পান্না! চেয়ারে হেলান দিয়ে হাসল রবিন। তাকিয়ে রয়েছে হেডকোয়ার্টারের ছাতের দিকে। স্প্যানিশ সৈন্য! চোরাই ডায়রি! নিরুদ্দেশ চাকর! সব মিলিয়ে। চমৎকার এক রহস্য! মিস্টার ক্রিস্টোফার শুনলে খুব খুশি হবেন। এরকম কাহিনীই তো তিনি চান ছবি বানানোর জন্যে।
কিশোরও হাসল। বানাতে চাইলে অপেক্ষা করতে হবে তাকে। সমস্ত রহস্যের জট খুলে পুরো একটা কাহিনী তৈরি করতে হবে, তার পর না ছবি।
মেসেজের কমপিউটার প্রিন্ট আউটটা ডেস্কে রেখে দেখছে গোয়েন্দাপ্রধান। ঈশ্বরের অশ্রু এলেনার জন্যে সূত্র। কিন্তু অশ্রুগুলো কোথায়? আর রক্তাক্ত বিশপের সঙ্গে এর কি সম্পর্ক ছিল?
কলাম্বিয়ায় প্রচুর পান্না পাওয়া গেছে, রবিন বলল। পান্নার খনি আছে। ওখানে। দুনিয়ার সব চেয়ে বড় পান্নার খনি, রেফারেন্স বইতে পড়েছি। মনে হচ্ছে, ওগুলো খুঁজে আনার জন্যে এলেনাকে সোগামোসোতে যেতেই হবে। পান্নার খনির সঙ্গে বিশপের কোন যোগাযোগ ছিল না তো? নাকি শুধুই সোনা?
ঘড়ি দেখল কিশোর। দেরি হয়ে যাচ্ছে। বিকেল তো শেয। ফোন করে এলেনাকে জানানো দরকার সব কথা। রিসিভার তুলল সে। লিটারের নম্বরে ডায়াল করল। দ্বিতীয়বার রিং হতেই জবাব দিল এলেনা। আমি, কিশোর বলল। কি ব্যাপার? উত্তেজিত লাগছে। ফোন করেছিল নাকি আবার?
না। তুমি করলে তো, ভাবলাম কিডন্যাপারই করেছে। রুক্সটনে গিয়েছিলে?
গিয়েছি। বইটা একজন লিশপের ডায়রি। কয়েক শো বছর আগে কলাম্বিয়ায় বাস করতেন। সোনার খানকে সাংসাতি অত্যাচার করতেন ইনডিয়ানদের ওপর, সে জন্যে নাম হয়ে গেছে রক্তাক্ত বিশপ। অসুখ হয়ে বিশপ মারা গেলে ডায়রিটা নিখোঁজ হয়ে যায়। সব কিছু পরিষ্কার বলা যাচ্ছে না, কারণ বইটার পুরো অনুবাদ করা হয়নি। উক্টর মনটাগোর কাছে রেখে আসতে পারলে, সময় দিতে পারলে, হত। আমরা তো সেটা করতে পারি না।
না, পার না।
আরেকটা কথা, ঈশ্বরের অশ্রু জিনিসটা কি জানতে পেরেছি। অ্যাডিজ পর্বতের ইনডিয়ানরা পান্নার ওই নাম দিয়েছে।
পান্ন? এক সেকেও চুপ করে থাকল এলেনা। তারপর আবার বলল, পান্না? আমাকে এতগুলো দামী জিনিস দান করে দিল আব্বা? মধ্য গ্রীস্মের দিন আর বৃদ্ধা টি মহিলা বলতেই বা কি বোঝাতে চেয়েছে? আরও যেসব সংকেত?
আপনার আব্বাকে উদ্ধার করে আনতে পারলে সমস্তই জানা যাবে। এখন যেটা জরুরী, বইটা কিডন্যাপারকে দিয়ে তাকে মুক্ত করে আনা। আজ রাতে কোথায় থাকবেন? ওখানেই? কাউকে আপনার সঙ্গে থাকতে হবে?
না, এলেনা বলল। দরকার নেই। আজ রাতে আম্মা এসে থাকবে বলেছে। কিছু জানতে পারলে তোমাদেরকে জানাব।
লাইন কেটে দিল এলেনা।
প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আবার বেজে উঠল ফোন। হেনরি বেসিন ফোন করছে। এলেনা লিসটার আমার সমস্ত পাওনা মিটিয়ে দিয়েছে। দোকানে আসতে পারবে? তোমাদের টাকাটা দিয়ে দিতাম।
নিশ্চয়ই, জবাব দিল কিশোর।
রিসিভার নামিয়ে রেখে বইটা আলমারিতে ভরে তালা দিল কিশোর। তারপর দুই সহকারীকে নিয়ে বেরিয়ে এল ট্রেলার থেকে। সাইকেল নিয়ে রওনা হল।
রকি বীচের একটা গলিতে বেসিনের দোকান। ছেলেরা পৌঁছে সামনের অংশে। কাউকে দেখতে পেল না। রান্নাঘরে চলে এল ওরা। ওখানে পাওয়া গেল বেসিনকে। টেবিলে খাতা বিছিয়ে গভীর মনোযোগে হিসেব করছে। কিশোররা ঢুকতে একটা মেয়ে বেরিয়ে গেল। সে-ও পার্টিতে কাজ করতে গিয়েছিল। পাওনা বুঝে নিয়ে গেল বোধহয়।
হাসল বেসিন। টাকা রেডিই রেখেছি। একটা করে খাম তুলে দিল তিনজনের হাতে। সবাইকেই দিয়েছি। বাকি রইল একমাত্র পিকো।
পিকো? কিশোর বলল। ওহহো, মনে পড়েছে। ধোয়ামোছার জন্যে যাকে নেয়া হয়েছিল।
হ্যাঁ। গত দুহপ্তা ধরে আমার এখানে কাজ করছে। অনেক সাহায্য হচ্ছে আমার।
নিজের খামটা খুলল রবিন। নোটগুলো গুণে বলল, বেশি দিয়ে ফেলেছেন।–
কিছুটা বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে, বেসিন বলল। এত কম হাতে উঠছিল না। অনেক খেটেছ, দেখেছি তো। চকলেট কেক খাবে? কাল বিকেলে একটা বাচ্চার জন্মদিনে গিয়েছিলাম। অনেক কেক বেঁচেছিল, নিয়ে এসেছি। আমি মুখেও দিতে সাহস করিনি। এমনিতেই মোটা হয়ে যাচ্ছি। আমার গার্লফ্রেণ্ডও জানলে মাথায় বাড়ি দেবে।
কেকটা ভালই হয়েছে, না? জানতে চাইল কিশোর।
হাসল বেসিন। প্যানট্রিতে রয়েছে। ওই দরজাটার ওপাশে, তাকে।
প্যানট্রিতে এসে ঢুকল কিশোর। মেঝে থেকে ছাত পর্যন্ত রয়েছে অসংখ্য তাক। জিনিসপত্র বোঝাই। চকলেট, ময়দা, চিনি, তেল, খাবার বানাতে লাগে। এরকম নানা জিনিস।
চকলেট কেকটা নামাতে দরজাটা বাধা হয়ে দাঁড়াল। পাল্লাটা অর্ধেক ভেজিয়ে দিল কিশোর। কেকের পাত্রের পাশে যে ছুরিটা রেখে দিয়েছে বেসিন সেটা নেয়ার জন্যে হাত বাড়িয়েছে সে, এই সময় পায়ে লাগল কি যেন। নিচে চেয়ে দেখল দরজার পেছনে একটা প্ল্যাস্টিকের ব্যাগ ঠেলে রাখা হয়েছে। লাল ব্যাগ। উজ্জ্বল বেগুনী রঙে লেখা রয়েছে কোম্পানির নাম। ডি এল ডিপার্টমেন্টাল স্টোর থেকে এসেছে জিনিসটা।
একটা মুহূর্ত ওটার দিকে তাকিয়ে রইল কিশোর। তাহলে লিসটারের দোকানে গিয়েছিল বেসিন। তা যেতেই পারে। জিনিস কিনতে যে কেউ যেতে পারে ওই দোকানে। ক্যাটারার গেলেও কোন দোষ নেই। কি কিনতে গিয়েছিল? শার্ট? জুতো? এন্থনির সঙ্গে নিশ্চয় ব্যবসার সম্পর্ক নেই বেসিনের।
এলেনার মায়ের বাড়ি থেকে তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে আসছে এনথনি, দৃশ্যটা মনে পড়ে গেল কিশোরের। ঠিক কোন জায়গাটায় ছিল সে, যখন মহিলার সঙ্গে কথা বলছিল কিশোর?
লুকিয়ে ছিল। আর কোন ব্যাখ্যাই হতে পারে না। যদি কোন কুমতলব না থাকত, আর শুধুই দেখা করতে যেত তাহলে লিভিং রুমেই বসে থাকত, স্বাভাবিক ভাবে। কিশোরের সামনে থাকতে দ্বিধা করত না। কিন্তু সে লুকিয়েছিল। কেন?
তার সঙ্গে হেনরি বেসিনেরও কোন সম্পর্ক রয়েছে? লিসটারের কিডন্যাপের ব্যাপারে তারও হাত রয়েছে? নাহ, লোকটাকে দেখে সেরকম মনে হয় না। তবে মুখ দেখে সব সময় অপরাধীকে সনাক্ত করা যায় না। তাহলে মোটিভটা কি? লিসটারের কমপিউটারে বেসিনের নাম নেই। থাকার কথাও নয়। লিসটারের কোন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে না বেসিন। কিন্তু তাই বলে শত্রুতা থাকতে পারে না এমন কোন কথা নেই। কে যে কখন কিভাবে কার শত্রু হয়ে উঠবে বলা মুশকিল। এমনও হতে পারে রক্তাক্ত বিশপের ডায়রির কথাটা জানে বেসিন। কিংবা এনথনি জানিয়েছে। বেসিনের টাকার দরকার। কাজেই সাহায্য করতে রাজি হয়েছে। ঘুস নিয়েছে।
প্ল্যাস্টিকের ব্যাগের ওপর দিকটায় নীল রঙের কি যেন রয়েছে। ঝুঁকে ছুঁয়ে দেখল, কিশোর। একটা উইণ্ডব্রেকার। নাড়া লেগে কাত হয়ে পড়ে গেল ব্যাগটা, ভেতর থেকে বেরিয়ে পড়ল উইণ্ডব্রেকারটা। ওটার নিচে রয়েছে ভঁজ করা একটা খবরের কাগজ। চুলো না কিশোর। শুধু তাকিয়ে রইল।
দেখতে পাচ্ছে কাগজটার বিভিন্ন জায়গা কাটা। শব্দ! প্রথম পৃষ্ঠার হেডলাইন থেকে শব্দ কেটে নেয়া হয়েছে। ওগুলো কেটেই লাগিয়েছিল এলেনার কাছে। পাঠানো নোটে…
কিশোর? রান্নাঘর থেকে ডাকল বেসিন। কি করছ? পাওনি?
ভীষণ চমকে গেল কিশোর। তাড়াতাড়ি ব্যাগের ভেতরে উইণ্ডব্রেকারটা ঢুকিয়ে আগের মত করে রেখে দিল। দ্রুত হাতে তিন টুকরো কেক কেটে নিয়ে বেরিয়ে এল প্যান্ট্রি থেকে।
আপনার জন্যে আনলাম না, বেসিনকে বলল সে।
না, খাব না। ঠিকই করেছ।
খেতে শুরু করল রবিন আর মুসা। একটা টুল টেনে নিয়ে নিজের টুকরোটায় কামড় বসাল কিশোর।
তারপর? যেন নিছকই আলোচনার জন্যে বলল বেসিন। এলেনার সঙ্গে কেমন কাটছে তোমাদের? কিছু পেলে? বাবাকে মুক্ত করতে পারবে মেয়েটা?
চেষ্টা তো নিশ্চয় করবে। কিন্তু খুব কঠিন কাজ। কিডন্যাপার এমন একটা জিনিস চাইছে যেটার মাথামুণ্ড কিছুই বোঝা যায় না। টাকাটুকা কিছু না, লোকটা। চাইছে বিশপের বই।
খাওয়া থামিয়ে দিয়েছে রবিন আর মুসা। কিশোরের দিকে তাকিয়ে রয়েছে দুজনে। মুসা বলেই ফেলতে যাচ্ছিল, কিন্তু আমরা তো জানি!
কি ভেবে বলল না সেকথা। বলার জন্যে মুখ খুলে ফেলেছে, কিছু একটা বলতেই হয়, লিসটারের বাড়ির হাজার হাজার বই ঘেঁটে ফেলেছি আমরা। আরও কত জিনিস যে ঘেঁটেছি। কোন কিছুই ফেলে দেয় না লোকটা। এক অদ্ভুত চরিত্র।
হাসল বেসিন। হ্যাঁ। বেশির ভাগেরই কানাকড়ি দামও নেই।
ভাবছি, কিশোর বলল, সেন্ট্রাল কোস্ট মেরিনেও যাব। বোম্প্রিট ড্রাইভের শিপইয়ার্ডটার কথা শুনেছেন? সেখানে ড্রাই ডুকে লিসটারের একটা ইয়ট তুলে রাখা হয়েছে। আইলিন লিসটার। দেখা যাক, বিশপের বই মেলে কিনা ওখানে। ওখানেও নিশ্চয় বাড়ির মতই জঞ্জাল বোঝাই করে রেখেছেন লিটার।
রাখলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কিশোরের কাঁধের ওপর দিয়ে দরজার দিকে তাকাল বেসিন। এসেছ। এস। টাকা রেড়ি। যা বলেছিলাম তার চেয়ে বেশিই পাবে।
ফিরে তাকিয়ে কিশোরও দেখতে পেল পিকোকে। ছেলেদের দিকে একবার মাথা নুইয়ে এগিয়ে গেল বেসিনের কাছে।
তোমাদের হল? রবিন আর মুসাকে বলে শেষ টুকরোটা মুখে পুরল কিশোর।
বেসিনকে গুডবাই জানিয়ে বেরিয়ে এল তিন গোয়েন্দা। দাঁড়িয়ে রয়েছে বেসিনের ভ্যান। সেটার পাশ কাটাল ওরা। গলি পার হয়ে এসে পড়ল বড় রাস্তায়। ফিরে তাকাল কিশোর।
ব্যাপারটা কি বল তো? জিজ্ঞেস করল রবিন। ওরকম না জানার ভান করলে কেন?
নিশ্চয় কিছু বের করেছ, মুসা বলল।
প্যানট্রিতে একটা প্ল্যাস্টিকের ব্যাগ আছে, কিশোর বলল। লিসটারের ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের জিনিস। তার মধ্যে একটা খবরের কাগজ আছে। কিছু কিছু শব্দ কেটে নেয়া হয়েছে।
বল কি! হাঁ হয়ে গেল রবিন।
ঠিকই বলছি।
বেসিন? বিশ্বাস করতে পারছে না মুসা। ও কিডন্যাপার? যত যাই বল আমার বিশ্বাস হয় না! তোমার দাদা ড্রাকুলা ছিলেন একথা বললে যেমন বিশ্বাস হবে না
বিশ্বাস না হলেও ব্যাপারটা সত্যি হতেই পারে, বাধা দিয়ে বলল কিশোর। বেসিনের ব্যাপারটাও অসম্ভব কিছু নয়। নিজের চোখকে তো আর অবিশ্বাস করতে পারি না।
তার মানে তার জন্যে একটা ফাঁদ তৈরি করে এলে, রবিন বলল।
করে এলাম। সে ভাববে শিপ ইয়ার্ডে ইয়টের মধ্যে থাকতে পারে বিশপের, বই। জানল তো। দেখা যাক এখন কি করে।
উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল মুসা। তার পিছু নিতে হলে একটা গাড়ি এখন জরুরী। আমাদেরগুলো তো জাহান্নামে গেছে। কোথায় যে পাই…
আরনি ভিনসেনজোর কাছে, সমাধান করে দিল কিশোর। আমাদেরকে সাহায্য করবে কথা দিয়েছে সে।
পনেরো মিনিটেই পৌঁছে গেল আরনি। ধূসর রঙের একটা সিডান নিয়ে এসেছে। বাম্পারে মরচে পড়া। রঙ চটে গেছে জায়গায় জায়গায়। পাশের বাড়ির একজনের কাছ থেকে চেয়ে নিয়েছি, জানাল সে। ইচ্ছে করেই আনলাম। এত পুরনো গাড়ির ওপর নজর দেয় না কেউ। তা কার পিছু নিতে হবে?
হেনরি বেসিন, কিশোর বলল। ওদিকটায় তার দোকান। বেরোবে। এখনই।
বেসিন? অবাক হল আরনি। সে এতে জড়িত? এত ভাল একটা লোক?
বিশ্বাস করা শক্ত, স্বীকার করল কিশোর। কিন্তু আমি প্রমাণ পেয়েছি-ওই যে, বেরোল।
ক্যাটারিং শপের পেছন দিকে তাকাল সবাই। ছিটকানি লাগাচ্ছে বেসিন।
ইঞ্জিন স্টার্ট দিল আরনি।
ভ্যানে উঠল বেসিন। চলতে শুরু করল গাড়িটা।
মাথা নিচু করে ফেলল ছেলেরা।
মোড়ের কাছে গিয়ে ব্রেক করল বেসিন। ডানে বায়ে তাকাল। তারপর মোড় নিয়ে কোস্ট হাইওয়ের দিকে রওনা হল।
একটা ব্লক তাকে এগোতে দিল আরনি। তারপর অনুসরণ করে চলল।
চৌরাস্তায় এসে থামতে হল বেসিনকে। লাল আলো জ্বলেছে। দূরে থাকতেই গতি কমিয়ে দিল আরনি। আরেকটা ভ্যান পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গিয়ে ঢুকে পড়ল মাঝের ফাঁকে। গাড়িটাতে কয়েকজন লোক, সার্ফ করতে চলেছে সাগরে।
বেশ সাবধানী লোক আপনি, প্রশংসা করল মুসা।
হাসল আরনি। ডিটেকটিভ ছবি দেখেছি অনেক। কি করে অনুসরণ করতে হয় শিখে নিয়েছি।
সবুজ আলো জ্বলল। হাইওয়েতে উঠল গাড়িগুলো। উত্তরে চলল, বোম্প্রিটের। দিকে। শেষ মোড়টার কাছে গিয়ে উত্তেজনায় টান টান হয়ে গেল কিশোরের স্নায়ু। কিন্তু তাকে হতাশ করে দিয়ে থামল না ক্যাটারারের ভ্যান, সোজা এগিয়ে চলল।
কিশোর, রবিন বলল। থামল না তো! তার মানে এসবে নেই?
জবাব দিল না কিশোর।
চ্যাপার্যাল ক্যানিয়নে পৌঁছে ব্রেক করল বেসিন। ডানে মোড় নিল। হাইওয়ে থেকে তিন ব্লক দূরে একটা অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স। ওটার সামনে গাড়ি রেখে গিয়ে সামনের দরজায় উঠল সে। বেল বাজাল।
ভ্যানের পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেল আরনি। পরের ব্লকের কাছে গিয়ে থামল। পেছনের জানালা দিয়ে তাকিয়ে রয়েছে ছেলেরা। বাড়ির ভেতরে ঢুকতে দেখল বেসিনকে। কয়েক মিনিট পরে একটা মেয়েকে সহ বেরিয়ে এল। সুন্দর চেহারা মেয়েটার, কালো চুল। দুজনে এসে উঠল ভ্যানে। যেদিক থেকে এসেছিল সেদিকে ফিরে চলল আবার গাড়িটা।
কিন্তু এবারেও গতি কমাল না শিপইয়ার্ডের কাছে।
নাহ, যাচ্ছে না তো, নিরাশ হয়ে বলল রবিন। আজ রাতে আর যাবে না।
সত্যিই গেল না বেসিন। সোজা দক্ষিণে মেরিনা ডেল রে-এর কাছে একটা রেস্টুরেন্টের পার্কিং লটে গিয়ে ঢুকল।
বুঝলাম, আরনি বলল। গার্লফ্রেণ্ডকে নিয়ে গেছে ডিনারে। এতে কোন দোয নেই। ক্রাইম করেনি। ও শিপইয়ার্ডে ঢুকলে হার্ট অ্যাটাক হয়ে যেত আমার।
আরনি কথা বলছে, বেসিন তখন রেস্টুরেন্টের সামনের দরজায় গিয়ে দড়িয়েছে। দরজা ঠেলে খুলে ধরে রাখল যাতে মেয়েটা ঢুকতে পারে। তারপর ফিরে তাকাল। যেন আরনির গাড়িটার দিকেই তার নজর। একই মুহূর্তের জন্যে। ডেভিড লিটারের দাঁড়ানোর ভঙ্গি মনে পড়ে গেল কিশোরের। গেলাস ভাঙার পর রান্নাঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন লিসটার, ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে ছিলেন বেসিন আর পিকোর দিকে। কল্পনায় দেখতে পেল পিকোর চেহারা, তাকিয়ে রয়েছে লিসটারের দিকে। আরনির বলা হার্ট অ্যাটাক শব্দটা যেন প্রতিধ্বনি তুলল। কিশোরের মনে।
আমি একটা গাধা! কপালে চাপড় মারল কিশোর। বেসিন কি করে হয়? ও হতেই পারে না। এখন আমার মনে পড়ছে। রান্নাঘরের দরজায় গিয়ে। দাঁড়িয়েছিলেন লিসটার, বেসিনকে শাসানোর জন্যে, তার ভাড়া করে নিয়ে যাওয়া। একটা মেয়ে গেলাস ভেঙে ফেলেছে বলে। তখন থেকেই সমস্ত ঘটনা শুরু।
নীরব হয়ে গেল সে। তাকিয়ে রয়েছে সামনের দিকে। চোখ মুদে ফেলল ধীরে ধীরে। ওখানে হেনরি বেসিনও ছিল। ট্রেতে খাবার রাখছিল। পিকো কাজ করছিল। সিংকে। সাবান দিয়ে বাসন ডলছিল। হাত ভেজা। ওই মুহূর্তের আগে। কিডন্যাপিঙের প্লটই তৈরি হয়নি। বাজি ধরে বলতে পারি। নিরাপদেই ছিলেন লিসটার, হঠাৎ করেই পরিস্তিতি বিপজ্জনক হয়ে উঠল তার জন্যে। মারাত্মক বিপদ। সেটা বুঝতে পেরেছেন তিনি। আমি দেখেছি সেটা। অথচ তখন বুঝতে পারিনি।
সামনে ঝুঁকল রবিন। কেন পারলে না? কি ঘটেছিল?
কি রকম রেগে গিয়েছিলেন লিসটার মনে আছে? চিৎকার করছিলেন। তাকে থামানোর চেষ্টা করছিল এলেনা। তারপর পিকো তাকিয়েছিল তার দিকে। হাত থেকে বাসন ফেলে দিয়েছিল। আরেকটু হলেই হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাচ্ছিল লিসটারের।
তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই, আরনি বলল। কোন জিনিস ভাঙলে ভীষণ খেপে যায় বুড়োটা। চোখের সামনে একগাদা বাসন ভাঙতে দেখলে শান্ত থাকার কথা নয় তার।
আসল কারণ সেটা নয়, কিশোর বলল। বাসনগুলো ভাঙার পর প্রথম ভালমত পিকোর ওপর নজর দিয়েছিলেন লিসটার। তাঁর দিকে তাকিয়েছিল পিকো। লিসটারের মুখ দেখতে পাচ্ছিলাম না আমি, কিন্তু পিকোর পাচ্ছিলাম। অদ্ভুত দৃষ্টি ফুটেছিল তার চোখে। আমি তখন ভেবেছিলাম বুঝি ভয় পেয়েছে। এখন বুঝতে পারছি ভয় নয়, ঘৃণা। কেঁচোর দিকে যে দৃষ্টিতে তাকায় মানুষ, সেই দৃষ্টি। লিসটারকে চিনতে পেরেছিল পিকো। আগে থেকেই পরিচয় ছিল। লিসটারও চিনতে পেরিছিলেন তাঁকে। এ কারণেই অ্যানজিনার অ্যাটাক হয়।
হাঁ করে শুনছে রবিন। পিকো…পিকোই সিয়েটা!
হতে পারে, কিশোর বলল। ওর ব্যাপারেই এলেনাকে হুঁশিয়ার করেছেন হয়ত লিটার। আমার ভুল না হয়ে থাকলে এ মুহূর্তে আইলিন লিসটারে বিশপের বই খুঁজতে চলে গেছে পিকো। আমি বেসিনের সঙ্গে যখন ইয়টটার সম্পর্কে কথা বলছিলাম, ওই সময়ই সে ঢুকেছিল। নিশ্চয় শুনে ফেলেছে। প্যাস্ট্রিতে যে ব্যাগটা পেয়েছি ওটা বেসিন রাখেনি ওখানে, পিকো রেখেছে।
চল তাহলে! তাড়াতাড়ি গাড়ি ঘোরাল আরনি। তীব্র গতিতে ছুটল বোটি ড্রাইভের দিকে।
সেন্ট্রাল কোস্ট মেরিনে পৌঁছতে পৌঁছতে অন্ধকার হয়ে গেল। মুসার ভয় হতে লাগল, দারোয়ান ওদেরকে কিছুতেই ঢুকতে দেবে না।
গেট দিয়ে যাওয়ার দরকারও নেই, কিশোর বলল। ওই দেখ।
দেখল সবাই। আরনির গাড়ির হেডলাইটে ধরা পড়েছে পিকো। শিপইয়ার্ডের কাঁটাতারের বেড়ার কাছে দাঁড়িয়ে আছে সে। বেড়ার এক জায়গায় বেশ বড় একটা ফোকর কাটা হয়েছে।
থামবেন না! প্রায় চিৎকার করে বলল রবিন। আমরা যে দেখেছি বুঝতেই যেন না পারে। আগে হাতেনাতে ধরি, তারপর জিজ্ঞেস করা যাবে লিসটারকে কি করেছে।
চলে যান, কিশোর বলল। পরে নেমে তার পিছু নেব।
এগিয়ে গেল আরনি। পেছনের জানালা দিয়ে তাকিয়ে রইল গোয়েন্দারা। দেখল, বেড়ার কাছ থেকে সরে যাচ্ছে পিকো। দৌড় দিল হাইওয়ের দিকে।
পুরো আধপাক ঘুরে গাড়ির মুখ আবার ঘুরিয়ে ফেলল আরনি। হেডলাইট নিভিয়ে দিয়ে এগোল। আরেক বার পাশ কাটাল পিকোর। লোকটা তখন হেঁটে চলেছে। আরনির গাড়ির পার্কিং লাইট শুধু জ্বলছে। অন্য গাড়ি মনে করল পিকো। হাত তুলল থামানোর জন্যে। লিফট চায়।
তুলে নেব? আরনির প্রশ্ন।
মাথা খারাপ? কিশোর বলল। চিনে ফেলবে না?
থামল না আরনি। দক্ষিণে এগিয়ে গেল ব্লক দুয়েক। তারপর একটা রেস্টুরেন্টের পার্কিং লটে ঢুকে থামল। এবারও পেছনের জানালা দিয়ে তাকিয়ে রয়েছে গোয়েন্দারা। রাস্তায় একটা ভ্যানকে দেখল থেমে পিকোকে তুলে নিতে।
ডার্ক শেভি ভ্যান, বলল কিশোর।
বুঝেছি, আরনি বলল।
আবার অনুসরণের পালা। দুটো গাড়ির পেছনে রইল আরনি সর্বক্ষণ। চলে এল সান্তা মনিকায়। লিংকন বুলভারে পৌঁছে থেমে গেল ভ্যান। পিকে নেমে গেলে চলতে শুরু করল গাড়িটা।
আরেকবার পিকোর পাশ কাটাল আরনি। কোণের কাছে পৌঁছে- থামল। পেছনের জানালা দিয়ে চেয়ে রয়েছে ছেলেরা।
মাথা নিচু, কাঁধ বাঁকা করে হাঁটছে পিকো। ফিরে এল আরনি। পাশ কাটাল। দাঁড়াল। আবার ঘুরল। পাশ কাটাল। দাঁড়াল। এভাবেই অনুসরণ করে চলেছে। খেয়ালই করছে না যেন পিকো।
কয়েক ব্লক পরে একটা নির্জন জায়গায় চলে এল ওরা। জায়গাটা পতিত। যেন দানবীয় কোন রেজর ব্লেড দিয়ে চেঁছে তুলে নেয়া হয়েছে ওপরের মাটি।
পুরনো বাড়িঘর সব ভেঙে ফেলা হয়েছে এখানে, আরনি বলল। পার্ক বানাবে বোধহয়। রাস্তার এত কাছে, যা শব্দ, পার্ক কেমন হবে কে জানে। জায়গা সিলেকশন ভাল হয়নি ওদের। পার্ক হওয়া দরকার নীরব জায়গায় গাড়ি থামিয়ে তাকিয়ে রয়েছে পিকোর দিকে।
লোকটা এখন শুধু একটা ছায়া। কয়েকটা অন্ধকার আকৃতির দিকে হেঁটে চলেছে। আলো নেই এখানটায়। খোলা জায়গাটার ওপাশের আকৃতিগুলো। বাড়িঘরের। নির্জন, শূন্য, ধ্বংস হয়ে আসা সব বাড়ি। দুটো বাড়ির মাঝের গলিতে হারিয়ে গেল পিকো।
গাড়ি নিয়ে না গিয়ে, কিশোর বলল, হেঁটেই যাই। সুবিধে। দরজা খুলল সে।
বেরিয়ে এল চারজনেই। নীরবে পিছু নিল পিকোর। যেদিকে অদৃশ্য হয়েছে সে সেদিকে চলল দ্রুতপায়ে।
এখানে কোথায় এল? অন্ধকারে হোঁচট খেয়ে পড়ে যাচ্ছিল মুসা।
শশশ! হুঁশিয়ার করল কিশোর। দেখ!
সামনে ম্লান আলো। আলোর আভা বললেই ঠিক বলা হয়, পরিত্যক্ত একটা বাড়ির ভেতর থেকে আসছে। পা টিপে টিপে এগোল গোয়েন্দারা। আরও কাছে এলে দেখল জানালার ভেতর দিয়ে আসছে আলোটা। শাটার লাগানো। কিন্তু কয়েক জায়গায় ভাঙা, আলো বেরোচ্ছে ওই পথে।
অন্য পাশ দিয়ে বাড়ির একেবারে গা ঘেষেই চলে গেছে গাড়ি চলাচলের পথ। এত জোরে হর্ন বাজাল একটা লরি, চমকে উঠল ওরা।
গর্জন করতে করতে চলে গেল গাড়িটা। শাটারের একটা ভাঙা অংশে চোখ রাখল কিশোর। একটা ঘর। একটা বিছানা। পাশে একটা পুরনো আলমারি। তার ওপর হারিকেন জ্বলছে। বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে শুয়ে থাকা লোকটার দিকে তাকিয়ে রয়েছে পিকো। লোকটাকে মনে হচ্ছে বেহুশ। কাত হয়ে আছে। মুখটা জানালার দিকে ফেরানো। চোখ বন্ধ। এক গোড়ালিতে একটা আংটা, সেটার সঙ্গে শেকল লাগানো। শেকলের আরেক মাথা মেঝের বড় একটা পাথরের ফুলকে গাথা। আরেকটা আংটার সঙ্গে লাগানো। বেঁধে রাখা হয়েছে লোকটাকে।
পিছিয়ে এল কিশোর। সঙ্গীদেরকে ইশারা করল সরে যাওয়ার জন্যে।
বেশ কিছুটা সরে এসে ফিসফিস করে ওদেরকে জানাল কিশোর, ডেভিড লিসটারকে পেয়েছি। বের করে আনতে হবে এখন।
আরেকটা পরিত্যক্ত বাড়িতে এসে ঢুকল গোয়েন্দারা। পরিকল্পনা করার জন্যে।
সোজা ঢুকে পড়তে পারি আমরা, আরনি বলল। পিকোর কাছ থেকে জোর করে চাবি আদায় করে খুলে নিয়ে আসতে পারি। তবে পিস্তল থাকতে পারে পিকোর কাছে। তাহলে মুশকিল হবে। রাগের মাথায় লিসটারকেই গুলি করে। বসতে পারে।
আমাদেরকেও করতে পারে, মুসা বলল। এত ঝুঁকির মধ্যে না গিয়ে পুলিশকে ফোন করতে পারি আমরা।
তা পারি। বেশ, আমি ফোন করতে যাচ্ছি। ওরা এসে হাতে নাতে ধরবে পিকোকে। আমি সন্দেহ থেকে বাদ যাব। বেঁচে যাই তাহলে। একটু থেমে আরনি বলল, তোমরা এখানেই বসে থাক।
ছেলেদেরকে কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে বেরিয়ে গেল আরনি।
আমাদের কারও যাওয়া উচিত ছিল ওর সঙ্গে আরনির পায়ের শব্দ মিলিয়ে গেলে আফসোস করল মুসা।
কেন? রবিনের প্রশ্ন। সে কি পুলিশকে ফোন করতে পারবে না?
তা পারবে। কিন্তু করবে কিনা সেটাই প্রশ্ন। লিসটারকে ঘৃণা করার তার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। মত বদলাতে পারে। চলে যেতে পারে। তাহলে আমরা এখানে বসেই থাকব বসেই থাকব, গাধা হয়ে।
থাকতে যাচ্ছে কে? মুখ খুলল কিশোর। আরনিও ভাল করেই জানে বেশিক্ষণ তার জন্যে এখানে বসে থাকব না আমরা। আর চলে গেলে তো সন্দেহমুক্ত হতে পারল না, বরং তার ওপর আমাদের সন্দেহ আরও বাড়বে। নাহ, সে যাবে না। পুলিশকে ফোন করবে। লিসটারকে এখন আর হাতছাড়া করতে চাইবে না। এক সেকেণ্ড চুপ করে ভাবল গোয়েন্দাপ্রধান। শোন, পিকোর হাবভাব একটুও ভাল লাগেনি আমার। মরিয়া হয়ে উঠেছে সে। খারাপ কিছু করে বসতে পারে।
অযথা বসে না থেকে বেরিয়ে পড়ল তিন গোয়েন্দা। চলে এল স্লান আলোকিত জানালাটার কাছে। ফোকরে চোখ রাখল কিশোর। এখনও আগের জায়গাতেই। রয়েছে পিকো। ঝুঁকে তাকিয়ে রয়েছে লিসটারের দিকে। হারিকেনের আবছা আলোয় মনে হচ্ছে তার গালে মাংস নেই, গর্ত। আর সারাটা জীবনই যেন ক্ষুধার্ত রয়ে গেছে লোকটা।
বুড়ো ভাম, বিড়বিড় করে বল পিকো। আমাকে তুমি বোকা বানাতে পারবে। এইই, এইই! বলে, জোরে চিৎকার করে ডাকল সে। জানালায় কাঁচ নেই। তাই রাস্তার গাড়িঘোড়ার শব্দকে ছাপিয়ে সেই চিকরি কানে এল গোয়েন্দাদের।
এইই, শুনছো! আরও ঝুঁকে লিসটারের পা চেপে ধরল পিকো। জোরে ঝাঁকি। দিল। ঠিকই শুনতে পাচ্ছ। ভান করছ না শোনার। যেন বেহুশ হয়ে গেছে, এহ! আমার সঙ্গে ওসব চালাকি খাটবে না।
ঘাবড়ে গেল তিন গোয়েন্দা। লিসটারকে কিছু করবে না, তো পিকো? পুলিশ নিয়ে আরনি ফেরার আগেই ওরা কিছু করার চেষ্টা করবে?
বইটা চাই আমি! লিসটারের কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বলল পিকো। ওটা আমার জিনিস, আমি অনেক কষ্ট করেছি, আদায় করে নিয়েছি বলা যায়। সারাটা জীবনই নষ্ট করেছি ওটার জন্যে। জেল খেটেছি। তোমার সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিতে আপত্তি ছিল না আমার। কিন্তু তুমি এমনই লোভী, পুরোটা একাই মেরে। দেয়ার তালে ছিলে। তুমি আমাকে জেলে পাঠিয়েছ, পাঠাওনি? বইটা হাতে পেতেই চলে গিয়েছ পুলিশের কাছে। গিয়ে বলেছ ওটা কার কাছে আছে জান। আমার নাম বলে দিয়েছ। আমাকে অ্যারেস্ট করল ওরা। আমার মত একজন মানুষকে! পিকো সিয়েটাকে! ছ্যাচড়া চোরের মত কোমরে দড়ি বেঁধে নিয়ে গিয়ে আমাকে জেলে ভরল পুলিশ!
আমার ঘরে বইটা পায়নি ওরা, তা-ও জান তুমি। জানবেই তো, তোমার কাছেই তো ছিল। ওরা আমাকে কি করেছে জান? পিটিয়েছে। বার বার জিজ্ঞেস করেছে, বইটা কি করেছি। বলতে পারলাম না। ওরা ধরে নিল আমি ওটা বিক্রি করে দিয়েছি। কিছুতেই বিশ্বাস করাতে পারলাম না। জেলে ভরলই ওরা আমাকে।
তারপর তুমি কোথায় গিয়েছ লিসটার, আমি জানি। সোজা সেই জায়গাটায় চলে গিয়েছিলে। পকেট ভর্তি করার জন্যে। ধনী হওয়ার জন্যে!
বিছানার কাছ থেকে সরে এল পিকো। ঘুরে দাঁড়াল। পায়চারি শুরু করল। মুঠো শক্ত হয়ে গেছে।
আরনি যেদিকে গেছে অধৈর্য হয়ে সেদিকে তাকাল মুসা। এখনও আসছে না। কেন? এত দেরি কেন?
পায়চারি থামাল পিকো। বিছানার কাছে গিয়ে আবার কথা বলতে লাগল। অন্য রকম হয়ে গেল কণ্ঠস্বর। মানসিক চাপের লক্ষণ। তার জন্যে এখন তোমাকে জবাবদিহি করতে হবে। তুমি ভেবেছ, তোমার মেয়েটা গিয়ে পুলিশকে বলবে। ওরা খুজতেই থাকবে,খুজতেই থাকবে, তারপর নাটকীয় ভাবে চলে আসবে, এখানে, তোমাকে উদ্ধার করার জন্যে। না, তা হবে না। সে রকম কিছু যাতে না ঘটতে পারে সেজন্যে সতর্ক রয়েছি আমি। মেয়েটা আস্ত ভীতু। রাতে একা বাড়িতে থাকতে পারে না বলে কয়েকটা ছেলেকে ডেকে এনেছে সঙ্গ দেয়ার। জন্যে। আরও বেশি যখন ভয় পেলে, পালিয়ে চলে গেল মায়ের কাছে। ও রকম একটা মেয়ের ওপর ভরসা করে আছ তুমি। পুলিশ নিয়ে আসবে। হুহ! এখানেই। থাকতে হবে তোমাকে, বুঝলে?
কোথায় আনা হয়েছে ভাল করেই জান তুমি, লিসটার। এখানে কেউ আসে। কেউ চলাচল করে না এদিক দিয়ে। গলা ফাটিয়ে চিৎকার করলেও কারও কানে যাবে না। সময়ের অভাব নেই আমার। তাড়াহুড়া করব না। যতক্ষণ না বলছ, ছাড়ছি না। বুঝলে?
গটমট করে শাটারের কাছে এসে দাঁড়াল পিকো।
ঝট করে একপাশে সরে গেল মুসা।
আরেক পাশে সরল রবিন।
কিশোর পিছিয়ে গেল। লুকিয়ে পড়ার চেষ্টা করল। কিন্তু সময় মত পারল না, দেরি করে ফেলল। শাটার খুলে দিল পিকো। আরেকটু হলেই বাড়ি লাগত কিশোরের মুখে।
চোখে চোখে তাকিয়ে রইল দুজনে। পুরো একটা সেকেণ্ড নড়তে পারল না। কিশোর, পা যেন অসাড় হয়ে গেছে। তারপর পাশ থেকে হাত ধরে এক হ্যাঁচকা টানে তাকে সরিয়ে নিল মুসা। ততক্ষণে গোলমাল যা হওয়ার হয়ে গেছে।
দৌড় দিল তিনজনে।
চেঁচিয়ে উঠল পিকো। দড়াম করে আবার বন্ধ হয়ে গেল শাটার। আরও জোরে শব্দ হল দরজার।
ওদের পেছনে ছুটে আসছে পিকো।
পেছনে তাকাল কিশোর। লোকটার হাতে অস্ত্র দেখতে পেল। পিস্তল নয়। লাঠি জাতীয় কিছু। অন্ধকারে ভাল দেখতে পেল না সে, আন্দাজ করল পুরনো বেজবল ব্যাট হবে। পিকোর মত লোকের হাতে ওই জিনিসই আগ্নেয়াস্ত্রের চেয়ে কম ভয়ঙ্কর নয়। ওই ব্যাটের কাছে কিশোর আর মুসার জুডো ক্যারাট খাটবে না। লোকটার গায়ে ষাড়ের শক্তি। বন বন করে ঘোরাতে ঘোরাতে যদি এগিয়ে আসে, কাছেও ঘেষতে পারবে না তিনজনের কেউ। পালানো ছাড়া গতি নেই।
ছুটছে তিন গোয়েন্দা। তেড়ে আসছে পিকো, চিৎকার করে গালাগাল করছে। স্প্যানিশ আর ইংরেজিতে। সব বুঝতে পারল না ওরা। এটুকু বোঝা গেল, ধরতে পারলে মাটিতে মিশিয়ে দেয়ার হুমকি দিচ্ছে। গালাগাল থামিয়ে দিল আরও জোরে দৌড়ানোর জন্যে।
তাড়া খাওয়া জানোয়ারের মত গুঙিয়ে উঠল মুসা। দুটো বাড়ির মাঝের অন্ধকারে ঢুকে পড়ল। তার পেছনে গেল রবিন। সব শেষে কিশোর। নিজেকে যেন ছুঁড়ে দিল অন্ধকার ছায়ায় মিশে যেতে চাইছে।
পিকো থামছে না। আসছেই। ছুটে আসছে ব্যাট উঁচ করে।
আর দৌড়ানোর কোন মানে হয় না। বুঝতে পারছে তিনজনেই। রুখে দাঁড়ানোই দরকার।
ঝুঁকিটা অনেক বেশি হয়ে যাবে, ভাবল মুসা। মাথায় এক বাড়ি পড়লে, দুফাঁক হয়ে যাবে খুলি। বাড়ি লাগার আগেই ব্যাট ধরে হ্যাঁচকা টানে যদি নিয়ে চলে আসা যায় তাহলে…তবে তার জন্যে সুযোগ দরকার।
অযথা ঝুঁকি নেয়া ঠিক হবে না। পিকো একা, ওরা তিনজন, সুযোগ আসবেই। রবিনের হাত ধরে টেনে নিয়ে চলল মুসা। কিশোর এগোল ওদের। পেছনে। আবার ফিরে তাকাল পেছনে, পিকো কতখানি এসেছে দেখার জন্যে।
অনেক কাছে চলে এসেছে।
মুসা এসে দাঁড়াল কিশোরের পাশে। রবিনকে সরিয়ে দিয়ে এসেছে। হাত তুলে দেখাল। অন্ধকারে আবছামত চোখে পড়ল কিশোরেরও, একটা দরজা। শূন্য বাড়িটাতে ঢুকে লুকিয়ে পড়া যায়।
ঢুকে পড়ল কিশোর আর মুসা। আগেই ঢুকে বসে আছে রবিন। হাত ধরাধরি করে এগোল তিনজনে, যাতে আলাদা হয়ে না যায়। অত অন্ধকার, চোখ খোলা। রাখা আর বন্ধ রাখা সমান কথা।
কয়েক পা এগিয়েই ফিরে তাকাল দরজার দিকে। বাইরের আলো আসছে, ফলে ওখানটায় অন্ধকার কিছুটা কম। ফ্যাকাশে। দরজার বাইরে থামতে শোনা গেল পিকোকে। খসখসে হয়ে উঠেছে নিঃশ্বাস। শোনা যাচ্ছে। নিশ্চয় দরজার কাছে ঘাপটি মেরে রয়েছে, ভাবল কিশোর, ওদের বেরোনোর অপেক্ষায়। শব্দ শোনার চেষ্টা করছে, যাতে বুঝতে পারে ওরা কোথায় আছে।
অবশেষে নড়ল পিকো। একটা পা বাড়াল, নীরবতার মাঝে এত মদু শব্দও কিশোরের কান এড়াল না। পিছিয়ে যেতে লাগল সে। দরজার কাছ থেকে যতটা সম্ভব সরে যাওয়া উচিত।
এক পা এক পা করে পিছাতে পিছাতে দেয়ালে এসে ঠেকল, পিঠ। মুসা এসে থামল তার পাশে। নাকি রবিন? যে-ই হোক, তাতে কিছু এসে যায় না। তিনজনের একসঙ্গে থাকার দরকার,ব্যস।
পাশে সরতে শুরু করল তিনজনে। এক সময় পিঠের কাছটায় শুন্য মনে হল কিশোরের। দেয়াল নেই। ফাঁকা। তার মানে দরজা। যেটাতে রয়েছে ওরা তার পেছনে আরেকটা ঘর। দরজা দিয়ে পিছাতে লাগল কিশোর। সঙ্গে এল অন্য দুজন। আপাতত নিরাপদ। তবে কয়েকটা সেকেণ্ড কিংবা মিনিটের জন্যে। ওঘরেই রয়েছে পিকো। চুপ করে আছে। কান পেতে শুনছে নিশ্চয়। শব্দ শুনলেই ছুটে আসবে।
চারপাশে তাকাল কিশোর। আর কোন দরজা কিংবা জানালা আছে কিনা। বোঝার চেষ্টা করল। বেরিয়ে যেতে পারলে ভাল হত। নেই। শুধু নিচ্ছিদ অন্ধকার। ঈশ্বরের অশ্রু
আরনি! এতক্ষণে মনে পড়ল তার কথা। আরনি কোথায়? পুলিশ নিয়ে আসছে না কেন?
মুসার সন্দেহই সত্যি হল, তেতো হয়ে গেল কিশোরের মন। মত বদল করেছে আরনি। ওদেরকে ফেলে চলে গেছে। যা করার এখন নিজেদেরকেই করতে হবে। কারও সাহায্য পাবে না। পিকোকে আক্রমণ করে তার হাত থেকে ব্যাটটা কেড়ে নিতে হবে। তার পরেও কথা থাকে। পিকোর পকেটে পিস্তল থাকতে পারে। ব্যাট হাতছাড়া হয়ে গেলে বের করবে ওটা। তাহলে মারাত্মক বিপদে পড়ে যাবে ওরা।
আচমকা কেঁপে উঠল মেঝেটা। ওদের পায়ের তলায় মাটির গভীরে যেন প্রচণ্ড তোলপাড় শুরু হয়েছে। ভারি কোন লরি রাস্তা দিয়ে গেলে যেমন কেঁপে ওঠে মাটি অনেকটা তেমনি।
তারপর গর্জে উঠল ধরণী। গর্জন বাড়ছেই, আরও, আরও। এমন ভাবে ভরে দিল দিগ্বিদিক, যেন ওই শব্দটাই একমাত্র আছে পৃথিবীতে আর কিছু নেই। টলতে শুরু করল বাড়িটা। ঝিলিক দিয়ে উঠছে আলো। বিদ্যুৎ চমকের মত উজ্জ্বল, চোখ ধাঁধানো। বাইরের টেলিগ্রাফের খুঁটিগুলো চোখে পড়ল, মাটিতে দেবে যাচ্ছে, যেন মুহূর্তে নরম কাদা হয়ে গেছে কঠিন মাটি।
অন্তিম মুহূর্ত ঘনিয়ে এসেছে যেন বাড়িটার। তীব্র আর্তনাদ শুরু করে দিয়েছে। তীক্ষ্ণ রোম খাড়া করা শব্দ করে তা থেকে খুলে আসছে খুঁটিতেমারা পেরেক।
ভূমিকম্প! আর বুঝতে অসুবিধে হল না ছেলেদের। যে কোন মুহূর্তে এখন ধসে পড়তে পারে পুরনো বাড়িটা। দেয়াল থেকে সরে যাবে ছাত, ধুড়ুম করে ভেঙে পড়বে ওদের মাথায়। বাঁচতে চাইলে এখনি বেরিয়ে যেতে হবে।
কিন্তু বেরোতে পারছে না কিশোর। এমনকি সোজা হয়ে দাঁড়াতেও পারছে। মেঝে দুলছে অশান্ত সাগরের মত। তক্তা আঁকড়ে ধরে কোনমতে দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা চালাল।
আটকা পড়ল ও।
কেঁপেই চলেছে ধরণী। থামবে না নাকি? বসে পড়তে বাধ্য হয়েছে কিশোর। সিনেমায় দেখেছে, ভূমিকম্পের সময় কি রকম করে মাটি ফাঁক হয়ে যায়। তার ভেতরে তলিয়ে যায় ডাইনোসরের মত বিশাল প্রাণীও। কল্পনায় সেসব দেখতে দেখতে শিউরে উঠল সে। তার নিচেও ওরকম ফাঁক হয়ে যাবে না তো? তলিয়ে যাবে না তো মাটির গভীরে? তার পর হাজার বছর পরে ভবিষ্যতের কোন প্রত্নতাত্ত্বিক খুড়ে বের করবে তার ফসিল হয়ে যাওয়া কঙ্কাল…
চারপাশে গুঙিয়ে চলেছে খুঁটি আর তজ্ঞা। দেয়াল থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যে টানাটানি করছে ছাত। কাছেই বিকট একটা শব্দ হল। ধড়াস করে এক লাফ মারল কিশোরের বুক। এই বুঝি গেল বাড়িটা। না, পুরোটা নয়, একটা দেয়াল ধসে পড়েছে। আরও বিকট আরেকটা শব্দ হল। আস্ত একটা বাড়ি ধসেছে। এটাও পড়বে। হঁটকাঠের তলায় জ্যান্ত কবর হয়ে যাবে তিন গোয়েন্দার।
অবশেষে দীর্ঘ এক যুগ পরে যেন থামল ধরণীর কম্পন। কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়াল কিশোর। ঘরের কালো অন্ধকারের মাঝে চারকোণা একটা ফ্যাকাশে ফোকর চোখে পড়ল। জানালা। তারমানে দেয়ালটা দাঁড়িয়েই আছে। সাংঘাতিক শক্ত বাড়ি তো! ধসে পড়ার আর ভয় নেই।
অন্ধকারে বলে উঠল মুসা, বাপরে বাপ! কাণ্ডটা কি হল। এভাবে ভূমিকম্পের মধ্যে আর পড়িনি কখনও।
নাগরদোলায় চড়লাম! রসিকতার চেষ্টা করল রবিন, জমল না, কোলা ব্যাঙের স্বর বেরোল তার গলা দিয়ে।
পিকোর কথা মনে পড়ল কিশোরের। ভুমিকম্প শুরুর আগে পাশের ঘরটায় ছিল সে। এখনও কি আছে?
কাঁপা পায়ে দরজার কাছে এগিয়ে গেল কিশোর। ঘরটা এখন আর আগের মত অন্ধকার নয়। দেয়াল ধসেছে। রাস্তার গাড়ির আলো এসে পড়েছে ভেতরে। বাতাসে ধুলো উড়ছে। ভারি, কেমন যেন শ্যাওলা শ্যাওলা গন্ধ। পিকোকে দেখা গেল না।
অসংখ্য আলো আছে রাস্তায়। গাড়ির। তবে সব অচল হয়ে আছে। দাঁড়িয়ে গেছে সব। লোকের চিৎকার, গাড়ির তীক্ষ্ণ হন, আগের নীরবতার কিছুই অবশিষ্ট নেই আর এখন। নড়ছে না একটা গাড়িও, কিংবা হয়ত নড়তে পারছে না।
রাস্তার পাশের বাড়িটার দিকে তাকিয়ে চমকে গেল কিশোর। কয়েক মিনিট। আগেও যেটা আস্ত ছিল, সেটার অনেকখানিই ধসে পড়েছে এখন। বাড়ি বলেই চেনা যায় না আর। তিন দিকের দেয়াল নেই। বাকি একটা দেয়ালের ওপর কাত হয়ে ঠেস দিয়ে রয়েছে কোনমতে ছাতটা।
ওটাই সেই বাড়ি! যেটাতে লিসটারকে বন্দি করে রেখেছিল পিকো!
সর্বনাশ! গুঙিয়ে উঠল রবিন। ভু-ভর্তা হয়ে গেছে…
থেমে গেল একটা গাড়ির আলো দেখে। উঁচুনিচু জমিতে ঝাঁকুনি খেতে খেতে, এগিয়ে আসছে ওটা। অন্ধকারের চাদর ফুড়ে দিয়েছে যেন ওটার হেডলাইট। বিদ্ধ করেছে পিকোকে।
ধসে যাওয়া বাড়ির দিকে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রয়েছে সে। এগিয়ে আসা গাড়িটার দিকে তাকাল। অন্ধ করে দিয়েছে যেন তাকে হেডলাইট। পেছনে যে আরেকটা গাড়ি আসছে দেখতেই পেল না। হাতের ওপর জ্বলছে লাল-নীল আলো। পুলিশের গাড়ি।
হাসি ফুটল কিশোরের মুখে। এসে গেছে পুলিশ।
ফিরে তাকাল পিকো। ছেলেরা যে বাড়িটায় রয়েছে সেদিকে। হাতে এখনও রয়েছে বেজবল ব্যাটটা। বেরিয়ে পড়ল তিন গোয়েন্দা। সতর্ক রয়েছে। পিকো ব্যাট উঁচিয়ে তেড়ে এলেই সরে যাবে তিন দিকে। কিন্ত এল না লোকটা। বরং ব্যাটটা হাত থেকে ফেলে দিয়ে দৌড় দিল। ছুটতে ছুটতে হারিয়ে গেল ধসে পড়া বাড়ির দেয়ালের আড়ালে।
জোরে ঝাঁকুনি দিয়ে থেমে গেল পুলিশের গাড়ি। ঝটকা দিয়ে খুলে গেল দরজা। লাফিয়ে নামল দুজন অফিসার। ধসে পড়া বাড়িটার দিকে দৌড় দিল। আরনিও নামল। লিসটারের নাম ধরে চিৎকার করে ডাকতে ডাকতে ছুটল, বলল, আর কোন ভয় নেই।
জবাবে ভেসে এল আরেকটা কণ্ঠ, রেডিওর স্পীকারের মত কড়কড় করে উঠল যেন, জলদি এস! গাধা কোথাকার! আস্ত একটা বাড়ি ধসে পড়েছে আমার ওপর, আর বলছে কোন ভয় নেই! রামছাগল!
ডেভিড লিসটার। বেঁচে আছেন এখনও। ধসে পড়া বাড়ির নিচে চাপা পড়েছেন। এত বড় বিপদে থেকেও মেজাজের সামান্যতম পরিবর্তন হয়নি তার।
পিকোর পিছু নিয়েছে পুলিশ। রাস্তায় পৌঁছার আগেই ধরে ফেলল তাকে। হাতকড়া পরিয়ে দিল। নিয়ে আসতে লাগল গাড়ির দিকে।
ও-ই কিডন্যাপার, অফিসারদের দিকে এগিয়ে গেল রবিন।
পুলিশের হাত থেকে হ্যাঁচকা টানে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল পিকো। লাফ দিয়ে এসে লাথি মারার চেষ্টা করল রবিনকে। ঝট করে সরে গেল রবিন।
আবার তাকে চেপে ধরল পুলিশ। শক্ত করে, যাতে আর ছুটতে না পারে। টেনেহিঁচড়ে গাড়িতে এনে তুলল।
দেয়ালের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছে আরনি। চিৎকার করে বলল, ভয় নেই, মিস্টার লিসটার, আমরা আপনাকে বের করে আনব।
তাহলে করছ না কেন? সারারাত লাগাবে নাকি? খেঁকিয়ে উঠলেন লিসটার।
এই সময় মনে পড়ল আরনির, সে কে, কেন এখানে এসেছে। বাবার কথা ভাবল। যাকে ধংস করে দিয়েছে দেয়ালের নিচে চাপা পড়ে থাকা ওই বুড়োটা।
মিস্টার লিসটার, চুপ করে থাকুন! বলল সে। ফিরে গেল তার গাড়িতে। ভেতরে ঢুকে চুপ করে বসে রইল। আর কোন সাহায্য করতে রাজি নয়। বেরোলই না আর। মাঠের ওপর দিয়ে যখন নাচতে নাচতে ছুটে এল এলেনার গাড়িটা, তখনও না।
আসার সময় ফোন করে এসেছে নিশ্চয় এলেনাকে, অনুমান করল মুসা। আসতে এত দেরি হয়েছে সে জন্যেই। সব দিক গোছগাছ করেই এসেছে।
এলেনার সঙ্গে এসেছেন ওর মা। বাবা কোথায় আছে জানতে পেরে যেন পাগল হয়ে গেল মেয়েটা। দেয়ালের জানালা দিয়েই গিয়ে ঢুকতে চাইল। তাকে ধরে রাখলেন মা, যেতে দিলেন না।
আপনারা কিচ্ছু ভাববেন না, একজন অফিসার বলল। যা করার আমরা। করছি।
যা করার একটু জলদি করলে ভাল হয় না? চেঁচিয়ে বললেন লিসটার। ধুলোয় দম আটকে যাচ্ছে তো! লাশ হয়ে গেলে আর বের করে লাভ কি?
মড়মড় করে উঠল কাত হয়ে থাকা ছাত। গোঙাল। বাকি দেয়ালটাকেও ধসিয়ে দেয়ার হুমকি দিচ্ছে।
জানালা দিয়ে ঢুকে পড়ল দুই অফিসার। বাইরে যারা রইল, তারা দম বন্ধ করে অপেক্ষা করতে লাগল। আপাতত পড়বে না আর দেয়ালটা, যতই হুমকি। দিক। ছাতটাও এমনভাবে আটকে গেছে পড়ার ভয় নেই। যদি আবার কাঁপুনি শুরু না হয়। বড় ভূমিকম্পের পরে মাঝে মাঝেই আবার শুরু হয় কাপুনি, বিরতি দিয়ে দিয়ে। সে রকম একটা কম্পন এলেই সর্বনাশ। এখন সামান্য একটা কাপুনিই। ছাতটাকে ধসিয়ে দিতে যথেষ্ট।
তবে আর কোন কম্পন শুরু হল না। খানিক পরে জানালা দিয়ে বেরিয়ে এল। একজন অফিসার। ছেলেদের দিকে তাকিয়ে ভুরু কুচকাল। মেঝের সঙ্গে শেকলে বাধা। একথাটা জানানো হয়নি আমাদের। অনেকটা অভিযোগের সুরেই বলে গাড়িতে ফিরে গেল সে। সাহায্যের জন্যে ফোন করতে।
দমকলের গাড়ি এল ফোন পেয়ে। আধ ঘণ্টা পর। তবে এসে আর দেরি করল না একটা মুহূর্ত। আটকা পড়া মানুষকে উদ্ধার করার ট্রেনিং আছে ওদের। দুজন ঢুকে গেল জানালা দিয়ে। ভেতরের অবস্থাটা দেখে এল। একটা লোহাকাটার করাত চাইল সহকর্মীদের কাছে। করাত দিয়ে কাজ সারার পর চাইল একটা শাবল। ধ্বংসস্তূপের ভেতরে তাদের কাজ করার বিচিত্র শব্দ হতে লাগল। একটা স্ট্রেচার ঢোকান হল জানালা দিয়ে। এর খানিকক্ষণ পরে ওই পথেই বের করে আনা হল লিসটারকে।
ততক্ষণে একটা অ্যাম্বুলেন্স চলে এসেছে।
খবরদার, মাথামোটার দল! অ্যাম্বুলেন্সে তোলার সময় চিৎকার করে বললেন লিসটার, ছেড়ে দিও না!
বাবার পাশে পাশে এসেছে এলেনা। ওফ, আব্বা, একটি বারের জন্যেও কি চুপ থাকতে পার না! বাবার সঙ্গে সে-ও অ্যাম্বুলেন্সে উঠল। হাসপাতালে যাবে।
ঠিক ওই সময় আবার কেঁপে উঠল মাটি। মা-ভূমিকম্প ঘুরে যাওয়ার পরে হাজির হয়ে গেছে ছানা-ভূমিকম্প। ছোট ছোট কয়েকটা ঝাঁকুনি দিল। যেন হ্যাঁচকা টানে কাত করে ফেলল অবশিষ্ট দেয়ালটাকে, পুরোপুরি ধসিয়ে দিল ছাত, একটু আগেও যেটার নিচে আটকা পরে ছিলেন ডেভিড লিসটার। ধুলো উড়তে লাগল চারদিকে।
তৈরি হয়ে অপেক্ষা করছে তিন গোয়েন্দা। স্যালভিজ ইয়ার্ডে আসবেন ডক্টর ত্রুগার মনটাগো। লিসটারকে উদ্ধার করে আনার পর পুরো একটা হপ্তা পেরিয়ে গেছে। তিনি এলে তাকে নিয়েই মিস্টার ভিকটর সাইমনের ওখানে যাবে ওরা। চিত্রপরিচালক মিস্টার ডেভিস ক্রিস্টোফার নেই হলিউডে। জরুরী একটা কাজে ইউরোপ চলে গেছেন। তবে যাবার আগে দেখা হয়েছে গোয়েন্দাদের সঙ্গে। কেসের রিপোর্ট পড়েছেন। গল্পটা ভারি পছন্দ হয়েছে তাঁর। ছবি বানাবেন। চিত্রনাট্য লিখে দিতে অনুরোধ করেছেন মিস্টার সাইমনকে।
তাকে পুরো গল্পটা শোনাতেই তিন গোয়েন্দার যাওয়ার কথা আজ। রওনা হবে হবে করছে, এই সময় ফোন এসেছে রুক্সটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, ডক্টর মনটাগোর। দেখা করতে আসতে চাইলেন তিনি। বিশপের বইটাতে কি লেখা আছে বলার জন্যে।
গাড়ি নিয়ে এলেন তিনি। কোথায় কি জন্যে যেতে হবে তিন গোয়েন্দাকে, খুলে বলল তাকে কিশোর।
আপনিও যেতে পারেন, মুসা বলল। অসুবিধে নেই। মিস্টার সাইমন খুব ভাল মানুষ। তাকে আপনারও ভাল লাগবে। অনেক বড় গোয়েন্দা। তেমনি বড় লেখক। কোনটাতে যে বেশি সুনাম কামিয়েছেন, বলা মুশকিল। বিরাট এক বাড়ির মালিক। এককালে ওটা সরাইখানা ছিল।
তাই নাকি? মনটাগো বললেন। শুনে তো যাওয়ার জন্যে লোভই হচ্ছে।
লোভটাকে আরও বাড়িয়ে দেয়ার জন্যেই রবিন বলল, শুধু কি বাড়ি। ভিয়েতনামী একজন কাজের লোকও আছে। নাম নিসান, জাং কিম। সে-ও খুব ভাল। তবে একটা দোষ আছে, অদ্ভুত সব খাবার রান্না করার ঝোঁক। আর সুযোগ পেলেই মানুষকে খাইয়ে সেসব রান্না কেমন হয়েছে পরীক্ষা করার প্রবণতা। কিছু। কিছু রান্না তো দারুণ! আর কিছু কিছু…মুখেই দেয়া যায় না!
আর লোভ সামলাতে পারলেন না ডক্টর মনটাগো। তিন গোয়েন্দার সঙ্গে যেতে রাজি হলেন। বিশপের বই নিয়ে আলোচনা ওখানেও করা যাবে।
ডক্টরের গাড়িতেই চলল তিন গোয়েন্দা। সামনে বসল কিশোর, ড্রাইভারের পাশের সীটে। রবিন আর মুসা বসল পিছনে। পথ দেখিয়ে দিতে লাগল কিশোর। কোস্ট হাইওয়ে থেকে মোড় নিয়ে সরু একটা পাহাড়ী পথে উঠল গাড়ি। কিছু দূর এগোনোর পর বিরাট একটা শাদা রঙ করা বাড়ি চোখে পড়ল।
এই কিশোর, দেখ, পেছন থেকে বলল মুসা। বাড়ির দরজা খোলা। বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে ছোট একটা মেয়ে। একটা চামড়ার ফিতে দিয়ে কপাল আর চুল বাঁধা। তাতে পাখির লাল পালক গোঁজা।
ইনডিয়ান মেয়ে! মনটাগো বললেন। ওর কথা তো কিছু বলনি।
নতুন এসেছে মনে হয়, জবাব দিল কিশোর। ইনডিয়ানদের মত লাগছে, তবে ইনডিয়ান নয়।
ভাল করে দেখে ডক্টরও একমত হলেন কিশোরের সঙ্গে। মেয়েটা এশিয়ান। লজ্জিত ভঙ্গিতে হেসে হাত নাড়ল। নিসান জাং কিম বেরিয়ে এল বারান্দায়। মেয়েটার হাত ধরল।
চুমাশ রাজকুমারীর পোশাক পরেছে। সুন্দর না? মেয়েটার কথা বলল কিম, ক্যালিফোর্নিয়ার আদিম মানুষের আচার আচরণ শিখছে।
মনটাগোকে নিয়ে বারান্দার দিকে এগোল তিন গোয়েন্দা। আরও কয়েকটা বাচ্চা বেরিয়ে এল। সবাই এশিয়ান। পরনে ইনডিয়ান পোশাক।
পূর্ব-পশ্চিমের মধ্যে বন্ধুত্বের চেষ্টা করছে এরা, বুঝিয়ে বলল কিম। আমেরিকানদের রীতিনীতি শেখাচ্ছে আমাদের দেশের বাচ্চাদের। যাতে সহজেই যে কোন আমেরিকান ইস্কুলে ভর্তি হতে পারে। সহপাঠীদের সাথে মিশতে পারে। এক দেশ থেকে আরেক দেশে পড়তে গেলে আর সে দেশের কিছুই জানা না থাকলে অসুবিধে হয়ে যায়।
প্রজেক্টটা তাহলে নতুন শুরু করলেন, হেসে বলল রবিন।
হ্যাঁ, করলাম।
ইনডিয়ানদের দিয়েই শুরু? আরও তো লোক রয়েছে আমেরিকায়।
তা আছে। তবে আসল অধিবাসী তো ইনডিয়ানরাই। এখানে তাদের রীতিনীতিই হল খাঁটি। বাকি সব ভেজাল। নানা দেশের লোক এসে ভিড় জমিয়েছে আমেরিকায়, সব তালগোল পাকিয়ে ফেলেছে। সে জন্যে ইনডিয়ানদেরই বেছে নিয়েছি। আজকে ওদেরকে রান্না শেখাচ্ছি। চুমাশ ইনডিয়ানদের রান্না। পাহাড়ী এলাকায় গিয়ে শিখে এসেছি। অ্যাক্রন কেক। ক্রীমড ড্যানডেলিয়ন। আর হজমের সুবিধের জন্যে রোজহিপ চায়েরও ব্যবস্থা করব।
মারছে! বিড়বিড় করল মুসা, অবশ্যই নিচু স্বরে, যাতে কিম শুনে না ফেলে।
বেরিয়ে এলেন ভিকটর সাইমন। বাচ্চাদেরকে ভেতরে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিল কিম। ডক্টর মনটাগোর সঙ্গে তাঁর পরিচয় করিয়ে দিল কিশোর। আসার উদ্দেশ্যও জানাল। বিশপের বই নিয়ে আলোচনা করতে চান ডক্টর। হাত মেলালেন সাইমন। খুব খুশি হলেন। তিন গোয়েন্দার দিকে ফিরে ওয়েলকাম জানালেন ওদেরকেও।
প্রথমেই প্রশ্ন করল মুসা, আচ্ছা, স্যার, এই ক্রীমড ড্যানডেলিয়নের ব্যাপারটা কি বলুন তো?
মুচকি হাসলেন সাহিত্যিক গোয়েন্দা। ভয় নেই। কড়া নির্দেশ দিয়ে দিয়েছি আমি। আমরা চুমাশ নই, ভিয়েতনামী শিশুও নই যে আমেরিকানদের রীতি শিখতে হবে। কাজেই পাহাড় থেকে শিখে আসা কোন ইনডিয়ান খাবার চলবে না। সকালে আমি নিজে বাজারে গিয়ে পছন্দ মত খাবার কিনে এনেছি। আলাপ আলোচনা শেষ হোক, তারপর খেতে বসব।
হাঁপ ছেড়ে বাচল যেন তিন গোয়েন্দা। যাক, অন্তত এই একটা দিন সাইমনের বাড়িতে এসে তার ভিয়েতনামী বাবুর্চি কিমের অত্যাচার সহ্য করতে হবে না। অ্যাক্রন কিংবা ড্যানডেলিয়ন চেখে দেখার কোন ইচ্ছেই ওদের নেই।
পথ দেখিয়ে মেহমানদেরকে মস্ত ঘরটায় নিয়ে এলেন সাইমন, যেটা থেকে সাগরের চমৎকার দৃশ্য দেখা যায়। সরাইখানা চালু থাকার সময় এ ঘরটা ছিল প্রধান ডাইনিং রুম। এখন হয়েছে একাধারে লিভিং রুম, লাইব্রেরি আর অফিস। কফি টেবিল ঘিরে বসল সবাই। কেসের রিপোর্ট ফাইলটা ঠেলে দিল রবিন। এতে সব নেই, বলল সে। সেগুলো ডক্টর মনটাগো মুখেই বলবেন।
মাথা ঝাঁকালেন ডক্টর। আগে ফাইলটা পড়া শেষ করুন। আমার কাহিনী অনেক পুরনো একটা রহস্য নিয়ে। চারশো বছর আগের। তাড়াহুড়া নেই। সব বলা যাবে।
পড়তে আরম্ভ করলেন সাইমন। রান্নাঘরে শোনা যাচ্ছে বাচ্চাদের কলরব। কিন্তু পড়তে পড়তে এতই মগ্ন হয়ে গেলেন তিনি, সে সব শব্দ কানেই ঢুকল না। শেষ পৃষ্ঠাটাও শেষ করে মুখ তুললেন। হাসলেন। ভূমিকম্পের ঝাঁকুনি খেয়েও তাহলে লিটারের মেজাজ ঠিক হয়নি! হাহ্ হাহ্।
কিশোরও হাসল। চিতাবাঘ কি আর চামড়ার ফোঁটা মুছে ফেলতে পারে। সিয়েটাও কিন্তু কম বদমেজাজী নয়। দুজনে মিলেছিল ভাল।
দুটো দক্ষিণ আমেরিকান দেশে সিয়েটাকে খুঁজছে পুলিশ, রবিন জানাল। বড় রকমের অপরাধী। জীবনের বেশির ভাগ সময়ই কাটিয়েছে জেলখানায়। বিশপের ডায়রি চুরির ব্যাপারে তার হাত কতটা ছিল, ডক্টর মনটাগো সেটা ভাল বলতে পারবেন। এসব নিয়ে গবেষণা করেছেন তিনি। আগেও অনেক অপরাধ। করেছে সিয়েটা। তবে বিশপের বই হাতে গিয়েই প্রথমবার পুলিশের হাতে ধরা পড়ল। জেলে গেল। তার পরে কুকাজ করতে গিয়ে আরও কয়েকবার জেলে গেছে।
অ্যাটাচি কেস খুলে চামড়ায় বাধানো পুরনো বইটা বের করলেন মনটাগো। আইলিন লিসটারে ওটা খুঁজে পেয়েছিল কিশোর। আমি এখন শিওর, ডক্টর বলতে লাগলেন, এটাই বিশপ এনরিক জিমিনিজের হারানো ডায়রি। অনেক বছর আগে বোগোটাতে বাস করতেন তিনি। সোনার খনিতে ইনডিয়ান শ্রমিকদের ওপর অমানুষিক অত্যাচার করার কারণে লোকে তার নাম দিয়েছিল রক্তাক্ত বিশপ। স্প্যানিশ বিজেতাদের দখল করা পান্নার খনিও দেখাশোনা করেছেন তিনি। স্প্যানিশ কলোনির একজন উঁচুদরের লোক ছিলেন। গভীর আঁতাত ছিল। সরকারের সঙ্গে।
লোকে বলে তিনিও অত্যাচারী ছিলেন। অথচ বিশপ তার ডায়রিতে লিখে গেছেন, খনির শ্রমিকদের ওপর স্প্যানিশদের অত্যাচারে তিনি মর্মাহত। সেসব অত্যাচার ঠেকানোর জন্যেই নাকি খনি পরিদর্শন করতে গিয়েছিলেন তিনি। একটা পান্নার খনিতেও গিয়েছিলেন। এক চিলতে জমিতে পাওয়া গিয়েছিল খনিটা। বেশি গভীরে খুঁড়তে পারেনি ইনডিয়ানরা, কেবল ওপরটা কিছুদূর খুঁড়েছিল। আরও ভেতরে কেন নামতে পারছে না ওর। সেজন্যে সাংঘাতিক অত্যাচার চলছিল। ওদের ওপর। দেখেশুনে আর স্থির থাকতে পারেননি বিশপ। ছুটে এসেছিলেন। বোগোটায়। স্প্যানিশ সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করার জন্যে। যাতে ইণ্ডিয়ানদেরকে খনির কাজ থেকে রেহাই দেয়া হয়। সরকার কিছু করার আগেই পর্বতে ভূমিধস ঘটল। যে খনিটা দেখে এসেছিলেন বিশপ, সেটা চাপা পড়ে গেল। অনেক মাটির তলায়।
এ পর্যন্ত বলে থামলেন মনটাগো। দম নিলেন। তারপর ডায়রি খুলে পড়ে অনুবাদ করে বলতে লাগলেন, কয়েক মাস ধরে খুঁড়ল অনেক লোক মিলে। মাটি সরানোর চেষ্টা করল। কাজটা মারাত্মক বিপজ্জনক। আরও ভূমিধস নামতে পারে। আলগা মাটি খসে পড়ে মানুষকে চাপা দিতে পারে। কিন্তু এত বিপদের মধ্যেও লোকগুলোকে কাজ করতে বাধ্য করল সৈন্যরা। বিদ্রোহী হয়ে উঠল ইনডিয়ানরা। আর খুড়তে অস্বীকার করল। এই সময় আদেশ এল সরকারের কাছ থেকে, খনিটা বাতিল বলে ঘোষণা করা হয়েছে। ওটাতে আর কাজ করানোর দরকার নেই। বাঁচল ইনডিয়ানরা। তবে ঈশ্বরের অশ্রু খুঁজতে গিয়ে অনেক অশ্রু ঝরে গেছে ততদিনে।
হুমম! মাথা দোলালেন সাইমন। এতদিন তাহলে ভুল কথা জেনে এসেছি। বিশপ অন্যায় করেননি। অত্যাচারী ছিলেন না।
অযথা বদনামের ভাগী হয়েছেন, মুসা বলল। সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস…
বইয়ের মাঝখানে নাকি কিছু পৃষ্ঠা নেই। সাইমন জিজ্ঞেস করলেন, সেগুলোতে কি লেখা ছিল? কিছু বুঝতে পেরেছেন?
ওগুলোই ছিল আসল, মনটাগো জানালেন। খনিটার অবস্থান। বোগোটা থেকে রওনা দিয়ে খনিতে পৌঁছতে যে কদিন লেগেছিল সে কদিনের কথা নিশ্চয়। লেখা ছিল ওই পৃষ্ঠাগুলোতে। ওই লেখার নির্দেশ পড়ে গিয়ে পৌঁছানো যাবে, সোগামোসোর সেই পান্নার খনিতে। যে জায়গায় বৃদ্ধা মহিলা তার ছায়া ফেলবে সেখানেই পাওয়া যাবে খনিটা। বৃদ্ধা মহিলা, অর্থাৎ ওল্ড উয়োমেন হল অ্যানডিজ পর্বতমালার একটা চুড়ার নাম। স্থানীয় ইনডিয়ানরা ওই নাম রেখেছে।
বহু বছর ব্যক্তিগত সংগ্রহে ছিল বিশপের ডায়রি। মালিক জানতই না এটাতে কি লেখা রয়েছে। তার হাত থেকে চলে গেল এক বই ব্যবসায়ীর হাতে, দুর্লভ বই কিনে বিক্রি করত ওই ব্যবসায়ী। তার মনে হয়েছিল মূল্যবান আবিষ্কার। করা যাবে ও বইয়ের লেখার মানে বের করতে পারলে। কিন্তু বের করার আগেই চুরি হয়ে গেল বইটা। পুলিশ সন্দেহ করল ব্যবসায়ীর অ্যাসিসটেন্টকে। লোকটার বাসায় গিয়ে হানা দিল একদিন। বেশ কিছু দুর্লভ দলিল বের করল ওখান থেকে। সব চোরাই মাল। দোকান থেকে চুরি করে নিয়ে গেছে। তবে যেটার জন্যে যাওয়া সেই ডায়রিটাই পেল না।
তাই? ডিটেকটিভ বললেন। ওই অ্যাসিসটেন্ট নিশ্চয় আমাদের সিয়েটা।
হ্যাঁ, জবাবটা দিল মুসা। শুরুতে সব অস্বীকার করে সিয়েটা। বলে সে কিছু জানেই না। শেষে চাপে পড়ে বলে একজন আমেরিকান দোকানে ঢুকে ডায়রিটা নিয়ে চলে গেছে। জ্যাকেটের নিচে লুকিয়ে। একথাও বিশ্বাস করেনি পুলিশ। জেলে পাঠিয়ে দিল তাকে।
আসলে কি ঘটেছিল আন্দাজ করতে পারি আমরা, রবিন বলল। কিমের রান্নাঘরে হঠাৎ যেন এক ঝলক হাসির ঝড় উঠল। সেটা মিলিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত। অপেক্ষা করতে হল তাকে। এখনও কেউ মুখ খুলছে না, সিয়েটাও না, লিসটারও না। এলেনার কাছে তার বাবার সম্পর্কে যা শুনেছি তাতে একটা ধারণা করতে। পারি আমরা। এক সময় নাবিক ছিলেন লিসটার, দেশে দেশে ঘুরে বেড়াতেন। বন্দরে জাহাজ থামলে বসে থাকতেন না। যতটা পারতেন ঘুরে বেড়াতেন দেশের ভেতরে। প্রচণ্ড উচ্চাকাভক্ষা ছিল তার। সব সময় সুযোগ খুজতেন। বোগোটায়। কোন ভাবে পরিচয় হয়েছিল সিয়েটার সঙ্গে। ডায়রিটা, পড়েই হোক কিংবা যে ভাবেই হোক সোগামোলোর পান্নার খনির কথা জেনে ফেলেছিল সিয়েটা। সেটা বলেছিল লিসটারকে। তারপর দুজনে মিলে চুরি করে ডায়রিটা। সিয়েটার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেন লিসটার। ফলে সিয়েটা গেল জেলে আর তিনি দেশে ফিরে এলেন বিপুল টাকার মালিক হয়ে।
তার মানে পান্নার খনিটা তিনি পেয়েছিলেন, সাইমন বললেন।
তাই তো মনে হয়, কিশোর বলল। বিশপের ডায়রিতে যে পথের কথা লেখা আছে সে ভাবে চলে আমরাও পৌঁছতে পারব খনির কাছে। পড়া খুব কঠিন।
স্প্যানিশ না জানলে হবে না।
মাথা ঝাঁকালেন মনটাগো। কিছু কিছু জানা থাকলে অবশ্য পারতেও পার। ডিকশনারি আর রেফারেন্স বইয়ের সাহায্য নিয়ে। আমার বিশ্বাস লিসটারও তাই করেছিলেন। গত চারশো বছরে স্প্যানিশ ভাষার ততটা পরিবর্তন হয়নি।
আইলিন লিসটারে গেল কি করে ডায়রিটা? জানতে চাইলেন সাইমন।
মনে হয়, রবিন বলল। পান্নার দরকার হলেই জাহাজ নিয়ে কলাম্বিয়ায় চলে যেতেন লিসটার। ওই ডায়রিটাই হল খনিতে যাওয়ার পথ নির্দেশক। তাই ওটা সঙ্গে রাখতেন। যদি ভুল হয়ে যায় দেখে মিলিয়ে নেয়ার জন্যে। শেষবার যাওয়ার পর আর অনেকদিন যাবেন না বুঝতে পেরেই হয়ত আসল পাতাগুলো ছিঁড়ে নিয়ে এসেছিলেন। লুকিয়ে রেখেছিলেন বাড়িতে। ডায়রিটা ফেলে রেখেছিলেন সাধারণ বইয়ের সঙ্গে। কারণ ওটার আর তখন দাম নেই। তবু কোন জিনিস ফেলে দেয়ার স্বভাব নয় তো, রেখে দিয়েছিলেন।
হুঁ। তাহলে বড় লোক হওয়ার পুঁজিটা তিনি পান্নার খনি থেকেই জোগাড় করেছেন। জানালা দিয়ে সাগরের দিকে তাকালেন সাইমন। আবার মুখ ফিরিয়ে বললেন, তারপর তার অপরাধের সঙ্গী এসে সেদিন মেয়ের পার্টিতে হাজির হল। দেখে ভীষণ চমকে যাওয়ারই কথা।
হয়েছেন মানে। একেবারে অ্যানজিনার অ্যাটাক হয়ে গিয়েছিল। অনেক বছর পরে দেখা। তবু তাকে চিনতে ভুল করেনি সিয়েটা।
মুসা বলল, আমি যখন লিসটারের কাছে বসে ছিলাম, ঘুমের ভান করে পড়ে ছিলেন তিনি। আসলে তার মনে তখন দুশ্চিন্তার ঝড়। বুঝে ফেলেছিলেন সিয়েটা প্রতিশোধ নেয়ার চেষ্টা করবেই। ডায়রিটা চাইবে। কিন্তু তখনও ওটা দেয়ার ইচ্ছে ছিল না লিসটারের। অন্তত আসল পাতাগুলো। তাই পয়লা সুযোগটা পেয়েই আমাকে বাথরুমে আটকে পাতাগুলো বের করে ফায়ারপ্লেসে ফেলে পুড়িয়েছেন। তারপর কমপিউটার রুমে গিয়ে একটা মেসেজ লিখলেন এলেনার জন্যে। খনিটার কথা মেয়েকে বোঝাতে চেয়েছেন তিনি, যদি তার কিছু ঘটে যায় তাহলে এলেনা যাতে গিয়ে খুঁজে বের করতে পারে ওই সম্পদ।
শ্রদ্ধা চলে যাচ্ছে আমার লোকটার ওপর থেকে, বিরক্ত কণ্ঠে বললেন সাইমন। লিসটার ভীষণ লোভী। যা আনার তো এনেছিল, প্রয়োজনের অতিরিক্ত, আর কেন? ডায়রিটা সিয়েটাকে দিয়ে দিলেই হত। ..
ঠিকই বলেছেন, মাথা ঝাঁকাল মুসা। আমি বাথরুমে আটকা পড়ে আছি। নিশ্চয় ওই সময়টাতেই পা টিপে টিপে দোতলায় উঠে এসেছিল সিয়েটা। আমাকে বাথরুম থেকে বের করতে এসেছিলেন তখন লিসটার, সিয়েটার জন্যে পারেননি। একটা বালিশ এনে তার মুখ চেপে ধরেছিল সিয়েটা, যাতে চেঁচাতে না পারেন। ভয় দেখানোর জন্যেও হতে পারে। টানাটানিতে গেল ওটা ছিঁড়ে। তখন দ্বিতীয়। বালিশটা নিয়ে এল সিয়েটা। বেহুশ করে ফেলল লিসটারকে। বোধহয় খুন করে ফেলেছে বলে ভয় পেয়ে গিয়েছিল সিয়েটা। সে চেয়েছিল ভয় দেখিয়ে ডায়রিটার কথা বের করে নেবে। খুনের ইচ্ছে ছিল না। ঘাবড়ে গিয়ে লাশ সরিয়ে ফেলার। জন্যেই লিসটারকে সরিয়ে নিয়ে যায়, এমন ভাবে, যাতে সবাই ভাবে নিজে নিজেই। চলে গেছেন লিসটার।
বাড়ি থেকে বের করল কিভাবে? জানতে চাইলেন সাইমন।
ঠেলাগাড়িতে করে। ময়লা টেবিলক্লথ দিয়ে ঢেকে।
শেষ পর্যন্ত ময়লার গাড়ি? হাহ।
আগের কথার খেই ধরল কিশোর, পার্টি শেষে ডেকোরেটরের জিনিসপত্র। ফেরত দিয়ে আসার দায়িত্ব ছিল সিয়েটার ওপর। ভেবেছিল তখনই সুযোগ করে। লিসটারের লাশটা নিয়ে গিয়ে গুম করে ফেলবে কোথাও। কিন্তু লাশ বের করতে গিয়ে দেখে মরেননি লিসটার, বেহুশ হয়ে আছেন। অ্যানজিনার অ্যাটাক, এমনিতেই দুর্বল শরীর, তার ওপর ওই ধকলে একেবারে কাহিল হয়ে পড়েছিলেন।
এতে মস্ত সুযোগ পেয়ে গেল সিয়েটা, কিশোরের মুখের কথা টেনে নিয়ে বলল রবিন। লিসটারকে বন্দি করল নিয়ে গিয়ে ওই নির্জন বাড়িটায়। যত চেঁচামেচিই করুন, ওখানে কারও কানে যাবে না। আর পোড়ো বাড়িতেও মানুষ। থাকতে পারে, এতে সন্দেহের কিছু নেই। ভবঘুরেরা যেখানে সেখানে রাত কাটায়। কাজেই বাড়িটা থেকে সিয়েটাকে বেরোতে যদি কেউ দেখেও থাকে, কেয়ারই করেনি। খুঁজেপেতে ভাল বাড়িই বের করেছিল সিয়েটা। যে ঘরে লিসটারকে আটক করেছিল সে, সেটা নিশ্চয় মেশিরুম ছিল। কোন বড় ধরনের মেশিন ছিল ওখানে, যার জন্যে ওই আঙটার প্রয়োজন হত। সিয়েটা সেই আঙটায় শেকল লাগিয়ে বাঁধল লিসটারকে।
তাকে মারতে চায়নি সিয়েটা। তাই নিয়মিত খাবার আর পানি নিয়ে যেত। ডায়রিটার কথা জিজ্ঞেস করাও উদ্দেশ্য ছিল তার। কিন্তু লিসটার এমনই ধড়িবাজ, সিয়েটাকে দেখলেই বেহুশ হয়ে যাওয়ার ভান করতেন। নড়া নেই চড়া নই কোন প্রশ্নের জবাব দেয়া নেই। ভান যে করছেন সেটা সিয়েটাও বুঝতে পারত। কিন্তু বেশি চাপাচাপি করার সাহস পেত না সে, পাছে মরে যান। খুনের দায় তো চাপবেই ঘাড়ে, খনির ঠিকানাটাও চিরতরে মুছে যাবে।
এখন কেমন আছেন লিসটার? জিজ্ঞেস করলেন সাইমন।
সুস্থ হচ্ছেন, মুসা জানাল। একটা অলৌকিক ব্যাপারই বলা যায়। হাতটা ধসে পড়ল, অথচ একটা আঁচড়ও লাগেনি তার গায়ে।
হুঁ। ভাগ্যবানের বোঝা ভগবানে বয়, হাসলেন ডিটেকটিভ। তবে ভূমিকম্পটা তত বড় ছিল না, তাহলে আর বাঁচতে হত না তোমাদের কারোই। গত হপ্তায় নিউ ইয়র্কে ছিলাম আমি। এখানে যে ভূমিকম্প হয়েছে সেটাকে গুরুত্বই দেয়নি কোন কাগজ।
ওরা যা-ই বলুক, রবিন বলল। আমাদের বারোটা বাজতে যাচ্ছিল আরেকটু হলেই। ভাগ্যিস আমাদের বাড়িটা ধসেনি।
সেজন্যেই তো বলছি, বড় ছিল না। তাহলে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে ফেলত। কেউ বাঁচতে না তোমরা…
নাক কুঁচকালো মুসা। অদ্ভুত একটা গন্ধ আসছে রান্নাঘর থেকে। হঠাৎ করেই নীরব হয়ে গেল চুমাশ ইনডিয়ানদের কোলাহল। ভাগ্যিস ইনডিয়ান হয়ে জনুগ্রহণ করেনি সে। ওরকম বিদঘুঁটে গন্ধ-ওয়ালা খাবার খেয়ে বাঁচার কোন ইচ্ছেই তার নেই। কদিন ধরেই হাসপাতালে আছেন লিসটার, বলল সে। বেড়ালের জান। মরবেন না। ভাল হয়ে উঠছেন দ্রুত। তবে হওয়ার পর আরেকটা ধাকা খাবেন, এলেনা বলেছে আমাদেরকে। বাবা সুস্থ হয়ে উঠলে চিরদিনের জন্যে মায়ের কাছে চলে যাবে সে, আর থাকতে আসবে না। বাবার কাছে। সে বুঝে গেছে, কোন দিনই তার বাবার মেজাজ ঠিক হবে না। ওরকম একটা খেপা লোকের কাছে থাকলে যে কোন সুস্থ মানুষের মাথা খারাপ হয়ে যেতে পারে। এলেনার কথাঃ টাকাই জীবনে সব নয়। টাকার নেশা মানুষের সর্বনাশ করে ছাড়ে।
আর পান্নার খনির ব্যাপারে যা ভেবেছিলাম, রবিন বলল কিছুটা হতাশ কণ্ঠেই। আসলে তা নয়, গোপন নেই আর ওটা। বহু বছর আগেই আবিস্কার হয়ে গেছে। লিসটারই করেছেন। ওটা কোন রহস্য নয়। অযথাই এর পেছনে সময় নষ্ট করলাম।
আরও একটা খবর, মিটিমিটি হাসছেন মনটাগো। লিসটারও জানেন না। অনেক দিন আগে শেষ গিয়েছিলেন তো খনিটাতে, তাই। আমি খোঁজ নিয়ে। জেনেছি কয়েক বছর আগে আরেকটা লোক ওটা আবিষ্কার করে ফেলেছে। কলাম্বিয়ার সরকার দখল করে নিয়েছে এখন ওটা। লিসটার যদি সন্ধান বলতেনও আর সিয়েটা যদি যেতও, কিছুই পেত না। খনির কাছে ঘেঁষতেই দেয়া হত না। তাকে।
আহহা, এটা তাকে জানিয়ে দেয়া উচিত ছিল, জিভ দিয়ে চুকচুক শব্দ করল। মুসা। অযথাই কষ্ট করল বেচারা। খামোকা আবার জেলে গেল।
অপরাধীদের ওরকম সাজাই হয়, সাইমন বললেন।
লিসটারেরও একটা শাস্তি হওয়া উচিত।
আর কি হবে? হয়েছেই ভোস্ত্রী তালাক দিয়ে চলে গেছে। মেয়ে থাকে না। নিজে আধ পাগল। কোটি কোটি টাকা থাকলেই কি না থাকলেই কি। এটা একটা জীবন হল। কেউ তাকে দেখতে পারে না। সম্মান করে না।
আমরাও করি না, ফস করে বলে ফেলল মুসা। বলেই বুঝল কথাটা বলা ঠিক হয়নি। গাল চুলকাতে শুরু করল সে।
মুসার অস্বস্তি বুঝতে পারলেন সাইমন। আসলে সম্মান জিনিসটা জোর করে কাউকে করা যায় না। ভেতর থেকে আসে। তোমাদের আসে না, তো কি করবে।
হাসপাতালে গিয়ে কিশোর যা সব কথা বলে এসেছে না, রবিন বলল। ইজ্জত রাখেনি।
কি বলেছে?
কিশোর আর আমাদেরকে ধন্যবাদ দিচ্ছিলেন লিসটার, আমরা তাকে উদ্ধার করেছি বলে। মুখের ওপর বলে দিল কিশোর, তিনি ওরকম জানলে কখনোই কাজটা করত না। বলেছে, আমরা টাকা নিই না কাজের জন্যে। লোকের উপকার করাই আমাদের ব্রত। কিন্তু যারা অন্যায় করে তাদেরকে সাহায্য করার কোন ইচ্ছে আমাদের নেই।
লিসটার কি বললেন?
চুপ হয়ে গেলেন।
হু! বলবেন আর কি? বলার তো কিছু নেই। এক মুহূর্ত চুপ থেকে জানতে চাইলেন ডিটেকটিভ, আরনি ভিনসেনজোর খবর কি?
একটা ব্যাঙ্কে নতুন চাকরি নিয়েছে, রবিন জানাল। ডি এল ডিপার্টমেন্টাল স্টোরেই বহাল রয়েছে এনথনি, ভাবছে তার, শয়তানীর কথাটা ভুলে যাবেন লিসটার। এলেনার মায়ের সঙ্গে তার একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছে বহুদিন থেকেই, সেটা লিসটারকে জানাতে চায়নি বলেই কিশোরকে দেখে লুকিয়ে পড়েছিল। ভদ্রমহিলাও সে কারণেই ভীষণ অস্বস্তিতে পড়ে গিয়েছিলেন। কিশোরকে বের করে। দেয়ার জন্যে অস্থির হয়ে উঠেছিলেন। মহিলা অবশ্য বলেছেন, তার সঙ্গে…
থাক, হাত তুললেন সাইমন। ওসব কথা শুনতে চাই না। লোকের ব্যক্তিগত ব্যাপার। এইবার আসল কথাটা বল তো। ফাইলে লেখনি। চিলেকোঠার সেই ভুতের ব্যাপারটা। কি ব্যাখ্যা দেবে? কিশোরকে প্রশ্নটা করলেন তিনি।
আমি বুঝতে পারছি না, স্যার, মাথা নাড়ল কিশোর। এটা সত্যিই একটা বড় রহস্য। বের করব একদিন। মিসেস বেকার একটা গল্প বলেছে। মুসা বিশ্বাস করে, আমি করি না। মহিলা বুলে, সেই ছোট্ট মেয়েটা, যে তার ধনী ফুফুর কাছে, বড় হয়েছিল, তাকে একবার সাংঘাতিক মেরেছিল ফুফু। সোনার একটা পিন হারিয়েছিল বলে।
তারপর অনেক ভুগতে হয়েছে মেয়েটাকে। তার পরিবারের সবাই ভাবতে আরম্ভ করে, সে চোরই। আমরা চলে আসার পর চিলেকোঠায় গিয়েছিল মিসেস বেকার, খোঁজাখুজি করতে। যে কোন ব্যাপারে, বিশেষ করে ভূতের, তার খুব কৌতূহল। পুরনো একটা ট্রাঙ্কের ভেতরে লেপের মধ্যে আটকে থাকা এই জিনিসটা বের করে এনেছে, পকেট থেকে একটা সোনার ব্রোচ বের করে টেবিলে রাখল গোয়েন্দাপ্রধান। মিসেস বেকারের ধারণা, এই জিনিসটা চুরির অপবাদ দিয়েই মারধর করা হয়েছিল মেয়েটাকে। কিন্তু আসলে সে চুরি করেনি। ট্রাঙ্কে লেপ ভরার সময় নিশ্চয় টান লেগে বা অন্য কোনভাবে জিনিসটা লেপের মধ্যে ঢুকে গিয়েছিল। সেখানে আর খোঁজেওনি ফুফু, পায়ওনি। মহিলা ওই বাড়িতে থাকতেই মারা গেছে। তার অনেক পুরনো জিনিস এখনও রয়ে গেছে বাড়ির চিলেকোঠায় আর স্টোররুমে। ওই ট্রাঙ্কটাও তারই। বাড়িটা কেনার পর এখন মিস্টার লিসটারের সম্পত্তি হয়ে গেছে।
আমার বিশ্বাস, চিলেকোঠার প্রথম অনুপ্রবেশকারী হল সিয়েটা। এলেনার ওপর ভরসা রাখতে পারেনি সে, তাই নিজেই খুজতে এসেছিল বিশপের বই। দুবার আমার সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। একবার বিরোধ বাধে। আরেকবার এসে এলেনার জিসিনপত্র ঘাটাঘাটি করে যায়। কিন্তু দ্বিতীয়জন যে এসেছে সে কে? সেটার জবাব দিয়েছে মিসেস বেকার। খোঁজ নিয়েছিল সে, ব্রোচটা পাওয়ার পর। মোটর দুর্ঘটনায় নাকি মারা গেছে মেয়েটা। এলেনার পার্টি যেদিন হয় সেদিন। মিসেস বেকার জোর গলায় বলছে, নিশ্চয়, সেই মেয়েটার অশান্ত আত্মাই এসে ঢুকেছে চিলেকোঠায়, ব্রোচটা খুঁজে বের করে মানুষকে দেখানোর জন্যে যে সে সত্যিই ওটা চুরি করেনি, চোর ছিল না।
নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার জন্যে, অন্যমনস্ক হয়ে গেলেন ডিটেকটিভ।
মাথা, ঝাঁকাল কিশোর। সে চোর ছিল না এটা বিশ্বাস করছি। কিন্তু ভূত সেজে চিলেকোঠায় এসেছে একথা আমি বিশ্বাস করব না কিছুতেই। ভূত, প্রেতাত্মা এসব থাকতেই পারে না। ওই শব্দের অন্য কোন ব্যাখ্যা আছে।
আমারও তাই ধারণা। বাতাসের কারসাজি হতে পারে। অনেক অদ্ভুত কাণ্ড ঘটায় বাতাস, বিশ্বাস করা যায় না। ইঁদুরও হতে পারে। ঠিক আছে, আমিও নাহয় একদিন যাব তোমাদের সঙ্গে। রহস্যটার সমাধান করতে। অবশ্যই যদি লিসটার অনুমতি দেন।
হঠাৎ প্রতিবাদের ঝড় উঠল রান্নাঘরে। থেমে গেল আবার। একটু পরে দরজায় উঁকি দিল কিম। ঘোষণা করল, খাবার তৈরি। উদ্ভট একটা গন্ধ এসে ঢুকছে রান্নাঘর থেকে, সবার নাকেই লাগছে সেটা। সেদ্ধ করা কাঠের গুডোর গন্ধ মনে হল মুসার কাছে।
অ্যাক্রন কেক খেতে চাইছে না বাচ্চারা, বিষণ্ণ কণ্ঠে জানাল কিম। ওসব খেয়ে চুমাশ ইনডিয়ান সাজার কোন ইচ্ছেই ওদের নেই। কাপড় পরেছে যে এই বেশি।
তাই! ঘাবড়ে গেলেন মিস্টার সাইমন। ওঁদেরকেই না আবার চেখে দেখতে বাধ্য করে কিম। চোখ ফেরালেন আরেক দিকে।
রবিও ঘাবড়ে গেল।
ভয়ে ভয়ে আবার চোখ ফেরালেন সাইমন। তাহলে এগুলোর কি গতি হবে? আর বাচ্চাদেরকেই বা কি খাওয়াবে? ওদেরকে তো অভুক্ত রাখা যায় না।
ওদের নিয়ে ভাবনা নেই, হাসল কিম। হাইওয়েতে একটা পিজার দোকানে নিয়ে যাব। আমেরিকান অ্যাক্রন না খেতে চাইলে কি হবে, আমেরিকান পিজা খুবই পছন্দ ওদের।
ভাল। তাই নিয়ে যাও। আর অ্যাক্রনগুলো ফেলে দাও, কিংবা কোন চুমাশ ইনডিয়ানের সঙ্গে পরিচয় থাকলে তাকে দিয়ে দাও।
চোখে অনেক আশা নিয়ে মুসার দিকে তাকাল কিম।
এদিক ওদিক তাকাল মুসা। আবার তাকাল কিমের দিকে। না, তার দিকেই তাকিয়ে রয়েছে বাবুর্চি, কোন সন্দেহ নেই। খাইছে! বিড়বিড় করল সে। কিমকে জিজ্ঞেস করল, আমার দিকে তাকিয়ে আছেন কেন? আমি কি চুমাশ নাকি?
না, চুমাশ নও। তবে চুমাশের বাপ। পায়ে পায়ে এগিয়ে এল কিম। আচমকা মুসার দুহাত চেপে ধরল। মুসা, প্লীজ, লক্ষ্মী ভাই আমার, একটি বার! শুধু একটা চামচ! তার বেশি বলব না…
মানে?
অ্যাক্রন এই নতুন রান্না করলাম। কেউ না চাখলে তো বুঝতে পারব না কেমন হয়েছে। শুধু এক চামচ…
মাথা চুলকাল মুসা। রাজি হয়ে গেল, বেশ। তবে এক শর্তে।
কি শর্ত? যে কোন শর্তে রাজি কিম।
প্রচুর পরিমাণে স্যাণ্ডউইচ, মাংসের বড়া, ডিম ভাজি, পনির, কেক, সালাদ, আইসক্রীম…
আছে, সব আছে। থালা ভর্তি করে দেব। যত চাও দেব…
ঠিক আছে। নিয়ে এস তোমার অ্যাক্রন, এমন একটা ভঙ্গি করল মুসা, যেন অ্যাক্রনেরই একদিন কি তারই একদিন। দেখে নেবে আজ।
হাসি ফুটল অন্যদের মুখে। নিস্তার পেয়েছে।
নাচতে নাচতে রান্নাঘরের দিকে চলল নিসান জাং কিম।
.
আরও পনের দিন পর। ট্র্যাকে মোটা একটা খাম এসে হাজির হল কিশোরের নামে। ইয়ার্ডের কাজ করছিল সে। এই সময় পিয়ন দিয়ে গেল চিঠিটা। কাজ করতে করতে হাঁপিয়ে উঠেছে গোয়েন্দাপ্রধান। বিশ্রাম নেয়ার কথা ভাবছিল অনেকক্ষণ থেকেই। পেয়ে গেল ছুতো এবং সুযোগ দুটোই। অফিসের সামনের বারান্দায় এসে বসল। ধীরেসুস্থে খুলল খামটা।
ভেতরে বেশ বড় একটা চিঠি। টাইপ করা। আর একটা কার্ড, দাওয়াতের। অবাক হল সে। কে দাওয়াত করল? আগে তাই কার্ডটাই দেখল। পড়ে আরও অবাক। লিসটার দাওয়াত করেছেন। আরেকটা পার্টি দিচ্ছেন তিনি। মেয়ের বিয়ের কথা ঘোষণা করবেন, এনগেজমেন্ট করা হবে, হ্যাঁ, নিক ভিশনের সঙ্গেই। আশ্চর্য!
তিন গোয়েন্দাকেও দাওয়াত করা হয়েছে।
চিঠির নিচের সইটা দেখল কিশোর। লিটারের। ব্যাপার কি? পড়তে আরম্ভ করল সে। তাকেই লেখা হয়েছেঃ
কিশোর,
সেদিন তুমি হাসপাতাল থেকে যাওয়ার পর অনেক ভেবেছি। আসলেই, খারাপ লোক আমি। তুমি আমার চোখ খুলে দিয়েছ। জীবনে। অনেক অন্যায় করেছি। সেসব কথা ভেবে ভীষণ, অনুশোচনা হচ্ছে এখন। অনেকগুলো বছর পেছনে ফেলে এসেছি, আর অনেক অন্যায়, সবগুলোর প্রায়শ্চিত্ত তো আর করতে পারব না, তবু যতটা পারি করার চেষ্টা করছি। ঠিকই বলেছ তুমি, শুধু টাকা থাকলেই হয় না, জীবনে ইজ্জত-সম্মানের অনেক দাম। এবং সৎ থাকার।
তোমাকে কয়েকটা কথা জানানোর প্রয়োজন বোধ করছি। আমার মত একটা মানুষকে সাহায্য করেছ বলে রাগ হচ্ছে তোমার, দেখ এসব জানার পর রাগ কিছুটা কমে কিনা। সিয়েটার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ করিনি আমি পুলিশের কাছে। বলেছি, আমাকে কিডন্যাপ করেনি সে, নিজের ইচ্ছেতেই আমি তার সঙ্গে গিয়েছিলাম। পুলিশ তখন জিজ্ঞেস করল, আমাকে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখা হল কেন? বললাম, সেটা আমাদের দুই বন্ধুর ব্যাপার। পুলিশ অসন্তুষ্ট হলেও যেহেতু আমি কোন অভিযোগ করিনি, সিয়েটাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। অনেক বুঝিয়ে-শুনিয়ে তাকে নিয়ে এসেছি আমার কাছে। পুরনো বন্ধুত্বটা আবার ঝালাই করার চেষ্টা করছি।
তোমরা নিশ্চয় একটা ভুল ধারণা নিয়ে বসে আছ, পান্নার খনি থেকে পানা তুলে এনে বিক্রি করেই আমি আমার ব্যবসার পুঁজি জোগাড় করেছি। ভুল। আসলে, জীবনে যা করেছি আমি, যেখানে এসে উঠেছি, সব আমার নিজের চেষ্টায়। অনেক পরিশ্রম করে টাকা কামিয়ে দুটো ঝরঝরে স্টীমার কিনেছিলাম। সেই দিয়েই শুরু। বিশ্বাস না করলে এসে দেখে যেতে পার, খনি থেকে তুলে আনা পান্নাগুলো আজও আমার কাছেই আছে। একটাও নষ্ট করিনি কিংবা বিক্রি করিনি। সব সিয়েটাকে দিয়ে। দেব ঠিক করেছি।
ডায়রির পাতাগুলো আমিই পুড়িয়েছি। ঠিকই আন্দাজ করেছ। আর কেউ যাতে যেতে না পারে, সেজুন্যেই পুড়িয়েছিলাম পথের নির্দেশ। এখন ভাবি, ভালই করেছি। কেউ আর সে নির্দেশক পাবে না। পেলেই লোভ হত, আর লোভ থেকেই পাপ। আমি যে অন্যায় করেছি তা আর কেউ করতে পারবে না এখন।
ভাবছি, সিয়েটাকে ব্যবসার অংশীদার করে নেব। সে রাজি হবে। কিনা জানি না। যতদূর জানি, আমার চেয়ে তার আত্মসম্মানজ্ঞান বেশিই।
ও হ্যাঁ, আরনি ভিনসেনজোর সঙ্গেও দেখা করেছিলাম। তার পুরনো চাকরিটা ফেরত দিতে চেয়েছিলাম। রাজি হয়নি। নতুন একটা চাকরি। জুটিয়ে নিয়েছে। শেষে তার বাবার সঙ্গে দেখা করে যে ক্ষতি আমি করেছি তার জন্যে মাপ চাইলাম। ওখানে আমার টায়ারের দোকান বন্ধ। করে দিয়েছি। ভিনসেনজোর দোকানপাট আবার সাজিয়েগুছিয়ে দেয়ার দায়িত্ব নিয়েছি আমি। যা লোকসান হয়েছে সব পুষিয়ে দেয়ার কথাও বলেছি।
তোমাদের কাছে আরও একটা জিনিস নিশ্চয় খুব খারাপ লেগেছে। আমার কমপিউটারে সমস্ত কর্মচারীদের ব্যক্তিগত জীবনের গোপন ফাইল রেখে দেয়ার ব্যাপারটা। সব মুছে ফেলেছি আমি। ওরকম ব্ল্যাকমেল করে। মানুষকে দিয়ে কাজ হয়ত করান যায়, কিন্তু তাদের শ্রদ্ধা মেলে না। স্পষ্ট করে সব কর্মচারীকে জানিয়ে দিয়েছি, ঠিকমত দায়িত্ব নিয়ে আমার এখানে কাজ করলে, কারোরই কোন অসুবিধে হবে না। কাউকে অন্যায় ভাবে চাপ দিয়ে আর কাজ করাব না আমি। তবে যে ফাঁকি দেবে তারও জায়গা হবে না আমার এখানে।
সব শেষে আসি মেয়ের কথায়। তার বিয়েতে আমার কোন অমত নেই আর। জীবনটা তার, কাকে নিয়ে কাটাবে সেটাও তার পছন্দ, আমার নাক গলান ঠিক হয়নি। নিককে নিয়ে যদি সুখী হতে পারে, আমার আপত্তি কি?
কিশোর, তুমি বুদ্ধিমান ছেলে। স্বীকার করতে লজ্জা কিংবা দ্বিধা নেই, আমি তোমার কাছে কৃতজ্ঞ। আরও আগেই যদি তোমার মত ওভাবে কেউ আমার চোখ খুলে দিতে পারত, অনেক ভাল হত। জীবনটা অনেক সুন্দর হয়ে যেত আমার কাছে। তোমাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।
শেষ কথা, মেয়ের বিয়ের এনগেজমেন্ট হবে, কার্ড পাঠালাম। আসবে, অবশ্যই। তিন গোয়েন্দার দাওয়াত রইল। খুব খুশি হব। না এসে বুড়ো মানুষটাকে আর দুঃখ দিও না, প্লীজ।
ইতি–
ডেভিভ লিসটার।