দ্রুত বাড়ছে পানি।
গুহার দেয়ালে জন্মে থাকা জলজ আগাছা আঁকড়ে ধরে আছে ওরা। ঝাঁপাঝাঁপি করছে পানি দেয়ালে দেয়ালে। ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতে চাইছে ওদেরকে তাক থেকে। আর বেশি বাকি নেই, ছাতে গিয়ে ঠেকবে পানি। এত দেরি করছে কেন বিড়বিড় করল মুসা। কাঁপছে ঠাণ্ডায়, ভয়ে। তার মনে হচ্ছে, এক যুগ আগে গড়িয়ে পড়েছিল ছোট পাথরটা। চমকে উঠেছিল ওরা। খানিক পরেই ডাক শোনা গিয়েছিল। কিশোরের। বিপদে আছে, জানিয়েছে মুসা। তার মানে সাহায্য আসবেই। কিন্তু আর কত দেরি?
অপেক্ষা ছাড়া করার আর কিছুই নেই। কাজেই অপেক্ষা করতে লাগল ওরা। মাঝে মাঝে টর্চ জ্বেলে দেখে নিচ্ছে, ছাতে পানি ঠেকতে আর কত বাকি ব্যাটারিও ফুরিয়ে এসেছে। আলোর উজ্জ্বলতা নেই। তবু, অন্ধকারে স্নান ওই আভাটুকুই সাহায্য করছে অনেক।
শোন! হঠাৎ বলল পাপালো। মোহর পেয়েছি, এটা ফাঁস করব না আমরা।
কেন?? জানতে চাইল রবিন। এখানে কি করতে এসেছি, বলতে হবে না?
বলব ড়ুবে ড়ুবে সাঁতার কাটছিলাম। হঠাৎ নজরে পড়ে গেল গর্তটা! বুঝলাম সুড়ঙ্গ। ভেতরে কি আছে দেখার জন্যে ঢুকে পড়লাম, বলল পাপালো। মোহর পেয়েছি বললে ফিরে এসে আবার খোঁজার সুযোগ হারাবা।
হারালে হারাব, বলল রবিন। এখানে দ্বিতীয়বার আর ঢুকতে চাই না। আমি। মোহরের বস্তা পড়ে থাকলেও না। যার খুশি এসে নিয়ে যাক।
আমারও একই কথা, সায় দিয়ে বলল মুসা। পাপালোকে বলল, এত ভাবছ কেন? যা মোহর ছিল, সব তুলে নিয়েছি আমরা। আর নেই। জোয়ারের সময় কোনভাবে এসে পড়েছিল হয়ত। ভেবো না, সিন্দুকফিন্দুক নেই এখানে।
তা হয়ত নেই, কিন্তু বালির তলায় আরও মোহর থাকতে পারে, বোঝানোর চেষ্টা করল পাপালো। এটাই আমার শেষ সুযোগ। আরেকটা নৌকা কিনতে হবে, বাপকে বাঁচাতে হবে। কটা মোহর পেয়েছি? চল্লিশ? পঞ্চাশ? তিন ভাগের এক ভাগ কাটা হবে? নৌকাই তো কিনতে পারব না।
ঠিক আছে, পাপালোর কথা মেনে নিল রবিন। আপাতত ব্যাপারটা ফাঁস করব না আমরা। আরেকবার খুঁজে দেখার সুযোগ…
মুসা আমান আর আসছে না। এই গুহায়া বাধা দিয়ে বলল গোয়েন্দা সহকারী। তুমি আসতে চাইলে আসতে পার, পাপু। কোথায় মোহর পেয়েছি কাউকে না বললেই তো হল।
মোহর পেয়েছি, এই কথাটাও গোপন রাখতে চাই এখন, থলেতে আঙুলের চাপ শক্ত হল পাপালোর। একবার কেন, আরও দশবার আসতেও ভয় পাব না। আমি। কপাল খারাপ তাই বিপদে পড়ে গেছি। কে ভাবতে পেরেছিল, সুড়ঙ্গমুখে এসে নৌকা আটকাবে? এমন ঘটনা সব সময় ঘটে না।
জোসেফ আর কিশোর কতখানি কি করছে, কে জানে! গুঙিয়ে উঠল মুসা। কোস্ট গার্ডকে খবর দিতে গিয়ে থাকলেই সেরেছে। ফিরে এসে আর পাবে না আমাদেরকে।
নৌকাটা সরাতে শক্তি দরকারম বলল রবিন। ভেঙে ফেলতে হবে, কিংবা শাবল দিয়ে চাড় মেরে বের করে নিতে হবে।
অনেক সময় লেগে যাবে তাতে, ঢেউয়ের ধাক্কায় কাত হয়ে গেল মুসা। আগাছা আঁকড়ে ধরে সামলে নিল। তাক থেকেই ফেলে দেবে। দেখছি… হ্যাঁ, যা বলছিলাম। কমসে কম দুঘণ্টা তো লাগবেই। ততক্ষণে আমরা শেষ।
কিশোর জেনেছে আমরা এখানে আছি, নিরাশ হচ্ছে না রবিন। কিছু একটা ব্যবস্থা করে ফেলবেই ও। ঠিক বের করে নিয়ে যাবে। আমাদের, দেখা।
সেই প্রার্থনাই কর, নিচু গলায় বলল পাপালো।
***
মুসার কাছ থেকে সাড়া পাবার পর মাত্র পনেরো মিনিট পেরিয়েছে।
তীর থেকে শখানেক ফুট দূরে ভাসছে এখন মোটর বোট। ইঞ্জিন নিউট্রাল। হাল ধরেছে কিশোর। জোসেফ ডুবুরির পোশাক পরছে।
পাগলামির সীমা থাকা উচিত। আপনমনেই বিড়বিড় করল। জোসেফ। ওয়েট বেল্ট আটল কোমরে। বোটের কিনারে গিয়ে দাঁড়াল। ফিরে চাইল। এখানেই থাক। পরিস্থিতি দেখে আসি আমি। কোস্ট গার্ডকে খবর দেয়ার সময় আছে কিনা কে জানে! ফেস মাস্ক টেনে দিল সে। একটা আন্ডারওয়াটার টর্চ হাতে নিয়ে নেমে গেল পানিতে।
বড় একা একা লাগছে কিশোরের। দক্ষিণে অনেক দূরে এক সারি নৌকা, মাছ ধরা শেষ করে ফিরে চলেছে ফিশিংপোর্টে। এদিকে কেউ আসবে না। গুহায় আটকা পড়ে মরতে বসেছে তিন বন্ধু। ওদেরকে কি উদ্ধার করতে পারবে শেষ পর্যন্ত? মুসা যা বলল, সুড়ঙ্গমুখে বেশ শক্ত করেই আটকেছে। ভাঙা নৌকা।
অতি ধীরে গড়িয়ে গড়িয়ে যাচ্ছে যেন সময়। কিশোরের মনে হল এক ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। ঘড়ির দিকে চেয়ে দেখল, জোসেফ গেছে মাত্র পাঁচ মিনিট আগে। আরও পাঁচ মিনিট পরে ভেসে উঠল। জোসেফের মাস্কে ঢাকা মুখ। দ্রুত উঠে এল সে বোটে। মাস্ক সরাল মুখ থেকে। চেহারা ফ্যাকাসে, উদ্বিগ্ন।
সাংঘাতিক শক্ত হয়ে আটকেছে। বলল জোসেফ। কোথাও ধরে যে টান দেব, সে জায়গাই নেই। কোস্ট গার্ডকেই খবর দিতে হবে। শাবল কিংবা ক্রো-বার ছাড়া হবে না।
জোসেফের মুখের দিকে চেয়ে আছে কিশোর। তাতে তো অনেক সময় লাগবো কমপক্ষে দুঘণ্টা!
আস্তে মাথা ঝাঁকাল জোসেফ। তা-তো লাগবেই। কিন্তু আর কি করার আছে? বড় কোন গর্ত নেই টিলার। থাকলে ও পথে দড়ি নামিয়ে দিয়ে টেনে তোলা যেত।
জোসেফের কথা কানে ঢুকছে কিনা কিশোরের, বোঝা গেল না। নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটছে সে।
মিস্টার গ্র্যাহামা হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল কিশোর। নৌকাটাকে টেনে বের করে আনলেই হয়।
টেনে বের করবা ভুরু কুঁচকে গেল জোসেফের। কি করে?
মোটর বোটের সাহায্যে, বলল কিশোর। খুব শক্তিশালী ইঞ্জিন এই বোটটার। নোঙরের দড়িও অনেক লম্বা। নোঙরের একটা আকশি নৌকায় গেঁথে…
কিশোর, তুমি একটা জিনিয়াস! চেঁচিয়ে উঠল জোসেফ। ঠিক বলেছ! এখুনি যাচ্ছি। আমি!
দ্রুত হাত চালাল জোসেফ। ক্যাপস্ট্যান থেকে খুলে আনল দড়িসহ নোঙর। দড়ির অন্য মাথা বাঁধল বোটের পেছনের একটা রিঙবোল্টে। পানিতে ছুড়ে ফেলে দিল নোঙর।
আমি যাচ্ছি। দড়ি ধরে তিনবার টানব। ফাস্ট-গিয়ারে দিয়ে আস্তে আস্তে জোর বাড়াবে। নৌকাটা সুড়ঙ্গমুখ থেকে খসে এলে বুঝতেই পারবে। থেমে যাবে তখন। গুহায় ঢুকে ওদেরকে বের করে আনব আমি। …আর হ্যাঁ, টানতে টানতে হঠাৎ যদি সামনে লাফ দিয়ে ছুটতে শুরু করে বোট, বুঝবে, নৌকা থেকে নোঙর খসে গেছে। এখানে নিয়ে আসবে। আবার বোট। আমার ওঠার অপেক্ষা করবে। ঠিক আছে?
মাথা ঝোঁকাল কিশোর।
নেমে গোল জোসেফ।
আবার অপেক্ষার পালা। দড়ি ধরে বসে রইল কিশোর। দুরুদুরু করছে বুকের ভেতর। একবার টান পড়ল দড়িতে। নোঙর গাঁথছে হয়ত জোসেফ। এক মিনিট কাটল.. দুই মিনিট… হঠাৎ টান পড়ল দড়িতে। জোরে জোরে, তিন বার।
লাফ দিয়ে উঠে এল কিশোর। ড্রাইভিং সিটে বসেই গিয়ার দিল। ধীরে ধীরে চলতে শুরু করল বোট। তারপর থেমে গেল। হঠাৎ করেই। টান টান হয়ে গেছে দড়ি।
এক্সিলেটরে চাপ বাড়াচ্ছে কিশোর। হুইলে হাতের আঙুল চেপে বসেছে। নোঙর বাঁধা দড়ির মতই টান টান হয়ে গেছে তার স্নায়ু। গর্জন বাড়ছে শক্তিশালী ইঞ্জিনের।
প্রথম কয়েক মুহূর্ত কিছুই ঘটল না। তারপর সামনে বাড়তে লাগল। বোট, ধীরে, অতি ধীরে। এক ইঞ্চি দুইঞ্চি করে। বিশাল মরা তিমিকে টেনে নিয়ে যেতে চাইছে যেন টাগবোট। হঠাৎ সামনে লাফ দিল বোট। সেরেছে—ভাবল কিশোর। গেছে হয়ত ছুটে। কিন্তু না, যতখানি জোরে ছোটা উচিত তত জোরে এগোচ্ছে না তো বোটা তারমানে নৌকাটা আটকে আছে নোঙরে। ওটাকে টেনে নিয়ে চলেছে বোট। বিশ ফুট… পঞ্চাশ ফুট… একশো ফুট দূরে গিয়ে ইঞ্জিন নিউট্রাল করে দিল কিশোর। প্ৰায় সঙ্গে সঙ্গেই থেমে দাঁড়াল বোটটা।
সিট থেকে উঠে পেছনে চলে এল কিশোর। কোমরের বেল্ট থেকে ছুরি খুলে নিয়ে কেটে নিল দড়ি। ফিরে এসে বসল। আবার ড্রাইভিং সিটে।
আবার আগের জায়গায় বোট ফিরিয়ে নিয়ে এল কিশোর। অপেক্ষা করতে লাগল। এক মিনিট… দুই মিনিট… ভুসস করে বোটের পাশেই ভেসে উঠল একটা মাথা। জোরে শব্দ করে শ্বাস নিল পাপালো হারকুস। বোটের গা ঘেঁষে এল। থলেটা ছুড়ে দিল ভেতরে। চেঁচিয়ে বলল, জলদি লুকাও ওটা! ভেতরে মোহর কারও কাছে ফাঁস করা চলবে না এখন।
হাত ধরে আগে পাপালোকে বোটে উঠতে সাহায্য করল কিশোর। তারপর ভেজা থলেটা তুলে নিয়ে সিটে রেখে ওটার ওপরেই বসে পড়ল। লুকানোর এর চেয়ে ভাল জায়গা আর নেই বোটে।
কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল পাপালো, এই সময় ভেসে উঠল রবিন। পরীক্ষণেই মুসা। দুজনকে উঠতে সাহায্য করল কিশোর আর পাপালো।
যাক, উদ্ধার করলে শেষ পর্যন্ত! স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল মুসা। বাঁচার আশা ছিলই না!
জোসেফের ভাবভঙ্গিতে মনে হল, খুব রেগে গেছে, বলল রবিন।
সব শুনলে বাবাও খেপবে! কথার ধরনেই বোঝা গেল, ভয় পাচ্ছে মুসা। তবে যা-ই হোক, কিছু মোহর পেয়েছি। পাপু বলেনি?
থলেটার ওপরেই বসে আছি, বলল কিশোর। এখন মোহরের কথা থাক। পরে সব শুনিব।
কাজটা খুব খারাপ হয়ে গেছে, পিঠে বাঁধা গ্যাস ট্যাংক খুলতে খুলতে বলল রবিন। কিন্তু দোষ আমাদের নয়। পাপালোর নৌকাটাকে
চুপ! রবিনকে থামিয়ে দিল কিশোর। জোসেফ। সব জানানোর দরকার নেই ওকে। রেখেঢেকে বলবে।
বোটের পাশে ভেসে উঠেছে জোসেফ। এক হাতে দড়ির কাটা প্ৰান্ত। বাড়িয়ে দিল ওটা। ধরল কিশোর। বেঁধে দিল ক্যাপস্ট্যানের সঙ্গে। তাড়াতাড়ি এসে বসল। আবার সিটে।
বোটে উঠে এল জোসেফ। ধীরেসুস্থে খুলে নিল ফেস মাস্ক, ফ্লিপার, গ্যাস ট্যাংক।
নীরবে অপেক্ষা করছে ছেলেরা। ওদের দিকে তাকাল জোসেফ। তারপর? খুব তো দেখালে!
আমরা… শুরু করেও থেমে গেল রবিন।
হাত তুলেছে জোসেফ। আর সাফাই গাইতে হবে না। যা করার করেছি। তবে তোমাদের ডাইভিং এখানেই শেষ। গোয়েন্দাগিরিও। মিস্টার আমানও তাই বললেন। শুরু থেকেই আমার মত ছিল না। বাচ্চাকাচ্চা দিয়ে কাজ হবে না কিছুই। শুধু শুধু বাড়তি ঝামেলা!
নীরব রইল ছেলেরা।
পাপালোর দিকে ফিরল জোসেফ। তারপর? চোরের কি খবর? অনেক হারামীপনা করেছ, এবার জেল খাটগে।
জোসেফ কি বলছে, কিছুই বুঝতে পারল না ছেলেরা।
হাঁ করে আছ কেন? পাপালোর দিকে চেয়ে বলল জোসেফ। গতরাতে একটা ট্রেলারের জানালা ভাঙা হয়েছে। ছোট ফোকর। বড় মানুষ ঢুকতে পারবে না। ওই ফোকর দিয়ে, গোটা দুয়েক দামি লেন্স চুরি গেছে। কম করে হলেও হাজার ডলার দাম। ভুল করে একটা ছুরি ফেলে গেছে চোর। স্থির চোখে পাপালোর দিকে তাকিয়ে আছে সে। ছুরিটা কার, জােন? তোমার! আর জানালার ওই ফোকর দিয়ে তোমার পক্ষেই ঢোকা সম্ভব।
বোবা হয়ে গেছে যেন চার কিশোর। হাঁ করে চেয়ে আছে জোসেফের দিকে।
তোমার শয়তানী খতম, বলল জোসেফ। হোভারসনকে খবর দেয়া হয়েছে। ফিশিংপোর্টে ফিরে গিয়েই তার দেখা পাবে। কপালে তোমার অনেক দুঃখ আছে, পাপালো হারকুস, এই বলে দিলাম।
পাপালোকে পুলিশে দিল ওরা! বিষণ্ণ কণ্ঠে বলল রবিন। কাজটা উচিত হয়নি।
হ্যাঁ, আস্তে মাথা দোলাল মুসা। আমার কিন্তু এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না, লেন্সগুলো ও চুরি করেছে। কিশোর, তুমি কি বল?
কোন জবাব দিল না গোয়েন্দাপ্রধান, যেন শুনতেই পায়নি। দুই বন্ধুর কাছ থেকে দূরে, লিভিং রুমের আরেক প্রান্তে সোফায় বসে আছে। গভীর চিন্তায় মগ্ন।
বিকেলের মাঝামাঝি। বাইরে ঝমোঝম বৃষ্টি। সারাদিন বাইরে বেরুতে পারেনি ওরা। বৃষ্টি না থাকলেও অবশ্য পারত না। মিস্টার আমানের কড়া নির্দেশঃ একা কোথাও যেতে পারবে না ওরা। যেতে হলে তাঁকে জানাতে হবে। লোক সঙ্গে দিয়ে দেবেন। গতকাল বিকেলে ছেলেদের অবাধ্যতার ওপর কড়া বক্তৃতা দিয়েছেন তিনি। আন্তরিক দুঃখিত হয়েছেন ওদের কাজে, সেটাও জানিয়েছেন বার বার।
কিশোরা গলা চড়িয়ে ডাকল মুসা। কি বলছি, শুনিছ? আমার ধারণা, লেন্স পাপু চুরি করেনি। তুমি কি বল?
কেশে উঠল কিশোর। এখনও পুরোপুরি যায়নি সর্দি।
না, বলল গোয়েন্দাপ্রধান। পাপু চুরি করেনি। সাক্ষী প্রমাণ সব ওর বিরুদ্ধেই যাচ্ছে যদিও। ওর ছুরি পাওয়া গেছে ট্রেলারের ভেতর, তাজ্জব কান্ড!
দুই দিন আগে হারিয়েছিল ওটা, বলল রবিন। ও তাই বলেছে।
এখন কেউ বিশ্বাস করবে না একথা, বলেই আবার কাশতে লাগল কিশোর। কাশি থামলে বলল, ধরেই নিয়েছে সিনেমা কোম্পানি, তাদের সমস্যা শেষ। চোর ধরা পড়েছে, আর কি?
কঙ্কাল দ্বীপের রহস্যটা আসলে কি? জিজ্ঞেস করল রবিন। অনুমান করেছ কিছু??
কেউ একজন চায় না, কঙ্কাল দ্বীপে লোক যাতায়াত করুক, কিংবা বাস করুক, বলল কিশোর। এ-ব্যাপারে। আমি শিওর। কিন্তু কেন চায় না, বুঝতে পারছি না এখনও।
দরজায় টোকা পড়ল। সাড়া দিল মিসেস ওয়েলটন। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল। পেছনে পুলিশ চীফ হোভারসন। রেনকোট থেকে পানি ঝরছে।
এই যে, ছেলেরা, বলল বাড়িওয়ালি, চীফ কথা বলতে চান তোমাদের সঙ্গে।
মিসেস ওয়েলটন, বলল হোভারসন, ওদের সঙ্গে একটু একা কথা বলতে চাই, প্লীজ…
ওহ, শিওর শিওর, দরজা ভেজিয়ে দিয়ে বেরিয়ে গেল মিসেস ওয়েলটন।
রেনকোটটা খুলে দরজার পাশের হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে রাখলেন চীফ। সোফায় বসলেন। সিগারেট বের করে ধরালেন ধীরেসুস্থে।
তারপর, ছেলেরা, কথা শুরু করলেন হোভারসন, পাপুর পজিশন খুব খারাপ। লেন্স দুটো পাওয়া গেছে। ওর বিছানার তলায়।
কিন্তু পাপালো চুরি করেনি, রাগ প্রকাশ পেল রবিনের গলায়। আমরা জানি, ও করেনি।
হয়ত করেনি, মাথা ঝোঁকালেন হোভারসন। কিন্তু সব সাক্ষীপ্রমাণ ওর বিরুদ্ধে যাচ্ছে। সবাই জানে, বাবার চিকিৎসার জন্যে গ্ৰীসে ফিরে যাবার জন্যে, পাগল হয়ে উঠেছে ও।
উঠেছে, ঠিক, বলল মুসা। কিন্তু সেজন্যে চুরি করবে না সে। তাছাড়া টাকা তার আছে। এবং আরও পাবার সম্ভাবনা আছে।
তাই। তিনজনের দিকেই একবার করে তাকালেন হোভারসন। ওর টাকা আছে? আরও পাবার সম্ভাবনা আছে! কি করে?
মুখ ফসকে কথা বেশি বলে ফেলেছে, এখন আর ফেরার পথ নেই। মোহরের কথা বলতেই হবে চীফকে। তবু চুপ করে রইল মুসা।
ছেলেরা, আবার বললেন হোভারসন, পাপুকে আমি পছন্দ করি, তার ভাল চাই। এখন বলত, সত্যি সত্যি কি ঘটেছিল গতকাল। বিপদে পড়েছি, এবং উদ্ধার করে আনা হয়েছে, ঠিকই। কিন্তু কেন পড়েছ বিপদে? কেন গিয়ে ঢুকেছ ওই সুড়ঙ্গে। শুধুই কৌতূহল? নিশ্চয় না। হয়ত তোমাদের ভয়, গুপ্তধনের কথা ফাঁস হয়ে গেলে দলে দলে ছুটে আসবে লোক। শুটিঙে বিন্ন ঘটাবে। কিন্তু পাপুর দিকটাও ভেবে দেখতে হবে তোমাদের। ওকে হাজত থেকে বের করে আনতে চাও না?
দ্বিধা করছে তিন গোয়েন্দা। শেষে মন স্থির করে নিল কিশোর। হ্যাঁ, স্যার, চাই। মুসার দিকে ফিরল। থলেটা নিয়ে এসো।
দোতলায় চলে গেল মুসা। পাপালোর থলেটা নিয়ে ফিরে এল। থলের মুখ খুলে হোভারসনের পাশে ঢেলে দিল মোহরগুলো। মৃদুটুংটাং আওয়াজ তুলে সোফায় পড়ল পয়তাল্লিশটা স্প্যানিশ ডাবলুন।
বড় বড় হয়ে গেল হোভারসনের চোখ। মাই গাডা জলদস্যুর গুপ্তধন। পাপু পেয়েছে?
পাপু, মুসা আর রবিন, বলল কিশোর। দ্য হ্যান্ডের গুহায়। ফিরে গিয়ে আরও খোঁজার ইচ্ছে আছে পাপালোর। সেজন্যেই গোপন রেখেছি ব্যাপারটা।
হুমমা ঝট করে চোখ তুললেন হোভারসন। আমিও তোমাদের দলে। মোহর পেয়েছ, কাউকে বলব না।
তাহলে বুঝতেই পারছেন, স্যার, আগের কথার খেই ধরল রবিন, টাকার জন্যে চুরি করার দরকার নেই পাপুর।
কিন্তু, বললেন হোভারসন, তাতে প্ৰমাণ হয় না, পাপু চুরি করেনি। মোহরগুলো পাওয়া গেছে লেন্স চুরি যাবার পর। পাপালো তখন জানত না, মোহর পাবে।
ঠিকই বলেছেন পুলিশ চীফ। মুখ কালো করে ফেলল। আবার রবিন। সজোরে পকেটে হাত ঢোকাল মুসা।
রুমাল বের করা নাক মুছল কিশোর। তারপর বলল, রাফাত চাচা, মিস্টার সিমনস আর মিস্টার গ্র্যাহামের ধারণা স্কেলিটন আইল্যান্ডের রহস্যের সমাধান হয়ে গেছে। তাঁরা মনে করছেন, যত নষ্টের মূলে ছিল ওই পাপু। কিন্তু, তাঁরা ভুল করছেন। সমস্ত শয়তানীর পেছনে রয়েছে অন্য কেউ। ঘটনাগুলো সব খতিয়ে দেখলেই অনেক কিছু পরিষ্কার হয়ে যায়। গোড়া থেকেই শুরু করছি. কেশে উঠল সে।
আপনি সবই জানেন, কাশি থামলে বলল কিশোর, তবু গোড়া থেকেই শুরু করছি। মাঝে অনেক দিন বিরতি দিয়ে, হঠাৎ করে আবার স্কেলিটন আইল্যান্ডে ভূতের উপদ্রব শুরু হল কেন? সিনেমা কোম্পানির ওপর ওই বিশেষ নজর কেন চোরের? প্লেন থেকে নামতে না নামতে কার কি এমন ক্ষতি করে ফেললাম, যে ঝড়ের রাতে দ্য হ্যান্ডে নির্বাসন দিয়ে আসা হল আমাদেরকে? সবগুলো প্রশ্নের একটাই সহজ উত্তরঃ কেউ একজন চায় না, স্কেলিটন আইল্যান্ডে লোক যাতায়াত করুক, কিংবা বাস করুক, কিংবা ওটার ব্যাপারে খোঁজখবর করুক। এবং সেটার প্রমাণও পেয়েছি। গতকাল বিকেলে ডাক্তার রোজারের চেম্বার থেকে ফিরছিলাম, হঠাৎ পাশের গলি থেকে বেরিয়ে এল। একজন লোক। ঢেঙা, রোগাটে, হাত উল্কি দিয়ে আঁকা জলকুমারীর ছবি…
ডিক, চোয়ালে হাত ঘষছেন। চীফ। ডিক ফিশারা মাত্র জেল থেকে বেরোল ব্যাটা, এরই মাঝে শুরু করে দিলা.ঠিক আছে বলে যাও।
দ্বীপগুলোর আশপাশে খুব বেশি ঘোরাফেরা করে পাপু, তাই তার নৌকা ভেঙে দেয়া হল, বলল কিশোর। শুধু তাই না, চক্রান্ত করে তাকে জেলে পাঠানোর ব্যবস্থা করল।
কিন্তু কেন? প্রশ্ন করল রবিন।
সেটাই বুঝতে পারছি না, বলল কিশোর। তাহলে সব রহস্যেরই সমাধান হয়ে যেত।
হু-হা চিন্তিত দেখাচ্ছে হোভারসনকে। ব্যাপারটা ভাল করে ভেবে দেখব। এখন আমি উঠি।। দেখি, পাপুর কোন ব্যবস্থা করা যায়। কিনা। হাক স্টিভেন ওরা জামিন হতে রাজি আছে। কাগজপত্র তৈরি করতেও দেরি হবে না। জজ সাহেব একটা কাজে বাইরে গেছেন। তিনি ফিরে এলেই সই করিয়ে নেয়া যায়। হ্যাঁ, আমাকে না জানিয়ে কোন কিছু করে। বোসো না। বিপদে পড়ে যেতে পার। চলি, গুড বাই।
বেরিয়ে গেলেন হোভারসন।
তাড়াতাড়ি আবার মোহরগুলো থলেতে ভরে নিল মুসা। মুখ বেঁধে নিয়ে গিয়ে রেখে এল দোতলায়, নিজেদের ঘরে, সুটকেসে। ফিরে এল নিচের ঘরে।
ঘরে ঢুকল মিসেস ওয়েলটন। খাবার দেবে কিনা জানতে চাইল। দিতে বলল ছেলেরা।
টেবিলে খাবার দেয়া হল। খেতে বসল। ছেলেরা। কাছেই একটা চেয়ারে বসে এটা ওটা বাড়িয়ে দিচ্ছে মিসেস ওয়েলটন। বলি বলি করছে কি যেন। শেষ পর্যন্ত আর থাকতে না পেরে বলেই ফেলল, গুপ্তধন খোঁজার জন্যেই তাহলে এসেছে তোমরা। দেখলাম…
ঝট করে মাথা তুলল কিশোর। কি দেখেছেন?
সত্যি বলছি, চুরি করে কারও কিছু দেখার অভ্যোস নেই আমার। দেখতে এসেছিলাম, চীফ চলে গিয়েছে কিনা। দেখলাম, বসে আছে, পাশে একগাদা ডাবলুন। ভাবলাম, খুব জরুরী কোন কথা আলোচনা করছ তোমরা। বিরক্ত না করে চলে গেলাম।
একে অন্যের দিকে চাওয়া-চাওয়ি করল তিন গোয়েন্দা। খাওয়া বন্ধ।
কাউকে বলেছেন একথা? জিজ্ঞেস করল কিশোর।
কোন কথা?
আমরা গুপ্তধন খুঁজে পেয়েছি…
নাহ, এদিক ওদিক মাথা নড়ল মিসেস ওয়েলটন, তেমন কাউকে না। ফোনে শুধু আমার ঘনিষ্ঠ তিন বান্ধবীকে জানিয়েছি। আমারই মত কম কথা বলে। পেটে বোমা মারলেও আমারই মত মুখে তালা লাগিয়ে রাখবে। কাউকে কিছু বলবে না…
হুঁ, চিন্তিত ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকাল কিশোর। কয়েকটা মোহর পেয়েছে মুসা আর রবিন। তবে স্কেলিটন আইল্যান্ডে নয়।
আমাকে বোকা বানাতে পারবে না, ইয়ং ম্যান, নিজের বুদ্ধির ওপর খুব বেশি ভক্তি মিসেস ওয়েলটনের। আগামী কাল ভোর থেকেই লোক যেতে শুরু করবে। স্কেলিটন আইল্যান্ডে। গুপ্তধন খুঁজতে… বলতে গিয়েই থেমে গেল। মনে পড়ে গেছে, একটু আগে বান্ধবীদের প্রশংসা করে। বলেছে, মুখে তালা লাগিয়ে রাখবে ওরা। কথা ঘোরানোর চেষ্টা করল, মানে, আমি বলতে চাইছি, যদি আর কেউ শুনে ফেলে। আর কি! চীফ হোভারসনও তো জেনে গেল….
তিনি কাউকে বলবেন না, কথা দিয়েছেন, বলল কিশোর।
ওহ, আমি যাই। তাড়াতাড়ি উঠে পড়ল মিসেস ওয়েলটন। দুধ পুড়ে যাচ্ছে…
কাম সারছে কিশোরের মুখে শোনা বাঙালি বুলি ঝাড়ল মুসা। এতক্ষণে জেনে গেছে হয়ত আদেক শহর আগামী কাল ভোর হতে না। হতেই ভিড় লেগে যাবে কঙ্কাল দ্বীপে। শুটিঙের বারোটা বাজলা সব দোষ আমাদের!
এরপর রাফাত চাচাকে মুখ দেখাব কি করে আমরা বলল রবিন।
লোক ঠেকাতে না পারলে সর্বনাশ হয়ে যাবে ফিল্ম কোম্পানির! বলল মুসা। কিশোর, তুমি কিছু বল।
চুপচাপ খেয়ে যাচ্ছে কিশোর। নির্লিপ্ত। মুখ তুলল, একটা বুদ্ধি এসেছে আমার মাথায়। আগে খেয়ে নিই, তারপর বলছি। তোমরাও খেয়ে নাও।
শেষ হল খাওয়া। হাতমুখ ধুয়ে এসে বসল। আবার আগের জায়গায়।
কি বুদ্ধি, বল, জানতে চাইল মুসা।
খুলে গেল দরজা। ঘরে এসে ঢুকলেন মিস্টার আমান, পেছনে পিটার সিমনস।
মিস্টার আমান জানালেন, আগামী কাল সকালেই এসে পৌঁছুবেন। পরিচালক জন নেবার। এসকেপ ছবির শুটিং শুরু হবে।
আঁতকে উঠল মুসা আর রবিন।
কিশোর নির্লিপ্ত। ধীরে ধীরে জানাল, কি ঘটেছে। আগামী কাল সকালে কি ঝামেলায় পড়তে যাচ্ছে সিনেমা কোম্পানি।
মুখ কালো হয়ে গেল পিটার সিমানসের।
গেল, সব সর্বনাশ হয়ে গেলা প্ৰায় চেঁচিয়ে উঠলেন মিস্টার আমান। পিঙ্গপালের মত ঝাঁপিয়ে পড়বে গুপ্তধন শিকারির দলা বলে কাউকে বোঝাতে পারব না, মোহর নেই কঙ্কাল দ্বীপে।
বলে বোঝানোর দরকার কি? বলল কিশোর।
ভুরু কুঁচকে গেছে, হাঁ করে কিশোরের দিকে তাকিয়ে আছেন। মিস্টার আমান।
একটা বুদ্ধি এসেছে মাথায়, বলল কিশোর। এক কাজ করলেই তো হয়। গুপ্তধন শিকারিদের ছবি তুলে নিন। কোথায় খুঁজছে, কি করছে। না করছে, সব। ট্রেজার হান্টার নাম দিয়ে কম দৈর্ঘ্যের একটা ছবি বানিয়ে ফেলুন। ভাড়া করে লোক এনে গুপ্তধন খোঁজার ছবি বানানো সম্ভব, কিন্তু এত নিখুঁত, এত জ্যান্ত হবে না।
কি যেন ভাবল সিমনস। বলল, ঠিকই বলেছ। শুধু এভাবেই গুপ্তধন শিকারিদের হাত থেকে নিস্তার পাব আমরা। ডাক্তার রোজারকে বলে পাঠাব, স্থানীয় রেডিওতে গিয়ে ঘোষণা করুক, আগামী কাল গুপ্তধন খোঁজা চলবে ব্যাপক হারে। যে গুপ্তধন খুঁজে পাবে, পাঁচশো ডলার পুরস্কার পাবে সে আমাদের কোম্পানির কাছ থেকে। তবে, একটা শর্ত থাকবে, নাগরদোলা নাগরদোলার কোন ক্ষতি করতে পারবে না। খুঁজেপেতে কিছুই না পেয়ে চলে যাবে ওরা। বুঝে যাবে, কোন গোপন ম্যাপ পাইনি আমরা, গুপ্তধন খুঁজতে আসিনি। তাহলে এভাবে লোককে আমন্ত্রিত করতাম না। আর কখনও আমাদের বিরক্ত করতে আসবে না ওরা। নিরাপদে এসকেপ ছবির শুটিং চালিয়ে যেতে পারব। মাঝে থেকে গুপ্তধন শিকারের ওপর চমৎকার একটা ছবিও তৈরি হয়ে যাবে। খুব ভাল বুদ্ধি
হুঁ-উঁ! ধীরে মাথা ঝাঁকালেন মিস্টার আমান। ঠিকই। তাহলে এখুনি ফোন করে সব কথা জানানো উচিত মিস্টার নেবারকে। তিন গোয়েন্দার দিকে ফিরলেন। রাত অনেক হয়েছে। আর জেগে থেকে না। শুতে যাও। সকালে উঠে দেখতে পাবে খেলা…
কিন্তু বাবা, পাপু… বলতে গিয়ে বাধা পেল মুসা।
ওই চোরটার কিছু শিক্ষা হওয়া দরকার, উঠে দাঁড়ালেন মিস্টার আমান। পিটার, চল যাই। ডাক্তার রোজারকেও খবর পাঠাতে হবে…
তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে গেল দুজনে। উফফা বাঁচলাম আরাম করে হেলান দিয়ে বসল মুসা। কি ঘাবড়েই না গিয়েছিলাম! কিন্তু পাপুর ব্যাপারটা কি হবে? কানই দিল না বাবা!
বড়রা ছোটদের কথায় কান দেয় না, এটাই নিয়ম, ক্ষোভ প্ৰকাশ পেল রবিনের কথায়। তারা যা ভাবে, সেটাই ঠিক, আমাদের কথা কিছু না…। যাকগে, কিশোরের কথায় কান দিয়েছে ওরা, এটাই বাঁচোয়া। আমি তো কোন উপায়ই দেখছিলাম না. তুমি আবার কি ভাবতে শুরু
অত বেশি ভেব না, হাসল মুসা। মগজটাকে একটু বিশ্রাম দাও। নইলে বেয়ারিং জ্বলে যাবে…
কেশে উঠল কিশোর। থামল। স্বস্তি ফুটেছে চেহারায়।
কি, কিশোর? জিজ্ঞেস করল রবিন। প্রশ্নের জবাব পেয়ে গেছ মনে হচ্ছে?
কণ্ঠে বলল কিশোর।
পারছ। চেঁচিয়ে উঠল মুসা। বলে ফেল! জলদি!
চল, ওপরে চলে যাই বলল কিশোর।
কিশোরের পিছু পিছু দোতলায় শোবার ঘরে এসে ঢুকল দুই সহকারী গোয়েন্দা। উত্তেজিত।
বল এবার, ঘরে ঢুকেই বলে উঠল রবিন।
নিজের বিছানায় গিয়ে বসল কিশোর। ক্যাপ্টেন এক কান-কাটা কোথায় ধরা পড়েছিল, মনে আছে? হস্তে। মোহরগুলো রেখে খালি সিন্দুকটা উপসাগরে ফেলে দিয়েছিল সে। দ্বীপে গিয়ে উঠেছিল। তারপর টিলার ওপরের গর্ত দিয়ে সব মোহর ফেলে দিয়েছিল নিচের গুহায়। এজন্যেই একটা মোহরাও খুঁজে পায়নি ব্রিটিশ যুদ্ধ-জাহাজের ক্যাপ্টেন। তাহলে আরও অনেক মোহর আছে গুহায়! উত্তেজনায় কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম দেখা দিয়েছে মুসার। পাপুর কথাই ঠিক
মনে হয় না, মাথা নাড়ল কিশোর। তিনশো বছর ধরে জোয়ার আসছে। গুহায়। নিশ্চয় বেশির ভাগ মোহরই বের করে নিয়ে গেছে খোলা সাগরে। ওপরে যা ছিল, পেয়ে গেছ। আর কিছু থাকলেও, বালির অনেক গভীরে ঢুকে গেছে। ওগুলো। খুঁজে পাওয়া কঠিন।
চেপে রাখা শ্বাসটা ফেলল মুসা। ঠিকই বলেছ। তবে আরও কিছু পাওয়া গেলে খুব ভাল হত, উপকার হত পাপুর। ওর বাবাকে গ্ৰীসে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারত।
পাপালোর কথা উঠতেই আবার চুপ হয়ে গেল ওরা। বন্ধুকে সাহায্য করার কোন উপায় ঠিক করতে পারল না। বিষণ্ণ মুখে শুতে গেল।
শোবার সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়ল মুসা আর রবিন। কিশোরের চোখে ঘুম এল না। ভাবনার ঝড় বইছে মাথায়। অনেক দিন পরে হঠাৎ আবার দেখা দিল কেন স্যালি ফ্যারিংটনের ভূত? কঙ্কাল দ্বীপে লোক যাতায়াত করলে কার কি অসুবিধে? তাদেরকে হস্তে ফেলে রেখে এসেছিল। কেন হান্ট গিল্ডার? কেন হুমকি দিল ডিক.ডিক.তড়িাক করে। লাফিয়ে উঠে বসল কিশোর। বুঝে গেছে!
মুসা, রবিন, জলদি ওঠা চেঁচিয়ে ডাকল কিশোর। রহস্যের সমাধান করে ফেলেছি।
চোখ মেলল দুই সহকারী গোয়েন্দা। হাই তুলতে তুলতে তাকাল কিশোরের দিকে।
কি হয়েছে? ঘুমজড়িত গলায় জানতে চাইল মুসা। দুঃস্বপ্ন দেখেছ?
না উত্তেজিত কণ্ঠ কিশোরের। জলদি কাপড় পর কঙ্কাল দ্বীপ যেতে হবে! রহস্যের সমাধান করে ফেলেছি।
লাফ দিয়ে বিছানায় উঠে বসিল মুসা আর রবিন।
ইয়াল্লা! চেঁচিয়ে উঠল মুসা। বল বল…
বলল কিশোর।
কিশোর, তোমার তুলনা নেই? বন্ধুর প্রশংসা না করে পারল না রবিন। ঠিক ঠিক বলেছ একেবারে খাপে খাপে মিলে যাচ্ছে সব কিছু।
ইস্স্, একটা গাধা আমি রবিনের কথায় কান দিল না কিশোর। আরও আগেই বোঝা উচিত ছিল জলদি যাও। আমিই যেতাম, কিন্তু সারা শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা…
না না, তোমার যাবার দরকার নেই, হাত নেড়ে বলল মুসা। তুমি শুয়ে থাক। আমরাই পারব। কিন্তু বাবাকে জানালেই তো পারি। জিমকে নিয়ে তারাও আমাদের সঙ্গে গেলে…
না, মাথা নাড়ল কিশোর। আমার অনুমান ভুলও হতে পারে। তা হলে খেপে যাবেন রাফাত চাচা। তোমরা দুজনেই খুঁজে বের করগে আগে। পেলে, সঙ্গে সঙ্গে গিয়ে জানাবে তাদেরকে।
পাঁচ মিনিটেই কাপড় পরে তৈরি হয়ে গেল। রবিন আর মুসা। টর্চ নিলো দুজনেই। দরজা খুলে বেরিয়ে গেল নিঃশব্দে।
শুয়ে পড়ল আবার কিশোর। ঘুম এলো না। ক্ষোভে-দুঃখে ছটফট করছে। কেন লাগল ঠাণ্ডা? কেন এই হতচ্ছাড়া সর্দি ধরে বসল। তাকে! নইলে তো রবিন আর মুসার সঙ্গে সে-ও যেতে পারত। রাতটা দ্বীপেই থেকে যেত। তারপর ভোর না হতেই গুপ্তধন শিকারিদের খেলা. গুপ্তধন শিকারি! আবার লাফিয়ে উঠে বসল কিশোর। ভুল হয়ে গেছে, মস্ত ভুল! ভয়ানক বিপদে ঠেলে পাঠানো হয়েছে। রবিন আর মুসাকে! খুন হয়ে যেতে পারে ওরা, খুন…