রিসিভার রেখে খবরটা জানালো কিশোরকে।
চরকির মতো পাক খেয়ে ঘুরেই লাইব্রেরিতে ছুটলো কিশোর। পেছনে দৌড় দিলো শোঁপা। ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিলো।
বিভিন্ন তাকে মিনিট দুই খোঁজাখুঁজি করে বইটা বের করলো শোঁপা। এই যে, আ স্ক্রীম অ্যাট মিডনাইট, বাই হ্যারিসন ক্লক অ্যাণ্ড হেনরি মিলার। কপাল। খুলছে। মেসেজটা কোথায়? ছেঁড়াটা..হ্যাঁ, দেখি…তিন নম্বর পৃষ্ঠা, সাতাশ নম্বর শব্দ-কাগজ-কলম নাও…
দ্রত পাতা উল্টে তিন নম্বর পৃষ্ঠায় থামলো শোঁপা। শব্দটা লেখো…স্ট্যাণ্ড…তারপর হলো গিয়ে…
একের পর এক শব্দ বলছে শোঁপা, কিশোর লিখে নিচ্ছে।
শেষ হয়ে গেল মেসেজ। বইটা বন্ধ করে শোঁপা বললো, ব্যস, এইই। পড় তো, কি হয়েছে?
পড়লো কিশোর, স্ট্যাণ্ড ইন দা মিডল অভ দা রুম অ্যাট ওয়ান মিনিট টু মিডনাইট। হ্যাভ টু ডিটেকটিভস অ্যাণ্ড টু রিপোর্টারস উইদ ইউ। হোল্ড হ্যাঁণ্ডস, মেকিং আ সার্কল; অ্যাণ্ড কীপ অ্যাবসলুটলি সাইলেন্ট ফর ওয়ান মিনিট। অ্যাট মিডনাইট এক্সাক্টলি থেমে গেল সে। আর নেই।
ইসসি, আসল জায়গায় ছিঁড়ে ফেলেছে হারামজাদা! ঠিক মাঝরাতে কি ঘটবে? কি ঘটতে পারে? জানার কোনো উপায় নেই! মেসেজ পুড়িয়ে ফেলেছে। ক্লক মৃত। কে বলতে পারবে? জোরে নিঃশ্বাস ফেললো। অসাধারণ ধূর্ত ছিলো। লোকটা, ক্ষুরধার বুদ্ধি। ঠিক তার মতো করে কে ভাবতে পারবে?…এখন এক কাজ করা যায়। আরও ভালোমতো খুঁজতে হবে এঘরে। দরকার হলে দেয়াল ভেঙে ফেলবো। কিন্তু যদি এঘরে লুকানো না থাকে?
তাহলে আর জানা যাবে না কোনোদিন, চিন্তিত ভঙ্গিতে বললো কিশোর। হঠাৎ হাত তুললো, মিস্টার শোঁপা, দেয়ালের ওই ছবিগুলো নয় তো! আসল ছবির ওপর নতুন করে আঁকা…
না, এতো সহজের মধ্যে যাবে না ক্লক। তবু, দেখি।
একটা ছবি নামিয়ে প্রথমে খালি চোখে পরীক্ষা করে দেখলো শোঁপা। কিছু বোঝা গেল না। পকেটনাইফ বের করে ক্যানভাসের এক কোণায় রঙ চেঁছে তুলে ফেললো।
না, একেবারেই বাজে জিনিস, ঠোঁট বাঁকালো সে। বইয়েই খুঁজতে হবে। লুকানো চাবি-টাবিও রেখে যেতে পারে। এক ধার থেকে সব বই দেখবো।
দাঁড়ান! একটা বুদ্ধি এসেছে মাথায়।
কী?
মেসেজের বাকিটা উদ্ধার করতে পারবো মনে হচ্ছে।
কিভাবে!
বই থেকে শব্দ বাছাই করে মেসেজ তৈরির সময় অনেকেই শব্দের তলায় দাগ দিয়ে রাখে। সুবিধে হয়। মিস্টার ক্লকও ওরকম কিছু করে থাকলে…
আরি, খেয়াল করলাম না তো দাগ আছে কিনা! দেখি আবার? তাড়াতাড়ি আবার বইটা খুলে দেখলো শোঁপা। ঠিক! ঠিকই বলেছো তুমি। দাগ দিয়েছে। পেন্সিলের হালকা দাগ, এতো আবছা, প্রায় চোখে পড়ে না। দেখো।
বইটা হাতে নিয়ে এক এক করে পাতা ওল্টাতে শুরু করলো কিশোর, খুব ধীরে। মনোযোগ দিয়ে দেখছে প্রতিটি পাতার প্রতিটি লাইন। এবার কাগজ-কলম। নিয়েছে শোঁপা। অবশেষে একটা পাতায় থেমে একটা শব্দ বললো কিশোর। লিখে নিলো শোঁপা।
মোটা বই। অপরিসীম ধৈর্যের পরিচয় দিতে হলো কিশোরকে। দিলো। এসব কাজে কষ্ট করতে তার কোনো আপত্তি থাকে না।
শেষ পাতাটাও ওল্টানো শেষ হলো। আর শব্দ নেই। বই বন্ধ করলো কিশোর।
শেষ, না? শোঁপা বললো। প্রথম থেকে পড়ি। স্ট্যাণ্ড ইন দা মিডল অভ দা রুম অ্যাট ওয়ান মিনিট টু মিডনাইট। হ্যাভ টু ডিটেকটিভস অ্যাণ্ড টু রিপোর্টারস উইদ ইউ। হোল্ড হ্যাঁণ্ডস, মেকিং আ সার্কল, অ্যাণ্ড কীপ অ্যাবসলুটলি সাইলেন্ট ফর ওয়ান মিনিট। অ্যাট মিডনাইট এক্সাক্টলি দা অ্যালার্ম অভ দা স্ক্রীমিং ক্লক হুইচ আই সেন্ট ইউ শুড গো অফ। হ্যাভ ইট সেট অ্যাট ফুল ভলিউম। লেট দা স্ক্রীম কনটিনিউ আনটিল মাই হাইডিং প্লেস ইজ আনকাভারড।
পড়া শেষ করে মুখ তুলে তাকালো শোঁপা। কিছু বুঝলে?
ভুরু কুঁচকে ভাবছিলো কিশোর, দাঁত দিয়ে নখ কাটছে, শোঁপার প্রশ্নে মুখ। তুললো। উঁম?
আবার একই প্রশ্ন করলো শোঁপা, কিছু বুঝলে?
মানে তো সহজ, মুখ থেকে আঙুল সরালো কিশোর। মাঝরাতের এক মিনিট আগে, অর্থাৎ এগারোটা উনষাট মিনিটে ঘরের ঠিক মাঝখানে দাঁড়াতে বলা হয়েছে। দাঁড়ালাম। দুজন গোয়েন্দা আর দুজন সাংবাদিককে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে। গোয়েন্দা পাবো, কিন্তু সাংবাদিক আনা সম্ভব না। নাকি?
না, সম্ভব না, মাথা নাড়লো শোঁপা।
তারপর বলছে, হাত ধরাধরি করে একটা চক্র তৈরি করে নীরবে অপেক্ষা। করতে। আসলে নীরবে অপেক্ষা করাটাই আসল কথা, হাত ধরাধরিটা কোন ব্যাপার নয়। ওরা বেশি নাটকীয়তা, নাটকের লোক তো, সেজন্যেই ওরকম করতে বলেছে। না করলেও হয়তো চলবে। বলছে, ঠিক বারোটায় বাজবে অ্যালার্ম ক্লক, যেটা হেনরি মিলারের কাছে পাঠিয়েছিলো। বাজবে মানে চিৎকার করে উঠবে আর কি। এই রাত বারোটার ব্যাপারটারও কোনো মানে নেই, আমার বিশ্বাস। এটাও নাটকীয়তা, রহস্য গল্পের রহস্য বাড়ানোর হাস্যকর প্রচেষ্টা-ঠিক রাত বারোটা, কিংবা মধ্যরাত, যেন সন্ধ্যা আটটা কিংবা ভোর চারটেয় হলে রহস্য জমে না। যত্তোসব! হ্যাঁ, যা বলা হয়েছে, ঘড়ি তো চিৎকার করবে, ভলিউম পুরো বাড়িয়ে দিতে হবে ওটার। চিৎকার করিয়ে যেতে হবে যততক্ষণ না ক্লকের গোপন জায়গা বেরিয়ে পড়ে।
তোমার ধারণা, চেঁচানো ঘরিটাতেই রয়েছে রহস্যের চাবিকাঠি?
সরাসরি জবাব দিলো না কিশোর। ঘুরিয়ে বললো, হতে পারে, এমন কোনো মেকানিজম রয়েছে গোপন জায়গাটায়, চিৎকারের শব্দে সক্রিয় হয়ে উঠবে। সরে যাবে কোনো লুকানো প্যানেল-ট্যানেল বা দরজা। শব্দের সাহায্যে তালা খোলা তো আজকাল কোনো ব্যাপারই নয়। কিছু তালা আছে, আপনি ভালো করেই জানেন, মালিককে কাছে গিয়ে শুধু বলতে হয় খোলো, ব্যস, খুলে যায়। মিস্টার ক্লকের কণ্ঠস্বরও বোধহয় ওরকম কিছুই করবে।
হ্যাঁ, এটা সম্ভব, মাথা দোলালো শোঁপা। শব্দের সাহায্যে অনেক তালা খুলেছি আমি।
ঘড়িটা কোথায়? নিয়ে আসুন, চেষ্টা করে দেখি।
নেই। নষ্ট করে ফেলেছি।
নষ্ট করে ফেলেছেন!
হ্যাঁ, বললাম না, খুলে ফেলেছি। যন্ত্রপাতি কোথায় যে কোনটা ফেলেছি…মাঝে মাঝে এমন গাধামো করি না..অন্য কি করা যায়, বল।
আর কি করবেন? হতাশ ভঙ্গিতে দুহাত নাড়লো কিশোর। হবে না।
হতেই হবে! দরকার হলে ঘর ভেঙে ফেলবো আমি। এক সহকারীর দিকে ফিরে আদেশ দিলো, বিল, যন্ত্রপাতি। কুইক!
.
লাইব্রেরি বলে আর চেনা যায় না এখন ঘরটাকে। হাতুড়ি, বাটালি, ড্রিল মেশিন, কুড়াল আর শাবল নিয়ে আক্রমণ করেছিলো শোঁপার লোকেরা। প্রথমেই তাক থেকে সমস্ত বই নামিয়ে মেঝেতে স্তূপ করেছে। তারপর নামিয়েছে ছবিগুলো আর আয়না। দেয়ালের এক ধার থেকে খোঁজা আরম্ভ করেছে, ফাপা জায়গা, কিংবা গোপন ফোকর আছে কিনা দেখেছে। দেয়ালের কয়েকটা তাকও ভেঙে টেনেটুনে নামিয়েছে। ধারণা ছিলো, লুকানো দরজা-টরজা বা দেয়াল আলমারি থাকতে পারে। ছাতও বাদ রাখেনি। অনেক জায়গার আস্তরণ খসিয়ে ফেলেছে। মোট কথা, ধসিয়ে দেয়াটা বাকি রেখেছে শুধু।
কিন্তু নিরাশ হতে হয়েছে ওদেরকে, ব্যর্থ হয়েছে চেষ্টা। কিছুই পায়নি। কিচ্ছু। লুকানো ফোকর, দরজা, কিংবা দেয়াল আলমারির চিহ্নও নেই। ছবি লুকিয়ে রাখার মতো কোনো জায়গা-ই নেই।
প্রচণ্ড হতাশা রাগিয়ে দিয়েছে শোঁপাকে।
শেষ পর্যন্ত পারলাম না, আঁ! কপালের ঘাম মুছলো সে। হেরে গেলাম। ক্লকের কাছে? বিশ্বাসই করতে পারছি না! কোথায় লুকালো? কোথায়?
তার মানে টিমের বাবাকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পারছেন না? কিশোর প্রশ্ন করলো।
ছবিগুলো না পেলে কি করে করি? তোমার চোখের সামনেই তো খোঁজা হলো।…আর কোনো উপায়? বুদ্ধি-টুদ্ধি কিছু?
নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটতে শুরু করলো কিশোর। আনমনে মাথা দোলালো কিছুক্ষণ। মিস্টার শোঁপা, বাঁ হাতের তালুর দিকে তাকিয়ে আছে সে। ঘড়ি নষ্ট হয়েছে বটে। কিন্তু চিৎকারটা বোধহয় হয়নি।
মানে? দুই লাফে কাছে চলে এলো শোঁপা।
চেয়ারে হেলান দিয়ে কয়েক সেকেণ্ড পা দোলালো কিশোর। ধীরে ধীরে বললো, মিস্টার শোঁপা, হিরাম বারকেনের কাছে অনেকগুলো টেপ আছে। রেডিওর নাটক রেকর্ড করে রেখেছেন। হ্যারিসন কক যতগুলোতে কণ্ঠ দিয়েছে, সব। তার মধ্যে আ স্ক্রীম অ্যাট মিডনাইটও নিশ্চয় আছে। ঘড়ির মধ্যে যে চিৎকারটা ঢুকিয়ে দিয়েছিলো, সেটা কোনো নাটকেরও হতে পারে। মানে, ওরকম ভাবে চিৎকার করেছিলো হয়তো কোনো নাটকে। তাহলে টেপ বাজালেই সেই চিৎকার পেয়ে যাবো আমরা। এখন, মিস্টার বারকেন দয়া করে টেপগুলো আর রেকর্ডারটা দিলেই হয়। ঘড়ি আর দরকার হবে না আমাদের।
এখুনি, এক্ষুণি ফোন করো তাকে! চেঁচিয়ে উঠলো শোঁপা। দপদপ করে লাফাচ্ছে কপালের একটা শিরা। সময় খুব কম।
হলঘরে এসে বারকেনকে ফোন করলো কিশোর।
শুনে প্রথমে অবাক হলেন বারকেন। বুঝিয়ে বললো কিশোর।
হ্যাঁ, এবার বুঝেছি, বললেন তিনি। কোন চিৎকারটার কথা বলেছো, তা-ও বুঝেছি। ঠিক যেটা চাইছো, সেটাই দিতে পারবো। ওই চিৎকারই বিখ্যাত করেছিলো হ্যারিকে। আমি টেপটা বের করে রাখছি। মেশিনও রেডি রাখবো। এসে নিয়ে যাও। তবে কথা দিতে হবে, পরে সমস্ত ঘটনা আমাকে খুলে বলবে। রহস্যটা দারুণ ইনটারেসর্টিং।
কথা দিলো কিশোর। বললো, একজন লোক পাঠাচ্ছে, টেপ আর রেকর্ডার আনার জন্যে।
রান্নাঘর থেকে এসে রবিন, টিম আর মিসেস ডেলটনও কিশোরের কথা শুনছিলো। তার সঙ্গে লাইব্রেরিতে চললো। ঘরটার অবস্থা দেখে চমকে গেল ওরা।
হায় হায়, করেছে কি? মাথায় হাত দিলো রবিন। একেবারে লণ্ডভণ্ড…তা, কিছু পেলে?
এখনও পাইনি, কিশোর বললো।
বাড়ি ভাঙার চেষ্টা হয়েছিলো নাকি! মিসেস ডেলটনের চোখ বড় বড় হয়ে গেছে। এই কাণ্ড করবে জানলে কক্ষণো খোঁজার অনুমতি দিতাম না।
আপনার স্বামীকে বাঁচানোর চেষ্টাই করছি আমরা, মিসেস ডেলটন, শোঁপা বললো। প্রমাণ খুঁজছি। নির্দোষ যে, এটা প্রমাণ করতে হবে আদালতে। আর খুঁজতে মানা করছেন?
নষ্ট যা করার তো করেই ফেলেছেন। আর বাকিই বা আছে কি। খুঁজুন। দেখুন, প্রমাণ বেরোয় কিনা।
না, আর-কিছু ভাঙবো না। হলে এখন ভালোভাবেই হবে। তবে এই-ই শেষ চেষ্টা।
আপাতত আর কিছু করার নেই। টেপ আর রেকর্ডার এলে তারপর যা করার করবে। কাজেই বসে থাকতে হলো। গাড়ি নিয়ে মিক গেছে ওগুলো আনার জন্যে।
ঘন্টাখানেক পর ফিরলো সে। ভারি মেশিনটা নামিয়ে রাখতে রাখতে বললো, আরিব্বাপরে, দশ মন হবে! টেপ ঢুকিয়েই দিয়েছে এর মধ্যে। শুধু চালালেই হবে এখন।
কিশোর, শোঁপা বললো, চালাতে পারবে এটা?
পারবো। উঠে এসে চামড়ার বাক্স থেকে মেশিনটা বের করলো কিশোর। সকেটে প্লগ ঢুকিয়ে কানেকশন দিলো। ভুল হয়ে গেছে। এতোক্ষণ শুধু শুধু বসে না থেকে ঘরটা গুছিয়ে ফেলতে পারতাম। ঠিক আগের মতো হবে না, যতোটা পারা যায় আরকি। ছবিগুলো জায়গা মতো ঝোলাতে হবে, আয়নাটা আগের জায়গায়। বইগুলো তাকে।
প্রতিবাদ করতে গিয়েও কি ভেবে থেমে গেল শোঁপা। সঙ্গীদের নির্দেশ দিলো কাজ করার।
আয়নাটা লাগালো ওরা। ছবিগুলো ঝোলালো। বই যতোগুলো সম্ভব, তুলে সাজিয়ে রাখলো তাকে, আর বুকশেলফে।
উহ্, অনেক সময় নষ্ট হয়েছে। নাও, শুরু করো, কিশোরকে বললো শোঁপা। দেখো, কিছু হয় কিনা।
টেপ চালু করে দিলো কিশোর। ভলিউম কমিয়ে রেখেছে। বসে থাকেনি সে। টেপটা চালিয়ে সেই জায়গায় নিয়ে এসেছে, যেখান থেকে শুরু হয়েছে চিৎকার। ওয়াইও করে সামান্য পিছিয়ে নিয়ে আবার প্লে-এর বোতামটা টিপে দিলো। বললো, সবাই চুপ, প্লীজ। একটুও শব্দ করবেন না।
সবাই নীরব হতেই ভলিউম বাড়িয়ে দিলো কিশোর।
নারী-পুরুষের কিছু সংলাপের পর চিৎকারটা হলো। তীক্ষ্ণ, কাঁপা কাঁপা, ভয়ঙ্কর। বদ্ধঘরে প্রতিধ্বনি তুললো। শেষ হলো ধীর লয়ে।
সবাই অধীর হয়ে আছে। ভাবছে, দেয়ালের কোথাও কোনো গোপন ফোকরের দরজা খুলে যাবে, কিংবা দেয়ালের কোনো জায়গায় ফাঁক দেখা দেবে। আরব্য উপন্যাসের আলিবাবার গুহার মতো।
সে-রকম কিছু ঘটলো না।
জানতাম, হবে না! উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে গিয়েছিলো, ধপ করে আবার বসে পড়লো শোঁপা। ঘাড় ডলছে। ওরকম কিছু থাকলে আগেই পেয়ে যেতাম। তেমন। জায়গা নেই এঘরে। ছবিগুলোও নেই।
আমার মনে হয়, আছে, হঠাৎ-আগ্রহে সামনে ঝুঁকে পড়লো কিশোর। একটা পরিবর্তন চোখে পড়েছে তার। বুঝতে পারছে, কোথায় লুকানো রয়েছে ছবিগুলো। আবার করে দেখি, বললো সে। ভলিউম বোধহয় আরও বাড়াতে হবে।
ভলিউম পুরো বাড়িয়ে দিলো কিশোর। টেপ রিওয়াইণ্ড করে প্লে-বাটন টিপলো।
ভীষণ চিৎকার যেন চিরে দিলো কানের পর্দা। চড়ছে…চড়ছে…চড়ছে..কানে আঙুল দিতে হলো সবাইকে।
এই সময় ঘটলো ঘটনাটা।
ভেঙে চুরচুর হয়ে গেল বড় আয়নাটা। ঝুরঝুর করে মেঝেতে ঝরে পড়লো কাঁচ। মাত্র এক সেকেণ্ডেই ফ্রেমে আটকানো কয়েকটা ছোট টুকরো ছাড়া আর সব পড়ে গেল।
আয়নার জায়গায় এখন দেখা যাচ্ছে উজ্জ্বল রঙের একটা ছবি। ওদের চোখের সামনেই গোল হয়ে মুড়ে মেঝেতে পড়ে গেল ওটা। পেছনে আরেকটা। ওটাও পড়লো। তার পেছনে আরও একটা। পর পর পাঁচটা ছবি পড়লো কাঁচের টুকরোর ওপর। ফ্রেমের পেছনের শক্ত পর্দা আর আয়নার মাঝখানে রাখা হয়েছিলো। ছবিগুলো।
অবশেষে বোঝা গেল চেঁচানো ঘড়িতে অ্যালার্মের জায়গায় চিৎকারের ডিস্ক লাগানোর কারণ।
ছুটে গেল শোঁপা। কাঁচের পরোয়া করলো না, মাড়িয়ে গিয়ে নিচু হয়ে তুলে নিলো একটা ছবি। কালোর পটভূমিকায় ঝলমল করে উঠলো গাঢ় লাল, নীল, সবুজ। এগুলোই! হ্যাঁ, এগুলোই! ফিসফিস করছে সে, যেন জোরে কথা বললে কাঁচের মতোই ছবিগুলোও চুরমার হয়ে যাবে। দশ লাখ ডলার..পেলাম…
ঝটকা দিয়ে খুলে গেল লাইব্রেরির ভেজানো দরজা। তীক্ষ্ণ কণ্ঠে আদেশ এলো, খবরদার, নড়বে না! হাত তোলো!
এক মুহূর্ত স্তব্ধ নীরবতা।
দরজার দিকে ঘুরে গেল সাত জোড়া চোখ।
দরজা জুড়ে দাঁড়িয়েছে দুজন পুলিশ। হাতে উদ্যত, রিভলভার। তাদের পেছনে উঁকি দিচ্ছে পুলিশ চীফ ইয়ান ফ্লেচারের মুখ। তার পেছনে মুসার বাবা মিস্টার রাফাত আমান। দুজন পুলিশের মাঝের ফাঁক বেড়ে গেল, ঠেলে সরিয়ে দেয়া হয়েছে তাদের। সেখানে দেখা দিলো আরেকটা মুখ। মাথার খুলি কামড়ে রয়েছে যেন বাঁকা তারের মতো চুল, খাটো করে ছটা। কুচকুচে কালো মুখ হাসিতে উদ্ভাসিত, ছবিগুলোর মতোই ঝলমল করছে ঝকঝকে সাদা দাঁত।
খাইছে, কিশোর, বলে উঠলো মুসা আমান। এক্কেরারে সময়মতো হাজির হয়ে গেছি, না? তা ঠিকঠাক আছো তো তোমরা? ঘুমোতে গিয়েছিলাম, বুঝলে। ঘুম এলো না। কেন যেন খালি দুশ্চিন্তা হচ্ছিলো তোমাদের জন্যে। তাছাড়া বাবা। একটা কথা বলেছে, খচখচ করছিলো মনে। তোমাকে বলার জন্যে অস্থির হয়ে উঠলাম। সকালের জন্যে আর বসে থাকতে পারলাম না। উঠে ফোন করলাম। তোমাদের বাড়িতে। শুনলাম রবিনদের বাড়ি গেছে। করলাম ওদের ওখানে। রবিনের মা বললো, রবিন তোমাদের ওখানে গেছে। ভাবলাম, হেডকোয়ার্টারে আছো। ফোন করলাম। ধরলো না, কেউ। সন্দেহ হলো। ছুটে গেলাম ওখানে। টেবিলের ওপর পেলাম তোমার নোট। ফোন করলাম এখানে। অনেকক্ষণ চেষ্টা করেছি। কেউ ধরলো না। তাড়াতাড়ি বাড়ি গিয়ে বাবাকে বললাম। তাকে নিয়ে। সোজা ছুটলাম থানায়। তারপর আর কি। পুলিশ নিয়ে চলে এলাম।
ঘরে ঢুকলেন ইয়ান ফ্লেচার। এগিয়ে এসে শোঁপার হাত থেকে নিয়ে নিলেন। ছবিটা। সাবধানে রাখলেন টেবিলে। একবার দেখেই মাথা নাড়লেন, চিনেছি। থানায় ফটো পাঠানো হয়েছিলো এটার। বছর দুই আগে এক গ্যালারি থেকে চুরি.: গিয়েছিলো। কিশোরের দিকে ফিরলেন। কালই বুঝেছি, ডেঞ্জারাস কোনো কেসে জড়িয়েছে। থানার কাছেই টিমের গাড়ি থেকে ঘড়ি চুরি হয়ে গেল! ভাগ্যিস মুসা। গিয়েছিলো, সময়মতো আসতে পেরেছি।
শোঁপার দিকে তাকালো কিশোর। ধরা পড়েছে, অথচ বিন্দুমাত্র উদ্বেগ নেই চেহারায়। শান্ত। হাসছে। ফ্লেচারের অনুমতি নিয়ে হাত নামালো। সিগার বের করে ধরালো। ধোয়া ছেড়ে বললো, চীফ, অ্যারেস্ট তো করলেন। কিন্তু আমার অপরাধ জানতে পারি?
সেটা আবার বলতে হবে নাকি? মেজাজ দেখিয়ে বললেন চীফ। চোরাই মাল সহ হাতেনাতে ধরেছি। তাছাড়া অন্যের ঘরে বেআইনী ভাবে ঢুকে মালপত্র নষ্ট…
তাই? চীফকে থামিয়ে দিলো শোঁপা। জোরে জোরে দুবার টান দিলো সিগারে। সেটা আঙুলের ফাঁকে নিয়ে ওপরের দিকে মুখ করে হালকা ধোয়ার মেঘ সৃষ্টি করতে করতে বললো, অযথা লজ্জায় পড়তে যাবেন না, প্লীজ। খবরের কাগজ ওলারা আপনার চাকরি খেয়ে ছাড়বে। আর যদি কপাল গুণে চাকরিটা বেঁচেই যায়, অজাগা-কুজাগায় ট্রান্সফার এড়াতে পারবেন না। আমি বেআইনী কিছুই করিনি। কতগুলো চোরাই ছবি খুঁজে বের করতে এসেছি। যে-কেউ সেটা করতে পারে, পেলে পুলিশের হাতে তুলে দিয়ে বাহবা নিতে পারে। আমিও শুধু তা-ই করেছি। এই ছেলেগুলোকে জিজ্ঞেস করুন, কিশোর, রবিন আর টিমকে দেখালো সে। ওরা সাক্ষী। জিজ্ঞেস করুন, ওরাও আমার সঙ্গে খুঁজেছে কিনা?
কিন্তু মালপত্র নষ্ট…, খানিক আগের গলার জোর হারিয়েছেন ক্যাপ্টেন।
অনুমতি নিয়েই করেছি। মালিকের অবর্তমানে এই বাড়ি দেখাশোনার ভার রয়েছে এই মহিলার ওপর, টিমের মাকে দেখালো শোঁপা। তাকে বার বার জিজ্ঞেস করেছি আমি, খুঁজবো কিনা। ছবিগুলো পাওয়া গেছে। আপনারা এসেছেন। দয়া করে নিয়ে যেতে পারেন ওগুলো। আপনারা না এলে আমি নিজে গিয়ে পৌঁছে দিয়ে আসতাম। বিমল হাসি ছড়িয়ে পড়লো চিত্র-চোরের চেহারায়।
কিন্তু..কিন্তু কথা খুঁজে পাচ্ছেন না চীফ।
কিন্তুর কি আছে? জিজ্ঞেস করুন। সাক্ষীরা তো এখানেই আছে। ওরা মিথ্যে বলরে না। কিশোর, বলো না, আমি সত্যি বলছি, না মিথ্যে?
চোখ মিটমিট করলো কিশোর। অনিচ্ছাসত্ত্বেও বলতে হলো, হ্যাঁ, স্যার, মিস্টার শোঁপা ঠিকই বলছেন। চোরাই ছবি খুঁজে বের করতে আমরাও সাহায্য করেছি তাকে।
কিন্তু ও ফেরত দিতো না! রাগে চেঁচিয়ে উঠলেন ফ্লেচার। অসহায় ভঙ্গিতে থাবা মারলেন নিজের উরুতে। কিছুতেই দিতো না। নিয়ে পালিয়ে যেতো।
সেটা আপনার ধারণা, শান্তকণ্ঠে বললো শোঁপা। প্রমাণ করতে পারবেন ] তো, আমি এখন যাই। জরুরী কাজ আছে। আর যদি অ্যারেস্ট করে নিয়ে যেতে চান, নিতে পারেন। নিজেরই ক্ষতি করবেন শুধু শুধু।
দুই সহকারীকে হাত নামানোর ইঙ্গিত করলো শোঁপা। চলো! এখানে আর আমাদের দরকার নেই।
দাঁড়াও! চেঁচিয়ে উঠলো একজন পুলিশ। এতো সহজে ছাড়া পাবে না। পুলিশের পোশাক পরার অপরাধে ওই দুজনকে ধরতে পারি আমরা।
পারেন নাকি? হাই তুললো শোঁপা, যেন ঘুম ঠেকিয়ে রাখতে পারছে না। এই বিল, এদিকে এসো। ওনাকে দেখাও মনোগ্রামগুলো…
এন,ওয়াই-পি-ডি! অবাক হলেন চীফ।
হ্যাঁ, স্যার, বিনীত কণ্ঠে বললো শোঁপা। নিউ ইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্ট। এটা একটা নিছক রসিকতা। ওরা দুজনেই অভিনেতা, ভাড়া করেছি ছবিগুলো খোঁজায় সাহায্য করতে। জানেনই তো, নিউ ইয়র্ক এখান থেকে তিন হাজার মাইল দূরে, এই শহরে ওখানকার পুলিশের কাজ করার অধিকার নেই। করতে হলে আপনাদের অনুমতি নিয়ে করতে হবে। কাজেই, লস অ্যাঞ্জেলেসে নিউ ইয়র্ক পুলিশের ব্যাজ পরাটা বেআইনী কিছু নয়, আসলে কোনো ব্যাপারই নয় ওটা। ওরা নিউ ইয়র্কের আসল পুলিশ হলে অনুমতি না নেয়ার জন্যে আটকাতে পারতেন। আপনারা। অভিনয়ের জন্যে পারেন না। তা-ও পারতেন, যদি পুলিশের পোশাক পরে ধাপ্পা দিয়ে কারো কোনো ক্ষতি করতো। কিছুই করেনি ওরা।
ঢোক গিললো কিশোর। আরেকবার গাধা মনে হলো নিজেকে। অন্যদের, মতো সে-ও ঠকেছে, দুজনকে লস অ্যাঞ্জেলেসের পুলিশ মনে করে।
এই, চলো,,সহকারীদের বলে দরজার দিকে রওনা হলো শোঁপা।
বাঘের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন সেদিকে ক্যাপ্টেন। শক্ত হয়ে গেছে হাতের মুঠো।
দরজার কাছে গিয়ে ঘুরলো শোঁপা। হাসি হাসি মুখ করে বললো, কিশোর, চলি। তোমার সাথে কাজ করার মজাই আলাদা। আগেও বলেছি, আবার বলছি, আমার দলে চলে এসো। তোমার বুদ্ধি আর আমার অভিজ্ঞতা একসাথে হলে দুনিয়ার কোনো বাধাই বাধা থাকবে না আমাদের জন্যে। আসবে?
আপনি বরং আরেক কাজ করুন না, পাল্টা প্রস্তাব দিলো কিশোর। চুরি ছেড়ে গোয়েন্দা হয়ে যান। আমাদের সঙ্গে হাত মেলান। দুনিয়ার সব না হোক, কিছু চোর অন্তত চুরি ছাড়তে বাধ্য হবে। কিংবা হাজতে ঢুকবে।
স্থির দৃষ্টিতে এক মুহূর্ত কিশোরের দিকে তাকিয়ে রইলো শোঁপা। তারপর হাসলো। এ-কারণেই তোমাকে আমার পছন্দ, ইয়াং ম্যান। আই লাইক ইউ। চলি, আবার দেখা হবে।
আমার সঙ্গেও তোমার দেখা হবে, শোঁপা, কঠিন কণ্ঠে বললেন ফ্লেচার। কথা দিচ্ছি, এবারের মতো আর বোকামি করবো না তখন। অসময়ে হাজির হবো
তার দিকে চেয়ে সামান্য মাথা নুইয়ে, হেসে বেরিয়ে গেল শোঁপা।
.
২১.
চেঁচানো ঘড়ির কেসের বিবরণ লিখে শেষ করেছে রবিন। উপসংহারে লিখলোঃ
দক্ষিণ আমেরিকায় খোঁজ নিয়েছে পুলিশ। সত্যিই মারা গেছে হ্যারিসন ক্লক।
সেই গ্যারেজ থেকে ধরা হয়েছে ডিংগো, মারকো, আর লারমারকে। তেমনি। হাতকড়া পরা অবস্থায়ই ছিলো ওরা, ছুটতে পারেনি। নিজেদের অপরাধ স্বীকার করেছে। ব্লকই ছবিগুলো রান্নাঘরে লুকিয়েছিলো টিমের বাবাকে ফাঁসানোর জন্যে, এই জবানবন্দীও দিয়েছে আদালতে। জেল থেকে মুক্তি পেয়েছে বেকার ডেলটন।
আ স্ক্রীম অ্যাট মিডনাইট নাটকে চিৎকার করেছে ক্লক, সেই চিৎকারই ডিস্কে রেকর্ড করে ঘড়িতে ঢুকিয়েছে। নাটকটিতে একটা দৃশ্য ছিলো, চিকারের শব্দে চুরচুর হয়ে ভেঙে গেছে একটা আয়না। ছবি লুকানোর ক্ষেত্রে ওই কায়দাটাকেই কাজে লাগিয়েছে ধড়িবাজ ক্লক। তার জানা ছিলো, বিশেষ পরিবেশে, বিশেষ শব্দ তরঙ্গের জোরালো ধাক্কা সইতে পারে না পাতলা কাঁচ, ভেঙে যায়।
সেদিন রাতে, নাটকের ওই দৃশ্যটার কথাই বলেছিলেন মিস্টার রাফাত আমান। শুনে, মুসার মনে হয়, তথ্যটা জরুরী, কিশোরকে জানানো দরকার।
থুতনিতে কলমের মাথা ঠেকিয়ে কিছুক্ষণ ভাবলো রবিন। আর কোনো পয়েন্ট আছে? না, সবই লেখা হয়েছে। কিছু বাকি নেই। ফাইলটা বন্ধ করে, ফিতে বেঁধে, সযত্নে রেখে দিলো ফাইলিং কেবিনেটে। আগামী দিন এটা নিয়ে যাবে বিখ্যাত চিত্রপরিচালক মিস্টার ডেভিস ক্রিস্টোফারের অফিসে দেখা করার জন্যে।