একটা মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে মুনের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল জোসি। পরক্ষণে ঝটকা দিয়ে ঘুরে কেবিনের দিকে ছুটল। পিছনে ছুটল কিশোর ও মুসা। হুড়মুড় করে কেবিনের দরজা দিয়ে ঢুকে থমকে দাঁড়াল।
বিছানায় কুঁকড়ে পড়ে আছেন জেফরি। দুই হাতে পেট চেপে ধরে গোঙাচ্ছেন। পাশে বসা এরিনা। ভিজা কাপড় দিয়ে বার বার জেফরির কপাল মুছে দিচ্ছেন।
এগিয়ে গিয়ে জেফরির কাঁধে হাত রাখল জোসি। চাচীকে জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে?
মাথা নাড়লেন এরিনা। জানি না। হঠাৎ করেই বলল পেটে ব্যথা। তারপর থেকে বেড়েই চলেছে। বিছানায় থাকতে পারছে না।
আমার ভয় লাগছে, বলে কিশোর-মুসার দিকে তাকাল মুন। কিছু একটা করা দরকার।
উঠে দাঁড়ালেন এরিনা। জোসি, এ অবস্থায় তোমার চাচাকে আমার একা রেখে যাওয়া উচিত হবে না। বনে যাবে? কী আনতে হবে জানোই তো।
দরজার দিকে পা বাড়াতে গিয়ে ফিরে তাকাল জোসি।
কিশোরদের বলল, তোমরাও এসো। আমাকে সাহায্য করবে।
পায়ে চলা পথ ধরে বনের দিকে হাঁটতে হাঁটতে জিজ্ঞেস করল কিশোর, কোথায় যাচ্ছ?
বনে, জোসি বলল।
তা তো বুঝলাম, মুসা বলল। কী আছে ওখানে?
ভেষজ ওষুধ। চাচীর মা আর নানী খুব ভাল কবিরাজ ছিলেন। চাচী তাঁদের কাছ থেকেই কবিরাজি শিখেছে।
আর তুমি?
চাচীর কাছে।
ইণ্ডিয়ানদের অসাধারণ কবিরাজি জ্ঞানের কথা শুনেছে কিশোর। শত শত বছর নানারকম গাছ, পাতা আর শিকড়-বাকড় দিয়ে কঠিন কঠিন রোগের সফল চিকিৎসা করে আসছে তারা। ইদানীং বড় বড় ওষুধ কোম্পানিগুলোও ইণ্ডিয়ানদের এ সব ওষুধের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছে। এ সব ভেষজ সম্পর্কে বিশদভাবে জানতে গবেষক দল পাঠাচ্ছে ইণ্ডিয়ান অঞ্চলে।
বনের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মিনিট বিশেক পরেই কিশোর লক্ষ করল, গাছপালার চেহারা বদলে যাচ্ছে। পিছনে ফেলে এসেছে প্রুস গাছের ঘন জঙ্গল। সামনের জায়গাটা মোটামুটি পাতলা। বার্চ আর অ্যাসপেন গাছ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। স্নান সূর্যালোক চিকচিক করছে পাতাঝরা গাছগুলোর ডালে জমে থাকা বরফে।
বড় একটা ওক গাছ দেখাল জোসি। ওটার গোড়ার তুষার চেঁছে ফেলে দিলে এক ধরনের শ্যাওলা পাবে। তুলে নিয়ে এসো।
দৌড়ে গিয়ে কাজ শুরু করে দিল কিশোর ও মুসা। তুষার ফেলে দিতেই বেরিয়ে পড়ল বিচিত্র চেহারার শ্যাওলা। ভিজা মাটির গন্ধে ভরা। জোসি তখন অন্য জিনিস জোগাড়ে ব্যস্ত। বরফ খুঁড়ে এক জাতের চিরসবুজ উদ্ভিদ খুঁজে বের করল। উপড়ে নিল কয়েকটা গাছ। কালো রঙের চেরি-বার্ডের এক টুকরো বাকল কেটে নিল। এলডার ঝোপের শিকড় নিল। আর নিল দুই ধরনের গাছের দুটো নরম ডাল। এ গাছগুলো কিশোরের অচেনা।
কাজ শেষ করতে দশ মিনিট। দৌড়ে গ্লিটারে ফিরে চলল তিনজনে। ফেরার পথে গতি বেশি, কারণ ঢাল বেয়ে নামছে। কেবিনে ঢুকতে বিচিত্র সুবাস নাকে ঢুকল ওদের। স্টোভের ওপর কালো রঙের একটা কেটলিতে পানি ফুটছে, তাতে কিছু মিশিয়েছেন এরিনা, সেটার গন্ধই বেরোচ্ছে। জোসির হাত থেকে ব্যাগ নিয়ে ডাল-পাতা, শিকড়, বাকল, শ্যাওলাগুলো বের করে কেটলির পানিতে মিশানো শুরু করলেন।
কিশোর জিজ্ঞেস করল, জেফরি আঙ্কেল কীজন্য অসুস্থ হয়েছেন, আপনি বুঝতে পেরেছেন?
মাথা ঝাঁকালেন এরিনা। মনে হয়। আপেলটাতে বোধহয় খারাপ কিছু ছিল। ওটা খাওয়ার পর থেকেই পেটব্যথা শুরু।
আপনারা খাননি? আপনি আর মুন?
না। ও একাই খেয়েছে।
জোসি বলল, ঘরে আপেল আছে তাই তো জানতাম না।
ছিলও না, মুন জানাল। ইলকিস বিগ এক ঝুড়ি তাজা ফল উপহার দিয়ে গেছে।
মুসার দিকে তাকাল কিশোর। চোখে চোখে কথা হয়ে গেল। দুজনের মনে একই ভাবনা। জেফরিকে উপহার পাঠাল কেন বিগস? সে জানে বিরোধী দলের নেতা জেফরি। ফল পাঠানোটা ঘুষ না তো? ঘুষ হোক আর যা-ই হোক, মারাত্মক বিষে ভরা এই উপহার।
আপেলের মধ্যে বিষ ঢুকিয়ে দেয়নি তো বিগস? বিশ্বাস হতে চাইছে না কিশোরের। তবে উদ্দেশ্যটা বোঝা যাচ্ছে। জেফরি সহ তার পরিবারের লোকেরা অসুস্থ হয়ে পড়লে থিম পার্কের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলায় মনোযোগ দিতে পারবেন না তিনি। তাঁর কেবিন পোড়ানো, জো সারটনের নৌকা নষ্ট করা, সব এই পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ। ধরে নেয়া যায়, পার্কের সপক্ষের কেউ এই অকাজগুলো করেছে।
বছরের এ সময়ে তাজা ফল পেল কোথায় বিগস্? জোসির প্রশ্ন।
কেটলিতে চাপানো ওষুধ নাড়তে নাড়তে ফিরে তাকালেন এরিনা। নিশ্চয় প্লেনে করে এনেছে। আমরা মনে করেছিলাম আমাদের কেবিনের শোক ভোলাতে, আমাদের খুশি করতে ফলগুলো উপহার দিয়েছে বিগস্।
দেয়ার সময় কিছু বলেছে? জানতে চাইল মুসা।
ও নিজে নিয়ে আসেনি, এরিনা জানালেন।
টেডকে দিয়ে পাঠিয়েছে, মুন বলল।
এক মিনিট এক মিনিট, ভুরু কুঁচকে গেছে কিশোরের। টেড সিউল? ও আনতে গেল কেন?
মুন বলল, লুক স্টার্লিঙের অনুরোধে।
এরিনা বললেন, লুকের কাছ থেকে অর্ডার পেলে খাবার আর অন্যান্য জিনিস ফেয়ারব্যাংকস থেকে নিয়ে আসে ডিউক আইকহ্যাম। লুক তখন সেগুলো নিজেই যার যার ঠিকানায় পৌছে দেয় কিংবা টেডের মত কাউকে দিয়ে পাঠানোর ব্যবস্থা করে।
আরও প্রশ্ন করার জন্য মুখ খুলতে যাচ্ছিল কিশোর, হাত তুলে বাধা দিলেন এরিনা। মোটা একজোড়া দস্তানা পরে নিয়ে গরম কেটলিটা ধরে উঁচু করলেন। একটা মাটির পাত্রের মুখে পরিষ্কার এক টুকরো কাপড় রাখল মুন। তাতে কেটলির তরল পদার্থ ঢালতে লাগলেন এরিনা। কাপড়টা ছাঁকনি হিসেবে কাজ করল। মাটির পাত্র থেকে সেই তরল পদার্থ আবার বড় হাতায় করে চিনামাটির মগে নিলেন তিনি। তাতে সামান্য ঝর্নার পানি ঢেলে, অল্প একটু মধু মিশিয়ে ঠাণ্ডা করে নিয়ে গেলেন জেফরির কাছে।
বাবাকে বিছানায় উঁচু করে ধরল মুন। মগটা জেফরির ঠোটের কাছে ধরলেন এরিনা। ওষুধ খেয়ে আবার বিছানায় শুয়ে পড়লেন জেফরি।
এরিনাকে জিজ্ঞেস করল কিশোর, আচ্ছা, আন্টি, ফলের যে ঝুড়িটা দিয়ে গেল, তার মধ্যে কি নাম লেখা কোন কার্ড বা নোট ছিল?
ড্রেসারের ওপর থেকে একটা কার্ড নিয়ে এলেন এরিনা। কিশোরের হাতে দিলেন। দেখার জন্য কাত হয়ে এল মুসা। লেখা রয়েছে ইলকিস বিগস, ফিল্ড রেপ্রেজেনটেটিভ, থিম পার্ক। কার্ডের উল্টো দিকের সাদা অংশে হাতে লেখা কথাটার বাংলা মানে করলে দাঁড়ায়: অনেক শুভেচ্ছা। ইলকিস।
হ্যাঁ, কার্ডটা বিগসেরই, কোন সন্দেহ নেই, কিশোর বলল। কিন্তু জেফরি আঙ্কেলের নাম তো নেই কোথাও। এমনও তো হতে পারে কার্ডটা অন্য কাউকে দিয়েছিল বিগস। বিগসই উপহার পাঠিয়েছে বোঝানোর জন্য সেই লোক কার্ডটা ফলের ঝুড়িতে ভরে দিয়েছে।
টেড সিউলের মত কেউ? মুসার প্রশ্ন।
হতে পারে।
কিশোরের দিকে তাকাল জোসি। তুমি বলতে চাও ফলগুলোতেই গোলমাল?
ল্যাবরেটরি টেস্ট না করে শিওর হওয়া যাবে না। কিন্তু কোন কিছুর বিনিময়েই ওই আপেলে কামড় বসাতে রাজি নই আমি।
রাগে লাল হয়ে গেল জোসির মুখ। টেড যদি ভেবে থাকে আমার পরিবারের ওপর হামলা চালিয়ে, তাদের ক্ষতি করে ইডিরাটোড রেসে আমার অংশ নেয়া বন্ধ করাবে, মস্ত ভুল করছে ও। ওকে আমি ছাড়ব না।
ওর বাহুতে হাত রাখল মুন। জোসি, না জেনে কাউকে দোষারোপ করা ঠিক না। অন্য কেউও তো এ সব শয়তানি করে থাকতে পারে? টেড সিউলকে দোষী বানানোর জন্য।
ওর কথায় যুক্তি আছে, মনে মনে স্বীকার করল কিশোর।
পারলে কিছু একটা করো, এরিনা বললেন। আরও খারাপ কিছু ঘটে যাবার আগেই।
টেবিল থেকে ওষুধের মগটা তুলে নিয়ে আবার জেফরির কাছে গেলেন এরিনা। কেমন লাগছে এখন?
কোলাব্যাঙের স্বর বেরোল জেফরির গলা দিয়ে, ভাল।
আরেকটু দেব?
চোখ-মুখ কুঁচকে জেফরি বললেন, তোমার ওই ভয়াবহ জিনিস!
হাসলেন এরিনা। স্বাদটা খারাপ, তবে ওষুধ হিসেবে খুবই ভাল, অস্বীকার করতে পারবে না।
উঠে বসার চেষ্টা করলেন জেফরি। কাঁধ চেপে ধরে শুইয়ে দিলেন এরিনা। রেস্ট নাও। তোমার এখন বিশ্রাম দরকার।
সন্ধ্যার পর এরিনা বললেন, মুজের মাংসের কাবাব বানাব। আনতে পারবে?
উঠে দাঁড়াল মুসা। পারব।
কোথায় রেখেছেন? জানতে চাইল কিশোর।
আমাদের কেবিনের পিছনের ছাউনিতে, এরিনা বললেন। হুকে ঝোলানো আছে, আস্ত একটা রান। ছুরি, করাত সবই পাবে ওখানে।
লণ্ঠন জ্বেলে দিল জোসি। বাতি হাতে বাইরের অন্ধকারে বেরিয়ে এল কিশোর ও মুসা। উজ্জ্বল বড় বড় তারা মেরুর আকাশে ঘন হয়ে ফুটে আছে। কাছেই একটা পেঁচা ডাকল। মানুষের সাড়া পেয়ে ঝোপের মধ্যে ছুটে পালাল ছোট কোন জানোয়ার।
এ রকম সাধারণ একটা ছাউনির মধ্যে মাংস রাখে! মুসা বলল।
হাসল কিশোর। ভয় নেই। শীতকাল। নষ্ট হবে না। ছাউনির ভিতরের তাপমাত্রা এখন ডিপ ফ্রিজের চেয়ে কম নয়।
তারমানে মাংস জমাট বেঁধে বরফের মত শক্ত হয়ে গেছে। করাত ছাড়া কাটা যাবে না।
পোড়া কেবিনটার কাছে পৌঁছল ওরা। এখনও ধােয়ার গন্ধ বেরোচ্ছে। পাশ দিয়ে ঘুরে আসতে ছাউনিটা চোখে পড়ল। দরজা খুলল মুসা। ভিতরে ঢুকল দুজনে।
লণ্ঠন উঁচু করে ঘরের মধ্যে খুঁজতে লাগল কিশোর। বাঁয়ে একটা কাঠের বাক্স। তার ওপর রাখা চামড়ার স্তুপ, ফাঁদ পেতে ধরা হয়েছিল বুনো জানোয়ারগুলোকে। জমে শক্ত হয়ে গেছে। পিছনের দেয়ালে ঝোলানো কাঠ চেরাই করার একটা অনেক বড় করাত। চালাতে দুজন লাগে। বড় একটা বেতের ঝুড়িতে রাখা প্রয়োজনীয় নানারকম যন্ত্রপাতি।
সবই তো আছে দেখছি, কিন্তু মাংস কোথায়? চারপাশে তাকিয়ে খুঁজতে লাগল মুসা।
লণ্ঠনটা আরও উঁচু করে ধরল কিশোর। বিম থেকে বড় একটা হুক ঝুলছে। নিশ্চয় ওটাতেই ঝোলানো ছিল মাংসের টুকরো।
তাহলে এখন গেল কোথায়… কিশোর, দেখো!
মুসার কণ্ঠস্বর চমকে দিল কিশোরকে। চরকির মত পাক খেয়ে ঘুরে দাঁড়াল। ছাউনির কাঠের দেয়ালে কালো রঙ দিয়ে আঁকা একটা হৃৎপিণ্ড। মাঝখানে একটা ছুরি গাঁথা।
স্তব্ধ হয়ে ছুরিটার দিকে তাকিয়ে আছে দুজনে। দীর্ঘ একটা মুহূর্ত কেটে গেল। অবশেষে মুখ খুলল মুসা, মাংসের টুকরোটা হুক থেকে খুলে নিয়ে গেছে কেউ।
গম্ভীর হয়ে মাথা ঝাঁকাল কিশোর। মনে হয়।
কোন বুনো জানোয়ার অত ওপরে নাগাল পাবে না। নেকড়ে ততা পাবেই না, ভালুকেও পাবে না। তাহলে মানুষের খাবার চুরি করতে এল এ কোন জানোয়ার?
মানুষ-জানোয়ার, জবাব দিল কিশোর। খাওয়ার জন্য চুরি করলে মাপ করে দেয়া যেত। কিন্তু আমি শিওর, টিনুকদের ভয় দেখানোর জন্য করেছে। বোঝাতে চেয়েছে, দেখো, কত সহজেই আমি কত বড় ক্ষতি করে দিতে পারি। বসন্তকাল না আসা পর্যন্ত এখন না খেয়ে থাকো।
দেয়ালের কাছে গিয়ে ছবিটা শুকে দেখল কিশোর। তাজা রঙ। ঘণ্টা দুয়েক আগে এঁকেছে।
এক মুহূর্ত ভাবল মুসা। বলল, দুই ঘণ্টা আগে ফল নিয়ে এসেছিল টেড। ফলের ঝুড়ি রেখে ফিরে যাওয়ার সময় মাংসের টুকরোটা বের করে নিয়ে যাওয়া ওর জন্য সহজ।
যে কারও জন্যই সহজ। মাত্র কয়েক পা দূরে বন। ভিতর দিয়ে এলে কারও চোখে পড়বে না।
কিন্তু নিল কীভাবে? মুসার প্রশ্ন। মুজের একটা আস্ত রান কাঁধে করে বয়ে নিতে পারবে না। অনেক ওজন।
কম করে হলেও পঞ্চাশ কেজি। কিন্তু আমি ভাবছি টিনুকরা এখন খাবে কী? শিকারের মৌসুমের তো এখনও অনেক দেরি। কী যেন ভাবল কিশোর। চলল তো, বাইরে গিয়ে দেখি। কোন সূত্র পাই কি না।
কেরোসিন-লণ্ঠনের কাঁপা কাঁপা অতি সামান্য আলো। তবে চিহ্নটা খুঁজে বের করতে বেগ পেতে হলো না ওদের। এক ইঞ্চি চওড়া দুটো গভীর রেখা চলে গেছে বরফের ওপর দিয়ে। রেখা দুটোর মাঝখানের দূরত্ব দেড় ফুট।
ডগশ্রেজের দাগ না, মুসা বলল। তাহলে দাগের মাঝখানের দূরত্ব আরও বেশি হতো।
ঝর্না থেকে পানি আনতে গিয়েছিল মুন, মনে আছে? হাতে টানা একটা স্লেজ নিয়ে গিয়েছিল সে…
নীচের চোয়াল স্কুলে পড়ার অবস্থা হলো মুসার। কিশোর, তুমি মুনকে সন্দেহ করছ?
না না, তা করছি না, কিশোর বলল। তবে পানি আনার পর ছাউনির বাইরে রেখেছিল হয়তো স্লেজটা। আর তাতে করে মাংস বয়ে নিতে পারে চোর।
মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে ভালমত দাগগুলো দেখল মুসা। হ্যাঁ, স্টেজে করেই নিয়েছে। দেখো, ডানের রেখাটার চেয়ে বায়ের রেখাটা বেশি গভীর। বোঝার ভারে হয়েছে। আর বোঝা মানে মাংস। ভারী দিকটা রাখা ছিল গাড়ির বাঁ পাশে।
অন্ধকারে জোসির ডাক শোনা গেল, কিশোর? মুসা?
জোসি, আমরা এখানে, জবাব দিল মুসা।
জোসি এলে ওকে সব জানাল ওরা। অ্যাথাবাস্কান ভাষার তুবড়ি ছোটাল জোসি। একটা বর্ণও বুঝল না দুজনে।
এই দেখো, স্লেজের দাগ, লণ্ঠনটা উঁচু করে ধরল কিশোর।
ওকে অবাক করে দিয়ে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল জোসি। একটা রেখার ওপর গাল চেপে ধরল। উঠে দাঁড়িয়ে বলল, চাচার স্লেজ। চুরিটা করেছে সূর্য ডোবার ঠিক পর পর।
কী করে বুঝলে? কিশোরের প্রশ্ন।
রেখা ছুঁয়ে, জোসি বলল। চলো, দেখি চোরটা কোনদিকে গেছে।
বনের ভিতর দিয়ে পঞ্চাশ গজ মত এগিয়ে হাত তুলল জোসি। দাঁড়াও। ঝোপের মধ্যে কী যেন পড়ে আছে। কিশোর, লণ্ঠনটা বা দিকে উঁচু করো তো।
উঁচু করে ধরল কিশোর। চোখের পাতা সরু করে তাকাল মুসা। অন্ধকারে একটা কালো কী যেন পড়ে থাকতে দেখল।
হাসল জোসি। ওটাই আমাদের মুজের মাংস। যাক, রাতে আর খেয়ে থাকতে হবে না।
আস্ত একটা রান সহ এক পাশের অনেকখানি মাংস। টুকরোটা ছাউনিতে বয়ে নিল এল ওরা।
তোমরা কাটতে থাকো, আমি আসছি, ছাউনি থেকে বেরিয়ে গেল জোসি। দাগ ধরে ধরে চোরের সন্ধানে এগোল। কয়েক মিনিট পর ফিরে এসে জানাল, ওর কাছে যেতে পারলাম না। ভীষণ চালাক। স্লেজটা নেয়নি। ঝোপের মধ্যে মাংস ফেলে দিয়ে জেটা এনে রেখে গেছে আবার ছাউনির কাছে।
কিশোর বলল, আমি জানতাম, চুরির উদ্দেশ্যে চুরি করেনি চোর। ভয় দেখাতে চেয়েছে।
হ্যাঁ, জোসিও কিশোরের সঙ্গে একমত। চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল, প্রথমে আমাদের কেবিনে আগুন, তারপর জানালা দিয়ে লাকড়ি ছুঁড়ে মারা, তারপর আপেলে বিষ দেয়া, আর সবশেষে এই মাংস চুরি। কেউ একজন আমাদেরকে প্রচণ্ড ঘৃণা করে।
পরদিন সকালে জোসি ওর কুকুরগুলোকে দেখতে গেল, কিশোর ও মুসা চলল শহরে, রহস্যের তদন্ত করতে। প্রথমেই যার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল, সে ইলকিস বিগ্স্।
হাই, বয়েজ, দেখেই হাসিমুখে চেঁচিয়ে উঠল বিগ। তারপর? গ্লিটারে কেমন কাটছে সময়?
ভাল, জবাব দিল কিশোর। এই ফলের ঝুড়ির ব্যাপারে কিছু কথা ছিল।
বলে ফেলল। কীসের ফল?
ওই যে গতকাল আপনি যেটা পাঠিয়েছিলেন টিনুকদেরকে, মুসা বলল।
আমি ফল পাঠাইনি। তবে মনে করিয়ে দিয়ে ভালই করলে। ওদের তো সবই পুড়ে গেছে। কিছু খাবারটাবার পাঠানো উচিত। শুনলাম, কাল রাতে নাকি ওদের খাবারও চুরি করে নিয়ে যাচ্ছিল। এ সময়ে কারও মাংস চুরি যাওয়ার মানে ভয়ানক বিপদ। স্রেফ না খেয়ে মরতে হবে।
কিন্তু আপনি জানলেন কীভাবে? কিশোরের প্রশ্ন।
তোমাদেরকে তো আগেই বলেছি, এখানে খবর খুব দ্রুত ছড়ায়। ফলের ঝুড়ির কথা কী যেন বলছিলে?
এক ঝুড়ি তাজা ফল দিয়ে আসা হয়েছিল টিনুকদের বাড়িতে, তাতে আপনার কার্ড ছিল, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে বিগসের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে কিশোর। চেহারার কোন পরিবর্তন দেখল না। ওই ঝুড়ির আপেল খেয়ে অসুস্থ হয়ে গিয়েছিলেন জেফরি আঙ্কেল। প্রায় মরার দশা।
কঠিন হয়ে গেল বিগসের দৃষ্টি। তোমরা কী বলতে চাও, বুঝতে পারছি। কিন্তু কাল কাউকে ফল পাঠাইনি আমি,
তাহলে ঝুড়িতে দেয়া কার্ডটা? মুসার প্রশ্ন।
গ্লিটারের অর্ধেক লোকের কাছেই আমার কার্ড আছে, বিগ বলল। যে কেউ আমার কার্ড ঝুড়িতে রেখে দিতে পারে। যা-ই হোক, আমাকে এখন যেতে হবে। জরুরি কাজ আছে।
তাড়াহুড়া করে চলে গেল বিগস্।
কিশোর বলল, অন্য কেউ পাঠিয়েছিল আপেলের ঝুড়িটা।
কে পাঠিয়েছিল জানি আমরা, মুসা বলল। জোসির বিরুদ্ধে যার প্রচণ্ড আক্রোশ। জোসির রেস জেতা যে বন্ধ করতে চায়। প্রয়োজনে তার আত্মীয়-স্বজনের ক্ষতি করে হলেও।
চলো, লুককে জিজ্ঞেস করে দেখি তিনি কী বলেন। তাঁর টুওয়ে রেডিওটাও লাগবে। থিম পার্কের ব্যাপারে মিস্টার সাইমনকে একটু খোঁজ-খবর করতে বলব।
বিখ্যাত গোয়েন্দা মিস্টার ভিকটর সাইমন, খোড়া গোয়েন্দা বইতে তিন গোয়েন্দার সঙ্গে তাঁর পরিচয়। এরপর থেকে তার সঙ্গে বহু কেসে কাজ করেছে তিন গোয়েন্দা। কখনও তিনি ওদের সহায়তা চেয়েছেন, কখনও তিন গোয়েন্দা ওঁর সাহায্য নিয়েছে।
ভালই হয়, কিশোরের কথায় মুসাও একমত। চলো।
দোকানেই পাওয়া গেল লুককে। রেডিও ব্যবহার করতে চাইল কিশোর। ওদেরকে দোকানের পিছনের ঘরে নিয়ে গেলেন লুক। ফেয়ারব্যাংকসে যোগাযোগ করা হলো প্রথমে। সেখান থেকে লাইন দেয়া হলো রকি বিচে। একটা টেলিফোন রিসিভার কিশোরের হাতে ধরিয়ে দিলেন লুক।
মাইক্রোফোনে হাত চাপা দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল কিশোর। লুকের দিকে তাকাল।
বুঝতে পারলেন তিনি। অ, একা কথা বলতে চাও। তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
গ্লিটারে কী ঘটছে, সংক্ষেপে মিস্টার সাইমনকে জানাল কিশোর। তবে ওর সন্দেহের কথা চেপে গেল। কারণ একটা ছোট শর্ট ওয়েভ রেডিও সেট-এর সাহায্যে যে কেউ ওদের গোপন কথা শুনে নিতে পারবে।
সবশেষে বলল, সার, একটা কোম্পানি এখানে থিম পার্ক বানাতে চায়। কোম্পানিটা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাই। ব্যাপারটা খুব ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে আমার কাছে। এ ব্যাপারে আপনি কিছু জানেন নাকি?
আলাস্কার গ্লিটারে থিম পার্ক? না, জানি না তো, মিস্টার সাইমন বললেন। তবে ইন্টারেস্টিং বলছ যেহেতু, খোঁজ নেয়া যেতে পারে। ঘণ্টাখানেক পরে আবার যোগাযোগ কোরো এই নম্বরে।
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল কিশোর। মিস্টার সাইমন ওর ইঙ্গিত বুঝতে পেরেছেন। মুসাকে বলল, ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই জানাবেন। ফলের ঝুড়িটার কথা আর আপাতত জিজ্ঞেস করব না লুককে। মিস্টার সাইমন কী বলেন আগে শুনি। তারপর।
দোকান থেকে বেরিয়ে এল দুজনে। পরের পঁয়তাল্লিশ মিনিট টেডকে খুঁজে বেড়াল ওরা। রাস্তায় কয়েকজন জানাল, সকালে টেডকে দেখেছে। কিন্তু কিশোর-মুসা ওর দেখা পেল না।
দোকানে ফিরে এল ওরা। আবার মিস্টার সাইমনের সঙ্গে যোগাযোগ করল কিশোর। কথা শেষ করতে মিনিটখানেকের বেশি লাগল না এবার। লাইন কেটে দিয়ে মুসাকে জানাল, কোম্পানিটার কোন বদনাম নেই, তবে টাকার টানাটানিতে পড়েছে। থিম পার্কের প্ল্যান কার্যকর করতে না পারলে টিকে থাকাই কঠিন হয়ে যাবে ওদের পক্ষে।
মাথা দোলাল মুসা। হু। তারমানে ভোটে জিততেই হবে ওদের, যেভাবেই হোক। আর জেতার জন্য হয়তো বিষ খাইয়ে মানুষ মারতেও পিছ-পা হবে না। খুবই জোরাল মোটিভ।
খোলা দরজার দিকে তাকিয়ে দেখে নিল কিশোর, কাছাকাছি। লুক আছে কি না। কণ্ঠস্বর নামিয়ে বলল, কিন্তু বিগ তো ফলের ঝুড়ি পাঠানোর কথা স্বীকার করল না।
অপরাধী কি আর সহজে কিছু স্বীকার করে? মুসা বলল, চলো, লুকের সঙ্গে কথা বলি।
দোকানের মূল ঘরে ফিরে এল ওরা। চকচকে পালিশ করা কাউন্টারের ওপাশে তাকের ওপর কনডেন্সড মিল্কের টিন সাজাচ্ছেন লুক। ফিরে তাকিয়ে হাসলেন। কি, কথা হলো?
হ্যাঁ। থ্যাংক ইউ, জবাব দিল কিশোর। আচ্ছা, লুক, কাল আপনি টিনুকদের বাড়িতে ফলের ঝুড়ি পাঠিয়েছিলেন?
মাথা নাড়লেন লুক। আমি না, বিগ দিয়েছিল। আমি টেডকে দিয়ে জেফরির বাড়িতে পাঠিয়েছি। কেন?
আশ্চর্য! মুসা বলল। আপনার দোকানে আসার আগে বিগসের সঙ্গে দেখা হয়েছে আমাদের। স্বীকারই করল না।
তাই নাকি? আমার এই কাউন্টারের ওপর পেয়েছি ঝুড়িটা। তাতে বিগৃসের একটা কার্ড আর একটা নোট ছিল। নোটে অনুরোধ করে লেখা ছিল, ঝুড়িটা যাতে টিকদের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করি। আমি ভাবলাম বিগসই রেখে গেছে।
কিশোর জিজ্ঞেস করল, নোটটা আছে?
না। ফেলে দিয়েছি। কী যেন মনে পড়তে মাথা দোলালেন। মনে হচ্ছে, শুধু বিস্ না, গোল্ডও এতে জড়িত। ওকে দিয়েই করিয়েছে।
বুড়ো প্রসপেক্টর?
মাথা ঝাঁকালেন লুক। কাউন্টারের দিকে চোখ নামালেন। মানুষের গোপন কথা অন্য কাউকে জানাতে ভাল লাগে না আমার। চোখ তুলে বিব্রত হাসি হাসলেন। কিন্তু মনে হচ্ছে তোমাদের বলা উচিত। কাল রাতে বিগসকে গোল্ডের হাতে টাকার তোড়া দিতে দেখেছি। চুপি চুপি দিচ্ছিল। এত টাকা কেন দিল গোল্ডকে? শুধু শুধু নিশ্চয় নয়? কিছু করানোর জন্য দিয়েছে।
কীভাবে দেখলেন? জানালা দিয়ে। কি জানি কি মনে হলো, রাতে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিলাম, তখন দেখলাম।
লুককে ধন্যবাদ দিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে এল দুই গোয়েন্দা। রাস্তায় নেমে কিশোর বলল, গোন্ডের সঙ্গে কথা বলা দরকার।
একটা কেবিন দেখে থামল ও। গোল্ডকে কোথায় পাওয়া যাবে জিজ্ঞেস করে জেনে নিল।
পাহাড়ী রাস্তা ধরে হাঁটতে লাগল ওরা। শহরকে পিছনে ফেলে এগিয়ে চলল। পায়ে চলা সরু পথটা পুরানো দিনের গোন্ড রাশ যুগের কথা মনে করিয়ে দেয়।
গোন্ডের সোনার খনিটা শহর থেকে বিশ মিনিটের হাঁটা পথ। বরফ জমে থাকা সরু নালার ওপাশে মলিন একটা কুঁড়ে, প্রথম চোখে পড়ল কিশোরের। মুসাকে দাঁড়াতে বলে এগিয়ে গিয়ে গলা চড়িয়ে ডাকল, হাই, গোন্ড?
জবাব পেল না।
আরেকটু কাছে গিয়ে আবার ডাকল।
মৃদু পদশব্দ শুনে ঘুরে তাকাতে গেল। পারল না। পিছন থেকে ওর গলা পেঁচিয়ে ধরল একটা বাহু। চাপ বাড়াতে বাড়াতে শ্বাসরুদ্ধ করে দিল।