সে রাতে সকাল সকাল শুতে যাবার জন্যে তৈরি হল তিন কিশোর।
সারাদিন ডোবাড়ুবি করেছে, ভীষণ ক্লান্ত মুসা আর রবিন। চোখ জড়িয়ে আসছে ঘুমে।
কিশোরের অসুখ আরও বেড়েছে। নাক দিয়ে পানি গড়াচ্ছে। হাঁচি দিয়ে চলেছে একের পর এক।
মিসেস ওয়েলটনের বোডিং হাউসে ছেলেদের সঙ্গেই রাতের খাবার খেয়েছেন মিস্টার আমান। এখন ফিরে যাবেন কঙ্কাল দ্বীপে। অনেক কাজ পড়ে আছে।
নাগরদোলার ভূতের গল্প সারা শহরে ছড়িয়ে পড়েছে, ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললেন মুসার বাবা। জিম শহরে গিয়ে বলে এসেছে গতরাতে সে-ই নাগরদোলা ঘুরিয়েছিল, কিন্তু কেউ বিশ্বাস করতে চায় না। গার্ড জোগাড় করতে পারেনি। কাজের লোকও আসেনি। দেখি, যাই, যদি কাঠমিস্ত্রি জোগার করতে পারি…
বেরিয়ে গেলেন মিস্টার আমান।
নিজেদের ঘরে এসে ঢুকল ছেলেরা। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কয়েকবার দেখা হয়ে গেছে মোহরটা, আরেকবার বের করল ওটা মুসা। হাতে নিয়ে ওজন আন্দাজ করল, আঙুল দিয়ে ছয়ে ধারগুলো পরীক্ষা করল, লেখাগুলো দেখল। কোথায় রাখবে? জামার পকেটে? না, পড়ে যেতে পারে—ভাবল সে। রেখে দিল নিজের বালিশের তলায়। বিছানায় উঠে শুয়ে পড়ল। রবিন আর কিশোর আগেই শুয়ে পড়েছে।
সকালে মিসেস ওয়েলটনের ডাকে ঘুম ভাঙল তিন গোয়েন্দার।
ওঠ, ছেলেরা দরজার বাইরে থেকে ডাকছে বাড়িওয়ালি। নাস্তা তৈরি। মুসা, তোমার বাবা এসেছেন। জলদি এসো।
তাড়াহুড়ো করে তৈরি হয়ে নিল তিন কিশোর। নেমে এল একতলায়।
মিস্টার আমান বসে আছেন। ছেলেদেরকে দেখে বললেন, এই যে, এসেছি। একটা কথা বলতে এসেছি। আজ তোমাদের ব্যবস্থা তোমাদেরকেই করে নিতে হবে। আমি খুব ব্যস্ত থাকব। জোসেফও সঙ্গে যেতে পারবে না। কোথাও যেতে চাইলে, নিজেরাই যাও। কিশোর, তোমার শরীর কেমন এখন?
ভাল না, বলল কিশোর। ভীষণ জোরে হ্যাঁচাচো করে উঠল। রুমাল দিয়ে নাক মুছতে মুছতে বলল, সরিা চেপে রাখতে পারিনি!
হুমম। গম্ভীর হয়ে মাথা ঝোঁকালেন মিস্টার আমান। সত্যি খারাপা তুমি ওদের সঙ্গে বেরিও না। ঘরেই থাক দু-এক দিন। ডক্টর রোজারকে ফোন করে দিচ্ছি। খুব ভাল লোক। আমার বন্ধু। স্কেলিটন দ্বীপের মালিক। গিয়ে দেখিয়ে এস ওকে।
বসে পড়ল ছেলেরা। নাস্তা দিয়ে গেল মিসেস ওয়েলটন।
ফোনের কাছে উঠে গেলেন মিস্টার আমান। ফিরে এসে জানালেন, দুপুর নাগাদ কয়েক মিনিটের জন্যে সময় দিতে পারবেন ডাক্তার রোজার। একটা কাগজে ডাক্তারের নাম-ঠিকানা লিখে দিয়ে বেরিয়ে গেলেন।
ব্যাপারটা খুব খারাপ হয়ে গেল, কিশোর, বলল মুসা। তুমি বেরোতে পারবে না। ভাবছিলাম, মোটর বোটটা নিয়ে আমরা একাই যাব।
কি আর করব! যাকগে, ভালই হল, ভাবার সুযোগ পেলাম, বলল কিশোর। নিজের জন্যে করুণা হচ্ছে তার, কিন্তু প্ৰকাশ করতে চায় না। অনেক কিছু ভাবার আছে। কঙ্কাল দ্বীপের কথাই ধর না, কিছু একটা রহস্য রয়েছে। ওটার। কিন্তু কি, বুঝতে পারছি না।
কি রহস্যের কথা বলছ? জিজ্ঞেস করল মিসেস ওয়েলটন। বড় এক প্লেট কেক নিয়ে ফিরে এসেছে।
স্কেলিটন আইল্যান্ড।
স্কেলিটন আইল্যান্ড? ওই ভয়ানক জায়গাটা জান, পরশু রাতেও নাগরদোলায় চড়েছে স্যালি ফ্যারিংটনের ভূত?
জানি, শান্ত গলায় জবাব দিল কিশোর। আসলে কি ঘটেছিল, তাও জানি। ভূত-ফুত কিছু না। ব্যাপারটা খুলে বলল মিসেস ওয়েলটনকে।
তা হতে পারে! বিশ্বাস করতে পারছে না মিসেস ওয়েলটন। তবু, সবাই বলে, ওখানে ভূতের উপদ্রব আছে। এত ধোঁয়া, তলায় নিশ্চয় আগুন আছে।
আবার বেরিয়ে গেল বাড়িওয়ালি।
নাক দিয়ে অদ্ভুত একটা শব্দ করল কিশোর। এতেই বোঝা যায়, লোকের বিশ্বাস ভাঙানো কত কঠিন!
জানালায় টোকার শব্দ হল। একই সঙ্গে সেদিকে ঘুরে গেল। তিন জোড়া চোখ। রোদে পোড়া একটা মুখ। উজ্জ্বল কালো এক জোড়া চোখ চেয়ে আছে। ওদের দিকে। পাপালো হারিকুস।
পাপু চাপা গলায় বলে উঠল রবিন। উঠে দ্রুত এগিয়ে গেল। জানালার দিকে।
গুপ্তধন খুঁজতে যাচ্ছি, ফিসফিস করে বলল পাপালো। তোমরা যাবে?
নিশ্চয়! তবে আমি আর মুসা। কিশোর যেতে পারছে না।
ঠাণ্ডা আরও বেড়েছে না? থাকুক, কি আর করা যাচ্ছি। জেটির পাশে থাকব। ডুবুরির সাজসরঞ্জাম নিয়ে এসো।
চলে গেল পাপালো।
ফিরে এল রবিন। পাপালোর সঙ্গে কি কথা হয়েছে জানাল দুই বন্ধুকে।
দারুণ! উজ্জ্বল হয়ে উঠল মুসার মুখ। হয়ত আরেকটা মোহর খুঁজে পাবা! চল, তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়ি।
যাচ্ছি, বলল রবিন। কিশোর যেতে পারছে না, সত্যি খুব খারাপ লাগছে।
কিশোরের চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে, তারও খুব খারাপ লাগছে। কিন্তু মুখে প্ৰকাশ করল না সেকথা। আমি পারছি না, তাতে কি? তোমরা যাও। অসুখের সঙ্গে তো আর কথা নেই।
লাঞ্চের সময় ফিরে আসব। আমরা, বেরিয়ে গেল মুসা। পেছনে রবিন। দ্রুত জেটির দিকে এগিয়ে চলেছে দুজনে।
পুরানো ভাঙাচোরা জেটির পাশে নৌকা নিয়ে অপেক্ষা করছে পাপালো। দুই বন্ধুকে দেখেই হাত তুলে ডাকল।
নৌকায় উঠল দুই গোয়েন্দা। নৌকা ছাড়ল পাপালো। গুপ্তধনের খোঁজে চলল। তিন কিশোর।
বন্ধুদেরকে বেরিয়ে যেতে দেখল কিশোর। দীর্ঘশ্বাস ফেলল। চেয়ার ঠেলে সরিয়ে উঠে দাঁড়াল। স্কেলিটন আইল্যান্ডের ওপর লেখা ফিচারটা আরেকবার খুঁটিয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে শোবার ঘরে এসে ঢুকাল।
বিছানা গোছগাছ করছে মিসেস ওয়েলটন। মুসার বালিশটা টান দিয়ে সরিয়েই স্থির হয়ে গেল। চেঁচিয়ে উঠল, আরো সোনার মোহরা এটা এলো কোখেকো ভুরু কুঁচকে তাকাল কিশোরের দিকে। তোমরা খুঁজে পেয়েছ, না? স্কেলিটন আইল্যান্ডে?
মুসা পেয়েছে, বলল কিশোর। কানে বাজছে জোসেফ গ্র্যাহামের হুশিয়ারিঃ খবরদার ! কেউ যেন জানতে না পারে! কিন্তু চেপে রাখা গেল না। ফাঁস হয়ে গেল মুসার বোকামির জন্যে।
স্কেলিটন আইল্যান্ডেই পেয়েছে তো?
না, উপসাগরে। দ্বীপ থেকে অনেক দূরে।
তাজ্জব কাণ্ড! প্রথম দিন পানিতে ডুব দিয়েই মোহর পেয়ে গেল! কিশোরের দিকে তাকাল। চোখে সন্দেহ। লোকের ধারণা, শূটঙ-ফুটিঙ কিছু না, আসলে মোহর খুঁজতে এসেছে দলটা। ক্যাম্প করেছে। দ্বীপে। ক্যাপ্টেন ওয়ান ইয়ারের আসল ম্যাপটা পেয়ে গেছে। ওরা কোনভাবে।
হুঁ, চিন্তিত ভঙ্গিতে মাথা ঝোঁকাল কিশোর। সেজন্যেই কি বিরক্ত করা হচ্ছে সিনেমা কোম্পানিকে। কেউ হয়ত চাইছে, কোম্পানি দ্বীপ থেকে চলে যাক। …কিন্তু মিসেস ওয়েলটন, সত্যি বলছি, কোন ম্যাপ নেই কোম্পানির কাছে। ওরা গুপ্তধন খুঁজতে আসেনি। ছবি তুলতেই এসেছে। আপনার এখানে অনেকেই আসে, তাদের ভুল বিশ্বাস ভেঙে দেবার চেষ্টা করবেন।
তা করব। কিন্তু আমার কথা বিশ্বাস করবে বলে মনে হয় না। একবার কোন কথা ওদের মাথায় ঢুকলে আর সহজে বেরোতে চায় না।
হ্যাঁ, মাথা ঝোঁকাল কিশোর। এই যেমন, নাগরদোলার ভূতের কথাও বেরোতে চাইছে না। আচ্ছা, আপনাকে কয়েকটা কথা জিজ্ঞেস করব, জবাব দেবেন? সারাজীবন এখানেই বাস আপনার, এখানকার অনেক কিছুই জানেন।
নিশ্চয় বলব, যা জানি, হাসল মহিলা। ঘরটা গুছিয়ে নিই। নিচেও কয়েকটা কাজ আছে। তুমিও নিচেই চলে এসো। কফি খেতে খেতে কথা বলব।
ঠিক আছে, বলল কিশোর। রবিনের ব্যাগ থেকে ম্যাগাজিনটা বের করে নিলো। আমি যাচ্ছি। আপনি আসুন। ড্রইংরুমে এসে বসল কিশোর। পড়ায় মন দিল।
কাজ সেরে এলো মিসেস ওয়েলটন। হাতে দুকাপ কফি।
ম্যাগাজিনটা বন্ধ করে পাশে রেখে দিল কিশোর। হাত বাড়িয়ে একটা কাপ তুলে নিলো।
আরেকটা সোফায় বসে পড়ল মিসেস ওয়েলটন। হ্যাঁ, এবার কি বলতে চাও?
ওই স্কেলিটন আইল্যান্ড, বলল কিশোর। প্রথমেই বলুন, ওটা ভূতুড়ে হল কি করে? জানা আছে তার, তবু স্থানীয় একজনের মুখে শুনতে চায়।
খুলে বলল সব মিসেস ওয়েলটন। ফিচারে লেখা তথ্যের সঙ্গে তার কথা হুবহু মিলে গেল। একটা কথা জানা গেল, যেটা লেখা নেই। প্লেজার পার্ক পরিত্যক্ত হবার অনেক বছর পর আবার দেখা দিতে শুরু করেছে। স্যালি ফ্যারিংটনের ভূতা বেশ ঘন ঘন দেখা যাচ্ছে ইদানীং।
জেলেরা, যারা দেখেছে, বলল কিশোর, তাদেরকে কতখানি বিশ্বাস করা যায়?
তা সঠিক বলা মুশকিল! তিলকে তাল করার অভ্যাস আছে জেলেদের। তবে ওই তিলটা থাকতেই হবে। আরেকটা ব্যাপার, স্কেলিটন আইল্যান্ডে ভূত আছে, শুধু শুধু বানিয়ে বলতে যাবে কেন ওরা?
কেন বলতে যাবে, কোন ধারণা নেই কিশোরের। তবে, জেলেরা পুরোপুরি মিছে কথা বলেছে, এটাও ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না। তার।
ঠিক কবছর আগে থেকে দেখা দিতে শুরু করেছে স্যালি ফ্যারিংটনের ভূত?
সঠিক বলতে পারব না, বলল মিসেস ওয়েলটন। তবে বছর দুইতিন আগে থেকে। কিশোরের দিকে তাকাল বাড়িওয়ালি। সিনেমা কোম্পানি এলো, ক্যাম্প করল দ্বীপে। চুরি যেতে লাগল তাদের জিনিসপত্র, কিন্তু চোর ধরা পড়ল না। ভূতে নিয়ে যায় যেন জিনিসপত্রগুলো একেবারে গায়েবা নাহ, কিছু একটা রহস্য আছে দ্বীপটীয়া কি, বলতে পারব না।
কিশোরও মিসেস ওয়েলটনের সঙ্গে একমত। কিছু একটা রহস্য আছে কঙ্কাল দ্বীপের। কিন্তু কি সে রহস্য!
চমৎকার হাওয়া, ফুলে উঠেছে পােল। তরতর করে এগোচ্ছে ছোট নৌকা। আশেপাশে কোন নৌকা-জাহাজ নেই। অনেক দূরে দক্ষিণ দিগন্তে কয়েকটা কালো বস্তু, মাছ ধরা নৌকা।
কঙ্কাল দ্বীপের জেটিতে এসে নৌকা বাঁধল পাপালো, রবিন আর মুসার অনুরোধ। ডুবুরির সাজসরঞ্জাম নেবে ওরা। তবে আগে জোসেফ গ্রাহামের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে।
অনুমতি দিল জোসেফ। তাড়াহুড়ো করে চলে গেল প্লেজার পর্কের দিকে।
ট্যাংক। দুজনের জন্যে। পাপালোর দরকার নেই। ওসব সরঞ্জাম ছাড়াই সাগরে ডুব দিতে অভ্যস্ত সে। কি ভেবে, পানির তলায় ব্যবহারের উপযোগী দুটো টর্চও নিয়ে নিলো।
আবার এসে উঠল। ওরা নৌকায়। বাঁধন খুলল পাপালো। আবার নৌকা ছাড়ল।
উজ্জ্বল রোদে ঝিকমিক করছে পানি। ছোট ছোট ঢেউয়ে তালে। তালে দুলছে নৌকা। চুপ করে বসে থাকতে থাকতে ঝিমুনি এসে গেল। দুই গোয়েন্দার।
গান ধরল পাপালো। ভাষাটা বুঝতে পারল না। দুই গোয়েন্দা। নিশ্চয় গ্ৰীক। চোখ মেলে চাইল ওরা। চোখে পড়ল দ্য হ্যান্ড, হস্ত। যেখানে দুরাত আগে রহস্যজনকভাবে আটকা পড়েছিল ওরা।
রাতে ভালমত দেখতে পারেনি, দিনের আলোয় এখন দেখল। ওরা দ্বীপটা। সোয়া এক মাইল লম্বা, শদুয়েক গজ চওড়া। রুক্ষ, পাথুরে, মানুষ বসবাসের অযোগ্য। ফোয়ারা দেখা যাচ্ছে না এখন, শুধু ঝড়ের সময় দেখা যায়।
ফোয়ারার কথা পাপালোকে জিজ্ঞেস করল রবিন।
সাগর আজ শান্ত, বলল পাপালো। খুব বেশি অশান্ত হলে তবেই পানি ছিটায় ওই ফোয়ারা।…দ্বিীপের তলায় কোন ধরনের সুড়ঙ্গ আছে। ওটা দিয়েই পানি ঢুকে ছিটকে বেরোয় টিলার ওপরের ছিদ্র দিয়ে। তিমির ফেয়ারার মত।
দ্বীপের মূলভূমির একশো গজ দূরে নৌকা রাখল পাপালো। পাল নামিয়ে নোঙর ফেলল। এখন ভাটা। পানি কম। এদিকে। পুরো জোয়ারের সময়ই কেবল দ্বীপ পর্যন্ত নৌকা নিয়ে যাওয়া যায়।
ঢেউয়ে নাচছে নোঙরে-বাঁধা নৌকা। সাজ-সরঞ্জাম পরে নিল রবিন আর মুসা। পাপালোর ওসব দরকার নেই। নিজের ফেস মাস্কটা শুধু পরে নিয়েছে।
আস্তে করে নৌকা থেকে পানিতে পড়ল পাপালো। আগে আগে সাঁতরে চলল। তাকে অনুসরণ করল দুই গোয়েন্দা।
কয়েক গজ গিয়ে থেমে গেল পাপালো। দাঁড়িয়ে পড়ল। কয়েক ফুট এগিয়েই হাঁটু পানিতে উঠে এল। ফিরে চেয়ে দুই সঙ্গীকে বলল, বলেছি না, পানি একেবারে কম। যা চোখা পাথর। খোঁচা লাগলে নৌকা শেষ। এজন্যেই ওখানে রেখে আসতে হয় নৌকা।
ছপাৎ ছপাৎ আওয়াজ তুলে হেঁটে চলল ওরা। দ্বীপে উঠল। একপাশে একটা ছোট খাঁড়ি। তলায় বালি। বিশ ফুট গভীর। তল দেখা
যায়।
গত হাপ্তায় ওই খাঁড়িতেই দুটো মোহর পেয়েছি, পাপালো বলল। কপাল ভাল হলে আজও পেয়ে যেতে পারি কয়েকটা।
খাঁড়িতে নেমে পড়ল তিন কিশোর। ডুব দিল।
এখানে ওখানে পড়ে আছে ছোটবড় পাথর। পাথর ঘিরে জন্মেছে নানারকম সামুদ্রিক আগাছা। হলদে বালিতে পড়ে আছে উজ্জ্বল রঙের তারা মাছ। আশপাশে ঘুরছে ছোট রঙিন মাছের দল। আর আছে কাঁকড়া। অগুণতি। বিচিত্র ভঙ্গিতে পাশে হেঁটে এগোচ্ছে, তাড়া করলেই সুড়ুৎ করে লুকিয়ে পড়ছে ছোট ছোট গর্তে। অনেক কিছুই দেখল তিন ডুবুরি, কিন্তু একটা মোহরও চোখে পড়ল না।
ওঠার ইশারা করল মুসা। ভুসস করে ভেসে উঠল তিনজনে।
বেশি গভীর না, মাউথপিস খুলে নিয়ে বলল মুসা। এখানে গ্যাস নষ্ট করে লাভ নেই। এক কাজ করলেই তো পারি। সব কিছু রেখে পাপুর মত শুধু মাস্ক পরে ডুব দিলে অসুবিধে কি? ও পারছে, আমরা পারব না কেন?
রাজি হল রবিন। তীরে এসে উঠল। দুজনে। মাস্ক ছাড়া আর সব সরঞ্জাম খুলে রাখল পাথরের ওপর। আবার নেমে এল খাঁড়িতে।
পুরো খাঁড়ির কোথাও খোঁজা বাদ রাখল না ওরা। কিন্তু মোহরের চিহ্নও চোখে পড়ল না।
ক্লান্ত হয়ে তীরে এসে উঠল তিনজনে, বিশ্রাম নিতে।
আজ ভাগ্য বিরূপ, হতাশ কণ্ঠে বলল পাপালো। তবে পেলে কাজ হত। বাবার অসুখ বেড়েছে। চল, আরেক জায়গায় যাই। একটা জায়গা চিনি। অনেক দিন আগে ওখানে একটা মোহর পেয়েছিলাম। ওখানে গিয়ে… হঠাৎ থেমে গেল সে। চেয়ে আছে উপসাগরের দিকে।
কানে ঢুকল ইঞ্জিনের শব্দ। ফিরে চাইল রবিন। ধূসর একটা মোটর বোট। পুরানো। দ্রুত গতিতে ছুটে আসছে।
এদিকেই আসছে। বলল পাপালো। ওরাও মোহর খুঁজতে আসছে কিনা কে জানে!
দ্রুত এগিয়ে আসছে বোট। গতি কমছে না মোটেই। লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল পাপালো। আরে, পাথরে বাড়ি লাগবে তো! তলা খসাবে! চেঁচিয়ে উঠল সে। এ-ই-ই বোট থামাও! বাড়ি লাগবে পাথরে!
কমল না বোটের গতি। ইঞ্জিনের শব্দে পাপালোর চিৎকার কানে গেল না হয়ত চালকের।
উঠে দাঁড়াল মুসা আর রবিন। তিনজনে হাত নেড়ে নেড়ে চিৎকার করতে লাগল, বোট থামাতে বলল।
আরও এগিয়ে এলো বোট। হুইল ধরে রাখা চালককে দেখা যাচ্ছে। মাথার বড় হ্যাটের কাণা টেনে নামানো। চেনা গেল না লোকটাকে। ছেলেদের চিৎকার তার কানো গেল। কিনা বোঝা গেল না, তবে হঠাৎ বদলে গেল ইঞ্জিনের শব্দ। গতি কমে গেল বোটের। ব্যাক গীয়ার দিয়েছে হয়ত।
সাঁ করে ঘুরে গেল বোটের নাক। গতি এখনও অনেক। কান্ত হয়ে গেল একপাশে, উল্টেই যাবে যেন। সোজা হয়ে গেল। আবার। তারপরই ঘটল অঘটন।
বোটের ঠিক সামনেই পাপালোর নৌকা। শেষ মুহূর্তে নৌকাটা দেখতে পেল বোধহয় চালক। সরে যাবার চেষ্টা করল। কিনা, বোঝা গেল। না। প্ৰচণ্ড জোরে আঘাত হানল ইস্পাতের তৈরি ভরি বোটের নাক, নৌকার মাঝামাঝি। ঢুকে গেল ভেতরে। একটা মুহূর্ত এক হয়ে রইল দুটো জলযান! জোরে গর্জে উঠল মোটর বোটের ইঞ্জিন। ঝটিকা দিয়ে। নৌকার ভেতর থেকে বের করে আনল নাক। মোড় ঘুরে সোজা ছুটীল খোলা সাগরের দিকে।
বোবা হয়ে গেছে যেন ছেলে তিনটে। হাঁ করে চেয়ে আছে ভাঙা নৌকাটার দিকে। দ্রুত তলিয়ে যাচ্ছে ওটা।
ইয়াল্লা! গুঙিয়ে উঠল মুসা। কাপড়-চোপড়, ঘড়ি, সব গোল আমাদের!
বাড়ি ফেরার পথ বন্ধা বিড়বিড় করল রবিন। আটকা পড়লাম এই দ্বীপে। দ্বিতীয়বারা
স্তব্ধ হয়ে গেছে পাপালো। কিছুই বলার নেই তার। মুঠো হয়ে গেছে হাত। বোবা চোখে চেয়ে আছে সাগরের দিকে। তার সব আশা সব ভরসা যেন তলিয়ে গেছে। ওই ছোট নৌকাটার সঙ্গে সঙ্গে।