৬. হাইমাসের পাশে বসেছে রবিন আর মুসা

0 Comments

ছুটে চলেছে ভ্যান।

সামনের সীটে হাইমাসের পাশে বসেছে রবিন আর মুসা।

পেছনে মিসেস হাইমাস। তার মাথার ওপরে ভ্যানের ছাতের রডে ঝুলছে পাঁচটা খাঁচা।

হাইমাস যেখানে নতুন বাসা নিয়েছে, তার থেকে অনেক দূরে স্যানটিনোর গ্রাম, উপকূলের ধারের সমভূমিতে। পৌঁছতে বিকেল হয়ে যাবে।

আঁকাবাঁকা নির্জন পাহাড়ী পথ ধরে ছুটছে গাড়ি।

হঠাৎ শোনা গেল মিসেসের উত্তেজিত কণ্ঠ, হাইম, একটা গাড়ি! পিছু নিয়েছে।

গাড়ি? রিয়ার-ভিউ মিররে তাকাল হাইমাস। কই?।

মোড়ের ওধারে…ওই যে বেরোচ্ছে: কোয়ার্টার মাইল দূরে।

হ্যাঁ হ্যাঁ, দেখছি। সেডান পিছু নিয়েছে, কি করে বুঝলে?

তাই তো মনে হচ্ছে?

কি রঙ? ধূসর? উত্তেজিত হয়ে বলল মুসা। কই, দেখি তো?

তার পাশের মিররে দেখা যাচ্ছে না গাড়িটা, পেছন দিকে উঁকি-ঝুঁকি দিয়েও কিছু দেখল না। শেষে কেবিনের দরজা খুলে শক্ত করে তার হাত ধরতে বলল রবিনকে। দরজা দিয়ে বের করে দিল শরীরের অর্ধেকটা। কই…ও, হ্যাঁ, দেখেছি। সেদিন ওই গাড়িটাই দেখেছিলাম, ধাক্কা লাগিয়ে দিচ্ছিল।

শোঁপা! গুঙিয়ে উঠল হাইমাস। কি করি এখন?

চালিয়ে যাও, তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছে মিসেসের কণ্ঠ, সামনের শহরটায় ঢোকার আগে ধরতে দেবে না।

কিন্তু মাইল পঁচেকের ভেতর তো কোন শহর নেই। খালি পাহাড় আর পাহাড়। অ্যাক্সিলারেটর টিপে ধরল সে, যতখানি গেল। প্রচণ্ড গোঁ গোঁ করে প্রতিবাদ জানাল পুরানো এঞ্জিন, ঝনঝন করে কাপছে ঝরঝরে বডি, বিপজ্জনক গতিতে ছুটল পাহাড়ী পথ ধরে।

টায়ারের কর্কশ আর্তনাদ তুলে বাঁক ঘুরল গাড়ি। এক ধারে হালকা লোহার বেড়া, জোরে ধাক্কা লাগলে ঠেকাতে পারবে না, উড়ে গিয়ে পাঁচশো ফুট নিচের খাদে পড়বে গাড়ি। জোরে মোড় নিতে গিয়ে বেড়ার সঙ্গে নাক ছুঁই-ছুঁই হয়ে গেল ভ্যানের, দম বন্ধ করে ফেলল দুই গোয়েন্দা। কিন্তু সময়মত সরিয়ে আনল হাইমাস।

একেবারে পিছে এসে গেছে, চেঁচিয়ে জানাল মিসেস। পাশ কাটাতে চাইছে।

আয়নায় দেখতে পাচ্ছি, বিড় বিড় করল হাইমাস। কিন্তু সাইড দেব না।

সাঁই করে রাস্তার মাঝখানে গাড়ি নিয়ে এল সে। পেছনে টায়ারের তীক্ষ্ণ চিৎকার শোনা গেল, গাল দিয়ে উঠল যেন হর্ন।

ঝাঁকুনি খেতে খেতে ছুটে চলেছে পুরানো ভ্যান, বডির বিচিত্র শব্দে আরোহীদের কান ঝালাপালা। কিন্তু উপায় নেই। গতি কমানো যাবে না। পেছনে ছায়ার মত লেগে আছে বিশাল সেডান। খালি পাশ কাটানোর চেষ্টা।

খানিকদূর নেমে ধীরে ধীরে আবার উঠে গেছে পথ। হঠাৎ যেন মাটি খুঁড়ে উদয় হলো বিশাল এক ট্রাক, পথের শেষ মাথায়। পুরো রাস্তা জুড়ে আসছে, ফাঁক খুবই সামান্য।

মস্ত এক দানব যেন ছুটে আসছে পাহাড় কাঁপিয়ে।

চিল্কার করে মাথা নুইয়ে ফেলল রবিন।

শেষ মুহূর্তে স্টিয়ারিং ঘোরাল হাইমাস, কোনমতে পাশ কাটিয়ে এল ট্রাকের। পলকের জন্যে ট্রাক-ড্রাইভারের এক জোড়া বিস্মিত চোখ নজরে পড়ল মুসার।

সেডানটাও নিরাপদেই ট্রাকের পাশ কাটাল। খানিকটা পিছিয়ে পড়ল। কিন্তু গতি বাড়িয়ে পুষিয়ে নিল আবার ফারাকটা। রাস্তার মাঝখানে ভ্যান তুলে আনার কথা যেন ভুলে গেল হাইমাস, সুযোগটা কাজে লাগাল সেডান। চলে এল ভ্যানের পাশে।

সীটের ধার, দরজার কিনার, যে যেটা পারছে খামচে ধরে সীটে বসে থাকার চেষ্টা চালাচ্ছে দুই গোয়েন্দা। ঝাঁকুনির চোটে বার বার সরে যাচ্ছে, পড়ে যেতে চাইছে সীট থেকে। ওই অবস্থায় থেকেই নজর দিল সেডানের ভেতর। চারজন আরোহী, তিনজন বয়স্ক, আরেকজন তরুণ। ফেকাসে চেহারা। লম্বা নাক চেপে ধরেছে জানালার কাচে, বিকৃত হয়ে গেছে চেহারা। কিন্তু তা-সত্ত্বেও চিনতে পারল দুই গোয়েন্দা।

টেরিয়ার ডয়েল।

শুঁটকি! বোম ফাটল যেন মুসার কণ্ঠে। হারামী কোথাকার।…দাঁড়াও, আগে ধরি, তারপর… আস্তিন গোটানোর জন্যে হাত সরিয়ে আনতেই খামচে ধরল জানালার কিনার।

ঢালু হয়ে গেছে আবার পথ। ভ্যানের এক পাশে একশো ফুট গভীর খাদ, আরেক পাশে সেডান। সরে আসছে পাশে, ইঞ্চি ইঞ্চি করে ভ্যানটাকে সরিয়ে দিচ্ছে খাদের দিকে। ধাক্কাধাক্কি করে সেডানের শক্তিশালী এঞ্জিনের সঙ্গে পারা যাবে না, বুঝে গেছে হাইমাস। ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল, না, হবে না। না থামলে খাদে ফেলে দেবে।

ব্রেক কষল সে। থেমে গেল ভ্যান, ডান পাশের চাকা দুটো খাদের কিনার থেকে মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরে। বাঁ পাশে ভ্যানের একেবারে গা ঘেষে দাঁড়াল সেডান। দরজা খোলার উপায় নেই। ডান পাশের দরজা খোলা যায়, কিন্তু লাভ কি? একশো ফুট নিচে তো লাফিয়ে নামতে পারবে না।

ওদের দিকে চেয়ে মসৃণ হাসি হাসল ফরাসী লোকটা, দাঁতে চেপে রেখেছে সাগর কলার মত মোটা এক সিগার। ওটা সরিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল, এই যে, হাইমাস, দেখা হয়েই গেল। যতখানি ভেবেছিলাম তত বড় নয় আমেরিকা।

কি চাই এনথনি? ভোঁস ভেঁস করে নিঃশ্বাস ফেলছে হাইমাস, ঘামছে দরদর করে। মেরেই ফেলেছিলে।

কি যে বলো। মারব কেন? খুব বাজে ড্রাইভ করো তুমি, মাতালে ওরকম করে। এক কাজ করো খাঁচাগুলো আমার গাড়িতে তুলে দাও। টমাস, যাও তো, ভ্যানের পেছনের দরজাটা খুলে দেবে ওরা। খাঁচাগুলো নিয়ে এসো, সহজ ভঙ্গিতে কথা বলছে সে। যে কোন ব্যাপারই না এসব।

যাচ্ছি, স্যার, মনিবের মত শান্ত নয় বেঁটে ড্রাইভার, গাড়ি চালাতে হয়েছে তো, তাই বোধহয় সামান্য হাঁপিয়ে পড়েছে।

লরা, দরজা খুলে দাও, হাইমাস বলল, আর কিছু করার নেই। বাধা দিলে খাদে ফেলে দেবে।

অনিচ্ছাভরে উঠল মিসেস হাইমাস, পেছনের দরজার হুক সরিয়ে ওপরের দিকে তুলে দিল দরজা।

দুই গোয়েন্দা দেখছে টেরিকে। খুব মজা পাচ্ছে সে। হাসছে দাঁত বের করে। জোরে ঠোঁট কামড়ে ধরল মুসা। পারছে না নামতে, নইলে হাসি বের করে দিত। টেরির দাঁত ফেলে দেয়ার জন্যে হাত নিশপিশ করছে তার।

ব্যাপারটা বুঝতে পারছে টেরি। মুসাকে আরও রাগিয়ে দেয়ার জন্যে ভেঙচি কাটল। হাহ, গোয়েন্দা। চোরের সঙ্গে গিয়ে হাত মিলিয়েছে।

অনেক কষ্টে চুপ রইল মুসা আর রবিন।

খাঁচাগুলো নামাচ্ছে টমাস, শব্দ শোনা যাচ্ছে।

বস, টমাসের গলা শোনা গেল, জায়গা হচ্ছে না সবগুলো। ছেলেটাকে নামিয়ে দিলে হবে।

এই ছেলে,শোঁপা বলল। নামমা তো।

নামব? হাসি হাসি ভাবটা চলে গেল টেরির। নামব কেন? আমিই তো দেখালাম।

দেখানো শেষ হয়েছে। এবার নামো।

তর্ক শুরু করল টেরি।

টমাস, বলল শোঁপা, ছুঁড়ে ফেলে দাও তো বেয়াদবটাকে।

কুৎসিত হাসি হেসে এগিয়ে এল টমাস। টেরির ঘাড় ধরে বেড়াল-ছানার মত টেনে বের করে ফেলে দিল রাস্তায়।

উঠে বসল টেরি। বোকা হয়ে গেছে, বিশ্বাস করতে পারছে না এই ব্যবহার করা হবে তার সঙ্গে। কিন্তু আমাকে পাঁচশো ডলার পুরস্কার দেবেন বলেছিলেন।

বিল পাঠিয়ে দিয়ো তোমার বাবার কাছে। অনেক বড়লোক, আমাদের হয়ে দিয়ে দেবে, ময়লা দাঁত বের করে হেসে চোখ টিপল টমাস। সব কটা খাঁচা গাড়িতে তুলল। বস, একটা কম। কালো পাখিটা নেই।

নেই? জানালা দিয়ে মুখ বের করল শেপা। হাইমাস? ব্ল্যাকবিয়ার্ড কোথায়? সাতটা পাখিই তো লাগবে।

ও, আমার ঘরে ঢুকেছিলে তুমিই? কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক হচ্ছে না হাইমাসের। জেনেছ সবাই। চোর কোথাকার।

ব্ল্যাকবিয়ার্ড কোথায়? হাসি সামান্যতম মলিন হলো না শোঁপার। সাতটাই লাগবে।

উড়ে গেছে।

যাহ মিছে কথা বলছ। মুসা আর রবিনের দিকে তাকাল শোঁপা, শীতল চাহনি। তোমাদের কাছে আছে, না? খুব চালাক তোমরা।

নেই, চোখ সরিয়ে নিল রবিন। কোথায় আছে জানি না।

হাইমাসের পকেটের দিকে চোখ পড়ল শোঁপার। তাড়াহুড়ো করে রবিনের লেখা কাগজটা খুঁজে রেখেছিল হাইমাস, অনেকখানি বেরিয়ে আছে। শোঁপার দৃষ্টি অনুসরণ করে পকেটের দিকে চেয়েই সামান্য চমকে গেল সে। ঠিকই খেয়াল করল ধুরন্ধর চিত্র-চোর। হাত বাড়াল, দেখি কাগজটা? নইলে ধাক্কা দিয়ে গাড়ি খাদে ফেলে দেব।

মুসার হাতে কাগজটা দিল হাইমাস, মুসা দিল শেপাকে।

হুঁ, হাসিমুখে মাথা দোলাল শেপা, সাতটার মধ্যে তিনটে। বাকিগুলো কথা বলেনি, না? বলবে, বলবে। ব্ল্যাকবিয়ার্ডকে দরকার। দেখি পারলে খুঁজে নেব। চলি হাইমাস, লণ্ডনে দেখা হবে।

চলে গেল সেডানটা।

ছাই হয়ে গেছে হাইমাসের চেহারা। স্টিয়ারিং খামচে ধরে গুঙিয়ে উঠল সে, পরক্ষণেই দু-হাতে চেপে ধরল পেট.। উফফ…

কি হলো, হাইম? ভুরু কোঁচকালো মিসেস। খারাপ লাগছে?

ব্যথা।…বেড়েছে…

হ্যাঁচকা টানে দরজা খুলে নেমে এল মিসেস হাইমাস। মুসা আর রবিনকে নামতে বলল। হাইমাসকেও নামাল ধরে ধরে। নিজে উঠে বসল ড্রাইভিং সীটে। তার পাশে উঠল আবার হাইমাস। মুসা আর রবিন উঠল পেছনে।

তাদের দিকে ফিরে বলল মিসেস, বেশি উত্তেজনা। অ্যাসিডিটি বেড়ে যায় ওর, আলসার আছে। গাড়ি স্টার্ট দিল, এখন সোজা হাসপাতাল। পড়ে থাকবে কয়েকদিন। স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে খাদের ধার থেকে গাড়ি সরিয়ে আনতে আনতে বলল, কাউকে কিছু বোলো না। পুলিশকে বলে কিছু হবে না। এদেশে শেপার বিরুদ্ধে অভিযোগ নেই পুলিশের।…তবে, তোমাদের হাজার ডলার ঠিকই পাবে, যদি ছবিটা আমাকে দিতে পারো।

ব্রেক কষল মিসেস। সামনে দু-হাত তুলে দাঁড়িয়েছে টেরিয়ার। শুনুন। আমাকে ফেলে যাবেন না, প্লীজ।

কঠিন চোখে তাকাল মিসেস হাইমাস। কুঁকড়ে গেল টেরিয়ার।

যাও, ওঠো, কড়া গলায় বলল মিসেস।

গাড়িতে উঠল টেরিয়ার।

বলল, কি হয়েছিল, গাড়ি চালাতে চালাতে বলল মিসেস হাইমাস। শোঁপা খুঁজে পেল কি করে আমাদের? তুমি কিছু করেছ।

এই শুঁটকি, সরো, গন্ধ লাগে, ঝাল মেটানোর সুযোগ পেয়ে গেছে মুসা।

থাক, মুসা, বাধা দিল মিসেস। এই, তুমি বলো। চুপ করে আছো কেন?

রকি বীচের মেইন রোডে হাঁটছিলাম, মিনমিন করে বলল টেরিয়ার। হঠাৎ পাশে এসে থামল শেপার গাড়ি। জিজ্ঞেস করল, রোলস-রয়েস চড়ে এমন তিনটে ছেলেকে চিনি কিনা। বললাম, চিনি, আড়চোখে রবিন আর মুসার দিকে তাকাল, অস্বস্তি চাপা দিতে পারছে না। শোঁপা বলল, হলুদ ঝুঁটিওয়ালা কয়েকটা কাকাতুয়া খুঁজে বের করে দিতে পারব কিনা, ওগুলো নাকি তার, চুরি হয়েছে। প্রতিটি পাখির জন্যে দেড়শো ডলার করে দেবে। বললাম, পারব। আমাকে একটা ফোন নম্বর দিয়ে সে চলে গেল।

সে-রাতে এমনি ঘুরতে গিয়েছিলাম হলিউডে, কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে দেখা করলাম। ওরা সবাই জানে কাকাতুয়ার কথা, খোজাখুঁজি করছে। আমিও যোগ দিলাম। একটা কাকাতুয়া কোথায় আছে, জেনে ফেললাম। গো… ইয়ে… গোয়েন্দাদের আগেই গিয়ে হাজির হলাম। নিয়ে গেলাম। ফোন করলাম শেপাকে।

খুব খুশি হলো ও। তখন বলল, কিশোর গোয়েন্দারা নাকি কয়েকটা চোরকে সাহায্য করছে। ওদের পিছু নিতে বলল।

রোলস রয়েসের পিছু নিলাম। একটা পুরানো বাড়ির সামনে থামল গাড়িটা। কিছুক্ষণ পর দেখলাম, গোয়েন্দাদের না নিয়েই গাড়িটা চলে যাচ্ছে। একটু পর দুই গোয়েন্দা বেরোল আরেকটা কাকাতুয়া নিয়ে। তারপর আপনাদের ভ্যান এল, ওদের তুলে নিতে দেখলাম।

ভ্যানকে অনুসরণ করে দেখে এলাম কোথায় থামে। পাহাড়ের চিপা থেকে বেরিয়ে একটা ফোনবুদে গিয়ে আবার ফোন করলাম শেপাকে। ছুটে এল সে।

তারপর আর কি? তিক্ত কণ্ঠে বলল টেরিয়ার। বেঈমানী করল সে, পাঁচশো ডলার দিল না…

ঘাড়েও হাত দিল…আহারে! জিভ টাকরায় ঠেকিয়ে চুকচুক শব্দ করল মুসা।

থাক, মুসা, টেরিয়ারের করুণ দশায় দুঃখ হচ্ছে রবিনের। আর কিছু বোলো।।

একটা মোড়ে এসে গাড়ি রাখল মিসেস হাইমাস। টেরিয়ারকে বলল, আমরা এখন হাসপাতালে যাব। হেটে চলে যাও বাস স্টপেজে।

টেরিয়ার নেমে গেলে দুই গোয়েন্দাকে বলল মিসেস হাইমাস। হ্যাঁ, তোমরা কিন্তু খোজা বন্ধ কোরো না, হাজার ডলার পাবে।

হেডকোয়ার্টারে আলোচনায় বসেছে তিন গোয়েন্দা।

সারাদিন ইয়ার্ডে ব্যস্ত থেকেছে কিশোর, একা একা অনেক কাজ করেছে। রবিন আর মুসাকে আরেকটা বাস স্টপেজে নামিয়ে দিয়েছিল মিসেস হাইমাস। ওখান থেকে রকি বীচে ফিরে যার যার বাড়ি গিয়ে খেয়ে তারপর ইয়ার্ডে এসেছে।

তিনজনেই শ্রান্ত।

ওই রোলস-রয়েসই যত নষ্টের মূল, কথা শুরু করল কিশোর। ওটাই ফাঁস করে দিল দু-বার, চোরেরা আমাদের পিছু নিতে পারল। শিক্ষা হলো একটা। চট করে লোকের চোখে পড়ে এমন কোন কিছু ব্যবহার করা উচিত নয় গোয়েন্দাদের।

শুধু একথা বলার জন্যেই বসেছ? হাত ওল্টাল মুসা। সারাদিন কত কাণ্ড হলো। হাতে পেয়েও হারালাম কাকাতুয়াগুলো। কষ্ট করলাম আমরা, আর শুঁটকির বদৌলতে ওগুলো সব পেল শোঁপা।

কাকাতুয়াগুলোরও অনেক হয়রানি হচ্ছে, কিশোর বলল। আমার মনে হয়, এত সহজে শোঁপার কাছে মুখ খুলবে।

কিন্তু ও খোলাবেই, রবিন বলল। ও যে-রকম মানুষ দেখলাম, কাকাতুয়াও ওর কাছে মুখ না খুলে পারবে না।

পারলেও সময় লাগবে। তাতে কিছুটা সময় পাব আমরা।

কি হবে তাতে? মুসা জিজ্ঞেস করল। চারটে মেসেজ জানি আমরা, লাগবে সাতটা। বাকি তিনটে শেপার কাছ থেকে ছিনিয়ে আনবে নাকি?

না, তা আনতে পারব না, স্বীকার করল কিশোের। মিস্টার ফোর্ডের কাকাতুয়া এনে দিতে পারব না, মিসেস বোরোরটাও দিতে পারব না। ছবিটা খুঁজতে সাহায্য করতে পারব না মিসেস হাইমাসকে…।

এমনকি শুঁটকির লম্বা নাকটা ঘুসি মেরে ভোতাও করে দিতে পারব না, মুসার সব রাগ গিয়ে পড়েছে টেরিয়ারের ওপর, তার জন্যেই হাত থেকে ফসকে গেল পাখিগুলো। ব্যাটা পালিয়েছে, আসার সময় শুনলাম। কোন আত্মীয়ের বাড়ি নাকি বেড়াতে গেছে। মরুকগে, হারামজাদা।

কয়েক মিনিট নীরবতা। চুপচুপ নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটছে কিশোর। অবশেষে মাথা ঝাকাল, হ্যাঁ, ভরসা কম।

আবার নীরবতা। ব্ল্যাকবিয়ার্ড দানা ঠুকরে খাচ্ছে, শুধু তার মৃদু খুটখুট আওয়াজ।

ক্যাপ্টেন কিড, শারলক হোমস আর রবিন হুডকে কথা বলাতে পারলে কিছু হয়তো করা যেত, বিড়বিড় করল রবিন।

রবিন হুড, খপ করে কথাটা ধরল ব্ল্যাকবিয়ার্ড। মাথা কাত করে তাকাল তিন গোয়েন্দার দিকে। ডানা ঝাপটাল। আয়্যাম রবিন হুড, স্পষ্ট উচ্চারণ। আই শট অ্যান অ্যারো অ্যাজ এ টেস্ট, আ হানড্রেড পেসেস শট ইট ওয়েস্ট।

ঝট করে মুখ তুলে তাকাল তিনজনেই।

শুনলে কি বলল? মুসার প্রশ্ন।

তোমার কি মনে হয়… কিশোরের দিকে চেয়ে থেমে গেল রবিন, ডোক গিলল।

চুপ, ফিসফিস করে বলল কিশোর। ওকে বাধা দিয়ো না। দেখি, আবার বলে নাকি? ময়নার দিকে চেয়ে জোরে বলল, হালো, রবিন হুড।

আয়্যাম রবিন হুড, আবার বলল ব্ল্যাকবিয়ার্ড আই শট অ্যান অ্যারো অ্যাজ এ টেস্ট আ হানড্রেড পেসেস শট ইট ওয়েস্ট, বলেই ডানা ঝাপটাল আবার।

হাঁ হয়ে গেছে মুসা।

কিশোরও অবাক। আস্তে বলল, মনে আছে, ডিয়েগো বলেছিল, ময়নাটা জন সিলভারের কাঁধে বসে থাকত? কাকাতুয়াগুলোকে যখন বুলি শেখাত তখনও।

হ্যাঁ, উত্তেজনায় কথা আটকে যাচ্ছে রবিনের। আরেকটা ব্যাপার সেদিন খেয়াল করিনি, ময়নাটা কিন্তু স্কারফেসের বুলি বলেছিল, আই নেভার গিভ আ সাকার অ্যান ইভন বেক…সত্যি, ময়নারা কাকাতুয়ার চেয়ে অনেক ভাল কথা শেখে কিশোর, অন্য দুটো…।

দেখি চেষ্টা করে, বেছে ভাল একটা সূর্যমুখীর বীচি নিয়ে ব্ল্যাকবিয়ার্ডের ঠোঁটের কাছে বাড়িয়ে ধরল কিশোর। ডাকল, হালো, শারলক হোমস। হালো, শারলক হোমস।

আগের বারের মতই সাড়া দিল ময়না। ডানা ঝাপটে বলল, ইউ নো মাই মেথডস, ওয়াটসন। থ্রি সেভেনস লীড টু থারটিন, কথায় কড়া ব্রিটিশ টান।

লিখে নাও, রবিন, নিচু গলায় বলল কিশোর। দরকার ছিল না, সে বলার আগেই লিখতে শুরু করেছে নথি-গবেষক।

ক্যাপ্টেন কিড, ময়নার ঠোঁটের ফঁাকে আরেকটা বীচি ধরিয়ে দিল কিশোর। হালো, ক্যাপ্টেন কিড।

আয়্যাম ক্যাপ্টেন কিড, জবাব দিল ময়না। লুক আনডার দা স্টোনস বিয় দা বোনস ফর দা বক্স দ্যাট হ্যাজ নো লকস।

খাইছে! কণ্ঠস্বর কিছুতেই দাবিয়ে রাখতে পারল না মুসা। এ-তো দেখি জ্যান্ত টেপ রেকর্ডার। সব মুখস্থ করে রেখেছে

আগেই আন্দাজ করা উচিত ছিল আমার, গম্ভীর হয়ে বলল কিশোর। ওই যখন, স্কারফেসের বুলি বলল…। ২ বলার নেশায় পেয়েছে যেন ব্ল্যাকবিয়ার্ডকে, স্কারফেসের নাম শুনেই চেঁচিয়ে উঠল, আই নেভার গিভ আ সাকার অ্যান ইভন ৰেক! অ্যাণ্ড দ্যাটস আ লেড পাইপ সিনশ। হা-হা-হা! টেনে টেনে হাসল সে, যেন এক মহা-রসিকতা করে ফেলেছে।

কাগজের ওপর পেন্সিলের তুফান চালাচ্ছে রবিন। লেখা শেষ করে পাতাটা বাড়িয়ে দিল কিশোরের দিকে। নাও, সাতটাই হয়ে গেল।

তা হলো, মাথা কাত করল মুসা। কিন্তু আরেকটা কাজ বাকি রয়ে গেল। খুব ছোট্ট সহজ একখানা কাজ।

কি? রবিন বলল।

মেসেজগুলোর মানে বের করা। খুবই সহজ, না?

Categories: