৯. লুকানো গুপ্তধন

0 Comments

গায়ের জোরে দাঁড় টানছে মুসা। প্রায় উড়ে চলেছে ছোট্ট নৌকা। এক জেলের কাছ থেকে নৌকাটা ভাড়া নিয়েছে সে। সামনের গলুইয়ের কাছে বসে আছে রবিন। চেয়ে আছে সামনের দিকে। তারার আলোয় অদ্ভুত দেখাচ্ছে কঙ্কাল দ্বীপকে।

এসে গেছি! বলে উঠল রবিন।

মোড় ফেরাল মুসা। জেটির কাছে গেল না। প্লেজার পার্কের দিকে এগিয়ে চলল।

ঘ্যাঁচ করে বালিতে এসে ঠেকাল নৌকার সামনের অংশ। লাফিয়ে নেমে পড়ল রবিন। মুসাও নামল। দুজনে টেনে নৌকাটাকে তুলে আনল ডাঙায়।

চল, পার্কের ভেতর দিয়ে এগেই, নিচু গলায় বলল মুসা। পার্ক পেরিয়ে পথে নামব, সেদিন যৌপথে গুহায় গিয়েছিলাম। খুব সাবধান। জিম টের পেলে চোঁচামেচি শুরু করবে।

হ্যাঁ, মাথা ঝোঁকাল রবিন। তবে সঙ্গে ও গেলে ভালই হত। …অন্ধকারে গুহাটা খুঁজে পাব তো?

মনে হচ্ছে পাব, জবাব দিল মুসা। দ্বিধা করল এক মুহূর্ত। গাঢ় অন্ধকার। নীরব-নিস্তব্ধ। সৈকতে ঢেউ আছড়ে পড়ার একটানা মৃদু ছলছলাৎ শব্দ নীরবতাকে আরও গভীর করে তুলেছে যেন। চল, এগোই।

আগে আগে চলেছে মুসা। মাঝেমাঝে টর্চ জ্বেলে দেখে নিচ্ছে সামনের পথ। এসে ঢুকাল পার্কে।

কালো আকাশের পটভূমিতে কিস্তৃত এক দানবের মত দেখাচ্ছে নাগরদোলাটাকে। পাশ কাটিয়ে নাগরদোলার কাছে চলে এলো দুজনে। মোড় ঘুরে এগোেল। পেছনের ভাঙা বেড়ার কাছে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল।

নাহ, একা যাব না ফিসফিস করে বলল মুসা। বাবাকে জগাব। গিয়ে। ভয় পাচ্ছি, তা নয়। আমাদেরকে বোডিং হাউস থেকে বেরোতে নিষেধ করেছে, তবু বেরিয়েছি। কোন বিপদে পড়ার আগেই তাকে জানিয়ে রাখা ভাল।

ঠিকই বলেছ, সায় দিল রবিন। চল যাই। তাঁকে জানিয়ে গেলে আর কোন ভয় থাকবে না। আমাদের।

ক্যাম্পের দিকে পা বাড়াতে গিয়েই থমকে গেল দুজনে। ধড়াস করে উঠল। বুকের ভেতর।

কেউ এসে দাঁড়িয়েছে পেছনে। বিশালদেহী কেউ। খবরদার! যেখানে আছ, দাঁড়িয়ে থাকা শোনা গেল গর্জন।

বরফের মত জমে গেল যেন দুই গোয়েন্দা।

আলো জ্বলে উঠল। সামনে চলে এল টর্চের মালিক। দুই কিশোরের মুখে আলো ফেলেই স্থির হয়ে গেল। অবাক কষ্ঠে বলে উঠল, আরে একি! তোমরা এত রাতে চোরের মত এখানে কি করছ?

দুজনের চোখের ওপর থেকে আলো সরাল জিম, নিচের দিকে ফেলল। ভাগ্যিস, মেরে বসিনি! এতরাতে এখানে কি করছ তোমরা?

অনুমান ঠিক কিনা দেখতে এসেছি।

দ্বীপের রহস্য অবাক কণ্ঠ জিমের। কি বলতে চাইছ?

সত্যিই গুপ্তধন লুকানো আছে। এখানে, বলল মুসা। কিশোরের তাই ধারণা।

গুপ্তধন! ছেলেদের কথা বিশ্বাস করতে পারছে না যেন গার্ড। কিসের গুপ্তধন?

ওই যে… থেমে গেল মুসা। তার আগেই কথা বলতে শুরু করেছে রবিন। আপনার কথা থেকেই সূত্র খুঁজে পেয়েছে কিশোর।

আমার কথা থেকে। বিড়বিড় করল জিম। কিছুই বুঝতে পারছি না!

সেদিন সকালে বললেন না, বলল রবিন, দুই বছর আগে আর্মার্ড কার লুট করেছিল দুই ভাই? ডিক আর বাড ফিশার? যারা বাঁ হাত নষ্ট করে দিয়েছে। আপনার।

হ্যাঁ হ্যাঁ। কিন্তু তাতে কি?

আপনি আরও বলেছেন, রবিনের কথার খেই ধরল মুসা। কোস্ট গার্ডেরা দুজনকে ধরে ফেলে। উপসাগরে একটা বোটে ছিল দুই ভাই। কিছু ফেলছিল পানিতে। চোরাই টাকা ফেলেছিল ওরা, লোকের ধারণা।

তই তো করেছিল।

এবং, মুসার কথার খেই ধরল রবিন। ঠিক দুই বছর আগে থেকেই কঙ্কাল দ্বীপে আবার ভূতের উপদ্রব শুরু হল। টাকা লুট হল দুবছর আগে, স্কেলিটন আইল্যান্ডের পাশে ধরা পড়ল দুই ডাকাত, দীর্ঘ বিশ বছর পর আবার গোলমাল শুরু করল দ্বীপের ভূত। ভয় দেখাতে লাগল লোককে। ঘটনাগুলো একটার সঙ্গে আরেকটার মিল যেন খুব বেশি। সন্দেহ জাগল কিশোরের।

এত ভণিতা না করে আসল কথা বলে ফেল তো! অধৈর্য হয়ে উঠেছে জিম।

বুঝতে পারছেন না এখনও? বলল মুসা। বোটে করে পালাতে গেল দুই ডাকাত, ইঞ্জিন খারাপ হয়ে গেল। হঠাৎ। ওরা তখন স্কেলিটন আইল্যান্ডের কাছাকাছি। এত বুকি নিয়ে এতগুলো টাকা লুট করেছে, পানিতে ফেলে দেবে সহজে? মোটেই না। কোনভাবে বোটটা তীরে ভিড়িয়ে দ্বীপে উঠেছিল ওরা। টাকাগুলো লুকিয়ে রেখেছিল। তারপর বোট নিয়ে ভেসে পড়েছিল আবার। কোস্টগার্ডের বোট আসতে দেখে টাকা পানিতে ফেলার ভান করেছিল, ফেলেছিল আসলে অন্যকিছু। ভারি কিছু, যা সঙ্গে সঙ্গে তলিয়ে গিয়েছিল। বিমল ধরা না পড়লে খুব বেশি দিন জেল হবে না, ঠিকই বুঝতে পেরেছিল ওরা। জেল থেকে বেরোলে আর কোন ভয় নেই। দ্বীপে এসে টাকাটা নিয়ে দূর কোন দেশে চলে যাবে। কেউ কিছু সন্দেহ করবে না। মাত্র হস্তাদুয়েক হল ছাড়া পেয়েছে ওরা। সেদিন কিংবা তার পরের দিনই এসে টাকা নিয়ে যেতে পারত, কিন্ত মুশকিল করেছে সিনেমা কোম্পানি। দিকে এলে ওদের চোখে পড়ে যাবার সম্ভাবনা আছে। ডিক আর বাডকে ঘোরাফেরা করতে দেখলে পুলিশের সন্দেহ জাগতে পারে। সে বুকি ওরা নেয়নি।

সর্বনাশা বলে উঠল জিম। কি গল্প শোনাচ্ছি। এখানেই টাকা লুকিয়ে রেখেছে ডিক আর বাডা কোথায়, কিছু বলেছে কিশোর?

কিশোরের ধারণা, বলল রবিন। শুকনো উচু কোন জায়গায় লুকানো হয়েছে। কাপড়ের ব্যাগে ভরা কাগজের টাকা, মাটির তলায় পুঁতে রাখলে পচে যাবে। শুকনো উচু সবচেয়ে ভাল জায়গা দ্বীপে….

গুহা! প্ৰায় চেঁচিয়ে উঠল জিম। সেই পুরানো গুহার ভেতরো কোন তাকের পেছনের খাঁজো খাঁজের ভেতরে থলেগুলো ঢুকিয়ে সামনে কয়েকটা পাথর ফেলে রাখলেই কেউ দেখতে পাবে না! সন্দেহও করবে না কিছু!

কিশোরেরও তাই ধারণা, বলল মুসা। টাকাগুলো একমাত্র ওখানেই নিরাপদে থাকবে।

ইস্‌স্‌, অস্থির হয়ে উঠছে জিম, ফুটো বছর ধরে টাকাগুলো ওখানে রয়েছে। ঘুণাক্ষরেও মাথায় এলো না ব্যাপারটা যদি কোনভাবে বুঝতে পারতাম… ইস্‌স্‌! চল চল, দেখি, সত্যিই আছে নাকি…

আগে রাফাত চাচাকে ডেকে নিয়ে আসি, বলল রবিন।

দরকার নেই, মাথা নাড়ল জিম। ওঁরা ঘুমোক। আমরা বের করে। নিয়ে আসি আগে। টাকার বস্তা দেখিয়ে চমকে দেব ওঁদেরকে।

কিন্তু… বলতে গিয়েও থেমে গেল মুসা।

ঘুরে হাঁটতে শুরু করেছে জিম। ফিরে চেয়ে বলল, এসো আমার সঙ্গে।

অন্ধকারে দুপাশের গাছপালাগুলোকে অদ্ভুত দেখাচ্ছে। জিমের পিছু পিছু এগিয়ে চলেছে দুই গোয়েন্দা। কেন যেন খচখচ করছে দুজনের মন। এভাবে যাওয়া ঠিক হচ্ছে না।

উফফা হঠাৎ শোনা গেল। রবিনের চিৎকার। গাছের আড়াল থেকে বেরিয়া এসে জোরে কাঁধ খামচে ধরেছে। কেউ। মিস্টার রিভান! কে জানি… মুখ চেপে ধরল। কঠিন একটা থাবা।

পেছনে আরেকটা চাপা শব্দ শুনতে পেল রবিন। মুসার মুখও আটকে দেয়া হয়েছে, অনুমান করল।

ফিরে দাঁড়াল জিম। এগিয়ে এলো কাছে। কিন্তু এ-কি! সামান্যতম অবাক হল না তো! কোমরের খাপ থেকে রিভলভারও বের করল না! চমৎকার! বলে উঠল গার্ড। চেচামেচি করতে পারেনি।

আমরা করতে দিইনি বলে, বলে উঠল রবিনকে ধরে রাখা লোকটা। নৌকা দ্বীপে ভেড়াবে, এটাই তো বিশ্বাস হচ্ছিল না তোমার। আরেকটু হলেই তো দিয়েছিল! ক্যাম্পে নিয়ে ওদেরকে জাগালেই…

কিন্তু যেতে তো পারেনি, অস্বস্তি বোধ করছে জিম। এখন আর কোন ভয় নেই…

কে বলল তোমাকে? বলল মুসাকে ধরে রাখা লোকটা। টাকাগুলো নিয়ে কেটে পড়ার আগে নিরাপদ নই। যে-কোন মুহূর্তে যা খুশি ঘটে যেতে পারে! এই বিচ্ছ দুটোর ব্যবস্থা করা দরকার। চল, বেঁধে নৌকায় ফেলে রাখি। পরে দেখব, কি করা যায়।

ঠিক আছে, রাজি হল জিম। আচ্ছা, ডিক, টাকাগুলো কোথায়?

গুহায় রেখেছ?

ওসব জেনে কাজ নেই তোমার, ভারি গলায় বলল ডিক। সেটা আমাদের ব্যাপার।

আমারও! গম্ভীর কণ্ঠ জিমের। তিন ভাগের এক ভাগ আমার। তোমাদের মতই দুটো বছর অপেক্ষা করেছি। আমিও। বাঁ হাতটার কথা বাদই দিলাম। যদিও, এটা হারিয়েছি তোমাদের দোষে।

থাম! বড় বেশি কথা বল তুমি বলল রবিনকে ধরে রাখা লোকটা। তোমার ভাগ তুমি পাবে। এখন এক কাজ কর। গায়ের শার্টটা খুলে ছিড়ে ফেল। এ-দুটোকে বাঁধতে হবে।

কিন্তু…

জলদি করা ধমকে উঠল লোকটা।

শার্ট খুলে নিল জিম। ছিড়ে লম্বা লম্বা ফালি করতে লাগল।

ভাবছে রবিন। ডাকাতদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে জিম। আমার কার লুট করতে সাহায্য করেছিল ডিক আর বাডকে। ওকে সন্দেহমুক্ত রাখতে পিস্তল দিয়ে বাড়ি মেরেছিল ডিক। আঘাতটা একটু জোরেই হয়ে গিয়েছিল। কাঁধের হাড় ভেঙে গিয়েছিল। জিমের। ফলে অকেজো হয়ে গেছে বাঁ-হাতটা…

মুখের ওপর থেকে হাত সরে যেতেই চেঁচিয়ে উঠতে গেল রবিন। কিন্তু তার আগেই কাপড় গুজে দেয়া হল। মুখের ওপর দিয়ে পেঁচিয়ে নিয়ে গিয়ে মাথার পেছনে বেঁধে দেয়া হল একটা ফালি। জিভ দিয়ে ঠেলে আর গোঁজটা খুলতে পারবে না সে। দুহাত পিছমোড়া করে বেঁধে দেয়া হল এরপর।

একইভাবে মুসাকেও বাঁধা হল। পেছন থেকে দুই গোয়েন্দার জ্যাকেটের কলার চেপে ধরল। দুই ভাই।

এবার, বিচক্ষুরা, বলল ডিক, হাট। কোনরকম চালাকির চেষ্টা করবে না। দুঃখ পাবে তাহলে।

জোর ধাক্কায় প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়ার উপক্রম হল, কিন্তু কলার ধরে আছে ডিক, পড়ল না রবিন। পাশে চেয়ে দেখল, একই ভাবে ধাক্কা খেয়ে এগোচ্ছে মুসা।

দ্বীপের অন্য প্ৰান্তে নিয়ে আসা হল ওদেরকে। সৈকতে বিছিয়ে আছে পাথর। তীরের কাছে নোঙর করা একটা বড় মোটর বোট।

ওঠা। রবিনের কাঁধে ধাক্কা মারাল ডিক। উঠে পড়ল দুই গোয়েন্দা। ইঞ্জিনের সামনের খোলা জায়গাটুকুতে নিয়ে আসা হল ওদেরকে।

বস, বসে পড়া কাঁধে চাপ পড়ল। রবিনের। বাড, দড়ি বের করা তো। শক্ত করে বাঁধতে হবে, যেন পালাতে না পারে।

কাছেই পড়ে আছে বোট বাঁধার দড়ি। অনেক লম্বা। হ্যাঁচকা টান দিয়ে মুসাকে চিত করে শুইয়ে ফেলল বাড। দড়ি তুলে নিয়ে পেঁচিয়ে বেঁধে ফেলল। মুসার পা। বাড়তি অংশটুকু দিয়ে রবিনের পা বাঁধল। আরেক টুকরো দড়ি এনে দুজনের বুকে বুক লাগিয়ে পেঁচিয়ে বাঁধল।

ব্যস ব্যস, বলল ডিক ফিশার। আর ছুটতে পারবে না। চল, তাড়াতাড়ি করতে হবে। এমনিতেই অনেক সময় নষ্ট করে ফেলেছি। গুপ্তধন, হঁহা খোঁজার জন্যে যে-কোন সময় চলে আসতে পারে ব্যাটারা

বোট থেকে নেমে গেল দুই ফিশার।

তুমি এখানেই থাক, জিম, শোনা গেল ডিকের কথা। চোখ রাখ চারদিকে। সন্দেহজনক কিছু দেখলে প্যাঁচার ডাক ডাকবে।

ছেলে দুটোকে কি করবে? জিমের গলা। ওরা বলে দেবে সব! আমি…

বলবে না, কেমন অদ্ভুত শোনাল ডিকের গলা। খানিক পরেই ফিরে আসছি আমরা। বোট নিয়ে চলে যাব। তখন ওদের নৌকাটা উল্টো করে ভাসিয়ে দেবে। আগামী কাল ওভাবেই পাওয়া যাবে ওটা। লোকে ধরে নেবে কোন কারণে সাগরে ড়ুবে মরেছে…

বুঝেছি, বুঝেছি, বলে উঠল জিম।

পায়ের শব্দ কানে এল, দুজোড়া।। চলে যাচ্ছে। তারপর নীরবতা। কথা বলার চেষ্টা করল রবিন। পারল না। অদ্ভুত একটা চাপা। আয়োজ বেরোল শুধু। বাঁধন খোলা যাবে না। বাঁচার উপায় নেই।

বিশাল টেবিলে পড়ে থাকা মোহরের ছোট স্তূপের দিকে অবাক হয়ে চেয়ে আছেন মিস্টার ডেভিস ক্রিস্টোফার।

গুপ্তধন তাহলে পেলো অবশেষে বললেন পরিচালক। সব পাওনি, ঠিক, তবে কিছু তো পেয়েছ।

মোট পঁয়তাল্লিশটা, বলল কিশোর। এখানে আছে তিরিশটা, মুসা। আর রবিনের ভাগের। ক্যাপ্টেন ওয়ান-ইয়ারের ধনরাশির তুলনায় কিছুই की।

তবু তো ধন, সোনার ডাবলুন, বললেন মিস্টার ক্রিস্টোফার। এখন বল, কেন মনে হল, লুটের টাকা স্কেলিটন আইল্যান্ডে লুকানো আছে?

সন্দেহটা ঢোকাল স্কেলিটন আইল্যান্ডের ভূত, বলল কিশোর। ওসব কুসংস্কারে বিশ্বাস করি না। শুনেই বুঝলাম, দ্বীপে ভূত দেখা যাওয়ার পেছনে মানুষের কারসাজি রয়েছে। কেউ একজন চায় না, ওই দ্বীপে মানুষ যাতায়াত করুক। তখনই প্রশ্ন জাগল মনে, কেন? মূল্যবান কিছু রয়েছে? ক্যাপ্টেন ওয়ান-ইয়ারের গুপ্তধন? ব্যাপারটা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি। এই সময় দ্য হ্যান্ডের নিচের গুহা আবিষ্কার করে বসল পাপালো। মোহর পেল ওখানে। বুঝে গেলাম, স্কেলিটন আইল্যান্ডে ওয়ান-ইয়ারের গুপ্তধন নেই। তাহলে? একসঙ্গে তিনটে কথা এল মনে। প্ৰায় বিশ বছর পরে হঠাৎ দেখা যেতে শুরু করেছে স্যালি ফ্যারিংটনের ভূত, বছর দুই আগে থেকে। ঠিক দুই বছর আগে লুট হয়েছে দশ লক্ষ ডলার। স্কেলিটন আইল্যান্ডের পাশে উপসাগরে ধরা পড়েছে দুই ভাই, ডিক আর বাড ফিশার। ক্যাপ্টেন ওয়ান-ইয়ারের ধরা পড়ার সঙ্গে কোথায় যেন মিল রয়েছে। একটু ভাবতেই বুঝে ফেললাম ব্যাপারটা। ক্যাপ্টেন ওয়ান-ইয়ার মোহর সাগরে ফেলে দেয়নি, লুকিয়ে ফেলেছিল। হ্যান্ডের গুহায়। ফিশাররাও টাকা পানিতে ফেলে দেয়নি, লুকিয়ে ফেলেছে স্কেলিটন আইল্যান্ডের গুহায়। ব্রিটিশ জাহাজের ক্যাপ্টেনকে ফাঁকি দিয়েছিল ওয়ান-ইয়ার, একই কায়দায় পুলিশকে ফাঁকি দিয়েছে ফিশাররা।

চমৎকার! বললেন পরিচালক। আরেকটা প্রশ্ন। ডিক আর বাড তো জেলে, ভূত সাজল কে?

হান্ট গিল্ডার, এটা আমার অনুমান, বলল কিশোর, জেলে দুই ফিশারের সঙ্গে দেখা করত সে। কোনভাবে ওকে নিয়মিত টাকা দেবার বন্দােবস্ত করেছিল দুই ভাই। বিনিময়ে মাঝে মাঝেই দ্বীপে গিয়ে ভূত সেজে জেলেদেরকে দেখা দিত হান্ট। আসল কারণটা নিশ্চয় জানত না, তাহলে টাকাগুলো খুঁজে বের করে নিয়ে চলে যেত।

যেমন যেত গার্ড জিম রিভান, বললেন মিস্টার ক্রিস্টোফার।

হ্যাঁ, মাথা ঝোঁকাল কিশোর। জিম জানত না, দ্বীপেই লুকানো আছে টাকাগুলো। শুধু এটুকু জানত, কোথাও লুকিয়ে রেখেছে দুই ভাই। জেল থেকে বেরিয়ে এসে বের করবে। তার ভাগ তাকে দিয়ে দেবে।

যখন জানল, তার নাকের ডগায়ই রয়েছে টাকাগুলো, হেসে বলল রবিন, কি আফসোসই না করলা

হ্যাঁ, কিশোরের গলায় ক্ষোভ। নিশ্চয় দেখার মত হয়েছিল তার মুখের ভাবা সর্দির জন্যে তো যেতে পারলাম না…

সিনেমা কোম্পানির জিনিসপত্র চুরি করল কে? জিজ্ঞেস করলেন পরিচালক। জিম আসার আগেই তো শুরু হয়েছিল চুরি!

নিশ্চয় হান্ট, বলল কিশোর। চোর হিসেবে বদনাম আছে। ওর এমনিতেই। চুরি কুরতে গিয়ে ধরা পড়লে, ব্যাপারটাকে সাধারণ চুরি হিসেবেই নিত পুলিশ। অন্য কিছু সন্দেহ করত না।

কাজটা অন্যকে দিয়ে করানোর কি দরকার? বললেন পরিচালক। জেল থেকে তো বেরিয়েছে তখন দুভাই। ওরা করলেই পারত? আর এত সব ঝামেলার মধ্যে গেল কেন? চুপচাপ এক রাতে গিয়ে টাকাগুলো বের করে নিয়ে চলে আসতে পারত।

পারত না, বলল কিশোর। আমার ধারণা, হান্ট টাকার গন্ধ পেয়ে গিয়েছিল। দুবছর ভূত সেজেছে সে। অনেক টাকা পেয়েছে দুই ভাইয়ের কাছ থেকে। এত টাকা খামোেকা ব্যয় করেনি। ডিক আর বাড, এটা বুঝবে না, অত বোকা নয় সে। দুই ফিশারের ভয় ছিল, টাকা আনতে গেলে পিছু নেবেই হান্ট, দেখে ফেলবে। তখন তাকে একটা ভাগ দিতে হবে। হান্টের ব্ল্যাকমেলের শিকার হবারও ভয় ছিল ওদের। তাই তো কৌশলে সরাল ওকে।

কি কৌশল? জানতে চাইলেন পরিচালক।

আমরা যাব, কথাটা ছড়িয়ে পড়ল শহরে। জেনে গেল ডিক আর বাড। বুঝল, হান্টকে সরানোর এই সুযোগ। আমাদেরকে কিডন্যাপ করে। দ্য হ্যান্ডে রেখে আসতে ওকে পাঠাল ওরা। নিশ্চয় অনেক টাকা পেয়েছে, বোকার মত কাজটা করে বসল। হান্ট। ফিরে এসে সব কথা জানালাম আমরা পুলিশকে। পিছু লাগল পুলিশ। শহর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হল হান্ট। থামল কিশোর। তারপর আবার বলে চলল, হান্ট চলে গেল। সিনেমা কোম্পানি থেকেই গেল দ্বীপে। চুরি বন্ধ করা চলবে না। জিমকে ধরল দুই ভাই। সুন্দর সুযোগ। কোম্পানি একজন গার্ড চায়। জিম হলে খুব ভাল হবে। নিজেই চাকরির দরখাস্ত নিয়ে গেল জিম। হয়ে গেল চাকরি। ঘরের ইদুর বেড়া কাটতে লাগল। দ্বীপটার আশেপাশে খুব বেশি ঘোরাফেরা করে পাপালো। গুপ্তধন খুঁজে বেড়ায়। যদি কখনও গুহায় ঢুকে টাকার বাণ্ডিল দেখে ফেলে, এই ভয়ে তার ওদিকে যাওয়া বন্ধ করতে চাইল দুই ফিশার। গুজব রটিয়ে দিল, পাপালো চোর। সিনেমা কোম্পানির জিনিসপত্র সে-ই চুরি করে। তাকে দেখলেই লাঠি নিয়ে তাড়া করে জিম। এই সময় আমরা গিয়ে হাজির হলাম। জোর পেল পাপালো। শুধু গুজব রটিয়ে ওকে আর ঠেকানো যাবে না, বুঝতে পারল দুই ভাই। সময় মত জিম পেয়ে গেল পাপালোর ছুরিটা। জানাল দুই ডাকাতকে। সুযোগটা লুফে নিল ওরা। লেন্স চুরি করােল জিমকে দিয়ে, ট্রেলারের জানালা ভাঙল, মেঝেতে ছুরিটা ফেলে রাখা হল, লেন্সগুলো নিয়ে গিয়ে পাপালোর বিছানার নিচে রেখে দিয়ে এল ডিক কিংবা বাড। পরের দিন আরেকটা সুযোগ পেয়ে গেল ডিক। দ্য হ্যান্ডের দিকে গিয়েছে পাপালো, জানল কোনভাবে। পিছু নিল। ভেঙে দিয়ে এল নৌকাটা। ব্যস, একেবারে নিশ্চিন্ত হয়ে গেল। কোন কারণে যদি পাপালোকে ছেড়েও দেয় পুলিশ, ও আর গুপ্তধন খুঁজতে যেতে পারবে না। কিন্তু বড় একরোখা পাপালো হারকুস, ওকে শেষ অবধি ঠেকাতে পারল না। দুই ফিশার। ওরই জন্যে ধরা পড়েছে ওরা, প্ৰাণে বেঁচেছে মুসা আর রবিন।

হাঁ আস্তে মাথা ঝাঁকালেন মিস্টার ক্রিস্টোফার। আচ্ছা, কিছু করে এসেছি। ওর জন্যে? সাহায্যের কথা বলছি।

আমাদের কিছু করতে হয়নি, কথা বলল মুসা। নিজের ব্যবস্থা নিজেই করে নিয়েছে পাপু।

কি?

গুপ্তধন শিকারের ওপর যে ছবিটা করা হয়েছে, তাতে মূল ভূমিকা তার দেখানো হয়েছে। দ্য হ্যান্ডের গুহা থেকে ড়ুবে ড়ুবে মোহর তুলে আনছে সে, এই দৃশ্যের ছবিও তোলা হয়েছে। মিস্টার জন নেবারের সঙ্গে আলোচনা করে বেশ মোটা অংকের পারিশ্রমিক দিয়েছে তাকে বাবা। ট্রেজার-হান্টার ছবিতে অভিনয়ের জন্যে।

খুব ভাল, খুব ভাল, খুশি হলেন পরিচালক। আর কিছু?

পরিবহন কোম্পানির দশ লাখ ডলার ফিরে পাওয়ার ব্যাপারে পাপালোর কৃতিত্বই বেশি, বলল কিশোর। তাকে একটা পুরস্কার দিয়েছে কোম্পানি। পঁচিশ হাজার ডলার।

বাহ্, বেশ বড় পুরস্কার তো! বললেন পরিচালক।

বাবাকে নিয়ে দেশে ফিরে যাবে পাপালো, বলল কিশোর। ভালভাবে চিকিৎসা করবে। একটা বোট কিনে মাছের ব্যবসা শুরু করবে। আশা পূরণ হয়েছে তার।

হুমম, মাথা ঝোঁকালেন পরিচালক। তোমাদের এই অ্যাডভেঞ্চার কাহিনী নিয়ে খুব ভাল একটা ছবি হবে। ভাবছি, পুরোটাই শুটিং করব। স্কেলিটন আইল্যান্ড আর আশেপাশের দ্বীপগুলোতে। যেখানে যা যা যেভাবে ঘটেছে, ঠিক তেমনি ভাবে। পাপালোর চরিত্রটা তাকে দিয়েই অভিনয় করালে কেমন হয়?

খুব ভাল হয়। একই সঙ্গে বলে উঠল তিন গোয়েন্দা।

ঘড়ি দেখলেন পরিচালক। ঠিক আছে। নতুন কোন রহস্যের খোঁজ পেলে জানাব।

ইঙ্গিতটা বুঝল তিন কিশোর। উঠে দাঁড়াল। মোহরগুলো টেনে নিলো মুসা। বেছে বেছে একটা ভাল মোহর-যেটা কম ক্ষয় হয়েছে, তুলে নিয়ে বাড়িয়ে ধরল। এটা আপনাকে দিলাম, স্যার। আপনার সংগ্রহে রেখে দেবেন।

থ্যাংক ইউ, মাই বয়, মোহরটা নিতে নিতে বললেন পরিচালক।

ঘর থেকে বেরিয়ে গেল তিন গোয়েন্দা।

হাতের তালুতে নিয়ে মোহরটার দিকে চেয়ে রইলেন মিস্টার ক্রিস্টোফার। বিড়বিড় করে বললেন, সত্যিকারের জলদস্যুর গুপ্তধন! হাসলেন আপন মনেই। দারুণ ছেলেগুলো কী সুন্দর সুন্দর কাহিনীর জন্ম দিচ্ছে ভাবছি, এরপর কি আসাইনমেন্ট  দেয়া যায় তিন গোয়েন্দাকে!

Categories: