পরদিন সকালে তাড়াতাড়ি বিছানা ছাড়ল কিশোর। ভারি নিঃশ্বাস পড়ছে তখনও রবিন আর মুসার, ঘুমোচ্ছে। শব্দ করল না সে, ওদের ঘুম ভাঙাল না। ব্যাগ থেকে সাঁতারের স্যুটের একটা পাজামা বের করে পরল। গায়ে দিল একটা ঢোলা শার্ট। চাবি নিয়ে পা টিপে টিপে এগোল দরজার দিকে।
পুলের কিনারে যাওয়ার জন্যে বেরোচ্ছে। তার ধারণা, ওখানে এই কেসটা নিয়ে ভাবলে জবাব মিলবে তাড়াতাড়ি। মগজটা ভালমত কাজ করবে ওখানে গেলে।
পুলের পানিতে নেমে পড়বে। চুপ করে ভাসতে ভাসতে মনটাকে ছেড়ে দেবে বল্গাহীন ভাবে-যেখানে খুশি ঘুরে বেড়াক। জট ছাড়াক রহস্যগুলোর। আজব এক জটিলতার মধ্যে পড়েছে। এক পা এগোলে দুপা পিছিয়ে আসতে হচ্ছে।
যেমন ধরা যাক আইজাক হুফারের কথা। লোকটাকে কাছে থেকে দেখলে তার সম্পর্কে অন্য একটা ধারণা হয়ে যায়। ওর রাগী রাগী ভাবটা আর ততখানি থাকে না। রাগী, সন্দেহ নেই, তবে হাস্যকর একটা ব্যাপারও রয়েছে ওর মাঝে, কিছুটা ভাঁড়ামি। ওকে চোর হিসেবে কিছুতেই ভাবতে পারছে না কিশোর।
শুধু তা-ই নয়, রাতে ওদের ঘরে ঢুকে পড়েছিল সে, এটাও মানতে পারছে না। একটা ব্যাপার আলোচনা করে তিনজনেই একমত হয়েছে, যতটা জাপটাজাপটি ওরা করেছে ধরার জন্যে, তাতে আর যা-ই হোক, হুফারের চেহারার ওই পরিবর্তন হতে পারে না, ওভাবে মারেইনি ওরা। তাহলে ওসব দাগ কার কাছ থেকে সংগ্রহ করল হুফার?
সন্দেহ অন্য দিকে ঘোরানর জন্যে নিজেই নিজেকে পেটায়নি তো? নাহ। ভ্যানে করে লোকটা পালিয়ে যাওয়া আর তিন গোয়েন্দার ওকে দেখে ফেলার মাঝে এতটা সময় পায়নি সে যে এরকম একটা কাণ্ড করতে পারবে।
আরেকটা কাজ করতে পারে। গাড়ির গায়ে বুকে বুকে মুখে দাগ করে ফেলে তারপর গাডিটাকে কোথাও রেখে দিয়ে চলে আসা। ভাবতে গিয়ে এতটাই হাস্যকর মনে হলো কিশোরের, হেসেই ফেলল। উঁহুঁ, এই যুক্তি ধোপে টেকে না। ওরকম কাণ্ড আর যে-ই করতে পেরে থাকুক, হুফার পারবে না। ওরকম লোকই নয় সে।
বেশ। তা যদি না হয় তাহলে কে পেটাল তাকে? কেন? কমিক চুরির সঙ্গে এর কি কোন সম্পর্ক আছে? ডাকাতির ব্যাপারে এখনও সন্দেহের বাইরে নয় সে। কিন্তু যেহেতু পিটুনি খেয়েছে, আরও কেউ যে এসবে জড়িত রয়েছে, এটা স্পষ্ট। আরেকটা নতুন রহস্য এসে যোগ হল আগের রহস্যগুলোর সাথে।
এলিভেটরে করে নিচে নেমে এল কিশোর। লবি পেরোতে যাবে, এই সময় নাম ধরে ডাক শুনতে পেল। ঘুরে তাকিয়ে দেখল তাড়াহুড়া করে আসছেন লুই মরগান।
এত সকালে উঠলে, বললেন কনভেনশন চীফ।
আপনিও তো উঠেছেন। কাল রাতে পাটির পর ঘুমোতে নিশ্চয় অনেক রাত হয়েছে।
বাধ্য হয়েই উঠতে হয়েছে, হাসলেন মরগান। সম্মেলনের কাজ। অনেক ঝামেলা। কত রকম গোলমাল হতে পারে। আগেই সেগুলো বুঝে নিয়ে সাবধান থাকা দরকার। পারলে মিটিয়ে ফেলা দরকার, যাতে না হয়। ভাগ্যটা বরং ভালই মনে হচ্ছে। কিছুটা তো ঘুমিয়ে নিতে পেরেছি। গোল্ড রুমে গিয়ে দেখ, লাল লাল চোখ হয়ে আছে কতজনার। বিশ ঘণ্টা ধরে শুধু তাকিয়েই রয়েছে, রক অ্যাসটারয়েডের দিকে। সম্মেলন করতে এলে ঘুম-নিদ্রা সব বাড়িতে রেখে আসতে হয়।
তবে, মরগানকে দেখে মনে হলো না ঘুমের বিশেষ অসুবিধে হয়েছে। ভালই বিশ্রাম নিয়েছেন। নতুন ধোঁয়া জিনস পরনে, গায়ে নতুন ইনটারকমিকন টি-শার্ট। বগলে চেপে রেখেছেন একটা ক্লিপবোর্ড। চকচকে চোখ। কাজ করার জন্যে পুরোপুরি তৈরি হয়ে এসেছেন।
নিজের চোহরা না দেখেও আন্দাজ করতে পারছে কিশোর, তার মুখে ক্লান্তির ছাপ ফুটে আছে।
তোমার কেসের খবর কি? জিজ্ঞেস করলেন মরগান, তদন্ত কতটা এগোল?
করছি। নতুন নতুন সব ব্যাপার বেরিয়ে আসছে, অবাক করার মত। নিশ্চয় বুঝতে পারছেন, হুফারকে সন্দেহ করছি আমরা। বিশেষ করে তার অ্যালিবাইটাকে আপনি যখন ফুটো করে দিলেন। কিন্তু একটা কথা, সে যদি চোরই হবে, তার ঘরের জিনিসপত্র তছনছ করতে গেল কে, কেন? তাকে মারলই বা কেন?
মাথা ঝাঁকালেন মরগান। কৌতূহলী মনে হচ্ছে। তোমার কি মনে হয়?
এখনও কিছু ভেবে ঠিক করতে পারিনি। তবে একটা ব্যাপার পরিষ্কার, হঠাৎ করেই কেউ মরিয়া হয়ে উঠেছে হুফারের জীবনটাকে হেল করে দেয়ার জন্যে। কোন একটা ঘাপলা কোথাও নিশ্চয় আছে, যেটা এখনও ধরা পড়েনি আমাদের চোখে। অবস্থা দেখে তো মনে হয় হুফার শিকারি নয়, শিকার।
ঘড়ি দেখলেন মরগান। দেরি হয়ে যাচ্ছে। যা-ই হোক, তোমার সঙ্গে আমিও একমত। রওনা হয়ে গেলেন তিনি। এক পা গিয়েই ঘুরে তাকালেন। আমার মনে হয়, হুফারকে নিয়ে যা ঘটছে তার অন্য ব্যাখ্যা আছে।
যেমন?
সেই যে পুরানো প্রবাদঃ চোরের সঙ্গে থাকতে থাকতে চোরই হয়ে যায়।
এই শেষ কথাগুলো নাড়িয়ে দিল কিশোরকে। পুলের কাছে পৌঁছল চিন্তা করতে করতে। ঝাপ দিয়ে পড়ে সাঁতার কাটতে শুরু করল।
পানি তার খুব ভাল লাগে। এর একটা কারণ, পানিতে নাক ডুবিয়ে চুপচাপ ভেসে থেকে কিংবা চিত হয়ে চোখ বন্ধ করে ধীরে ধীরে সাঁতরানো যায়, আর এই সময়ে মগজটাকে খাটানো যায় পুরোদমে। জটিল সমস্যার সমাধান করা সহজ হয়, কারণ ভাবনায় একাগ্রতা আসে।
কিছুক্ষণ দাপাদাপি করে শান্ত হলো কিশোর। চুপ করে নাক ডুবিয়ে ভাসতে লাগল। চালু হয়ে গেছে মগজ। ভাবছে। কেউ হামলা করেছিল হুফারকে। তার ঘরে মুসাকেও আক্রমণ করেছিল একটা লোক। তারপর গত রাতে তিনজনকেই এলোপাতাড়ি পিটিয়েছে কেউ। তিনটে ঘটনাই কি একই লোকের কাজ? সেই লাল আলখেল্লা পরা লোকটা করেছে এসব, যে কমিকগুলো ছিনতাই করেছে?
মুখোশের জন্যে লোকটার মুখ দেখতে পারেনি মুসা, তবে শরীরের অনেকটাই দেখেছে। পেশীবহুল শরীর লোকটার। ডাকাতির ব্যাপারে যাদেরকে সন্দেহ করা যায়, তাদের সঙ্গে এই লোকটার শরীরের মিল নেই। হুফার লম্বা, পাতলা; ডুফার মোটা, বোরাম ভুঁড়িওয়ালা। আর মিরিনা জরডানকে তো মেলানোই যায় না কোনমতে।
কাজেই চোরটা এমন কেউ, যাকে ওরা চেনেই না, কিংবা ওই ডাকাতির সঙ্গে একাধিক লোক জড়িত। জটগুলো ছাড়ার চেষ্টা করছে কিশোর, এই সময় পেছনে ঝপাং করে শব্দ হলো। ডাইভ দিয়ে পড়েছে কেউ।
মাথা তুলল মেয়েটা। পরনে লাল, সাঁতারের পোশাক। খাট বাদামী চুল মাথা এবং গালের সঙ্গে লেপ্টে গেছে। সাঁতরাতে শুরু করল সে। পিছু নিল কিশোর।
সে যখন পুলের প্রান্তে পৌঁছল, মেয়েটা তখন ফিরে সাঁতরাতে শুরু করেছে আরেক প্রান্তের দিকে।
যাবে নাকি আবার? ভাবল কিশোর। যাওয়াই ঠিক করল। জোরে জোরে সঁতরে চলে এল মেয়েটার পাশাপাশি। ভাল করে দেখার জন্যে মুখের দিকে ভাকাল। বেশ সুন্দরী। রোদে পোড়া চামড়া। তার দিকে একবার তাকিয়েই গতি বাড়িয়ে দিল মেয়েটা।
প্রতিযোগিতা করতে চাইছে মনে হলো। লেগে গেল কিশোর কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পরই বুঝে গেল পারবে না, মেয়েটার সঙ্গে। অনেক আগেই আরেক প্রান্তে চলে গেল মেয়েটা, ঘুরে আবার আসতে শুরু করল। প্রায় মাঝপথে কিশোরকে পাশ কাটিয়ে উল্টো দিকে চলে গেল।
আর চেষ্টা করল না কিশোর। লাভ নেই। পারবে না। অহেতুক পরিশ্রমে ক্লান্ত হওয়ার কোন মানে হয় না। তাছাড়া ক্লান্ত হলে মগজও ঠিকমত কাজ করতে চায় না। ভেসে থেকে তাকিয়ে রইল মেয়েটার দিকে।
পানি থেকে উঠে পড়ল মেয়েটা। চুলে আঙুল চালিয়ে পানি ঝরাল, তারপর গিয়ে বসল একটা লাউঞ্জ চেয়ারে। তোয়ালে দিয়ে গা মুছতে লাগল। কয়েক ডলা দিয়ে তোয়ালেটা রেখে দিয়ে হেলান দিল চেয়ারে। আরাম হচ্ছে না বোধহয়। আবার উঠে চেয়ারটাকে ঘুরিয়ে রোদের দিকে মুখ করে বসল।
চেয়ারের হেলানে ঝোলানো ছিল ব্যাগটা। নাড়া লেগে মাটিতে পড়ে গেল। মুখ খুলে ছড়িয়ে পড়ল ভেতরের জিনিস। লক্ষ্যই করল না মেয়েটা। সে রোদ নিয়ে ব্যস্ত। কিভাবে ঠিকমত গায়ে লাগে সেটা দেখছে।
কিশোর তাকিয়ে রয়েছে ব্যাগ থেকে বেরোনো জিনিসগুলোর দিকে। কমিকের বই। অনেকগুলো।
খুবই অবাক হয়েছে সে। কি করবে ঠিক করতে পারল না একটা মুহূর্ত। ডুব দিয়ে মাথা ঠান্ডা করে নিল যেন। তারপর সাঁতরাতে শুরু করল তীরের দিকে। পানি থেকেই দেখতে পেল কমিকগুলোর ভেতর থেকে উঁকি দিয়ে আছে তিন গোয়েন্দার একটা কার্ড। না না, একটা নয়, আরও আছে! আশ্চর্য! ওদের কমিকের বই আর কার্ডগুলো তো থাকার কথা হোটেলের ঘরে, একটাও তো বিক্রি করেনি এখনও। তাহলে মেয়েটা পেল কোথায়?
এর একটাই মানে হতে পারে। এই কমিক ওদের ঘরেরগুলো নয়। ম্যাড ডিসনের স্টল থেকে যেগুলো ছিনতাই হয়েছে সেগুলো। বাক্সে অনেক কার্ড ছিল। কিছু ঢুকে গিয়েছিল হয়তো বইগুলোর মাঝে।
কিন্তু মেয়েটার কাছে এই জিনিস এল কোথা থেকে?