তুমুল শোরগোল। অ্যাসেম্বলি হলের অনেকেই সিট থেকে মেঝেতে ঝাঁপ দিয়েছে। বহু প্রশ্ন আর চিৎকার-চেঁচামেচির স্রোত বয়ে গেল জনাকীর্ণ ঘরটায়। কে যেন একজন চেঁচিয়ে উঠল, এই চলো চলো, বেরোও! মরবে নাকি এখানে থেকে! দরকার নেই আমাদের থিম পার্কের!
হুড়াহুড়ি করে দরজার দিকে ছুটল বহু লোক। বাইরে থেকে চিৎকার শোনা গেল, আগুন! আগুন!
এই থামুন থামুন! শান্ত হোন! সব হট্টগোলকে ছাপিয়ে শোনা গেল মিস্টার সিউলের কণ্ঠ। অহেতুক ঠেলাঠেলি করবেন না। ঘরের মধ্যে কোন বিপদ নেই। বাইরে থেকে এসেছে বিস্ফোরণের শব্দ।
আতঙ্কিত জনতার কাছ থেকে মুনকে টেনে সরাল কিশোর ও মুসা। তারপর দুজনে হাতে হাত ধরে ওকে মাঝখানে রেখে একটা ব্যারিকেড তৈরি করল উন্মত্ত জনতার ধাক্কাধাক্কি থেকে বাঁচানোর জন্য। শহরের গণ্যমান্য কয়েকজন নানাভাবে বুঝিয়ে জনতাকে থামানোর চেষ্টা করছে। দরজার কাছ থেকে ওদেরকে ফিরিয়ে নিয়ে এসে চেয়ারে বসাতে চাইছে। দ্রুত কমে এল আতঙ্ক।
জেফরির চিঙ্কার শোনা গেল, দরজার কাছ থেকে সরে আসুন। বাতাস ঢোকা বন্ধ করে দিচ্ছেন তো।
ঘুরে তাকাল মুসা। একটা চেয়ারের ওপর দাঁড়ানো দেখতে পেল জেফরিকে। দুই হাত মুখের কাছে জড় করে চিৎকার করে আবার বললেন তিনি, যারা আগুন নেভাতে পারে তাদের বেরোতে দিন আগে। সরুন। সরে যান দরজার কাছ থেকে।
কেমন বোকা বোকা লাগছে মানুষগুলোকে। কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না। ধীরে ধীরে সরে যেতে শুরু করল দরজার কাছ থেকে। ডজনখানেক লোক, যাদেরকে জেফরির কেবিনের আগুন নিভাতে দেখেছিল মুসা, এক দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে গেল। তাদের পিছু পিছু আরও অনেকেই বেরোনো শুরু করল।
চলো, আমরাও যাই, কিশোরকে বলল মুসা।
জনতার লম্বা সারিতে একটা ফাঁক দেখে তার মধ্যে নিজেদের ঢুকিয়ে নিল ওরা। মনে হলো সারিটা আটকে গেছে। আগেও যায় না, পিছেও যায় না। তারপর আচমকা স্রোতের ধাক্কায় কুটোর মত বেরিয়ে চলে এল সরু দরজাটা দিয়ে। ঠাণ্ডা বাতাসে দম নিতে লাগল হাঁ করে।
এমনিতে বাইরের বাতাস তাজাই থাকে, তবে এখন পুরোপুরি তাজা বলা যাবে না। ধূসর ধােয়ার চাদর ছড়িয়ে পড়েছে। কোনখানে ওই ধোয়ার উৎপত্তি, বুঝতে সময় লাগল না।
হায় হায়, আমার দোকান! চিৎকার করে উঠলেন লুক স্টার্লিং। আমার দোকানে আগুন লেগেছে।
দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে দৌড়ানো শুরু করলেন তিনি। তাঁর ঠিক পিছনেই রইল কিশোর ও মুসা। অর্ধেক পথ এসে কিশোর বলল, দোকান না, দোকান না, আগুন লেগেছে পিছনের কোন কিছুতে।
মুসাও দেখল। আগুন আর ধোঁয়া উঠছে দোকানের পিছনে বেশ খানিকটা দূরের একটা কাঠের ছাউনি থেকে। অবাক হলো। এটাই সেই ছাউনি, যেটা থেকে একজন লোককে বেরোতে দেখে তাড়া করেছিল ওরা।
কাজে লেগে গেছে অগ্নিনির্বাপক বাহিনী। বালতি বালতি পানি ছুঁড়ে দিচ্ছে ভাঙা জানালা দিয়ে ভিতরে। কিশোররা ওদের কাছে পৌঁছতেই ধুড়স করে বিকট শব্দে ছাত ধসে পড়ল। ফাঁকা পেয়ে লাফ দিয়ে গাছের মাথার কাছে উঠে গেল আগুন।
ফ্যাকাসে মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল লুক স্টার্লিংকে। কাছে গিয়ে দাঁড়াল মুসা। বলল, ভাগ্যিস দোকানে লাগেনি।
ওই ঘরে কী আছে? পিছন থেকে জিজ্ঞেস করল কিশোর।
জঞ্জাল আর আজেবাজে বাতিল জিনিস, লুক জবাব দিলেন। পুড়ে গেলেই ভাল।
আপনার দোকান থেকে দূরেই আছে ওগুলো, কিশোর বলল। ওখান থেকে আগুন ছড়াবে না।
কিন্তু লাগল কীভাবে? মুসার প্রশ্ন। বিস্ফোরণের শব্দ শুনে তো মনে হলো বোমা ফেটেছে।
এমন অনেক জিনিস আছে ফাটলে বোমার মত শব্দ হয়, লুক বললেন। গোটা দুই পাঁচ গ্যালনের জেরিক্যান ছিল ভিতরে। যদি সামান্য পেট্রলও থেকে থাকে ওগুলোর কোনটাতে, আর গরম করা হয়, ভিতরে যে বাষ্প তৈরি হবে, তাতে বোমা ফাটার মতই শব্দ হবে।
তারমানে আপনি বলতে চাইছেন প্রথমে আগুন লেগেছে, জেরিক্যানগুলোকে গরম করেছে, তারপর বিস্ফোরণ? কিশোরের প্রশ্ন।
কী করে বলি? দেখার জন্য আমি তো আর এখানে ছিলাম না। সবার সঙ্গে মিটিঙে ছিলাম। তোমরা জিজ্ঞেস করলে, তাই কীভাবে আগুন লাগতে পারে ধারণা দিলাম মাত্র। অস্থির হয়ে উঠেছেন লুক। কিশোরদের কাছ থেকে সরে গেলেন।
আগুন নিভানোর পর নিজেদের কেবিনে ফিরে এল গোয়েন্দারা। আলোচনায় বসল।
এই প্রথম একটা দুর্ঘটনা ঘটল, মুসা বলল, যা জোসির রেসকে কোনভাবে প্রভাবিত করবে না। থিম পার্কের বিরোধিতা যারা করছে, তাদেরকে ভয় দেখানোর জন্যও ঘটানো হয়ে থাকতে পারে এটা।
কিন্তু লুক তো থিম পার্কের বিপক্ষে নন, কিশোর বলল। তাহলে তাঁর ঘর পোড়ানো হলো কেন?
সেটাই তো বুঝতে পারছি না। ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে রহস্য!
কিশোর বলল, তবে, আগের রহস্যগুলোর সঙ্গে এই ছাউনি পোড়ানোর সম্পর্ক আছে। সন্দেহভাজনদের সংখ্যা এখন কমিয়ে আনা সম্ভব। মিটিঙের সময় আমাদের জানামতে কে কে টাউন হলের বাইরে
ছিল?
টেডকে দেখিনি ওখানে, মুসা বলল।
জোসিও ছিল না।
তারমানে তুমি জোসিকেও সন্দেহ করো?
এখনও করছি না, কিশোর বলল। টাউন হলের বাইরে কে কে ছিল সেটা মনে করার চেষ্টা করছি আপাতত। লুকের কথাই ঠিক মনে হচ্ছে। আগুনটা আগে লেগেছে, তারপর বিস্ফোরণ। আর যদি বোমা ফাটিয়ে আগুন লাগানো হয়, ফাটানো হয়েছে টাইমার দিয়ে। তখন আবার সন্দেহভাজনদের সংখ্যা বেড়ে যাবে। যে কেউ ঘটাতে পারে এ রকম দুর্ঘটনা, মিটিঙে সে-লোক থাকুক বা না থাকুক।
দমে গেল মুসা। কিশোরের কথায় প্রথমে মনে হয়েছিল, রহস্য সমাধানের দোরগোড়ায় পৌছে গেছে। এখন মনে হচ্ছে, এ রহস্য ভেদ করা এত সহজ নয়।
দরজায় টোকা শুনে উঠে গিয়ে খুলে দিল ও। জোসি দাঁড়িয়ে আছে।
ঘরে ঢুকল জোসি। পার্কাটা খুলে নিতে নিতে বলল, রেড লাইটকে পাওয়া গেছে।
ভাল আছে ও? চেঁচিয়ে উঠল মুসা।
আছে। কিন্তু ভীষণ দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছে আমাকে। ওকে কেনলে রাখতে গিয়ে ছেঁড়া দড়িটা দেখলাম। কেউ কেটে রেখেছিল।
মাথা ঝাঁকাল কিশোর। আমরাও দেখেছি। তোমাকে বলার সুযোগ পাইনি।
টেড যে এতদূর যাবে তা কল্পনাও করতে পারিনি, ছোট্ট ঘরটার মধ্যে পায়চারি শুরু করল জোসি। কী করতে চাইছে ও? যুদ্ধ? ও কি বুঝতে পারছে না ও যতটা ক্ষতি করছে আমার, আমিও ততটাই করতে পারি? এ ভাবে দুজনে ঝগড়া আর একে অন্যের ক্ষতি করতে থাকলে লাভ কিছু হবে না, বরং ক্ষতি, রেসে আর অংশ নিতে পারব না।
টেডকে দেখেছ নাকি? মুসা জিজ্ঞেস করল। ওর সঙ্গে কথা আছে আমাদের।
মাথা নাড়ল জোসি। দেখিনি। হয়তো কুকুরগুলোকে প্র্যাকটিস করাতে নিয়ে গেছে। এখন তো ওর একমাত্র কাজই হলো প্র্যাকটিস। আমিও অবশ্য তা-ই করতাম। কিন্তু দুর্ঘটনাগুলো বাধা দিচ্ছে আমাকে। ভয় লাগছে, প্র্যাকটিস করাতে না পারলে চর্বি জমে যাবে কুকুরগুলোর গায়ে। তাতে ক্ষিপ্রতা হারাবে ওরা। আমাকে আটকে ফেলে এটাই করাতে চাইছে কি না টেড, কে জানে!
পরদিন খুব সকালে লুকের ছাউনিটা দেখতে চলল কিশোর ও মুসা। বাতাসে ছাই আর পোড়া কাঠের ঝাঁঝাল গন্ধ৷ প্রচণ্ড তাপে গলে বিকৃত, কালো হয়ে গেছে বড় বড় ক্যান। বিছানার একটা গদি পুড়েছে, প্রিংগুলোই শুধু অবশিষ্ট আছে, কাপড়, রবার সব পুড়ে ছাই। পুরানো একটা সোমোবাইল, আগেই হয়তো ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল, এখন পোড়া দেহটা পড়ে আছে।
কী খুঁজছ? কিশোরকে ছাতের একটা কড়িকাঠ সরাতে দেখে জিজ্ঞেস করল মুসা।
অস্বাভাবিক কিছু, জবাব দিল কিশোর।
হাসল মুসা। এখানে স্বাভাবিক কোটা? সবই তো অস্বাভাবিক।
মিনিট বিশেক খোঁজার পর হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল কিশোর, মুসা, দেখো!
পুরানো মডেলের একটা অ্যালার্ম ঘড়ি দেখাল ও চাবি ঘুরিয়ে দম দেয়া হতো।
সোমোবাইলটার মতই আরেকটা জঞ্জাল, আগ্রহ দেখাল না মুসা।
তা ঠিক। কিন্তু আসল জিনিসটাই চোখে পড়েনি তোমার। বারো নম্বর লেখাটার ঠিক মাঝখানে একটা পিন ফুঁড়ে বেরিয়ে আছে। ঘণ্টার কাঁটা আর মিনিটের কাঁটা দুটোকেই এক জায়গায় আটকে দিয়েছে।
আরে তাই তো! এতক্ষণে উৎসাহ দেখা গেল মুসার। ব্যাটারিতে দুটো তার লাগিয়ে তারের এক মাথা মিনিটের কাটায়, আরেক মাথা ঘণ্টার কাঁটায় লাগিয়ে দিলে, বোমার টাইমার বানিয়ে ফেলা যায়।
এ ধরনের ঘড়ি কোথায় দেখেছি আমি, তা-ও মনে পড়ছে, কিশোর বলল। লুক স্টার্লিঙের দোকানের তাকে। পোড়া ঘড়িটা দেখিয়ে বলল, এটা কার কাছে বিক্রি করেছিলেন, মনে করতে পারবেন নিশ্চয়।
চলো, জিজ্ঞেস করি।
দোকানে ঢুকে ওরা দেখল দোকানের মেঝে ঝাড় দিচ্ছেন লুক।
পেলে কিছু? মুখ তুললেন না তিনি, নিজের কাজে মনোযোগ। দেখলাম, পোড়া ছাইয়ের গাদায় কী যেন খুঁজে বেড়াচ্ছ।
এই যে, এটা পেলাম, পোড়া, বাতিল ঘড়িটা দেখাল কিশোর।
ও, ওটা। দশ বছর আগে ফেলে দিয়েছিলাম।
হতাশ হলো মুসা। কিছুদিনের মধ্যে কেউ কিনেছে এ রকম ঘড়ি?
কিনলে তো বেঁচেই যেতাম, তাকের দিকে আঙুল তুললেন লুক। ওই দেখো, কত ঘড়ি পড়ে আছে। বড় শহর হলে কবে বেচে ফেলতাম। ওসব জায়গায় সময়ের খুব দাম। আর এখানে লোকের অফুরন্ত সময়। অ্যালার্ম ক্লক কারও কাজে লাগে না।
দোকান থেকে বেরোতেই বিগসূকে দেখতে পেল ওরা। হনহন করে হেঁটে চলে যাচ্ছে শহরের বাইরে। বার বার ফিরে তাকাচ্ছে। কেউ পিছু নিল কি না দেখছে বোধহয়।
কোথায় যায়? মুসার প্রশ্ন।
চলো, দেখে আসি।
বিগস্ এখনও ওদের দেখেনি। বেশ অনেকটা দূর থেকে ওকে অনুসরণ করে চলল দুজনে। মিনিট পাঁচেক পর মুসা বলল, এ রাস্তা দিয়ে একমাত্র গোল্ডের বাড়িতেই যাওয়া যায়।
ওখানে যাচ্ছে কেন? নিজেকেই যেন প্রশ্ন করল কিশোর। গোল্ডের কাছে তো আর থিম পার্কের উপকারিতা বয়ানের দরকার নেই। গোল্ড এমনিতেই ওর পক্ষে।
সেটাই তো ভাবছি।
গোল্ডের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল বিগস্। টোকা দেবার আগেই খুলে গেল দরজা।
তারমানে বিগস্ আসবে গোল্ড জানে, ফিসফিস করে বলল মুসা। আরেকটু কাছে যেতে পারলে ভাল হতো। কী বলে শুনতে পারতাম।
পা টিপে টিপে এগোল দুজনে। কেবিনের পাশ ঘুরে এসে জানালার কাছে দাঁড়িয়ে কান পাতল। বিগসকে বলতে শুনল, আগুন লাগানো, বোমাবাজি, এ সব কিন্তু মোটেও পছন্দ হচ্ছে না আমার!
এ সব আমাকে বলছ কেন? রেগে গেল গোল্ড।
কোম্পানির বদনাম হয়ে যাচ্ছে, বিগস বলল। এই শয়তানি বন্ধ করা দরকার।
গোল্ডও চেঁচিয়ে উঠল, আমাকে ধমকানোের তুমি কে? আমার যা খুশি আমি করব। আগুন লাগাতে ইচ্ছে করলে লাগাব, বোমা মারতে ভাল লাগলে মারব। তোমার গা জ্বালা করলে ইউকন নদীতে ঝাঁপ দিয়ে ঠাণ্ডা করোগে।
মুসার দিকে তাকাল কিশোর। এক ভুরু উঁচু করল। গোল্ডের কথায় মনে হচ্ছে অপরাধগুলো সে-ই করেছে।
তুমি ভাবছ এ সব করে কোম্পানির মস্ত উপকার করছ? বিগসের ঝাঁঝাল কণ্ঠ। এমনিতেই পরিস্থিতি ভীষণ নাজুক। শহরের লোকের মানসিকতা এই ভাল তো এই মন্দ। কোন সিদ্ধান্তই নিতে পারছে না। এখন এ সব দুর্ঘটনা ঘটতে থাকলে পরিস্থিতি কোনদিকে মোড় নেবে বুঝতে পারছ না? আমি এ সব বন্ধ করাব। বুঝলে, করিয়ে ছাড়ব?
আমার বাড়িতে এসে আমাকেই ধমক! গর্জে উঠল গোল্ড।
বিগও কম যায় না। আমি তোমাকে এ সব করতে বলিনি। পাগলামি করে কোটি ডলারের প্রোজেক্ট ধ্বংস করবে, আর আমি হাত গুটিয়ে বসে থাকব যদি ভাবো, ভুল করছ।
হঠাৎ শক্ত হয়ে গেল কিশোর। ওদের পিছনের ঝোপে কী যেন নড়ছে। বড় কোন জানোয়ার হতে পারে। ফিরে তাকাল ও। ভয়ের শীতল শিহরণ বয়ে গেল মেরুদণ্ডে।
ঝোপ থেকে বেরিয়ে এল বিশাল এক বাদামি ভালুক। কিশোরদের দেখে যেন হোঁচট খেয়ে থেমে গেল। পিছনের দুই পায়ে ভর দিয়ে মানুষের মত সোজা হয়ে দাঁড়াল। হাঁ করা মুখের ভিতর থেকে বেরিয়ে এসেছে টকটকে লাল জিভ আর হলুদ রঙের মারাত্মক দাঁত।
ওর দিকে তাকিয়ে রাগে গোঁ-গোঁ করল জানোয়ারটা।
দিশেহারা হয়ে পড়ল কিশোর। কী করবে, বুঝতে পারছে না।
ভিতরের কথা ভালমত শোনার জন্য জানালায় কান পেতে দাঁড়িয়েছিল মুসা। ভালুকের গোঁ-গোঁ শুনে চমকে গেল। কেবিন থেকে শোনা গেল বিগ্সের কথা, কীসের শব্দ!
ভালুক, গোল্ডের জবাব। দাঁড়াও, আসছি।
আঙুলের ইশারায় মুসাকে একটা পাথরের চাঙড় দেখাল কিশোর।
মাথা ঝাঁকাল মুসা। মুহূর্ত পরেই কেবিনের দরজা খুলে গেল। শব্দ শুনে দরজার দিকে মুখ ফেরাল ভালুকটা। এই সুযোগে এক দৌড়ে গিয়ে পাথরের আড়ালে লুকাল কিশোর ও মুসা। ভালুক আর গোল্ডকে দেখতে পাচ্ছে এখান থেকেও।
এই ব্যাটা, বন্দুক চিনিস? হাতের রাইফেল দেখিয়ে হুমকি দিল গোল্ড। জলদি ভাগ। নইলে দুনিয়া থেকে ভাগাব।
গর্জে উঠল ভালুক। নড়ল না।
রাইফেল নেড়ে আবার চেঁচিয়ে উঠল গোল্ড, ভাগ! ভাগ! জলদি ভাগ! হোল্কা হাঁদা কোথাকার। কথা কানে যাচ্ছে না? ভাগ বলছি।
আবার গর্জে উঠল ভালুক। তবে গলার জোর কমে গেছে।
ও, ভাল কথায় যেতে ইচ্ছে করে না! রাইফেলের নল আকাশের দিকে তুলে গুলি করল গোল্ড।
আর সাহস ধরে রাখতে পারল না ভালুকটা। ঝোপঝাড় ভেঙে ছুটে পালাল। বনে যাওয়ার আগে থামল না আর।
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল মুসা। ভয় পাচ্ছিল, তাড়া খেয়ে ভালুকটা ওদের দিকে ছুটে আসে।
গুলি করলে না কেন? গোল্ডের পিছন থেকে কথা বলল বিগ।
অকারণে মেরে লাভ কী? পরক্ষণে হেসে উঠল গোল্ড। ও, ভালুকের মাংস খেতে চেয়েছিলে? আগে বললে না কেন…
আমি যাচ্ছি, বিগৃস্ বলল। যা বললাম, মনে রেখো।
আমি যা বললাম, তুমিও মনে রেখো, গোল্ডও পাল্টা জবাব দিল।
দরজা লাগানোর শব্দ হলো। বিগসের পায়ের শব্দ ক্রমশ দূরে চলে গেল। আর বসে থেকে লাভ নেই। উঠে দাঁড়াল কিশোর। চলো, যাই।
শহরে ফেরার পথে মুসা বলল, গোল্ডকে কিন্তু বিগসের লোক মনে হলো না।
কী জানি! আমি ঠিক বুঝতে পারছি না!
আচ্ছা, এমনও তো হতে পারে পুরো ব্যাপারটাই একটা নাটক, মুসা বলল। আমাদেরকে দ্বিধায় ফেলার জন্য করেছে। নিশ্চয় আমাদেরকে পিছু নিতে দেখেছিল বিগস্। কেবিনে ঢুকে ইশারায় কোনভাবে গোল্ডকে বুঝিয়ে দিয়েছে আমরা পিছু নিয়েছি। তারপর দুজনে ঝগড়ার নাটক করেছে।
মাথা নাড়ল কিশোর। উঁহু, আমার তা মনে হয় না। কেন এ সব করছে অপরাধী, আসল কারণটা না জানলে ওকে ধরা কঠিন হবে। এখনও আমরা জানি না, এ সবের মূলে থিম পার্ক, না অন্য কিছু। দড়ি কেটে রেড লাইটকে ছেড়ে দেয়ার সঙ্গে ভোটেরই বা কী সম্পর্ক?
জবাব না পেয়ে চুপ হয়ে গেল মুসা।
শহরে ঢুকল ওরা। মুনকে দেখল। ঢাল বেয়ে নেমে আসছে। কাঁধে ময়দার বস্তা। দূর থেকে ওদের চিনতে পেরে হাত নাড়ল মুন। বস্তাটা নামিয়ে রেখে ওদের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। ওরা কাছে গেলে বলল, মনে মনে তোমাদেরকেই খুঁজছিলাম। একটা জিনিস দেখে এলাম। জরুরি কি না জানি না, তোমরা শুনলে হয়তো বুঝবে।
কী জিনিস? জানতে চাইল কিশোর। দ্বিধা করতে লাগল মুন। তারপর বলল, পোস্ট অফিসে গিয়েছিলাম, আমাদের নামে কোন চিঠি এসেছে কি না দেখতে। ইলকিস বিগসও গিয়েছিল চিঠি নিতে।
এত তাড়াতাড়ি পোস্ট অফিসে চলে গেল? ভুরু কোঁচকাল মুসা। একটু আগে তো দেখে এলাম।
কোথায় দেখেছ?
গোল্ডের ওখানে।
আমি দেখেছি কয়েক মিনিট আগে, মুন জানাল। বহু চিঠি এসেছে ওর নামে। ওর একটা চিঠির ঠিকানা দেখে ফেলেছি।
কিশোর জিজ্ঞেস করল, কী দেখলে?
অন্যের চিঠি চুরি করে দেখাটা অভদ্রতা, জানি, মুন বলল, কিন্তু চোখ চলে গেলে কী করব?
কার ঠিকানা? অধৈর্য হয়ে হাত নাড়ল মুসা।
চোখের পাতার বড় বড় পাপড়ি নাচাল মুন। নীল চোখে অস্বস্তি। ডিনামাইট!
মানে?
খামের গায়ের ফিরতি ঠিকানাটা ফেয়ারব্যাংকসের নর্থফিল্ড ডিনামাইট কোম্পানির। ডিনামাইট কোম্পানি থেকে বিগসের নামে কেন চিঠি আসে? খটকা লাগে না?
মাথা ঝকাল কিশোর। লাগে।
তথ্যটা কাজে লাগবে তোমাদের?
লাগতে পারে।
খুশি হলো মুন। আমি যাই। ময়দার ভারী বস্তাটা অবলীলায় কাঁধে তুলে নিয়ে স্বচ্ছন্দ গতিতে পাহাড়ী রাস্তা ধরে হেঁটে চলল।
কিশোরের দিকে ফিরল মুসা। ভুরু নাচাল। ডিনামাইট কোম্পানিকে বিগসের কী দরকার?
ডিনামাইট দিয়ে ঘরবাড়ি ওড়ানো যায়, ঠোট কামড়াল কিশোর।
ছাউনি পোড়ানো যায় না?
চিন্তিত ভঙ্গিতে মুসার দিকে তাকাল কিশোর। চলো। বিগসকে পেলে জিজ্ঞেস করব।
শহরের মধ্যে দিয়ে হেঁটে চলল দুজনে। গ্লিটার এতই ছোট শহর, কেউ রাস্তায় বেরোলে দেখা হবেই। ঠিকই পেয়ে গেল বিগৃকে। একটা কেবিন থেকে বেরোচ্ছে।
হাই, বয়েজ, ওদের দেখে উল্লসিত গলায় হাঁক ছাড়ল ও। গ্লিটার তোমাদের কেমন লাগছে?
ভালই লাগত, জবাব দিল কিশোর। কিন্তু এত উত্তেজনা, আগুন, বোমাবাজি, ডিনামাইট… আচ্ছা, নর্থফিল্ড ডিনামাইট কোম্পানির নাম শুনেছেন?
রাগ দেখা গেল বিগসের চোখে। সামলে নিয়ে হাসল। শুনেছি, তবে আজই প্রথম। খবরটা এত তাড়াতাড়ি কে দিল তোমাদের? পোস্ট অফিস থেকে কেউ চুরি করে খামের ঠিকানা দেখে গেছে নিশ্চয়?
আপনিই তো বলেছিলেন এখানে কোন কথা গোপন থাকে না, হেসে বলল কিশোর। হঠাৎ করেই আপনার কাছে চিঠি লিখে বসল কোম্পানিটা?
হ্যাঁ। প্রাইস লিস্ট পাঠিয়েছে।
কেমন কাকতালীয় না ঘটনাটা? লুক স্টার্লিঙের ঘরে বোমা ফাটার একেবারে পরদিনই বিস্ফোরক কোম্পানির প্রাইস লিস্ট এসে হাজির।
কাকতালীয়ই, জবাব দিল বিগস। আমি ওদের কাছে প্রাইস লিস্ট চাইনি। ডিনামাইটের কোন প্রয়োজন নেই আমার। লাগলে
তো লুকের কাছ থেকেই নিতে পারতাম।
কুঁচকে গেল মুসার ভুরু। লুক ডিনামাইটও বিক্রি করে?
করে। খনির কাজে লাগে ডিনামাইট। তা ছাড়া গাছের বড় বড় গুঁড়ি উপড়ানো থেকে শুরু করে বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হয়। প্রয়োজনীয় জিনিস, চাহিদা আছে, লুকের দোকানে পাওয়া না যাওয়ার কোন কারণ নেই। চলি। পরে দেখা হবে। পা বাড়িয়েও ফিরে তাকাল বিগস্। তোমাদেরকে একটা উপদেশ দিই, যদিও শুনতে ভাল লাগবে না; সেই পুরানো প্রবাদটা জানো তো, বেশি কৌতূহলে বিড়াল মরে?
চলে গেল বিগ। কিশোরের দিকে তাকাল মুসা। ও কি হুমকি দিয়ে গেল আমাদের?
তাই তো মনে হলো।
ওর কথা বিশ্বাস করেছ?
করা কঠিন, কিশোর বলল। কিন্তু দোষীই যদি হবে, প্রাইস লিস্ট পাঠানোর কথা স্বীকার না করলেও পারত।
চালাকি করেছে। স্বীকার না করলেই বরং বেশি সন্দেহ করতাম ওকে। ও সেটা জানে। কিন্তু আমি ভাবছি শেষ কার কাছে ডিনামাইট বিক্রি করেছেন লুক, জানতে পারলে ভাল হতো।
চলো না গিয়ে জিজ্ঞেস করি।
দোকানের কাছাকাছি এসে লুককে দেখতে পেল মুসা। নদীর ধারে একটা অদ্ভুত মেশিনের সামনে দাঁড়ানো। ওই যে।
তার দিকে এগোল দুজনে।
কয়েক গজ দূরে থাকতে বলল কিশোর, কী করছেন?
আচমকা ডাক শুনে ভীষণ চমকে গেলেন লুক। ফিরে তাকালেন। তোমরা! উফ, হার্ট অ্যাটাক করিয়ে দিয়েছিলে। ছায়ার মত হাঁটো। একটু শব্দ হয় না।
ঝরঝরে পুরানো মেশিনটা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল মুসা, কী মেশিন? চাঁদ থেকে আনালেন নাকি?
না, বৃহস্পতি গ্রহ থেকে, হাসলেন লুক। সামলে নিয়েছেন। এর নাম ফিশহুইল। গরমকালে নদীর বরফ গলে গেলে স্রোতের মুখে বসিয়ে দেয়া হয়। স্রোতের টানে চাকা ঘোরে। চাকায় লাগানো এই যে তারের থলিগুলো দেখছ, এগুলো ডোবে আর ভাসে। ডুবে যাওয়া থলিগুলো স্যামন মাছে ভর্তি হয়ে ওপরে উঠে আসে, ওপরেরগুলো তখন নীচে চলে যায়। মাছগুলো আপনাআপনি একটা বাক্সে পড়তে থাকে। খালি থলি নীচে নামে, ভরা থলি ওপরে ওঠে। এভাবেই চলতে থাকে মাছ ধরা।
দারুণ মেশিন তো, মুসা বলল। আপনার?
না, জো সারটনের। একটা লোককে এটার কাছে ঘুরঘুর করতে দেখে সন্দেহ হয়েছিল। দেখতে এসেছি, এটাও নষ্ট করে দিল কি না, বেচারার নৌকাটার মত। নৌকাটা নষ্ট করে খুব খারাপ কাজ করেছে।
লোকটাকে চিনতে পেরেছেন?
দ্বিধা করলেন লুক। পিছন থেকে দেখেছি তো, ঠিক চিনতে পারিনি। তবে হাঁটার ভঙ্গি গোল্ড ফেরানির মত। তোমরা কোথায় যাচ্ছিলে?
আপনার কাছেই এসেছি। কথা ছিল।
দোকানে চলো।
কয়েক সেকেণ্ড নীরবে ফিশহুইলটার দিকে তাকিয়ে থেকে ঘুরে দাঁড়াল কিশোর। লুকের সঙ্গে তার দোকানের দিকে এগোল। হাঁটতে হাঁটতে ডিনামাইটের কথা জিজ্ঞেস করল।
নাহ, দুচার দিনের মধ্যে কারও কাছে বিক্রি করিনি, লুক বললেন। শেষ বিক্রি করেছি শীতের শুরুতে। আমার ছাউনিটার কথা ভুলতে পারছ না তোমরা, তাই না? তবে লিখে দিতে পারি, ডিনামাইট দিয়ে পোড়ায়নি। ডিনামাইটের দাম আছে। মাছি মারতে কামান দাগতে যাবে না। আমি শিওর, আগুন লাগার মূলে ওই জেরিক্যানের পেট্রল। দোকানের বারান্দায় উঠে গেলেন তিনি। ফিরে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ডিনামাইটের কথা মাথায় এল কেন তোমাদের?
বিগসের কাছে ডিনামাইট কোম্পানি চিঠি দিয়েছে, ফস করে বলে ফেলেই বুঝল মুসা, গোপন তথ্য ফাঁস করে দেয়াটা ভুল হয়ে গেছে।
তাই নাকি? তাহলে তো চিন্তার কথাই… দোকানে ঢুকে গেলেন লুক।
নিজেদের কেবিনে ফিরে চলল দুই গোয়েন্দা। মুসা বলল, আমাদের চোখ এড়িয়ে ফিশহুইলটার কাছে কীভাবে গেল গোল্ড, বুঝতে পারছি না। রাস্তা তো মোটে ওই একটা। এমন নির্জন রাস্তা দিয়ে একজন লোক হেঁটে গেল আর আমাদের চোখে পড়ল না, এত কানা তো এখনও হইনি।
লুক তো বললেনই পিছন থেকে দেখেছেন। গোল্ড কি না শিওর নন তিনি। চিন্তিত ভঙ্গিতে জবাব দিল কিশোর। আচ্ছা, গোল্ডকে বিপদে ফেলার জন্য মিথ্যে কথা বলেননি তো?
তা কেন বলতে যাবেন?
কারণ, তিনি গোল্ডকে দেখতে পারেন না।
তা নাহয় বললেন। কিন্তু ফিশহুইলটার কাছে তো কেউ একজন নিশ্চয় গিয়েছিল। নইলে দেখতে যেতেন না লুক। সেই লোকটা কে?
বিগ নয়, এটা ঠিক। লুকের রহস্যময় লোকটা যখন ফিশহুইলের কাছে, বিগ তখন আমাদের সামনে। আমাদের সঙ্গে কথা বলছিল।
রাস্তার মোড়ের কাছে আসতে ওপাশ থেকে কুকুরের চিৎকার কানে এল। হুকুম শোনা গেল, হাইক! হাইক!
মোড় ঘুরে ছুটে এল টেড সিউলের কুকুরবাহিনী।
হাইক! হাইক! বলে চেঁচিয়ে কুকুরগুলোকে গতি বাড়ানোর নির্দেশ দিতে থাকল টেড। স্লেজ নিয়ে ছুটে আসছে ঢাল বেয়ে। কিশোর-মুসা সেই পথের ওপরই দাঁড়ানো। ওদের দেখেও দেখল যেন টেড।
দাঁত বেরিয়ে গেছে সামনের নেতা-কুকুরটার। বিকট মুখভঙ্গি। কিশোরের কাছ থেকে মাত্র কয়েক গজ দূরে রয়েছে। থামার কোন লক্ষণই নেই।
স্লেজটা গায়ের ওপর এসে পড়বে।