৮. প্রাচীন গির্জার ধ্বংসাবশেষ ও কবরস্থান

0 Comments

কাঁকর বিছানো অসমতল পথে ঝাঁকুনি খেতে খেতে ছুটে চলেছে ইয়ার্ডের ছোট ট্রাক। চালাচ্ছে বোরিস। পাশে বসে পথের দিকে তাকিয়ে রয়েছে দুই গোয়েন্দা।

মাত্র কয়েক মিনিট আগে উঠে বসেছে। এতক্ষণ হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল মেঝেতে। ইয়ার্ডের দশ মাইল দূরে চলে এসেছে গাড়ি। এতদূরে নিশ্চয় আর কেউ নেই তাদের ওপর চোখ রাখার জন্যে।

কেউ পিছু নেয়নি আমাদের, এক সময় বলল বোরিস। কিন্তু ও-কি? ওটা শহর না ভূতের গী। আমাদের ব্যাভারিয়ায় ওরকম অনেক শহর আছে… ভূতের গল্প আরু করল সে।

এমনিতেই চলেছে গোরস্থানে। এসব ভূতের গল্প এখন মোটেই ভাল লাগছে না মুসার।

মেরিটা ভ্যালিতে পৌঁছতে এক ঘন্টা লাগল। ঠিকই বলেছে বোরিস, এটাকে শহর বলা চলে না। বাণিজ্য কেন্দ্রগুলো ফেলে এল পেছনে। ছাল চামড়া ওঠা, পুরানো বেকার স্ট্রীট ধরে এগিয়ে চলল। দুই ধারে একটা বাড়িও চোখে পড়ল না। পথের শেষ মাথায় পাথরের ছড়ানো দেয়াল। দেয়ালের ওপাশে পাথরের শত শত কুশ আর স্মৃতিস্তম্ভ ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। মেরিটা ভ্যালির গোরস্থান।

হাত তুলে দেখাল মুসা। দেয়ালের এক জায়গায় ফাঁক, মানে দেয়াল নেই ওখানে। কাঠের একটা পুরানো সাইনবোর্ডে লেখা রয়েছে।

২২২বিবেকার স্ট্রীট।

এখানেই থামব? জিজ্ঞেস করল মুসা।

মাথা নাড়ল কিশোর। বোরিস, ডানে যান। পরের রাস্তাটায়।

হোকে, যাচ্ছি।

মস্ত কবরস্থান, অনেক পুরানো। দেয়ালের কোণের দিকে আসার পর চোখে পড়ল প্রাচীন গির্জার ধ্বংসাবশেষ, পাথর আর কাঁচা ইটে তৈরি। নির্জন, পরিত্যক্ত।

মোড় নিল বোরিস। এগোল আরও শ-খানেক গজ। কবরস্থান পেছনে ফেলে চলে এল ইউক্যালিপটাস গাছের বেশ বড়সড় একটা ঝাড়ের কাছে। পথের ওপর মাথা নুইয়ে আছে ডালপালা, বয়েসের ভারে বাঁকা হয়ে গেছে যেন কোমর। পাতার ঝঝাল তৈলাক্ত গন্ধ ভারি করে তুলছে বাতাস।

গাছের নিচে রাখুন, বোরিসকে বলল কিশোর।

নামল দুই গোয়েন্দা।

আমাদের দেরি হবে, বলল কিশোর, আপনি এখানে থাকুন।

হোকে। রেডিও অন করে দিয়ে একটা খবরের কাগজ টেনে নিল বোরিস।

এবার কি? জিজ্ঞেস করল মুসা।

নীরবে একটা ফাঁকা মাঠ দেখাল কিশোর, কোণাকুণি গিয়ে মিশেছে গোরস্থানের দেয়ালের সঙ্গে। কেউ না দেখে ফেলে আবার। ভেতরে কেউ থাকতেও পারে।

নিঃশব্দে দেয়াল টপকাল দুজনে।

নেই কেউ, বলল মুসা, তবে থাকলে ভাল হত। বড় বেশি নির্জন। ভয় লাগছে।

জবাব দিল না কিশোর। অনেক দিনের অব্যবহৃত একটা পথ ধরে এগিয়ে চলল। দু-ধারে অসংখ্য ছোটবড় স্মৃতিস্তম্ভ আর ক্রুশ, কোনটা আস্ত কোনটা ভাঙা, কোনটা হেলে রয়েছে বিষণ্ণ ভঙ্গিতে।

পথ চিনে রাখো, মুসা, অন্ধকার হলেও যেন ফিরে যাওয়া যায়। তুমিই পারবে, আমাকে দিয়ে হবে না।…এহহে, যাহ, টর্চ আনতে ভুলে গেছি।

মরেছি! অন্ধকারে? কুকুরছানার মত কেউ করে উঠল মুসা। দরকার কি এতক্ষণ থাকার? হালকা এক ঝলক ধোঁয়ার মত কিছু উড়ে গেল ওদের সামনে দিয়ে। আরে? আবার কুয়াশা।

পশ্চিমে তাকাল কিশোর, প্রশান্ত মহাসাগরের অসীম বিস্তার যেন পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছে। হ্যাঁ, ঠিকই আন্দাজ করেছে মুসা। পানির ওপরে চাপ চাপ ধোঁয়ার মেঘ ভাসছে, বাতাসে দুলে ধীরে ধীরে সরে আসছে এদিকেই।

এরকম হয় দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায়। কোন আভাস না দিয়েই হঠাৎ করে কুয়াশা জমতে শুরু করে সাগরের ওপর, ধেয়ে আসে উপকূলে, দিনের বেলায়ও তখন কয়েক হাত দূরের জিনিস দেখা যায় না।

দিল বোধহয় সর্বনাশ করে, কিশোরের কণ্ঠে শঙ্কার ছায়া, মুখ গম্ভীর।

অন্ধকারের চেয়েও খারাপ। এসে পড়ার আগেই যদি ছবিটা খুঁজে পেতাম।…ওই যে, রাস্তাটা।

লম্বা লম্বা পায়ে হেঁটে চলল কিশোর। দুটো বড় স্মৃতিস্তম্ভের মাঝ দিয়ে এসে থামল অনেকগুলো পথের একটা সঙ্গমস্থলে। পথের শাখাপ্রশাখা এখান থেকে বেরিয়ে আলের মত ছড়িয়ে গেছে বিশাল গোরস্থানের ভেতরে ভেতরে। জায়গাটা ২২২ বি লেখা সাইনবোর্ডের কাছেই।

এবার? অস্বস্তি লাগছে মুসার।

পকেট থেকে নোট লেখা কাগজ বের করল কিশোর। টু টু টু বি বেকার স্ট্রীটে এলাম। চার নম্বর মেসেজ বলছে, একশো কদম পশ্চিমে যাও। গেটের মুখ উত্তর দিকে…তাহলে, এই যে, এদিকে…

কি?

একশো কদম মানে একশো গজ, বিড়বিড় করল কিশোর। জন সিলভারের কথা মোতাবেক এখান থেকে একশো গজ পশ্চিমে যেতে হবে আমাদের। মুসা, শুরু করো। তোমার পা লম্বা, বড়দের সমান হবে।

এক…দুই…তিন করে গুণে গুণে পা ফেলতে শুরু করল মুসা। তার পেছনে রইল কিশোর।

এক জায়গায় চল্লিশ ফুট দূরের দেয়ালের সঙ্গে সমান্তরাল হয়ে চলে গেছে একটা পথ, ওটা ধরেই এগোচ্ছে এখন।

একশো গুণে থামল মুসা। এবার?

পাঁচ নম্বর বলছে, ইউ নো মাই মেথডস, ওয়াটসন। থ্রি সেভেনস লীড টু থারটিন।

মাথা লিখেছে, রাগ করে বলল মুসা।

চিন্তিত চোখে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে কিশোর। হঠাৎ বলল, মুসা, তোমার কদম কি পুরো এক গজ?

কি জানি। মেপে তে দেখিনি।

তাহলে মেপে দেখা যাক। পকেট থেকে একটা প্লাসটিকের টুকরো বের করল কিশোর, একটা তিন বছরের পকেট ক্যালেণ্ডার। এক ধারে চার ইঞ্চি লম্বা স্কেল রয়েছে। মুসার ছড়ানো কদম মেপে দেখল। হুমম। তিরিশ ইঞ্চি। একশো কদমে কম হয়েছে পঞ্চাশ ফুট। হাঁটো। আরও বিশ কদম।

একেবারে পেছনের দেয়ালের কাছে চলে এল ওরা। কিন্তু দৃষ্টি আকর্ষণ করার মত পাথর বা কোন কিছু নেই।

দেখো, হাত তুলে উল্টোদিকে খানিক দূরের তিনটে পাথরের ফলক দেখাল মুসা। পাশাপাশি তিনটে কবরের মাথার কাছে গাথা। তিনটে ফলকে তিনটে নাম হিউগো সেভার্ন, পিটার সেভার্ন, মরিস সেভার্ন। ১৮৮৮ সালের একটা তারিখ লেখা রয়েছে নিচে, একই দিনে তিনজনে পীতজুরে মারা গেছে।

সেভার্ন। চেঁচিয়ে উঠল মুসা, সেদিনই ধরেছিলাম। রবিন উড়িয়ে দিল ইংরেজদের কথার টনি বলে। খ্রি সেভার্নস লীড টু থারটিন।

হ্যাঁ, সেভার্নরা রয়েছে এখানে। কিন্তু তেরোর কাছে নিয়ে যাবে কিভাবে? দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরল কিশোর।

পাথরগুলো রয়েছে এক সারিতে, বুদ্ধি খুলে যাচ্ছে মুসার, এক লাইন। লাইনটা ধরে ডানে-বাঁয়ে যে কোন একদিকে হাঁটি।…ইয়াল্লা, কিশোর, জলদি, করো। কুয়াশা এসে পড়ছে।

পাক খেয়ে খেয়ে এগিয়ে আসছে হালকা কুয়াশা, এটা সামনের স্তর, ঘিরে ধরল দুই গোয়েন্দাকে। হাহাকার করে গেল বাতাস, যেন অশরীরী কোন প্রেতের বুকভাঙা দীর্ঘশ্বাস। শিউরে উঠল মুসা। ককিয়ে বলল, কিশোর, জলদি করো, প্লীজ!

বিষণ্ণ পরিবেশকে আরও বিষণ্ণ করে তুলছে বিচ্ছিরি কুয়াশা, কিন্তু কিশোরের ভাবান্তর নেই। গালে টোকা দিচ্ছে, তাকাচ্ছে আশেপাশে। হুঁ!, লাইনটা গিয়ে শেষ হয়েছে ওই পাথরটায়। চলো তো দেখি।

আরেকটা প্রস্তরফলক। এপাশে কিছুই লেখা নেই। ঘুরে ওপাশে আসতেই দেখতে পেল ওরা, লেখা রয়েছে :

চিরনিদ্রায় ঘুমিয়ে আছে এখানে
তেরোজন অচেনা ভ্রমণকারী
ইণ্ডিয়ানরা খুন করেছে এদের সবাইকে।
জুন ১৭, ১৮৭৬

থারটিন! ফিসফিস করল মুসা, জোরে বলতে ভয় পাচ্ছে, যেন ঘুম ভেঙে যাবে তেরোজন হতভাগ্য মানুষের। তিন সেভার্ন নিয়ে এল তেরোর কাছে।

ছয় নম্বর বলছে, কিশোর বলল, লুক আনডার দা স্টোনস বিয়ণ্ড দা বোনস ফর দা বক্স দ্যাট হ্যাজ নো লকস।

কিন্তু কোন পাথরটা? এখানে তো পাথরে বোঝাই।

মেসেজ বলছে, বিয়ণ্ডা দা বোনস, বাঁকা চোখে কয়েকটা পাথরের দিকে তাকাল কিশোর। দূর, কুয়াশা এসেই পড়ল দেখি।…ওই যে, দেয়ালের ধারের ওই মনুমেন্টের কাছে, পাথর পড়ে আছে কতগুলো…কোনকালে পড়েছিল কে জানে, ঠিক করেনি আর।…আচ্ছা, তেরোজনের হাড়গোড়কে বোনস ধরে নিলে ওগুলোকেই স্টোনস বোঝায়, আশেপাশে আর যা আছে, একটা করে পাথর, সুপ নেই…।

কিশোরের কথা শেষ হওয়ার আগেই ছুটে গেল মুসা। দু-হাতে পাথর সরাতে শুরু করল। মুখ না তুলে বলল, কিশোর, হাত লাগাও। কুয়াশার আগেই শেষ করতে হবে।

কাজে এতই মগ্ন রয়েছে ওরা, পেছনে পদশব্দ শুনতে পেল না।

বাহ, খুব কাজের ছেলে, বলে উঠল কেউ।

কানের কাছে যেন বাজ পড়েছে, এত জোরে চমকে উঠল দুজনে।

ঘনায়মান কুয়াশার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে তিনটে মূর্তি, একজন শোঁপা, কোন সন্দেহ নেই, পাশের দুজনকেও চেনে, একজনের নাম জানে, টমাস, আরেকজনের জানে না।

তোমাদের কাজ শেষ, কাছে এসে হাসল শোঁপা। আর কষ্টের দরকার নেই। এবার আমরাই পারব। টমাস, ধরো ওদের।

মনে মনে, এক সঙ্গে একই সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেল দুই গোয়েন্দা। লাফিয়ে উঠে দুজন ছুটল দুদিকে। কিন্তু পারল না। ধরা পড়ে গেল।

টমাস, তুমি ধরে রাখো, আদেশ দিল শোঁপা। ডিংকি, পাথর সরাও।

মুসার হাত মুচড়ে ধরল টমাস, পিস্তল বের করে পিঠে ঠেকাল। কিশোরকে বলল, চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। নাকি বন্ধুর পিঠ ফুটো করাতে চাও?

ঠাণ্ডা, ভেজা গুড় দিয়ে ওদেরকে পেঁচিয়ে নিচ্ছে যেন ঘন কুয়াশা।

দ্রুত হাত চালাচ্ছে ডিংকি, লুকানো হাড় খুঁজছে যেন ক্ষুধার্ত কুকুর। ছোটবড় পাথর, টালি আর কাঁচা ইটের টুকরো ছুঁড়ে ফেলছে চারপাশে, একটা ভাঙা ডাল ছুঁড়ে ফেলল, একটা পুরানো পাইপ ফেলল, কাছেই দাঁড়িয়ে থাকা টমাস আর ছেলেদের গায়েও এসে পড়ছে কিছু।

এই, দেখেটেখে ফেলো, বলল টমাস। লাগে।

হ্যাঁ, এত তাড়াহুড়ো কি? বলল শোঁপা। আরও আস্তে সরাও না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখছে দুই গোয়েন্দা। তেতো হয়ে গেছে মন। এত কষ্টের পর লাভটা কি হলো? ওরা ছবি বের করে দিল, মজা লুটবে এখন ওই বিদেশী চোর।

মন খারাপ লাগছে? শান্তকণ্ঠে বলল শোঁপা। জানো, দুনিয়ার অনেক জায়গায় গিয়েছি আমি, অনেক মিউজিয়ম থেকে ছবি চুরি করেছি, অনেক উঁদরেল পুলিশ আর গার্ডকে বোকা বানিয়ে এসেছি, নিজেকে খুব চালাক ভাবতাম। কিন্তু না বলে পারছি না, তোমরা আমার মত লোককেও বহুত নাকানি-চুবানি খাইয়েছ। ওই গাড়ি বদলানোর বুদ্ধিটা তো রীতিমত…কি বলব? হতবাক করে দিয়েছে আমাকে। কুয়াশায় ভিজে নিভে যাওয়া সিগারেট আবার ধরিয়ে নিয়ে হাসল। কুয়াশার মধ্যে জ্বলন্ত লাইটার হাতে কালো আলখেল্লা পরা মূর্তিটাকে ঠিক মানুষ মনে হচ্ছে না এখন, কবর থেকে উঠে এসেছে যেন, ভূত। আন্দাজ ঠিকই করেছিলে তোমরা, তোমাদের ওপর চোখ রাখতে বলেছিলাম। রেখেছিলও। রোলস-রয়েসটাকে অনুসরণ করেছিল। বিশ মিনিট পর ওটার পাশ কাটিয়ে আসার সময় দেখল ভেতরে মাত্র একটা ছেলে। ফোনে জানাল আমাকে। প্রথমে বুঝতেই পারিনি, ঘটনাটা কি ঘটেছে। অনেক ভাবার পর..নাহ, ইয়াং ম্যান, তোমরা প্রতিভাবান। আমার ভক্তি এসে গেছে। আমি চোর, ঠিক, কিন্তু এনথনি শোঁপার শ্রদ্ধা পেতে হলে… জোরে জোরে কয়েকবার টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল সে, কিন্তু কুয়াশার জন্যে দেখা গেল না ধোঁয়া, এক রঙ হয়ে গেছে।

পাথর সরিয়েই চলেছে ডিংকি।

জন সিলভারের কয়েকটা মেসেজ বুঝেছি তাড়াতাড়িই, আবার বলল শোঁপা। তবে এই কবরখানার কথা ভাবিনি প্রথমে। তাড়াহুড়ো ছিল। ম্যাপ-ট্যাপ নিয়ে বসতে পারলে অবশ্য বুঝে যেতাম। শেষে টুরিস্ট ব্যুরোকে ফোন করে জিজ্ঞেস করলাম, আশেপাশে নির্জন পোড়ো জায়গা কোথায় কোথায় রয়েছে। মেরিটা ভ্যালির কথা ওরাই জানাল।

টমের পায়ে এসে পড়ল মাঝারি সাইজের একটা পাথর। গাল দিয়ে উঠল সে। ধমক দিয়ে বলল, এই, দেখে ফেলতে পারো না?

দেখেই ফেলো, ডিংকি, নরম গলায় বলল শোঁপা। পাথর হাড্ডিতে পড়লে ব্যথা লাগে।

বড় চ্যাপ্টামত একটা পাথর সরিয়েই অস্ফুট শব্দ করে উঠল ডিংকি। টেনে পাথরের তলা থেকে বের করে আনল জিনিসটা। এই যে নিন, মিস্টার শোঁপা, আপনার বাক্স।

বাহ! এগিয়ে গিয়ে বাক্সটা নিল শোঁপা। পাশে চোদ্দ ইঞ্চি, লম্বায় তার প্রায় দ্বিগুণ। ছোট শক্ত একটা তালা লাগানো রয়েছে কড়ায়। হ্যাঁ, সাইজ ঠিকই আছে। ভেরি গুড, ডিংকি।

ওটাই, বাংলায় বলল কিশোর, বিষণ্ণ কণ্ঠ।

মুসা বুঝল। কিশোরের কাছে বাংলা মোটামুটি শিখে নিয়েছে সে আর রবিন।

পকেট থেকে খুব শক্তিশালী ঘোট একজোড়া কাটার বের করল শেপী, এক চাপেই কট করে কেটে ফেলল ধাতব আঙটা।

বাজে অবস্থা, কুয়াশার দিকে চেয়ে বলল শোঁপা। তবে মনে হয় না ছবিটার কোন ক্ষতি হবে। ভাল ছবি ভাল রঙ দিয়েই আঁকা হয়। এক পলক দেখি, নিজেকেই বোঝাচ্ছে সে, আসলে লোভ সামলাতে পারছে না।

সাবধানে ডালা তুলে ভেতরে চেয়েই চেঁচিয়ে উঠল রাগে। লাফ দিয়ে তার, পাশে এসে দাঁড়াল ডিংকি। ছেলেদের দিকে মনোযোগ হারিয়েছে টমাসও, গলা বাড়িয়ে উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করল বাক্সের ভেতর কি আছে।

এক টুকরো কাগজ রয়েছে শুধু বাক্সের ভেতরে। বের করে জোরে জোরে পড়ল শোঁপা, সরি, বন্ধু, মেসেজের মানে ঠিকমত বোঝনি।

কিশোর, ফিসফিস করে বাংলায় বলল মুসা, এই-ই সুযোগ, বলেই ঝাড়া মারল। বাক্সের ভেতর কি আছে দেখার জন্যে ঢিল দিয়েছিল টমাস, ঢিলই রয়ে গেছে আঙুল, ফলে ছুটিয়ে নিতে পারল মুসা। একই সঙ্গে ডাইভ দিয়ে পড়ল সামনে। ছো মেরে তুলে নিল পায়ের কাছে পড়ে থাকা পুরানো পাইপটা। গুলি করবে কিনা দ্বিধা করছে টমাস, সুযোগটা কাজে লাগাল মুসা। এক বাড়ি দিয়ে ফেলে দিল পিস্তল। পরক্ষণেই গায়ের জোরে বাড়ি মারল টমাসের মাথা সই করে।

চট করে সরিয়ে নিয়ে মাথা কোনমতে বাঁচাতে পারল টমাস, কিন্তু কাঁধ বাঁচাতে পারল না। আঁউউ করে উঠে কাঁধ চেপে ধরে বসে পড়ল। দাঁড়িয়েই আছে কিশোর। এসব বিশেষ মুহূর্তে তার পেশী যেন জড় হয়ে যায়, নড়তে চায় না। এক হাতে পাইপ, আরেক হাতে কিশোরের কজি চেপে ধরে টান মারল মুসা। দৌড়ে গিয়ে ঢুকে গেল ঘন কুয়াশার মধ্যে। সামনে খানিকটা জায়গায় কুয়াশা যেন জট বেঁধে কালো হয়ে গেছে, আসলে ইউক্যালিপটাসের একটা ঝাড়। কিশোরকে নিয়ে ছুটে ওটার ভেতরে ঢুকে পড়ল মুসা।

ট্রাকটা ওদিকে, ফিসফিস করে বলল মুসা, হাত তুলে একটা দিক দেখাল। কিছুই চোখে পড়ল না কিশোরের। কোনটা যে কোন দিক, মুসা কি করে খেয়াল রেখেছে, সে-ই জানে। কিশোরের কাছে সব দিক একই রকম লাগছে।

কি করে বুঝলে? জিজ্ঞেস করল কিশোর।

বুঝেছি, শুধু বলল মুসা।

বিশ্বাস করল কিশোর। দিকচিহ্ন খুঁজে বের করার ব্যাপারে ওস্তাদ তার সহকারী। রাতের বেলায়ও এমন সব জায়গায় পথ খুঁজে বের করে ফেলে মুসা, কিশোর যেখানে দিনেই হারিয়ে যায়।

শোননা, দ্রুত বলল মুসা, দেয়ালের ধার ধরে যাও, মাঝে মাঝেই ইউক্যালিপটাসের ঝাড় পাবে। আমরা যেখান দিয়ে ঢুকেছিলাম সেই ফাঁকটার কাছে চলে যেতে পারবে। ঝড়ের ভেতরে ভেতরে চলে যাও!

পারব না, অনিশ্চিত শোনাল গোয়েন্দাপ্রধানের কণ্ঠ, হারিয়ে যাব।

হারাবে না…ওই যে, ব্যাটারা আসছে, ওদের ভুল পথে তুলে দিয়ে আসিগে। গাছের দিকে চোখ রাখবে। আশ্চর্যবোধক আর তীর চিহ্ন এঁকে এঁকে যাব। অসুবিধে হবে না তোমার। যাও।

কাঁধ চেপে ধরে ঝটকা দিয়ে বন্ধুকে ঘুরিয়ে সামনে ঠেলে দিল মুসা। তারপর আরেক দিকে ঘুরে লোকগুলোকে শুনিয়ে জোরে জোরে বলল, এই কিশোর, এই যে এদিকে, এসো।

হই-চই শোনা গেল তিনজন মানুষের।

আবার শোনা গেল মুসার কথা। সরে যাচ্ছে। দূর থেকে দূরে লোকগুলোকে সরিয়ে নিয়ে চলল সে।

অন্ধের মত ছুটছে কিশোর। ভাঙা কুশ, শুভ আর পাথরে হোঁচট খেলো, হুমড়ি খেয়ে পড়ল কয়েকবার। কনুই আর হাঁটুর চামড়া ছিলল কয়েক জায়গায়। এক ঝাড় থেকে বেরিয়ে অনেক কষ্টে খুঁজে পেল আরেকটা ঝাড়।

কুয়াশা এখানে সামান্য হালকা, যেন পানির নিচে রয়েছে সে। কয়েক ফুটের বেশি নজর চলে না। কুয়াশা আসছে…আসছেই ঢেউয়ের মত একনাগাড়ে। গাঢ় হচ্ছে ধূসর রঙ। ওপর দিকে কুয়াশা অনেক পাতলা, তার মধ্যে দিয়ে কোণাকুণি দৃষ্টি চলে অনেক দূর। প্রায় চল্লিশ ফুট দূরে একটা গাছের মাথা আবছামত দেখতে পেল কিশোর। দৌড় দিল সেদিকে।

তিন দিকে ছড়িয়ে পড়েছে তিনজন মানুষের কণ্ঠস্বর, পথ হারিয়েছে মনে হচ্ছে।

মুসার কোন সাড়াশব্দ নেই, কোথায় রয়েছে বোঝা যাচ্ছে না।

গাছের কাছে এসে থামল কিশোর। কুয়াশা এখানে খুবই পাতলা। গাছের গায়ে নীল চকে আঁকা আশ্চর্যবোধকটা স্পষ্ট। তীর চিহ্ন বয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত করছে।

ছুটল কিশোর।

আরেকটা ঝাড়ের কাছে চলে এল। আশ্চর্যবোধক আর তীর চিহ্ন আঁকা আছে আমি টিকা দিপে ধরল

গাছের গায়ে। কি ভাবে যেন কিশোরের আগে চলে গেছে মুসা। পেছনে একজন লোকের চিৎকার শোনা গেল, কোন কিছুতে হোঁচট খেয়ে পড়ে ব্যথা পেয়েছে। অন্য দুজনের গলাও শোনা যাচ্ছে, সরে যাচ্ছে দূরে।

কিশোর যেখানে রয়েছে, সেখানেও ঘন হতে শুরু করেছে কুয়াশা। ভীষণ এক দুঃস্বপ্নে রয়েছে যেন সে, কিংবা কোন প্রেতপুরীতে। গাছের ডালপাতাগুলোকে মনে হচ্ছে কোন পিশাচের বাহু, ধারাল নখ দিয়ে খামচে ধরতে আসছে তাকে। অতি সাধারণ স্তম্ভগুলোও ভয়াবহ ভূতুড়ে রূপ নিয়ে পথ রোধ করতে চাইছে তার। ছোটার সময় কয়বার যে বাড়ি খেয়েছে, কপাল ফুলে গেছে, ব্যথা করছে বুকের একপাশ। কিন্তু সেসব খেয়াল করার সময় এখন নেই।

ছুটে চলেছে কিশোর। যখন মনে করল, দেয়ালের ফাঁকের আর দেখা পাবে না, ঠিক সেই সময়ই দেখতে পেল দেয়ালটা। কুয়াশার মধ্যে দিয়ে শুধু ওপরের অংশ দেখা যাচ্ছে, কালো মোটা রেখার মত।

দেয়ালের ওপর প্রায় হুমড়ি খেয়ে এসে পড়ল কিশোর। মোটা রেখাটা ধরার জন্যে হাত বাড়াল ওপরে।

কে যেন চেপে ধরল কজি, জীবন্ত আরেকটা হাত।

ঝটকা দিয়ে ছাড়িয়ে নিতে যাচ্ছিল কিশোর, ফিসফিসিয়ে বলল মূসা, কিশোর, আমি।

বন্ধুর গলা এত মধুর আর কখনও মনে হয়নি কিশোরের। টেনে তাকে দেয়ালের ওপর তুলে নিল মুসা।…

দুজনে লাফিয়ে নামল ওপাশে।

হাত ধরে টেনে নিয়ে চলল মুসা। নতুন অভিজ্ঞতা হচ্ছে আজ গোয়েন্দাপ্রধানের। কোন ব্যাপারে কারও ওপর এতখানি নির্ভরও আর কখনও করেনি।

ঘন কুয়াশার ভেতরে দেখা যাচ্ছে হলুদ দুটো ঘোলাটে আলো, যেন কোন দানবের চোখ। ট্রাকের হেডলাইট।

হাঁপাতে হাঁপাতে ট্রাকের কাছে এসে থামল দুই কিশোর।

তোমরা হোকে? পাশে এলিয়ে পড়া দুই গোয়েন্দাকে জিজ্ঞেস করল বোরিস।

হ্যাঁ হ্যাঁ, হোকে, দম নিয়ে সারতে পারছে না কিশোর, ফেটে যাবে যেন ফুসফুস। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, আর আলসেমি নয়, কাল থেকেই সকালে উঠে মুসার সঙ্গে ব্যায়াম শুরু করবে সে। আরিব্বাপরে বাপ, দৌড়ানো এত কষ্ট! বাড়ি যান। হারামি এই কুয়াশার ভেতর থেকে বেরোন।

সাবধানে এগিয়ে চলল বোরিস। পুবে। পাতলা হতে হতে এক সময় পেছনে পড়ে গেল কিশোরের হারামি কুয়াশা।

Categories: